Thursday, February 7, 2019

আজাদ হিন্দ ফৌজ : অনূদিত গল্প

"A true revolutionary is one who never acknowledges defeat, ..... A true revolutionary believes in the justice of his cause and is confident that his cause is bound to prevail in the long run."
( Netaji )

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস! একটি নাম! এক কিংবদন্তী! এক ইতিহাস! এবং এক বিস্মৃত অধ্যায়! ১৯৪৫, ১৮ই আগস্ট! তাইহোকু বিমানবন্দর! বিমান দুর্ঘটনার কথিত কাহিনী! এবং এক কিংবদন্তীর অন্তর্ধান! তারপর কেটে গেছে প্রায় সাত দশকেরও বেশী সময়!আজও কিনারা হয়নি সেই রহস্যের! আজও লেখা হয়নি পুরো ইতিহাস! আজও ধামাচাপা পড়ে আছে ভারতীয় স্বাধীনতা অর্জনের নেপথ্য কাহিনী! আজও সারা ভারত জুড়ে একঘরে করে রাখা হয়েছে নেতাজীর অবদান!

তাইহোকু বিমানবন্দরের ঘটনার পর জল অনেকদূর গড়িয়েছে! ঘটনার দুই বছরের মধ্যেই ক্ষমতা হস্তান্তর করে মুখ রক্ষা করতে হয়েছে বৃটিশকে! ভারতবর্ষের রাষ্ট্রিক কাঠামোয় ব্রাত্য করা হয়েছে সুভাষ বোসকে! তথাকথিত স্বাধীনতার ইতিহাসে সুকৌশলে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে নেতাজীর ভূমিকাকে! আর একদিকে ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তি পঁয়তাল্লিশের আগস্ট থেকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়িছে নেতাজীকে! এই একমাত্র একজন, যিনি বৃটিশকে বৃটিশের ভাষাতেই পাল্টা জবাব দিতে পেরেছিলেন! আর সেখানেই বৃটিশের অহং এ চোট লেগেছিল মারাত্মক! তাই নেতাজীকে ধরতে না পারার আক্ষেপে বিমান দুর্ঘটনার কথিত কাহিনীর পর থেকেই তাদের প্রধান টার্গেট হয়ে ওঠেন চন্দ্রবোস! প্রধান আতঙ্কও বটে!

"He has again escaped; if Subhas Chandra Bose comes again we will lose whole of Asia"
বক্তা বিখ্যাত মার্কিণ সেনাপতি ম্যাক আর্থার!

হ্যাঁ, সেদিন ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তি এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত ছিল নেতাজী সম্বন্ধে! আর সেই আতঙ্ক থেকেই সেই ১৮ই আগস্টের তাইহোকু বিমান বন্দরের বিমান দুর্ঘটনার মাত্র দুই বছরের মধ্যে তড়িঘড়ি ভারতীয় বৃটিশভক্তদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত করতে বাধ্য হল প্রবল পরাক্রান্ত সেই বৃটিশ! নয়ত কোনো ভাবে নেতাজী দেশে ফিরে এলে তাদের যে আম ও বস্তা দুইই যাবে, এ বিষয়ে বৃটিশের কোনো সন্দেহ ছিল না! আর এই সত্যই স্পষ্ট করে নেতাজী মারা যাননি সেই দিন! স্পষ্ট করে তথাকথিত ভারতীয় স্বাধীনতা এসেছিল ঠিক কোন পথে!

ম্যাক আর্থারের এই বক্তব্যটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম! মনে রাখতে হবে এই বক্তব্যের আগে ইউরোপে জার্মানী বিধ্বস্ত! হিটলার আত্মহত্যা করেছেন! জাপান হিরোশিম-নাগাসাকির ক্ষত নিয়ে, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছে মার্কিণদের শক্তির কাছে! তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে চূর্ণবিচূর্ণ অক্ষশক্তি! এই রকম নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরেও নতুন আবিষ্কৃত পারমানবিক শক্তিতে বলিয়ান মদমত্ত প্রবল শক্তিধর মার্কিণরা কিনা আতঙ্কিত বঙ্গসন্তান চন্দ্রবোসকে নিয়ে?

হ্যাঁ ঠিক তাই! নেতাজীকে নিয়ে ইঙ্গমার্কিণ শক্তির এই আতঙ্কের মূল কারণ দুটি! তারা নেতাজীকে চিনতে একটুকুও ভুল করেনি! আর তাইহোকুর বিমানদুর্ঘটনাকে বিশ্বাস করার মতো নির্বোধও তারা ছিল না! এটাই ইতিহাস!

এই প্রসঙ্গে দেখা যাক "The Last Years of British India" গ্রন্থে লেখক Michael Edwards ঠিক কি বলছেন ; "....British had not feared Gandhi; the reducer of violence; they no longer feared Nehru; who was rapidly assuming the lineaments of civilized statesmanship....The British however; still feared Subhas Bose...."

তাই স্বভাবতঃই ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তি সেদিন আতঙ্কে ভুগছিল শুধুমাত্র নেতাজীর ফিরে আসার সম্ভাবনায়! তাই একদিকে পাগলের মতো তারা খুঁজে গেছে চন্দ্রবোসকে! আর একদিকে কংগ্রেস ও লীগ নেতৃত্বকে নিজেদের সমস্ত শর্তে রাজী করিয়ে, ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনায় এগোতে হল অকল্পনীয় দ্রুততায়!

তাইহোকু বিমানকাণ্ডের পর নেতাজীর অন্তর্ধানের সাথেই শেষ হল আজাদ হিন্দ ফৌজের স্বাধীনতা যুদ্ধ ! কিন্তু সেখানেই শেষ হল না আইএনএর প্রভাব! সেই প্রভাবের স্বরূপ বোঝা গেল, লালকেল্লায় শুরু হওয়া আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিচার পর্বে! সারা ভারতবর্ষ জুড়ে তখন আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দীদের মুক্তির দাবিতে সরব সমস্ত রাজনৈতিক পক্ষ! তাই দেশের জনমত অনুধাবন করে বিয়াল্লিশের ভারত ছাড়োর পর প্রায় নেতিয়ে পরা জাতীয় কংগ্রেস এগিয়ে এল বন্দীমুক্তির দাবিতে! বৃটিশ মুখপাত্র হিউ টয়ের ভাষায়, "....As a political weapon the I.N.A. had been of the greatest use to the Congress in India." এই সুযোগে দেশবাসীকে নিজের দিকে টেনে আনা সহজ হল কংগ্রেসের!

ঠিক এই কথাই শোনা গেল মাইকেল এডওয়ার্ডসের লাস্ট ইয়ার্স অফ বৃটিশ রাজ গ্রন্থে, "The I.N.A. trials were used by Congress propagandists to glorify the right to rebel against foreign rule."

সেদিনের জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ যথার্থই অনুধাবন করেছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দীদের মুক্তির দাবীর স্বপক্ষে না দাঁড়ালে জনগণের কাছে তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাবে! তাই জওহরলাল নেহরু, ভুলাভাই দেশাই প্রমুখ ছয়জনকে নিয়ে গঠন করা হল আই.এন.এ ডিফেন্স কমিটি! নেতাজীর ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে রাজনীতির প্রেক্ষাপটে! বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লীমেন্ট এটলীর কথায়, "We were sitting on the top of the volcano!"

