এক বিশাল সাহসীকতা দেখিয়েছিলেন। আর দেখাবেন না বা ই কেন। কেকের মধ্যে গোপনীয় ভাবে মেমোরি চিপে ছবিটি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সেই কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। আর সেদিনের ফেস্টিভ্যাল প্রেক্ষাগৃহ মুভিটি দেখার পর তুমুল হাততালিতে কেঁপে উঠেছিল। লোকটা যেই সেই তো আর না। জাফর পানাহি বলে কথা। গৃহবন্দি থাকাবস্থায় এক আশ্চর্য চলচ্চিত্র উপহার দিলেন, 'দিস ইজ নট এ ফিল্ম'।সমস্ত বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। সরকার যাতে কোন ভাবেই টের পায় না তা কিভাবে চলচ্চিত্র বানানো যায় বোধহয় বিশ্বে জাফর পানাহির মতো তেমন কেউ দেখাতে পারেননি।
আজ আমরা দেখতে পাই সমস্ত বিশ্বজুড়ে এক অদ্ভুত কণ্ঠরোধের চেষ্টা। ভীষণ দম বন্ধ পরিস্থিতে আমরা জীবন কাটাচ্ছি।যে বা যারাই শক্তির বিরুদ্ধে সংলাপ আওড়াবেন তাতে কবি, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, দার্শনিক যেকেহই হোন না কেন তাঁরই টুঁটি চেপে ধরা হবে। এটাই এখন একটা ট্রেন্ড। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যম। সেই একই ধারায় আবারও গ্রেফতার করা হল চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহি কে। এটা কোন নতুন সংস্করণ নয়।
এ খেলা এর আগেও হয়েছে, আগেও একাধিকবার ওনার ক্যামেরার লেন্স ঢেকে দেওয়া হয়েছে।আগেও বহুবার ওনার কলম ভেঙে কালি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগেও জেলের ভাত উনি খেয়েছেন - আর এ সবকিছুর পেছনে ওনার দোষ কী? উনি সিনেমা তৈরি করেন।তার অপরাধ freedom of expression এ বিশ্বাস বা He believes his duty to tell the tales করেন বলে! তিনি তো সত্য ঘটনা বলতে ভালোবাসেন, আয়না ধরতে ভালোবাসেন। আর রাষ্ট্র নিজের ছবি দেখতে পছন্দ করে না, রাষ্ট্রশক্তি তার কুৎসিত চেহারা সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই ওয়াকিবহাল। তাই ওরা এই আয়না ভেঙে দিতে চায়। কিন্তু কি নির্মম পরিহাস, আয়নাকে ভেঙে হাজার টুকরো করলেও, প্রতিটি টুকরো নিছক কাঁচ না হয়ে নিজেরা এক একটা আয়না হয়ে যায়, আহ্। ঠিক একইভাবে জাফর পানাহি আর কোন মানুষ নন, তিনি একটা চিন্তাতে পরিনত হয়েছেন।একটা মুক্ত চিন্তাধারা যা সত্যি বলতে শেখায়, যা পুরোনোকে ভেঙে নতুনকে স্বাগত জানাতে শেখায়। তবে এর সাথে আর একজনের নাম এসে পড়ে তুরস্কের পরিচালক ইলমাজ গুণের কথাও।
জাফর পানানহি নামক মানুষটিকে জেলে ভরলেও আজ তাঁর সিনেমাগুলো আমাদের মতো হাজারো মানুষকে শিক্ষিত করেছে। যে মানুষ গৃহবন্দী অবস্থাতেও সিনেমা বানানোর মতো দুঃসাহসিক খেলায় মত্ত। যিনি জেলের ছোট্ট সেল থেকে বেরিয়েও নিজেকে এক বৃহৎ জেলে অনুভব করেন, তাঁকে কি আর জেলের ভয় দেখিয়ে কোন লাভ আছে? এই মানুষটা কখন যে সিনেমা বানাতে গিয়ে নিজেই একটা আস্ত সিনেমা হয়ে গেছেন, তা নিজেও জানেন না।
২০০৬ সালের ইরানের সামাজিক অবস্থানকে ও ধর্মীয় গোড়ামিকে এক এক করে আঙ্গুল দেখাতে সক্ষম ছিলেন এই উদারপন্থী শিল্পী। নিজ কন্যা ও ১৫ জন বন্ধু সহ গ্রেফতার হয়েছিলেন ২০১০ সালে। বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। মুক্তও হয়েছিলেন কিন্তু থাকতে হলো গৃহবন্দি হয়ে। যে মানুষটা জগতসভায় বার বার অসামান্য চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন।একাধিকবার চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ এবং সম্মানিত পুরষ্কার ছিনিয়ে নিয়ে ইরানের মতো একটি দেশকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁকে গ্রেফতার, গৃহবন্দি, নজরবন্দি ইরানের মতো মৌলবাদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সরকারের পক্ষেই বোধহয় সম্ভব!
