Sunday, September 4, 2022

'ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়...'


ক্ষুধা, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং সব ধরনের অপুষ্টি দূর করার চ্যালেঞ্জ দিন দিন বেড়েই চলেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, কোভিড-১৯ মহামারী আমাদের কৃষি ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সমাজে অসমতাকে আরও উন্মোচিত করেছে, যার ফলে বিশ্বে ক্ষুধা এবং মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। বৈশ্বিক অগ্রগতি সত্ত্বেও, শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির প্রবণতা - যেমন স্টান্টিং এবং অপচয়, প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি এবং শিশুদের অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলতা - একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। তদুপরি, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মাতৃ রক্তাল্পতা এবং স্থূলতা একটি উদ্বেগের বিষয়।

স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পান না প্রায় ৯৭ কোটি ভারতীয়। মানে, ১৩০ কোটির ‘গর্বিত’ ভারতবাসীর মধ্যে ৯৭ কোটি মানুষেরই দু’বেলা জীবনধারণের উপযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার জোটে না। অর্থাৎ, মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭১ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার জোগাড় করতে পারেন না। শুধু তাই নয়, ভারত অনাহার-অপুষ্টির এই তালিকায় আফ্রিকার খুব কাছাকাছিই আছে। যা রীতিমত উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্যকর বা সুষম খাদ্য কেনার ক্ষমতার উপর আন্তঃদেশীয় একটি তুলনামূলক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ভারতের ৭১ শতাংশ মানুষের পুষ্টিকর খাদ্য কেনার ক্ষমতা নেই। সংখ্যায় যার পরিমাণ প্রায় ৯৭ কোটি। আরও লজ্জার বিষয় এই যে, ভারতেরই পিছনে রয়েছে আফ্রিকা। যেখানে ৮০ শতাংশ মানুষের পুষ্টিকর খাবার জোটে না। গোটা এশিয়ায় ৪৩.৫ শতাংশ মানুষ এই আওতায় পড়েন। সুতরাং, বোঝাই যাচ্ছে, একা ভারতই কীভাবে অপুষ্টি, অনাহার, অর্ধাহার ও সুষম খাদ্যাভাবের দৌড়ে এশিয়ার মুখ উজ্জ্বল করে রয়েছে !

দি স্টেট অফ ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২২’ নামে রিপোর্টটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যই বলছে, ২০২০ সালে বিশ্বের প্রায় ৩০৭ কোটি মানুষ ভালোভাবে খেতে পাননি। সেখানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ ভারতেই তিন ভাগের একভাগ মানুষের বাস। ফাওয়ের তথ্যে বলা হয়েছে, একজন মানুষের সারাদিনে সুষম খাবার খেতে যা খরচ হওয়ার কথা, তাতে ভারতে ৪ জনের পরিবারে মাসে ৭৬০০ টাকা লাগে। অর্থাৎ ভারতের ৯৭ কোটি মানুষই এই পরিমাণ ক্রয়ক্ষমতার নীচে বসবাস করেন।

এই তালিকায় দেখা যাচ্ছে, চীনের ১২ শতাংশ, ব্রাজিলে ১৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৪৯ শতাংশ, নেপালের ৮৪ শতাংশ, বাংলাদেশে ৭৩.৫ এবং পাকিস্তানের ৮৩.৫ শতাংশ মানুষ সুষম আহার পান না। ভারতের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষই ভরতুকির খাবার বা সরকারি রেশনের উপরে নির্ভরশীল। অর্থাৎ, সরকার পোষিত খাবার না পেলে, তাঁদের দুর্দশা কী হবে, তা নিয়েও যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে।

প্রায় ৮০ কোটি, বা ৬০% ভারতীয়, সরকার-প্রদত্ত ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য রেশনের উপর নির্ভর করে, যেখানে সুবিধাভোগীরা বিশেষ মহামারী ছাড়াও প্রতি মাসে প্রতি কিলোগ্রামে মাত্র 2-3 টাকা হারে পাঁচ কেজি রেশন পান। যা প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনার আওতায় পাঁচ কেজি রেশন। যাইহোক, পরিকল্পনাটি প্রায়শই সমালোচিত হয় যে যদিও ক্যালোরি সরবরাহ হচ্ছে কিন্তু পর্যাপ্ত পুষ্টি হচ্ছে না।

জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য জরিপ ( National Family Health Servey), 22টি রাজ্যে ভারত সরকার পরিচালিত এই সমীক্ষার ফলাফল দেখায় যে দেশে অপুষ্টির ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। মহিলাদের মধ্যে সাধারণত অ্যানিমিয়ায় শিশুরা অপুষ্টিতে জন্ম নেয়। এই কারণে,১৩ টি রাজ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে কম। ১২টি রাজ্যে, একই বয়সের শিশুদের ওজন উচ্চতা অনুযায়ী নয়।

 এই সমীক্ষাটি আসাম, বিহার, মণিপুর, মেঘালয়, সিকিম, ত্রিপুরা, অন্ধ্রপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট, কর্ণাটক, মিজোরাম, কেরালা, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, হিমাচল প্রদেশ, লাক্ষাদ্বীপ, দাদরা ও নগর হাভেলি এবং মহারাষ্ট্রে করা হয়েছে। সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুসারে, মেঘালয়ের পরে বিহার দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ৪৩ শতাংশ শিশু যারা তাদের বয়সের অনুপাতে ছোট। গুজরাটে এই সংখ্যা ৩৯ শতাংশ।অর্থাৎ গুজরাট ও বিহারের মতো রাজ্যে শিশুদের সঠিক বিকাশ হচ্ছে না। তারা অপুষ্টিতে ভুগছে। এ কারণে তাদের মধ্যে দৈর্ঘ্য কম হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিহারে সবচেয়ে কম ওজনের শিশুর সংখ্যা ২২.৯%।

 তবে দেশের বেশিরভাগ রাজ্যেই শিশুমৃত্যুর হার কমেছে। এর কারণ হিসেবে ভ্যাকসিনেশন হলেও ক্ষুধা ও অপুষ্টির পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। এখন আমাদের দেখার পালা আদৌ কি ভারত এই সংকট নিরসনে সাফল্য অর্জন করবে?

Wednesday, August 31, 2022

আমাদের ন্যায়পালিকা : তিস্তা থেকে বিলকিস


একটা রাষ্ট্ৰের জাতীয় দিবস তার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ আর এর মধ্যে যদি স্বাধীনতার ৭৬ তম বর্ষ উদযাপন হয় তো এর মাহাত্ম্য কতটুকু হতে পারে বোঝতেও পারছেন।এরমানে দেশ কতটা এগোচ্ছে এর একটা প্রমাণ আমরা ওয়াকিবহাল। নিৰ্দিষ্ট শ্ৰেণীর কয়েকজন কারাবন্দীদের মুক্ত করে দেয়া কোন ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। ভারতীয় আইনে এই ধরনের ব্যবস্থা আছে। গৃহ বিভাগ সচিব, আইন বিভাগের সচিব এবং কারাগার বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যাক্তিদ্বয়ের প্ৰস্তুত করা তালিকা মন্ত্রীসভাতে অনুমোদিত হওয়ার পর রাজ্যপালের কাছে প্রেরণ করা হয়। সেই তালিকাতে রাজ্যপাল সন্মতি জানালে তবেই তালিকাভুক্ত সকল কারাবন্দী মুক্তি পাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। এই তালিকাতে ভয়ংকর অপরাধীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না এবং নির্বাচিত সকল কারাবন্দীদের সেলে থাকা সময়ের আচার-আচরণ (বিশেষভাবে বিগত তিন বছরের) সন্তোষজনক হতে হব। উল্লেখিত সময়ে অসদাচরণের জন্য তাদেরকে আলাদা কোন শাস্তি ভোগ করতে হবে এমন নয়।

