Tuesday, March 28, 2023

আরজ আলী মাতুব্বর : সত্যের অভিযাত্রী


“বিদ্যাশিক্ষার ডিগ্রী আছে জ্ঞানের কোনো ডিগ্রী নেই; জ্ঞান ডিগ্রীবিহীন ও সীমাহীন”।

'প্রায় ৫০-৬০ হাজার বছর আগের নিয়ান্ডারথাল মানুষেরাই প্রথম প্রশ্ন তোলে জীবন-মৃত্যু নিয়ে? মানুষ কোত্থেকে আসে? বেঁচে থাকে কেন? মারা যায় কেন? শুধু মানুষ নয়। প্রকৃতিকে নিয়েও তারা প্রশ্ন করা শুরু করেছিল। নদী প্রবহমান কেন? বাতাস কি? পাহাড় এলো কোত্থেকে? সূর্য আলোকিত কেন? সহস্র বছর আগের অবিকশিত ও আদিম বুদ্ধি দিয়ে আদিম মানুষেরা ভেবে নিয়েছিল তাদের প্রতিটি সমস্যার সমাধান। প্রাণীজগতের সব প্রাণীই নিজেদের যেকোন সমস্যায় নিজ নিজ বুদ্ধি, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই আধুনিক যুগেও প্রাণীদের চোখে মটরগাড়ীগুলো শব্দকারক ও দূর্গন্ধযুক্ত একটি বিদঘুটে প্রাণী ছাড়া কিছুই নয়। একটি যন্ত্র সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণের জন্য আমরা প্রাণীদেরকে দোষ দিতে পারি না। কারণ যন্ত্রকে যন্ত্র মনে করার জন্য যে জ্ঞান, মেধা, মণীষা, অভিজ্ঞতা থাকা দরকার তা তাদের নেই। জীব জগতের কোটি বছরের ইতিহাসে মনুষ্যেতর প্রাণীগুলো কখনো যন্ত্র নিয়ে গবেষণা করেনি, বা করতে চায়নি। বানর, কয়েক প্রজাতির পাখি এবং অন্যান্য কয়েকটি মাত্র প্রাণী অবশ্য যন্ত্রের ব্যবহার করে। উঁচু ডাল থেকে ফল পাড়তে লাঠি, শত্রু তাড়াতে ঢিল, খাদ্য ভাঙতে পাথর ইত্যাদির ব্যবহার তারা করে থাকে। কিন্তু তাদের যন্ত্র সম্পর্কে এই অভিজ্ঞতা অতটুকু প্রাথমিক অবস্থাতেই থেকে গেছে। আর কোন অগ্রগতি হয়নি এবং তা সহজাত প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। কারণ যন্ত্রের ঐ সীমিত ব্যবহারটুকুর বেশি তাদের প্রয়োজন হয়নি। তাই যন্ত্রের আবিষ্কার বা উৎকর্ষের জন্যও কোন রকম অভ্যন্তরস্থ আগ্রহ তারা বোধ করেনি। কিন্তু মানুষ মানবেতর নয়। ক্রমাগত নিজেকে পেরিয়ে যাওয়ার এক অদম্য আগ্রহ মানুষকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায়। ফলে মানুষ নিরন্তর তার পূর্বতন অনভিজ্ঞতা, অনগ্রসরতা, পশ্চাৎপদতা, সীমিত যান্ত্রিক শক্তি প্রভৃতিকে পরিত্যাগ করেছে এবং সাগ্রহে বরণ করেছে ভবিষ্যতের নতুনত্ব, জ্ঞান, আবিষ্কার, মনন। তাই অন্যান্য পশুদের জীবন যাত্রা এখনও আদিম যুগের ন্যায় থাকলেও মানুষের ক্ষেত্রে তা পাল্টে গেছে। মানুষ এগিয়ে এসেছে বর্তমানের কুসংস্কারহীন প্রযুক্তিময় পৃথিবীতে।'

দার্শনিকরা কখনও ফুরিযে যায় না; বরং সময় ও সমাজ তাঁদেরকে ধারণ করে। সময়ের সমান্তরালে তাঁরাও বহমান। একটা সমাজকে প্রগতিশীল হতে হলে দার্শনিক দরকার। দর্শন আসে জীবনবোধ থেকে, দর্শন আসে প্রশ্ন ও চিন্তার স্বাধীনতা থেকে। অথচ আমাদের সন্তানরা প্রশ্ন করতে জানে না, চিন্তা করতে জানে না। বাঙালির জীবন খুব সংকীর্ণ। কোনোভাবে পঞ্চাশটা বছর কাটাতে পারলে মৃত্যুর প্রহর গুনে তাঁর দিন কাটে। জীবনের বিকাশ ও জীবনবোধ তাঁর কাছে অনর্থক। লালনের মতো দার্শনিককে আমরা এখনও পাগল বানিয়ে রেখেছি। একটা সমাজকে কেবল লালনের গান দিয়ে সুচিন্তক বানানো সম্ভব। লালন বাংলার মাটিতে বেড়ে ওঠা মানুষ, এখানকার পরিবেশ ও জীবনের সাথে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। আরবদের জীবনীর বদলে বাংলা বইয়ে লালনের জীবন পাঠ অনেক বেশি জরুরী ও প্রাসঙ্গিক। লালনের জীবন কোনো পয়গম্বরের থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু সেই লালন আমাদের কাছে উপেক্ষিত। আমরা লালন দর্শনে চর্চা করি না।

