Tuesday, July 19, 2022

চন্দ্রাভিযান : মানুষ উড়ালো বিজয় পতাকা

"That's one small step for a man, one gaint leap for mankind "

আজ থেকে ৫২ বছর আগে, এই দিনেই, ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই ‘স্যাটার্ন ৫’ রকেটে চেপে চাঁদে পাড়ি দিয়েছিল ‘অ্যাপোলো ১১’। আজ সেই ঐতিহাসিক দিন।প্রথম চাঁদের মাটিতে পা পড়ল মানবের। মানব সমাজের প্রতিনিধি হিসাবে পা দিলেন নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন। চন্দ্র পৃষ্ঠের রুক্ষ ভূমিতে উড়ল মানুষের বিজয় পতাকা। মানবসভ্যতার ইতিহাসে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। সফল হলো নাসার চন্দ্রাভিযান। তার পর থেকে একাধিক বার চাঁদে পাড়ি দিয়েছে মানুষ। অ্যাপোলো ১১-র ৫২ বছর পূর্তি উপলক্ষে একবার দেখে নেওয়া যাক সে দিনের সেই জার্নিটা।

ফ্লরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ হয়েছিল অ্যাপোলো ১১-এর। তিন জন মার্কিন মহাকাশচারী সে দিন চাঁদের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। নীল আর্মস্ট্রং, এডুইন (বাজ) অলড্রিন এবং মাইকেল কলিন‌্স। চাঁদের মাটিতে পা রেখে বদলে দিয়েছিলেন মানবসভ্যতার ইতিহাস। ১৬ জুলাই রওনা দিয়েছিলেন তাঁরা। চাঁদের মাটিতে পৌঁছতে তাঁদের সময় লেগেছিল ৪ দিন। অর্থাৎ ২০ জুলাই চাঁদের কক্ষপথে প্রদক্ষিণের পর চাঁদের মাটিতে নামেন তিন মহাকাশচারী।

সে দিন চাঁদের মাটিতে প্রথম পা রাখেন মার্কিন মহাকাশচারী নীল আর্মস্ট্রং। তার পরে নামেন এডুইন অলড্রিন। সব শেষে নামেন পাইলট মাইকেল কলিন‌্স। চাঁদে মানুষের সেই প্রথম পদার্পণের ঘটনা বিশ্বজুড়ে টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল সে দিন। একটি ব্যাগে নমুনা হিসেবে ২১.৫ কিলোগ্রাম চাঁদের মাটি এবং পাথর ভরে ফিরে এসেছিলেন তিন মহাকাশচারী। পরে জানা গিয়েছিল, সেই ব্যাগটি হারিয়ে ফেলেছিল নাসা। তবে ২০১৩ সালে সেটির খোঁজ মেলে। তবে ২০১২ সালে মাত্র ৯৯৫ ডলার অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় ৭৫ হাজার টাকার বিনিময়ে এক ব্যক্তিকে ওই ব্যাগটি বিক্রি করে দিয়েছিল মার্কিন মার্শাল বিভাগ।

যে রকেটে চেপে উড়ে ছিল অ্যাপোলো ১১, তার উচ্চতা ছিল ৩৬৪ ফুট। ওজন ছিল ২ লক্ষ ৩৯ হাজার ৭২৫ কিলোগ্রাম। আর অ্যাপোলো ১১-র ওজন ছিল ৪৫ হাজার ৭০২ কিলোগ্রাম। পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপণ এবং ফের পৃথিবীতে অবতরণ— এই মিশনটা সম্পূর্ণ হতে মোট সময় লেগেছিল ৮ দিন ৩ ঘণ্টা এবং ১৮ মিনিট।