এইবার স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে কেন্দ্রীয় সরকারের গৃহ বিভাগ এমনি এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে রাজ্য সরকারের কাছে আবশ্যকীয় নির্দেশিকা প্রেরণ করে।বন্দীমুক্তির এই ব্যবস্থা চলিত বছরের ১৫ আগষ্ট, আগামী বছরের ২৬ জানুয়ারি এবং ১৫ আগষ্টের ভিতরে কাৰ্যকরি করতে হবে বলে নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। বলাবাহুল্য, গৃহ বিভাগের নির্দেশাবলীতে মুক্তির জন্য নির্বাচিত কারাবন্দীদের মধ্যে হত্যাকারী এবং ধর্ষণকারী থাকতে পারবে না বলেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে।

কিন্তু এই নিৰ্দেশাবলীর অহেতুক সুবিধা নিয়ে গুজরাট সরকার প্রথম খেউয়ে যে ১১জন লোককে মুক্তি করে দেয়, সমগ্র দেশবাসীর চোখ কপালে তুলতে তারা সফল হয়। পিএম মোদী স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে আহ্বান জানানোর কিছু সময়ের পরই এই গুরুতর কয়েকটি অপরাধীদের মুক্তি করে দেয়া হয়। তার থেকেও বিস্ময়কর এবং উদ্বেগজনক কথাটা হ'ল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মকর্তারা তাদেরকে কারাগারের সম্মুখে মিষ্টিমুখ করিয়ে দেয়, তিলক লাগানো হয়, পা স্পর্শ করে সম্মান জানানো হয়। কথাটা বিস্ময়কর এবং উদ্বেগজনক বলে একারণেই বলছি যে সেই সকল কারাবন্দীরা কোনো রাজনৈতিক বন্দী ছিল না, দেশ তথা জনতার হিতে সংগ্রাম করে দণ্ডিত করা হয় নি। তারা ছিলেন হত্যাকারী এবং ধৰ্ষণকারী। অথচ গৃহ বিভাগের নির্দেশাবলীতে উল্লেখ আছে, হত্যাকারী এবং ধর্ষণকারীকে মুক্তির তালিকায় সন্নিবিষ্ট করতে দেয়া হবে না। ২০০২ সনের গুজরাটের সাম্প্রদায়িক সংঘৰ্ষে সেই ১১জন বেকসুর খালাসীরা বিলকিস বানো নামের ইসলাম ধর্মীয় পাঁচ মাসের অন্তসত্ত্বা এক মহিলাকে দলবদ্ধভাবে ধৰ্ষণ করেছিল। কেবল বিলকিস কে ধৰ্ষণ করাতে এরা থেমে থাকে নি, তার চোখের সম্মুখেই তার তিন বছরের কন্যা সন্তান সালেহা কে হত্যা করার পরও পরিবারের আরও সাতজন লোকের হত্যা করা হয়েছিল। এরা যে কতটা ভয়ংকর অপরাধী, তা বলে জানানোর আবশ্যকতা নাই। 

যাইহোক, কেন্দ্ৰের গৃহবিভাগ সমগ্র দেশের জন্য জারি করা নীতি গুজরাট সরকার বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পদদলিত করে উক্ত দুর্ধর্ষ অপরাধীদের সসম্মানে মুক্ত আকাশের নিচে বাহির করে আনার সাহস করলো কিভাবে ? উল্লেখ্য যে এই ১১জন কারাবন্দীর মধ্যে একজন বন্দী, যে ইতিমধ্যে ১৫ বছর কারাবাসের সাজা কাটাচ্ছিল, তা লাগব করার উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ে আবেদন দাখিল করেছিল। সেই আবেদনের ভিত্তিতে ন্যায়ালয় গুজরাট সরকারকে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির বিষয়টি বিবেচনা করার নির্দেশ দিয়েছিল। সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের সেই নির্দেশের উপর আমল করে গুজরাটের বিজেপি সরকার বাকী ১০জন লোককে মুক্তি দিয়ে দেয়।

ইতিহাসের পাতায় গুজরাট সরকারের এহেন কার্য নিশ্চয় কোনো সোণালী অক্ষরে লিখা থাকবে না বরং স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব বৰ্ষে এই ঘটনা কলংকিত করে রাখবে। কলংকিত করে রাখবে, কারণ রাজ্য সরকারের এই কুকার্যে কেন্দ্রীয় সরকারের পরোক্ষ সমর্থন আছে বিজ্ঞ মহলে চর্চিত। সমর্থন আছে এজন্যই কেন্দ্রের জারি করা নীতি উলংঘন করে রাজ্য সরকার যে কার্য সংঘটিত করেছে, কেন্দ্রীয় সরকার তার বিরুদ্ধে একটা কিছু লিখিত বা অন্তত একটা কথাও আজ পর্যন্ত বলে নাই দেশবাসীর প্রতি সম্বোধন করে। দেশের অগণিত মানুষ গুজরাট সরকারের এইকাজের প্ৰতিবাদে সবর হয়ে উঠেছে দেখেও কেন্দ্রীয় সরকার এখনও নির্বিকার হয়ে আছেন৷ উনাদের মৌনতা এই কথার স্পষ্ট আভাস দেয় যে বিলকিস বানো তথা তার পরিবারের মধ্যে আসতে পারে সম্ভাব্য দুশ্চিন্তা এবং বিপদ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার একদমই উদ্বিগ্ন নয়, বরং আম আদমি পার্টির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা তাদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে ৷ একজন সোসিয়াল এক্টিভিস্ট বলেন 'সম্ভবত গোধরা বিধায়ক সি কে রাহুলের .. they are Brahmins. Anyway, the sanskar of Brahmins is very good." এই মন্তব্য আপ্তবাক্য রূপে মোদী-শাহ অন্তস্থল থেকে বিশ্বাস করেন। উল্লেখযোগ্য যে, সাজা লাগব করা পর্যালোচনা সমিতিতে রাহুল জি'র ছাড়াও আরও একজন মহিলা বিধায়িকা সুমন চৌহান ও ছিলেন !'

