ভাষাগত ও জাতিগত দিক দিয়ে যত রকমের ল্যাব ও ডিএনএ টেস্ট রয়েছে পৃথিবীর আর কোন জাতিকে হয়তো এতোটা প্রমাণপত্র দিতে লাগে না। যতটা বাংলা ভাষা ও বাঙালিকে বিশেষ করে উত্তর পূর্বাঞ্চল ও বরাক উপত্যকার বাঙালিকে দিতে হয়। আর এটার প্রচলন যে আজ শুরু হয়েছে এমন নয়। এর প্রমাণ স্বরূপ রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে অর্থাৎ ১৯৬১ সালের ১৯শে মে ১১ টি তরতাজা প্রাণ শহীদ হন শিলচরে, ১৯৭২ এর ১৭ই আগস্ট করিমগঞ্জে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু চক্রবর্তী),১৯৮৬র ২১ জুলাই করিমগঞ্জে শহীদ হন জগন্ময় ও যীশু, ১৯৯৬ এ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার রক্ষায় করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে শহীদ হন সুদেষ্ণা সিংহ ও সলিল সিংহ। সেই তখন থেকেই এখন অব্দি চলছে। হ্যাঁ হয়তো এখন শহীদ হচ্ছেন না ঠিক কিন্তু আগ্রাসনবাদী শক্তির করমর্দনে দেয়ালে পিঠ ঘষা খেতে খেতে কতটা ঘা হয়েছে এ বলার ইয়ত্তা রাখেনা।
ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় জীবনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আর এই আন্দোলনই অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনার ভিত্তি সুদৃঢ় করে। যার ফলস্বরূপ বাঙালি নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা ও স্বতন্ত্র অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে। বাঙালি জনগণ উপলব্ধি করতে পারে সংগ্রামের মাধ্যমেই তাদেরকে দাবি-দাওয়া আদায় করতে হবে এবং ভালোভাবে বাঁচার পথ খুঁজতে হবে। মায়ের ভাষা রক্ষার জন্য মেয়েরাই তো পেরেছিল রক্ষণশীলতার ব্যারিকেড ভেঙ্গে রাস্তায় নামতে। ভাষা আন্দোলনই তো পেরেছিল সাহিত্য-সংস্কৃতি-সমাজ গঠনে এক মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে। এটি একটি জাতির রাজনৈতিক ও সামাজিক ল্যান্ডস্কেপ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও, ১৯৯৯ সালের ২৬ শে নভেম্বর ইউনেস্কোর অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। বিশ্ববাসীর দরবারে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির যেভাবে আত্মমর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি ভাবমূর্তিও হয়েছে উজ্জ্বল।
'তবু উনিশে মে-র কাছে ফিরে যেতে হয়। নিষ্কর্ষ খুঁজতে হয় পুনর্নির্মাণের। ভাষা আন্দোলন চলমান এক প্রক্রিয়ার নাম: কোনো একটা বিশেষ তারিখ অন্য দিনগুলির তুলনায় উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে, এইমাত্র। ভাষা-সংগ্রামের বহুমুখী মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়ন করে বুঝি, বৃহত্তর গণসংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গ হল ভাষা আন্দোলন।' আজ উনিশে মে ভাষা আন্দোলন শুধু বরাক উপত্যকার মধ্যে সীমাবদ্ধ এমনটা কিন্তু