তথ্য সূত্র : উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।

Sunday, July 17, 2022

আবার সিংহ জেগেছে নরসিংহ রূপে


"সিংহদের আক্রমনাত্মক হওয়ার কথা ছিল কিন্তু এই সিংহরা (অশোকের) আক্রমণাত্মক নয়। এই সিংহ সৌম্য,শান্তি ও সুরক্ষার বার্তা দেয়। নতুন সিংহের মধ্যে দাঁত বেশি দেখা যায় যা পুরোনো সিংহদের ক্ষেত্রে দেখা যায় না।"
--- ইতিহাসবিদ হারবনস

প্রথম কথা হলো সম্রাট অশোকের অশোকস্তম্ভের আদি রূপ শান্তির বার্তা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ শাসন ব্যবস্থার প্রতীক ছিল। দাঁত দেখানো "আক্রমনাত্মকতার" একটি শক্তিশালী চিহ্ন যা "আক্রমনাত্মক জাতীয়তাবাদ" দেখায় যা চিত্রিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি অসচেতনভাবে করা হয়নি বা শৈল্পিক স্বাধীনতা নয়।প্রত্যেক শিল্পীদের স্বাধীনতা আছে কিন্তু শিল্পের অংশটি যে মৌলিক বার্তা দিতে চায় তা তারা পরিবর্তন করতে পারে না।

 দাঁতগুলি এখানে বিশেষভাবে আক্রমনাত্মক। এটি মৌলিক প্রকৃতির পরিবর্তন করে। পরিবর্তনগুলি একটি অর্থ বহন করে। এই সরকার কী ধরনের বার্তা দিতে চাইছে? আপনি কি ভারতকে একটি শান্তিপূর্ণ দেশ থেকে একটি আক্রমণাত্মক দেশে রূপান্তরিত করছেন? সম্রাট অশোক অহিংস হন তবে সিংহের বদলে গোমাতার মূর্তি স্থাপন করে নজির গড়তে পারতেন! কিন্তু এই সিংহ তো নিরিহ শান্ত স্বভাবের ছিল। তাঁর সিংহ অনাক্রমণের প্রতিক বলা যায়।

কিন্তু আমাদের নতুন সিংহ গর্জনরত অবস্থায়। যে সবকিছু গোগ্রাসে গিলে ফেলতে চায়। সে খুব ক্ষুধার্ত। শিকার ধরতে একদম সকল প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে। ঝোপ বোঝে কোপ মারবে। কিন্তু পুরোনো অশোকস্তম্ভে লিখা ছিল সম্রাট অশোকের হিংসা না করার অঙ্গীকার আর পালি ভাষায় ডিক্লেয়ারেশন।

ইতিহাসের প্রতিটা সময়েই আমরা দেখেছি তার সময়কার শাষকের চিন্তাধারা বিভিন্ন স্থাপত্য শিল্পে প্রকাশ পায়।অতিতের অশোক স্তম্ভও বুদ্ধের চিন্তা ও চরিত্র প্রকাশ পেয়েছিল। ঠিক একইভাবে বর্তমানের অশোক স্তম্ভ তার এই সময়ের বাস্তব রূপ চিত্রিত করেছে।

যেখানে প্রায় ৯৫কোটি লোক পুষ্টিকর খাবার খেতে পায় না সেখানে জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে সংসদ ভবনে আবার নতুন সংস্করণে অশোক স্তম্ভ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তার হয়ত আমার ক্ষুদ্র মগজে ঢুকছে না। নরখাদক এই সিংহ মূর্তি স্থাপন করে দেশের মধ্যে কি বার্তা বহন করবে এটাই দেখার এখন সময়। কথা হলো এই সিংহের স্বভাব গর্জন ছেড়ে মিয়াঁও মিয়াঁও করবে না তো?

Tuesday, July 12, 2022

সাত নম্বরে কে আসছে?


