Tuesday, September 19, 2023

ইন্ডিয়া’- নাম কি তাহলে বদলে যাবে ‘ভারত’-এ?


'রোমিও জুলিয়েট' নাটকের একটা বিখ্যাত লাইন যেখানে শেক্সপীয়ার বলেছিলেন, নামে কিবা আসে যায়?(What's in a name!) তাহলে বিতর্ক থেকেই যায়। 'ইন্ডিয়া' না  'ভারত' কোন নামটি দেশের হওয়া উচিত। সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদে যেখানে লেখা আছে "India, that is Bharat, shall be a Union of States”। দেশের নাম বদলে যাবে! এই গত কয়েকদিন ধরে এমনই জল্পনা শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। কেন্দ্রের তরফ থেকে বিশেষ যে অধিবেশন রাখা হয়েছে সেই অধিবেশনেই নাকি এমন নাম বদলের বিল পেশ করা হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। অনুমান করার পাশাপাশি এই নিয়ে বিস্ফোরক সব দাবি তুলতেও দেখা যাচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা নেত্রীদের। এমন জল্পনা শুরু হয় মূলত G20 সম্মেলন ঘিরে রাষ্ট্রপতি যে আমন্ত্রণপত্র পাঠান তা থেকেই।

আমাদের দেশের ভূখণ্ডকে সেই প্রাচীনকাল থেকে নানা নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জম্মুদ্বীপ, ভারতখণ্ড, হিমবর্ষ, অজনাভবর্ষ, আর্যাবর্ত, হিন্দ, হিন্দুস্তান আর ইন্ডিয়া নামগুলি। সম্রাট অশোকের শিলালিপিতে জম্মুদ্বীপের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ভাষাবিদ অজিত ওয়াডনের্করের মতে, “হিন্দ, হিন্দুস্তান বা ইন্ডিয়া – এই নামগুলির সঙ্গে সিন্ধু নদের যোগ আছে। কিন্তু সিন্ধু শুধু একটি নদ নয়, এর অর্থ যেমন নদ বা নদী হয়, তেমনই সাগরও এর আরেকটি অর্থ। সেদিক থেকে বিচার করলে দেশের উত্তর-পশ্চিম অংশটি কোনও এক সময়ে সপ্তসিন্ধু বা পাঞ্জাব বলা হত। ওই অঞ্চলটি খুবই উর্বর ছিল তাই সেখান দিয়ে বহমান সাত অথবা পাঁচটি নদীই ছিল এলাকার পরিচয়।“ তিনি আরও বলেন, “প্রাচীন ফার্সি ভাষায় সপ্তসিন্ধুকে ‘হফ্তহিন্দু’ বলা হত।“ আবার ইন্ডিয়া এবং ইন্ডাস নাম পাওয়া যায় গ্রীক ইতিহাসবিদ মেগাস্থিনিসের বর্ণনায়। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সংস্কৃতের দিকপাল অধ্যাপক মনিয়র উইলিয়ামস, যিনি সংস্কৃত-ইংরেজি অভিধান লিখেছিলেন, তার মতে বেদে ভরত বা ভরথ শব্দটির অর্থ অগ্নি, লোকপাল বা বিশ্ব-রক্ষক, এক অর্থে রাজা। ওয়াডনের্কর বলছেন, “বৈদিক যুগের এক প্রসিদ্ধ জনগোষ্ঠী ভরতের উল্লেখ অনেক প্রাচীন পুঁথিতে রয়েছে। এই গোষ্ঠী সরস্বতী নদী তট, যেটি বর্তমানের ঘগ্গর, ওই অঞ্চলে বসবাস করত। এদের নাম অনুসারেই ওই ভূখণ্ডের নাম হয় ভারতবর্ষ।“

আসল-নকলের উত্তর খোঁজা সহজ নয়। ‘ইন্ডিয়া’- নামটিও মিলছে যথেষ্ট প্রাচীন ব্যবহারেও— ‘Indos’ শব্দটি পাওয়া যাচ্ছে গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস-এর বিবরণে। প্রাচীন ভারতে বিদেশাগত পর্যটক মেগাস্থিনিস (‘ইন্ডিকা’), আল বেরুনি প্রমুখের (‘কিতাব উল হিন্দ’) বইয়ের নামের মধ্যেই ‘ইন্ডিয়া’ শব্দটি লুকিয়ে আছে। তাহলে কেন ‘ভারত’ এভাবে উঠে এল সরকারি নথিতে? ভাষাবিদ পবিত্র সরকার বলছেন, শকুন্তলা ও দুষ্মন্তের পুত্র ভরতের নাম থেকেই তার রাজ্যের নাম হয় ভারত, এটাই প্রচলিত ধারণা। ‘ভারত’ শব্দের উৎসে লুকিয়ে আছে এক হিন্দু পুরাণকাহিনী। মহাভারতে যে কুরু-পাণ্ডবের গল্প আমরা পড়ি, ভরত ছিলেন তাঁদেরই পূর্বজ, চন্দ্রবংশের একজন নৃপতি। ‘ভরতের রাজ্য’ অর্থেই ‘ভারত’ ভূখন্ডটি তাৎপর্যময়, এবং সেই উদ্দেশ্যেই ‘ভারত’ নামটিকে গুরুত্ব দেওয়া— কিছু বিরোধী সমালোচনা অনুযায়ী উঠে এসেছে এমনই মতামত। বিজ্ঞজনেরা ধরে নিচ্ছেন আগামী দিনে রাষ্ট্রে’র নির্মাণপ্রকল্পে পুরাণকাহিনিকে ইতিহাসে রূপান্তরিত করার একটা প্রয়াস হিসেবেই এটাকে দেখছেন তাঁরা।

মুঘল আমলের দিকে তাকানো যায় তবে দেখা যায় তাদের শাসনাধীন অঞ্চলকে হিন্দুস্তান বলা হত। তবে ঐতিহাসিক ইয়ান জে ব্যারো লিখেছেন, অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে ব্রিটিশ মানচিত্রগুলিতে ইন্ডিয়া নামটির প্রচলন হতে থাকে। তার আগে, মুঘল আমলে তাদের শাসনাধীন এলাকাটিকে হিন্দুস্তান বলে চিহ্নিত করা হত। ব্যারো 'জার্নাল অফ সাউথ এশিয়ান স্টাডিসে' প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ ‘ফ্রম হিন্দুস্তান টু ইন্ডিয়া’-তে লিখেছেন “ইন্ডিয়া শব্দটির প্রতি আকর্ষণের কারণ সম্ভবত ছিল তাদের গ্রীক-রোমানদের সঙ্গে নৈকট্য, ইউরোপে এটির দীর্ঘ ব্যবহার এবং সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার মতো বৈজ্ঞানিক ও সরকারি সংস্থাগুলির কাছে এই নামটির গ্রহণযোগ্যতা।“

২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রের নিরঞ্জন ভটওয়াল, 'ভারত' নামটিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে জনস্বার্থ মামলা করেছিল। ‘ইন্ডিয়া’ নাম বাতিল করে শুধু ‘ভারত’ করা যাবে না, সেবছরই দেশের শীর্ষ আদালতে হলফনামা দিয়েছিল কেন্দ্র সরকার। যাইহোক নাম পাল্টে দেশ ও দশের কিছু লাভ হবে কি? তর্কের খাতিরে মেনেই নিলাম এই নাম পরিবর্তন করেই ভারতবর্ষ করা হলো তাহলে যে সব সরকারি প্রতিষ্ঠান গুলো আছে তাদের নামের আগে বা পরে ইন্ডিয়া শব্দটি ব্যবহার হয় উদাহরন স্বরূপ I.I.T (Indian Institute of Technology), I.I.M.s (Indian institute of management), I.S.R.O ( Indian space Research Organisation), R.B.I (Reserve Bank of India), S.B.I (State Bank of India), AIIMS (All India Institute of Medical Sciences) ইত্যাদি, এমনকি পাসপোর্টেও লিখা থাকে রিপাবলিক ওফ ইন্ডিয়া, পেন কার্ড, আধার কার্ড এবং প্রত্যেক টাকা তে উল্লেখ থাকে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া(RBI), এই সব সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান গুলির নাম,  কাগজ, টাকা ও দস্তাবেজ পরিবর্তন করতে কোন অযথা খরচা হবে না তো? উপরে মাত্র কয়েকটা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে ইন্ডিয়া নামে এমন হাজারো সরকারি, আধা সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ধরুণ এটা যদি তুঘলকি সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে আমাদের দেশ কতটা দুর্দশায় আক্রান্ত — মানুষ  মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নাগরিকত্ব,  দুর্নীতি, গৃহ ও জাতি দাঙ্গা, ক্ষুদা সূচকে অবনতি, নির্দিষ্ট কর্পোরেট দের হাতে রাষ্ট্রের সম্পত্তি জলের দামে বিক্রি, ঋণ চুরি, নির্দিষ্ট শিল্পপতিদের ঋণ মাফ, সীমা বিবাদ, মহিলা, দলিত, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু অত্যাচার, বনভূমি ও খনি সমূহ কে কিছু নির্দিষ্ট কর্পোরেট দের হাতে তুলে দেওয়া প্রভৃতি সরকারের একের পর এক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন না করতে পারে সেইজন্য জনসাধারণ নাম বিতর্কের পিছনে অযথা তর্কে বহুদূর সরিয়ে দেয়ার কোন মনোবাঞ্ছনা নয় তো!

আসন্ন ২০২৪ লোকসভা ভোটে পায়ের নীচে জমি শক্ত করছে বিরোধী শিবিরে। বিজেপির প্রতিপক্ষ হিসেবে জোট শিবিরে রয়েছেন মমতা, কেজরিওয়াল, নীতিশ কুমার, উদ্ধব ঠাকরে, ফারুখ আবদুল্লাহ, এম. কে. স্তালিন প্রমুখ বিরোধী ঐক্যের নেতা-নেত্রীরা। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারতের ছাব্বিশটি রাজনৈতিক দলের এক ‘বিগ টেন্ট’ হিসেবে ১৮ জুলাই ২০২৩ তারিখে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে INDIA ওরফে Indian National Developmental Inclusive Alliance । বিশেষজ্ঞদের মতে স্পষ্টতই ‘ইন্ডিয়া’- নামটিকে বিজেপি বিরোধী অস্ত্র হিসেবে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে চাইছিল বিরোধী শিবির। কিন্তু, ‘ভারত’ নামটি ব্যবহার করে যেন সেই পরিকল্পনারই পাল্টা দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী — এমনটাই তাঁদের ধারণা। আবার, অনেকে এ-ও ভাবছেন— এতে অযথা রাজনীতি খোঁজা অর্থহীন। ‘ভারত’- নামেই বা সমস্যা কোথায়? ‘ইন্ডিয়া’ বিদেশী ইংরেজদের দেওয়া নাম, তাই দেশের ‘ভারত’ নামই দেখতে চান বলে গুঞ্জন বিশেষজ্ঞ মহলে।

কিন্তু, সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা— ‘ইন্ডিয়া’- সরকারি নামটিই কি তাহলে বদলে যাবে ‘ভারত’-এ? তাঁদের অনেকেই মনে করছেন এবার আবারও কি ফিরবে নোটবন্দি’র স্মৃতি। ব্যাঙ্ক নোট থেকে আরম্ভ করে আধার, ভোটারের মত সরকারি নথিতে ‘ইন্ডিয়া’ বদলে ‘ভারত’ করানোর লাইনে দাঁড়ানোর পালা আসতে চলেছে ফের। সব মিলিয়ে নাম-বিতর্ক এখন তুঙ্গে। অবশেষে একটিই কথা বলতে চাই নামে কোন আপত্তি নেই। এটা ভারতবর্ষ হোক আর ইন্ডিয়া বা হিন্দুস্থান। কথা হলো এবার বিচার করার পালা পরিবর্তনের নামে যাতে নোংরা রাজনীতি না হয় দেশে। জনগণের টাকাকে দেশের ও দশের উন্নয়নে যেনো লাগানো হয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও তুঘলকি স্বার্থের বিপরীতে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ চরিত্র আমরা দেখতে চাই।