কিন্তু কোন ভলক্যানোর কথা বলছেন এটলী ? প্রবল পরাক্রান্ত বৃটিশের ভয়টা ঠিক কোনখানে ? পট্টভি সীতারামাইয়া তাঁর ‘দ্য হিস্ট্রী অফ দ্য ইণ্ডিয়ান ন্যাশানাল কংগ্রেস’ গ্রন্থে লিখছেন, "It looked as though the I.N.A. itself eclipsed the Indian National Congress and the exploits of war and violence abroad threw into obscurity the victories of non-violence at home." (Vol-2: p-784)

কি সাংঘাতিক কথা! কংগ্রেসের নিয়ম-তান্ত্রিক আন্দোলন কি তবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে? ওদিকে বৃটিশ সমর বিভাগের রিপোর্ট অনুযায়ী, "The I.N.A. affair was threatening to tumble down the whole edifice of the Indian army."

এটলীর অবস্থা সত্যই সঙ্গীন!

আই.এন.এ.র বিচার পর্বে সত্যিই বৃটিশের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়েছিল ! কারণ যে দুইটি স্তম্ভ ভারতে বৃটিশের সাম্রাজ্যকে ধরে রাখতে বরাবর সাহায্য করে এসেছে, সেই জাতীয় কংগ্রেস এবং বৃটিশ সেনাবাহিনীর প্রভুভক্ত ভারতীয় সেনাদের উপর নেতাজী ও তাঁর আজাদ হিন্দ বাহিনীর প্রভাব দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছিল! পরিস্থিতির এই পরিবর্তনে বৃটিশের সামনে একটাই পথ খোলা ছিল, নেতাজীর পুনরাবির্ভাবের পূর্বেই মানে মানে বৃটিশভক্ত কংগ্রেস ও লীগ নেতৃত্বের কাছে শর্ত সাপেক্ষে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেওয়া! আর সেই লক্ষ্যেই সাম্প্রদায়িক ভাগ বাঁটোয়ারা করে দেশভাগের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নেতাজীর প্রভাব সম্পূর্ণ ধুয়ে দেওয়া! আর ঠিক সেটাই তারা করল!

জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্ব, আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতি সারা দেশের অনুরাগকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে সেই আবেগকে ইন্ধন করে দেশবাসীর আনুগত্য নিজেদের দিকে টেনে নিয়ে, ভারতবর্ষের রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা অনেকটাই বাড়িয়ে নিল! যার ফল পাওয়া গেল হাতে হাতে, ১৯৪৬এর ৪ঠা জানুয়ারী লালকেল্লা থেকে আই.এন.এ-র জেনারেল শাহনওয়াজ খান, কর্নেল সেইগল এবং ধীলন এর ঐতিহাসিক মুক্তির পর নির্বাচনে কংগ্রেসের জয়-জয়াকারে! বৃটিশ মুখপাত্র হিউ টয়ের মতে, এই বিচার পর্বেই বোঝা যায়, নেতাজীর এই অপরিসীম প্রভাব কংগ্রেসের রাজনৈতিক অগ্রগতির পক্ষে কতটা সুবিধে করে দিল! আর স্বভাবতঃই কংগ্রেসের এই অগ্রগতি বৃটিশের পক্ষে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিল!

আজাদ হিন্দ বাহিনীর সংগ্রামের দেশজোড়া আবেগের পিঠে সওয়ার হয়ে জাতীয় কংগ্রেসের এ হেন সাফল্যে বৃটিশের একটি দুর্ভাবনা ঘুচল! দেশবাসীর মনকে এবার নেতাজীর দিক থেকে ঘুরিয়ে আবার অহিংস আন্দোলনের সাফল্যের রূপকথায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা সহজ হবে! হলোও ঠিক তাই! আর এবিষয়ে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দের মতো বৃটিশের এমন সৃহৃদ আর কে আছে! অবশ্য মুসলীম লীগ নেতৃত্বও এই বিষয়ে জাতীয় কংগ্রেসের থেকে কোনো অংশেই পিছিয়ে ছিল না! আর এই দুই পক্ষের নাকের ডগায় সাম্প্রদায়িক বিভেদের উস্কানীমূলক ক্ষমতার ভাগ বাঁটোয়ারার টোপ ঝুলিয়ে দেশভাগের সুনিপুন ষড়যন্ত্রের খাল কেটে নেতাজীর আদর্শের চিরতরে সলিল সমাধি ঘটিয়ে তবেই দেশ ছাড়ল বৃটিশ! নিজের শর্তে!

১৯৪৬এ নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে সেদিনের পরিস্থিতি সম্বন্ধে সাবধান করে বলা হল, "Although the Indian National Army has been disbanded following the futile attempt to 'liberate' India with Japanese support; it is still an explosive political issue and more emotionally surcharged than any to be found here.... "

নেতাজী ও তার আই.এন.এ-র প্রভাব নিয়ে এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত ছিল ইঙ্গমার্কিণ শক্তি ! এবং আশঙ্কা যে মোটেই অমূলক ছিল না সেই সত্য প্রমাণ হল ১৮ই ফেব্রুয়ারী! শুরু হলো বিখ্যাত নৌবিদ্রোহ! বিদ্রোহের প্রথম সূত্রপাত বোম্বাইতে! তারপর ক্রমশ তা ছড়িয়ে পড়ল করাচী, মাদ্রাজ, বিশাখাপত্তম প্রভৃতি বন্দরে!

আবারও বৃটিশ মুখপাত্র হিউ টয়ের ভাষ্যে, "There can be little doubt that the serious naval mutinies and the unrest in the other two services early in 1946; owed something to its (I.N.A.) influence."

এবার দেখা যাক কি ছিল নৌবিদ্রোহীদের দাবীর মধ্যে! একটি প্রধান দাবী ছিল, আজাদ হিন্দ ফৌজের সমস্ত বন্দীদের দ্রুত মুক্তি দিতে হবে! সরাসরি আবারও নেতাজীর আই.এন.এ-র প্রভাব! আটাত্তরটি জাহাজের নৌসেনারা বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন একে একে! বৃটিশের পক্ষে মাত্র দশটি জাহাজ! সমস্ত জাহাজ থেকে বৃটিশের পতাকা নামিয়ে তোলা হল কংগ্রেস, লীগ ও কম্যুনিস্ট পার্টির পতাকা! নৌবাহিনীর নাম পরিবর্ত্তন করে রাখা হল, ইণ্ডিয়ান ন্যাশানাল নেভি!

তরুণ নৌসেনাদের এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যে আহ্বান জানানো হলো বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাদেরকে! বিদ্রোহী নৌসেনাদের নিয়ে গঠিত সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি এম এস খান তাঁর সহযোগীদের নিয়ে রাজনীতিবিদদের কাছে গিয়ে হতবাক হয়ে গেলেন! কেউ তাদের ডাকে সাড়া দিতে রাজী নয়! সবচেয়ে বড়ো ধাক্কা খেলেন লৌহমানব, জাতীয় কংগ্রেসের নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের কাছ থেকে! নেহরু রুষ্ট হয়ে উঠলেন নৌবিদ্রোহের সমর্থনে হরতাল ডাকায় ! গান্ধী বললেন, "Why should they continue to serve; if service is humiliating for them or India."
প্যাটেল বললেন, "...Bunch of young hotheads messing with things they had no business in.."