সম্প্রতিকালে ভারতের ন্যায়ব্যবস্থা নিয়ে যে সকল অবাঞ্ছিত প্ৰশ্নের অবতরণ হয়েছে, বিলকিস বানোর ঘটনাই সব 'দুধ কা দুধ, পানি কা পানি' হয়ে গেছে । এর আগে তিস্তা সিতালভাড় এবং শ্রীকুমারকে নিয়ে সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ে দেয়া রায়ের বিষয়ে বিভিন্ন লোক ভারতীয় বিচার ব্যবস্থাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে তুলেছেন। অবশ্য দুই একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে ন্যায় ব্যবস্থাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের ন্যায়লয়ের উপর আমার আস্থা আছে এবং তা রাখতে হবে। যদিও কয়েকটি রায় ন্যায়ালয়ের মর্যাদা অবনমিত করেছে বলে অনেক লোকের মন্তব্য। এমনকি সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের প্রাক্তন বিচারপতি এবং জ্যেষ্ঠ আধিকারিকের কাছ থেকেও মন্তব্য শোনা যায়। তিস্তা সিতালভাড় এবং শ্রীকুমারের বিষয়টি আন্তরাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তোলপাড় শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের বিশ্ববরণ্য কিছু ভালো মানুষ সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়কে অনুরোধ জানিয়ে এইবলে আবেদন দাখিল করেছে যে স্বতস্ফূর্ত উদ্যোগ নিয়ে ন্যায়ালয়ে সিতালভাড় এবং শ্রীকুমারের কেইস দুটো তাৎক্ষণিকভাবে রফা-দফা করতে হবে। এই আবেদনে সকল স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন—— ব্ৰিটিশ সাংসদ এবং রাজনৈতিক তত্ত্ববিদ ভিখু পারেথ, ভাষাতত্ত্ববিদ তথা স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি, ভারতীয় মূলত আমেরিকান নৃতত্ত্ববিদ অর্জুন আপ্পাডুরাই, মার্কিন রাজনৈতিক তত্ত্ববিদ ওয়েণ্ডি ব্রাউন, ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃত পণ্ডিত শেল্ডন পল ক., অর্থনীতিবিদ রবাৰ্ট পলিন, দার্শনিক কেওল বরেন, চাৰ্লস টেইলব, মার্কা নুসবাউম, আকিল বিলগ্রামী আরও অন্যান্য। এর দ্বারা দুটো কথা স্পষ্ট হয়। এক, এতো দিন ধরে আমাদের সরকারের — “ভারতের ন্যায়পালিকা স্বতস্ফূর্ত'— কথাগুলোর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। দুই, ন্যায়পালিকাকে প্রহসনমূলক করার ক্ষেত্ৰে বিজেপি সরকারের ভূমিকা সুস্পষ্ট।জরুরীকালীন অবস্থায় ইন্দিনা গান্ধী ন্যায়পালিকাকে নিজ স্বাৰ্থে ব্যবহার করেন নি, কিন্তু সাম্প্রতিক কালে ন্যায়পালিকার গতি-বিধি জরুরী কালীন অবস্থা কে তুচ্ছ করে তোলেছে।

এখনও আমাদের দেশে জরুরিকালীন অবস্থা জারি করা হয় নি। যদিও এর আবশ্যকতাও নেই৷ কারণ ফ্যাসিবাদ ঘোষণার মাধ্যমে ইহা আসে না, এটা আসে হস্তক্ষেপে একজনে দুজনের ভাগ আত্মসাৎ করার জন্য । ইতিমধ্যে আমার ঘটি, লোটা, বাটি আমার বহু বস্তু নেয়া হয়েছে । কিন্তু আমি অন্ন যোজনা, অরুণোদয়, সোনা রূপার মোহে বন্দী, আজমল মুখ্যমন্ত্ৰী হওয়ার আতংকে আক্রান্ত। একটা সময়ে আনোয়ারা তাইমুরও মুখ্যমন্ত্ৰী হয়েছিলেন। আমরা এতোটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছি যে পরনের কাপড়টা যেদিন হারাবো, সেইদিন আর রাজার বিরুদ্ধে বাহিরে এসে প্রতিবাদ করতে পারবো না। ইতিমধ্যে আমরা 'বইলিং ফ্রগ সিমড্রমে' আক্রান্ত হয়েছি।

https://acrobat.adobe.com/link/review?uri=urn:aaid:scds:US:34b142c8-55b5-395e-87d8-7132a7c91985

Saturday, August 27, 2022

রুশদির উপর হামলা ও অন্যান্য

প্ৰথমত সৎকারের প্ৰসংগ নিয়ে কিছু কথা বলি। দুই যুগ আগে একজন শৰ্মা একজন কোচ রাজবংশীকে বিয়ে করেন। প্ৰকৃতির নিয়ম মতে মানুষ মরবেই। এই শৰ্মাই মরেছিলেন। তাঁর সৎকার করার জন্য (সহজ ভাষায় পুড়ানোর জন্য) কেহই অগ্রসর হয়ে আসেন নি। কেনো আসবেন? ঈশ্বরের মুখপত্র বেদ চারটি বর্ণের কথা বলে। গীতাতেও আছে। আমি এত কিছু জানি না।তবে এটা নিশ্চিত যে বেদে আছে। ঈশ্বরের বাণী এমন একটি ধর্মগ্রন্থকে উল্টে দেওয়ার ক্ষমতা কি মানুষের আছে? আপনিও বেদে বিশ্বাস করবেন এবং চার বর্ণের বিরোধিতা করবেন। হয় ধর্মগ্রন্থ পড়ে এই জঘন্য মানসিকতাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে বা স্বীকার করতে হবে যে গ্রামের লোকেরা যা করছে তা ধর্মের নির্দেশ অনুযায়ীই করেছে।

এই বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক। কেউ কেউ বলেন, ধর্মের ভিত্তিতে নয়, কাজের ভিত্তিতে জাত বিচার করা উচিত। তার মানে কি পরিশ্রমী কৃষক, নাপিত, লন্ড্রিম্যান এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিকৃষ্ট বর্ণের? আর যারা মানুষের টাকা মেরে সম্পদের পাহাড় গড়ে তারা উচ্চ বর্ণের! কি ভয়ানক মানসিকতা আমাদের! মানুষের আবার জাতিগত বিচার কি? আমি একবার পড়েছিলাম যে জাপানের একটি কারখানার মালিক নিজে টয়লেট পরিষ্কার করেছিলেন। টয়লেট ক্লিনার কেন নিম্ন বর্ণের হবে? আমি একবার অফিসে গিয়ে দেখি, থুতু ফেলে বেসিন নোংরা করে ফেলেছেন কোন এক বড়বাবু , আর ঝাড়ুদার পরিষ্কার করছেন। নিজের থুতু নিজে পরিষ্কার করতে আপত্তি কেন? বন্ধুরা, জাতপাতের এই কুৎসিত মানসিকতা পরিহার করুন। ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলুন কোনো বই বা মানুষ (তা কাজ বা ধর্মের ভিত্তিতেই হোক) যারা জাত নিয়ে কথা বলে ।

কিছু নিচু মনের মুসলমানও এই জাতপাতের খেলা থেকে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে। সেই অংশের সাথে সতর্ক থাকুন। নূপুর যা বললেন তার আড়ালে সারা বিশ্বে যে নৃশংস খেলা চলছে তা নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। তবে নূপুর যা বলেছেন তা ইসলামের প্রাসঙ্গিক পবিত্র গ্রন্থ হাদিস থেকে উদ্ধৃত। তারাই চার্লি হেবডোরের উপর হামলা চালিয়েছে এবং ফরাসি শিক্ষককে হত্যা করেছে। তারা উপন্যাস লিখার জন্য সালমান রুশদিকে নিষিদ্ধ করেছে। তার প্রাণ কেড়ে নিতে তারা হামলা চালায়। তাদের মানসিকতাও শাস্ত্র দ্বারা পরিচালিত। তাদের ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে, কিন্তু তারা যে ধর্মগ্রন্থ দ্বারা প্রভাবিত তাতে কি কোনো ভুল আছে?

