Thursday, March 7, 2019

নারী ও জীবন

"আমাদের মাকে আমরা বলতাম তুমি, বাবাকে আপনি।

আমাদের মা গরিব প্রজার মত দাঁড়াতো বাবার সামনে,

কথা বলতে গিয়ে কখনোই কথা শেষ ক’রে উঠতে পারতোনা।

আমাদের মাকে বাবার সামনে এমন তুচ্ছ দেখাতো যে

মাকে আপনি বলার কথা আমাদের কোনোদিন মনেই হয়নি।

আমাদের মা আমাদের থেকে বড় ছিলো, কিন্তু ছিলো আমাদের সমান।"

… হুমায়ুন আজাদের লেখা “ আমাদের মা " ভীষণ প্রিয় একটা কবিতা আমার। মা তো শুধু মা নন, একজন নারীও। প্রাসঙ্গিক কারণেই এতো বড় কবিতাটা এখানে দেয়া সম্ভব হলো না কিন্তু কতটা গভীর এবং সূক্ষ্ম মানবিক বোধ থাকলে একজন মা’কে নিয়ে, একজন নারীকে নিয়ে এমন ভাবে ভাবা যায়, এমন ভাবে লেখা যায়! ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ বিষয় নিয়ে সরাসরি না লিখে বরং কবিতা দিয়ে শুরু করলাম। শুরু করলাম ঘরে বাইরে একজন নারীর অবস্থান নিয়ে। কতটা পরিবর্তন হয়েছে তার অবস্থানের; সেই আদি থেকে বর্তমান অবধি? জানি সেটা লিখে বা বলে ফুরোবার নয়।

নারীদিবস সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ধারণা কিছুটা অস্পষ্ট। আন্তর্জাতিক নারী দিবস, ৮ই মার্চ, এ কোন কোন পুরুষ নারীদিবসের শুভেচ্ছা জানান নারীদেরকে। কেউ কেউ ভালোবাসাও জানান। কেউ হাসাহাসি করেন। কেউ বলেন, আমাদের পুরুষদিবস কই? অনেকে বলেন, নারীদেরকে তারা শ্রদ্ধা করেন পরিপূর্ণভাবে, বছরের প্রতিটা দিন। নারীর জন্য আলাদা দিবসের কোন দরকার নেই। আমি বলি সেই পুরুষদের, তুমি কূয়োর ব‍্যাঙ কূয়োতেই থাকো।           

আজকাল প্রায়ই লক্ষ্য করা যায় যে, অনেকেই নারী অধিকার নিয়ে, নারী পুরুষের পারস্পারিক সহাবস্থান নিয়ে লিখতে আগ্রহী হন, চান কথা বলতে। যারা লিখতে চান, তারা লিখে বোঝাতে চান তারা সহনশীল এবং সমস্যা সমাধানে আগ্রহী। কিন্তু আমি মনে করি আজকে নারীর অধিকার, দাবী, নারী নির্যাতন রোধ যা কিছু নিয়েই আমি লিখতে চাই বা বলতে চাই না কেন, হোক সে নারী গৃহিণী বা কর্মজীবি, সবার আগে দরকার উন্নত চেতনার। নারীর কাজ করা বা না করার সাথে এই চেতনা সম্পর্কযুক্ত নয়। কুসংস্কার, পুরাতন রীতিনীতি ও আচরণের পরিবর্তন দরকার, আরো দরকার মানবিক আবেগ ও মানবিকতার জয়। মানবতা হলো নিজের কথা চিন্তা করে অন্যের প্রতি উদার হবার ক্ষমতা। যে মানুষ অন্যের প্রতি উদার হতে পারে না, সে তার নিজের প্রতিও উদার না। অনেক নারীবাদী পুরুষ আছেন যারা তাদের লেখনীর মাধ্যমে, আলোচনা তথা কথাবার্তায় নিজেকে 'রেডিকেল ফেমিনিষ্ট' বলে ভাবে। কিন্তু দিন শেষে যে সব একই ,কোন না কোন ভাবে শোষিত হচ্ছে নারী ওদের হাতে।

নারীদিবসের যেদিন দরকার পড়বে না, সেদিন সবচেয়ে খুশি হবে কে জানেন? নারীরা। নারীদিবস একটি মাইলস্টোন।এ দিনটি একজন নারীর দৈনন্দিন হাজারো ব্যস্ততার ভিড়ে একটু নিজের দিকে ফেরার, খানিকটা সচেতনতার ক্ষণ। এ দিনটি নারীকে মনে করিয়ে দেয়, পুরুষের সমান অধিকার আজও তোমার নেই। তুমি অর্ধাঙ্গিনী।  পুরুষের প্রয়োজনে তার পাঁজরের হাড় থেকে তুমি উদ্ভূত। তুমি মিসেস রায়হান। পৈতৃক সম্পত্তিতে তোমার অধিকার অর্ধেক। তোমার শারীরিক শক্তি কম,  পুরুষের থেকে কম মজুরি সেজন্য তোমার প্রাপ্য। শারীরিক  শক্তি কম বলে তোমাকে রাস্তাঘাটে যেমন ইচ্ছে যন্ত্রণা আর অপমান করা যাবে। দুর্বল  বলে প্রত্যুত্তর দেয়ার সাহস হবে না তোমার। মানুষ হিসেবে প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে তোমাকে এখনও অনেক পথ পেরুতে হবে।        
            
উপরের কথাগুলো কিছু সুবিধাপ্রাপ্ত নারীর জন্য না হলেও পৃথিবীজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীর জন্য প্রযোজ্য। যে পুরুষরা নারীকে শ্রদ্ধা করেন, নারীর অবদানকে স্বীকার করেন, নারীর চোখে পৃথিবীটা কেমন দেখায়, তা বোঝার চেষ্টা করেন-- তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা রইল। আমি পুন গুরুত্বপূর্ণ ভাবি। তবে বুঝতে পারি, মেয়েদেরকে স্বাভাবিক পৃথিবী উপহার দেওয়া হয়নি এখনো।         
 