‘আমার সারা জীবনে এভাবে পুরো দেশকে একজন ব্যর্থ নেতাকে হটানোর একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এক হতে দেখিনি। সরকারি বাসভবনের করুণ পরিণতিই আপনার ভবিষ্যৎ বলে দিচ্ছে। শান্তিপূর্ণ পথে বিদায় হোন। গোতা আজই চলে যান।’

‘আমি সব সময় শ্রীলঙ্কার মানুষের সঙ্গে আছি। তাদের এ বিজয় উৎযাপন করব শিগগিরই। কোনো নিয়ম লঙ্ঘন না করে এই বিক্ষোভ অব্যাহত থাকুক। অবরোধ শেষ হয়েছে। দুর্গের পতন হয়েছে। মানুষের ক্ষমতার জয় হয়েছে। এখনই পদত্যাগ করে সম্মানজনকভাবে বিদায় নিন।’ 

-শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক সনৎ জয়সুরিয়া।

কলম্বোতে গণ অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি রাজাপাকসে আগামী ১৪ জুলাই আনুষ্ঠানিক ভাবে পদত্যাগ করবে। হাজার হাজার পুরুষ, মহিলা এবং শিশু প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় প্রাসাদে সারিবদ্ধ হয়ে উপরের তলায় রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসের চেয়ারে বসার জন্য ঢেলে দিচ্ছিল যখন শিশু এবং পিতামাতারা নীচে একটি গ্র্যান্ড পিয়ানো বাজছিল।রাজপ্রাসাদের মনোমুগ্ধকর "গর্ডন গার্ডেন" পার্কে, হাস্যোজ্জ্বল পরিবারগুলি পিকনিকের মধ্যাহ্নভোজ উপভোগ করেছিল, 'বেলা চাও'ছিল মুখে মুখে। আর বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সেফরোন পোশাকে মার্বেল মেঝে এবং কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বিস্মিত হয়েছিল। নেতারা যখন এমন বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন, তখন তাদের কোন ধারণা থাকে না যে সাধারণরা ভবিষ্যতে কীভাবে পরিচালনা করতে পারে?

ঠিক যেমনটা আমাদের মতো। প্রায় যেভাবে বলা হয়ে থাকে 'হিন্দু খাতরে মে হ্যায়'। দেশটিতে প্রায় ৭৫% সিংহলীরা থাকলেও তারা দশকের পর দশক থেকে বিপন্নতার কৃত্রিম ধারণাকে সত্যরূপে দেখিয়ে একটা ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। তার ফলস্বরূপ তামিল ও মুসলিমরা বৈষম্য ও হিংসার চরম শিকার হয়। বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে জানা যায় ২০১৩ সাল থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে চলে আসছে চরম অমানুষিক নির্যাতন। কখনো বা বোরখা-হিজাব, কখনো বা মসজিদ মাদ্রাসাগুলোতে আক্রমণ করা হয়েছে। 

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিয়ে সংখ্যালঘু বিদ্বেষী কার্যকলাপের মাধ্যমে সিংহলী উগ্রজাতিয়তাবাদী রাজনীতির তীব্র অনুশীলন করা হয়। এর একমাত্র কারণ ছিল ধর্মীয় ও জাতিগত মেরুকরণ ধরিয়ে অর্থনৈতিক সংকট থেকে জনগণের নজর ঘুরিয়ে রাখা। উদার অর্থনীতির নামে একটি কল্যানকামী রাষ্ট্রের যেসব উদাহরণ তার তছনছ করে দেওয়া হয়। রাজাপক্ষরা ভেবেছিল এই ধর্মীয় মেরুকরণ ধরিয়ে রাখতে পারলেই রাজগদী আর হারাতে হবে না। তবেই কেল্লাফতে। কিন্তু ক্ষুধার আগুন যখন দাউদাউ করে জ্বলে তখন কি আর ধর্মীয় মেরুকরণ আর উদার অর্থনৈতিক বুলডজার চালানো সম্ভব! জনগণ গলার গামছা ধরে রাজপথে নামতে আর কি তোয়াক্কা করে? তবে যেযাই বলো ভাই, সারে যাহা সে আচ্ছা হিন্দুস্তান হামারা'। হ্যাঁ, এটা সত্য যে কোনভাবেই ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতি বা ধর্মীয় শুড়শুড়ি-উন্মাদনায় একটা কল্যাণকামী রাষ্ট্র কোনভাবেই তৈরি হতে পারে না।