আরজ আলী নামের একজন মানুষ এই পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছেন তা প্রথম জানতে পারি ডিগ্রি ফার্স্ট ইয়ারে। সত্যের সন্ধানে বইটা পড়ি পিডিএফ আকারে ঠিক তারিখ মনে নেই তবে সালটা ২০১৫-১৬ হবে। যেহেতু নামটা আগে শুনেছি তবে তাঁর বই পড়ার সুযোগ হয় নি। যদিও কলেজে পড়ার সময় হেগেল, কনফুসিয়াস, দেকার্ত, মার্কস, এঙ্গেলস, মাও, বার্ট্রান্ড রাসেল পড়েছি। সময় সুযোগে তাঁদের জীবন ও দর্শন সম্পর্কে জেনেছি এবং অভিভূত হয়েছি কিন্তু আরজ আলী মাতুব্বর পড়া হয়নি। সক্রেটিস বা প্লেটো বাঙালির খুব পরিচিত নাম। সক্রেটিস পড়ছিলাম ক্লাস টেনে ইংরেজি সাবজেক্টে একটা পাঠ ছিল, তখন।

বাট্রান্ড রাসেল খ্রিস্টধর্মের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন, জাঁ-পল সার্ত্র ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন না। কিন্তু তাঁরা নিজ দেশে অনেক সম্মান পেয়েছেন। দার্শনিক নিটশে বলেছেন, ‘ঈশ্বর মৃত’। কিন্তু নিটশে পড়ানো হয় পৃথিবীর সব দেশে। আরজ আলী মাতুব্বরকে একজন বিজ্ঞানী ও লৌকিক দার্শনিক অভিধায় ভূষিত করা হয়, তাঁর লেখা হেগেলের দ্বান্দ্বিকতাবাদের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। একদিকে বলা যায় তিনি যুক্তিবাদী দর্শনের একনিষ্ঠ অনুসারী, আবার অন্যদিকে বলা যায় তিনি আধুনিক চার্বাকবাদী।

আরজ আলী মাতুব্বর প্রশ্ন করতে ভালোবাসতেন। শুধু প্রশ্ন করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, সেগুলোর উত্তর সন্ধানের চেষ্টা করেছেন। মানুষের জীবন ও প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর মনে কৌতুহল বা কোনোরকম প্রশ্নের উদয় হলে তিনি ‘বস্তুবাদ’ বিষয়টা নিয়ে নড়াচড়া করতেন। বই থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান এবং নিজের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তিনি নিজস্ব চিন্তার জগৎ তৈরি করতেন। একটি প্রবাদ আছে "স্বশিক্ষিত লোক মাত্রেই সুশিক্ষিত।" সে হিসেবে 'স্বশিক্ষিত' আরজ আলী মাতুব্বর অবশ্যই একজন সুশিক্ষিত ব্যক্তি। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। আরজ আলী মাতুব্বর বিশ শতকের একজন অনন্য ও অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। বিজ্ঞানে আস্থাবান যুক্তিবাদী আরজ আলী বাঙালির মানসমুক্তির সহায়।

আমাদের সমাজ আরজ আলীকে ধারণ করে না। আরজ আলীকে নিয়ে চর্চা হয় না। দেশে হাতেগোনা কিছু মানুষই হয়ত আরজ আলী নামের সাথে পরিচিত। অথচ আরজ আলী সবার পাঠ্য হওয়া উচিত। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের মতো মুখস্ত থাকা উচিত আরজ আলীর জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী। প্রসঙ্গক্রমে কেউ যদি আরজ আলীর জন্ম বা মৃত্যু নিয়ে দু একটা লাইন লিখে ফেসবুকে পোস্ট করে তবে তাকে নানা উপাধিতে ভূষিত করা হয়। নাস্তিক-আস্তিকের প্রশ্নে ভেসে যায় কমেন্টবক্স। এখানে চিন্তার স্বাধীনতা নেই, প্রশ্নের স্বাধীনতা নেই। ধর্ম নামক জাতাকলে পিষ্ঠ সবাই। সেসবের বিপরীতে আরজ আলী চিন্তা করার সাহস যেগায়, প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা দেয়।