প্রতিটি দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থান ভিন্ন। আমি স্বীকার করি, ভারতবর্ষের মানুষ মা’কে নিয়ে বেশ আবেগিক। নিজ ঘরের অন্যান্য নারীদেরকেও নিজের চিন্তা আর ভাবনা অনুযায়ী যার যার মত করে নিরাপত্তা দিতে চান পুরুষরা। এখানে আবারও বলি 'পুরুষ' কে তুমি স্বাধীনতা দেয়ার। প্রতিটা নারী ডিসাইড করবে তার প্রয়োজনটা নিয়ে।আপনি/ আমি কেন করবো! সম্পত্তির জন‍্য!?কিন্তু সামগ্রিকভাবে ভারতের নারীর অবস্থান কেমন?  ভারতের প্রেক্ষিতে দেখা যাক। নারী রাস্তাঘাটে একজন পুরুষের মত সহজে চলাফেরা করতে পারে না। বারোহাতি শাড়ী, বা বিশাল ওড়নায় নিজেকে ঢেকেও শরীর নিয়ে তাকে কখনো কখনো  অপমানসূচক কথা শুনতে হয়। কাজের জায়গায় সঠিক ও নিরাপদ পোশাক পরার প্রয়োজনীয়তা নারীর চেয়ে ভালভাবে কে বুঝবে? কর্মজীবী একজন নারী নাইট শিফটে কাজ করতে পারেন। কিন্তু স্বাভাবিক কর্মযজ্ঞ সেরে অনেক রাতে তার ঘরে ফেরার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আট বছরের আসিফার কথাই ভাবুন, ঘরে ফিরতে চেয়েছিল, ফিরতে পারেনি। মেয়েরা ভীত থাকে, অস্বস্তিতে থাকে তার নারীত্বের কারণে। মাতৃত্ব নারীর অহংকার। অবিসংবাদিতভাবে ঘরের কাজ, সন্তানের কাজের সাথে শুধুমাত্র নারীকে সম্পর্কযুক্ত দেখতেই আমরা অভ্যস্ত।তাই কর্মক্ষেত্রে কখনো যোগ্যতর হয়েও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে মেধাবী নারী। যদিও ভারতের সংবিধানে
১) সাম্যের অধিকার (১৪ নং থেকে ১৮ নং অনুচ্ছেদ)
২)স্বাধীনতার অধিকার (১৯ নং থেকে ২২ নং অনুচ্ছেদ)
৩)শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার  (২৩ নং ও ২৪ নং অনুচ্ছেদ) রয়েছে তথাপিও সবসময় প্রতিটা ক্ষেত্রেই নারী শোষিত, নিষ্পেষিত।

সারা পৃথিবীজুড়ে কমবেশি একই ধরনের চিত্র। মৌখিকভাবে নারীকে সমঅধিকারের স্বীকৃতি জানালেও কাজের কাজ তেমন কিছু হয়নি। বাস্তবতায় নারীর সেরকম অবস্থান নেই। একটি মেয়ে জন্মের পর থেকে স্বস্তিতে বেড়ে উঠবে, পড়াশুনা করবে, চাকুরী করবে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেবে, আরও দশটা মানুষের মতো সেও তার জীবন উপভোগ করবে। নারীত্বকে সে  বোঝা মনে করবে না, মানুষ হিসেবে তার আইডেন্টিটি ভাববে,নারী হিসেবে নয়-- এরকম দিন এখনও আসেনি। পৃথিবীতে নারীর এই অবস্থান যতদিন না আসবে, আমি চাই বা না চাই, নারীদিবসের প্রয়োজনীয়তা ততদিন থাকবে। 

নারী নির্যাতন এবং নারী সমস্যার সঙ্গে ধর্মীয় মৌলবাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে এ বিষয়টি বিশেষ আলোচনায় আসেনি। মৌলিক আলোচনায় গেলে বলতে হয়, নারীর অধস্তন অবস্থার জন্য দায়ী শ্রেণীসমাজ।ইতিহাসে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের উদ্ভবের ঠিক আগে আগে ব্যক্তিগত সম্পত্তির জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই নারী জাতি হারিয়েছে স্বাধীনতা- যাকে এঙ্গেলস বলেছেন,  'নারীর বিশ্ব-ঐতিহাসিক পরাজয়'। 'পুরুষ ঘরের মধ্যেও কর্তৃত্বের লাগামটি ধরল, নারী পদানত হলো, দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হলো। 'ধর্মীয় মৌলবাদ হলো ধর্মের সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ব্যাখ্যা, যা যুগের সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় বিধিবিধানের সংস্কারকে মানতে চায় না। মৌলবাদী সংগঠনগুলো মনে করে তারা যেভাবে ধর্মের ব্যাখ্যা দেবে সেটাই সবাইকে মানতে হবে এবং সে জন্য তারা সন্ত্রাস ও বল প্রয়োগের আশ্রয় নেয়।