Thursday, August 24, 2023

অন্ধকারে জাগ্রত বিবেক : নরেন্দ্র দাভোলকর


“নরেন্দ্র দাভোলকারের কাজ কখনও মুছে ফেলা যাবে না। তাঁর পায়ের ছাপ রয়ে যাবে” — নাসিরুদ্দিন শাহ

শুধু কেউ বিজ্ঞান জানলে কিংবা বিজ্ঞানী হলে সমাজ বিকশিত হবে না, যদি না তিনি বিজ্ঞানমনস্ক হন। কারণ মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণীদের প্রধান তফাত হল, মানুষের কৌতূহল আছে, সে প্রশ্ন করে, অন্য প্রাণীরা করে না। প্রকৃতি সম্বন্ধে কৌতূহল থেকেই মানুষ জন্ম দিয়েছে বিজ্ঞানের। পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তর্ক, অনুমান, অভিজ্ঞতার  মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে বিজ্ঞান। মূলত ‘বিজ্ঞানমনস্কতা’ হল, বিজ্ঞানস্বীকৃত সত্যকেই বিশ্বাস করার মানসিকতা। ২০ অগাস্ট ২০১৩ সাল। আততায়ীদের হাতে গুপ্তহত্যার শিকার হন নরেন্দ্র দাভোলকর। কাজের দিক থেকে তিনি বিজ্ঞান আন্দোলন কর্মী, ডাক্তার, সমাজকর্মী ও প্রভাবশালী যুক্তিবাদী লেখক ছিলেন। মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতির সভাপতি ছিলেন। তাঁরা দীর্ঘ লড়াইয়ের পর কুসংস্কার ও কালাযাদু বিরোধী একটি আইন আনার চেষ্টা করছিলেন মহারাষ্ট্রে। যা অনেক ক্ষমতাশালীদের ভীমরুলের স্বার্থে আঘাত করেছিল। তাই আলো হাতে নিয়ে যারা আঁধারের যাত্রী তাদের লুকিয়ে লুকিয়ে গুপ্তহত্যা। শুধু দাভোলকর নন, গোবিন্দ পানসারে, এমএম কালবুর্গি, গৌরী লঙ্কেশ সহ অগুন্তি যুক্তিবাদী প্রগতিশীলরা আমাদের গর্ব। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যখন এঁদের মতো প্রগতিশীলরা আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন।

নরেন্দ্র দাভোলকর নিজে ছিলেন একান্ত নিরীশ্বরবাদী, কিন্তু কোনও মানুষের ধর্মাচরণে কখনও বাধা দেননি। ধর্মাসক্ত অসহায় মানুষকে তিনি বরং ভরসা দিতেন, বলতেন সাফল্যের জন্য সতত পরিশ্রম করার কথা। তাঁর মৃত্যুর পর 'ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান র‌্যাশনালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন'-এর সভাপতি নরেন্দ্র নায়ক বলেন, “প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি যদি মনে করে থাকে আমাদের এক জনকে গুলি চালিয়ে খুন করে আন্দোলনকে স্তব্ধ করবে, তবে তারা ভুল করছে।” বিজ্ঞানে স্বীকৃত সত্যই একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য। অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই কখনওই থামে না, বরং হাতবদল হয় শুধু।

সমাজকে আলোর পথে হাঁটানোর ভাবনা দাভোলকরের মধ্যে যুবক বয়স থেকেই ছিল প্রায় সক্রিয়। ডাক্তারি পড়তে পড়তেই তিনি যোগ দিয়েছিলেন ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান ড্রিঙ্কিং ওয়াটার’ আন্দোলনে। পানীয় জলের অপব্যবহার নিয়ে তিনি তৎকালীন ধর্মগুরু আসারাম বাপুর সরাসরি বিরোধিতা করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। দাভোলকর ১৯৮৩ সালে নিজে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি’ বা ‘এমএএনএস’। শুধু মহারাষ্ট্রেই এর ২৩০টি শাখা। আজ সমগ্র ভারতে এই সমিতির শাখা ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে যেমন সরব হলেন, তেমনি মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন দাভোলকর। ২০০২ সালে একটি চ্যালেঞ্জে বলেন, কোনও অলৌকিক বাবা যদি ‘এমএএনএস’-এর ঠিক করে দেওয়া ১২টি কাজের মধ্যে কোনও একটি করে দেখাতে পারেন তবে ১১ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। এই কাজগুলির মধ্যে ছিল শূন্যে ভেসে থাকা, গভীর জলের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া, আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা, শূন্য থেকে একটা সোনার হার তৈরি করা ইত্যাদি। কাউকে ব্যক্তিগত আঘাত করার উদ্দেশ্যে এই চ্যালেঞ্জ নয়, উদ্দেশ্য ছিল তথাকথিত বাবাজি-মাতাজির হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা, একটা সুস্থ সমাজ গঠন করা। ‘মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি’র লক্ষ্য ছিল— কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের চর্চা বন্ধ করা, যুক্তিবাদ, নৈতিক মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ব চর্চা, বিজ্ঞান-অনুসন্ধিৎসা ও অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষকে সঠিক পথ দেখানো।

যুক্তিবাদী নিগ্রহ ও নিধনের এই পর্বটি হয়তো এখনও শেষ হয়নি। হয়তো যুক্তিবাদী সৈনিকদের আরও মূল্য চোকাতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, যুক্তিবাদ, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সমর্থনে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই স্বনামধন্য ব্যক্তি ছিলেন। প্রত্যেকটি মৃত্যুর জোরালো প্রতিবাদ হয়েছে ভারতের কোণায় কোণায়। দেশের বাইরেও আলোড়ন কম হয়নি। এঁদের প্রাণ কেড়ে যুক্তিবাদী কর্মীদের মনোবল গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে মৌলবাদীরা। কিন্তু অন্য দিক থেকে দেখলে, মৌলবাদকে রুখতে যুক্তিবাদের এক দুর্দান্ত ভূমিকায় এভাবে উঠে আসতে হবে। উঠে আসে যুক্তিবাদী আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলার এখন সময়ের দাবি। আধুনিকতার অভিঘাতে বিপন্ন ধর্মের মরণকামড় হয়তো বা আরও কিছুকাল সমাজের উপর পড়বে, কিন্তু তা কখনই চিরস্থায়ী হতে পারে না। মানবসভ্যতার অগ্রগতির রৈখিক পথরেখায় এ এক সাময়িক ‘ফ্ল্যাকচ্যুয়েশন’ বা বিচলন মাত্র, আধুনিকতার চাকাকে কখনও পেছনে ফেরানো যায় না। তবে ঊর্ধ্বমুখী লেখচিত্রের এই উঁচুনিচু বাঁকগুলোকে আমরাই পারি দ্রুত সরলরেখায় এনে ফেলতে। সুবিচারের দাবিতে বিচারব্যবস্থাকে অবশ্যই প্রভাবিত করতে হবে। একই সঙ্গে, আমাদের ইতিকর্তব্য থেকেও আমরা যেন বিচ্যুত না হই।

ব্যক্তিজীবন বা সামাজিক জীবন সার্বিকভাবে সুস্থ ও সুন্দর করে গড়ে তোলার প্রয়াস জারি রাখতে প্রকৃতি ও সমাজের প্রতিটি ঘটনার পেছনে কার্যকারণ সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা খুব জরুরী। আর এইজন্য চাই প্রশ্ন করার আর প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার বৈজ্ঞানিক মেজাজ। ততটুকুই গ্রহণীয় যতটুকুর সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে, এই বৈজ্ঞানিক মেজাজ তৈরী করার কাজটা সুচারুভাবে করেছিলেন তিনি। মানুষের সাথে বন্ধুর মত মিশে, মানুষের জীবনসংগ্রামের সাথী হয়ে, মানুষকে বিজ্ঞান সচেতন করে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে সামিল করার প্রয়াস প্রতিটি বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের কাজ। আর এই কাজে ঔদ্ধত্য নয়, সাহসী এবং বিনয়ী হতে হবে। সর্বোপরি তৈরী করেছিলেন কুসংস্কার ও জাদুবিদ্যা বিরোধী আইনের সেই ঐতিহাসিক খসড়া যা সারা ভারতে যুক্তিবাদী মানুষের সংগ্রামের পাথেয়। যুগে যুগে কোনো যুক্তিশীল চিন্তাধারার মানুষদের কাজ কখনও সহজ হয়নি। ওনার কাছেও এই কাজ সহজ ছিল না। বহু বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বক্তৃতা বন্ধের চক্রান্ত, ম্যাগাজিন বিক্রি না করার ফতোয়া এমনকি প্রাণনাশের হুমকি নিয়েই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

সাম্প্রতিক কালে গোবিন্দ পানসার, নরেন্দ্র দাভোলকর, এম এম কালবুর্গি,  গৌরী লঙ্কেশের মত ব্যাক্তিত্বদের খুন করার উদ্দেশ্য এক। সবটাই হয়েছে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদীদের নিখুঁত পরিকল্পনায়। ওরা যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাধারাকে ভয় পায়। সেই একই কারণে অরুণ ফেরেইরা, সূধা ভরদ্বাজ, ভারভারা রাও, গৌতম নাভালখা ও ভেরনন গনজাল্ভেজরা আটক হন। পাশের রাষ্ট্রে, ঠিক একই উদ্দেশ্যে ধর্ম সন্ত্রাসীরা অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, আরেফিন দীপন, অনন্তবিজয় দাস, হুমায়ুন আজাদ, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়কে খুন করে। ধর্মান্ধে কিছু ধান্দাবাজ গডম্যানরা নিজ স্বার্থে তাদের ধর্ম বিপদে এমন গল্প বারংবার শুনিয়ে ভক্তদের মগজধোলাই করে উগ্র, হিংস্র বানায়। এরা কারোর যুক্তির ধার ধারেন না। এরা যা জানে সেটাই অভ্রান্ত, এমনটাই মনে করেন। এদের হাতে কখনো খুন হয়, অপদস্থ হয় এমনকি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় ব্লগার, ফেমিনিস্ট, এলজিবিটি এক্টিভিস্ট, মুক্তচিন্তকরা।


আমরা কখনই এরকম দেশ চাই না যেখানে অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, বিজ্ঞানমনস্ক পরিপন্থী মৌলবাদী কট্টরপন্থীদের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই ওরা গলা টিপে ধরবে।  যেরকম পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে মৌলবাদীরা মুক্তচিন্তকদের জড় সমেত উপড়ে ফেলার সংকল্প নিয়েছে। ভারতও কি সেই পথে হাঁটছে! মৌলবাদের উৎসগুলিকে ধ্বংস করতেই হবে। বিজ্ঞানমনস্কতা প্রচারের জন্য দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মৌলবাদী শক্তির হাতে খুন হওয়ার প্রতিবাদ হোক.... সেই সাথে মাঠে ঘাটে ছড়িয়ে থাকা বিজ্ঞান কর্মীদের যারা প্রতিনিয়ত  যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতাকে ছড়িয়ে দিতে গিয়ে প্রাণ দিচ্ছেন। [Scientific thinking is purely logical: the adjective ‘rational’ cannot be applied to it. Scientific temperament is a process of thinking, method of action, search of truth, way of life, spirit of a freeman. — Dr Narendra Dabholkar, The Case for Reason, Volume One] ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কলম ধরলেই পাশবিক হয়ে উঠেন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি । বেছে নেয় খুন করার পথ। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমালোচনা করা নাগরিকদের বৈধ অধিকার। মত প্রকাশের অধিকার যদি কোন ক্ষমতার দ্বারা বিপন্ন হয় তবে নিশ্চয় ভাববার বিষয়।

Thursday, August 10, 2023

নিষ্কর্ষ বার্তাবাহক '১৯-এর কবিতা ও গান'