আরজ আলী মূলত বস্তুবাদী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি অনেক অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লেখালেখি করেন। আরজ আলীর রচনায় মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদী দার্শনিক প্রজ্ঞার ছাপ রয়েছে। মানবকল্যাণ ও বিশ্বধর্ম আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রদের জন্য বৃত্তি প্রদান, পাঠাগার স্থাপন ও রচনা প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করেন। এছাড়া তিনি নিজ দেহ ও চক্ষু মানবতার সেবায় উৎসর্গ করেন। মাতুব্বর বরিশালের অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির, অধ্যাপক মুহাম্মদ সামসুল হকসহ অসংখ্য সাম্যবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজমান ছিলো।

তার বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতার কথা তিনি একাধিক গ্রন্থে প্রকাশ করেন। তার লিখিত বইয়ের মধ্যে ‘সত্যের সন্ধান’, ‘সৃষ্টি রহস্য’, ‘সীজের ফুল’, ‘শয়তানের জবানবন্দী’ অন্যতম। আরজ আলীর রচিত পাণ্ডুলিপির সংখ্যা মোট ১৫টি। এর মধ্যে তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছিল ৪টি। এই বইগুলো হলো- ‘সত্যের সন্ধান’ (১৯৭৩), ‘সৃষ্টি রহস্য’ (১৯৭৭), ‘অনুমান’ (১৯৮৩), ও ‘স্মরণিকা’ (১৯৮৮)। আরজ আলী মাতুব্বর তার প্রথম বইয়ের প্রচ্ছদও আঁকেন। বইটি লিখেছিলেন ১৯৫২ সালে। প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে ‘সত্যের সন্ধানে’ শিরোনামে। বইটি তাকে এলাকায় ‘শিক্ষিত ব্যক্তি’ হিসেবে সুনাম এনে দিয়েছিল।

তাঁর সত্যের সন্ধান গ্রন্থে আরজ আলী মাতুব্বর যে মৌলিক প্রশ্নগুলি উল্লেখ করে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন তার মধ্যে রয়েছে : ‘১. আমি কে? ২. প্রাণ কি অরূপ না স্বরূপ? ৩. মন ও প্রাণ কি এক? ৪. প্রাণের সহিত দেহের সম্পর্ক কি? ৫. প্রাণ চেনা যায় কি? ৬. আমি কি স্বাধীন? ৭. অশরীরী আত্মার কি জ্ঞান থাকিবে? ৮. প্রাণ কিভাবে দেহে আসা যাওয়া করে?’..... ঈশ্বর সম্পর্কিত প্রশ্নে আরজ আলী মাতুব্বর জিজ্ঞেস করেছেন ‘স্রষ্টা কি সৃষ্টি হইতে ভিন্ন?’ ঈশ্বর কি স্বেচ্ছাচারী না নিয়মতান্ত্রিক?’ ….......

কেবল দার্শনিক চিন্তায় নয়, জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ বোধের আর এক প্রকাশ ঘটেছে তার এরূপ কর্মে যে, তিনি জীবিত অবস্থাতেই জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মানুষের হিতার্থে তাঁর দেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে উইলের মাধ্যমে বরিশাল মেডিক্যাল কলেজকে দান করে গেছেন। প্রতি বছরই ১৫ই মার্চ আরজ আলী মাতুব্বরের জন্মদিন পালন করা হয়। এত বছর পরে আরজ আলীকে নিয়ে কেউ উৎসাহ দেখাবে তা হয়ত তিনিও ভাবতেন না। ঠিক এভাবেই আরজ আলী সময়ের সমান্তরালে বহমান। শত বা সহস্র বছর পরেও আরজ আলী আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হবেন।

লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন ও সন্দীপ দত্ত


লিটল ম্যাগাজিন ভাবুন, কিনুন, পড়ুন – সন্দীপ দত্ত ছাড়া এভাবে আর কেউ কি বলতে পারেন! সন্দীপ দত্তের দেহাবসান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আসলে গতানুগতিকতার বাইরে দৈনিকে রবিবারের ফিচারপাতা নয় লিটল ম্যাগাজিন। বাঙালির একক চেষ্টায় যে সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে এবং দীর্ঘ জীবন পেয়েছে তার মধ্যে সন্দীপ দত্তের লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি অন্যতম, সাম্প্রতিকতমও বটে। লিটিল ম্যাগাজিনের একাল-সেকাল বিষয়ে কী ভাবেন? এই বিষয়ে সন্দীপ দত্তকে জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন, “বাংলা সাময়িক পত্রের শুরুটা যদি আমি ১৮১৮ সাল ধরি, তাহলে বলব পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লিটল ম্যাগাজিন বাংলা ভাষাতেই বেরোয়। এই ১৮১৮ থেকে আজ পর্যন্ত এত বছরের ইতিহাসটা একটা লং জার্নি। ১৯ শতক ছিল নির্মানের যুগ। সেখানে ‘সবুজপত্র’ ছিল, ‘বঙ্গদর্শন’ ছিল, ‘তত্ত্ববোধিনী’ ছিল, সাহিত্যের একটা নতুন ধারার উপস্থিতি দেখা গেছিল। ৪০’এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সারা বিশ্ব তথা বাংলায়ও বামপন্থি প্রভাব পড়েছিল, সেখান থেকে সে সময়ে ‘দ্বন্দ্ব’, ‘কাক’, ‘স্ফুলিঙ্গ’, ‘অগ্রনী’ ইত্যাদি বেরোল। ৬০’এ কমিউনিষ্ট পার্টিকে কেন্দ্র করে বহু কাগজ বেরিয়েছিল। তার মধ্যেই হাংরি জেনারেশন চলে আসে, সেটাই ছিল প্রতিষ্ঠান বিরোধী প্রথম আন্দোলন। ঐ আন্দোলন কে কেন্দ্র করে কতকগুলো পত্রিকা বেরোল। ৮০’এ আমরা দেখলাম বিশেষ সংখ্যা বেড়ে গেল অর্থাৎ আগে এত বহুমুখীনতা ছিল না, যেমন- উত্তর আধুনিকতা, মানুষের দ্বিচারিতা-হিংসা, শ্মশান, হাট-জনপদ, ঘুড়ি, মানুষের চুল, নানান বিষয় বৈচিত্র দেখা গেল। সেকাল-একাল এইভাবেই। সেকালের লিটল ম্যাগাজিনকে আমরা এককথায় বলতে পারি সাহিত্যকেন্দ্রিকতা, এখনও সাহিত্যকেন্দ্রিকতা, তবে আগের থেকে বিষয়-বৈচিত্র্য অনেক বেড়েছে।”

বাংলা সাহিত্য নিয়ে যাঁরা নীরবে কাজ করেন, তাঁদের কাছে সন্দীপ দত্ত এক পরিচিত নাম। পাঁচ দশক ধরে প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যের পুনঃপ্রকাশনার কাজও। বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিনের প্যাভেলিয়নে দেখা যেত তাঁকে। তাঁর গ্রন্থাগারে সেকালের ‘সবুজ পত্র’ থেকে ‘কৃত্তিবাস’ বা আজকের প্রায় সব রকমের লিটল ম্যাগাজিনই স্থান পেয়েছিল। এমন অনেক দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহ তাঁর কাছে ছিল, যা একেবারে অকল্পনীয়। সন্দীপ নিজেও একাধিক গল্প, প্রবন্ধ এবং কবিতা সংকলনের স্রষ্টা। করে গিয়েছেন সাহিত্যের পুনঃপ্রকাশনার কাজ। 

লিটল ম্যাগাজিন এক আন্দোলনের নাম অর্থাৎ 'ইনকিলাব'।  ‘স্বপ্ন নয়– শান্তি নয়– ভালোবাসা নয়, হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়’। এই বোধ'ই জন্ম দিয়েছিল সম্পাদনার কাজ। 'মননভূমি' সাহিত্য পত্রিকা। সময়টা ছিল ২০১৭ সাল। বাংলাদেশ সফর থেকে ফিরেই এপ্রিল ২০১৭ সালে 'মননভূমি' প্রথম প্রকাশ প্রায় প্রয়াত বিশ্বজিৎ চৌধুরী ও কম০ নিশীথ রঞ্জন দাসের হাত ধরে। ইচ্ছে ও উদ্দীপনা নিয়ে চলছে আজও। ২০১৮ সালে ডিসেম্বরে ৭ম উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনের আমন্ত্রণ পাই আমরা। সেই সুবাদে আমাদের ৩য় সংখ্যা উন্মোচিত হয় সন্দিপ দত্তের হাত ধরে। দীর্ঘদিনের এক অনন্ত পিপাসা মেটে এই সম্মেলনে। বেশ কিছুসময় তাঁর সাথে আলাপ হয়। লিটল ম্যাগাজিন সম্বন্ধে খুঁটিনাটি বিষয় জানতে পারি। দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে বেশ কিছু সময় আমাদের স্টলেও বসেছিলেন। 'মননভূমি' ১ম ও ৩য় সংখ্যা তাঁর হাতে দিয়েছিলাম। আজও স্মৃতি বিজড়িত সেইসময়। লকডাউন এর পর যখন সন্দিপ দা কে দেখতে যাই, আমি অবাক! পুরো মনে আছে আমাদের কথা লিটল ম্যাগাজিন সহ। তোমাকে ভোলা যায় না সন্দীপ দা। তুমিই শিখিয়েছো আন্দোলনের আরেক নাম লিটল ম্যাগাজিন।

