Saturday, September 10, 2022

বিদ্যালয় একত্রিকরণ ও কিছু কথা


সাক্ষরতা একটি মানবাধিকার। দারিদ্র দূর করে সকলের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ৫০ বছরের বেশি হল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয় প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে। ৮ সেপ্টেম্বর সারা বিশ্বে জুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস (International Literacy Day)। বিশ্ব জুড়ে নিরক্ষরতা দূর করে স্বাক্ষরতা এবং শিক্ষার হার বাড়ানোর লক্ষ্যে ইউনেস্কোর তরফে এই দিনটির প্রচার করা হয়। সকলকে এই দিনটির মাধ্যমে বোঝানো হয় শিক্ষা এবং স্বাক্ষরতার গুরুত্ব, এবং এটা কীভাবে মানুষকে তাঁর সামাজিক অধিকার এবং মানবাধিকার পেতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধি মানেই দারিদ্র, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার দিকে এগোনো। শিক্ষাকে সব স্তরে পোঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ১৯৬৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দিনটিকে প্রথম আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস বা ‘ইন্টারন্যাশনাল লিটারেসি ডে’ হিসাবে ঘোষণা করেছিল। সেদিন থেকে প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্তে, নানা দেশে এই দিনটি নানা ভাবে আন্তর্জাতিক সক্ষরতা দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে।

আচ্ছা এখন সাক্ষরতা প্রসঙ্গের সাথে মিল রেখে অন্য কথায় যাওয়া যাক। রাজ্যের কিছু সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকার কর্তৃক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো চলছে একত্রিকরণ। ২০টি জেলার ১৭১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ করে কাছাকাছি বিদ্যালয়ের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। আগের সরকারের আমলে রাজ্যে প্রায় ৭,০০০ প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে আশেপাশের স্কুলের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছিল। 2022 সালের ম্যাট্রিক পরীক্ষায় শূন্য ফলাফল দেখায় সরকার ১৫টি জেলার ৩৪টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং হাই মাদ্রাসা বন্ধ করার কাজ সম্পন্ন করেছে । সরকার নিশ্চিত যে সেই বিদ্যালয়সমূহে শিক্ষক ভালভাবে পড়ান নাই, সেই বিদ্যালয়গুলোতে থাকা সেই অঞ্চলের জনগণ পঢ়াশোনার প্ৰতি আগ্রহী নয়, সেই অঞ্চলের শিক্ষাৰ্থীদের সরকারের হয়ে চিন্তা করা সকলের একই ধারণা যে এরা ‘গাধা’। সেইজন্য ‘গাধা’র নামে সরকারি ধন খরচ হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। এবার স্পষ্টভাবে বলি তাদেরকে ‘গাধা’ বলে সম্বোধন আমি করছি না বা এই স্পর্ধা আমার নেই। সরকারের হয়ে চিন্তা করা সকল, মন্ত্ৰী-বিধায়ক, পরামৰ্শদাতা একাংশ বুদ্ধি দিয়ে চলা লোক, স্ব-স্বাৰ্থসিদ্ধির জন্য সরকারের কথায় তাল মিলিয়ে গান গাওয়া সকলের চিন্তাতেই সেই অঞ্চলের শিক্ষাৰ্থীরা ‘শিক্ষার প্ৰতি আগ্রহহীন’, ‘গাধা’। সরকার পক্ষের কাউকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তারা সঙ্গে সঙ্গে বলে দেবে না। কিন্তু স্কুল বন্ধের কারণ ব্যাখ্যা করা গেলে সবাই বুঝতে পারবে এটাই চূড়ান্ত সত্য।

বন্ধ স্কুলগুলোর শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সরকার। সরকার কি তথ্য প্রমাণ করাতে পারবে যে একজন শিক্ষকের অবহেলার কারণে একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান খারাপ হয়েছে? যে সরকার স্কুলটি বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে তারা কি প্রমাণ দিয়ে জনগণকে বোঝাতে পারবে যে স্কুলটি এলাকায় অবস্থিত সেখানে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার কোন প্রভাব নেই?