ধর্ম কীভাবে নারী নির্যাতনের হাতিয়ার হয়েছিল তার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত হিন্দু সমাজে সতীদাহের মতো বর্বর প্রথা চালু ছিল। মধ্যযুগে ইউরোপে ডাইনি বলে কত নারীকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল ধর্মের নামেই, চার্চের নির্দেশে। হিন্দু ধর্মের ভগবান শঙ্করাচার্য স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, নরকের দ্বার হচ্ছে নারী। বাইবেলে বলা আছে, নারী হচ্ছে 'রুট অফ অল ইভিল'। ইসলাম ধর্ম তুলনামূলক প্রগতিশীল হলেও এখানেও নারীকে পুরুষের অধীনস্থ রাখা হয়েছে, বন্দি করা হয়েছে তাকে পুরুষতান্ত্রিক বিধিমালার কাছে। তাছাড়া আরও অনেক উদাহরণ আছে প্রতিটা ধর্মীয় বিধানে যা আপনার আমার সবার জানা।মুসলমান সমাজে নারী শিক্ষার প্রবর্তক মহীয়সী বিপ্লবী নারী বেগম রোকেয়া তাই বলেছেন, "আমাদের যথাসম্ভব অধঃপতন হওয়ার পর দাসত্বের বিরুদ্ধে কখনো মাথা তুলিতে পারি নাই; তাহার প্রধান কারণ এই বোধ হয় যে, যখনই কোনো ভগ্নী মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন, অমনই ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচন-রূপ অস্ত্রাঘাতে তাহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। ... আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ওই ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন। ... এই ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষ-রচিত বিধি ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে। "একবিংশ শতাব্দীতেও কলকাতার কলেজের অধ্যাপিকা মীরাতুন নাহার বলছেন, "...মুসলমান সমাজের পুরুষের স্বার্থপরতা মেয়েদের বন্দী হতে বাধ্য করেছে। ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে মেয়েরা ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে। যত বিধিনিষেধ তাদের ওপর। পুরুষ স্বাধীন। মেয়েরা বন্দী। নারী-পুরুষের জৈবিক সম্পর্ককে মুসলমান পুরুষ সমধিক গুরুত্ব দেয়। উভয়ের সম্পর্ক যেন ভোক্তা ও ভোগ্যের। সে কারণে কঠোর পর্দাপ্রথা। " মৌলবাদীরা কোন ধরনের সংস্কারের বিরুদ্ধে। কিন্তু মৌলবাদীদের মতাদর্শগতভাবে পরাস্ত করেই তো আমাদের প্রগতির পথে অগ্রসর হতে হবে।ধর্মীয় ফতোয়ার কবলে পড়ে কত নারী অপমানিত, নির্যাতিত, এমনকি মৃত্যুবরণ করছে অশ্লীল তেঁতুলতত্ত্বের প্রমাণ বহন করে।

বিশ্বায়ন (গ্লোবালাইজেশন) আর তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে কার্যক্ষেত্র পরিবর্তন হচ্ছে খুব দ্রুত। যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে সক্ষম, তাদের জন্য নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস, ২০১৭ এর প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল, “Women in the Changing World of Work: Planet 50-50 by 2030”. সোজা বাংলায়, পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্রে নারীর ভুমিকাঃ ২০৩০ সাল নাগাদ, প্ল্যানেট ৫০-৫০। দেখা যাচ্ছে কাজ করতে সক্ষম, এমন নারীদের ভেতর মাত্র ৫০ শতাংশ কাজে আছেন। কাজ করতে সক্ষম পুরুষদের ভেতর ৭৬% কাজ করছেন। শ্রম বাজার বলুন, আয়ের ক্ষেত্রেও বলুন, ঘরোয়া কাজে বলুন—সব জায়গাতে নারী আর পুরুষের ভেতর বৈষম্য প্রকট। 

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৯ এর মূল ভাবনা আগের বছরের ধারাবাহিকতারই  ফলাফল, এ বছরের থিম # PressforProgress- বিগত বছরের বিশ্বজুড়ে #Me Too, #Time’s Up  সহ বিভিন্ন  আন্দোলনের সাথে একাত্ম হয়ে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করাই এর মূল লক্ষ্য।    
 
আন্তর্জাতিক নারী দিবসটি কোন দেশ, গোষ্ঠী বা সংস্থা-নির্দিষ্ট নয়। অনুন্নত দেশ থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল তথা উন্নত দেশগুলোতেও এর প্রয়োজনীয়তা আছে। জেন্ডারভিত্তিক অসমতা রাতারাতি বদলাবার নয়। তবে পৃথিবীজুড়ে নারীরা সচেতন হচ্ছেন।নিজের জন্য, সহকর্মীর জন্য, বন্ধুর জন্য, সর্বোপরি নারীসম্প্রদায়ের জন্য তারা কথা বলছেন, নিজেদের অধিকার নিশ্চিত করতে আগ্রহী হচ্ছেন-- আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সার্থকতা এখানেই।  

শুধু নারী দিবস বলেই একটি নির্দিষ্ট দিনে আমরা নারীদের নিয়ে ভাববো, তাকে সম্মান দেব তা নয়। আসুন আমরা নারীকে তার যথাযথ সম্মান দেই, তাকে দেই তার সদিচ্ছা পূরণের অধিকার, তাকে ভাবতে শিখি স্বতন্ত্র একজন মানুষ হিসেবে ।