এখন কথা হলো আমাদের ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার ততটা ফারাক নেই। দূরত্ব ও বড়জোর ৫৫ কিলোমিটার জলপথে। তারসাথে ধর্মীয় মেরুকরণ ও উদার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও আমাদের রয়েছে। চোখের পলকে এশিয়া মহাদেশের আরো ক্লিয়ার করে বললে দক্ষিণ এশিয়ার ৮ টির মধ্যে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল, মালদ্বীপ, মায়ানমার, ভুটান এবং শ্রীলঙ্কার সহ ৬টি দেশের সরকার পরিবর্তন হলো। 

Who is Next ?

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=428927585914300&id=100063911868609

Friday, July 8, 2022

ধর্মান্ধতা মানুষের অবনতির পথ


ধর্মীয় আচার ব্যাবহার বা ধর্মের প্রতি আবেগ অনুভূতি এই উপমহাদেশে খুব বেশি। আমরা যারা এই উপমহাদেশের বাসিন্দা তাই অন্যান্য দেশের মানুষ যতই তাদের জীবন ধারণের মানদণ্ড উন্নত হোক না কেন তাতে কিছুই যায় আসে না। ধর্মের মোহ মানুষের চিন্তা জগতকে কতোটা নির্মমভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তার দৃষ্টান্ত বিশ্ব ইতিহাসে বিরল নয়। মানুষের চিন্তায় ধর্মের মতো একটা কাল্পনিক এবং তাদের দৈনন্দিন জীবন জীবিকার সাথে প্রকৃতিগতভাবে সম্পর্কহীন বিষয়টা কিভাবে এতো বিপূলভাবে সম্পৃক্ত, সমৃদ্ধ ও বিকশিত হতে পারলো, সেই প্রশ্ন আমাদের অনেকেরই। অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে এই অজুহাতে উগ্র ধর্মবাদিরা নিজ ধর্মের সমালোচকদের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাইছে, শুধু তাই নয়, তাদের অস্তিত্বও নিশ্চিহ্ন করতে চাইছে। ধর্মীয় আদর্শ অন্য সকল মতাদর্শকে পিছনে ফেলেছে শুধু নয়, জ্বালাও, পোড়াও, ভাঙচুর, ফতোয়া, ফাঁসির দাবি, গ্রেফতার, খুন, কিছুই থামছে না। প্রকৃতপক্ষে প্রতিনিয়ত তাদের হত্যা করে চলেছে। 

বিজ্ঞানের এই বিপূল অগ্রগতির যুগে মানুষের চিন্তা যেখানে যুক্তিবাদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল, সেটা না হয়ে বরং তার উল্টোটাই ঘটে চলেছে অহরহ। কয়েক হাজার বছরের এই ধর্মীয় মতাদর্শ তার মৌলিক নীতির কোনো পরিবর্তন না ঘটিয়েও কিভাবে কাল্পনিক সর্বশক্তিমানের অস্তিত্ব মানুষের মনে যুগ যুগ ধরে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে এবং বতর্মান সময়েও নিজের প্রাসঙ্গিকতার বিস্তার ঘটাচ্ছে, সে আলোচনা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি অন্যান্য মতাদর্শ নিরলস চর্চা করেও সেই সাফল্য অর্জন করতে ব্যর্থ।

প্রথমে মুসলমানদের নবী বিতর্ককে সামনে রেখে কিছু কথা বলতে চাই। যেভাবে সারা ভারতবর্ষের মুসলিম সমাজ সহ তামাম মুসলিম বিশ্ব ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের প্রিয় নবীজীর অসম্মানের প্রতিবাদ করছে এবং সেই অপরাধের প্রতিবিধান চাইছে তা দেখে আমার মনে হয়েছে যদি জীবন জীবিকার সাথে সম্পর্কযুক্ত বিষয়গুলো নিয়ে মানুষ এভাবে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ সংগঠিত করতো, তবে দেশে হয়তো বিপ্লবের জমি তৈরি হয়ে যেতো। যে বিপ্লবের স্বপ্ন প্রতিটি সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ নিজেদের মনে লালন করে।