১৫ মার্চ ২০২৩ (বুধবার) ৭২ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন বাংলায় লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব সন্দীপ দত্ত। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মধুমেহ রোগে ভুগছিলেন। হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। গ্যাংগ্রিন হওয়ায় তাঁর একটি পা বাদ দিতে হয়েছিল। বিগত কয়েক দিন ধরে তাঁর ডায়ালিসিস চলছিল। ২০২৩ সালের শুরুতে তাঁর শারীরিক অবস্থার প্রচণ্ড অবনতি ঘটে। প্রথমে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে সেখান থেকে তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সন্দীপ দত্তের প্রয়াণ লিটল ম্যাগাজিনের সংরক্ষণ, অস্তিত্বের ক্ষেত্রে এক বড় আঘাত হানল। তিনি চলে যাওয়ায় লিটল ম্যাগাজিনের জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হল। সন্দীপ দত্তের সংগ্রহে থাকা বহু দুষ্প্রাপ্য পত্রিকা আজ থেকে অভিভাবকহীন হয়ে গেল।

১৮/এম, টেমার লেন, কলকাতা ৭০০০০৯—এই ঠিকানাটি বাংলা পত্র-পত্রিকার প্রতি আগ্রহী বহু মানুষেরই অতি পছন্দের একটি গন্তব্য। এখানেই রয়েছে ‘কলিকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র’। যার প্রতিষ্ঠাতা হলেন সন্দীপ দত্ত। ১৯৭৮ সালের ২৩ জুন এই প্রতিষ্ঠানটি স্থাপিত হয়েছিল। সন্দীপ দত্তের প্রায় একক প্রচেষ্টাতেই এর জন্ম বলা চলে। সাধারণ গ্রন্থাগারে ক্ষুদ্র পত্র-পত্রিকার প্রতি অবহেলা দেখে সন্দীপ দত্ত নিজেই সেগুলি সংরক্ষণ শুরু করেন। নিজের বাড়িতে দু-কামরার ঘরে গড়ে তোলেন লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি। ক্ষুদ্র পত্র-পত্রিকার প্রতি সন্দীপ দত্তের প্রেম সর্বজনবিদিত। প্রায় অর্ধ শতক ধরে তিনি বাংলা পত্র-পত্রিকার সংগ্রহ ও সংরক্ষণে নিবেদিত প্রাণ।

পশ্চিমবঙ্গে অন্তত লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও সন্দীপ দত্তের নাম প্রায় এক নিঃশ্বাসেই উচ্চারিত হতে শোনা যায়।১৯৫১ সালের ২৪ জুলাই কলকাতায় সন্দীপ দত্তের জন্ম। সেন্ট পলস স্কুল থেকে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূত্রপাত হয়। স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ. করেন। সেখান থেকেই বি.এড. ডিগ্রি অর্জন করেন। কলকাতার মির্জাপুরের সিটি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আজীবন সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলেন। সিনে সেন্ট্রাল কলকাতারও সদস্য ছিলেন তিনি। এরকম আরো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। একাধিক পত্র-পত্রিকার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। বেশ কয়েকটি বই রচনা করেছিলেন। ২০০০ সালে তাঁর ‘লিটল ম্যাগাজিন ভাবনা’ বইটি প্রকাশিত হয়। ২০০২ সালে প্রকাশিত হয় ‘ভুবনেশ্বরী’ এবং ‘বিবাহ মঙ্গল’। ২০০৪ সালে ‘বহতা’। ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সম্পাদিত ‘বাংলা ভাষা বিতর্ক’। ২০০৮ সালে তাঁর সম্পাদিত ‘জন্মদিন’ প্রকাশ পায়। সন্দীপ দত্তের হাত ধরেই আসে একগুচ্ছ লিটল ম্যাগাজিন— ‘পত্রপুট’, ‘উজ্জ্বল উদ্ধার’, ‘অল ইন্ডিয়া লিটল ম্যাগাজিন ভয়েস’। সন্দীপ দত্তের একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হল ‘বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিবৃত্ত (১৯০০-১৯৫০)’।

অবশ্য শুধু পত্রিকাই নয়। একইসঙ্গে লোকশিল্পেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন সৃজনশিল্পী সন্দীপ দত্ত। তাঁর লাইব্রেরিতে গেলেই আন্দাজ পাওয়া যাবে তাঁর শিল্পরুচির। তাছাড়াও কলকাতার বুকে লেখকব্যাঙ্ক তৈরি, একাধিক ছোটো পত্রিকা ও গ্রন্থের সম্পাদনা, শিক্ষকতা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরব উপস্থিতি তাঁর। অসুস্থতা সত্ত্বেও শেষ বয়সে হাজির হতেন বাংলার বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন মেলা, বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নের টেবিলে টেবিলে। কাঁপা হাতেই সংগ্রহ করতেন পত্রিকার নতুন সংখ্যা। ইতিহাস, আঞ্চলিক সাহিত্য ও বাংলা ভাষা সংরক্ষণের প্রতি এ এক অকৃত্রিম ভালোবাসাই বটে। এমন এক ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ অভিভাবকহীন করে তুলল দুই বাংলার সমস্ত লিটল ম্যাগাজিন করিয়েদের। ছাদ হারালেন ছোটো পত্রিকার সম্পাদক, কর্মী, লেখক ও গবেষকরা...