সরকার কি নিশ্চিত যে, এবার যারা ব্যর্থ হয়েছে তাদের ছাড়া যেসব এলাকায় শিক্ষার মান খারাপের অভিযোগে স্কুল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেখানে আর কোনো শিক্ষার্থীর জন্ম হবে না? সেসব স্কুলের আওতাভুক্ত এলাকায় যদি আর কোনো মানুষ না জন্মায়, সরকার নিশ্চিত যে এটাই শেষ প্রজন্ম, তাহলে বেশি কিছু বলার দরকার নেই। সরকারের চোখে 'গাধা' প্রমাণিত শিশুরা যখন সই করতে জানে তখন তারা পড়া বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু সরকার যদি নিশ্চিত না হয় যে ওইসব এলাকায় আর কোনো শিশুর জন্ম হবে না, তাহলে উঠতি শিশুরা স্কুলে যাবে কোথায়? নাকি সরকার ওইসব এলাকায় ‘গাধার’ জন্ম দেওয়া বন্ধ করার জন্য বাধ্যতামূলক বন্ধ্যাকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে, যাতে সেখানে আর স্কুলের প্রয়োজন না হয়!

ফলাফলের উপর ভিত্তি করে একটি বিদ্যালয় বন্ধ করা হলে এলাকায় শিক্ষার মারাত্মক ক্ষতি হয়। এলাকায় এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে দেওয়া হয় না। দরুন মাজুলির একটি গ্রামের একমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি পরীক্ষায় ফেল করার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কারণে বন্ধ করা শিশুদের কথা না বললেও স্কুলের বাকি শিক্ষার্থীদের কী হবে? যদি তারা পড়াশোনা করতে চায় তবে তাদের একটি বা দুই নদী পার হতে হবে বা বালির মধ্যে দিয়ে দুই তিন কিলোমিটার দূরে অন্য স্কুলে হেঁটে যেতে হবে। বর্ষায় তো সেভাবে যাওয়াই যায় না।

এভাবে এক স্কুলের শিক্ষার্থীরা যখন অন্য স্কুলে চলে যায়, তখন কি ওই স্কুলে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য জায়গা থাকবে? যেসব স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের ওপর এভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে সরকার পক্ষ থেকে কি বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেয়া হবে ?

বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের কী হবে? তাদের তো ঐ স্কুলের প্রয়োজনে রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের পড়াতে ও পাস করতে না পারায় 'অদক্ষ' শিক্ষক-কর্মচারীরা বিলম্বে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে বিরত রাখা হবে ?না, চাকরি পরিবর্তন হয়ে যাবে! বন্ধ স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কী হবে? তিনি কি আবার সহকারী শিক্ষক হবেন? পদের অবনতি হলে ওই প্রধান শিক্ষকরা কি আইনি ব্যবস্থা নেবেন না? নাকি অন্য শিক্ষকদেরও জ্যেষ্ঠতা হ্রাস পেলে তারা চুপ থাকবে? কারণ সরকারি চাকরিতে জ্যেষ্ঠতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেহেতু এখন পর্যন্ত চাকরি সংক্রান্ত কোনো আপত্তি লক্ষ্য করা যায়নি, তাই বোঝা যায় তাদের জ্যেষ্ঠতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বন্ধ স্কুলের নামে রয়েছে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী। তাহলে স্কুল বন্ধের শাস্তি কার? শাস্তি শুধু স্কুলের আওতাভুক্ত এলাকার মানুষ ও ছাত্র ছাত্রীদের। অর্থাৎ হয়রানির শিকার শুধু এরাই।

বন্ধ স্কুলের ঘর ও অন্যান্য সম্পত্তির কী হবে? সংক্ষেপে, ঘরটি মর্গে পরিণত হবে, দুষ্টচক্রের জন্য মদ এবং জুয়ার আসর হবে। আর কিছু হোক আর না হোক ! সরকার নির্দেশ দিতে পারে যে অন্যান্য সম্পত্তি প্রতিবেশী স্কুলগুলিতে হস্তান্তর করা হবে কিন্তু তা কি হস্তান্তর করতে রাজি হবে স্কুল কমিটির সদস্য বা এলাকার মানুষ ? দেশে অনেক স্কুল আছে যেগুলো জনগণের অনুদানে কেনা হয়েছে জনগণ কি সহজে তাদের নির্মাণ ও অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি ছেড়ে দেবে? ফলস্বরূপ, অনেক সম্পত্তি ধ্বংস হবে, বা হারিয়ে যাবে। তবে স্বাধীনতা দিবস ও প্রজাতন্ত্র দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে হবে শিক্ষক-কর্মচারীদের। স্কুল বন্ধ করার ক্ষেত্রে সরকারের মূল উদ্দেশ্য ব্যয় কমানো। এমন বিভ্রান্তির কারণে যদি স্কুল বন্ধ থাকে, তাহলে খরচ কমবে কোথায়? বিদ্যালয় বন্ধ করে একটি এলাকার শিশু ও জনগণের অসুবিধা সৃষ্টি করা ছাড়া আর কিছুই হবে না।