ভাষাগত ও জাতিগত দিক দিয়ে যত রকমের ল্যাব ও ডিএনএ টেস্ট রয়েছে পৃথিবীর আর কোন জাতিকে হয়তো এতোটা প্রমাণপত্র দিতে লাগে না। যতটা বাংলা ভাষা ও বাঙালিকে বিশেষ করে উত্তর পূর্বাঞ্চল ও বরাক উপত্যকার বাঙালিকে দিতে হয়। আর এটার প্রচলন যে আজ শুরু হয়েছে এমন নয়। এর প্রমাণ স্বরূপ রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে অর্থাৎ ১৯৬১ সালের ১৯শে মে ১১ টি তরতাজা প্রাণ শহীদ হন শিলচরে, ১৯৭২ এর ১৭ই আগস্ট করিমগঞ্জে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু চক্রবর্তী),১৯৮৬র ২১ জুলাই করিমগঞ্জে শহীদ হন জগন্ময় ও যীশু, ১৯৯৬ এ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার রক্ষায় করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে শহীদ হন সুদেষ্ণা সিংহ ও সলিল সিংহ। সেই তখন থেকেই এখন অব্দি চলছে। হ্যাঁ হয়তো এখন শহীদ হচ্ছেন না ঠিক কিন্তু আগ্রাসনবাদী শক্তির করমর্দনে দেয়ালে পিঠ ঘষা খেতে খেতে কতটা ঘা হয়েছে এ বলার ইয়ত্তা রাখেনা।

ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় জীবনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আর এই আন্দোলনই অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনার ভিত্তি সুদৃঢ় করে। যার ফলস্বরূপ বাঙালি নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা ও স্বতন্ত্র অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে। বাঙালি জনগণ উপলব্ধি করতে পারে সংগ্রামের মাধ্যমেই তাদেরকে দাবি-দাওয়া আদায় করতে হবে এবং ভালোভাবে বাঁচার পথ খুঁজতে হবে। মায়ের ভাষা রক্ষার জন্য মেয়েরাই তো পেরেছিল রক্ষণশীলতার ব্যারিকেড ভেঙ্গে রাস্তায় নামতে। ভাষা আন্দোলনই তো পেরেছিল সাহিত্য-সংস্কৃতি-সমাজ গঠনে এক মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে। এটি একটি জাতির রাজনৈতিক ও সামাজিক ল্যান্ডস্কেপ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও, ১৯৯৯ সালের ২৬ শে নভেম্বর ইউনেস্কোর অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। বিশ্ববাসীর দরবারে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির যেভাবে আত্মমর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি ভাবমূর্তিও হয়েছে উজ্জ্বল।

'তবু উনিশে মে-র কাছে ফিরে যেতে হয়। নিষ্কর্ষ খুঁজতে হয় পুনর্নির্মাণের। ভাষা আন্দোলন চলমান এক প্রক্রিয়ার নাম: কোনো একটা বিশেষ তারিখ অন্য দিনগুলির তুলনায় উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে, এইমাত্র। ভাষা-সংগ্রামের বহুমুখী মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়ন করে বুঝি, বৃহত্তর গণসংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গ হল ভাষা আন্দোলন।' আজ উনিশে মে ভাষা আন্দোলন শুধু বরাক উপত্যকার মধ্যে সীমাবদ্ধ এমনটা কিন্তু নয়। এর পরিধি পুরো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই চিরসত্য আপ্তবাক্য সারা বিশ্বের বাঙালির স্পর্শ করেছে শ্রদ্ধেয় কবি দিলীপকান্তি লস্কর সম্পাদিত '১৯ এর কবিতা ও গান' (দ্বিতীয় সংস্করণ,বিশ্ব-সংকলন) স্বমহিমায়। সিকুয়েন্স এর প্রথম বইটি হলো '১৯-এর ভাষা শহিদেরা'। প্রকাশকাল ২০০২ সালের ১৯ মে। আর আবার দীর্ঘ একুশ বছর পর ২০২৩-র ১৯ মে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় সুবিশাল কলেবরে। সম্পাদক কবি দিলীপকান্তি লস্কর তাঁর এই বইয়ের প্রথম সংস্করণে ভূমিকায় লিখেছিলেন, যে কোন সংগ্রামের পেছনে থাকে এক একটি সাহিত্য-সংস্কৃতিক ভূমিকা। কখনো তা সংগ্রামকে পেছন থেকে ইন্ধন যোগায়, কখনো তা সংগ্রামীকে দেয় প্রেরণা। আবার কখনও কখনও সংগ্রামের সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রভাবে জন্ম দেয় কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-গীতিকারদের মনোজগতে এক অনন্য সৃজন কর্মশালা। তদুপরি সংগ্রামটি যেখানে ১৯শে মে, আপামার জনসাধারণের মধ্যে পরিব্যাপ্ত এক মহান গণজাগরণ, মাতৃস্তন্যস্বরূপ মাতৃভাষার অধিকার অর্জনের সংগ্রাম, মাতৃভাষার কারিগর কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-গীতিকারদের চেতনায়-অবচেতনায় ফেলবেই তার স্বাভাবিক অনুরণন। ফেলছেও। ১৯-কে নিয়ে সাহিত্য 'সৃষ্টি হয়নি' কথাটি প্রায়শই উচ্চারিত হতে শুনেছি, লালনমঞ্চ তা মিথ্যে প্রমাণ করেছে। সে গোটা বাংলা ভূবনের সাহিত্যকৃতি ঘেঁটে দেখতে চেয়েছে। কোথায় কোথায় উনিশ। প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি বলে বঙ্গ ও বাংলাদেশের কবির সংখ্যা তুলনায় কম, তবে অদ্যাবধি যে মাধুকরিটুকু হলো, তাও কি খুব কম !' দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা সম্পাদক কবি প্রথমেই সৌহার্দ্য সিরাজের কবিতা দিয়ে শুরু করেছেন যেখানে একটি লাইন লিখা — 'বৃষ্টির মেঘ/বরাকের অশ্রুত চিহ্নগুলো নিয়ে যাও দেখুক পৃথিবী'। কবি দিলীপকান্তি লস্কর ভূমিকায় লিখেছেন,'ভাষা শব্দটি মাতৃভাষার আবেগ ও মমতায় কখনও যেন উনিশের ভাবধারার কাছাকাছি এসে যায়। আবার ‘ভাষা’ থেকে মাতৃভাষা, ‘মাতৃভাষা’ থেকে ‘মাতৃভাষাসংগ্রাম'—এই আনুভূতিক পারম্পর্য আমাদের কাব্য-ভাবনায় সৃষ্টি করে একটি সরল রৈখিক যোগাযোগ। এক থেকে আরেককে পৃথক করা দুষ্কর। আর এই ভাবধারা একুশ-উনিশ ভেদে প্রায়ই এক বা অনন্য। ফলে আমাদের প্রাপ্তির ঘরও বহু সদৃশ কবিতার ফুলের মতো, নানা বর্ণের লাবণ্যে পূর্ণ হয়ে ওঠে। নদীর মতো বিভিন্ন অববাহিকা, উঁচুনিচু পাহাড়-টিলা তথা আঁকাবাঁকা বহু রৈখিক পথে ভালো-মন্দ বহু বিচিত্র বিষয়বস্তু নিয়ে এগোতে থাকে তার পথযাত্রা, কিন্তু গতি তার সুনির্দিষ্ট সাগরের দিকে। এক্ষেত্রে উনিশ, উনিশ-একুশ এক বা উভয়ের ভাষা-কাব্য-গান, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ভাব-বিশ্ব-সায়রে এক অনন্য সৃষ্টিময়তার সংযোজন। তাই অধিকাংশ কবি সজ্ঞানে উনিশের ধৃতি নিয়ে কবিতা লিখে থাকলেও তাঁরা কিন্তু শেষ অব্দি এই সাগর-সঙ্গমে এসে যুক্ত হয়ে যান বহু থেকে এক এবং এক থেকে বছর বিন্যাসে। এখন তাই বাংলাভাষার কবিদের কাছে নেই কোনো আগল, যা রাজনৈতিক প্রভুরা কাঁটাতার বা নদীর সীমানা দিয়ে বিভাগ করে দিয়েছেন কারো রান্না ঘরের কারো উঠোনের বা খেলার মাঠের ভিতর দিয়ে বা উনুনের মাঝ বরাবর। বর্তমান সংকলনে আমরা উনিশের বহু কবিতা বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন কবির কাছে পেয়েছি। বিভিন্ন ভাবনা-চিন্তার কবিতা, উনিশকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে তার স্বরূপ তথা মূল্যায়নের কবিতা, মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধার মূল্যবোধ থেকে উনিশের কবিতা এবং আরো অনেক বিষয়-বৈচিত্র্যে ভরপুর। ভাষা-সংগ্রামের ফলে কিছু শব্দ পেয়েছে তার নিজস্ব পৃথক এক তাৎপর্য ও অর্থময়তা। আত্মত্যাগের রক্ত কৃষ্ণচূড়াতেই যেন পেয়েছে তার প্রকৃতির প্রতিরূপ। এমন আরো কত কী।'

আমার মনে হয় বর্ধিত কলেবরে সংকলনটি সাজানোর একমাত্র কারণ সবাইকে এক সুতোয় বাঁধা। সংকলনটি মূলত  কয়েকটি পর্যায়ের বিন্যাস। উনিশে মে'র কবিতা (স্বদেশে), উনিশে মে'র কবিতা (বাংলাদেশে), উনিশে মে’র কবিতা (দূর-বিদেশে), উনিশে মে'র কবিতা (বাংলা ভাষায় / ভাষান্তরে)। শেষের পর্যায়ে রয়েছে উনিশে মে'র গান বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যাগ্রহী 'জজ্ সাহেবা', শ্যামাপদ ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে আলাউদ্দিন খাঁ, গণেশ দে, মঞ্জুশ্রী দাস,কালিকা প্রসাদ, খালেক চৌধুরী সহ এই সময়ের অনেক কবির রচনা সংকলিত হয়েছে। আর উল্লেখযোগ্য হলো এই সংস্করণে  বেশ কয়েকজন কবির লেখা গান ভিডিও লিংক সহ দেয়া রয়েছে। রয়েছে বেশ কয়েকটি গানের স্বরলিপিও। এরমধ্যে আমার খুব প্রিয় যা উল্লেখ না করে আর পারলাম না শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর ‘বঙ্গভূমি মা’ গানটি। এর ভিডিও লিংক — http:// youtube.be/DRFs17ecj71।

সম্পাদক কবি দিলীপকান্তি লস্কর তার অসাধারণ বুনন শৈলীতে নির্মাণ করেছেন '১৯-এর কবিতা ও গান'র সূচিপত্র। ১৯ মে-র কবিতায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ থেকে শুরু করে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, ব্রজেন্দ্র কুমার সিংহ, মলয় রায়চৌধুরী, কামালউদ্দিন আহমেদ, তপোধীর ভট্টাচার্য, সুবোধ সরকার, জয় গোস্বামী, বিশ্বজিৎ চৌধুরী প্রমুখের কবিতা রয়েছে। বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, হুমায়ূন আজাদ, রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন, জিললুর রহমান, বেলাল চৌধুরি, হেনরি স্বপন প্রমুখ ছাড়াও বহু কবির কবিতা রয়েছে।  দূর বিদেশের (কানাডা,জার্মানি, নিউইয়র্ক, ফ্রান্স সহ আরও) কবিদের মধ্যে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, অরুণিমা নাসরিন, দীপঙ্কর দাশগুপ্ত প্রমুখ। তৎসঙ্গে যে সমস্ত ভিন্নভাষী কবির কবিতা বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে শুরুতেই রয়েছেন অসমের খ্যাতনানা কবি জ্যোতিপ্ৰসাদ আগরওয়ালর কবিতা। বড়ো কবি অঞ্জলি বসুমাতারি, উর্খাও গৌড়া ব্রহ্মের কবিতা। এরপর রয়েছে বাগানি ভাষার অভিজিৎ চক্রবর্তী, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষী কবিতা লিখেছেন ধনঞ্জয় রাজকুমার সহ প্রমুখ কবির কবিতা।