আরেক টা ঘটনা ঘটেছে। একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম কালীর পোস্টার যেটিতে হিন্দু দেবী কালীকে সিগারেট খাওয়ার চিত্র দেখানো হয়েছে । আবার এলজিবিটি ফ্ল্যাগ তার হাতে দেখা গেছে। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ক্ষোভ এটাকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্য নিন্দিত আখ্যা দিচ্ছে। যে মহাকালীকে উপহাস করা হচ্ছে এবং হেয় করা হচ্ছে। তারা চিত্রনায়িকা লীনা মণিমেকলাইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

 সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক প্রবণতা যেটা বতর্মান ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের কাছে চ্যালেঞ্জ, সেটা হোলো মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে ধর্ম নিয়ে লড়িয়ে দেওয়া। মানুষের পরিচয় ধর্ম দ্বারা নির্ধারিত হওয়া। আমি মানুষ, সেটার থেকেও বড় আমি কোন ধর্মের লোক।এই বিভাজন ধ্বংস করছে মানবিক ঐক্যকে। ধ্বংস করছে মানুষের সম্মিলিত ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদী শক্তিকে। যেটা রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য। রাষ্ট্র চায় তার সকল শ্রম শক্তির অনৈক্য। কারণ শ্রম শক্তির ঐক্যবদ্ধ রূপকে রাষ্ট্র ভয়ের চোখে দেখে। এই কারণেই পরিকল্পিতভাবে নবি বিতর্কের সৃষ্টি। নতুন একটা ইস্যু চাই। সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত ক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, সাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্নীতি প্রভূতি বিষয় এবারের লোকসভা নির্বাচনের ইস্যু ছিল। সরকারের কাছে কোনো উত্তর ছিল না। তাই মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে হবে। তারই ফল এই নবী বিতর্ক। সারা দেশ উত্তাল। সরকার তার উদ্দেশ্যে সফল। একদিকে হিন্দু সেন্টিমেন্টকে ভিত্তি করে বিজেপি হিন্দু ভোট ঐক্যবদ্ধ করতে চাইছে। অপরদিকে আমাদের রাজ্য মুসলিম সেন্টিমেন্ট কাজে লাগিয়ে মুসলমানদের পাশে দাঁড়াতে চাইছে। এই খেলা সাধারণ হিন্দু বা মুসলমানরা ধরতে পারছেন না। মেতে উঠেছে পৈশাচিকতায়। একটা চরম অব্যবস্থা। এভাবেই সব চলবে। চলছেও। মোহাম্মদ রিয়াজ আর গাউস মোহাম্মদ উদয়পুরের কানাইয়া লালের ঘটনাটি ধরে নিন।

