ফেসবুক তথা সোস্যাল সাইট দুনিয়ায় শুরু হয়েছে বিতর্কের ঝড়।বিদ্যালয়গুলোতে সরস্বতী পূজা বা নবী দিবস প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। আমারও তাতে কোন অসুবিধা নেই কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করার। ধর্ম পালন করার অধিকারও সবার আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এর কতটা যৌক্তিকতা আছে।বলাবাহুল্য, সোস্যাল মিডিয়ায় এই বিতর্কটি সাম্প্রতিক হলেও প্রকৃতপক্ষে বিতর্কটি নতুন নয়, আজ থেকে প্রায় পনেরো বছর আগে শিক্ষাঙ্গনে সরস্বতীপূজার বিরোধিতা করে প্রথম জনমত গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেন প্রবীর ঘোষের নেতৃত্বে 'ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি'। এরপর ক্রমশ বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়তে থাকে দাবীর স্বপক্ষে ও বিপক্ষে বাদানুবাদ। সময়ের সাথেসাথে বিতর্কটি ক্রমশ তীব্রতর হয়েছে এবং সাম্প্রতিককালে উন্নত কমিউনিকেশনের দৌলতে নেট দুনিয়ায় তা এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। এমতাবস্থায় একজন মুক্তমনা মানুষ হিসাবে কিছু কথা বলার প্রয়োজন বলে মনে করছি, তাই এই প্রসঙ্গের অবতারণা।
প্রথমত, সরস্বতী পূজা করে আদৌ কোনো 'ফললাভ' হয় কিনা সে আলোচনায় আমি যাচ্ছি না। প্রতিবছর ধূমধাম করে সরস্বতীপূজা হওয়া স্বত্ত্বেও আজও ভারতে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী নিরক্ষরের বাস, আজও জ্ঞান বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে ভারত বিশ্বের অন্যতম পিছিয়ে পড়া দেশ। বছরের পর বছর চলে যায়, বিজ্ঞান বা চিকিৎসাবিদ্যা বা সাহিত্যে একটিও নোবেল আসে না । আর অন্যদিকে সরস্বতীর অস্তিত্বে বিশ্বাস না করা পাশ্চাত্যের দেশগুলির দিকে তাকিয়ে দেখুন, স্বাক্ষরতার হারই হোক বা উচ্চশিক্ষার হার, সবদিকেই ওরা এগিয়ে আছে আমাদের চেয়ে। কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, হাভার্ড থেকে শুরু করে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে দেশগুলোতেই, ভারতে নয়। বছরের পর বছর এ দেশ থেকে দলে দলে ছাত্ররা যায় ও দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষা নিতে। উলটো স্রোত প্রায় অদৃশ্য। নোবেল সহ যাবতীয় একাডেমিক পুরষ্কারের ঝুলি বছরের পর বছর যায় ওইসব দেশগুলিতেই। বরং সেদিক থেকে বিচার করলে বলতে হয় সরস্বতী বলে যদি সত্যিই কেউ থেকে থাকেন তাহলে তিনি নিতান্তই দুর্বল এক দেবী। যে দেশ তার সবচেয়ে বেশী আরাধনা করে থাকে সেই দেশেই সাক্ষরতা তথা শিক্ষাদীক্ষার হার রীতিমত তলানির দিকে।
দ্বিতীয়ত, আমি সুষ্পষ্টভাবে মনে করি ভারত যেহেতু একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ, তাই এখানে স্কুল কলেজ সহ সমস্ত সরকারী বা সরকার পোষিত প্রতিষ্ঠানে সরস্বতীপূজা সহ সমস্ত ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ বন্ধ হওয়া আশু প্রয়োজন। এমনটা নয় সরস্বতীপূজা হিন্দুধর্মের অনুষ্ঠান বলেই এটাকে বন্ধ করতে চাইছি , প্রকৃতপক্ষে আমরা চাইছি হিন্দু, মুসলিম, খ্রীষ্টান, ইত্যাদি কোনো ধর্মেরই কোনো অনুষ্ঠান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে না করতে। সরস্বতী পূজা যেমন বন্ধ হওয়া দরকার তেমনই দরকার নবী দিবস পালন বন্ধ করা।
কে এই সরস্বতী ?