টাইমস অফ ইণ্ডিয়ায় লেখা হল, "As a result of the extravagant glorification of the I.N.A. following the trials in Delhi; there was released throughout India a flood of comment which had inevitable sequel in mutinies and alarming outbreaks of civil violence..."

নিউইয়র্ক টাইমসের মতে, "....Stimulated by the propaganda of CHANDRA BOSE; the pro-Japanese leader who had won followers among Moslems and Hindus alikes...."

বৃটিশ মন্ত্রীসভায় বড়লাট লর্ড ওয়াভেল প্রেরিত রিপোর্টে পরিস্কার জানানো হলো, পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ! সর্বস্তরের মানুষের কাছেই বৃটিশ সরকার অপ্রিয় হয়ে উঠছে!

আবুল কালাম আজাদের মতে, "A most remarkable change had in the meantime come about in all the public services..all the three branches of the Armed Forces -the Navy; the Army; and the Air Force -were inspired by a new spirit of patriotism...these sentiments were wide-spread; not only among officers but also among the ranks."

এই রকম অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার বদলে সেদিন বৃটিশের প্রধান সহায় হয়ে দাঁড়ালো জাতীয় কংগ্রস ও মুসলীম লীগের নেতৃবৃন্দ! এটাই ভারতবর্ষের ইতিহাস !
নেতাজীর ভাবাদর্শের ছোঁয়ায় গোটা দেশ যখন দেশপ্রেমে সংগ্রাম মুখর, তখনই আঘাত এল ঠিক পেছন দিক থেকে!

নৌবিদ্রোহীদের নেতাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল! লৌহ মানব! তিনি তাদের প্রতিশ্রুতি দিলেন, তাদের সব দাবী-দাওয়া পূরণের জন্যে বৃটিশের সাথে তারা কথা বলবেন! নৌবিদ্রোহীদের যাতে কোনো শাস্তি পেতে না হয়, সেই বিষয়ে কংগ্রেস তাদের পাশে থাকতে অঙ্গীকারাবদ্ধ ! বাদ গেল না মুসলীম লীগও ! মহম্মদ আলী জিন্না তাদের জানালেন, তাদের প্রতি যাতে ন্যায় বিচার হয়, তিনি ও লীগ সর্বতোভাবে সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখবেন এবং তাদের অভিযোগ পুরণের জন্যেও তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন! ২২শে ফেব্রুয়ারী ১৯৪৬! বিদ্রোহীরা সেই প্রতিশ্রুতি মত সমস্ত সেন্টারে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেন ! হাঁফ ছাড়ল বৃটিশ! এবার ডাইরেক্ট একশন!

জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের নেতৃবৃন্দের প্রতিশ্রুতি পেয়ে বিদ্রোহী নৌসেনারা যখন যুদ্ধ বন্ধ করে, প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণের আনন্দে মাতোয়ারা, ঠিক তখনই বৃটিশ সৈন্য বোঝাই যুদ্ধ জাহাজগুলি থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে কামানের গোলা ছুটে এল তাদের দিকে তাক করে! প্রথমে শান্তির পতাকা লাগানো বৃটিশের যুদ্ধ জাহাজগুলি এগিয়ে আসতে দেখে তারা ভেবেছিল, তাদেরই সমসাথীরা প্রীতিবিনিময় করতে এগিয়ে আসছে জাতীয় নেতাদের প্রতিশ্রুতি পেয়ে! কিন্তু শান্তির পতাকার আড়াল থেকে ছুটে এল বৃটিশের লক্ষ্যভেদী গোলা!
জাতীয় নেতারা বৃটিশের কথা মতো কাজ করেছেন! এবার বৃটিশের পালা তাদের হাতে নিরাপদে ক্ষমতা হস্তান্তর করে যাওয়া! পারস্পরিক স্বার্থরক্ষার চুক্তি!

ফণিভূষণ ভট্টাচার্য তার নৌবিদ্রোহের ইতিকথায় সেদিনের এই চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে জানান অতর্কিত এই হানায় বিদ্রোহীদের দেড়শর ওপর সৈন্য অকুস্থলেই শহীদ হন! কিন্তু তাতেও দমবার পাত্র ছিলেন না কেউ কেউ! বীর সৈনিক মদন সিং "খাইবার" জাহাজের বেতারে আবার যুদ্ধ ঘোষণা করলেন! অল আউট যুদ্ধের ডাক দিয়ে শুরু করলেন গোলাবর্ষণ! দেশের জনগণের উদ্দেশে বললেন, " See our national leaders. They are nothing but traitors of our motherland..." ফলে লড়াই করেও বিনা শর্তে আত্মসমর্পণে বাধ্য হতে হল তাদের! কিন্তু আজও বিশেষ জানা যায়নি, কত হাজার জন গ্রেফ্তার হয়েছিল, বা কার কি শাস্তি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত!

পেছন দরজা দিয়ে কুটকৌশলে নৌবিদ্রোহ দমন করলেও বৃটিশ প্রশাসন বুঝে গেল ভারতীয় সৈন্য দিয়ে আর আগের মত ভারতবর্ষকে পদানত রাখা যাবে না! কারণ, এই সৈন্যদের মধ্যে আজাদ হিন্দ বাহিনী ও নেতাজীর প্রভাবে স্বাধীনতার আকাঙ্খা জেগে উঠছে! এখন আর তারা শুধুমাত্র বেতনভুক্‌ কর্মী নয়, স্বাধীনদেশের সৈন্যরূপেই নিজেদের ভাবতে চাইছে! ফিল্ড-মার্শাল অকিনলেক রিপোর্ট পাঠালেন; সেই সময়ে ৬,৭০৪ জন অফিসার সহ প্রায় ২২ লক্ষ ভারতীয় সৈন্যের মধ্যে প্রায় ৭০% সৈন্যই আই.এন.এ-র প্রতি সহানুভূতিশীল এবং স্বাধীনতার পক্ষে! বৃটিশ দেখল এই অবস্থায় নেতাজী একবার ভারতে ফিরে এলে, একজন বৃটিশও হয়ত জ্যান্ত ফিরতে পারবে না বৃটেনে! সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল তারা!
১৯৪৫-এর ১৮ই আগস্টের তাইহোকুর বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যুকে ইঙ্গমার্কিণ শক্তি আদৌ বিশ্বাস করেনি বলেই তারা ভেবেছিল ১৯৪৬-এর মতো অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে নেতাজী একবার ফিরে এলে গোটা ভারতবর্ষে গণবিপ্লব ঘটে যাবে! খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের মতো বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের সহায়ক দলগুলি! ফলে চিরকালের মতোই ভারতবর্ষ হাতছাড়া হয়ে যাবে তাদের! লণ্ডন অবজারভারে লেখা হল, "India today is a vast powder magazine with exclusive potentialities exceeding those at any period of Indo-British history since Mutiny."

ঠিক, না আর ঝুঁকি নেওয়া যায় না! এই ঝুঁকি এড়াতে গেলে শাসনক্ষমতা হস্তান্তরিত করে যাওয়াই ভালো!

