বিশ্বে প্রতিদিন এমন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে যাদের জন্ম যুদ্ধের ময়দানে। সেই পাথরযুগের সূচনাকাল থেকেই মানুষকে পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। শুধু বেঁচে থাকা নয় যোগ্যতম হয়ে বাঁচার জন্য আদিমকাল থেকেই মানুষকে যুদ্ধ করতে হয়েছে। টিকে থাকার লড়াইয়ে গুহা থেকে শুরু করে সভ্যতার যুগে এসে যুদ্ধের ইতিহাস মানব ইতিহাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় রয়েছে যুদ্ধের অনেক বিবরণ। এমনকি যুগে যুগে বিশ্বাসী মানুষের পথ প্ৰদৰ্শক হয়ে আসা; যারা মনে করেন পথ হারিয়েছে তাদের অন্ধকার পথে আলোকিত করা একটি মোমবাতি ; এই ধর্মগ্রন্থগুলোর কাহিনীর অন্যতম প্রধান উপজীব্য হলো যুদ্ধ ৷ সব মিলিয়ে আদিমকাল থেকে মানুষ যুদ্ধ করে আসছে। কখনও কখনও এই যুদ্ধের কারণ হল বিজিত ভূমিতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, আবার কখনও তা ঘটে সাম্রাজ্য বিস্তারের কারণে। আজকের চেনাশোনা পৃথিবীটি অনেক অর্থেই ওই যুদ্ধের নির্মাণ। সেই সময় থেকে এই যুদ্ধ না ঘটলে ইতিহাসের ধারা অনেকটাই ভিন্ন খাতে বইত। বার্ট্রান্ড রাসেল ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, অস্ত্রের বদলে অস্ত্র দিয়ে সমস্যা সমাধান না করে মানুষ সমস্যা সৃষ্টিতেই পারদর্শী হয়ে উঠবে। সেই একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, জাতীয়তাবাদ নামক বন্দিত আদর্শটির মধ্যেই যে গভীর অসুখ, সেটাকে উপড়ে না ফেললে দুনিয়া অ-বাসযোগ্য হয়ে যাবে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বা এরিক মারিয়া রেমার্ক-এর মতো মার্কিন বা জার্মান ঔপন্যাসিক, বা তরুণ ব্রিটিশ কবি আইজ্যাক রোজেনবার্গ (যিনি যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা যান) সাহিত্যে দিয়ে গেলেন যুদ্ধদুনিয়ার ভয়ানক সব ছবি। তাঁরা নিশ্চয় জানতেন, ‘আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ কিংবা ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’-এর মতো বাক্যবন্ধ পরের শতাব্দীর সবচেয়ে সেরা প্রহসন হয়ে উঠবে?
সাম্রাজ্য বিস্তারের তাড়নাই কখনও মানুষকে এইভাবে অন্ধ করে তোলে যে ভুলে যায় সকল মানবীয় অনুভূতি। সাম্ৰাজ্য বিস্তারের মতো এমন শেষ না হওয়া বাসনা যে কেবল অগণিত মানুষের মৃত্যু এবং দুঃখ-যন্ত্ৰণার কারণ হয়ে পড়ে তেমন নয়, ইহা কখনও বা এক আগ্রাসী সাম্রাজ্যের পতনের মুখ্য কারণও হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, মোগল সাম্ৰাজ্যের কথাই ধরুন ৷ ঔরংগজেবের আগ্রাসনী নীতিমালা মোগল সাম্ৰাজ্যকে এইভাবে আয়তনে বিশালকায় করে তুলেছিল যে তাঁর পরবৰ্তী কালের বাদশাহদের জন্য ইহা মাথার ব্যথাস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। ঔরংগজেবকে বেশিরভাগ সময় ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল দাক্ষিণাত্যের অধিকৃত ভূমির সুরক্ষা সুনিশ্চিতকরণে। মোগল সাম্ৰাজ্যের পতনের যুগ ঔরংগজেবের এই আগ্রাসনী মনোভাবই ধেয়ে এনেছিল বলে বহু ইতিহাসবিদ মত পোষণ করেন ।সংক্ষেপে, হিন্দু বিদ্বেষ এবং ঔরংগজেবের আক্রমণাত্মক ও যুদ্ধবাজ নীতি মুঘল সাম্রাজ্যকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়।