'একজন লেখকের কাজ শুধু পাঠকের রুচি অনুসারে লেখা পরিবেষণ করা নয়। একজন লেখকের কাজ পাঠককে শুধু আনন্দ জোগানো নয়। একজন লেখকের কাজ পাঠককে বিরক্ত করা এবং অপশক্তিকে উত্যক্ত করা। লিও টলস্টয় নিজেকে বলতেন 'প্রফেশনাল ট্রাবলমেকার'। একজন লেখক তো তাই, তিনি বিঘ্ন সৃষ্টি করবেন পাঠকের সরল জীবনপথে, কাঁকড় বিছিয়ে দেবেন। পাঠক হোঁচট খাবে, এবং চোখ তুলে তাকাবে। সে তবেই বুঝবে তার চারপাশে কী ঘটছে। প্রুস্তু বলেছিলেন স্মৃতির মধ্যেই আছে বাস্তবিকতা। অতএব পাঠককে সেই বাস্তবিকতা উপলব্ধি করাতে হলে একজন লেখককে তাঁর লেখাকে স্মরণীয় করতে হবে, আজকের তথাকথিত জনপ্রিয় লেখকদের মতো ইউজ অ্যান্ড থ্রো সাহিত্য রচনা করলে চলবে না।' সলমান রুশদী একাধিক কারণে আমার খুব প্রিয় সাহিত্যিক নন। কিন্তু তাঁর মেরুদণ্ডটা খুব শক্ত, তাই আমার পছন্দ । এই ছুরিকাঘাত বিশ্বসাহিত্যের উপরেই হয়েছে। এ সাহিত্যের পরাজয় নয়। এটা জয়।তবে বুঝা গেল সাহিত্যের শক্তির মোকাবিলা কেবলমাত্র পশুশক্তি দিয়েই করতে পারে কিছু গোষ্ঠী।

সাটানিক ভার্সে কি আছে? আমি ঠিক জানি না, আমি তা পড়িও নি। কিন্তু বিভিন্ন আলোচনা পড়ে ও শুনে যা বুঝলাম তা হলো তিনি তার উপন্যাসে ইসলামের নবী মুহাম্মদের জীবনের একটি ঘটনাকে খুব কৌশলগত ভাবে তুলে ধরেছেন। একজন লেখকের অবশ্যই সেই অধিকার আছে। হিন্দু ধর্মের দেবদেবীদের নিয়ে অনেক রসিকতা ও সাহিত্য রয়েছে। সেখানে তো, কেউ আপত্তি করে না, তবে একজন সাহিত্যিক হিসাবে তিনি এটি উপভোগ করেন। যদিও বর্তমানে কিছু হিন্দুও উপরোক্ত বর্ণের মুসলমানদের মত আচরণ করছে এবং তারা ক্রমশ সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছে। এটা আমাদের দেশের জন্য এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।
সালমান রুশদিকে কোপানো জিহাদি হাদি মাটারের বয়স ২৪ বছর। রুশদি দেশছাড়া হয়েছেন ৩৩ বছর আগে। দ্য স্যাটানিক ভার্সেস বইয়ের বয়স ৩৪ বছর। অর্থাৎ রুশদি যখন এই বইটা লিখেছিলেন তখন তাকে আক্রমণ করা এই জিহাদি ছেলেটার জন্মও হয়নি। অথচ সে এমন এক ঘৃণার পরিবেশে বড় হয়েছে যেখানে তাকে শেখানো হয়েছে সালমান রুশদিকে হত্যা করতে হবে তার বইয়ের জন্য। রুশদী কি লিখেছেন সে আদৌ পড়ে দেখেছে কিনা সন্দেহ আছে।

একইভাবে বাংলাদেশে মৌলবাদীরা তসলিমা নাসরিনকে ঘৃণার শিক্ষা নিয়ে বড় হয়েছে। কেউকেউ তাকে হত্যা করার জন্য তৎপর । অনেকেই তো আবার তার মাথার দাম নির্ধারণ করেছে। পূর্বসূরি হুমায়ুন আজাদ, তসলিমা নাসরিন থেকে উত্তরসূরী অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, আসিফ মহিউদ্দিন, সবাই কমবেশি ভুক্তভোগী। ভারতেও দাভল কার, গৌরী লঙ্কেস সহ বহু বুদ্ধিজবী কে হত্যা করা হয়েছে। এত হত্যা, খুন, ধর্ষণ, বোমাবাজি করার পরেও দেখবেন তারা বলবে সারা দুনিয়া তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। পশ্চিমারাতো ইসলামোফোবিয়ার চাষ করছে। যারা বইয়ের জবাব দেয় চাপাতি দিয়ে, যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ এইসব হত্যা দেখা উল্লাসে ফেটে পড়ে, একজন সুস্থ-স্বাভাবিক, জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ মাত্রই এদের দেখে ফোবিয়ায় ভুগবে।

আচ্ছা যাইহোক রুশদির কথায় আবার আসা যাক। আমার ভুল হলে আমাকে সংশোধন করাবেন। নবী মুহাম্মদ একবার মক্কায় জনসমক্ষে প্রার্থনা করার সময় মূর্তি পূজারীদের দেব-দেবীর প্রশংসা করে একটি আয়াত পাঠ করেছিলেন। যাতে মুশরিকরা মুহাম্মাদের সাথে একত্রে সিজদা করে। এই মিল দেখে ইতিমধ্যে হিজরত করা মুসলমানরা মক্কায় ফিরে যেতে শুরু করে। পরে তিনি আয়াতটিকে ভুল বুঝেছিলেন এবং শয়তানের প্ররোচনা বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাফসীর কিতাবে বা বিভিন্ন ইসলামী গ্রন্থে এ ঘটনার বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। আগ্রহীরা নিজেদের জন্য এটি পড়া উচিত। রুশদি খুব কৌশলগত ভাবে এই ঘটনাটিকে তার উপন্যাসে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এটি ইসলামে বিশ্বাসী বেশিরভাগ লোককে তার মৃত্যুদণ্ডের জন্য আকাঙ্ক্ষায় আছে এবং তারা তা বাস্তবায়নেরও চেষ্টা করে।

বিরোধিতা করলে কলম দিয়ে করো, তলোয়ার দিয়ে কেন? নাকি আপনি কলম ব্যবহার করতে জানেন না? আজকের যুগে কলম ছাড়া অস্ত্র বানানো যায় না। যারা কল্লা নামানোর কথা বলেন শুধু কথা বলার অধিকার স্তব্ধ করতে তারা; ফ্যাসিস্ট দের বিরোধিতা করে কোন মুখে? সলমন রুশদির কি কথা বলার অধিকার নেই । যদিও লোকটা সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির সমর্থক। তাই কলম ধর, অস্ত্র নয়, বল নয়, হিংসা নয়। যা খুশি লিখুন, যা খুশি শপথ করুন, অভদ্র ভাষায় শপথ করুন, শুধু বর্ণবাদী আচরণ করবেন না, হিংসা ছড়াবেন না।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কি উচ্চাকাঙ্ক্ষা নীতীশ কুমারের আবার ক্ষমতা দখল !