এই সময় বৃটিশ দুটি কাজ করল একসাথে! প্রথমেই জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের নেতৃবৃন্দকে সতর্ক করে দেওয়া হল, ভারতীয় রাজনীতি যেভাবে নেতাজীর বৈপ্লবিক ভাবাদর্শ ও আই.এন.এ-র প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ছে, তাতে ভারতীয় রাজনীতির ভরকেন্দ্র গান্ধী-জিন্নার সমর্থকদের হাত থেকে চন্দ্রবোসের অনুগামীদের হাতে চলে যেতে পারে! ফল মিলল হাতে হাতে! রাজনীতির সমস্ত স্তর থেকেই মুছে ফেলা শুরু হল নেতাজী ও আই.এন.এ-র প্রভাব! ইতিহাসের পাতায় নির্বাসিত করা হল, উপমহাদেশের ভাগ্য পরিবর্ত্তনের এই নির্ণায়ক অধ্যায়! আর এই সূত্রেই উপমহাদেশের তিন অংশেই নেতাজীকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়েছে গত সাত দশকে! সত্য বড়ো কঠিন! বলেছিলেন বিশ্বকবি!

দ্বিতীয়ত, বৃটিশ ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে, সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশভাগের গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল! এ বিষয়েও সহযোগী রূপে কাছে টেনে নিল কংগ্রেস ও লীগ নেতৃত্বের প্রধান অংশকে! এই কাজে বাংলা, বিহার, পাঞ্জাবে গোপনে অস্ত্র ও গুণ্ডাবাহিনী সরবরাহ করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়ে, দেশভাগের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, নেতাজী ও আই.এন.এ-র প্রভাবিত অসাম্প্রদায়িক ঐক্যবোধের স্বদেশচেতনাকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হল সহজেই! আর এই পথেই সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশভাগ করে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে উভয় পক্ষের টিকিই ইঙ্গমার্কিণ শক্তির হাতে শতাব্দীব্যাপী বাঁধা রাখা নিশ্চিত করল বৃটিশ প্রশাসন! আজ যা কঠোর বাস্তব!

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা! দেশভাগ! একদিকে চৌদ্দো পুরুষের ভিটেমাটি, সহায় সম্পদ, জীবিকা ত্যাগ করে সীমানা পেরিয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয়! নতুন জায়গায় নতুন করে শূন্য থেকে জীবন শুরু করার কঠোর সংগ্রাম! আর একদিকে স্বাধীন দেশের ক্ষমতাতন্ত্রের চাকভাঙ্গা মধু খেতে দলতন্ত্রের রাজনীতিতে বুদ্ধির শান দেওয়া! এসবের মাঝে কত সহজেই তলিয়ে গেলেন নেতাজী তার অসাম্প্রদায়িক দেশপ্রেমের দুর্ম্মর ভাবাদর্শ নিয়ে! বিস্মৃতির অন্তরালে চলে গেল আই.এন.এ! নৌবিদ্রোহের অকথিত কাহিনী, বিশ্বাসঘাতকতার নির্লজ্জ ইতিহাস সব- সবই ধামা চাপা পড়ে গেল বৃটিশ ও তার ভারতীয় সহযোগীদের সুনিপুণ কৌশলে! এটাই সেদিনের ইতিহাস! ইঙ্গমার্কিণ শক্তির দুরন্ত সাফল্য!

রাজনৈতিক ইতিহাসের এটাই এক সাধারণ ধর্ম! ক্ষমতার কেন্দ্রে বিজয়ী শক্তির অঙ্গুলি হেলনে অর্দ্ধসত্যের সাথে অসত্যের জাল বুনে প্রচারিত হয় জনসাধারণকে পরিচালিত করার জনপ্রিয় ইতিহাস! রামায়ণ মহাভারতের যুগ থেকে শুরু করে এটাই মানব সভ্যতার চরম সত্য! উপমহাদেশের স্বাধীনতার নামে ক্ষমতা হস্তান্তরের ইতিহাসে আজ তাই ব্রাত্য নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস ও তাঁর বৈপ্লবিক ভাবাদর্শ! স্বাধীন ভারতের সৈন্যবাহিনীতে ঠাঁই হয়না আজাদ হিন্দ ফৌজ ও নৌবিদ্রোহের দেশপ্রেমী বীর সেনানীদের! ইতিহাসের পাতায় তাদের ত্যাগ, বীরত্ব ও কৃতিত্বকে ধামাচাপা দেওয়া হয় নিপুণ কৌশলে! প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অস্পষ্ট হতে থাকে প্রকৃত ইতিহাসের অকথিত কাহিনী!

অথচ সেদিন ইঙ্গমার্কিণ শক্তি হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে নেতাজীকে! কোথায় অন্তর্ধান করল চন্দ্রবোস! ভারতে ঢোকার সমস্ত পথে অতন্দ্র প্রহরা! কোনো ভাবেই যেন ভারতে ঢুকতে না পারে নেতাজী! কিন্তু বিশ্বাস নেই লোকটাকে! নিশ্ছিদ্র প্রহরার জাল কেটে বেড়িয়ে গিয়েছিল লোকটা! বারবার চেষ্টা করেও তারপর আর তার নাগাল পায়নি, প্রবল পরাক্রান্ত ইঙ্গমার্কিণ শক্তি! তাই আর ঝুঁকি নিয়ে বেশিদিন অপেক্ষা করতে পারেনি বৃটিশ মন্ত্রীসভা! ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্যে ১৯৪৮ সালকে স্থির করলেও একবছর আগেই এদেশে তাদের সহযোগীদের হাতে তড়িঘড়ি ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়ে চলে যেতে হল তাদের! এতটাই প্রবল ছিল সেদিন নেতাজী ছায়া বৃটিশের আতঙ্কসরূপ হয়ে!

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসের ছায়া কতটা প্রবল ছিল সেদিনের বৃটিশ প্রশাসনে, সেকথা লেখা আছে মাইকেল এডওয়ার্ডসের ‘দ্য লাস্ট ইয়ার্স অফ বৃটিশ ইণ্ডিয়া’ গ্রন্থে! লেখকের মতে, "The ghost of Subhas Bose; like Hamlet's father; walked the battlements of the Red Fort; and his suddenly amplified figure over-awed the conferences that were to lead to independence."
এখানেই শেষ নয়! বৃটিশ মুখপাত্র হিউ টয়ের মতে, "There can be little doubt that the Indian National Army; not in its unhappy career on the battlefield; but in its thunderous disintegration; hastened the end of British rule in India."

ইতিহাসের কি করুণ পরিণতি! যে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্যে নেতাজীর এতবড়ো সংগ্রাম, যে সংগ্রামে তাঁর ডাকে হাজার হাজার ভারতীয় সামিল হয়েছিলেন, যে সংগ্রামে শতশত আজাদী-সৈন্য শহীদ হল, যে সংগ্রামের প্রভাব পড়ল বৃটিশ সেনাবাহিনীর সকল বিভাগে কর্মরত ভারতীয় সৈন্যদের ওপর; সেই স্বাধীনতা এল না! অথচ তার বদলে তথাকথিত ভারতীয় স্বাধীনতার নামে ক্ষমতার হস্তান্তর হল পেছনের দরজা দিয়ে সেই নেতাজীরই পুনরাবির্ভাবের আতঙ্কে! আজ এসত্য স্পষ্ট, ১৯৪৫এর ১৮ই আগস্ট সত্যি সত্যিই তাঁর মৃত্যু হলে বৃটিশ অত তড়িঘড়ি পাততাড়ি গোটাতো না! কিন্তু একথাও সত্য, পাততাড়ি গোটালেও তারা নেতাজীর স্বপ্নের স্বাধীনতাকে চিরতরে ব্যর্থ করে যেতে সফল হয়েছিল সেদিন!
====উপসংহার====
দেশবিভাগের লজ্জার মধ্যে দিয়ে এল ১৯৪৭-এর ১৫ই আগস্ট! সম্পূর্ণ বৃথা গেল নেতাজীর আকুল আবেদন! "I have no doubt that if India is divided; she will be ruined. I vehemently oppose the Pakistan scheme for the vivisection of our motherland; our divine motherland shall not be cut up."