যদি ইতিহাসে যুদ্ধবাজ মানুষের একটা তালিকা প্রস্তুত করা হয় তবে অবশ্যই শীৰ্ষ পাঁচে নাম থাকবে এডলফ হিটলারের। নাৎসিদের গুণগত এবং শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী হিটলার নিজ জাতিকে যতটা ভালো পেয়েছিলেন তার ঠিক বিপরীতে সমানভাবে ঘৃণা ছিল অন্যদের প্রতি। এমনকি ইহুদি বিদ্বেষ ও সমাজতন্ত্র বিরোধিতায় নাৎসিরা নিজ জাতির বিরোধী পক্ষকেও নিস্তার দেয় নাই। প্রায় ষাট লাখ ইহুদিদের হিটলার হত্যা করলো হাসোয়া বা হলোকষ্টের নামে। এ হত্যাকান্ডও করা হয়েছে কেবল ধর্মের নামে। তৃতীয় রাইখের সময় বিনা অপরাধে লাখ লাখ জিউসকে বন্দীশিবিরে কৃতদাস বানায় হিটলার বাহিনি। একপর্যায়ে মালবাহি ট্রেনের বগিতে তুলে বধ্যভূমিতে নেয়া হতো জিউসদের। নেয়ার পথেই কষ্টে মারা যেতো অর্ধেক, বাকি অর্ধেককে হত্যা করা হতো সেখানে নিয়ে। একইভাবে ইতিহাসের পাতায় পাতায় হিটলার, মুসোলিনি, ঔরংগজেবের মতো অনেক মানুষ পাওয়া যায়। এর মধ্যে অবশ্য হারিয়ে যাননি সম্রাট অশোকও, পরাক্রমশালী অশোক, যিনি ২৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কলিঙ্গ যুদ্ধে বিজয়ের পর মৃতদেহের স্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আত্ম-উপলব্ধির নতুন আলোর পথ খুঁজে পান। অশোককে যুদ্ধের জন্য ক্ষুধার্ত একজন সাধারণ সম্রাট থেকে মানব ইতিহাসের অন্যতম সেরা সম্রাটে পরিণত করেছিল কিন্তু অশোক ছাড়া আর কতজন সম্রাট বা আজকের যুদ্ধ-উন্মাদ শাসক আত্ম-উপলব্ধির আলোর সাথে পরিচিত হয়েছেন তা নিয়ে অবশ্যই সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
মানব ইতিহাসে যুদ্ধ নিয়ে লিখতে গেলে ইসরাইল-প্যালেস্টাইন তুমুল যুদ্ধের উল্লেখ করতেই হয়। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামাসের নির্বিচারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ১৫ জন নিরীহ ইসরায়েলি নাগরিক নিহত হওয়ার পর ইসরায়েল গাজা ষ্ট্ৰিপস্থিত হামাসের ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এরই মধ্যে হাজার হাজার প্যালেস্টাইনি সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছে। বর্তমান গাজা ষ্ট্ৰিপে গভীর মানবিক সংকট চলছে। মানব ইতিহাসের আগের যেকোনো যুদ্ধের মতোই নিষ্পাপ শিশু ও নারীরা সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে এবং বর্তমানে করছে। গাজার হাসপাতালে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ৫০০ জন রোগী, আত্মীয়স্বজন ও চিকিৎসা কর্মী নিহত হয়েছেন। এই প্রসঙ্গে ইতিহাস কে মিথ্যা বলা যাবে না কিছু কথা যোগ করা খুবই জরুরি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের প্রয়োজনে দুর্লভ বোমা তৈরির কৃত্রিম ফসফরাস তৈরি করতে সক্ষম হন জিউস বিজ্ঞানী ড. হেইস বাইজম্যান। ফলশ্রতিতে আনন্দিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন - কি ধরনের পুরস্কার চান তিনি! জিউসপ্রেমিক বিজ্ঞানীর উত্তর ছিল - "অর্থ নয় - নারী নয় - বাড়ি নয়! আমার স্বজাতির হারানো ভূমি ফিরে পেতে চাই আমি"! বৃটেন প্রতিশ্রুতি দেয়, যিহোভা প্রদত্ত জিউস জাতির হারানো ভূমি ফিরিয়ে দেবেন তাদেরকে একদিন! ঐ প্রতিশ্রুতির ধরাবাহিকতায় ১৯৪৮ সনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৮১ নম্বর প্রস্তাব অনুসারে, ইসরাইল রাষ্ট্র গঠিত হয়। জাতিসংঘ তখন ৪৫% ভূমি ফিলিস্তিনিদের