আমরা সত্যি অবাক হই এটা ভেবে যে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানান ব্যাথা, যন্ত্রণা, হতাশা-যা আমরা প্রতিদিন প্রতি মুহুর্তে অনুভব করে চলেছি, তার জন্য কে দায়ী, কেন দায়ী কিভাবে তার সমাধান - এই সরল প্রশ্নগুলো আমাদের মনে স্থান পায়না। অথবা স্থান পেলেও তার সত্যিকারের অভিমুখ নির্বাচন করতে আমরা প্রায়শই ব্যর্থ হই। ফলে ভুল অভিমুখের কারণে আমরা দিকভ্রষ্ট হই। চক্রাকারে আবর্তিত হতে হতে পূর্বের জায়গায় ফিরে আসি। আমরা বিশ্বাস করি এইসকল যন্ত্রণার কোনো উপশম নেই। আমরা বিশ্বাস করি এ সবই আমাদের কর্মফল। আমরা বিশ্বাস করি এ সব পূর্ব নির্ধারিত। আমরা বিশ্বাস করি একমাত্র ঈশ্বরই পারেন এই যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে। আসলে বিষয়টা সাধারণভাবে দেখলে এমন সরল সমীকরণ ছাড়া অন্য কিছু আসবে না। কারণ কোনো কিছুর উপর বিশ্বাস স্থাপন তখনই সম্ভব, যখন সেই বিষয়ের যুক্তিসঙ্গত ইতিবাচক ফলাফল আমরা প্রাত্যহিক জীবন দিয়ে উপলব্ধি করতে পারি এবং সেটা জীবনের মানোন্নয়নে প্রয়োগ করতে পারি। ধর্মের ক্ষেত্রে বিশ্বাস অর্জনের এই নিয়ম খাটেনা। তবুও কেন ধর্ম মানুষের এই বিশ্বাস অর্জন করতে সমর্থ হোলো? এমনটা নয় যে শুধুমাত্র বিজ্ঞান বিরোধী মানুষরাই ধর্মে আস্থা রাখেন। অনেক বিজ্ঞানীকেও ধর্মের উপর প্রবল আস্থা রাখতে দেখা গেছে। কারন এখানে বিবিধ। কিছু মানুষ আছেন, যারা নিজের দক্ষতার উপর আস্থাহীন। আত্মবিশ্বাসের অভাবজনিত কারণে জীবনের সফলতার জন্য তারা কোনো না কোনো অবলম্বন খোঁজেন। আধ্যাত্মবাদের সাফল্য এইজন্যই যে এই মতবাদ বাস্তবের রুক্ষতা থেকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়ে মানুষকে এক স্বপ্নীল সুখময় জীবনের স্বপ্ন দেখায়। বোঝানো হয় একমাত্র নিরলস ঈশ্বর সাধনাই সেই লক্ষ্যে পৌঁছনোর একমাত্র পথ। তাই সেই ঈশ্বরের জয়গান করলেই যদি এমন জীবন পাওয়া যায়, তবে কেন মানুষ অন্য মতাদর্শ গ্রহন করবে? কী আশ্চর্য ! তাই না, দেশের জ্বলন্ত সব সমস্যাগুলিকে খুব কৌশলে এড়িয়ে, দেশ এখন ধর্মীয় ভাবাবেগ নিয়ে উত্তাল। আর আমরা নির্বাক হয়ে তা শুনছি, যাইহোক।

Monday, July 4, 2022

কোরবানি


ইদ এলেই কী প্রচণ্ড টানটান উত্তেজনা কাজ করতো! কিন্তু ইদানীং প্রায়ই নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত আকিদ। হয়ত বয়স বাড়ছে। তাই ভাবতো বুশরা। 

বিয়ের বারোটা বছর পেরিয়েছে সত্য কিন্তু আকিদ তার ছোটবেলার এই উৎসবের কথা কতবার শেয়ার করেছে তা বলার ইয়াত্তা রাখে না।শৈশবের-কৈশোরের রৈ রৈ। আকাশে চাঁদ দেখা গেলেই ছুটে যাওয়া মসজিদে ইমাম সাহেবের কাছে! 

কোরবানির ইদে কতবড় গরু জবাই করা হতো!  আরও কত কী! কিন্তু বছর দুয়েক থেকে তার মধ্যে একটা আলাদা রকম একটা পরিবর্তন ঘটেছে। 

বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে থাকে বুশরা এগুলো ভেবে।

এবারও আনন্দ-উৎসবের দিব সমাগত প্রায়। কিন্তু আকিদের ভাবসাব অন্যরকম। বুশরা নিজেকে আর সামলাতে না পেরে আকিদের হাত ধরে বলেই ফেললো "কারো সাথে কোরবানিতে শরিক হয়েছো"! উত্তরটা না আসলো। নাছোড়বান্দা হয়ে যখন বুশরা "না" টার কারণ জানতে চাইলো, আকিদ আর নিজেকে সামলাতে  পারলোনা।