বিহার রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজ্য। এখানকার লোকেরা তাকে তাদের নেতা হিসাবে বিবেচনা করে বা পছন্দ করে, যার 'অর্ধেক প্র্যাঙ্কস্টার' এবং 'অর্ধেক দাবাং গিরি' রয়েছে। কিন্তু ৭১ বছর বয়সী নীতীশ কুমার আত্মবিশ্বাসী যে তিনি নিজেকে একজন সুদক্ষ রাজনীতিবিদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যদিও তিনি ক্রমাগতভাবে তার রাজনৈতিক অংশীদার পরিবর্তন করে আসছেন। আজ তিনি বিজেপির বদলে পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী তেজস্বী যাদবের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন। আর এসবই করা হচ্ছে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ নজরে।

 পাঁচ বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার বিজেপির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, নীতীশ কুমার দেখিয়েছেন যে তিনি তার দল জনতা দল ইউনাইটেড (জেডিইউ) এবং বিহারকে খুব শক্ত হাতে শাসন করছেন। একই সময়ে, এটাও দেখা গেছে যে বর্তমানে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতার জন্য অন্য কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস এবং তেজস্বী যাদবের সাথে একসাথে সরকার চালাচ্ছিলেন।তেজস্বী যাদব ছিলেন RJD-এর প্রধান এবং কংগ্রেসও সেই জোটে যুক্ত ছিল। কিন্তু তেজস্বী যাদবের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিজেপির দ্বারস্থ হন নীতিশ কুমার।

 নীতীশ কুমার কয়েক দশক ধরে বিজেপির জাতীয় দলেও ছিলেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই গত এক দশক ধরে তার মিত্রদের সম্পর্কে অস্পষ্টতা দেখা যায় । তেজস্বী যাদবের সাথে সমস্ত তিক্ততা সত্ত্বেও, যিনি তাকে "পল্টু চাচা" বলে ডাকতেন, নীতীশ কুমার তার সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলেন এই আশায় যে তিনি সম্ভবত ২২ বছরে অষ্টমবারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেবেন। এবং যদি তিনি সফল হন তবে এটি একটি বিশাল কৃতিত্ব হবে কারণ বিজেপি (৭৪) বা তেজস্বী যাদবের (৮০) তুলনায় তার কম (৪৩) আসন রয়েছে।

তেজস্বী যাদব অনুমতি দিয়েছেন কারণ এটি কেবল তাকে ক্ষমতায় ফিরে আসার সুযোগই দেবে না, বিহারের রাজনীতিতে একটি চমৎকার বর্ণ-সংমিশ্রণ থেকেও উপকৃত হবে। বিহারে আরজেডির ১৪.৪ শতাংশ যাদব ভোট এবং ১৭ শতাংশ মুসলিম ভোট রয়েছে। চরম পশ্চাদপদ ভোটার নীতীশ কুমারের সঙ্গে দাঁড়িয়েছেন। নীতীশ কুমার নিজে একজন কুর্মি কিন্তু বিহারে চার শতাংশ কুর্মি ভোটার তেমন একটা ব্যাপার নয়।তেজস্বী যাদবের সাথে সম্প্রতি জুন মাসে আসাদুদ্দিন ওয়াইসির এআইএমআইএম-এর পাঁচ বিধায়কের মধ্যে চারজন যোগ দিয়েছেন। ওয়াইসি দীর্ঘদিন ধরে তাকে বিজেপির ‘বি-টিম’ বলে অভিযোগ করে আসছেন। এবং এটাও একটা সত্য যে বিহারের সমস্ত আঞ্চলিক দল চায় না ওয়েসির দল বিহারে পা ছড়িয়ে পড়ুক। 

বেশ কিছুদিন ধরেই বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছিলেন নীতীশ কুমারও। তিনি প্রকাশ্যে নতুন অগ্নিপথ আর্মি রিক্রুটমেন্ট স্কিম নিয়ে কটাক্ষ করেন। নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ তখনও এ বিষয়ে শান্ত ছিলেন। একের পর এক অনাস্থা দেখিয়ে ছিলেন নীতীশ কুমার। NITI আয়োগ সভায় যোগ দিতে অস্বীকার করেছিলেন এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজও বয়কট করেছিলেন। প্রাক্তন ঘনিষ্ঠ সহযোগী আরসিপি সিংয়ের সাথে নীতীশ কুমারের প্রকাশ্য ঝগড়া, যাকে রাজ্যসভার আসন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল, আসলে প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং অমিত শাহের সাথে "সেডোও বক্সিং" ছিল।

গত জুন মাসে উদ্ধব ঠাকরের সরকার পতনের পর, মিত্রদের খরচে বিজেপির আধিপত্যের ভয়ে নীতীশ কুমার সোনিয়া গান্ধীকে ডেকেছিলেন। খবরে প্রকাশ যে সোনিয়া গান্ধী নীতীশ কুমারের উদ্বেগের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন এবং যাদব পরিবারকে সহযোগিতা করতে রাজি হয়েছিলেন। লালু যাদবের সঙ্গেও কথা বলেছেন সোনিয়া গান্ধী। লালু যাদবও তাঁর ছেলে তেজস্বীকে অতীত ভুলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তেজস্বীর প্রস্তুত হওয়াতেই সবুজ সংকেত পেয়ে যায় নতুন ‘টিম নীতীশ’। দলগুলোর একই ক্ষমতা বণ্টন থাকবে যেভাবে তারা গতবার একসঙ্গে কাজ করেছিল। আর নীতীশ কুমার থাকবেন মুখ্যমন্ত্রীর আসনে।

নীতীশ কুমার ২০ অক্টোবর ২০২০-এ ভাগলপুরের একটি নির্বাচনী জনসভায় কটূক্তি করেছিলেন যে লালু প্রসাদ টাকা কোথা থেকে আনবেন.. জেল থেকে নাকি জাল নোট ছাপবেন? কাজ নিয়ে 'তু-তু, ম্যায়-ম্যায়'-এর লড়াইয়ে তেজস্বী তখন টুইট করে জবাব দিয়েছিলেন যে আপনি এটা বুঝবেন না। অন্যদিকে, নীতীশের তৎকালীন মিত্র বিজেপি, যে প্রথম দিকে তেজস্বীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মিথ্যা অপবাদ দিয়ে রটিয়েছিল কিন্তু নির্বাচনের মরসুমে নীতীশ কুমারের থেকে আলাদা অবস্থান নিয়ে ১৯ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থানের জন্য একটি নির্বাচনী প্রস্তাব ঘোষণা করে বিজেপি। এর জন্য দেশের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনকে সেই রেজুলেশন লেটারের উন্মোচন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পাটনায় পাঠিয়েছিল, যাতে জনগণ বোঝাতে পারে যে কর্মসংস্থানের পথে অর্থের অভাব নেই। তবে নির্বাচনের পর বিজেপি ও জেডিইউ-র সরকার অক্ষত থাকলেও রাজ্যে যুবকদের কর্মসংস্থানের কোনও অর্থবহ উদ্যোগ হয় নি।

এখন, যখন নীতীশ কুমার এবং বিজেপি আলাদা হয়ে গেছে এবং মনে করা হচ্ছে যে নীতীশ কুমার ২০২৪ সালের জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং বিজেপির বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই শুরু করেছেন, তখন তিনি পুরোনো অবস্থান থেকে ইউ টার্ন মেরে একটা বড় ঘোষণা করেন। ঠিক সেই দিনেই বেছে নেওয়া হয়েছিল, যখন প্রধানমন্ত্রী মোদি ২০৪৭ সালের বিকশিত ভারতের জন্য লাল কেল্লা থেকে 'পঞ্চ প্রাণ' আহ্বান করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি ঐতিহাসিক ভবন থেকে কোনো নতুন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প ঘোষণা করেননি বা মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, কৃষক, দরিদ্র সম্পর্কিত কোনো জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে কথা বলেননি, তবে তিনি পরিবারবাদ এবং দুর্নীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক লড়াইয়ের বার্তা দিয়েছেন। পিএম মোদী এর মাধ্যমে ২০২৪ সালের আখ্যান নির্ধারণের চেষ্টা করেছিলেন।

নীতীশ কুমার সর্বদা বলেন যে তিনি কেবল তার বিবেকের কণ্ঠে পদক্ষেপ নেন। যদিও তার সমালোচকরা তাকে ‘কুরসি কুমার’ বলে উপহাস করে। তবুও এই সত্যটি অস্বীকার করা যায় না যে নীতীশ কুমার এখনও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কোমলতা লালিত করে, কয়েক দশকের পুরনো আকাঙ্ক্ষা বজায় রেখেছেন। বিরোধীদের কাছে তার ফিরে আসা তাকে বুঝতে দেয় যে এখন তিনি সুযোগ পাবেন কারণ অতীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়েছিল যখন তার সহকর্মী মন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জির কাছ থেকে বিপুল অর্থ উদ্ধার করা হয়েছিল