এবং ৫৫% ভূমি জিউসদের দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ পর্যন্ত পৃথিবীর ১৬১-টি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও, ৩১-টি মুসলিম রাষ্ট্র এখনো ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বে মেনে নেয়নি। ১৯৪৮ সনে তৌরাত বর্ণিত ‘যিহোবা’ প্রতিশ্রুত ইসরাইল নামক ইহুদী রাষ্ট্র পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলে, আরবদের সম্মিলিত মুসলিম বাহিনির সাথে জিউসদের যথাক্রমে ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সনে যুদ্ধ বাধে। তারা যুদ্ধ করে জিউস জাতি তথা ইসরাইল দেশকে পৃথিবী থেকে বিলোপ করে দিতে চাইছে।
ইতিমধ্যে আন্তরাষ্ট্ৰীয় মঞ্চে পেলেষ্টাইনের পক্ষে এবং ইজরাইলের পক্ষে কারা কথা বলছে তা এখন প্রায় স্পষ্ট। যুদ্ধের পেছনে পেছনে চলছে কূটনৈতিক ছায়াযুদ্ধও। বলাবাহুল্য, যেকোন একটা যুদ্ধের সঙ্গে আরও বহু কথা জড়িত হয়ে থাকে। অস্ত্ৰ বেপারীদের স্বাৰ্থ, দেশের ঘরোয়া রাজনীতির স্বাৰ্থ ইত্যাদি ইত্যাদি। কখনও বা শাসক তার জনপ্রিয়তা উদ্ধারের আকাংক্ষায় এবং তার জন্য যুদ্ধসৃষ্ট তাৎক্ষণিক দেশপ্ৰেমের ইন্ধনকে সম্বল হিসেবে নেয়ার খবরও বিশেষভাবে চৰ্চিত হয়ে পড়ে। সেইজন্য বহু সময়ে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মাধ্যমে প্রচুর অৰ্থ, অস্ত্ৰ এবং মানব সম্পদের ব্যবহার হওয়া অনুশীলন যা আমাদের স্বচোক্ষে দেখানো হয় তা চূড়ান্ত সত্য না ও হতে পারে। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইসরায়েলের ওপর সাম্প্রতিক বিধ্বংসী হামাসের হামলা এবং ইসরায়েলের পাল্টা আক্রমণ এধরণের এমন অনেক সম্ভাবনাময় ঘটনা উদাহরণ স্বরূপ রয়েছে। কিন্তু এই ধরনের আলোচনা ও সমীকরণের শেষে একটা সত্য আছে- এই সবের জন্য সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে নিষ্পাপ শিশু ও নারীরা। হত্যাকারী জানে না কার ঘর ধ্বংস হয়েছে এবং কার জীবন কেড়ে নিয়েছে, মিসাইল কোনদিকে ছোড়ছে, বিনা কারণে যে প্রাণ হারাচ্ছে সে জানে না তার হত্যাকারী কে। আমরা যখন যুদ্ধ এবং মানুষের কথা বলি, তখন এটাই আমাদের হৃদয়ে আঘাত করে অবশ্য, যদিও যুদ্ধ সংবেদনশীল মানুষের হৃদয়কে অশ্রুপাত করে, তবুও বিশ্ব যুদ্ধের কবল থেকে মুক্ত হবে এমন কোনো আশা নেই। যুদ্ধ প্রতিরোধে আধুনিক মানুষের সমস্ত প্রচেষ্টা ইতিমধ্যেই বৃথা প্রমাণিত ।
লিগ অফ নেশ্যনস এর ব্যর্থতা যুদ্ধের ভারে ভারাক্রান্ত বিশ্বের বৃহৎ শক্তিদের দ্বারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের জন্ম হয়। কিন্তু জাতিসংঘ কি যুদ্ধ বন্ধে সফল হয়েছে? জাতিসংঘ কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিধর দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদী চাওয়া-পাওয়া মোকাবেলা করতে পেরেছে? পারে নাই। অস্ত্রশিল্পের বিশ্বায়ন খুলে দিল সামরিক প্রযুক্তির বিপ্লবের রাস্তা। পক্ষ-বিপক্ষ নির্বিশেষে মহামানবতীরের সর্বত্র যুদ্ধকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অনায়াসে। ইজরায়েল থেকে ইউক্রেন, আল্পস থেকে সাহারা, লিবিয়া থেকে ফিজি,
নিশ্চিন্ত প্রাত্যহিকতার মধ্যেই বিছিয়ে দেয়া হচ্ছে যুদ্ধের মারণ। মানুষের নিষ্ঠুরতা কত আন্তর্জাতিক, বিশ্বায়নের নতুন প্রজন্ম জিভ টেনে ধরবে না তো....!