প্রসঙ্গ যখন 'বিজ্ঞান শিক্ষা' ও 'বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা'


"বিজ্ঞানশিক্ষা ও বিজ্ঞানমনষ্কতার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। উইকিপিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্য হতে জানা যায়, বিজ্ঞান হচ্ছে বিশ্বের যাবতীয় ভৌত বিষয়াবলী পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ, যাচাই, নিয়মসিদ্ধ, বিধিবদ্ধ ও গবেষণালদ্ধ পদ্ধতি যা জ্ঞানকে তৈরিপূর্বক সুসংগঠিত করার কেন্দ্রস্থল। ল্যাটিন শব্দ সায়েনটিয়া থেকে ইংরেজি সায়েন্স শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে জ্ঞান। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান শব্দটির অর্থ বিশেষ জ্ঞান।" আবার, আধুনিক বিজ্ঞানের উৎস আলোচনা করতে গিয়ে বলা যায়, দর্শন হতেই বিজ্ঞানের উন্মেষ। যদিও আমরা বর্তমানে দেখতে পাই দর্শন ও বিজ্ঞান দুটি পৃথক পদ্ধতিগত শিক্ষা। তথাপি দার্শনিক পদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অভিন্ন নয়। হয়ত নীতিগতভাবে এদের মধ্যে কোনো বৈসাদৃশ্য থাকার কথা ছিল না। 'কারণ প্রাচীনকালে সভ্যতার ঊষালগ্নে আমরা বিজ্ঞানকে দার্শনিক বিষয়বস্তু হিসেবেই আলোচিত হতে দেখি। তখন বলা হতো, Natural Philosophy বা ভৌত দর্শন। নিউটনের ‘ন্যাচারালিস ফিলোসফিয়া প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা’ এর প্রমাণ। পদার্থবিজ্ঞানে যুক্তির প্রয়োগ, আরোহী-অবরোহী পদ্ধতির প্রয়োগ – এসবই দার্শনিক ভাবপ্রসূত। কিন্তু ক্রমশ গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান শাস্ত্রীয় দর্শন থেকে আলাদা হয়ে বর্তমান বিজ্ঞানের ভিত্তিভূমি রচনা করেছে।'

'সুতরাং, বিজ্ঞান শব্দটির সবচেয়ে সরলীকৃত অর্থ হলো- বিজ্ঞান হচ্ছে একটি দর্শন, যে দর্শনের মূল ভিত্তিই হলো প্রশ্ন করা ও কার্যকরণ অনুসন্ধান করা।' এবং, এককথায় বিজ্ঞানমনষ্কতা বলতে সেই দুটি বৈশিষ্ট্যকে বুঝায় যা বিজ্ঞানকে ধারণ করতে অপরিহার্য। এই দুটি বৈশিষ্ট্য হলো – প্রশ্ন করার প্রবণতা এবং কার্যকরণ অনুসন্ধানের
প্রবণতা। সুতরাং, যে ব্যক্তি অন্তরে উপরোক্ত দুটি বৈশিষ্ট্য ধারণ করবেন তিনিই বিজ্ঞানমনষ্ক হিসেবে বিবেচিত হবেন। এজন্য বিজ্ঞানের ছাত্র হবার প্রয়োজন নাই। যেমন: পেরিয়ার, আহমদ শরীফ বা হুমায়ুন আজাদ, কেউই বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন না। দর্শন ও সাহিত্যের ছাত্র হয়েও তাঁরা বিজ্ঞানমনস্কতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তেমনি স্বশিক্ষিত বিজ্ঞানমনষ্ক ছিলেন আরজ আলী মাতুব্বর। তিনিও স্বেচ্ছায় প্রশ্ন ও কার্যকরণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিজ্ঞানমনষ্কতার প্রমাণ রেখেছেন। একই কথা প্রযোজ্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বেলায়ও। তিনিও বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। কিন্তু, তিনি গ্রামে গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন শিশুদের। শিখিয়েছেন আহ্নিক গতি বার্ষিক গতির কার্যকরণ।

অপরদিকে, “বিজ্ঞানশিক্ষা” শব্দটি শুধুমাত্র পদ্ধতিগত এবং সীমাবদ্ধ বিজ্ঞান শিক্ষাকেই বুঝায়। এটি সাবজেক্ট ও সিলেবাসনির্ভর নিতান্তই সীমিত পরিসরে বিজ্ঞানের কিছু কার্যকরণকে আয়ত্ব করার শিক্ষা। রাষ্ট্রপ্রণীত “শিক্ষা” সর্বদাই নির্দিষ্ট। এর গতিপথ নির্দিষ্ট এবং নিয়ন্ত্রিত। যেকেউ এই নির্দিষ্ট গতিপথে চলে, নির্দিষ্ট সিলেবাস মুখস্থ করে “বিজ্ঞানশিক্ষা” সম্পন্ন করে দক্ষ কর্মী হতে পারে। এই সম্পূর্ণ ব্যবস্থাটি বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী একেকজন কর্মী উৎপাদন নিশ্চিত করে। এতে সেই কর্মীটি অন্তরে আদৌ প্রশ্ন করার এবং অনুসন্ধানের ক্ষমতা রাখেন কিনা – সে ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। বস্তুত, এই বিজ্ঞানমনষ্কতার বিকাশকে শিক্ষাব্যবস্থা তেমন গুরুত্ব দেয় না। একজন ব্যক্তির মনের মধ্যে প্রশ্ন করার ক্ষমতা এবং অনুসন্ধানের স্পৃহা জাগবে কি জাগবে না তা নির্ভর করে তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক অবস্থা, পারিবারিক শিক্ষা এবং শিক্ষাব্যবস্থার পরিবেশের উপরে।

