'রোমিও জুলিয়েট' নাটকের একটা বিখ্যাত লাইন যেখানে শেক্সপীয়ার বলেছিলেন, নামে কিবা আসে যায়?(What's in a name!) তাহলে বিতর্ক থেকেই যায়। 'ইন্ডিয়া' না 'ভারত' কোন নামটি দেশের হওয়া উচিত। সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদে যেখানে লেখা আছে "India, that is Bharat, shall be a Union of States”। দেশের নাম বদলে যাবে! এই গত কয়েকদিন ধরে এমনই জল্পনা শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। কেন্দ্রের তরফ থেকে বিশেষ যে অধিবেশন রাখা হয়েছে সেই অধিবেশনেই নাকি এমন নাম বদলের বিল পেশ করা হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। অনুমান করার পাশাপাশি এই নিয়ে বিস্ফোরক সব দাবি তুলতেও দেখা যাচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা নেত্রীদের। এমন জল্পনা শুরু হয় মূলত G20 সম্মেলন ঘিরে রাষ্ট্রপতি যে আমন্ত্রণপত্র পাঠান তা থেকেই।
আমাদের দেশের ভূখণ্ডকে সেই প্রাচীনকাল থেকে নানা নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জম্মুদ্বীপ, ভারতখণ্ড, হিমবর্ষ, অজনাভবর্ষ, আর্যাবর্ত, হিন্দ, হিন্দুস্তান আর ইন্ডিয়া নামগুলি। সম্রাট অশোকের শিলালিপিতে জম্মুদ্বীপের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ভাষাবিদ অজিত ওয়াডনের্করের মতে, “হিন্দ, হিন্দুস্তান বা ইন্ডিয়া – এই নামগুলির সঙ্গে সিন্ধু নদের যোগ আছে। কিন্তু সিন্ধু শুধু একটি নদ নয়, এর অর্থ যেমন নদ বা নদী হয়, তেমনই সাগরও এর আরেকটি অর্থ। সেদিক থেকে বিচার করলে দেশের উত্তর-পশ্চিম অংশটি কোনও এক সময়ে সপ্তসিন্ধু বা পাঞ্জাব বলা হত। ওই অঞ্চলটি খুবই উর্বর ছিল তাই সেখান দিয়ে বহমান সাত অথবা পাঁচটি নদীই ছিল এলাকার পরিচয়।“ তিনি আরও বলেন, “প্রাচীন ফার্সি ভাষায় সপ্তসিন্ধুকে ‘হফ্তহিন্দু’ বলা হত।“ আবার ইন্ডিয়া এবং ইন্ডাস নাম পাওয়া যায় গ্রীক ইতিহাসবিদ মেগাস্থিনিসের বর্ণনায়। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সংস্কৃতের দিকপাল অধ্যাপক মনিয়র উইলিয়ামস, যিনি সংস্কৃত-ইংরেজি অভিধান লিখেছিলেন, তার মতে বেদে ভরত বা ভরথ শব্দটির অর্থ অগ্নি, লোকপাল বা বিশ্ব-রক্ষক, এক অর্থে রাজা। ওয়াডনের্কর বলছেন, “বৈদিক যুগের এক প্রসিদ্ধ জনগোষ্ঠী ভরতের উল্লেখ অনেক প্রাচীন পুঁথিতে রয়েছে। এই গোষ্ঠী সরস্বতী নদী তট, যেটি বর্তমানের ঘগ্গর, ওই অঞ্চলে বসবাস করত। এদের নাম অনুসারেই ওই ভূখণ্ডের নাম হয় ভারতবর্ষ।“
আসল-নকলের উত্তর খোঁজা সহজ নয়। ‘ইন্ডিয়া’- নামটিও মিলছে যথেষ্ট প্রাচীন ব্যবহারেও— ‘Indos’ শব্দটি পাওয়া যাচ্ছে গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস-এর বিবরণে। প্রাচীন ভারতে বিদেশাগত পর্যটক মেগাস্থিনিস (‘ইন্ডিকা’), আল বেরুনি প্রমুখের (‘কিতাব উল হিন্দ’) বইয়ের নামের মধ্যেই ‘ইন্ডিয়া’ শব্দটি লুকিয়ে আছে। তাহলে কেন ‘ভারত’ এভাবে উঠে এল সরকারি