'১৯-এর কবিতা ও গান ' তাঁর সম্ভাব্য সকল দোষত্রুটি পেছনে ফেলে সুস্থ জনমত গঠনে আরও একধাপ এগিয়ে চলছে। সংস্করণের শুরুর দিক থেকে যদি দেখা হয়, সংকলনটির সূচনা হয় মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'বঙ্গভাষা' কবিতাটি দিয়ে। এরপর ধাপে ধাপে দেখা যায় শুধু নিদৃষ্ঠ 'উনিশ মে' নিয়ে কবিতার পাশাপাশি বিভিন্ন কবির কবিতায় তাঁর অনুভূতিতে প্রকাশ পায় ভাষা আন্দোলন, বাঙালি আগ্রাসন তথা কোণঠাসার গল্প। যেখানে মাইকেল তাঁর বঙ্গভাষা কবিতায় লিখেছেন — হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন; —তা সবে, (অবোধ আমি) অবহেলা করি।‌ জয় গোস্বামী লিখেছেন — 'আমি আসছি, ভাত বেড়ে রাখো'—/মাকে বলে ছুটে গিয়েছিল/সপ্তদশী কমলা।ফেরেনি।/গুলি সোজা লেগেছিল চোখে। শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর  'উদ্বাস্তুর ডায়েরি'তে লিখেছেন — যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সে-ই কেড়েছে ভয়,/ আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়।
কামাল উদ্দিন আহমেদ লিখেছেন — বাড়ন্ত সে সবুজের মেলায়/ আমার যৌবন দোল খায়/ কমলা শচীন সুকমল বীরেন্দ্র/কানাই হিতেশ সুনীল কুমুদ চন্ডী/তরণী সত্যেন এগারোটি তাজাপ্রাণ মরণজয়ী গান গায়।

গুণের বিচারে কবিতার মান নিয়ে কথা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। উনিশ কিবা একুশ - ভাষা আন্দোলন আমাদের আবেগকে নাড়া দেয়। তাই প্রতিটি কবিতার মানও গুণগত সম্পন্ন। এতোবড় কলেবরে বিশ্ব-সংকলন ঈষৎ ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। কিন্তু এদিকে না গিয়ে সম্পাদকের অসাধারণ কাজ তথা '১৯-এর কবিতা ও গান' দ্বিতীয় সংস্করণে সম্পাদকের প্রচ্ছদ রুচিও অতুলনীয়। যেখানে কেন্দ্রে স্বপন পালের ভাষা-শহিদ স্মারক ও নকশা বিন্যাসে রয়েছেন মাসুদ করিম। এককথায় প্রসারিত দুহাত বাড়িয়ে একত্রিত করেছে এই বিশ্ব-সংকলন। নিশ্চয়ই এই সংকলন বিশ্বকবিতার উইকিপিডিয়ায় স্থানলাভ করবে। চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বে উনিশের বার্তাবাহক হিসেবে।

'১৯-এর কবিতা ও গান' — সম্পাদক দিলীপকান্তি লস্কর
প্রগতি সরণি, বনমালী রোড, করিমগঞ্জ, আসাম। মূল্য - ৪৫০/-

Sunday, July 30, 2023

উনিশে মে'র ভাবনা ও আমাদের দায়ভার


‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় উনিশ’ - ১৯ শে মে। ১৯৬১ সাল। আজ প্রায় ৬২ বছর অতিক্রান্ত। আসামের বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা রক্ষার্থে এক অস্তিত্বের লড়াই। আচ্ছা সত্যিই কি আমরা ‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় উনিশ’ নিয়ে ঘুরছি। এখন চারদিকে যে আগ্রাসনের পালা – কীর্তন চলছে এতে মুটেই আশ্চার্যান্বিত হওয়ার কথা নেই। দেশজুড়ে আজব কার্নিভাল – জোর করে বিহু উৎসব গিলানো হচ্ছে, আর সঙ্গে তো আছেই চরম মিথ্যাচার, প্রতারণা আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকা। বড় দুঃখ হয় আর ক্রোধে গা জ্বলে ওঠে যখন দেখি, আমরা কোন অনুষ্ঠানে অসমিয়া আধিপত্যবাদের প্রতীক গামছা গলায় ঝুলিয়ে খুব লম্ফঝম্ফ করতে। তাইতো আমাদের অতি প্রিয় কবি দিলীপকান্তি লস্কর তাঁর কবিতায় অতি সুনিপুণভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন – 
আমি কোত্থেকে এসেছি,/তার জবাবে যখন বললামঃ/করিমগঞ্জ, আসাম। / তিনি খুশিতে ডগমগ হয়ে বললেনঃ / বাঃ। বেশ সুন্দর বাংলা বলেছেন তো !/একজন শিক্ষিত তথা সাহিত্যিকের যখন/এই ধারণা,/তখন/আমি আর কি বলতে পারিঃ / ওকে ঠিক জায়গাটা ধরিয়ে দিতে গিয়ে বললাম- / বাংলাভাষার তের শহিদের/ভূমিতে আমার বাস; / তখন তিনি এক্কেবারে আক্ষরিক অর্থে-ই / আমাকে ভির্মি খাইয়ে দিয়ে বললেনঃ /ও ! বাংলাদেশ? তাই বলুন।

আজকাল প্রায় হাতেগোনা কয়েকটি ভাষা ছাড়া বাকি সব ভাষাই বিপন্নের দিকে। জার্মান ল্যাঙ্গুয়েজ সোসাইটি বিশ্ব সমীক্ষা করে যে তথ্য উল্লেখ করেছে তাতে পৃথিবীতে বর্তমানে ছয় থেকে সাত হাজার ভাষার অস্তিত্ব সংকটে। একদিকে আগ্রাসন আর অন্যদিকে বিলুপ্তির শঙ্কা। এই বিলুপ্তি আর আগ্রাসনের পেছনে নানাবিধ আর্থসামাজিক কারণ রয়েছে। (কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস বলেছেন, "Language, like consciousness, only arises from the need, the necessity of intercourse with other man." (Marx, 1964, The German Ideology Moscow, quoted by Berezin, op.cit, Footnote 1, Page-161) তাঁরা এ-ও বলেছেন যে, ভাষা হল “... the immediate reality of thought... Practical...actual consciousness.” (তদেব) মার্ক্স আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, "Ideas do not exist divorced from language." (Sondel Ben, 1958, The Humanity of Words, New York, The world Publishing Company, Page 180)" ভাষাবিজ্ঞানের এই সূত্রগুলোকে ভিত্তি করে এ-কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ভাষা-আগ্রাসন মানে মানুষের চিন্তা-চেতনা-অনুভবকে আগ্রাসন, ভাষা-বিলুপ্তি মানে এগুলোর বিলুপ্তি।

'ভাষা-সংগ্রামের বহুমুখী মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়ন করে বুঝি, বৃহত্তর গণসংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গ হল ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বরকত-সালাম-জব্বারেরা শহিদ হয়েছিলেন বলেই ধাপে ধাপে তৈরি হয়েছিল ১৯৭১ সালে বাংলা নামে দেশের জন্ম-লগ্ন। ইতিহাস ও ভূগোলের যৌথ আক্রমণে বরাক উপত্যকা (আসামের দক্ষিণ অংশে সাবেক কাছাড় জেলা) যেহেতু প্রান্তিকায়িত হয়ে পড়েছিল, তার গভীর সর্বাত্মক সংকট কখনো তেমন মনোযোগের বিষয় হয়ে ওঠেনি। বহুদিন আগে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। ঐতিহ্যগত ভাবে শ্রীহট্ট বা সিলেট বৃহত্তর বঙ্গভূমির অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া সত্ত্বেও ধূর্ত ব্রিটিশ ১৮৭৪ সালে তাকে আসামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল। এতে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা-নির্ভর রাষ্ট্রযন্ত্র রাজস্বখাতে অনেকটা লাভবান হল যদিও, ‘বাঙালির আধিপত্য’ নামক জুজুর ভয় দেখতে শুরু করল কেউ কেউ। ক্রমান্বয়ে বিদ্বেষ-বুদ্ধির বিষবৃক্ষে শুধু জল সেচনই করা হল। দেশ বিভাজনের সময় গণভোটে সিলেট আসাম থেকে সরে গিয়ে যুক্ত হল পূর্ব পাকিস্তানে। শুধু সাবেক সিলেটের পূর্ব প্রান্তের কিছু অংশ যুক্ত হল দেশভাগ পরবর্তী কাছাড় জেলার সঙ্গে। এই নতুন কাছাড় ভৌগোলিক-সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিকভাবে কিন্তু বৃহত্তর বঙ্গভূমিরই অংশ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এই ভূমিও মমতা-বিহীন কালস্রোতে বাংলার রাষ্ট্রসীমা হতে নির্বাসিত। বহু শতাব্দী থেকে বাঙালিদের নিরন্তর প্রব্রজন চলেছে এখানে, বাংলাই এখানকার ভাষা—কী সাহিত্যে কী গণসংযোগের মাধ্যম হিসেবে। ইতিহাসের বিচিত্র জটিলতায় তা আসামের অঙ্গ হলেও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সঙ্গে এর কোনো আত্মিক সংযোগ কখনও ছিল না।' (তপোধীর ভট্টাচার্য, সময় অসময় নিঃসময় ২০১০ (পৃ. ৫০–৫৯) https://bn.m.wikisource.org)

জাতীয় স্তরে হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থানের ধ্বজাধারীরা হিন্দি ভাষাকে যেভাবে শুশ্রূষা করছে তাতে পরিষ্কারভাবে এটা বলাই যায়, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুকান্ত-জীবনানন্দ-সুভাষচন্দ্রের মাতৃভাষাকে “নানা ভাবে শেষ করে দেবার ফেসিষ্ট সুলভ আগ্রাসন” চালানো হচ্ছে। (বাঙালির দাবিপত্র, নীতিশ বিশ্বাস, ২৯ মার্চ ২০১৯) “তার প্রমাণ কেন্দ্রীয় বাজেটে ভারতের ২য় প্রধান ভাষিক জনসংখ্যার ভাষা হওয়া সত্ত্বেও গত ৭০ বছরে তার জন্য একটি টাকাও বরাদ্দ করা হয়নি।” (তদেব) বরং 'বাংলাভাষী মানে বাংলাদেশি’ এরকম প্রচার চালানো হচ্ছে আসাম সহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। আশ্চর্যের বিষয়, “NCERT-র বইয়ে রাজ ভাষার ছদ্মবেশে
ছাত্র-ছাত্রীদের শেখানো হচ্ছে হিন্দি রাষ্ট্র ভাষা"। (তদেব) গুজরাট হাইকোর্ট ১৩ অক্টোবর ২০১০ তারিখের রায়ে জানিয়েছে," There is nothing on the record to suggest that any provision has been made or order issued declaring Hindi as a national language of the country." ( সংবিধান ও বাংলা ভাষা, তৃতীয় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৯, – তদেব)

আমাদের বাসস্থান আসামে হলেও অসমিয়া আগ্রাসনের শিকার বহু আগে থেকেই। ১৯৬১ সালের ১৯শে মে ১১ টি তরতাজা প্রাণ শহীদ হন শিলচরে। ১৯৭২ এর ১৭ই আগস্ট করিমগঞ্জে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু চক্রবর্তী)। ১৯৮৬র ২১ জুলাই করিমগঞ্জে শহীদ হন জগন্ময় ও যীশু। ১৯৯৬ এ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার রক্ষায় করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে শহীদ হন সুদেষ্ণা সিনহা। আসামে ভাষিক সংখ্যালঘুরা এভাবে বারবার ক্লান্ত হচ্ছে অসমিয়া আগ্রাসন দ্বারা। নিপীড়িত হচ্ছেন ডি–ভোটারের তকমায় ডিটেনশন ক্যাম্পে আবার কখনো বা  উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির সুকৌশল ভাষিক আগ্রাসন নীতির মাধ্যমে। জাতীয়তাবোধ জাগরনের পেছনে যে উপাদানটি সার্বিক প্রয়োজন সেটি হলো এক সম্মিলিত ঐতিহ্যবোধ। বর্তমান সময়ে নব প্রজন্ম উনিশে মে শহীদের ধর্মের মাধ্যমে বিচার করে এরা হিন্দু না মুসলমান। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে এতটাই গুলিয়ে ফেলেছি, ভুলে গেছি কোন উৎসব কার। এনআরসি তে কার জয় হলো – মুসলিম খেদা না হিন্দু সুরক্ষিত। কিন্তু আমরা এসব কি করছি? মাতৃভাষা, জাতিসত্তা, সংস্কৃতি, প্রজন্ম‌ অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে যাচ্ছি না তো! 'উইপোকা', 'ঘুসপেটিয়া' তির্যক বিশেষণে যারা ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যু শিবিরে এদের কাছে নতজানু হচ্ছি না তো! এসব বিভাজনের রাজনীতি করে যারা হিন্দু – মুসলমান বাঙালীরা একবারও কি মনে প্রশ্ন জাগে আগামীদিনে ১৯শে মে কোন অনুষ্ঠানও কি করতে পারবো?