এবারে আরও একটি ঘটনার কথা বলি যা আমাদের পরিষ্কারভাবে বুঝতে সাহায্য করবে, পদ্ধতিগত “বিজ্ঞানশিক্ষা” কিভাবে একজন ব্যক্তিকে বিজ্ঞানমনষ্ক করতে ব্যর্থ হয়। ক্লাস টেনের যখন আমি ছাত্র ছিলাম। তো, আমাকে বাসায় সাইন্স ও মেথস পড়াতেন পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রিধারী একজন স্কুল শিক্ষক। তিনি আমাকে খনিজ পদার্থের সৃষ্টিপ্রক্রিয়া বুঝাতে গিয়ে বলেছিলেন, হাজার বছর ধরে গাছপালা মাটির তলায় পড়ে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে এইসব খনিজ মজুদ
হয়েছে – এসব শুধু পড়ার জন্য পড়ো, কিন্তু বিশ্বাস কোরো না। কারণ, ধর্মগ্রন্থে স্পষ্ট আছে, এইসব স্রষ্টার দান।
অর্থ্যাৎ, তিনি নিজে বিজ্ঞানচর্চা করেছেন ঠিকই, কিন্তু, বিজ্ঞানমনষ্ক হতে পারেন নাই। এবারে তিনি আমাকে বিজ্ঞানচর্চা করতে বলছেন ঠিকই কিন্তু বিজ্ঞানমনষ্ক হতে রীতিমত বাধা দিচ্ছেন! এইভাবে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা বাধাগ্রস্থ হয় পদে পদে। ( যদিও আমি পরবর্তীতে আর্টস নিয়ে পড়াশোনা করি) 'বিজ্ঞানমনষ্কতা ও বিজ্ঞানশিক্ষার মধ্যকার এই যে দ্বৈরথ তা মানুষকে বিজ্ঞানমনষ্ক হতে বাধা দেয়। বিজ্ঞানশিক্ষা হলো প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার একটি অংশবিশেষ। তাই, বিজ্ঞানমনষ্কতা এবং বিজ্ঞানশিক্ষা পুরোপুরি দুইধরণের কথা বলে। বিজ্ঞানমনষ্কতা মানুষকে বলে সম্ভাবনার কথা। আর বিজ্ঞানশিক্ষা বলে সীমাবদ্ধতা ও শর্টকাটের কথা। অর্থাৎ, কোন পথে, কতটুকু বিজ্ঞান শিখলে দক্ষ টেকনোলজিস্ট হওয়া যাবে এবং কোন কোন পথে যাওয়া বারণ। 

“শিক্ষা” সামগ্রিকভাবে একটি প্যাকেজ, যেখানে জ্ঞানের বহু শাখার অল্প অল্প তথ্য সীমাবদ্ধ করে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ হলো রাষ্ট্রপ্রণীত একটি কৃত্রিম ব্যবস্থা যেখানে শিক্ষার্থী মূলত রাষ্ট্রের কাছ থেকে শিখছে, প্রকৃতির কাছ থেকে নয়। বিজ্ঞানশিক্ষাও এইরকম একটা প্যাকেজ। এখানেও রয়েছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রণীত বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে স্রেফ দক্ষতা অর্জনের জন্য বিশেষ সিলেবাস এবং লিমিটেড পাঠদান। অপরপক্ষে, বিজ্ঞানমনষ্কতা রাষ্ট্রনির্ভর কোনো বিষয় নয়, প্রকৃতিনির্ভর বিষয়। এর কোনো সীমা-পরিসীমা নাই, এতে রয়েছে চিন্তার স্বাধীনতা এবং নিজস্ব সিদ্ধান্ত যাচাই করার সুযোগ।
অপরদিকে শিক্ষাব্যবস্থা তথা বিজ্ঞানশিক্ষার কেবলমাত্র দুটি উদ্দেশ্য – পরীক্ষার নম্বর ও অর্থসংস্থান। এই অর্থসংস্থান হলো বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে করে খাওয়ার নিছক শিক্ষা, কোনো দর্শনের উন্মেষ ঘটানো এর উদ্দেশ্য নয়। কারণ, বৈজ্ঞানিক দর্শনের উন্মেষ বস্তুত সকল বিষয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করে, এমনকি তা শাসককেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে ছাড়ে না। আর শাসক প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া মানে শিক্ষাব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া। মুক্তচিন্তার উন্মেষ মানেই সকল পদ্ধতিগত, সীমিত জ্ঞানচর্চার বিলোপ। সুতরাং, বিজ্ঞানমনষ্কতার বিকাশ বিজ্ঞানশিক্ষা, শিক্ষাব্যবস্থা এমনকি খোদ রাষ্ট্রের জন্যেও একটি বিপদজনক বিষয়ই হয়ে দাঁড়ায়।'