বেদের কিছু শ্লোকে সরস্বতী নদীর উল্লেখ আছে। দেবী হিসেবেও বর্ণিত হয়েছেন সরস্বতী।
अम्बितमे नदीतमे देवितमे सरस्वति |
– Rigveda 2.41.16
Best Mother, best of Rivers, best of Goddesses, Sarasvatī, We are, as ’twere, of no repute and dear Mother, give thou us renown.
अपो अस्मान मातरः शुन्धयन्तु घर्तेन नो घर्तप्वः पुनन्तु |
विश्वं हि रिप्रं परवहन्ति देविरुदिदाभ्यः शुचिरापूत एमि ||
– Rigveda 10.17
May the waters, the mothers, cleanse us,
may they who purify with butter, purify us with butter,
for these goddesses bear away defilement,
I come up out of them pure and cleansed.
–Translated by John Muir
আভিধানিক পরিভাষাঃ
সরস্বতীকে কখনো কখনো সারসবতী” হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি সার(গুন)+ স্বতি (নিজের) বা নিজের গুনে গুণান্বিত। সংস্কৃত পরিভাষায় সরস্বতী শব্দকে সরস+বতী বা জলপূর্ণ নদী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কোথাও সরস্বতীকে “ব্রাহ্মী” বা ব্রহ্মার কন্যা আবার কোথাও তাঁকে “ব্রাহ্মণী” বা ব্রাহ্মার স্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও “নারায়ণী” বা নারায়ণ ওরফে বিষ্ণুর স্ত্রী আবার কোথাও তিনি “ভগবতী” “ভারতী” হিসেবে বর্ণীত হয়েছেন। কোথাও তিনি উন্মুক্ত বক্ষ (কুঁচযুগ শোভিতা) আবার কোথাও তিনি “শ্বেতবসনা”। তিনি হংসাসনা, পুস্তকহস্তে এবং বীনাবাদনী।
তার ধ্যানমন্ত্রঃ
“ওঁ তরুণ শকল মিন্দোর্ব্বিভ্রতি শুভ্র কান্তি,
কুচভরণমিতাঙ্গি সন্নিষন্না সিতাব্জে,
নিজকর কমলোদ্যল্লেখনী পুস্তকশ্রীঃ
সকল বিভবসিদ্ধৈ পাতু বগ্দেবতা নমঃ”।
নমস্কারমন্ত্রঃ
জয় জয় দেবীচরাচরসারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।
বীণাপুস্তকরঞ্জিত হস্তে , ভগবতী ভারতী দেবী নমস্তে॥
ওঁ সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যেকমললোচনে,
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যাং দেহী নমোহস্তুতে॥
সরস্বতীর জন্ম কাহিনীঃ
মিশর, গ্রীক, রোমান, অশিরিয়ান পৌরাণিক কাহিনীর চরিত্রগুলির মতোই ব্রাহ্মন্য সাহিত্যের চরিত্রগুলিও হেয়ালী এবং স্ববিরোধিতায় পরিপূর্ণ। বিশেষত এই চরিত্রগুলির জন্ম কাহিনী এমন “অসম যৌনাচারে” ভরা যে তা বর্তমান নীল ছবিকেও হার মানাতে পারে। বিশেষত ব্রাহ্মন্যবাদী দেব দেবীর জন্ম কাহিনীগুলি এমন কুরুচিপূর্ণ, অশ্লীল এবং অনৈতিকতায় পরিপূর্ণ ধ্বংস করে দিতে পারে মানবিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা বোধ। সরস্বতীর জন্ম কাহিনী এবং জীবন কাহিনীও এই অবৈধ এবং অসম যৌনাচারের সমন্বয়ে গড়া।
কয়েকটি বিশেষ পুরাণে সরস্বতীর জন্ম কাহিনী পাওয়া যায়। এদের মধ্যে বিশেষ ভাবে Aitreay Brahman III : 33 // Satapatha Brahman 1 : 4 : 7 : 1ff // Matsya Puran III : 32ff // Bhagabati Puran III : 12 : 28ff উল্লেখযোগ্য। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণেও শ্রী কৃষ্ণের (বিষ্ণু) জিহ্বা থেকে সরস্বতীর জন্ম দেখানো হয়েছে।
সরস্বতী পুরাণ মতেঃ
স্বমেহন বা হস্তমৈথুন করতেন ব্রহ্মা। হস্তমৈথুনের পর নির্গত বীর্য তিনি একটি পাত্রে জমা করতেন। একদিন ঊর্বশীকে দেখে কামাতুর হয়ে পড়েন। অভ্যাস বশত হস্তমৈথুন করে সেই পাত্রে রাখেন এবং সেখানেই সরস্বতীর জন্ম হয়। তাই সরস্বতীর কোন মা নেই।