ভাষিক গোষ্ঠীর সংখ্যার বিচারে বাংলায় কথা বলতে পারেন পৃথিবীতে এর স্থান চতুর্থ। খুবই দুঃখজনক যে বাংলা সাহিত্য চর্চায় ভবিষ্যতে কতজন পাঠক পাওয়া যাবে কি না তা সন্দেহ। বরাক উপত্যকায় বাংলা মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীরা সরকার পরিচালিত বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে থাকে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন 'মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ সম'। মাতৃভাষা ছাড়া একজন মানুষের আত্মপরিচয় হয় না। সেইজন্য বাংলা ভাষা বিষয়ে পড়াশোনার প্রয়োজন। কিন্তু বাংলা ভাষাটা পড়াবার জন্য বরাকে সরকার পরিচালিত বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদগুলো প্রায় ৮০শতাংশ শূন্য। আধিপত্যের ষড়যন্ত্রে অগ্রগতির পথে অস্তিত্ব সংকটে।

যেকোনো ভাষা আয়ত্ব করা খুবই ভালো। তবে সেটা কোন ভাবেই নিজের মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে নয়। আজ ভাষার অস্তিত্ব যে আগ্রাসিত হচ্ছে এর পেছনে কিন্তু আমরাই দায়ী। আমরা যখন নিজেদের উনিশের উত্তরাধিকার বলে দাবি করি কিন্তু আমাদের সন্তানেরাই বাংলা জানে না। সুস্থ পরিকাঠামোর মাধ্যমে মাতৃভাষা চর্চার জন্য প্রয়োজন নতুন কর্মপদ্ধতি। তাই জরুরি ফ্যাসিবাদী ভাইরাসকে উপড়ে ফেলা। নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে ১৯৬১,৭২,৮৬,৯৬র রক্তাক্ত ইতিহাস। পরিচয় করাতে হবে এনআরসি,ডিটেনশন ক্যাম্প, ডি-ভোটার দিয়ে কিভাবে আমাদের টুকরো টুকরো করার কথা। ১৯শে মে মানে প্রতিরোধ এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম। বাঙালি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়তে হবে আধিপত্যবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে। নইলে সমবেত আত্মহনন ছাড়া উপায় নেই। ভাষা আন্দোলনের চলমান সংগ্রামী চেতনায় আমাদের বিবেক জাগ্রত হোক – কাঙ্ক্ষিত আশা এখন। যেভাবে প্রখ্যাত কবি শ্রী সুরেশ চন্দ্র চক্রবর্তী তাঁর 'শহীদ তর্পন' কবিতায় বলেছেন —
আমরা নওজোয়ান আমরা নওজোয়ান/আজি গাহিব শহীদ তর্পন গান/আমরা নওজোয়ান।/ ভাষা বেদি মূলে দিল যাঁরা প্রাণ/অপূর্ব আত্ম-বলি-দান/গাহিব তাঁদের তর্পন-গান/আমরা নওজোয়ান।/ ওই দেখো কমলা, শচীন্দ্র, কানাই,/হিতেশ, সুকোমল আর চন্ডী ভাই/কুমুদ, সুনীল, বীরেন, সত্যেন,/শহীদ তরণী – করে আনচান।/দুঃখ আজি নয় নয় রে শোক/ পাষাণেতে বাঁধ বাঁধেরে বুক/ শহীদ - তর্পণ- শপথ আজি—/ 'ভাষার লাগি দিব রে জান।'/ আমরা নওজোয়ান। (ভাষা আন্দোলনের শহীদ সত্যাগ্রহী)

বার্তালিপি ১৬-০৫-২০২৩ ইং 

Sunday, July 16, 2023

আধুনিক দাসত্ব : 'স্বাধীনতাহীনতায়' সভ্য সমাজ


স্বাধীনতা এবং দাসত্ব জীবনের দু’টি অঙ্গ। কবি এক জায়গায় লিখেছেন, ‘দাসত্ব শৃঙ্খল বলো কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়?’ কবি রঙ্গলাল তাঁর কবিতায় মানব জীবনের একটি গভীর আকাঙ্ক্ষার কথা ব্যক্ত করেন। সম্ভবত স্বাধীনতার এ আকাঙ্ক্ষা মানুষের সহজাত। প্রভাবশালী দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট তাঁর বিখ্যাত 'থিওরি অব হিউম্যান নেইচার'-এ বলেন, কর্ম সম্পাদনের জন্য দরকার বাইরের সবকিছু থেকে মুক্ত হওয়া। গত কয়েক বছরে গোটা বিশ্বে 'আধুনিক দাসত্ব' ব্যবস্থা বেড়ে গিয়েছে। প্রায় প্রতিদিন বিশ্বের বহু শিশু, নারী, পুরুষ, প্রবীণ এই সভ্যযুগীয় দাসপ্রথার বলি হচ্ছেন। কখনও গোচরে, কখনও অগোচরে। গ্লোবাল স্লেভারি ইনডেক্স ২০২৩-এ আধুনিক দাসদের বসবাসকারী দেশগুলির একটি তালিকা তৈরি করা হয়। এরা এমন মানুষ, যাদের কাজের কোনও কর্মঘণ্টা নেই, নেই কোনও নির্দিষ্ট বেতনও। সূচকে বলা হয়েছে, বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ দাসের মতো জীবনযাপন করছে। আধুনিক দাসত্বের ব্যাখ্যা হলো — জোরপূর্বক শ্রম, ঋণ, জোরপূর্বক বিয়ে-দাসত্ব, মানব পাচারের মতো কয়েকটি প্রথা। দাসত্বের সংজ্ঞা এবং প্রকৃত চিত্রের সাথে এর সামঞ্জস্য নেই। কারণ, দাসত্বের শৃঙ্খল এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লুক্কায়িত। যে মানুষ নিজেকে ‘স্বাধীন’ বলে দাবি করছে, সে দিনের শেষে দেখতে পাচ্ছে এক অদৃশ্য শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রিত করছে তাকে।

বিশ্বজুড়ে আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকা পড়া মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী ও শিশুরা। সভ্যসমাজের আধুনিক দাসত্বের নেপথ্যে রয়েছে, দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে শ্রমিক হতে বাধ্য করা, ঋণখেলাপিকে ক্রীতদাসে পরিণত করা, জোর করে বিয়ে, সাধারণ দাসত্ব এবং দাসত্বের অনুরূপ কাজকারবার। রিপোর্টে বলা হয়েছে, আধুনিক দাসত্বের মধ্যে ২ কোটি ৭৬ লক্ষ মানুষ বাধ্যতামূলক শ্রমে যুক্ত। আর, জোরপূর্বক বিবাহের শিকার হয়েছেন ২ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ। আধুনিক যুগীয় দাসত্ব চোখে দেখা যায় না। খালি চোখে বোঝাও যায় না। এই ব্যবস্থা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও সমাজের গভীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু খণ্ডাংশে নয়, গোটা পৃথিবীতেই সূক্ষ্মভাবে গোপনে আমাদের দাসত্বে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রতিদিন মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে, বাধ্য করা হচ্ছে অথবা জোর করে শোষিত হওয়ার পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে মানুষকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, যেখান থেকে তার নিষ্কৃতি বা পরিত্রাণের কোনও উপায় নেই।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, 'আধুনিক দাসত্ব সরল দৃষ্টিতে লুকিয়ে আছে। এটি বিশ্বের প্রতিটি কোণে জীবনের সাথে গভীরভাবে জড়িত। প্রতিদিন, মানুষ প্রতারিত, জোরপূর্বক বা শোষণমূলক পরিস্থিতিতে পড়তে বাধ্য হচ্ছে।' ‘গ্লোবাল স্লেভারি ইনডেক্স’ (Global Slavery Index) প্রকাশ করে ওয়াক ফ্রি জানিয়েছে - ‘২০২১ সালে ‘আধুনিক দাসত্বের’ শিকার হয়েছেন প্রায় প্রায় ৫ কোটি মানুষ। অর্থাৎ, সারা বিশ্বে প্রতি ১৫০ জন পিছু ‘আধুনিক দাসত্বের’ শিকার হয়েছেন ১ জন মানুষ।' যার মধ্যে ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষই বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের নাগরিক। সমীক্ষা বলছে, প্রতিদিন আমরা যেসব সামগ্রী কিনি কিংবা যেসব পরিষেবা ব্যবহার করি সেগুলি আমাদের ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয় অথবা আমাদের ব্যবহারের বুদ্ধি অর্থাৎ প্রস্তাব দেওয়া হয়। আমরা টেরই পাই না, এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে গোপন মানব শ্রমের মূল্য। সমীক্ষা বলছে, সভ্যযুগীয় দাসত্বে ২ কোটি ৭৬ লক্ষ মানুষকে জোর করে শ্রমিকের কাজ করানো হয়। ২ কোটি ২০ লক্ষ বিয়ে দেওয়া হয় পাত্র বা পাত্রীর অমতে। অন্যভাবে বলা যায়, প্রতি দেড়শো জনের মধ্যে একজনের বিয়ে দেওয়া হয় জোর করে।

স্বাধীনতার ৭৫ বছরে অমৃতকাল উপস্থিত হয়েছে বলে হাঁক শোনা যায় প্রায়শই। কিন্তু আধুনিকতার যাবতীয় উপকরণ কোলে সাজিয়ে বসে থাকলেও, দাসত্বের শিকল থেকে আজও মুক্ত হতে পারল না ১৪০ কোটির দেশ (Modern Slavery)। বিশ্ব দাসত্ব সূচক অন্তত তেমনই জানান দিচ্ছে। ভারতে আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়েছে বলে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে তাতে (Global Slavery Index 2023)। প্রতিবেদন বলছে, ২০ টি ধনী দেশের মধ্যে ছটি দেশের আধুনিক দাসত্বের হার সব থেকে বেশি। এক কোটি দশ লক্ষ নিয়ে এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভারত। তারপরেই রয়েছে চিন। সেখানে আধুনিক দাসত্বের মধ্যে থাকা মানুষের সংখ্যা ৫৮ লক্ষ। রাশিয়ায় ১৯ লক্ষ, ইন্দোনেশিয়ায় ১৮ লক্ষ, তুরস্কে ১৩ লক্ষ এবং আমেরিকায় সংখ্যাটা ১১ লক্ষের মতো। এইসব দেশগুলিতে হয় জোর করে শ্রমে নিয়োগ করা হচ্ছে কিংবা জোর করে বিবাহে বাধ্য করা হচ্ছে।

আধুনিক দাসত্বের নিরিখে কোন দেশ, কোন জায়গায় রয়েছে, তার তিনটি পর্যায় তৈরি করা হয়। এর একেবারে উপরের দিকে রয়েছে উত্তর কোরিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, তাজিকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, রাশিয়া, আফগানিস্তান, কুয়েত, মৌরিতানিয়া, ইরিত্রিয়া। দাসত্ব যেখানে নেই বললেই চলে, সেই দেশগুলি হল, সুইৎজারল্যান্ড, নরওয়ে, জার্মানি, হল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, আয়ারল্যান্ড, জাপান এবং ফিনল্যান্ড। যে সমস্ত দেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ আধুনিক ক্রীতদাস হয়ে রয়েছেন, তাদের নিয়ে তৃতীয় পর্যায় তৈরি করা হয়েছে। সেই দেশগুলি হল, ভারত, চিন, উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নাইজিরিয়া, তুরস্ক, বাংলাদেশ এবং আমেরিকা। রিপোর্টে বলা হয়েছে, সামগ্রিক ভাবে ধরলে, এই সমস্ত দেশে প্রতি তিন জন নাগরিকের মধ্যে দু'জন আধুনিক ক্রীতদাস, সামগ্রিক হিসেবে যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।