অথচ ক্ষমতার মধুলোভী রাজনীতিবিদরা সেদিন দেশভাগের জন্যে বৃটিশের ষড়যন্ত্রে সামিল হতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি! তারাই স্বাধীন ভারতে নেতাজী, তাঁর ভাবাদর্শ ও আই.এন.এ-র বীর সেনানীদের সবরকম ভাবে একঘরে করে রাখার সুবন্দোবস্ত করেছিলেন অনমনীয় দৃঢ়তায়!

স্বাধীন ভারতে আই.এন.এর সৈন্যরা কি পুরস্কার পেয়েছিল দেখা যাক!

লৌহমানব সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল

"Sardar Patel; India's first Home-Minister; explained to me in 1950 that he had been very careful indeed not to reinstate any of the officers who had gone over to Subhas Bose's I.N.A. He also saw to it that they did not thrive in politics."
[Reporting India: Taya Zinkin]

এবার জাতির জনক নেহরু!

"He (Nehru) wanted them to be kept out of politics and made no hint of any possibility of their being reinstated in the Indian army before or after the transfer of power."
[The Indian National Army: K.K.GHOSE.]

আর মহাত্মা গান্ধী? তিনি আজাদী সৈনিকদের চাষ-আবাদ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন নিজের নিজের গ্রামে ফিরে গিয়ে!
ইতিহাসের পাতায় আজও তাই একঘরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়!

Tuesday, February 5, 2019

সময়-সংকট

চরিত্রে-

সেলিনা  -- ১০/১১ বছরের মেয়ে। ক্লাস ফাইবে পড়ে।

গৈরিকা -- সে ও একই বয়সের। একই ক্লাসে।

কবির -- ১৩-১৪ বছরের ছেলে। মেট্রিকের ছাত্র।

( ইংরেজি বিদ‍্যালয়ের এরা ছাত্র-ছাত্রী। তিনজন একই স্কুলে পড়ে। তাই তিনজনের আগের থেকেই পরিচয়। স্কুলে টিফিনের সময় সেলিনা লাইব্রেরি থেকে হারমোনিয়াম এনে "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো" গানটি গলায় তুলবে। গান টা শুনে পাশদিয়ে যাওয়া কবির থেমে যায়। শ্রেণী কক্ষে প্রবেশ করে সেলিনার সাথে মাথা নাড়িয়ে গুনগুন করবে। পাশের টেবিলে গৈরিকা ইংরেজি বইটা পড়তে থাকবে। টিফিনের পরে মেডাম আসবেন। তাই রিভাইস দিচ্ছে। একটু জোরে পড়বে। )

সেলিনা--- হু হু হু হু হু.... " আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমিকি ভুলিতে পারি( গলা ঠিক করবে) সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজিয়ে)

কবির-- এই সেলিনা, বাহ্ দারুণ তো! গেয়ে যা।  আমি তাল দিচ্ছি।

সেলিনা-- আরে কবির দা যে, এসো এসো। গানটা প্রক্টিস করছি। বিকেলে একটা অনুষ্ঠান আছে।। একটু দেখিয়ে দিও।

কবির--- হ‍্যাঁ রে। আমি তো ভুলেই গেছি আজ যে একুশে ফেব্রুয়ারি। ঠিক আছে ঠিক আছে। গান টা গা তো। এই গান শুনলেই নিজেকে আর সামলে রাখতে পারি না , বুঝলি।

সেলিনা-- ঠিক আছে কবির দা। তুমি একটু দেখিয়ে দিও।(আবার শুরু)
" আমার ভাইয়ের রক্তে...." (সাথে কবির ও তাল দিচ্ছে)

গৈরিকা--- আরে বাবা, তোরা একটু আস্তে করবি! কেনো ডিসটার্ব দিচ্ছো। পিসফুলি কোন একটা জায়গায় থাকতে পরিনা।

সেলিনা--- কি হয়েছে রে? কি ডিসটার্ব দিচ্ছি। এখন টিফিনের সময়। অসুবিধা হবে কেন।?

গৈরিকা--- বুঝতে পারছিস না কেনো অসুবিধা হচ্ছে। একটু পরেই মেম আসবেন তখন বুঝবি। আর কি এসব গান। কোত্থেকে পেয়েছিস?

সেলিনা--- আরে.....! বলিস কি রে। এই গান তুই জানিস না! এতো আমাদের গর্ব, আমাদের ঐতিহ্য।

গৈরিকা--- হা--হা---হা ( হাসতে হাসতে বলবে)
একথা তুই বলছিস! এই গান ঐতিহ্য, গর্ব। তোর মুখে এসব শোভা পায়!  নেহা কক্কর কে তো একদম গুলিয়ে নিয়েছিস। আজ আবার কোত্থেকে বাঙালিয়ানা এসে গেছে তোর মাঝে?

সেলিনা--- কেন? আমি বাঙালি না! তুই বুঝবি না। এই গানের গভীরতা কতটুকু।

( কথোপকথন চলছে তো হঠাৎ চেয়ার থেকে কবির উঠে দুজনের সামনে দাঁড়াবে )

কবির--- এই এই এই। শুন শুন এসব কি শুরু করেছিস তোরা?

সেলিনা--- দেখেছো কবিরদা গৈরিকার কাণ্ড। কি যা তা বলছে।

গৈরিকা--- ঠিকই তো বলছি। আর কবিরদা ......। তুমিতো এনরিকের ফলোয়ার! তোমাকে তো একদিনও দেখিনি বাংলা গান গাইতে।

সেলিনা--- এই শুনো ওর কথা। কবিরদা তুমিই কিছু বলো।

কবির--- শুন্ গৈরিকা, ইংরেজি বা হিন্দি গান গেলেই যে নিজের পরিচয় ভুলে যাবো তা তখনই সম্ভব নয়। সেদিনও তো এন‍্যুয়েল ফেস্টিভ্যালে " আগুনের পরশমণি" গেয়েছি। শুনছিস না। আমি বাঙালি।বাংলা আমার পরিচয়।

গৈরিকা--- না বাবা, আমি এত্তো সবে নেই। বাংলাতে কি আছে বলো।

কবির--- আরে পাগলি। বাংলাই তো সব।
" বাংলায় জীবন, বাংলায় মরণ (আবৃত্তির মতো)
এই বাংলার জন‍্য প্রাণ দিল ২১-১৯ শে'র শহীদগণ"।

গৈরিকা--- কি এই ২১-১৯। কি বলছো এসব। আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা।

কবির--- শুন্ তাহলে। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে রফিক, বরকত ওরা আটজন তরুণ যুবক রক্তাক্ত হয়েছিল। আর ১৯৬১ সালের ১৯ শে মে আমাদের শিলচরে ঠিক একই ভাবে বাংলা ভাষার জন্য ১১ টি তাজা প্রাণ রক্তাক্ত হয়েছে পুলিশের বুলেটে। এই সংঘর্ষে কমলা ভট্টাচার্য নামে প্রথম মহিলা যিনি শহীদ হয়েছিলেন। তাই ২০১০ সালে রাষ্ট্রসংঘ ২১ শে ফেব্রুয়ারি " আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস" হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

গৈরিকা--- ও আচ্ছা আচ্ছা। তাই বুঝি সেলিনা 'আমার ভাইয়ের.....' নাকি গানটা গাইছে শুধু আজকের জন্য।!