আর একটি সূত্র থেকে পাওয়া যায়, ব্রহ্মার বীর্যে মাটির পাত্রে জন্ম হয় ঋষি অগস্ত্য এবং পরে অগস্ত্য জন্ম দেন সরস্বতীর। এই সূত্র অনুযায়ী সরস্বতী একদিকে ব্রহ্মার নাতনি।
পিতা ব্রহ্মা ও কন্যার অবৈধ যৌনতাঃ
নিজের কন্যার রূপ দেখে ব্রহ্মা যৌন লালসায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। তাঁকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করতে ছুটে আসে। সরস্বতী পিতার কামাতুর দৃষ্টি থেকে পরিত্রান পাবার জন্য চতুর্দিকে ছুটে বেড়ান কিন্তু পিতা তাঁকে চতুর্মুখ দিয়ে আকর্ষণ করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত হার মানে সরস্বতী। পিতার বাহুবন্ধনে ধরা দেন। তারা একটি গুহায় প্রবেশ করে। ১০০ বছর ধরে পিতা ব্রহ্মা কন্যা সরস্বতীকে ধর্ষণ করে এবং সেই অবৈধ সঙ্গমের ফলে স্বয়ম্ভূমারু’র (মনু) জন্ম হয়।
অন্য আর একটি সূত্র থেকে পাওয়া যায় যে ব্রহ্মা ও সরস্বতীর অবৈধ যৌন মিলনের ফলে একটি সন্তান মনু এবং একটি কন্যা শতরূপার জন্ম হয়।
নিজের পুত্র মনু’র সাথে সরস্বতীর যৌনতাঃ
মৎস পুরাণে উল্লেখ আছে যে পিতা ব্রহ্মার যৌনাচারে ক্ষিপ্ত হয়ে সরস্বতী তাঁকে পরিত্যাগ করেন এবং পুত্র মনুকে নিয়ে পালিয়ে যায়। যাবার আগে তিনি ব্রহ্মাকে অভিসম্পাত করেন যে পৃথিবীতে কোথাও তিনি পূজিত হবেন না। বেশ কিছু পুরাণ বর্ণনা করেছে যে এই সরস্বতী তার নিজের ছেলে মনুকে বিয়ে করেন এবং তাদের প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ নামে দুই পুত্র ও আকুতি, দেবাহুতি ও প্রসুতি নামে তিন কন্যার জন্ম হয়।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে সরস্বতীকে চঞ্চল, কলহপ্রিয়া এবং কামার্ত নারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে যে, এই দেবী জন্মের পরের থেকেই জন্মদাতা(বিষ্ণু)র প্রতি অতিশয় কামার্ত হয়ে পড়েন। বিষ্ণুর শয্যায় লক্ষ্মীকে দেখে ঝগড়া শুরু করেন। দুই সতীনের ঝগড়া এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বিষ্ণু এদের অভিশাপ দিয়ে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করে দেয়। বিষ্ণুর অভিশাপে সরস্বতী নদী হয়ে যায় এবং লক্ষ্মী নদীর পাড়ে গাছ হয়ে যায়। বিষ্ণু শিবকে এ কথাও জানায় যে এই দুই নারীর কারণে পৃথিবীও যৌনতা ও কলহপূর্ণ হবে। ওখানকার শান্তি বিনষ্ট হবে।
সরস্বতী মিথ কতটা যুক্তিযুক্ত ?
প্রখ্যাত অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্য মনে করেন যে, বেদ রচনার কাল ছিল খ্রিষ্ট পূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতক পর্যন্ত। একালের প্রায় প্রত্যেক ঐতিহাসিকও এই মত সমর্থন করেন। বিশেষত পুরাণ কাহিনীগুলি যে গুপ্ত যুগের কাহিনী তা সকলে মেনে নিয়েছেন। গুপ্ত যুগের আগে মৌলিক দুটি গ্রন্থ আমরা দেখতে পাই যেখানে নারীকে সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এই দুটি গ্রন্থ হল চাণক্যের অর্থশাস্ত্র (খ্রীস্ট পূর্ব দ্বিতীয়শতক) এবং ভৃগুর মনুস্মৃতি (খ্রীস্ট পূর্ব ১৮৫ সাল)। এদের মধ্যে মনুস্মৃতি স্পষ্ট করে নির্দেশ করেছিল যে,
147. By a girl, by a young woman, or even by an aged one, nothing must be done independently, even in her own house. “একজন বালিকা বা যুবতী বা বৃদ্ধা গৃহে স্বাধীন ভাবে কিছু করবেনা”।। (মনু স্মৃতি, ৫ অধ্যায়)
148. In childhood a female must be subject to her father, in youth to her husband, when her lord is dead to her sons; a woman must never be independent.