স্বাথী চতুর্বেদীর একটা কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়,যেখান তার কলামে লিখেছিলেন 'নীতীশ কুমারের খুব কাছের এক নেতার সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেন, "নীতীশ বাবু উত্তর ভারতে একজন গ্রহণযোগ্য নেতা। পাওয়ার এবং ব্যানার্জিকে এটা বিশ্বাস করা উচিত"। নতুন মিত্রদের সাথে শপথ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এবং তাই নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষার বাতাসে ভাসছেন। একে সংক্ষেপে নীতীশ কুমার বলে।'

হয়তো নীতীশ কুমারের মেজাজ বদলেছে, অথবা নতুন তরুণ সঙ্গী তেজস্বী যাদবের প্রভাবে তিনি বিহারে ১০ লাখ চাকরিসহ ২০ লাখকে রোজগার দেওয়ার ঘোষণা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, এর মাধ্যমেও নীতীশ লম্বা লাইন টানার চেষ্টা করেছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে প্রধানমন্ত্রী মোদি তার ২ কোটি লোককে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনা করতে চান না, তিনি মিত্রদের প্রতিশ্রুতিরও যত্ন নেন। ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিহার শাসন করা নীতীশ কুমার যদি ২০২৪ সালের আগে ১০ লক্ষ লোককে যদি চাকরি দেন, তবে এটি তার অপরাজেয় প্রান্ত হতে পারে এবং এই রাজনৈতিক কৌশলে নীতীশ ও তেজস্বী উভয়ের জন্যই ' সাপ ও মরবে লাঠিও ভাঙবে না '।


Sunday, August 14, 2022

মরুভূমির বুকে ‘প্রথম মাধ্যাকর্ষণহীন শহর


অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের দিকে যাত্রা শুরু করেছে সৌদি আরব। বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্থাপনা তৈরি করতে যাচ্ছে তাঁরা। এই স্থাপনাটি মূলত 'দ্য মিরর লাইন' LINE বা নিওম NEOM শহর নামেও পরিচিত। যার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি ডলার বা প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার এর উপর। এছাড়া এই প্রকল্পে আইন প্রণয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার। এটি প্রায় ১২০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এবং উপকূলীয়, পর্বত ও মরুভূমি অঞ্চল জুড়ে ৭৫ মাইল সমান্তরালে মিশরের মরুর বুকে অবস্থিত।এর উত্তরদিকে লোহিত সাগর এবং পূর্বদিকে আকবা উসাগরে অবস্থিত।এর ক্ষেত্রফল প্রায় ৩৪ বর্গকিলোমিটার।এর আকৃতি হবে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের কাছাকাছি।এটি দুটি কাচের প্রতিফলিত ভবনের সমন্বয়ে গঠিত। এখানে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ ৫ মিনিটে হেটে একে অপরের সঙ্গে দেখা করতে পারবে।ধারণা করা হচ্ছে,এটি তৈরি করতে সময় লাগবে প্রায় অর্ধ-শতক বা ৫০ বছর এবং এতে ৫০ লক্ষ বা ১ মিলিয়ন মানুষ বসবাস করতে পারবে।

এতে থাকবে ১৬০০ ফুট পর্যন্ত দুটি বিল্ডিং যা পিরামিডের মতো উচ্চাভিলাষী হবে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের এম্পায়ারের চেয়েও বেশি লম্বা হবে।এটির নিচ দিয়ে উচচগতিসম্পন্ন ট্রেন চলাচল করবে যা প্রায় ২০ মিনিটে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছিয়ে দিতে পারবে।মাটি থেকে ১০০০ ফুট উপরে থাকবে খেলার মাঠ।এছাড়া নিয়ম সিটির ট্রান্সপারেন্ট লাইন হতে পারে পৃথিবীর সপ্তাচার্য।এখানে কার্বন-ডাই অক্সাইডের মাত্রা শূণ্য এবং অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক বা নিয়ন্ত্রিত থাকবে।এই পরিকল্পনার মধ্যে আরো একটি যমজ ভবন যা ওয়াকওয়ের মাধ্যমে যুক্ত থাকবে। আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স দ্বারা পরিচালিত ওয়াটার সাপ্লাই ও এনার্জি সম্পূর্ণ নবায়নযোগ্য।এছাড়া এর ভিতরে থাকবে চাষাবাদের ব্যবস্থা।

সৌদি সিংহাসনের উত্তরসূরি মোহাম্মদ বিন সালমান এ পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। এই পরিকল্পনাটি কার্যক্রম ২০২১ সালেই শুরু হয় এবং এটি ২০৩০ ভিশন নামেও পরিচিত।এই পরিকল্পনাটি আল-জাজিরার ওয়াল্ড স্টিফেন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মরফোসিস আর্কিটেক্টর এর প্রতিষ্ঠাতা প্রিটজোকার আর্কিটেক্টর বিজয়ী থম মেইন।ধারণা করা হচ্ছে যে,এই পরিকল্পনা বা প্রকল্পটি সম্পন্ন করতে সফল হলে এটিই হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও আধুনিক স্মার্ট সিটি।

 সৌদি কর্মকর্তারা একে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ফ্লাইং কার সুবিধাসহ শহরটিকে বিশ্বের প্রথম প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। রেস্তোরাঁয় রোবোটিক সেবক থাকবে এবং হলোগ্রাফিক শিক্ষকরা স্কুল/কলেজে পড়াবেন। কৃত্রিম বৃষ্টি হবে এমনকি রাতের আলোর জন্য চাঁদও তার নিজস্ব হবে। এছাড়া রোবোটিক ডাইনোসর দিয়ে জুরাসিক পার্কও তৈরি করা হবে। 

ওয়েস্টার্ন স্পোর্টস সিটি এটি হবে বিশ্বের প্রথম ক্রীড়া শহর যা নিওম প্রকল্পের অধীনে ৩৭ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হবে, যেখানে ইসলামিক আইন প্রযোজ্য হবে না। স্পোর্টস সিটিতে আগত পর্যটকদের জন্য পশ্চিমা দেশ অনুযায়ী প্রণীত নিয়ম-কানুন প্রযোজ্য হবে। ক্রীড়া অনুরাগী, মহিলা এবং শ্রমিকদের প্রতি থাকবে না কোন শরিয়া বিধিনিষেধ এবং পশ্চিমা দেশগুলির আদলে অবাধে চলাফেরা করতে পারবে। স্পোর্টস সিটি সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন ২০৩০ এর অংশ। এর আওতায় সৌদি আরবকে ক্রীড়া ইভেন্টের বিশ্ব কেন্দ্রে পরিণত করা হবে।