কবির--- আরে না না। শুধু গান কেন বা আজকের জন‍্যই বা কেন। এতো আমাদের গর্ব আমাদের অহংকার। প্রতিটা মূহুর্তে আমাদের স্মরণ করতে হবে। এই ভাষাকে ভালোবাসতে হবে।

গৈরিকা--- বুঝলাম সব। তবে এতো ভালোবাসার কথা বলছো আর নিজে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ছো।

সেলিনা--- শুনছো কবির দা ওর কথা।

কবির--- তোরা ঝগড়া করবি না আমার কথা শুনবি।

সেলিনা--- আচ্ছা বলো।
কবির--- গৈরিকা ঠিকই বলেছে! আমি কেন ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ি বা ইংলিশ গান-টান গাই।

গৈরিকা--- হ‍্যাঁ, উত্তর টা দাও কবির দা।

কবির--- তবে শুন্, ইংরেজি পড়লেই যে নিজের পরিচয় ভুলে অন‍্যের টা গ্রহণ করতে হবে এটা কোন বাধ‍্যবাধকতা  নেই।  তা হয় না। ইংরেজি জানার জন্য পড়ি। ভালোবাসা শুধুই বাংলার প্রতি। মরতে পারি বাংলার জন‍্যই। কারণ আমি বাঙালি।

গৈরিকা---- না বাবা আমি এসবের মধ্যে নেই। কি আছে বলো বাংলায় এক রবিঠাকুরের নোবেলটা ছাড়া। আর হাই কুয়ালিফিকেশনের জন্য ইংলিশ ছাড়া........... অসম্ভব।

Friday, February 1, 2019

অহিংসার এখন কোন পথে পা বাড়াচ্ছে

Shashi Tharoor clarifies Gandhi’s philosophy of non violence, “Satyagrah (literally holding on to truth) and adds there is no denying Gandhi’s greatness. While the world was disintegrating into fascism, violence and war, Gandhi taught the virtues of truth, non-violence and peace. He destroyed the credibility of colonialism…. Yet Gandhi’s truth was essentially his own….. Gandhi’s “triumph” did not change the world forever. It is, sadly, matter of doubt whether he triumphed.”

"অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা প্রসারিত করেছেন যিনি মানুষের মাঝে। যার সংগ্রামে ছিল অহিংস। তারপর নৃশংস হত্যা। যদিও ছিল ওরা সেলের ভিতরে, তবে কেন উন্মুক্ত মৌলবাদীরা"

যুগে যুগে কিছু মানুষ আসেন যাদের নেতৃত্ব দশর্ন পাল্টে দেয় দুনিয়াকে দেশকে দেশের মানুষকে। যার আলোয় আলোকিত হয় মানুষ ও দেশ। তেমনি একজন মানুষ মহাত্মা গান্ধী। একটি নাম, একটি আদর্শ, একটি অহিংস মানবতাবাদী স্মরণীয়-বরণীয় চরিত্র। একজন মহান মানবের পক্ষেই এমন বিনয়ী উচ্চারণ সম্ভব। তিনি সত্যাগ্রহ ও অহিংসনীতি দ্বারা নিপীড়িত ভারতবাসীকে জাগিয়ে তুলে ভারতবষের্র স্বাধীনতা আন্দোলনে অবিস্মরণীয় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ভারতবাসীকে মুক্তি দিয়েছিলেন। যা পৃথিবীর ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। পৃথিবীর যেখানেই নিযাির্তত, নিপীড়িত মানুষের কান্না শুনেছেন, সেখানেই ছুটে গিয়েছেন গান্ধীজি। যেখানেই বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা রক্তপিপাসু রূপ নিয়েছে, সেখানেই তিনি প্রসারিত করেছেন শান্তির ও সাম্যের হাত।

আত্মকথা অথবা সত্যের প্রয়োগ গ্রন্থে তিনি বলেছেন- ‘১৯০৮ সালের পূর্ব পর্যন্ত আমি চরখা কি তাঁত দেখেছি বলে আমার স্মরণ হয় না। তাহা হলে আমার ‘হিন্দ স্বরাজ’ বইতে ভারতবর্ষে চরখার সাহায্যেই দারিদ্র্য দূর করা যায়, ইহা আমি বলেছি। আমি ধরে নিয়েছি, যে পথে দেশের ক্ষুধা মিটবে সে পথেই স্বরাজ আসবে।’ তিনি ওই পথেই সফল হলেন। ভারতবাসীকে পরাধীনতা থেকে মুক্তি দিলেন।দেশের মানুষের জন্য যার জীবনের সব অর্জন উৎসর্গ করা তাদের বলি হতে হয় নষ্টদের হাতে। তার প্রমাণ মহাত্মা গান্ধী নিজে। পশ্চাৎপদ ভারতীয়দের সামনে যিনি আলোর মশাল হাতে নিয়ে ছিলেন তাকেও ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গুলি করে হত্যা করা হয়। সে সময় তিনি নয়াদিল্লিতে পথসভা করছিলেন। । নাথুরামের সঙ্গে চরমপন্থি হিন্দু মহাসভার যোগাযোগ ছিল। গডসে এবং সহায়তাকারী নারায়ণ আপতেকে পরবর্তীতে আইনের আওতায় এনে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আজ এই আদর্শের কতটুকু মূল‍্যায়ন হচ্ছে? না জুমলা বাজি চলছে। ধর্মের ভিত্তিতে আমরা নিজেকে গুটিয়ে রাখছি, চলছে বিভাজনের কার্যপ্রণালী, সাধারণ মানুষ লাঞ্চিত হচ্ছে প্রতিটা প্রতিশ্রুতিতে। এটাই কি চাইছি গডসের আদর্শে নিজেকে তৈরি করি! শিক্ষিত , ধর্মিয় আদর্শবাদি নাথুরামের  চাওয়া অখন্ড ভারত হচ্ছে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারত। সেই ভারতেরই আজ জয়জয়কার। ভোটের হরির লোটে আর পুঁজিবাদী দখল হয়ে যাচ্ছে বিদ্যায়তন আর চিন্তার জগত ধর্মিয় উম্মাদনায়। শক্তি সঞ্চয় করে এগিয়ে যাওয়া শক্তিমান হিন্দুত্ববাদি ধ্যান-ধারণাই কথিত প্রগতিশীলতাকে দুর্বল করে ফেলছে । গান্ধীজীর অহিংসার ধারণা পেছনে পড়ে যাচ্ছে। এটা শুধু ভারতের রোগ নয় , গোটা পৃথিবীই এই হিংসার কর্কট রোগে আক্রান্ত।ধর্মের নামে , উন্নয়নের নামে, ‘আমিই শ্রেষ্ঠ’-এই বিবেচনার তুলাদন্ডে মূলত হিংসাই এখন শত্রু নির্ধারণ করে তাকে নির্মুল করতেই বদ্ধ পরিকর।তাই প্রশ্ন থাকছেই, মহাত্মা গান্ধীর অহিংসাবাদ কি তাঁর চন্দন কাঠ-ঘি আর সুগন্ধিমিশ্রিত চিতাভস্মের  সাথেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে!