স্ত্রীলোক বাল্যে পিতার বশ্য থাকবে, যৌবনে স্বামীর অধীনে, স্বামী প্রেতলোক প্রাপ্ত হলে পুত্রের অধীনে থাকবে। কোন পরিস্থিতিতে নারী স্বাধীন থাকবে না’। (মনু স্মৃতি, ৫ অধ্যায়)
150. She must always be cheerful, clever in (the management of her) household affairs, careful in cleaning her utensils, and economical in expenditure. সে সকল সময় ঘরকন্নার কাজে, থালা বাসন পরিষ্কার করা এবং আর্থিক অপচয়ের ক্ষেত্রে যত্নবান হবে (মনু স্মৃতি, ৫ অধ্যায়)
মহান গীতাতেও “নারী, বৈশ্য এবং শূদ্রগণ পাপ যোনিতে জন্ম” বলে সমস্ত অধিকার থেকে নারীকে বঞ্চিত করে রেখেছে। (গীতা, ৯/৩২) এমনকি তুলসীদাস রামচরিত মানস রচনা কালেও পূর্বজ গণের পথ অনুসরণ করে নারীকে পশুর সমান উল্লেখ করেছিলেন।
“ঢোল গাওয়ার পশু শূদ্র নারী
ইয়ে সারে তদন কী অধিকারী”।
অর্থাৎ ভারতীয় নারীরা খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে মুঘল আমল পর্যন্ত সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। সরস্বতী নামে কোন আর্য নারীর পক্ষেও বিদ্যার্জন ছিল একেবারেই নিষিদ্ধ। নিদেন পক্ষে তিনি ঘরদোর ঝাঁট দিয়ে, এঁটো বাসন মেজে অবসর সময়ে তানপুরা বাজিয়ে স্বামীর মন জয় করে শয্যা সঙ্গিনী হয়ে যৌনতা উপভোগ করতে পারতেন। গণ্ডা গণ্ডা সন্তান ধারণ করতে পারতেন। বিদ্যালয়ে গিয়ে, বিদ্যা অর্জন করে মহীয়সী হওয়া তার পক্ষে কোন ভাবেই সম্ভব ছিলনা।
এবার আসুন ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞায়। একটা কথা এখানে জানিয়ে রাখা দরকার, ভারতীয় সংবিধান প্রণীত হবার সময় কিন্তু 'ধর্মনিরপেক্ষ' শব্দটি প্রস্তাবনায় ছিলো না। পরবর্তীকালে ১৯৭৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ৪২ তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে 'ধর্মনিরপেক্ষ ' ও 'সমাজতান্ত্রিক' শব্দদুটি সংবিধানের প্রস্তাবনায় যোগ করেন। কিন্তু সংবিধানে 'ধর্মনিরপেক্ষ' শব্দটি যোগ করা হলেও এর কোনো ব্যাখ্যা সংবিধানে দেওয়া হয় নি। তাই ধর্মনিরপেক্ষ শব্দের অর্থ জানার ক্ষেত্রে আমাদের পাশ্চাত্য দেশগুলিতে প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষতার মডেলকেই আদর্শ হিসাবে গ্রহন করতে হবে। কারণ ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো ঐতিহ্য নেই। অশোক বা আকবরের সময়ে যা ছিলো তাকে বলা যেতে পারে 'ধর্মীয় সহিষ্ণুতা', কোনোভাবেই ধর্মনিরপেক্ষতা নয়।
ভারতীয় সংবিধানের ১৫(১) নং ধারায় স্পষ্টতই বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র কেবল মাত্র ধর্ম, বর্ণ, জাতি, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান ভেদে বা তাদের কোনো একটির ভিত্তিতে কোনো নাগরিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারবে না। আবার ২৫(১) ধারায় সকল ব্যক্তির বিবেকের স্বাধীনতা অনুসারে ধর্মাচরণ এবং ধর্মপ্রচারের অধিকারের পাশাপাশি কোনো ধর্মীয় বিষয় হস্তক্ষেপ না করার কথাও স্বীকার করা হয়েছে। একইসঙ্গে ২৮(১) নং ধারায় সরকারি বা সম্পূর্ণভাবে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ধর্মাচরণ যদি ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার হয়, তবে স্কুলের মতো সর্বজনীন, সমাজিক প্রতিষ্ঠানে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন তো শুধুমাত্র সংবিধানের উলঙ্ঘন নয়, ধর্মীয় ভেদাভেদকেও একপ্রকার মান্যতা দেওয়ার প্রচ্ছন্ন বহিঃপ্রকাশ। এক দিকে ধর্মনিরপেক্ষার আদর্শকে অপপ্রচার করা, আন্যদিকে সংখ্যগুরুর ধর্মকে পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসাবে অলিখিত মান্যতা দেবার ধ্বংসাত্মক প্রবণতা তো জেনেশুনে আগুনে আহুতি দেবার নামান্তর।