"সরকার স্কুল বন্ধ করার আরেকটি গোপন কারণ হল শিক্ষার সম্পূর্ণ বেসরকারীকরণ। একের পর এক সরকারি সম্পদ বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দেওয়ার পর কোনো দপ্তরকে দক্ষতার সঙ্গে চালাতে অযোগ্য মন্ত্রীদের ভরপুর সরকার শিক্ষা সম্পূর্ণভাবে কোনো না কোনো মালিকের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে নানা অজুহাতে স্কুল বন্ধ করে দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুল ইন্টিগ্রেশন। বিভিন্ন কারণে সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বেসরকারি খাতে পাঠাতে বাধ্য হবেন।"

ইতিমধ্যে, বেশিরভাগ উচ্চ ও মধ্যবিত্ত এবং কিছু নিম্ন মধ্যবিত্তরা বেসরকারি স্কুলগুলির প্রতি মুগ্ধ। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। বিভিন্ন কারণে, আমিও আমার সন্তানদের বেসরকারি স্কুলে পাঠাই। তবে সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে কিছু নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র অভিভাবকদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা গ্রহণে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হবে হয়তো এটি সরকার কর্তৃক বুঝতে বোধহয় অসুবিধা হচ্ছে।

এর ফলে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখা সুবিধাভোগীদের সরকার পক্ষে রাজনৈতিক লাভ হবে। তাহলে যে রাজনীতিবিদরা একদল অশিক্ষিত মানুষকে দেশের নাগরিক বানিয়েছেন এবং রাজনীতিবিদরা তাদের সন্তানদের ইংল্যান্ড বা দেশের স্টার স্কুলে পড়ান, তাদের পক্ষে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিকল্পিত ভাবে রাজনীতি পরিচালনা করা সহজ হবে। কারণ সেই অশিক্ষিত নাগরিকরা সরকারের উপকারভোগী এবং শক্তিশালী সমর্থক হয়ে উঠবে। সেই ক্যাটাগরিতে সংখ্যা বাড়বে। কারণ দেশে দারিদ্র্যসীমার ওপারে ভোটারের সংখ্যা এখনো কম নয়। এই দরিদ্রদের অবস্থার কোন উন্নতি হবে না, শিক্ষার অভাব তাদেরকে আরও দরিদ্র করে তুলবে। স্কুল বন্ধ করে সরকার এমন দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্র করবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

সরকার বিভিন্ন জায়গায় মডেল স্কুল খুলেছে। সরকার কি স্কুল খোলায় শতভাগ পাসের নিশ্চয়তা দিতে পারে? সরকার কি বন্ধ স্কুলের সব শিক্ষার্থীকে এসব স্কুলে ভর্তি করা নিশ্চিত করবে? আমরা আশা করি যে জনপ্রতিনিধিরা জনগণের উদ্বেগের মধ্যে দিনরাত কাটান তারা যে সমস্ত এলাকায় বিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সেখানে সকল শিক্ষার্থীর জন্য সহজলভ্য শিক্ষা নিশ্চিত করবেন। এটাও উল্লেখ করা দরকার যে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। এর সঙ্গে সরকারের গুণগত ও উন্নত পরিকাঠামো দেয়ার পরিবর্তে শিক্ষানুষ্ঠান সমুহকে চিরতরে বন্ধ করে দেয়া রাজ্যজুড়ে এক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন দল, সংগঠন, ব্যাক্তি বিশেষ সরকারের এই সিদ্ধান্তকে পুনঃ বিবেচনা করার জন্য দাবি জানিয়েছে।

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...