জাফর পানাহি তার অধিকাংশ সময় জেলে কাটিয়েও উপহার দিয়েছেন আশ্চর্য কিছু চলচ্চিত্র। আমার দেখা তার কিছু মুভি নিয়ে আলোচনা করা যাক। 'দা ওয়াল' যাঁরা দেখেছেন, অনুমান করতে পারবেন কি অসামান্য ছবি।
তারপর 'ট্যাক্সি'। বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে সর্বোচ্চ পুরষ্কার জিতে নেয় 'ট্যাক্সি'। ট্যাক্সি ছবি পুরোটাই স্যুটিং হয়েছে গোপন ক্যামেরায়। পানাহি নিজে ট্যাক্সি ড্রাইভারের ভূমিকায়। পথে বিভিন্ন প্যাসেঞ্জার উঠেছে তাঁর ট্যাক্সিতে। প্যাসেঞ্জারদের সঙ্গে কথপোকথন থেকে বেরিয়ে এসেছে মারাত্মক সামজিক অবস্থান। এ নিয়েই ছিল এই মুভি।দেশের বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিলনা তাই পানাহি নিজ হাতে সর্বোচ্চ পুরষ্কারটি গ্রহণ করতে বার্লিন যেতে পারেননি। পিতার হয়ে কন্যা পুরষ্কারটি গ্রহণ করেছিলেন।
দ্য মিররের সেই চকলেটি বাচ্চা মেয়েটি। যার মুখ আর কথা শুনলে মনটা একদম ভরে যায়। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরবে, অথচ কেউ তাকে সেদিন নিতে আসেনি। একে একে সবাই বাড়ি চলে গেলেও বাচ্চা মেয়েটি একা বসে রয়। টেলিফোন বুথ থেকে বাড়িতে ফোন করতে পারছেনা, উঁচুতে রাখা টেলিফোন তার মতো বাচ্চার নাগালের বাইরে। শেষে একাই বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়।জিজ্ঞেস করতে করতে ফিরছে বাড়ি। আর তার চোখদুটো দেখছে সম্মুখের নানান ধরণের মানুষের কালচার। এক অসামান্য ছবি। যেমন অসামান্য 'দ্য হোয়াইট বেলুন'। ঐ বাচ্চা মেয়েটিই অভিনয় করেছে। অফসাইডের কথা যদি বলতে হয় তো পানাহি অসাধারণ কাজ করেছেন। একদিকে ইরানের একটি মেয়ে লুকিয়ে , ছেলেদের পোশাক পরে , মাথা নিচু করে পুরুষদের ফুটবল খেলা দেখতে যাচ্ছে । মুখে চোখে যেন এক শববাহী যন্ত্রনা ! উচ্ছাসহীন স্তব্ধতা। মেয়েটি বিশ্বকাপের উপচে পড়া আনন্দকে সামান্যও স্পর্শ করতে পারছে না । কারণ তার একটাই চিন্তা সিকিউরিটিকে এড়িয়ে স্টেডিয়ামে ঢুকতে পারবো তো ?পুরুষতান্ত্রিক নিয়মের প্রাচীর ভেদ করে মেয়েদের দেশপ্রেমকে দেখতেই পারলো না পুরুষের চোখগুলো । ক্রিমশন গোল্ড, দ্য সার্কাল প্রতিটি ছবির চিত্রণ যেমন আলাদা তেমন সামাজিক অবস্থানকে মারাত্মকভাবে তুলে ধরার এক অনন্য নজির। চোখে ভাসে পানাহির প্রতিটি ছবি।
জাফর পানাহির গ্রেপ্তার আসলে একটি উন্মুক্ত আকাশকে বেড়ি পড়ানো।এখন দেখার পালা, খোলা আকাশকে কতদিন আটকে রাখা যায় ? আশার কথা গত ১১জুলাই তাঁর গ্রেফতারের পর কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কমিটি ইরানিয়ান সরকারের কাছে মুক্তির আবেদন করেছে। দমন করে কোনও প্রতিভা আটকানো যায়না যার প্রমাণ জাফর পানাহি। আমি জানি আমার মতো দুর্বলের বার্তা কোথাও পৌঁছোবে না তবু ব্যক্তিগতভাবে তাঁর মুক্তির তীব্র দাবি জানাচ্ছি।
No comments:
Post a Comment