নয়। এর পরিধি পুরো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই চিরসত্য আপ্তবাক্য সারা বিশ্বের বাঙালির স্পর্শ করেছে শ্রদ্ধেয় কবি দিলীপকান্তি লস্কর সম্পাদিত '১৯ এর কবিতা ও গান' (দ্বিতীয় সংস্করণ,বিশ্ব-সংকলন) স্বমহিমায়। সিকুয়েন্স এর প্রথম বইটি হলো '১৯-এর ভাষা শহিদেরা'। প্রকাশকাল ২০০২ সালের ১৯ মে। আর আবার দীর্ঘ একুশ বছর পর ২০২৩-র ১৯ মে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় সুবিশাল কলেবরে। সম্পাদক কবি দিলীপকান্তি লস্কর তাঁর এই বইয়ের প্রথম সংস্করণে ভূমিকায় লিখেছিলেন, যে কোন সংগ্রামের পেছনে থাকে এক একটি সাহিত্য-সংস্কৃতিক ভূমিকা। কখনো তা সংগ্রামকে পেছন থেকে ইন্ধন যোগায়, কখনো তা সংগ্রামীকে দেয় প্রেরণা। আবার কখনও কখনও সংগ্রামের সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রভাবে জন্ম দেয় কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-গীতিকারদের মনোজগতে এক অনন্য সৃজন কর্মশালা। তদুপরি সংগ্রামটি যেখানে ১৯শে মে, আপামার জনসাধারণের মধ্যে পরিব্যাপ্ত এক মহান গণজাগরণ, মাতৃস্তন্যস্বরূপ মাতৃভাষার অধিকার অর্জনের সংগ্রাম, মাতৃভাষার কারিগর কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-গীতিকারদের চেতনায়-অবচেতনায় ফেলবেই তার স্বাভাবিক অনুরণন। ফেলছেও। ১৯-কে নিয়ে সাহিত্য 'সৃষ্টি হয়নি' কথাটি প্রায়শই উচ্চারিত হতে শুনেছি, লালনমঞ্চ তা মিথ্যে প্রমাণ করেছে। সে গোটা বাংলা ভূবনের সাহিত্যকৃতি ঘেঁটে দেখতে চেয়েছে। কোথায় কোথায় উনিশ। প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি বলে বঙ্গ ও বাংলাদেশের কবির সংখ্যা তুলনায় কম, তবে অদ্যাবধি যে মাধুকরিটুকু হলো, তাও কি খুব কম !' দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা সম্পাদক কবি প্রথমেই সৌহার্দ্য সিরাজের কবিতা দিয়ে শুরু করেছেন যেখানে একটি লাইন লিখা — 'বৃষ্টির মেঘ/বরাকের অশ্রুত চিহ্নগুলো নিয়ে যাও দেখুক পৃথিবী'। কবি দিলীপকান্তি লস্কর ভূমিকায় লিখেছেন,'ভাষা শব্দটি মাতৃভাষার আবেগ ও মমতায় কখনও যেন উনিশের ভাবধারার কাছাকাছি এসে যায়। আবার ‘ভাষা’ থেকে মাতৃভাষা, ‘মাতৃভাষা’ থেকে ‘মাতৃভাষাসংগ্রাম'—এই আনুভূতিক পারম্পর্য আমাদের কাব্য-ভাবনায় সৃষ্টি করে একটি সরল রৈখিক যোগাযোগ। এক থেকে আরেককে পৃথক করা দুষ্কর। আর এই ভাবধারা একুশ-উনিশ ভেদে প্রায়ই এক বা অনন্য। ফলে আমাদের প্রাপ্তির ঘরও বহু সদৃশ কবিতার ফুলের মতো, নানা বর্ণের লাবণ্যে পূর্ণ হয়ে ওঠে। নদীর মতো বিভিন্ন অববাহিকা, উঁচুনিচু পাহাড়-টিলা তথা আঁকাবাঁকা বহু রৈখিক পথে ভালো-মন্দ বহু বিচিত্র বিষয়বস্তু নিয়ে এগোতে থাকে তার পথযাত্রা, কিন্তু গতি তার সুনির্দিষ্ট সাগরের দিকে। এক্ষেত্রে উনিশ, উনিশ-একুশ এক বা উভয়ের ভাষা-কাব্য-গান, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ভাব-বিশ্ব-সায়রে