Article 51(a) : (h) To develop the scientific temper, humanism and the spirit of inquiry and reform;
সংবিধানের 51(a):(h) অনুসারে ভারতীয় নাগরিকদের কর্তব্য হলো বৈজ্ঞানিক মানসিকতা মানবতাবাদ অনুসন্ধান ও সংস্কারের উন্নতি ঘটানো।
সরস্বতী পূজা না করে শিক্ষিত বিদ্বান দার্শনিক বিজ্ঞানী হয়েছেন বহু ব্যক্তি। বিপরীতে সরস্বতী পূজা করেও পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন বহুজন। সরস্বতী যে বিদ্যার দেবী একথা ভিত্তিহীন, অবৈজ্ঞানিক যুক্তিহীন।
এবার তাহলে দেখা যাক ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে কি বোঝায়। প্রথমেই আমাদের বোঝা দরকার, 'ধর্মনিরপেক্ষ' মানে কিন্তু 'সর্বধর্মের সমন্বয়' নয়। হ্যাঁ, অনেকের কাছে শুনতে একটু অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। 'নিরপেক্ষ' কথার অর্থ 'কোনো পক্ষে নয়'। কাজেই 'ধর্মনিরপেক্ষ' কথার অর্থ 'কোনো ধর্মেরই পক্ষে নয়'। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে প্রশাসন ও বিচারবিভাগকে সম্পূর্নভাবে ধর্মীয় নিয়ন্ত্রনের বাইরে রাখা হয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ ধর্মীয় অনুশাসনকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ 'রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পূর্ন বিযুক্তিকরণ'। কোনো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ব্যক্তিগত বা ধর্মসম্প্রদায়গত ভাবে কেউ ধর্মাচরণ করতেই পারেন। সেই স্বাধীনতা তাদের আছে। একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কখনই তার নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ করবে না। ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্ম বিরোধিতা নয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠানে কোনোরূপ ধর্মীয় অনুষ্ঠান হওয়া বাঞ্ছনীয় নয় বা রাষ্ট্রীয় কোনো সম্পত্তি কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা উচিত নয়। এটি ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের পরিপন্থী। একইসাথে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র অক্ষুন্ন রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় পদাধিকারীদের উচিত প্রকাশ্যে কোনো ধর্মীয় আচার পালন না করা । ধর্মনিরপেক্ষতার প্রকৃত সংজ্ঞাটি অনুধাবন করতে পারলেই একথা জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় কেন রাষ্ট্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতীপূজার মত ধর্মীয় একটি অনুষ্ঠান চলতে দেওয়া বাস্তবে উচিত নয়। যুক্তিবাদীরা তো কাউকে বাড়িতে পূজা করা বা মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ায় বাধা দিচ্ছে না। কেউ তার বাড়িতে বা পাড়ার মোড়ে যত খুশি পূজা করুক বা মন্দির মসজিদে গিয়ে যত খুশী ধর্ম পালন করুন, কারো কিছু বলার নেই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বা রাষ্ট্র পোষিত প্রতিষ্ঠানে একটি বিশেষ ধর্মের অনুষ্ঠান পালন করা নীতিগতভাবেই অনুচিত। এতে করে রাষ্ট্রের স্ববিরোধী চরিত্রটিকেই তুলে ধরা হয়।