আমাদের ভারতবর্ষে নারীদের অবস্থা কিরকম ছিল?নারীজাতির মুক্তিদাতা কে? নারী সমাজ জাগরণের পথিকৃৎ কে?এই কয়েকটা বিষয় আজ নারী দিবসের দিনে অবশ্যই চর্চা হওয়া উচিত। ভারতবর্ষে সামাজিকভাবে নারীরা পুরুষদের গোলাম। এমনকি ভারতের পবিত্র ধর্মগ্রন্থেও নির্দেশ আছে-- মেয়েরা বাল্যকালে পিতার অধীনে, যৌবনে স্বামীর অধীনে এবং বৃদ্ধবয়সে পুত্রের অধীনে থাকবে। এছাড়া শাস্ত্র অনুযায়ী, "নারী হল শূদ্রাণী", অর্থাৎ অধিকারহীন এবং যার কাজ হল সেবা করা। "নারী নরকের দ্বার", "নারীর অধিকার কেবল সন্তান উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ"। সত্যিই ভারতে নারীসমাজের অবস্থা ছিল চূড়ান্ত শোচনীয়, ঈশ্বরের নামে ধর্মের দোহাই দিয়ে মেয়েদেরকে দাসী ও ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করা হয়েছিল। এরকমভাবেই চলছিল কয়েক হাজার বছর। তারপর একদিন মহারাষ্ট্রের একজন সাহসী মেয়ে, নাম- সাবিত্রীবাই ফুলে, স্বামীর কাছে পড়াশুনা শিখে মেয়েদের জন্য স্কুল তৈরি করেন। প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি মেয়েদের সামাজিক অধিকারের জন্য আওয়াজ তোলেন। নারীর অধিকারের জন্য সামাজিক আন্দোলনের অগ্রদূত হিসাবে রাষ্ট্রমাতা সাবিত্রীবাই ফুলে আজকের দিনটিতে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। এছাড়া নারীর অধিকারের জন্য আরও একজনের নাম না বললে ভারতে নারী দিবস সম্পর্কে চর্চা অসম্পূর্ণ থেকে যায়, তিনি হলেন ভারতে নারীজাতির মুক্তিদাতা বাবাসাহেব আম্বেদকর। সমাজে মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি হিন্দু কোড বিল তৈরি করেন, কিন্তু জওহরলাল নেহেরুর ষড়যন্ত্রে এই বিল পাশ করা হয়নি, তাই বাবাসাহেব মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন। হিন্দু কোড বিল পাশ না করা গেলেও, ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী এবং ভারতের সংবিধানের রূপকার হিসাবে বাবাসাহেব সাংবিধানিকভাবে মেয়েদের অধিকার ও পর্যাপ্ত ভাগিদারীর জন্য সংবিধানে কয়েকটি ধারা সংযোজন করেন, যেমন- আর্টিকেল ১৪ ঃ সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সুযোগের সমানাধিকার। আর্টিকেল ১৫ ঃ লিঙ্গ বৈষম্যের উপর নিষেধাজ্ঞা। আর্টিকেল ১৫(৩) ঃ নারীদের উপর ভেদভাবের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা। আর্টিকেল ৩৯ ঃ জীবিকা নির্বাহের সমান অধিকার ও সমান কাজের সমান বেতন। আর্টিকেল ১৪ ঃ কার্যক্ষেত্রে মানবীক পরিবেশ ও মাতৃত্বকালীন ছুটি। আর্টিকেল 24 (3 d), (3 t) এবং (3 r) ঃ পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থায় মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ। নারীদের শিক্ষার জন্য বাবাসাহেবের অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি বলতেন, কোনো সমাজে মেয়েরা কতটা এগিয়ে তার নিরিখে আমি সেই সমাজের অগ্রগতি পরিমাপ করি। তিনি নারীদের পুরুষকে স্বামী না ভেবে বন্ধু ভাবতে এবং তার সাথে সমান চারিত্রিক সক্ষমতা রাখতে উৎসাহিত করতেন। তিনি মনে করতেন যে, নারীরা এই গুণগুলি অনুসরণ করলে তারা আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হবে।বেগম রোকেয়া, সাবিত্রীবাই ফুলে, ফতিমা শেখ প্রমুখ মহীয়সী নারী, যাদের আন্দোলন ও আত্মত্যাগের জন্য আজ ভারতের মেয়েরা বাল্যবিবাহ বহুবিবাহ সতীদাহপ্রথা ইত্যাদির মতো জঘন্য যুগ থেকে মুক্ত হতে পেরেছে, শিক্ষার আলো পেয়েছে, সেই মহীয়সী নারীদের আজ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। নারীর কল্যাণ ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং তাঁদের স্বপ্ন সফল করার জন্য আসুন আমরা আজ সকলে মিলে একসাথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই।

নারীদিবসকে নিয়ে আপনার ভাবনা কি? ভারতবর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের কর্মক্ষেত্রে সহজ স্বচ্ছন্দ অংশগ্রহণ কিভাবে সম্ভব?  আপনার ছোট মেধাবী মেয়েটির মেধা আর মননশীলতার পূর্ণ বিকাশ ঘটুক,  কার্যক্ষেত্রে তার কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারুক, এ নিয়ে আপনার কোন ভাবনা আছে কী? নারীর সামাজিক আচরণগত কোন বিষয়গুলো একজন পুরুষের কাছে অসুবিধাজনক বলে মনে হয়? পুরুষের কোন আচরণগুলোর কারণে একজন নারীর সামাজিক অংশগ্রহণ বাধাপ্রাপ্ত হয়? নারী-পুরুষ-বান্ধব একটি সুন্দর, সুষ্ঠু কর্মক্ষেত্র ও পরিবেশ আমরা কীভাবে তৈরি করতে পারি? সেই আদিমকাল থেকে নারীকে যারা সম্পত্তি হিসেবে ভাবছেন,  সবার অংশগ্রহণ ও মতামতকে  স্বাগতম জানাই।

Thursday, February 28, 2019

জাতীয় বিজ্ঞান দিবস প্রসঙ্গে

৷৷ মানুষের জন্য বিজ্ঞান ও মানুষ বিজ্ঞানের জন্য ৷৷

স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, "যে ঈশ্বর নিজের নিয়ম বদলাতে পারেন না, তাঁকে মানি না।" আজ জাতীয় বিজ্ঞান দিবস (National Science Day)। অধ্যাপক সি ভি রমন এর নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্তি উপলক্ষে প্রতিবছর ২৮শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে জাতীয় বিজ্ঞান দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয় সারা দেশ জুড়ে। প্রতিবছরই এই দিনটির একটি প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে। ২০১৯ এর প্রতিপাদ্য বিষয় "Science for People and People for Science" অর্থাৎ "বিজ্ঞানের জন্যে মানুষ এবং মানুষের জন্যে বিজ্ঞান"।