বলল সে--
" ইব্রাহিম তো তার আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রাণ- প্রিয় ছেলেকে কোরবানি করতে চেয়েছিলেন। এরজন্য কি আমাদের এইদিনে এতোগুলো নিষ্পাপ পশু জবাই করতে হবে? এবার যে ভয়াবহ ফ্লাড হয়েছে, আমাদের জরুরি নয় বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানো! তুমি-ই বলো। 

-- জানতাম এটাই তোমার উত্তর হবে। অামার মতে তোমার এই কোরবানি স্বার্থক।

চারচোখ এক মুহুর্তের জন্য ঝলক  দিয়ে উঠে।

Wednesday, June 29, 2022

জলভসকা


সুখ-সমৃদ্ধি-উন্নতি হারিয়ে
তিনভাগ জল মাঝে ডুবে যায় দালান-গাড়ী
খোঁজে একটুকরো শুকনো পাতা
বাঁচার অন্বেষা।
আশ্রয় হারিয়ে দূরত্ব বাড়ে ----
সবুজ নৈঃশব্দ্য তার তৈলচিত্র
জলতলা শেওলার ভেতর অস্থির প্রহর কাটায়
কর্পোরেশন নর্দমায়।

তিলোত্তমা শহর বলো আর গ্রাম বরাক
দখলে তার পার্ক,চেনা-অচেনা গলি, রাজপথ, ট্রাফিক পয়েন্ট, যত মল, বক্তৃতা মঞ্চ।
জঠরে ভরা যত শব ধ্বনিত হয়
ক্ষুধা - তৃষ্ণার আর্তনাদে 
প্রাণভিক্ষার আবেদন।

বন্যা - হয়েছ এক বিভীষিকা
চোখে ঘুম হারিয়ে।

ধর্মানুভূতি: আহত ও আঘাত এই কথা দুটিতে জড়িয়ে থাকে

"আমি হিন্দু" "আমি মুসলমান একথা শুনতে শুনতে কান ঝালা-পালা হয়ে গেলো।কিন্তু “আমি মানুষ” একথা কাহাকেও বলতে শুনি না। যারা মানুষ নয়, তারা হিন্দু হোক আর মুসলমান হোক, তাদের দিয়ে জগতের কোনো লাভ নেই।"
                                  -----রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


ধর্মান্ধতাই ধর্মের মৌলবাদ। এই মৌলবাদই দেশে দেশে শিল্প ও সংস্কৃতির জন্য হুমকি হয়ে পড়েছে। ধর্মান্ধতা মানুষের একটি কমন ত্রুটি। এর প্রধান ভিত্তি হচ্ছে কোন নির্দিষ্ট বিধিবিধান বা প্রথার প্রতি যাচাই বাছাই না করে অন্ধ আনুগত্য করা। তাইতো অভিজিৎ রায়ের কথায় ‘ধর্মান্ধতা, মৌলবাদের মতো জিনিস নিয়ে যখন থেকে আমরা লেখা শুরু করেছি, জেনেছি জীবন হাতে নিয়েই লেখালিখি করছি।’

প্রচলিত ধর্মগুলি মানুষকে হিংসা বিদ্বেষ শিক্ষা দেয়, সুস্থ মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, কর্মবিমুখ অলস পরনির্ভরশীল করে গড়ে তোলে, মানুষের মধ্যে তৈরি করে বিভেদ বিভাজন। এখনো এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে, জ্ঞান বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের সময়েও তা থেমে যায়নি। বিশ্বের সভ্য মানুষেরা যখন ধর্মের আদলে কর্মে মনোযোগ দিয়ে যাচ্ছে এগিয়ে, তখন কতিপয় ধুরন্ধর মতলববাজ পরজীবী শ্রেণী সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে বাড়িয়ে চালাচ্ছে তাদের পুঁজিবাদী ব্যবসা! ছড়াচ্ছে উন্মাদনা! মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারে! থামিয়ে দিচ্ছে উন্নতির অগ্রযাত্রাকে! মানুষ ঠকছে, হচ্ছে প্রতারিত! তাইতো কখনো 'রামের' নামে আবার কখনো 'গোস্তাকে রসুলের' নামে মারছে-মরছে।