১৯৭৬ সালে ভারতে অঙ্গীকারবদ্ধ শ্রম বিলোপ আইন পাস হয়। তার আওতায় জোরপূর্বক শ্রমদান এবং অঙ্গীকারবদ্ধ শ্রম নিষিদ্ধ হয়। এ নিয়ে প্রত্যেক রাজ্যের সরকারের উপর ভিজিল্য়ান্স কমিটি গড়ার দায়িত্বও বর্তায়। ১৯৮৫ সালে সংশোধন ঘটিয়ে ঠিকাশ্রমিক এবং পরিযায়ী শ্রমিকদেরও সেই আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সুপ্রিম কোর্টও জানিয়ে দেয়, ন্যূনতম মজুরি না মেটানোও জোরপূর্বক শ্রমের মধ্যে পড়ে। কিন্তু দাসত্ব বিলোপের পক্ষে এই আইন আদৌ কার্যকর করা সম্ভব কিনা, প্রশ্ন উঠতে শুরু করে গোড়া থেকেই।  আইনি ফাঁকফোকর, সরকারি উদাসীনতা, দুর্নীতি, রাজনীতিকদের মধ্যে সদিচ্ছার অভাবে এই আইন সার্বিক ভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি বলে মত সমাজকর্মীদের। অপরাধ বলে গন্য করা হলেও, জোরপূর্ব শ্রমে কোপ বসাতে গেলে দরিদ্র-নিম্নবিত্ত তথা মধ্যবিত্ত ঘরের পেটে টান পড়বে। তার সমাধান না খুঁজে, এই আইন কখনও কার্যকর করা সম্ভব নয় বলে ২০১৭ সালে কেন্দ্রের কাছে চিঠিও পাঠান সমাজ সচেতন মানুষেরা। শুধু তাই নয়, কেন্দ্র যে নয়া শ্রম আইন চালু করার দিকে এগোচ্ছে, তাতে সংগঠিত এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রে মালিক পক্ষের হাত আরও শক্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সমাজকর্মীরা। ভারতে একাধিক শ্রম আইন প্রণয়ন করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু 'আধুনিক দাসত্ব'-র বলয় ভাঙা এখনও সম্ভব হচ্ছে না।

দাসত্ব নিরোধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘোষণা এবং আইনের কোনো অভাব নেই। শুধু অভাব এর বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়ন করার ইচ্ছা। এর পেছনে সব সময় কাজ করছে সংঘাত, সংঘর্ষ, দুর্নীতি, দারিদ্র্য এবং নানা সামাজিক পার্থক্য। ক্ষমতা, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশ স্থাপন এবং স্বার্থ উদ্ধারও এর সাথে সম্পৃক্ত। এর ফলে দাসত্ব প্রথা নানা ঢঙে চালু রয়েছে এবং সারা বিশ্বে বিস্তার লাভ করেছে।
এর অবস্থান এখন এমন দৃঢ় যে, শিকার ও শিকারি উভয়েই এর আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে; কিন্তু বেরিয়ে আসতে পারছে না। অথচ দাসত্ব নির্মূল হওয়া প্রয়োজন। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে দু’টি বিষয়ের দিকে প্রথমেই মনোযোগ দিতে হবে, তা হলো পক্ষপাত ও অসমান। সামাজিক জীবনে অর্থনৈতিক শোষণকে বন্ধ করে সমতা রক্ষা করা হলে দাসপ্রথা চালু রাখা সম্ভব হবে না। সমাজ এবং সরকার যদি দুর্নীতি দমনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে এবং সেই মোতাবেক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে, তবে দাসত্ব তার সব অবয়ব নিয়ে হারিয়ে যেতে বাধ্য হবে। নতুবা এই অভিশাপ সমাজে প্রবলভাবে বৃদ্ধি বা স্থান নিয়ে থাকবে এবং পরিশেষে চলমান সামাজিক অশান্তির কারণ হবে।

একটা সময় মনে করা হয়েছিল, সেটা উনিশ শতকের শেষ দিক; যে পৃথিবী থেকে দাসপ্রথা বিদায় নিয়েছে। কিন্তু সেই ধারণা সত্য নয়। এই আধুনিক যুগও সেই অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়নি। পুঁজিবাদী ও নয়া উদারবাদ বিশ্বব্যবস্থার কালেও দাসত্বের শেকলে বন্দি বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষ। প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে রাষ্ট্রসংঘ সম্মেলনে বিশ্বের মহান নেতারা আগামীকালের জন্য যে লক্ষ্যগুলি রেখেছিলেন, তার মধ্যে ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে আধুনিক দাসপ্রথা, ফোর্সড লেবার এবং মানব পাচারের মতো কলঙ্কজনক ঘটনাগুলিকে মুছে দেওয়া, কিন্তু দুঃখের বিষয় তারপরেও আধুনিক দাসদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলছে। আধুনিক দাসত্ব এখনো খুব সহজ ভাবেই মানুষের সভ্যতার মধ্যে লুকিয়ে আছে। এবং সেটা মানুষের জীবনের সঙ্গে বিশ্বের প্রতিটি কোণে গভীরভাবেই রয়েছে। সেই কারণেই প্রতিদিন, মানুষ প্রতারিত হচ্ছে, জোর করে মানুষকে দাসত্ব করতে বাধ্য করা হচ্ছে।বেঁচে থাকার জন্য কাজ করে মজুর, কিন্তু কাজই জীবনীশক্তি কেড়ে নিচ্ছে। এমনকি জীবনও। আর আমাদের প্রয়োজনে সুতা থেকে বাড়ি তৈরিতে এক একটা বালু কণা সহ সব পণ্যে লেগে থাকছে সেই পীড়নের দাগ।

Friday, July 7, 2023

সমকামিতা 'বিকৃত যৌনাচার' নয়


সমকামিতা কোথাও থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেনি, বরং সমকামিতা সভ্যতার সব সময়ই ছিল। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই সমকামীদের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাণী জগতের সহস্রাধিক প্রজাতির মধ্যে যে সমকামিতার অস্তিত্ব পাওয়া যায় তা আজ প্রমাণিত। মানব সভ্যতাও কিন্তু এই ধারার ব্যতিক্রম নয়। এই সমকামিতা একুশ শতকের কোন বিষয় বা কলি যুগের কোনও পাপ নয়। মানব সভ্যতার প্রাচীন ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় সমকামিতার অস্তিত্ব অনেক পুরনো। বিভিন্ন কালে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে কেমন ছিল সমকাম ও সমকামী সম্পর্কের বিন্যাস। গ্রীক সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে রোমান সাম্রাজ্য, 'সাইবেরিয়ান সামানদের (Shaman) মধ্যে সমকামিতা ছিল, নেটিভ আমেরিকানদের মধ্যে, আফ্রিকান ট্রাইবে, সমকামিতা ছিল চৈনিক রাজবংশে, সমকামিতা ছিল আরব কিংবা ভারতীয় সভ্যতায়। এমন কোনো সভ্যতার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, যেখানে সমকামিতা নেই, কিংবা ছিল না। সেই প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর তাবৎ সাহিত্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, শিল্পকলা, দর্শন, পুরাণ কিংবা প্রত্নতত্ত্ব বিশ্লেষণ করেই গবেষকেরা জেনেছেন, সমকামী মনোবৃত্তিসম্পন্ন মানুষেরা ইতিহাসের প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি মুহূর্তে এবং প্রতিটি স্থানেই ছিলেন।'

‘সমকাম’- শব্দটি বিশ্লেষণ করলে দুটি পদ পাওয়া যায়, সম এবং কাম। সম মানে হচ্ছে একই এবং কামী মানে হল বাসনাকারী। অতএব সমকামী কথাটির মানে একই রকম বাসনাকারী। সমকামী শব্দটির উৎস সংস্কৃত ‘সমকামীন্’ থেকে। যার অর্থ সম লিঙ্গের ব্যক্তির প্রতি আকর্ষণবোধকারী ব্যক্তি। প্রাচীনকালে সমকামীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হত ‘ঔপরিষ্টক’ -শব্দটি। বাৎস্যায়ন তাঁর কামসূত্র- এর ষষ্ঠ অধিকরণের নবম অধ্যায়ে ঔপরিষ্টক শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সমকামিতার ইংরেজি প্রতিশব্দ Homosexuality; ১৮৬৯ সালে Karl Maria Cutberry তাঁর লেখা একটি আইনের পুস্তিকায় এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। গ্রিক 'হোমো' এবং ল্যাটিন 'সেক্সাস'- এই দুই শব্দের সমন্বয়ে Homosexual শব্দটি গঠিত হয়।

প্রকৃতিতে মানুষ সহ নূন্যতম প্রায় ১৫০০ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে সমকামী আচরণ দেখা যায়। কারণ প্রতিটা সিস্টেম নিজেকে টিকায়ে রাখার স্বার্থেই ‘সিস্টেম ব্যাগ’ ব্যবহার করে, যে কারণে পৃথিবীর জনসংখ্যা স্বাভাবিক রাখতে বা ন্যাচারাল ব্যালেন্স ধরে রাখতে বন্যা, ভূমিকম্প, বনে আগুন লাগা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা যায় এবং শিশু উৎপাদনকারী প্রজাতির পাশাপাশি প্রকৃতিতে শিশু জন্মদানে ‘অক্ষম’ প্রজাতির অস্তিত্ব থাকে। তবে এইক্ষেত্রে আপনি বলতে পারেন, ধর্ষণও প্রাকৃতিক বিষয়। শিশুকাম বা অযাচারও প্রাকৃতিক বিষয়। প্রকৃতিতে আছে বলেই সমকামিতার মত ‘বিকৃত যৌনাচার’ মেনে নিতে হলে ধর্ষণও মেনে নেওয়া উচিত, শিশুকামও মেনে নেওয়া উচিত। মজার বিষয় হচ্ছে এইসব কুযুক্তিদাতারা খেয়াল করেন না, সমকামিতার সাথে ধর্ষণ বা শিশুকামের অন্যতম প্রধান পার্থক্যের জায়গা হচ্ছে, ধর্ষণ এক ধরণের নির্যাতন; এক পক্ষকে নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করার নাম ধর্ষণ। শিশুকামও ধর্ষণের মতই নির্যাতন, কারণ আধুনিক পৃথিবীর বেশিরভাগ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী ১৬ বা ১৮ বছরের নিচে কোনো মানুষকে আমরা মতামত দেয়ার যোগ্য বা সমর্থ মানুষ বলে বিবেচনা করি না। যে কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১৮ বছরের নিচের মানুষদের রাষ্ট্রীয় আইনে ভোট দেওয়ার বা গাড়ি চালানোর বা বিয়ে করার অনুমতি নাই। অপরপক্ষে নিজ ইচ্ছায় দ্বিপাক্ষিকভাবে দুইজন সমকামি মানুষ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা কোনোভাবেই নির্যাতনের সংজ্ঞায় পড়ে না। ৭০ এর শেষ দিকে দার্শনিক মিশেল ফুকো উনার বিখ্যাত ‘দ্যা হিস্ট্রি অভ সেক্সুয়ালিটি’ (১৯৭৮) বইতে যখন বললেন, মানুষের যৌনতা অনেকাংশেই সমাজের নির্মাণ, একমাত্র তখনই সমকামিতাকে সমাজের ‘তৈরি করা’ অপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে চালানোর চল শুরু হয়।