Thursday, January 31, 2019

গৌরী লঙ্কেশ: এক প্রতিবাদী কণ্ঠ


"In your eyes, In your eyes
In your eyes
I can see....
Your unfinished story.

I realize, realize, realize
I realize
That somebody
Didn't want your Voice free

..."--------- Arati Rao

গৌরীকে নিয়ে আমার অধ‍্যয়ন শুরু সেই জয়পুরে সলমন রুশদি ইনসিডেন্টের পর থেকে। গর্জে উঠেছিল তাঁর কন্ঠ অন‍্যায় ও অপশক্তির বিরুদ্ধে। সাংবাদিক হিসেবে ছিলেন প্রবল যুক্তিবাদী। তাঁর মধ্যে ছিল প‍্যশন ইন জার্নালিজম। গৌরী লঙ্কেশ এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদী ব‍্যক্তিত্বের নাম। বাবার রেখে যাওয়া "লঙ্কেশ" পত্রিকায় বিরুদ্ধাচারী শক্তির বিরুদ্ধে আবার গর্জে উঠে তার সম্পাদিত কলম। গৌরী শুধু নাম নয় প্রতিবাদী ভাষা। যে আগুন ধরিয়েছো তুমি আমরাই নিয়ে যাবো সেই পদাঙ্ক অনুসরণে। আজও তোমার প্রতি একই ভাব গৌরী। এখানে সত‍্যের বিপরীতে অভিনয়।

আমরা জানি, প্রত‍্যেকটা দিন বাঁচাতে হয় এমন উদ‍্যমে যে আজ অন্তিম দিন। কিন্তু কি হবে যদি আপনার জীবন প্রকৃতিগত নিয়ম ছেড়ে দুষ্কৃতীদের মর্জি মতো  হয় যে আপনার আওয়াজ বন্ধ করার চেষ্টা করতে থাকে, আর আপনাকে দূরে ঠেলে দেয়। যেকোনো মামলায়, যেকোনো বিষয়ে গৌরী নিজ দরজার সামনে মৃত্যু কে রেখে জীবনের উচিৎ মূল্যায়ন করতেন। ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং বিকেলে ৫৫ বর্ষীয়া বলিষ্ঠ সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ কে উনার ঘরে গুলি করে হত্যা করা হয়। গোটা ভারত আহত হয়েছিল, কিন্তু একটা কথা স্পষ্ট ছিল। হত্যার এক দৃঢ় সাক্ষ্য ইহা ছিল যে গৌরীর আওয়াজ এমন কিছু গোষ্ঠীর কানে পৌঁছে গেছিল, যা তাদের জন্য স্বাস্থ্য সম্মত ছিল না।

১৯৬২'র ২৯ শে জানুয়ারি সকালে মেয়েটির জন্ম হয়। গৌরী যখন বেশ ছোট তখন দুরারোগ্য রোগ মস্তিষ্ক-জ্বরে হয়ে ছিলেন। উৎকন্ঠিত বাবা-মা'র মনে ভয় ছিল, মেয়েটি বোধহয় চেতনা হারাবে নাহয় অন্ধ হয়ে যাবে। সুস্থ হয়ে ওঠে তার শরীর। যেভাষা কখনই পড়তে পড়তেন না, বুঝতেন না। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর কন্নড় ডুকে যায় রক্তে। জেদী মেয়ে দীর্ঘ পনেরো বছর বিজ্ঞাপন ছাড়াই "লঙ্কেশ" পত্রিকা সম্পাদনা করে যান বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে।পল‍্য লঙ্কেশ আর ইন্দিরা লঙ্কেশের মেয়ে কেরিয়ারে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতার কাজ, ডাক্তার হওয়ার বদলে। তিন ভাই-বোনের সবচেয়ে বড় গৌরী ১৯৮০'র দশকে "টাইমস অফ ইন্ডিয়া" পত্রিকার মাধ্যমে কেরিয়ার শুরু করেন। এমনকি ২০০০ সন পর্যন্ত পিতার মৃত্যুর পর ১৬'র চেয়ে অধিক বর্ষ পর্যন্ত সাংবাদিক রূপে কাজ করেন।

২০০০ সালে পি. লঙ্কেশের মৃত্যুর পর "লঙ্কেশ" পত্রিকার দায়িত্ব গৌরী ও তার ভাই ইন্দ্রজিৎ এর কাঁধে ন‍্যাস্ত ছিল। প্রথম দিকে গৌরী পত্রিকাটির সঞ্চালনা বন্ধ করার পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু প্রকাশক মণি'র জোরজবরদস্তি তে আবার চালিয়ে নেওয়ার নির্ণয় নেন। ছোটভাই ইন্দ্রজিৎ ব‍্যবসায়ীক দিক দেখাশুনা করতেন আর গৌরী সাপ্তাহিক সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন।

সাক্ষাৎকারের সময় অনেকবারই ওর মুখে শুনা যেতো, "লঙ্কেশ" পত্রিকার কামান সামলানোর উদ্দেশ্য ওরজন‍্য কোনো কঠিন কাজ পুরো করা এবং গৌরী এর সঞ্চালনার জন্য সব ধরণের প্রয়াসও চালিয়ে যেতেন। ২০০৫ এর শেষের দিকে যখন ভাই-বোনদের মধ্যে ঝগড়া বাধে তখন গৌরী সম্পাদনা ছেড়ে আলাদা ভাবে পত্রিকা চালিয়ে যান। এরপর নিজের সাপ্তাহিক "গৌরী লঙ্কেশ" পত্রিকা চালু করেন, যেখানে গৌরী ২০১৭ সাল অর্থাৎ মৃত্যু আগমূহুর্ত পর্যন্ত সম্পাদক হিসেবে নিয়জিত ছিলেন।

দেড় দশকের জমকালো কেরিয়ার ছেড়ে ইংরেজী সাংবাদিকতার পেশা পিছনে ফেলে নিজের রাজ‍্যের,নিজের ভাষায় কেটেছে তার ব‍্যস্ত জীবন। কেবল কর্ণাটক নয় সারা ভারতের ঘটনা, সংখ্যালঘু-দলিত বিরোধী আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, তার কাগজে সম্পাদকীয় পাতায় উঠে আসতো তীব্র প্রতিক্রিয়া। গৌরীর কাছে ছিল মানুষের ভাষা বুঝার, মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার উচ্চ মানসিকতা। বয়স কোনো বাধাই ছিল না তার বন্ধুত্বে। বিশিষ্ট নাট‍্যকার, বুদ্ধিজীবী ইউ আর অনন্তমূর্তী,বি ভি করনু,কে পি পূর্ণচন্দ্র,তেজস্বীর মতো ব‍্যক্তিবর্গ ছিলেন তার ফ্রেন্ড লিষ্টে। আবার রূপান্তরকামী রেবতীর জীবন কাহিনী তামিল থেকে অনুবাদ করিয়ে ছাপতেও তার ছিল সমান আগ্রহ।