১৯৮৭ সাল থেকে সারা ভারতে মহাউৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে জাতীয় বিজ্ঞান দিবস পালিত হয়ে আসছে। ভারতীয় উপমহাদেশের যে কোনও বিজ্ঞান-শিক্ষার্থীই স্যার চন্দ্রশেখর ভেঙ্কটরমন বা সি ভি রমনের নাম শুনেছেন। তাঁর আবিষ্কৃত ‘রমন এফেক্ট' বা ‘রমন-প্রভাব’ পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এক আশ্চর্য মাইলফলক হয়ে আছে ১৯২৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে --- যে দিন এই আবিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়েছিল। রমন-প্রভাব আবিষ্কারের জন্য সি ভি রমন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ১৯৩০ সালে। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশ নয়, সমগ্র এশিয়ার মধ্যে তিনিই হলেন বিজ্ঞানে প্রথম নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী। তাঁর নোবেল-বিজয়ী গবেষণার সব টুকুই সম্পন্ন হয়েছিল কলকাতার ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্স’-এর ছোট্ট একটা গবেষণাগারে। রমন এফেক্ট আলোক তরঙ্গের অজানা পথ খুলে দিয়েছে। শক্তির স্তর এবং অণু ও পরমাণুর গঠন বুঝতে অনেক সহায়তা করেছে। পদার্থবিজ্ঞানের অনেক শাখায় রমন এফেক্ট কাজে লাগছে। জীববিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞানেরও অনেক শাখায় রমন এফেক্ট কাজে লাগিয়ে অনেক নতুন নতুন গবেষণা হচ্ছে।                                                                                   
এই দিনের উদ্দেশ্য বিজ্ঞানের প্রসার। কিন্তু বিজ্ঞানমনস্কতা বাদ দিয়ে বিজ্ঞানের প্রসারের অর্থ কী?
সরকারি, বেসরকারি নানা সংগঠন বিজ্ঞানের প্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ সংগঠনই ধরি মাছ না ছুঁই পানি মনোভাব নিয়ে কাজ করছে।  প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলছে বিজ্ঞানের অপব‍্যাখ‍্যা। জ‍্যোতিষ শাস্ত্র থেকে শুরু করে নানা ধরণের কুসংস্কার এবং ধর্মীয় অন্ধতা আঁকড়ে বেঁচে আছি আমরা, বৃহত্তর ভারতবাসী। আমরা বিজ্ঞানকে শুধু ফিজিক্স বা ক‍্যামিষ্ট্রির ল‍্যাবেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছি। এরবাইরে তার প্রচার প্রসার নিয়ে আমরা চরম উদাসীন।

গত জানুয়ারীর "ন্যাশনাল সাইন্স কংগ্রেসের" কথা মনে আছে নিশ্চয়? ভাইস চেন্সেলার নাগেশ্বর রাও বলেছিলেন "মহাভারতের কৌরবরা সেই যুগের টেস্ট টিউব বেবি", "রাবনের ২৪ টা এয়ারক্রাফ্ট ছিল", এমনকি ডারউইনের থিওরি অব্দি চ্যালেঞ্জ করেন তিনি তার ভাষণে। ইন্ডিয়ান সাইন্স কংগ্রেসের মতো একটি সংস্থায় যদি মাইথোলজি এবং বিজ্ঞানের মা-মাসি এইভাবে গুলিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে ভারতে বিজ্ঞানচেতনা এবং বিজ্ঞানমনস্কতা সত্যিই হুমকির মুখে। আরো অন্ধকার এক যুগ অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্যে।

ভাঙড়ের মতো ঘটনায় প্রায় সবারই মুখে কুলুপ। জল জংগল জমি বাঁচানোর জন্য যখন সবচেয়ে জোরালো গলায় কথা বলা উচিত বিজ্ঞানবিদ, কর্মীদের ;  যুক্তি, বিজ্ঞান, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা বহুত্ববাদী মানবতাকে সুরক্ষিত রাখতে যখন তীব্রভাবে আঘাত করা দরকার সবধরনের ধর্মীয় মৌলবাদকে, তখন সব বিতর্কের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে নিরাপদ দূরত্ব থেকে গায়ে প্রগতির নামাবলি চাপিয়ে যুক্তি, পরিবেশ, বিজ্ঞানের নামসঙ্কীর্তন চলছে দেশ জুড়ে। কেউ কেউ আবার বিজ্ঞান আন্দোলনের সীমা-পরিসীমার প্রসংগ তুলে বলেন, "আমরা বিজ্ঞানে আছি, রাজনীতিতে নেই"। প্রশ্ন জাগে, রাজনীতি ছাড়া কি বিজ্ঞান হয়? আদৌ কোনো আন্দোলনই কি হয়?

বিজ্ঞান তো আলোর দিশারী। অন্ধকার যুগ থেকে এই আলোর যুগে  বিজ্ঞানের হাত ধরেই তো আমরা এসেছি। প্রতিনিয়ত সংগ্রহ করেছি  জীবন ধারণ এবং গড়ার মন্ত্র। বিজ্ঞান ই তো আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে সত‍্য ও মিথ‍্যার ফারাক যুক্তি ও সঠিক প্রমাণের মাধ্যমে। তা না হলে আজও আমরা সূর্যকে পৃথিবীর চারদিকে ঘোরাতে থাকতাম। চিকিৎসা শাস্ত্র থেকে অর্থনীতি, সমাজ বিজ্ঞান থেকে রাজনীতি সবক্ষেত্র ই বিজ্ঞান ছাড়া পঙ্গু। অচল। আগুন ও চাকার মাধ্যমে বিজ্ঞানের জয়যাত্রার লালফিতা কাটা হয়, কিন্তু আজও গ্রহণযোগ্যতার দিকে আমরা পিছিয়ে। আজও আমরা জড়িয়ে আছি পুরোনো অযৌক্তিক নীতিমালার মধ্যে।

আজ ৩২তম জাতীয় বিজ্ঞান দিবস। অন্যান্য বারের মতই এবছরও নিয়ম করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পালিত হচ্ছে আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব বিজ্ঞান দিবস।   কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলো কতটা বিজ্ঞানের প্রচার প্রসারের জন্য এবং কতটা জনগনকে বিজ্ঞানমনস্ক করার জন্য হচ্ছে সেটা ভাবা ভীষন জরুরী।  কান পাতুন, এবছরের "জাতীয় বিজ্ঞান দিবস" কিন্তু একথাই ভাবিয়ে গেল  আপনাকে, আমাকে।

[তথ্যসহায়তা : উইকিপিডিয়া, নিউজ জার্নাল]

Tuesday, February 26, 2019

আগ্রাসিত আ মরি ভাষা


'মা তোর মুখের বাণী আমার কাছে লাগে সুধার মতন'-এ কেবল নোবেল জয়ী রবীঠাকুরের ব‍্যক্তিগত অনূভুতি নয়,এ হচ্ছে সর্বকালের মানুষের চিরন্তন অনূভুতি। মাতৃদুগ্ধ যেমন শিশুর জন্য সর্বোত্তম পুষ্টি, তেমনি মাতৃভাষার মাধ্যমে ঘটতে পারে একটি জাতির শ্রেষ্ঠ বিকাশ। তাই একটি জাতির উন্নয়নের শীর্ষস্থান দখল করার প্রথম ধাপ হলো- মাতৃভাষার মর্যাদা দেওয়া। মাতৃভাষা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের এক মৌলিক সম্পদ। মা ও মাটির মতোই প্রতিটি মানুষ জন্মসূত্রে এই সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়।