এরপরেও থেকে যায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সামাজিক যোগসূত্রের দিকটি। অনেকেই বলবেন সরস্বতীপূজা শুধু আর ধর্মীয় গন্ডীতে আবদ্ধ নেই, তা এক সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ঠিক, কিন্তু যে অনুষ্ঠান রাষ্ট্রীয় চরিত্রের সাথে খাপ খায় না তা রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠানে পালন করাটা কি খুব জরুরী? এতে কি শেষ অবধি রাষ্ট্রকেই অসম্মান করা হয় না? আর এমনটাতো নয় যে সরস্বতীপুজা ছাড়া বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলি ছাড়া আনন্দ উদযাপনের আর কোনো পথই আমাদের সামনে খোলা নেই। অনেক অনুষ্ঠান আছে যেগুলি চরিত্রের দিক থেকে ধর্মনিরপেক্ষ। উদাহরণ হিসাবে পয়লা বৈশাখ আছে, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী,প্রজাতন্ত্র দিবস, স্বাধীনতা দিবস,স্কুল স্পোর্টস , নেতাজীর জন্ম বার্ষিকী,নবীনবরণ অনুষ্ঠান,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আছে। এগুলো কম বেশী সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ধূমধামের সাথে পালিত হয়। প্রয়োজনে যুগের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আরো নতুন কিছু অনুষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তি আমরা করতেই পারি। ইচ্ছা থাকলেই করা যায়। অসম্ভব কিছু নয়। বরং রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র অক্ষুন্ন রাখতে এবং কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাঙ্গন থেকে সরস্বতীপূজা ও নবী দিবসের আশু বিদায় প্রয়োজন। এক সুন্দর ভবিষ্যতের স্বার্থের লক্ষ্যে।
যে-কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চরিত্র ধর্মনিরপেক্ষ হবে, সেটাই তো কাম্য। ধর্মের ভিত্তিতে শিশুদের পরিচয় নির্ধারণ করা, শিশুমনের সরলতার সুযোগ নিয়ে কোনও ধর্মীয় মতবাদ চাপিয়ে দেওয়া মানে তো শিশুর মৌলিক অধিকার খর্ব করা। স্কুল-কলেজে শুধুমাত্র সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় আচার পালন তাদের মনে যেমন আধিপত্যবাদের জন্ম দিতে পারে, তেমনি তৈরি হতে পারে ধর্মীয় অহংবোধ। পরিণতি হিসাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অনেক ক্ষেত্রে হীনমন্যতাবোধ ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়। এতে শিশুর সার্বিক বিকাশের পথ ব্যহত হয়, কখনও বা ভুল রাস্তা বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। তাই রাষ্ট্রের কর্তব্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখতে তৎপর হওয়া। শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পরিবর্তে ধর্মনিরপেক্ষ আনুষ্ঠান পালনেও উৎসাহিত করা। শিশু যাতে জীবনের শুরুতে কোনো ভেদনীতির শিকার না হয়, তা দেখাও রাষ্ট্রের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তার পরিবর্তে রাষ্ট্র নিজেই যদি ভেদাভেদকে প্রশ্রয় দেয়, নির্দিষ্ট একটি ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করে, তাকে আর যাই হোক, গণতন্ত্রের বলা যায় না।
ইদানীং ধর্মনিরপেক্ষতা, সহিষ্ণুতা নিয়ে নানা রকমের চর্চা, তর্ক-বিতর্ক শোনা যাচ্ছে। কিন্তু যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বোঝা প্রয়োজন, ধর্মনিরপেক্ষতা, সহিষ্ণুতা যাদুমন্ত্রবলে তৈরি হয় না। নিরন্তর অনুশীলন ও শিক্ষার মধ্য দিয়েই তা লাভ করা সম্ভব। তবেই তো আজকের শিশুরা প্রকৃত অর্থেই আগামী দিনের সুনাগরিক হয়ে উঠবে। কেবল মাত্র উপসর্গ নয়, উৎস জানাটাও রোগ নির্ণয়েয় জন্য সমান জরুরি। অন্যথায় রোগের নিরাময় কীভাবে সম্ভব! আমারা কবে এই সারমর্মটুকু বুঝে উঠতে পারব?