মৃত্যুর আগ মূহুর্ত পর্যন্ত, গৌরী লঙ্কেশের উদারবাদী বামপন্থী হিসেবে নাম ছিল। তিনি 'হিন্দুত্ব' রাজনীতির সাথে সাথে জাতী ব‍্যবস্থার ও খুব সমালোচনা করতেন। তিনি হিন্দু ধর্ম কে 'পদানুক্রমিক প্রণালী' বলে মানতেন। কারণ এই ধর্মে মহিলাদের"দ্বিতীয় শ্রেণির প্রাণী" বলে মানে। নিকস্থ ব‍্যক্তিগনের বক্তব্য মতে, গৌরী আলোচনা করার সময় এমন গভীরে প্রবেশ করতেন যে সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু এসবের পরও গৌরীর মধ্যে পিছপা দেয়া বা নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার কোনো অবকাশ ছিল না। ২০০৬ সালে কর্ণাটকের শিমোগা শহরে এক সাহিত্য অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল কিন্তু আর এস এস এই অনুষ্ঠানে গৌরীর অংশগ্রহণের বিরোধিতা করে। জীবনে অনেক কিছুর সাথে গৌরীর লড়াই হয়। এমনকি তাঁকে নকশালী সমর্থক বলা হতো। ফেব্রুয়ারি২০০৫ এ ভাই ইন্দ্রজিৎ ও তার উপরে নকশাল আন্দোলনের গোর আরোপ করে। কিন্তু পরে তৎকালীন কর্ণাটক সরকার (কংগ্রেস) দ্বারা গঠিত একটি কমিটিতে গৌরীকে সদস‍্যপদ দেওয়া হয়, যেখানে নকশালবাদীদের আবার ফিরিয়ে আনার,আত্মসমর্পণ তথা হিংসার বিরুদ্ধে একটি প্রয়াস চালায়।

গৌরী লঙ্কেশের গভীর আস্থা ছিল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার, দেশের ও মানুষের প্রতি। সেই জন্য ২০০০ সালে, ‘লঙ্কেশ পত্রিকে’ সম্পাদনার দায়িত্ব নেওয়ার দু’মাসের মাথায় একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, ‘নারী হওয়াই আমার সুরক্ষা এই মুহূর্তে। এক জন রাজনীতিক যত সহজে এক জন পুরুষকে ঘৃণ্য ভাষায় আক্রমণ করতে পারেন, নারী সম্পাদকের সঙ্গে তেমন আচরণ করলে জনমানসে শ্রদ্ধা হারাবেন।’ তিনি জানান, শারীরিক আক্রমণের ভয় তিনি করেন না। তাঁর বিরুদ্ধে হুমকির ঘটনাও কমে এসেছে। অন্যত্র তিনি লিখছেন, তাঁর কাগজের দর্শন ও মূল্যবোধকে সমর্থন করেন বলেই বহু মানুষ তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে কেস দায়ের করেননি।

পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, গৌরী জানতেন। অসহিষ্ণুতা, ঘৃণা, জাত, ধর্ম এনে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার অভিযান আগ্রাসী হয়ে উঠেছে গত কয়েক বছরে, দেশের সর্বত্র। কিন্তু নিজের কাজ, সম্পাদনার সামাজিক দায়িত্ব তাঁকে এতটাই ব্যস্ত রাখত, যে নিজের সুরক্ষার কথা ভাবার মতো সময় তাঁর ছিল না। ‘ব্যাঙ্গালোর মিরর’ কাগজে লেখা একটি প্রবন্ধে তিনি লিখছেন, ‘দ্বাদশ শতাব্দীতে বাসবান্না থেকে ২০১৫-তে কালবুর্গির হত্যা পর্যন্ত একই হিংসার প্রবাহ চলেছে, অথচ শ্রেণিবিহীন লিঙ্গায়েত সমাজ গড়ার জন্য বাসবান্না নিজের জীবন দিয়েছিলেন।’ নিবন্ধের শেষে গৌরী লিখেছিলেন, ‘আইডিয়াজ, হাওএভার, নেভার ডাই।’ উমর খালিদ তাঁদের ‘মাদার কারেজ’ গৌরীর বিষয়ে লিখেছেন, যখন ওঁদের সুরক্ষা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন, নিজেকে নিয়ে কোনও চিন্তাই মনে আসত না তাঁর।

এই সংকলনে বামপন্থী আন্দোলনে যুক্ত কে ফণিরাজের ‘আক্কাজ মেটামরফোসিস’ লেখাটি বিশেষ মূল্যবান। বর্তমান সহস্রাব্দের গোড়া থেকেই হিন্দুত্ববাদী শক্তির আক্রমণের মুখে পড়ে ‘লঙ্কেশ পত্রিকে’ এবং তার নবীন সম্পাদক। বাবাবুদানগিরির মন্দির ঘিরে হিন্দুত্ববাদীদের উদ্যমের বিরুদ্ধে কেকেএসভি অর্থাৎ কর্নাটক কমু সৌহার্দ্য ভেদিকে-র মতো একটি মঞ্চ গড়ে সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে একজোট করার সাহস দেখিয়েছিলেন গৌরী। সাংবাদিক থেকে অ্যাকটিভিস্ট সাংবাদিক হয়ে ওঠেন কেবল নিজের সাহস ও বিশ্বাসযোগ্যতায়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করতেন গৌরী। তবু নকশাল আন্দোলনের মূল প্রশ্নগুলি তাঁকে ভাবাত। অতি-বামেদের মূলস্রোতে ফেরাবার উদ্যোগে ‘সিটিজেন’স ইনিশিয়েটিভ ফর পিস’ নামক যে মঞ্চটি তিনি শক্তিশালী করে তুলছিলেন, তাতে নিহিত ছিল বিপুল সাহস ও ঝুঁকি। এমনিতেই হিন্দুত্ববাদীরা যে-কোনও বিরোধীকে নকশালবাদী চিহ্নিত করে দিয়ে থাকে। ‘তাঁর জীবন অকালে নিভে যাওয়ার আগের মাসগুলিতে গৌরী হয়ে উঠেছিলেন সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিবাদী, স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের হৃদয়প্রতিমা, কর্নাটক থেকে দিল্লি পর্যন্ত’, লিখেছেন ফণিরাজ। তাই কি অস্থির হয়ে উঠেছিল এই সকল মূল্যবোধের বিপরীতে যারা, তাদের পাইক বরকন্দাজ বর্গ?

গৌরীর মৃত্যু আজ অতীত। কিন্তু সামনে আদিগন্ত বিছিয়ে আছে তাঁর স্বপ্নের দেশ ও সমাজ। গতকাল গৌরীর জন্মদিন ছিল। এই দিনটি তাঁর জীবনের অভিব্যক্তিসমূহকে আমাদের সামনে উজ্জ্বলতর করে তুলুক। অম্লান হোক তাঁর সাহসী, স্নেহমাখা মুখের ছবি। ভাবধারা অনশ্বর।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...