সাধারণ অর্থে মাতৃভাষা বলতে মায়ের ভাষাই বোঝায়। একটি বৃহত্তর অঞ্চলে একই সাথে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত থাকে। এর মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ যে ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করে সেটাই হচ্ছে সে অঞ্চলের মানুষের মাতৃভাষা। মাতৃভাষা বহতা নদীর মতো শত ধারায় প্রবাহমান। বাঙালির মাতৃভাষা হচ্ছে 'বাংলা'। বাংলা আমাদের প্রাণের স্পন্দন, বাংলা আমাদের অহংকার। কবি অতুলপ্রসাদ সেনের কথায়-- " মোদের গরব মোদের আশা/আ মরি বাংলা ভাষা"। প্রখ্যাত ভাষা বিজ্ঞানী  ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন-- 'মা,মাতৃভূমি, এবং মাতৃভাষা' এই তিনটি জিনিস সবার কাছে পরম শ্রদ্ধার বিষয়'।

মাতৃভাষাই মানবজীবনের সকল ক্ষেত্রে তৃপ্তি ও পরিপূর্ণতা দান করে। জাতীয় জীবনে মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। জাতীয় জীবনের সার্বিক ক্ষেত্রে উন্নতি লাভ করতে হলে মাতৃভাষার কোনো বিকল্প হতে পারে না। শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্যের বিকাশে মাতৃভাষা হচ্ছে প্রধান মাধ্যম। বাংলা ভাষা রক্ষার্থে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রফিক, জব্বার, বরকতরা যেভাবে তরুণ তাজা রক্ত দিয়ে রাঙিয়ে ছিল এই দিনটিকে, তার সাথে গড়ে ছিল 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'। কিন্তু এর সাথে ১৯৬১ সালের ১৯ শে মে'র কথা আমরা কি ভুলতে পারি? কিভাবে ভুলতে পারি কমলা ভট্টাচার্যের কথা। যে  ভাষার প্রথম মহিলা হিসেবে শহীদ হয়েছিলেন। কিভাবে ভুলতে পারি শচীন্দ্র,রবীন্দ্রের কথা?

এবার একটু নিজের কথা বলি। যা দুঃখজনক হলেও সত্য। যে ভাষার জন্য এত কিছু করা,যে ভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে এতোগুলো প্রাণ বিসর্জিত হলো-- আমরা কি বাংলাকে সর্বস্তরে ব‍্যবহার করতে পারছি? আমাদের যদি চোখ থাকতো তাহলে পড়তে পারতাম সময়ের দেয়াল লিখন। আমাদের যদি কান থাকতো তা হলে শুনতে পারতাম জন সমুদ্রের উত্তাল কলরব। আমাদের যদি স্নায়ুতে নিউরন থাকতো তা হলে বুঝতে পারতাম কেন ভাষা-সাম্রাজ্যবাদীদের বাংলাকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র। কিন্তু না, আমরা আজ হীনমন্যতার স্বীকার। আমাদের দূরদৃষ্টির অভাব।

আসামের ইতিহাস বলতে গিয়ে সরকার প্রকাশিত বইয়েও লেখা হয়," The long alluvial valley of the Brahmaputra or Assam proper with which we are concerned" ( Political History of Assam vol.1,Dispur- 1977) অর্থাৎ আসাম বলতে শুধু ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ও তার ইতিহাসের কথা বলা হয়েছে। আসামের কৃষ্টি সভ‍্যতা ও ইতিহাস বলতে শুধু একা অসমিয়া সংস্কৃতি কে আলাদা করা যায় না। সুরমা উপত‍্যকার সভ‍্যতা ও ইতিহাস তথা পার্বত্য অঞ্চলের লোকদের দ্বারাও একক সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে আসামের কৃষ্টি সভ‍্যতা। কিন্তু ধারাবাহিক মিথ্যা ও বিকৃত প্রচার অভিযানের ফলে আসামের বাইরে এবং ভিতরে আসাম,আসামবাসী ইত্যাদি বিষয়ে যে মিথ্যা ও বিকৃত কিছু মারাত্মক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে -- তা প্রত‍্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আসামের আসামের বাংলা ভাষাভাষী লোকদের উপর আগ্রাসন চলছে। যা ভারতীয় সংবিধান পরিপন্থী।  যারা আসামকে খুব কাছে থেকে জানেন তাঁরা কোন সময়ই এই উগ্রজাতিয়তাবাদী আগ্রাসন কে প্রশ্রয় দেন নাই। বিভিন্ন সময়েই তাঁরা বিভিন্ন প্রতিবাদী সুরে এই উগ্রতা কে নিন্দা জানিয়েছেন ও দমন করার চেষ্টা ও করেছেন। ড. ভুবন মোহন দাস তাঁর "অসমিয়া জাতির ইতিবৃত্ত" বইটিতে আসাম সম্পর্কে যে সুস্পষ্ট ও প্রামানিক তথ্য দিয়েছেন তা সর্বজনগ্রাহ‍্য ।