প্রকল্পের প্রথম ধাপ, যা ২০১৮ সালে শুরু হয়েছিল, ২০২৫ সালে শেষ হবে। সৌদি আরব বলেছে যে তারা কোনো মূল্যে গেমস থেকে রয়্যালটির হার কমিয়ে দেবে না, এমনকি তাদের বৈশ্বিক মঞ্চে বিরোধিতা করলেও। এর লক্ষ্য খুব স্পষ্ট - পর্যটন শিল্পকে অবশ্যই তার রাজস্বের ১০ শতাংশ উৎপন্ন করতে হবে। খেলাধুলা সংক্রান্ত অনেক বড় ইভেন্ট আয়োজনের এখন পর্যন্ত ব্যবস্থা তৈরি করেছে সৌদি আরব। গত শনিবার, রিয়াদে অ্যান্টোইন জোশুয়া এবং অ্যান্ডি রুজ জুনিয়রের মধ্যে ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট বক্সিং প্রতিযোগিতা হয়েছিল। এই ম্যাচের প্রাইজমানি ৪৭২০ কোটি টাকা। আগামী বছর বক্সিং, ফুটবল, ফর্মুলা ওয়ান, সাইক্লিং, ঘোড়দৌড়সহ অনেক খেলার চ্যাম্পিয়নশিপ হবে বড় পরিসরে, যাতে থাকবে কোটি কোটি টাকার পুরস্কার।

 এদিকে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা খেলার মাঠে ফিরে সৌদি আরবের নতুন ভূমিকার জন্য সমালোচনা করেছে। যতদূর স্প্যানিশ রাষ্ট্র সম্প্রচারক RTVE. আগামী মাসে জেদ্দায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া স্প্যানিশ সুপার কাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে অস্বীকার করেছে।

 তহবিল কোথা থেকে আসবে?
 নিওম সিটির প্রথম ধাপের কাজ ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এ জন্য সময়মতো তহবিল ব্যবস্থা বড় লক্ষ্য। প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের তার দেশকে প্রযুক্তি হাব এবং ক্রীড়া নগরীতে গড়ে তোলার লক্ষ্যের অংশ হিসেবে তেল কোম্পানি শেয়ার বিক্রি করে তহবিলের ব্যবস্থা করা হবে। শেয়ার বিক্রিতে বিলম্ব হলে কাজ আটকে যেতে পারে। এ ছাড়া সময়ে সময়ে সৌদি আরবে ক্রীড়া অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রি, প্রতিবছর হজযাত্রী তথা পর্যটনের প্রচারের মাধ্যমে তহবিলের ব্যবস্থা করা হবে।

সৌদি আরব হলো দ্বিতীয় ইসলামি দেশ যারা তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন করেছে। এর আগে, তেলের উপর নির্ভরতা কমিয়ে কয়েক দশক আগে দুবাই পর্যটন শিল্পকে বাড়িয়েছিল। এক সময় এটি শুধুমাত্র তেল শিল্পের কারণে স্বীকৃত ছিল, কিন্তু এখন তা নেই। তেল বাণিজ্য কেবল তাদের অর্থনীতির প্রধান উৎস ছিল না, তবে পর্যটন, রিয়েল এস্টেট এবং আর্থিক পরিষেবাগুলিও আয়ের প্রধান উৎস হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। শরিয়া আইনের আওতায় থাকা দেশে এইধরণের অভিনবত্ব কম বড় কথা নয়।

তবে যাইহোক সৌদি তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পথে অগ্রসর হতে চলেছে। শহরটির নাম যেহেতু NIOM বা ‘নিয়ম’। সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন হতে চলছেন এই শহরের বোর্ড অব ডাইরেক্টর্স-এর প্রধান। জলবায়ু বদল ও বর্তমান নগরজীবনের সমস্যা মোকাবিলাতে এই শহর যুগান্তকারী হতে চলেছে বলেও দাবি করেন সলমন। এমনই একটি শহর তাঁরা নির্মাণ করতে চলেছেন বলে দাবি সৌদি আরবের। তাদের দাবি, এই শহরটি ‘পৃথিবীর প্রথম মাধ্যাকর্ষণহীন শহর’ হবে, ‘থাকবে না কোনও দূষণ, চলবে না কোনও গাড়িও’।

ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন নেবে


ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism) শব্দটির বিস্তৃত অর্থ রয়েছে। যদি উইকিপিডিয়া তে দেখা যায় তবে ধর্মনিরপেক্ষবাদ বলতে সাধারণত রাষ্ট্র আর ধর্মকে পৃথকরূপে প্রকাশ করাকে বোঝায়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে ধর্ম বা ধর্মীয় রীতিনীতির বাইরে থেকে পরিচালনা করাকে বোঝানো হয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আইন কোন নির্দিষ্ট ধর্মের উপর নির্ভরশীল থাকেনা।

তাসলিমা নাসরিন একবার লিখেছিলেন 'বোরখাওয়ালীরা প্রায়ই এম্পাওয়ার শব্দটা ব্যবহার করে থাকে। তারা বলতে চায় তারা শক্তিময়ী, ক্ষমতাময়ী, স্বাধীন, এবং স্বনির্ভর। নিজের চেহারাটাই লুকিয়ে রাখতে হয় আর স্বাধীনতার বড়াই। কেন তারা শরীর আড়াল করে? কারণ তারা মনে করে পুরুষেরা সব কামুক, বর্বর,যৌন নির্যাতক, ধর্ষক; তাদের চুল আর ত্বক দেখা মাত্র পুরুষেরা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, এর ফলে তারা এঁটো হয়ে যাবে। এঁটো হয়ে গেলে মুশকিল, কারণ স্বামী ফ্রেশ খাবে, এঁটো খাবে না। বোরখাওয়ালীরা নিজেদের খাদ্যবস্তু বলে বিশ্বাস করে।

সৌদি আরবের পাশাপাশি ইরান ও আফগানিস্তান হল বিশ্বের অন্য দুটি সবচেয়ে কট্টরপন্থী মুসলিম দেশ। ইরান ও আফগানিস্তানের মুসলিম নারীদের সাথে মধ্যযুগের মতোই উভয় দেশের কট্টরপন্থী ইসলামী সরকার এখনও আচরণ করে। আয়াতুল্লাহ খামেনির নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিদ্রোহের পর ইরানের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। কিন্তু দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

 ভারতের কিছু কট্টরপন্থী মুসলিমরা যখন বিভিন্ন রাজ্যে হিজাব ও বোরকার সমর্থনে প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের মতো কট্টর মুসলিম দেশে, হাজার হাজার প্রগতিশীল নারী হিজাবের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামছে। গত ১২ জুলাই ইরান সরকারিভাবে জাতীয় হিজাব ও বিনয় দিবস (National Hijab and Modesty Day) উদযাপন করেছে। কিন্তু উক্ত এই দিনে হাজার হাজার ইরানি নারী তাদের হিজাব থেকে মুক্তির দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনের কার্যসূচী রূপায়ণ করে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানে নারীদের হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করা হয়।

আফগানিস্তান বর্তমানে একটি কট্টরপন্থী ইসলামিক রাষ্ট্র। তালেবান, যাদের সভ্যতা ও মানবতার কোনো বোধগম্যতা নেই, তারা ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট থেকে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা কে তাড়িয়ে সেখানে গদি সামলায়। তালেবান সরকার আফগানিস্তানে গত মার্চ মাস থেকে ষষ্ঠ শ্রেণীর পর মেয়েদের স্কুল বন্ধ করে দেয় এবং মহিলা কর্মচারীদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কট্টরপন্থী তালেবানরা ১৯ জুলাই আফগান মহিলা সরকারী কর্মচারীদের একটি নির্দেশিকা জারি করে যেখানে মহিলারা তাদের চাকরি নিজের পরিবর্তে পরিবারের একজন পুরুষ সদস্যের কাছে ছেড়ে দিতে হবে। তালেবানদের দৃষ্টিতে, মেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা এবং পুরুষদের সাথে কাজ করা ইসলাম বিরোধী।