সমকামকে অপ্রাকৃতিক বলে এর বিরুদ্ধে ‘কু’যুক্তি দেয়া মানুষরা আরও বলে থাকেন, মানুষের পায়ুপথ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের উপযুক্ত না। যদি সমকাম প্রাকৃতিক বিষয় হত, তাহলে নারীদেহের যোনির মতই পায়ুপথ সঙ্গমের জন্য তৈরি হত, পায়ুপথে যোনির মত লুব্রিকেন্ট থাকতো, পুরুষের লিঙ্গ ধারণ করার আকার থাকতো ইত্যাদি ইত্যাদি। যারা সমকামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেছেন, তারা ধরেই নিয়েছেন, পৃথিবীর সকল সমকামী মানুষ শুধুমাত্র পায়ুপথেই যৌন সঙ্গম করতেই জন্মগ্রহণ করেছেন।প্রথমতঃ, পায়ুপথে যৌন সঙ্গমের উপর শুধুমাত্র সমকামী পুরুষদের একচ্ছত্র দাবী নাই, পায়ুপথে বিষমকামী নারী-পুরুষও যৌন সঙ্গম করেন। দ্বিতীয়তঃ, পৃথিবীতে শুধু সমকামী পুরুষ না, সমকামী নারীও আছেন, একই শরীরে নারী ও পুরুষ উভয় লিঙ্গ ধারণ করা মানুষ আছেন, নারী শরীরে পুরুষের মন এবং পুরুষ শরীরে নারীর মন নিয়ে বাস করা মানুষ আছেন- যাদের বেশিরভাগই পায়ুপথে সঙ্গম করেন না।

জার্নাল অভ সেক্সুয়াল মেডিসিনে প্রকাশিত ইন্ডিয়ানা এবং জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ১৮ থেকে ৮৭ বছরের প্রায় ২৫ হাজার সমকামি পুরুষ নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখান, উনাদের মধ্যে মাত্র ৩৬ শতাংশ পুরুষ পায়ুকামের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। বাকি সবার যৌন আচরণের মধ্যে শুধুমাত্র নিজেদের সঙ্গীদের চুমু খাওয়া বা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরা বা একে অন্যকে মাস্টারবেশান করিয়ে দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। একইসাথে ২০১৭ সালে সেইজ জার্নালসে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে ওহায়ো স্টেট ইউনিভার্সিটি, ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অভ উইনচেস্টারের গবেষকরা দেখান, পায়ুকাম শুধুমাত্র সমকামী পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। গবেষণায় অংশ নেওয়া বিষমকামী পুরুষদের মধ্যে ২৪ শতাংশই তাদের নারী সঙ্গীদের সাথে বিভিন্ন সময় পায়ুপথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন।  

পায়ুকামের সাথে যৌনবাহিত রোগ, বিশেষতঃ এইচ-আই-ভি এইডসের প্রথম সম্পর্ক পাওয়া যায় ৮০র দশকে। কিন্তু আগেই বলেছি, পায়ুকাম শুধুমাত্রই সমকামীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি না। আজ থেকে ১৭০০ বছর আগের পেরুভিয়ান মৃৎশিল্প থেকে শুরু করে, ১৩শতকের ভারতীয় খাজুরাহো মন্দিরের ভাস্কর্য ও স্থাপত্য, ১৬ শতকের চীনা এবং জাপানিজ কারুশিল্পে বা ৫০০ বি-সির গ্রীক ভাস্কর্যে বিষমকামী নারী-পুরুষের পায়ুপথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের প্রমাণ পাওয়া যায়। সুতরাং পায়ুকামের জন্য সমকামীদের একপাক্ষিকভাবে দায়ী করা হাস্যকর। পরবর্তীতে, অর্থাৎ ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের শুরুর দিকে বিভিন্ন গবেষণায় এইচ-আই-ভি এইডসের সাথে পায়ুকামের সম্পর্ক থাকার ‘মিথ’ও ভেঙ্গে যায়। পাবমেড এবং আমেরিকান সাইকোলজিকাল এ্যাসোসিয়েশানের জার্নালে প্রকাশিত ২০০০ সালের গবেষণায় দেখা যায় এইচ-আই-ভি নেগেটিভ ১২৬৮ জন বিষমকামী নারীর ৩২ শতাংশই তাদের পুরুষ সঙ্গীর (বা সঙ্গীদের) সাথে নিয়মিতভাবে পায়ুপথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন।

এছাড়াও আরেকটা বিষয় উল্লেখযোগ্য, পায়ুকামই যৌন রোগ ছড়ানোর একমাত্র মাধ্যম না। বেশ্যালয়ের মারফত বিষমকামী বহুগামী নারী ও পুরুষের মাধ্যমেই সমাজে সর্বোচ্চ হারে যৌন রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে। ‘সমকামীরা যৌন রোগ ছড়ান’ এমন মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে নাহয় সমকামিতাকে রাষ্ট্রীয় আইন আর ধর্মীয় চোখ রাঙানি দিয়ে বন্ধ করতে পারলেন, সকল সমকামীকে আগুনে পুড়িয়ে, শূলে চড়িয়ে, বরাকের জলে ডুবিয়ে মেরে ফেলতেও সমর্থ হলেন, কিন্তু আমাদের অতি স্বাস্থ্যসচেতন পবিত্রতার ধ্বজাধারী কুলীন বংশীয় সমাজপতিরা কি বেশ্যালয় বন্ধ করার সাহস রাখেন? বিষমকামী পুরুষের বহুগামিতা আর পায়ুকাম কি পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র আজকের দিন পর্যন্ত আইন করে বন্ধ করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে? দেখায় নাই। কারণ পৃথিবী এবং পৃথিবীর রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় আইন শুধুমাত্র পুঁজিবাদী অর্থনীতি কেন্দ্রিক, শুধুমাত্রই সংখ্যাগুরু বিষমকামী শ্রমিক পুরুষের পক্ষে, সংখ্যালঘু এবং সন্তান উৎপাদনে অক্ষম নারী ও সমকামী সম্প্রদায়ের প্রতি এই অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার কোনো মমতা, কোনো ন্যায় বিচার কাজ করে না।

যদিও আগেই বলেছি, সমকামিতা প্রাকৃতিক বিষয়। কিন্তু সমকামিতা শুধুমাত্রই বা একচ্ছত্রভাবে প্রাকৃতিক বিষয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমকামিতা সামাজিকও বটে। মিশেল ফুকোর কথা আগেই উল্লেখ করেছি। ফুকো ছাড়াও ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ হোমোসেক্সুয়ালিটি’ (১৯৯০) বইয়ে ডেভিড হ্যালপেরিন দাবী করেন সমকামিতা মূলতঃ সমাজের তৈরি করা মানসিক বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও সোশাল কনস্ট্রাকশনালিজম স্কুল অভ থটের অধীনে থাকা জন উইংকলার ‘কনস্ট্রেইন্ট অভ ডিজায়ার’ (১৯৯০) বইতে দেখান সমকামিতা কোনো প্রাকৃতিক বিষয় না, বরং সমকামিতা মানুষের সামাজিক চরিত্র। ফুকো বা হ্যালপেরিন বা উইংকলারের এই দাবীর পিছনে এ্যারিস্টোটোলের বক্তব্য ‘প্রকৃতি উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো কিছু সৃষ্টি করে না’- এই যুক্তির ভূমিকা আছে অবশ্যই। এই স্কুল অভ থটের দার্শণিকরা বিশ্বাস করেন সমকামী বা বিষমকামী হওয়া মানুষের নিজের সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ চাইলেই একজন সমকামী মানুষকে বিষমকামী এবং বিষমকামী মানুষকে সমকামী বানানো যায়।  

খাজুরাহো থেকে গ্রিসের লেসবস- পূর্ব থেকে পশ্চিম- কোথায়, পৃথিবীর কোন্‌ অঞ্চলে, কোন্‌ ধর্মে, কোন্‌ রঙের মানুষের মধ্যে সমকামিতা নাই? কোথায় উভলিঙ্গের মানুষ নাই? কোথায় কোন্‌ সংস্কৃতিতে রক্ষণশীল পুঁজিপতিদের চোখ রাঙানো অতিক্রম করে সমাজে নারী পুরুষের বাইনারি লিঙ্গ পরিচয়ের বাইরেও কোনো সংজ্ঞার অধীনে না থাকা মানুষদের গল্প শোনা যায় নাই? ব্যক্তিগতভাবে আমি একই সাথে এই বাক্য বিশ্বাস এবং অবিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি, সমকামিতা একই সাথে প্রাকৃতিক এবং সামাজিক। অর্থাৎ সমকামিতা যেভাবে প্রকৃতির মাধ্যমে জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়, ঠিক একইভাবে সমকামিতা সমাজের মাধ্যমেও তৈরি হতে পারে।

সমকামিতা সম্পর্কে আমাদের সমাজ হাজারো কুসংস্কারে আবদ্ধ। এমনকি যার কিছু বইপত্র পড়ে রাতারাতি প্রগতিশীল বনে গেছেন, তারাও সমকামিদের সম্পর্কে ঘৃণাত্মক মনোভাব পোষন করেন। সমকামিরা সামাজিক অবদমনের কারণে বিভিন্ন প্রকার অপরাধপ্রবনতা এবং একই সাথে আত্মহত্যাপ্রবনতা এবং বিভিন্ন মনোবৈকল্যের শিকার হতে পারেন। এর ভেতরে থাকতে পারে ড্রাগসে আসক্তি, অবদমনের কারনে যৌনতা বিকৃতির দিকে মোড় নেয়া ইত্যাদি। এর পেছনে সমকামিতাকে দায়ী করা যাবে না, সামাজিক অবদমন এবং ধর্মীয় দৃষ্টিতে পাপবোধের সৃষ্টিই এর কারণ। আমাদের সমাজে এলজিবিটি সম্প্রদায়কে মেনে নেয়ার প্রবণতা একেবারে নেই বলেই তাদের মানসিক ক্ষরণের মাত্রা বেশি। হোমোফোবিয়ার যে নেতিবাচক প্রভাব এলজিবিটি সম্প্রদায়ের উপর পড়ে, তা থেকে তাদের বাঁচাতে সবচেয়ে কার্যকর হলো তাদের বন্ধু ও পরিবারের সহায়তা। একজন সমকামি ব্যক্তির পরিবার যদি তাকে মানসিক সাপোর্ট দেয়, তার পাশে থাকে তাহলে হোমোফোবিয়ার প্রভাব অনেকটাই দূর হতে পারে।

এক্ষেত্রে সমকামী ব্যক্তির বাবা-মায়ের ভূমিকা অপরিসীম। বাবা-মা একজন সন্তানের জীবনে প্রথম শিক্ষক। সন্তানের সাথে সমকাম বিষয়ে খোলাখুলি আলাপ এখন সময়ের দাবি। আপনি যদি জানেন আপনার সন্তান সমকামী তবে তাকে সেই মানসিক সাপোর্ট দেয়াটা আপনার দায়িত্ব। আপনার সন্তান কোনোভাবে বুলিয়িং-এর শিকার হচ্ছে কি না, কোনোরকম মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে কি না, তার কাউন্সেলিং প্রয়োজন কি না এসব বিষয়ই খেয়াল রাখতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে সমকামিতা প্রাণী চরিত্রের স্বাভাবিক একটি বৈশিষ্ট্য। আমাদের সকলের মনে রাখতে হবে একটা স্বাধীন সভ্য দেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা প্রত্যেক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সমকামিদের সামাজিক ভাবে স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন এটা যেকোন সভ্য সমাজের দায়িত্ব। সমকামিতা সমকামিরা নিজে নির্ধারন করে না। প্রকৃতি তথা সমাজ তাদের ভেতরে সমকামিতার বীজ বপন করে। একজন সমকামি পুরুষের নারীর প্রতি প্রাকৃতিকভাবে আকর্ষন নাই, যৌন আকাংখা নাই। এই দোষে নিশ্চয়ই একজন মানুষকে এক ঘরে করে রাখা বা বয়কট করা কোন মতেই মানবিক আচরন হতে পারে না। সমকামীদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে আত্মহননের পথে। আর এগুলোতে পুরোমাত্রায় ইন্ধন যুগিয়ে চলেছে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় সংগঠন ও রক্ষণশীল সমাজ। দুইজন সমকামী মানুষ এক হতে চাইলে আমাদের এতো গাজ্বালা কেন ? মানুষ সামাজিক জীব। এই সামাজিক জীব হিসেবে সমাজ ও প্রকৃতিগত বিষয়কে 'নাক সিটকানো' কোন সুস্থ মগজসম্পন্নের কাজ হতে পারে না।
দৈনিক বার্তালিপি ০৭/০৭/২০২৩

Wednesday, June 28, 2023

ডিলেমিটেশন : যোগ বিয়োগে নতুন সমীকরণ

যদি সত্যি বলতে হয়, বোড়োরা যা করে দেখালো বরাকের প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ মানুষের ঝুলিতে মিলল একরাশ দুর্ভোগ। না না ভুল বুঝবেন না। হিংসা ও নয়। আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের শিকার আরেকবার, তা প্রমাণিত। প্রতিটা ভাষাভাষী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও তাদের অধিকার অটুট থাকা এটা সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু কপাল পুড়ার ক্ষেত্রে বারবার বরাকই বা কেন? বর্তমান আসামে দ্বিতীয় সরকারি বোড়ো ভাষা। জনসংখ্যার দিক থেকে বরাক পিছিয়ে না পড়লেও আসন সংখ্যায় কমে এখন তেরো। আসলে এই ছক আগে থেকেই আঁকা ! আসন সংখ্যা কমানোর পেছনে কোন যুক্তিসংগত কারণ এখনও মেলেনি। আমরা আজ ইতিহাসের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া সময়ে। আমাদের উচিত ছিল সেদিনই যেদিন বদরপুরকে কাছাড়ের আওতায় আনা হয়। দেশভাগের পূর্ববর্তী সময় থেকেই বদরপুর ছিল করিমগঞ্জের সঙ্গে। তবে এটা কি বলা যায় - 'বদরপুরের দুর্গ কে কাছাড়ি রাজার দুর্গ' বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা ?