আসাম ভারতের উত্তর পূর্বাংশে ব্রহ্মপুত্র আর বরাক নদীবিধৌত এক অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। যেখানে ২০১১ সনের লোকগণনা মতে ৪৮.৩৩% অসমিয়া আর ২৮.৯২% বাঙালিরা বসবাস করছে। কিন্তু ভাষা নিয়ে যে বিপত্তির শুরু হয়েছিল দেশভাগের পর থেকে আজও এর আগ্রাসন চলছে ষোলকলায়। ড. নীহাররঞ্জন রায় প্রমুখ মনীষীরা 'বাঙালীর ইতিহাস' ,বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে রচনা করেছেন। অসমিয়া জাতির ইতিহাস নিয়ে তেমন কোন শ্রমসাধ্য বিজ্ঞানসম্মত কাজ করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। অসম সাহিত্য সভা কর্তৃক প্রকাশিত 'অসমিয়া জাতির ইতিবৃত্ত' বিভিন্ন পণ্ডিতজনের কয়েকটি সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ মাত্র। এই সংকলনে অধ্যাপক রামচরণ দাস বলেছেন অসমিয়া সংস্কৃতি আর্য,অষ্ট্রিক এবং মঙ্গোলীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। মোটকথা অসমিয়ারা বাঙালির মতো সংকরজন। সংখ‍্যায় বাঙালিরা আসামে এক বিশাল জনগোষ্ঠী। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে টিকে থাকার লড়াই চলছে বাংলার এই রাজ‍্যে। বড়ই পরিতাপের বিষয়,বাঙালিরা অসমিয়া ভাষাকে রাজ‍্যভাষা হিসেবে মেনে নিলেও বারবার অসমিয়া আগ্রাসনের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদেরকে। ক্রমাগত হারাচ্ছে তাদের জাতিস্বত্বা। এই মনোবৃত্তি কি একান্তই উগ্রজাতিয়তাবাদী নয়? হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ভূপেন হাজারিকা, রবীঠাকুর যে মিলনের সেতু বন্ধন করেছিলেন তা কারা কোন সাহসে ভাঙছে,একবারও কি নিয়েছি আমরা খবর! নাকি সময়ের বহমানতায় পাল তুলে পালিয়ে যাচ্ছি হারাপ্পা সভ‍্যতার দিকে?

অসমিয়া আমাদের রাজ‍্যিক ভাষা,শিখতে হবে। তবে বাংলাকে পিছিয়ে নয়। তাই মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই,অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক নিষ্পেষণের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে অবিরত সংগ্রামের প্রয়োজন।

Sunday, February 24, 2019

হীরক রাজার দেশে দেশভক্তির পরীক্ষা

| কে দেশপ্রেমী আর কে দেশদ্রোহী তার বিচার করবে কে?  হীরকরাজ? |

#দেশদ্রোহী_কারা ? #দেশপ্রেমিই_বা_কারা ?

#দেশদ্রোহীরা_কি_করে ? #দেশপ্রেমিরাই_বা_কি_করেন ?

যারা রাষ্ট্রের হাতে প্রতিমাসে ১৩৫০জন কৃষক মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ৷

দেশপ্রেমিরা হল সেই জন যারা ভাগারের মরা গরু খাওয়ার অপরাধে দলিতদের গনপ্রহার করে ৷

দেশদ্রোহী তারাই যারা সেনাদের নীরাপত্তা ব্যাবস্থাতে রাষ্ট্রে উদাসিন্য নীতি নিয়ে প্রশ্ন করে ৷

দেশপ্রেমি মহান মানুষেরা দেশের মানুষের মধ্যে ধর্ম খুঁজে তাদের মধ্যে বিভাজন করে ৷

দেশদ্রোহী তারাই যারা আস্পাফার নাম করে উত্তর-পূর্বে ও কাশ্মীরের হাজার হাজার ভারতীয় নারী ধর্ষীতা কেন তার বিচারের দাবী তোলে ৷

দেশপ্রেমিরা ঐ ধর্ষীতা নারীদের দেশদ্রোহী ঘোষনা করে , এবং ধর্ষীতা নারীদের ক্রন্দন শুনে হাততালি মারে ৷ এমন কি কখনও কখনও কবর থেকে বিধর্মী নারী শরীর তুলে ধর্ষনের নিদানও দেয় ৷

দেশদ্রোহী তারাই যারা জন্মসূত্রে পাওয়া আদিবাসিদের জল জমি জঙ্গল কেড়ে নিয়ে আম্বানি-আদানি-বেদান্ত-পস্কোকে জলের দামে বিক্রির প্রতিবাদ করে ৷

দেশপ্রেমি হল তারা যারা MBA , MCA ইত্যাদী পড়ে আম্বানি-আদানি-পস্কো-বেদান্ততে ম্যানেজারের চাকুরি করে ৷ তারপর তারা কোম্পানির প্রফিটের জন্য ঐ আদিবাসিদের ₹৫০ দৈনিক দিয়ে ₹৫০০ টাকা মাইনের শ্রম ঘাড় ধরে আদায় করে ৷

আর দেশদ্রোহীরা তারা যারা শ্রমের ন্যাজ্বমূল ও অধিকার নিয়ে মেহনতি শ্রমজীবি মানুষের জন্য কিছু বলে ৷

দেশপ্রেমি তারাই যারা আম্বানি আদানি টাটা বিড়লা গোয়েঙ্কার স্বার্থ নিয়ে কিছু ভাবে ৷

তারাই দেশদ্রোহী যারাই  প্রশ্ন করে সারা বিশ্বে , স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও বিনাচিকিৎসাতে মৃত্যু , শিক্ষা , অপুষ্টি ঔ অনাহারের সূচকে , জন্মকালীন শিশু মৃত্যু ইত্যাদী সূচকে ভারত কেন বিশ্বের মধ্যে পিছনের সারিতে ? কেন আম্বানি আদানিদের শিল্পে টাকা ব্যায় না করে গরীব মানুষের জন্য বাজেট বারাদ্দ হচ্ছে কেন তার প্রশ্ন করে ৷

দেশপ্রেমি বলে তাদেরই যারাই আম্বানি আদানি আদানির উন্নয়ন ও তাদের সম্পদ বছরে ২০০% হারে বৃদ্ধি পেয়ে ভারতের মুখ কিভাবে উজ্বল করে তার বিশদ ব্যাখাসহ সেমিনার এটেণ্ড করে ৷

১|.