সাহাদাত হোসেন মান্টো ধর্মান্ধতা নিয়ে বেশ কিছু কাজ করেছেন। তার ‘ঠাণ্ডা গোস্ত’ গল্পে দেখি,দেশভাগের সময়কার দাঙ্গায় মুসলমানের রক্তে হাত রাঙানো শিখ যুবক ঈশ্বর সিংহ ঘরে ফিরে কিছুতেই প্রেমিকার সঙ্গে সঙ্গম করতে পারছে না। প্রেমিকার সন্দেহ হয়, তার পুরুষ নিশ্চয় অন্য নারীসঙ্গে মজেছে। ঈর্ষার জ্বালায় ঈশ্বরের কৃপাণ কোষমুক্ত করে সে ক্ষতবিক্ষত করে তাকে। মুমূর্ষু ঈশ্বর স্বীকার করে, সে এক অচেতন মুসলিম বালিকাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ক্রমশ বুঝতে পারে আসলে সে বালিকাটির শবের সঙ্গে... আখ্যানের তীব্র সংবেদনশীলতা বোঝেনি পাকিস্তান। ‘আমরা মুসলমানরা এতই আত্মমর্যাদারহিত যে আমাদের মৃত কন্যাদেরও শিখরা ধর্ষণ করে যায়?’—এমন প্রশ্ন তুলে লাহোর আদালতে মামলাও ঠুকে দেয় পাক আমলাতন্ত্র। যাইহোক এই কথাগুলো বলার কারণ হলো আমরা আর কত এভাবে একে অপরের রক্তস্নানে নিজেকে পবিত্র করবো ?

অনেক বড় ধরনের দূর্ঘটনা দেখেও আমরা খুব শক্ত থাকতে পারি। সেটা যতই মানবাধিকার লঙ্ঘণ হোক, সেটা যতই দেশের উন্নয়নে বাধা হোক, জনগণের স্বাধীনতা হরণ হোক আমরা মাথা ঠান্ডা রাখতে পারি। শ্রেণী সংগ্রামের পথে না গিয়ে আমরা চলছি ভোটের রাজনীতিতে, তাতে কোন ভাবেই আমাদের অনুভূতিতে আঘাত আনতে পারে না। কিন্তু যখন দেখি ধর্ম নিয়ে একে অপরের মন্তব্য বা কেটে মেরে রক্ত ঝরায়, তখন আমাদের আবেগ তীব্র উল্কাপিন্ড হয়ে যায়। হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়,শক্ত হয়ে যায়। মনে হয় নিজের শরীরে যন্ত্রনা হচ্ছে।পৃথিবীতে মনে হয় ধর্মের চেয়ে কেউ আত্মার এত কাছে থাকে না।

ধর্ম যে কতটা ঠুনকো কতটা ভঙ্গুর তার বারবার প্রমাণিত।মানুষ হতে ধর্মের কোনো প্রয়োজন নেই। একুশ শতকের আগের একটা মহান শিক্ষা আজ‌ও আমরা আমাদের বাচ্চাদের দিতে পারিনি - 'ধর্মের বেশে মােহ যারে এসে ধরে অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে'।

খারাপ মানুষকে ধর্ম ভালো করতে পারছে না। মানুষের ধর্ম নিজের ও মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা, ভালোকথা ভালোবাসা দিয়ে মানুষকে খুশি করা। জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রসারে, মনুষ্যত্ব মানবতাবোধ অর্জনের মধ্য দিয়ে, নিশ্চয়ই একদিন বিভাজন দূরীভূত হবে।

ছবিঋণ : জিষ্ণু রায়চৌধুরীর ফেসবুক ওয়াল থেকে।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...