আমাদের বাসস্থান আসামে হলেও অসমিয়া আগ্রাসনের শিকার বহু আগে থেকেই। ১৯৬১ সালের ১৯শে মে ১১ টি তরতাজা প্রাণ শহীদ হন শিলচরে। ১৯৭২ এর ১৭ই আগস্ট করিমগঞ্জে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু চক্রবর্তী)। ১৯৮৬র ২১ জুলাই করিমগঞ্জে শহীদ হন জগন্ময় ও যীশু। ১৯৯৬ এ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার রক্ষায় করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে শহীদ হন সুদেষ্ণা সিনহা। ভাষার অধিকার রক্ষায় ১৫ জন শহিদ হয়েছেন ঠিকই কিন্তু আসামে ভাষিক সংখ্যালঘুরা এভাবে বারবার ক্লান্ত হচ্ছেন অসমিয়া আগ্রাসন দ্বারা। নিপীড়িত হচ্ছেন ডি–ভোটারের তকমায় ডিটেনশন ক্যাম্পে আবার কখনো বা  উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির সুকৌশল ভাষিক আগ্রাসন নীতির মাধ্যমে অথবা নতুন প্রকৌশল ডিলিমিটেশনে । 

জাতীয়তাবোধ জাগরনের পেছনে যে উপাদানটি সার্বিক প্রয়োজন সেটি হলো এক সম্মিলিত ঐতিহ্যবোধ। 'শহীদ তীর্থ বরাক' এ এতোজন ভাষা শহীদ হয়েও আমরা এখনও উত্তরাধিকার হতে পারলাম না। আমরা ক্রমশঃ পরিচয়ে বিভক্ত হচ্ছি হিন্দু-মুসলমানে। আর সুযোগসন্ধানীরা সেই সুযোগে আঁতে ঘা দিচ্ছে একের পর এক কাঁটা বিদ্ধ করে। আমাদের দুটি আসন কমিয়ে গলা টিপার আরেক দফা এগোলো আর কি! বিধানসভা আসন সংখ্যাভিত্তিক কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের যে বরাদ্দ থাকে, তা কমবে। সুতরাং খুবই পরিতাপের বিষয় যাঁরা বলছেন, এই ডিলিমিটেশন প্রস্তাবে বরাকের কোনো ক্ষতি হবে না, তাঁরা কোন ভিত্তিতে বলছেন, তাঁরাই জানেন! জার্সি বদলিয়ে কথা ছিল পরিবর্তনের জোয়ারে ভাসিয়ে দেয়ার কিন্তু আগ্রাসন অক্ষরে অক্ষরে পালিত তার পদচিহ্ন প্রতিয়মান।

আসামের দক্ষিণাঞ্চল বরাক উপত্যকায় যথাক্রমে তিনটি জেলা কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি। আয়তনের দিক থেকে প্রায় ৬৯২২ বর্গ কিলোমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বরাক উপত্যকার জনসংখ্যা ছিল ৩৬,২৫,৩৯৯, তা বর্তমানে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষের অধিক। এই বিশাল জনসংখ্যবহুল উপত্যকায় এখন পর্যন্ত প্রতিনিধিত্ব করছেন ১৫ জন বিধায়ক। অন্যদিকে বিটিআর অটোনোমাস রিজিওন (Bodoland Territorial Region ) যথাক্রমে চারটি জেলা বাকসা, চিরাং, কোকরাঝাড় এবং উদালগুড়ি। আয়তনের দিক থেকে বিটিআর ৮৯৭০ বর্গ কিলোমিটার। ২০১১ মতে জনসংখ্যা প্রায় ৩১,৫৫,৩৫৯। বিধানসভায় প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন ১২জন বিধায়ক। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো এই ডিলিমিটেশনে আরও দুইটি আসন বাড়লো কিভাবে? ডিলিমিটেশন হয় সাম্প্রতিক লোক গণনা মতে জনসংখ্যার ঘনত্বের উপর (Delimitation reflect demographic fluctuations. Means the most current census serves as the basis for redrawing boundaries namely population density.) অর্থাৎ আয়তনের ভিত্তিতে আসন যোগ বা বিয়োগ হয় না। বিটিআর এ যেখানে চারটি জেলা আর বরাক উপত্যকায় তিনটি, এটাও যেন মাথায় রাখি। যেখানে বরাক উপত্যকায় ২০১১ অনুযায়ী হিসেব করা হয় তবুও বিটিআর থেকে প্রায় পাঁচ লক্ষের অধিক জনসংখ্যা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় শুধু বিটিআর কেন আসামের অন্যান্য জেলায়ও বেড়েছে বিধানসভার আসন। যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব কম।

বরাক, কুশিয়ারা, ধলেশ্বরীর মিলনায়তন এই উপত্যকা বহু আগে থেকেই পিছিয়ে পড়া। জনসংখ্যার দিক থেকে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষের বেশি হলেও সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থতৈনিক দিক দিয়ে জীবনধারণের মানদন্ডে ভারতের বিশেষ করে আসামের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক দূরে। নির্বাচনী ইশতেহার অনেক ঘোষণা থাকলেও রাজনৈতিক নেতা দুই একজন ব্যাতিক্রমী ছাড়া কন্ঠস্বর খুবই ক্ষীণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এতে নিশ্চয় দূরদর্শিতার অভাব। দেখতে গেলে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কাগজ কল পাঁচগ্রাম কাগজ কল এখন বন্ধ, অপমৃত্যু ঘটে আনিপুর চিনি কল, বন্যার প্রকোপ, দুর্বল কর্মসংস্থান, অবিকশিত কৃষি ক্ষেত্র। তাছাড়া কি আর বলার আমাদের ছেলেমেয়েরা পেটের তাগিদে বর্হিরাজ্যে গিয়ে কর্মসংস্থানে জুড়ছে। এখানকার জনজীবনের উন্নতিকল্পে যেখানে আসন বর্ধিত করার কথা সেখানে হলো কমানো। তিমির অবগুণ্ঠনে আরও তলানিতে বরাকের জনজীবন।

প্রায় দুই দশকের পর আসামে নির্বাচনী এলাকা পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে (Constituency rescheduling process in Assam)।  আসাম সরকার এই প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে একটি অফিসিয়াল চিঠি পাঠিয়েছে  হয়তো ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে আসামের লোকসভা, বিধানসভা কেন্দ্রের সীমানা পরিবর্তিত হবে (Redrawing constituency boundaries)। সঙ্গে আরও 'খেলা হবে', বদলে যাবে ভোটাররা !! ১১ মে ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সভায় একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল (All Party Meeting decision on Re determination)।  কিন্তু এনআরসি এখনও অসম্পূর্ণ।এনআরসি সম্পূর্ণ না করে কেন নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা একটি শুধু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন নয়, ভাববার বিষয়। আসু এবং অসম সাহিত্য সভা প্রমুখের সাংগঠনিক ভূমিকা এখন কি হবে তাও চিন্তার বিষয় ৷ এনআরসি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এতদিন সমষ্টির সীমা পুনর নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বাধা দিয়েছিল আসু ৷ করেছিল বলিষ্ঠ বিরোধীতা। এখন এন আর সি অসম্পূর্ণ হয়ে থাকা অবস্থায় সমষ্টির পুনর নির্ধারণ নিয়ে আসুর ভূমিকা ও হয়ে পড়েছে উদ্বেগজনক।

অবশ্য সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত ন্যায়াধীশ বিপ্লব শর্মার অধ্যক্ষে গঠিত অসম চুক্তির ৬ নং দফার রূপায়ণ কমিটির পরামর্শের ভিত্তিতে আসামে সমষ্টির পুনর্নির্ধারণ করার জন্য দাবি জানিয়েছিল সদৌ অসম ছাত্র সংস্থা। তবে এখন যে মৌনতা অবলম্বন করে আছে এটাতে বুঝা যায় সম্মতির নিশ্চয়ই লক্ষণ এখানে। এনআরসির বিপরীতে এখন হবে সমষ্টির পুনর নির্ধারণ। সর্বদলীয় মৌনতা ও অসম্পূর্ণ এন আর সি দিয়ে সমষ্টির পুনর নির্ধারণের সম্মতি বিবেচিত হচ্ছে। এখন কথা হলো প্রপোজড ডিলেমিটেশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা যাবে ১১ জুলাই ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ তারিখ পর্যন্ত। চিঠি বা মেইল মারফত অভিযোগ দায়ের করা যাবে সেক্রেটারি, ইলেকশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া-এর কাছে। প্রপোজড ডিলেমিটেশনে বরাকের কোন ক্ষতি হবে না তো! এই ডিলেমিটেশনে আমরা কি পেলাম। আমরা বঞ্চনার শিকার বহু আগে থেকেই। এটা নতুন করে বলার কিছু নয়। তাই বলাই বাহুল্য গালাগা হয়ে যাওয়া। ডিলেমিটেশনে বরাকের দুই সমষ্টি কাটলিছড়া ও পাথারকান্দি বিলুপ্ত। বরাকের ক্ষেত্রে এহেন আচরণ কোন রাজনৈতিক চক্রান্ত নয়তো, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে ফেলার ফন্দি নয়তো, আসাম বিধানসভায় বরাক থেকে প্রতিনিধিত্ব কমিয়ে বরাকের আওয়াজকে দাবিয়ে রাখার জন্য উদ্দেশ্য প্রণোদিত কলকাঠি নয়তো! 

আসলে আমরা হীনমন্যতায় ভুগছি। ভাত-ঘুমের ব্যাঘাত ঘটুক কে চাই! তবে এটা যেন মনে রাখি বার বার অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমাদেরই। মিথ্যে নয় - কি আর করতে পারলাম, না পারলাম 'ভাষা শহীদ ষ্টেশন' বানাতে না পারলাম ঐক্যবদ্ধ হতে। জনপ্রতিনিধি কমানোর যে ছক তা কি আসলে উপত্যকার গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার ছক ! এখনই সময় সম্মিলিতভাবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ঐক্যবদ্ধ জনমত গঠন করার। একটা কথা বলি, বরাক থেকে প্রতিনিধিত্ব কমানোর অর্থ হলো আমাদের আওয়াজ কমিয়ে দেওয়া। সুতরাং এই প্রপোজড ডিলেমিটেশন কতটা যুক্তিসঙ্গত এবং বরাকের ক্ষেত্রে কতটা বিকাশ আনতে পারে — তা দেখবার বিষয়!! জবাবদিহিতার অভাবে শেষে এটাই বলব শ্রদ্ধেয় কবি ব্রজেন্দ্র কুমার সিংহের ভাষায় — 'ধানের খেতের মতো শ্যামল কোমল/ দিঘির জলের মতো স্নেহ মাখা/ তাকে মেরে ফেলা এতই সহজ!'


দৈনিক নববার্তা প্রসঙ্গ — ২৮/০৬/২০২৩ ইং 

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...