নভজোৎ সিং সিধু তখন পুরোদমে ভাষ্যকার। শচীনের জনপ্রিয়তা বোঝাতে বলেছিলেন, ভারতে প্রধানমন্ত্রীকে ও একবার অন্তত কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়। কিন্তু শচীন টেন্ডুলকারের দিকে একবার আঙুল ও যদি কেউ তোলে গোটে দেশে আগুন লেগে যাবে৷

ভারতবর্ষে ডজনখানেক ধর্মের মধ্যে একটি প্রধান ধর্ম ক্রিকেট আর তার দেবাদিদেব শচীন রমেশ তেন্ডুলকার। এমন একটি নাম যা ১২০ কোটি দেশবাসীকে এক করতে পারে।

আপনি শচীনকে পছন্দ নাই করতে পারেন। কিন্তু গোটা স্টেডিয়াম যখন একসাথে মন্ত্রোচ্চারণের মতো শ....চীননন... শ...চীন বলতো আপনার গায়ে কাঁটা দিতো। লিটল মাস্টার যখনই ব্যাট করতে নেমেছে আপনি সব ফেলে খেলা দেখতে বসেছেন৷ হাউ হাউ করে কেঁদেছেন যখন শেষবার ক্রিকেট-ভগবান মাঠ ছেড়েছে, শেষবারের মতো দেশের পতাকা গায়ে জড়িয়ে।

এটাই বোধহয় একমাত্র আফিম যাতে হিন্দু মুসলিম অস্ত্র ফেলে বাইশ গজের লড়াই দেখে। এটাই বোধহয় একমাত্র যুদ্ধ যেটা জিতলে বিশ্বযুদ্ধ জেতার স্বাদ মেলে। কালাশনিকভ নয়। এ লড়াই ক্রিকেট ব্যাটে জেতা যায়। এ দেশপ্রেমী না দেশদ্রোহী তার বিচার করবে সে যে রোজ ঠান্ডা ঘরে বসে কাল্পনিক কালাশনিকভ আর কামান দাগে?

২|.

১৯৮৮ সালে পুরনো দিল্লি থেকে একজন ফের আরব সাগর তীরে এসেছিল।  শ্যামবর্ণ, গালে টোল আছে। মুম্বাইয়ের মেরিন ড্রাইভ এলাকার ঠিক মাঝে যেখান থেকে সমুদ্র আর চারপাশ সমুদ্ররানীর নেকলেসের মতো লাগে, ঠিক সেখানে দাঁড়িয়ে ছেলেটা সেদিন বলেছিল, একদিন আমি এই গোটা শহর রাজ করবো৷ তিরিশ বছর বাদে সেই ছেলেটিই একটা গোটা দেশে পরিনত। যার নিজের প্রজা আছে, দেশ বিদেশে নাগরিক আছে, মানুষ আছে যারা ভাবে শাহরুখ একটি দেশের নাম।

Sex & Shahrukh Khan sells. অর্থাৎ আপনি যাহাই বানান না কেন, তাতে এই দুই মশলা মাখায়ে দ্যান। পাবলিক আজ ও খাবে৷ পাঠকগন, পাবলিক মানে এখানে কিন্তু আফগানিস্তান থেকে আলাবামা। আজ্ঞে৷ পৃথিবীর মানচিত্রে এরকম অনেক দেশ আছে যেখানে গিয়ে আপনি নিজের দেশের নাম বললে, সবার আগে সে দেশের ট্যাক্সি ড্রাইভার বলবে, ও ল্যান্ড অফ শাহরুখ খান! ছাইয়া ছাইয়া!

যে ছেলেটি স্কুললাইফ থেকে জেল দিয়ে ব্যাকব্রাশ করে, হাত দিয়ে চুল কপালের থেকে সরিয়ে নেয়, একলা ঘরে আয়নার সামনে দু হাত ছড়িয়ে আকাশের দিকে তোলে খোঁজ নিয়ে দেখুন সে শাহরুখ খান নামক দেশের নাগরিক।

যে মেয়েটি একবার অন্তত জীবনে "Mere Khwabo mein jo aaye" একলা ঘরে তোয়ালে চেপে নেচেছে, যে রোজ রাতে "Dil Se" দেখে ভেবেছে ওর নিশ্বাসে ও যদি ওভাবে কেউ নিশ্বাস নিত,যার  নাম শম্পা, সাবিত্রী, চম্পা, চামেলি যাই হোক না কেন, সে আসলে সিমরন, যাকে zindegi বাঁচতে শিখিয়ে দিয়ে গেছে একটা দেশ। নাম শাহরুখ খান।  এ দেশপ্রেমী না দেশদ্রোহী তার বিচার করবে তারা যারা নব্বইয়ের দশকে মসজিদ ভেঙেছিল আর গোটা দেশে দাঙ্গা লাগিয়েছিল?

৩|.

না ভারতের মুসলমানরা কোনদিন চায় না পাকিস্তানে চলে যেতে। কাশ্মীরিরা চায় না পাকিস্তানে মিশে যেতে। এরা সুযোগ থাকলে ও দেশভাগের সময় এ দেশে থেকে গেছিল কারণ তারা ইসলামি রাষ্ট্রের অংশ হতে চায়নি। ওরা চায়নি এমন এক মানুষকে কায়েদ এ আজম বলতে যে ব্যক্তিজীবনে মদ, শুয়োরের মাংস, পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে আপন করে নিলে ও দেশকে বানিয়েছিল এক কট্টরপন্থী ইসলামী রাষ্ট্র। ওদের সাথে কথা বলুন। দেখবেন ওরা ও ঘৃণা করে সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর পাকিস্তানকে। দেশের প্রথম পরমবীর চক্রে ভূষিত সেনা জাওয়ান আব্দুল হামীদ, এ.আর. রহমান, উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান, আব্দুল কালাম, আজাদ, মুহাম্মদ রফি ওদেরই একজন। এরা দেশপ্রেমী না দেশদ্রোহী তার বিচার করবে তারা যারা রোজ হিন্দুকে মুসলিমের সাথে, ব্রাহ্মণকে দলিতের সাথে, উত্তর ভারতীয়কে দক্ষিণ ভারতীয়র সাথে, কাশ্মীরকে জম্মুর সাথে রোজ লড়িয়ে দিচ্ছে?

ভুল জানেন। যারা ঠাঁই ঠাঁই করে গুলি চালায় তারাই কেবল দেশপ্রেমিক নয়। এর বাইরে ও অনেকে আছে। কে দেশপ্রেমী আর কে দেশদ্রোহী তার বিচার করবে কে?  হীরকরাজ?

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...