 কট্টরপন্থী তালেবান এবং ইরানের শাসক গোষ্ঠী মহিলাদের জন্য হিজাব এবং বোরকা পরা বাধ্যতামূলক করেছে। কিন্তু, একই সময়ে, তুরস্ক এবং আর্মেনিয়ার মতো মুসলিম প্রধান দেশ গুলিতে মুসলিম মহিলাদের জন্য হিজাব এবং বোরকা বাধ্যতামূলক নয়, যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দিক দিয়ে সৌদি আরব, ইরান এবং আফগানিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

ভারত এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃত। কালের পরিক্রমায় সেই ভারতই এখন তার ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক চেতনা হারিয়ে ধর্মীয় মৌলবাদের বিষবৃক্ষে পরিণত হতে চলছে। ভারতীয় ‘সেকুলারিজম’ আসলে সংবিধানের কাঠামো নির্মাণে উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়, এ হল সেই দর্শন যা সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বহু মত-বহু পথের সম্মিলন ও সহাবস্থানের ঐতিহ্যকে সম্মানের সাথে অক্ষুণ্ন রাখে।

ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। তাইতো সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের (secularism) উল্লেখ আছে। যদিও সংবিধানে ‘সেকুলার’ শব্দটি যোগ হয়েছে অনেক পরে, ১৯৭৬ সালে সংবিধানের ৪২তম সংশোধনীতে। একদিকে যেমন আমেরিকান, রাশিয়ান ও চীনারা প্রগতিশীল চিন্তাধারার মাধ্যমে মহাকাশ গবেষণা তথা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখায় অবদান রাখছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে কট্টরপন্থী তালেবানরা তাদের দেশকে Islamic Sminate of Afghanistan হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করাচ্ছে এবং ইরান তাদের দেশকে Islamic Republic of Iran হিসেবে। সৌদি আরব, ইরান, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের মত কট্টরপন্থী রাষ্ট্রগুলির বিপরীতে ভারতকে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার দায়িত্ব সমস্ত আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের। তবেই তো ভারত আবার জগৎসভায় 'বিশ্বগুরু' খেতাব নিয়ে শ্রেষ্ঠ আসন নেবে।

আমরা করবো জয় নিশ্চয়


ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথভূক্ত সদস্য দেশসমূহের জন্য এটি একটি আন্তর্জাতিক বহু-ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। লন্ডনে ১৯৩৪ সালে ও ম্যানচেস্টারে ২০০২ সালের পর, ইংল্যান্ড এই নিয়ে তৃতীয়বারের জন্য গেমসটি আয়োজন করেছে এবং ২০১৪ সালের পর যুক্তরাজ্য সপ্তমবারের জন্য আয়োজন করেছে। এবারের খেলায় অংশগ্রহণ করে ৭২টি দেশ।

কমনওয়েলথ গেমসে এটি ভারতের অষ্টাদশতম উপস্থিতি। ১০৬ জন পুরুষ এবং ১০৫ জন মহিলা দ্বারা গঠিত ২১১ সদস্যের একটি দল ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভারতের পতাকাবাহক হিসেবে মনোনীত হন মনপ্রীত সিং এবং পি ভি সিন্ধু। ১৪ বছর ব্যসী স্কোয়াশ খেলোয়াড় অনাহত সিং ভারতের সর্বকনিষ্ঠ এবং ৪৫ বছর বয়সী লন বোলার সুনীল বাহাদুর সর্ব জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি ছিলেন। হোস্ট নেশন হিসেবে ২০১০ সালে ভারতও গেমসের আয়োজন করেছিল। এটি সর্বকালের কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের ক্রীড়াবিদদের সাথে 38 স্বর্ণ, 27 রৌপ্য এবং 36 টি ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিল।

কমনওয়েলথ গেমস 2022-এ ভারত মোট 61টি (22 স্বর্ণ, 16 রৌপ্য এবং 23 ব্রোঞ্জ) পদক নিয়ে মঞ্চে 4 তম স্থান অর্জন করে। সদ্য সমাপ্ত বার্মিংহাম কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের চতুর্থবার সেরা পারফরম্যান্স করেছে। যা কমনওয়েলথ গেমস 2006-এর সাথে সংযুক্ত স্বর্ণপদক জিতেছে।

 বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমস 2022-এ, অস্ট্রেলিয়া 178টি পদক (67 স্বর্ণ, 57 রৌপ্য এবং 54 ব্রোঞ্জ), ইংল্যান্ড 176 পদক (57 স্বর্ণ, 66 রৌপ্য এবং 53 ব্রোঞ্জ), কানাডা 92টি পদক (26 স্বর্ণ, 32টি রৌপ্য এবং 34 ব্রোঞ্জ) পদকে ভারতকে পিছনে ফেলেছে।

 ভারতের কমনওয়েলথ গেমস 2022 স্পোর্ট-ওয়াইজ পদকগুলি বিভক্ত করা হলঃ কুস্তি: 12টি পদক (6টি স্বর্ণ, 1টি রৌপ্য এবং 5টি ব্রোঞ্জ) টেবিল টেনিস: 7টি পদক (4টি স্বর্ণ, 1টি রৌপ্য এবং 2টি ব্রোঞ্জ) ভারোত্তোলন: 10টি পদক (3টি স্বর্ণ, 3টি রৌপ্য এবং 4টি ব্রোঞ্জ) বক্সিং: 7টি পদক (3টি স্বর্ণ, 1টি রৌপ্য এবং 3টি ব্রোঞ্জ) ব্যাডমিন্টন: 6টি পদক (3টি স্বর্ণ, 1টি রৌপ্য এবং 2টি ব্রোঞ্জ) অ্যাথলেটিক্স: 8টি পদক (1টি স্বর্ণ, 4টি রৌপ্য এবং 3টি ব্রোঞ্জ) লন বোল: 2টি পদক (1টি স্বর্ণ ও 1টি রৌপ্য) প্যারা পাওয়ারলিফটিং: 1 পদক (1 স্বর্ণ) জুডো: 3টি পদক (2টি রৌপ্য এবং 1টি ব্রোঞ্জ) হকি: 2টি পদক (1টি রৌপ্য এবং 1টি ব্রোঞ্জ) ক্রিকেট: 1টি পদক (1টি রৌপ্য) স্কোয়াশ: 2টি পদক (2টি ব্রোঞ্জ)

উল্লেখ করা উচিত যে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমস 2010-এ ভারতের সর্বকালের সেরা পারফরম্যান্স। CWG 2010-এ, ভারত 38টি স্বর্ণ সহ 101টি পদক জিতেছিল। জিতে থাকা সামগ্রিক পদকগুলির পরিপ্রেক্ষিতে, CWG 2022 বার্মিংহাম CWG 2010 নয়াদিল্লি (101 পদক), CWG 2002 ম্যানচেস্টার (69 পদক), CWG গোল্ড কোস্ট 2018 (66 পদক), এবং CWG 2014 Glasmedals-এর পরে ভারতের দ্বারা 5তম সেরা পারফর্মেন্স।

কমনওয়েলথ খেতাব-র গণ্ডীতে নিজেকে আটকে না রেখে, নিজস্ব ইভেন্টে কয়েক ধাপ এগিয়ে ওলিম্পিকে দেশকে আরও বেশি উপহার দেওয়া এটাই হোক মূল লক্ষ্য। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তিতে আমাদের ছেলে মেয়ারা সমস্ত দেশবাসীকে যে উপহার দিয়েছে তার সত্যিই প্রশংসনীয়। শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন - র পাশাপাশি আশারাখি প্যারিস ২০২৪ এ আবারও প্রমাণিত হোক 'আমরা করবো জয় নিশ্চয়'। 

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...