নথিতে? ভাষাবিদ পবিত্র সরকার বলছেন, শকুন্তলা ও দুষ্মন্তের পুত্র ভরতের নাম থেকেই তার রাজ্যের নাম হয় ভারত, এটাই প্রচলিত ধারণা। ‘ভারত’ শব্দের উৎসে লুকিয়ে আছে এক হিন্দু পুরাণকাহিনী। মহাভারতে যে কুরু-পাণ্ডবের গল্প আমরা পড়ি, ভরত ছিলেন তাঁদেরই পূর্বজ, চন্দ্রবংশের একজন নৃপতি। ‘ভরতের রাজ্য’ অর্থেই ‘ভারত’ ভূখন্ডটি তাৎপর্যময়, এবং সেই উদ্দেশ্যেই ‘ভারত’ নামটিকে গুরুত্ব দেওয়া— কিছু বিরোধী সমালোচনা অনুযায়ী উঠে এসেছে এমনই মতামত। বিজ্ঞজনেরা ধরে নিচ্ছেন আগামী দিনে রাষ্ট্রে’র নির্মাণপ্রকল্পে পুরাণকাহিনিকে ইতিহাসে রূপান্তরিত করার একটা প্রয়াস হিসেবেই এটাকে দেখছেন তাঁরা।
মুঘল আমলের দিকে তাকানো যায় তবে দেখা যায় তাদের শাসনাধীন অঞ্চলকে হিন্দুস্তান বলা হত। তবে ঐতিহাসিক ইয়ান জে ব্যারো লিখেছেন, অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে ব্রিটিশ মানচিত্রগুলিতে ইন্ডিয়া নামটির প্রচলন হতে থাকে। তার আগে, মুঘল আমলে তাদের শাসনাধীন এলাকাটিকে হিন্দুস্তান বলে চিহ্নিত করা হত। ব্যারো 'জার্নাল অফ সাউথ এশিয়ান স্টাডিসে' প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ ‘ফ্রম হিন্দুস্তান টু ইন্ডিয়া’-তে লিখেছেন “ইন্ডিয়া শব্দটির প্রতি আকর্ষণের কারণ সম্ভবত ছিল তাদের গ্রীক-রোমানদের সঙ্গে নৈকট্য, ইউরোপে এটির দীর্ঘ ব্যবহার এবং সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার মতো বৈজ্ঞানিক ও সরকারি সংস্থাগুলির কাছে এই নামটির গ্রহণযোগ্যতা।“
২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রের নিরঞ্জন ভটওয়াল, 'ভারত' নামটিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে জনস্বার্থ মামলা করেছিল। ‘ইন্ডিয়া’ নাম বাতিল করে শুধু ‘ভারত’ করা যাবে না, সেবছরই দেশের শীর্ষ আদালতে হলফনামা দিয়েছিল কেন্দ্র সরকার। যাইহোক নাম পাল্টে দেশ ও দশের কিছু লাভ হবে কি? তর্কের খাতিরে মেনেই নিলাম এই নাম পরিবর্তন করেই ভারতবর্ষ করা হলো তাহলে যে সব সরকারি প্রতিষ্ঠান গুলো আছে তাদের নামের আগে বা পরে ইন্ডিয়া শব্দটি ব্যবহার হয় উদাহরন স্বরূপ I.I.T (Indian Institute of Technology), I.I.M.s (Indian institute of management), I.S.R.O ( Indian space Research Organisation), R.B.I (Reserve Bank of India), S.B.I (State Bank of India), AIIMS (All India Institute of Medical Sciences) ইত্যাদি, এমনকি পাসপোর্টেও লিখা থাকে রিপাবলিক ওফ ইন্ডিয়া, পেন কার্ড, আধার কার্ড এবং প্রত্যেক টাকা তে উল্লেখ থাকে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া(RBI), এই সব সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান গুলির নাম, কাগজ, টাকা ও দস্তাবেজ পরিবর্তন করতে কোন অযথা খরচা হবে না তো? উপরে মাত্র কয়েকটা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে ইন্ডিয়া নামে এমন হাজারো সরকারি, আধা সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ধরুণ এটা যদি তুঘলকি সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে আমাদের দেশ কতটা দুর্দশায় আক্রান্ত — মানুষ মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নাগরিকত্ব, দুর্নীতি, গৃহ ও জাতি দাঙ্গা, ক্ষুদা সূচকে অবনতি, নির্দিষ্ট কর্পোরেট দের হাতে রাষ্ট্রের সম্পত্তি জলের দামে বিক্রি, ঋণ চুরি, নির্দিষ্ট শিল্পপতিদের ঋণ মাফ, সীমা বিবাদ, মহিলা, দলিত, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু অত্যাচার, বনভূমি ও খনি সমূহ কে কিছু নির্দিষ্ট কর্পোরেট দের হাতে তুলে দেওয়া প্রভৃতি সরকারের একের পর এক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন না করতে পারে সেইজন্য জনসাধারণ নাম বিতর্কের পিছনে অযথা তর্কে বহুদূর সরিয়ে দেয়ার কোন মনোবাঞ্ছনা নয় তো!
আসন্ন ২০২৪ লোকসভা ভোটে পায়ের নীচে জমি শক্ত করছে বিরোধী শিবিরে। বিজেপির প্রতিপক্ষ হিসেবে জোট শিবিরে রয়েছেন মমতা, কেজরিওয়াল, নীতিশ কুমার, উদ্ধব ঠাকরে, ফারুখ আবদুল্লাহ, এম. কে. স্তালিন প্রমুখ বিরোধী ঐক্যের নেতা-নেত্রীরা। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারতের ছাব্বিশটি রাজনৈতিক দলের এক ‘বিগ টেন্ট’ হিসেবে ১৮ জুলাই ২০২৩ তারিখে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে INDIA ওরফে Indian National Developmental Inclusive Alliance । বিশেষজ্ঞদের মতে স্পষ্টতই ‘ইন্ডিয়া’- নামটিকে বিজেপি বিরোধী অস্ত্র হিসেবে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে চাইছিল বিরোধী শিবির। কিন্তু, ‘ভারত’ নামটি ব্যবহার করে যেন সেই পরিকল্পনারই পাল্টা দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী — এমনটাই তাঁদের ধারণা। আবার, অনেকে এ-ও ভাবছেন— এতে অযথা রাজনীতি খোঁজা অর্থহীন। ‘ভারত’- নামেই বা সমস্যা কোথায়? ‘ইন্ডিয়া’ বিদেশী ইংরেজদের দেওয়া নাম, তাই দেশের ‘ভারত’ নামই দেখতে চান বলে গুঞ্জন বিশেষজ্ঞ মহলে।
কিন্তু, সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা— ‘ইন্ডিয়া’- সরকারি নামটিই কি তাহলে বদলে যাবে ‘ভারত’-এ? তাঁদের অনেকেই মনে করছেন এবার আবারও কি ফিরবে নোটবন্দি’র স্মৃতি। ব্যাঙ্ক নোট থেকে আরম্ভ করে আধার, ভোটারের মত সরকারি নথিতে ‘ইন্ডিয়া’ বদলে ‘ভারত’ করানোর লাইনে দাঁড়ানোর পালা আসতে চলেছে ফের। সব মিলিয়ে নাম-বিতর্ক এখন তুঙ্গে। অবশেষে একটিই কথা বলতে চাই নামে কোন আপত্তি নেই। এটা ভারতবর্ষ হোক আর ইন্ডিয়া বা হিন্দুস্থান। কথা হলো এবার বিচার করার পালা পরিবর্তনের নামে যাতে নোংরা রাজনীতি না হয় দেশে। জনগণের টাকাকে দেশের ও দশের উন্নয়নে যেনো লাগানো হয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও তুঘলকি স্বার্থের বিপরীতে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ চরিত্র আমরা দেখতে চাই।