এক অনন্য সৃষ্টিময়তার সংযোজন। তাই অধিকাংশ কবি সজ্ঞানে উনিশের ধৃতি নিয়ে কবিতা লিখে থাকলেও তাঁরা কিন্তু শেষ অব্দি এই সাগর-সঙ্গমে এসে যুক্ত হয়ে যান বহু থেকে এক এবং এক থেকে বছর বিন্যাসে। এখন তাই বাংলাভাষার কবিদের কাছে নেই কোনো আগল, যা রাজনৈতিক প্রভুরা কাঁটাতার বা নদীর সীমানা দিয়ে বিভাগ করে দিয়েছেন কারো রান্না ঘরের কারো উঠোনের বা খেলার মাঠের ভিতর দিয়ে বা উনুনের মাঝ বরাবর। বর্তমান সংকলনে আমরা উনিশের বহু কবিতা বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন কবির কাছে পেয়েছি। বিভিন্ন ভাবনা-চিন্তার কবিতা, উনিশকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে তার স্বরূপ তথা মূল্যায়নের কবিতা, মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধার মূল্যবোধ থেকে উনিশের কবিতা এবং আরো অনেক বিষয়-বৈচিত্র্যে ভরপুর। ভাষা-সংগ্রামের ফলে কিছু শব্দ পেয়েছে তার নিজস্ব পৃথক এক তাৎপর্য ও অর্থময়তা। আত্মত্যাগের রক্ত কৃষ্ণচূড়াতেই যেন পেয়েছে তার প্রকৃতির প্রতিরূপ। এমন আরো কত কী।'
আমার মনে হয় বর্ধিত কলেবরে সংকলনটি সাজানোর একমাত্র কারণ সবাইকে এক সুতোয় বাঁধা। সংকলনটি মূলত কয়েকটি পর্যায়ের বিন্যাস। উনিশে মে'র কবিতা (স্বদেশে), উনিশে মে'র কবিতা (বাংলাদেশে), উনিশে মে’র কবিতা (দূর-বিদেশে), উনিশে মে'র কবিতা (বাংলা ভাষায় / ভাষান্তরে)। শেষের পর্যায়ে রয়েছে উনিশে মে'র গান বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যাগ্রহী 'জজ্ সাহেবা', শ্যামাপদ ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে আলাউদ্দিন খাঁ, গণেশ দে, মঞ্জুশ্রী দাস,কালিকা প্রসাদ, খালেক চৌধুরী সহ এই সময়ের অনেক কবির রচনা সংকলিত হয়েছে। আর উল্লেখযোগ্য হলো এই সংস্করণে বেশ কয়েকজন কবির লেখা গান ভিডিও লিংক সহ দেয়া রয়েছে। রয়েছে বেশ কয়েকটি গানের স্বরলিপিও। এরমধ্যে আমার খুব প্রিয় যা উল্লেখ না করে আর পারলাম না শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর ‘বঙ্গভূমি মা’ গানটি। এর ভিডিও লিংক — http:// youtube.be/DRFs17ecj71।
সম্পাদক কবি দিলীপকান্তি লস্কর তার অসাধারণ বুনন শৈলীতে নির্মাণ করেছেন '১৯-এর কবিতা ও গান'র সূচিপত্র। ১৯ মে-র কবিতায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ থেকে শুরু করে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, ব্রজেন্দ্র কুমার সিংহ, মলয় রায়চৌধুরী, কামালউদ্দিন আহমেদ, তপোধীর ভট্টাচার্য, সুবোধ সরকার, জয় গোস্বামী, বিশ্বজিৎ চৌধুরী প্রমুখের কবিতা রয়েছে। বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, হুমায়ূন আজাদ, রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন, জিললুর রহমান, বেলাল চৌধুরি, হেনরি স্বপন প্রমুখ ছাড়াও বহু কবির কবিতা রয়েছে। দূর বিদেশের (কানাডা,জার্মানি, নিউইয়র্ক, ফ্রান্স সহ আরও) কবিদের মধ্যে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, অরুণিমা নাসরিন, দীপঙ্কর দাশগুপ্ত প্রমুখ। তৎসঙ্গে যে সমস্ত ভিন্নভাষী কবির কবিতা বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে শুরুতেই রয়েছেন অসমের খ্যাতনানা কবি জ্যোতিপ্ৰসাদ আগরওয়ালর কবিতা। বড়ো কবি অঞ্জলি বসুমাতারি, উর্খাও গৌড়া ব্রহ্মের কবিতা। এরপর রয়েছে বাগানি ভাষার অভিজিৎ চক্রবর্তী, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষী কবিতা লিখেছেন ধনঞ্জয় রাজকুমার সহ প্রমুখ কবির কবিতা।
'১৯-এর কবিতা ও গান ' তাঁর সম্ভাব্য সকল দোষত্রুটি পেছনে ফেলে সুস্থ জনমত গঠনে আরও একধাপ এগিয়ে চলছে। সংস্করণের শুরুর দিক থেকে যদি দেখা হয়, সংকলনটির সূচনা হয় মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'বঙ্গভাষা' কবিতাটি দিয়ে। এরপর ধাপে ধাপে দেখা যায় শুধু নিদৃষ্ঠ 'উনিশ মে' নিয়ে কবিতার পাশাপাশি বিভিন্ন কবির কবিতায় তাঁর অনুভূতিতে প্রকাশ পায় ভাষা আন্দোলন, বাঙালি আগ্রাসন তথা কোণঠাসার গল্প। যেখানে মাইকেল তাঁর বঙ্গভাষা কবিতায় লিখেছেন — হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন; —তা সবে, (অবোধ আমি) অবহেলা করি। জয় গোস্বামী লিখেছেন — 'আমি আসছি, ভাত বেড়ে রাখো'—/মাকে বলে ছুটে গিয়েছিল/সপ্তদশী কমলা।ফেরেনি।/গুলি সোজা লেগেছিল চোখে। শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর 'উদ্বাস্তুর ডায়েরি'তে লিখেছেন — যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সে-ই কেড়েছে ভয়,/ আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়।
কামাল উদ্দিন আহমেদ লিখেছেন — বাড়ন্ত সে সবুজের মেলায়/ আমার যৌবন দোল খায়/ কমলা শচীন সুকমল বীরেন্দ্র/কানাই হিতেশ সুনীল কুমুদ চন্ডী/তরণী সত্যেন এগারোটি তাজাপ্রাণ মরণজয়ী গান গায়।
গুণের বিচারে কবিতার মান নিয়ে কথা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। উনিশ কিবা একুশ - ভাষা আন্দোলন আমাদের আবেগকে নাড়া দেয়। তাই প্রতিটি কবিতার মানও গুণগত সম্পন্ন। এতোবড় কলেবরে বিশ্ব-সংকলন ঈষৎ ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। কিন্তু এদিকে না গিয়ে সম্পাদকের অসাধারণ কাজ তথা '১৯-এর কবিতা ও গান' দ্বিতীয় সংস্করণে সম্পাদকের প্রচ্ছদ রুচিও অতুলনীয়। যেখানে কেন্দ্রে স্বপন পালের ভাষা-শহিদ স্মারক ও নকশা বিন্যাসে রয়েছেন মাসুদ করিম। এককথায় প্রসারিত দুহাত বাড়িয়ে একত্রিত করেছে এই বিশ্ব-সংকলন। নিশ্চয়ই এই সংকলন বিশ্বকবিতার উইকিপিডিয়ায় স্থানলাভ করবে। চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বে উনিশের বার্তাবাহক হিসেবে।
'১৯-এর কবিতা ও গান' — সম্পাদক দিলীপকান্তি লস্কর
প্রগতি সরণি, বনমালী রোড, করিমগঞ্জ, আসাম। মূল্য - ৪৫০/-