কিন্তু, বিজ্ঞানশিক্ষা কেবলমাত্র বিজ্ঞানের নির্দিষ্ট কিছু তত্ত্ব শেখায়। সেগুলো মানুষকে প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করে না, ফলে শাসক থাকেন নিরাপদ। শিক্ষাব্যবস্থা এবং বিজ্ঞানশিক্ষা বলতে আমি শুধু দেশের পরিপ্রেক্ষিতকে বুঝাচ্ছি না। “শিক্ষাব্যবস্থা” বা “বিজ্ঞানশিক্ষা” – এসবের প্রকৃতি সমগ্র পৃথিবীতেই কমবেশী একইরকম। খোদ ইংল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করতে গিয়ে জর্জ বার্নাডশ বলেছিলেন, “একজন ছাত্রকে গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রী দেওয়া হয় কখন? যখন সেই ছাত্র একটা তথাকথিত শিক্ষাপ্রদানের পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে শেষ পর্যন্ত সে নিজের সম্বন্ধে ভাববার সকল ক্ষমতা হারিয়ে ফেল তখন।”

শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহারিক শিক্ষাকেও সীমাবদ্ধ করে বিজ্ঞানমনষ্কতাকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টাও স্পষ্ট। দেশের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় দীর্ঘদিন বিশেষ কোনো ব্যবহারিক বিজ্ঞানশিক্ষার ব্যবস্থাই ছিলোনা। "এজন্য খোদ বিজ্ঞানশিক্ষাও বেশ প্রকাশ্যেই সমাজে চলে আসা হাজার বছরের ধর্মশ্রায়ী কুসংস্কারগুলোকে ধারণ করে, এদের রদ করার চেষ্টা করে না। স্রেফ টেকনোলজিতে দক্ষ কর্মী উৎপাদনের জন্য কুসংস্কারকে দূরীকরণের প্রয়োজনও নাই। তাই, খোদ বিজ্ঞানের শিক্ষকেরাই বিজ্ঞানমনষ্ক নয়। তাঁরাই বয়ে বেড়ান ধর্মাশ্রয়ী কুসংস্কার। তাঁরা শিক্ষার্থীদের মনে সেইসব কুসংস্কারের বীজ বপন করে দেন। পরিবার থেকেও শিক্ষার্থীরা পায় নানান ধরণের ধর্মাশ্রয়ী কুসংস্কারের শিক্ষা। ফলে, উচ্চতর শিক্ষায় দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার সুযোগ পেলেও ছোটবেলা থেকে মনের মধ্যে জেঁকে বসা কুসংস্কারগুলো বিজ্ঞানকে মনের মধ্যে আলোড়িত করতে বাধা দেয়।"

আবার, আরেকটু ভিন্নচিত্রও দেখা দেয়। যদি আমরা ধরে নেই এইসব শিক্ষার্থীর জীবনে ধর্ম একটা বিরাট প্রভাব ফেলে, তারা ধর্মীয় অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলে – তাহলেও ভুল হবে। এটা শুধু ধর্মপ্রেম নয়। এ হলো নিখাঁদ কুসংস্কার, নিখাঁদ গোড়ামী। ব্যক্তিগত জীবনে এদের বেশীরভাগও ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি নির্ভরশীল নয়, শুধুমাত্র বিজ্ঞানশিক্ষার বেলায় ঘটে সংঘাত, তাও কিছু কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্নে – যেমনঃ কসমোলজি বা সৃষ্টিতত্ত্ব, বিবর্তনতত্ত্ব, ভূগোল ইত্যাদি।

"এতো গেল ধর্মাশ্রয়ী কুসংস্কারগ্রস্থদের কথা। আবার, এমনও বিজ্ঞানশিক্ষার্থী দেখা যায় যারা হয়তো বিজ্ঞানচর্চায় পারদর্শী কিন্তু নিজেরা বিজ্ঞানমনষ্ক নয়। অর্থ্যাৎ, উদ্ভাবনীর দিকে এদের আগ্রহ নেই বললেই চলে। এরা দক্ষ বিজ্ঞানকর্মী হতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই বিজ্ঞানী নয়। এরকম উদাহরণ ভরী ভরী যেখানে শিক্ষার্থীর একাডেমিক রেজাল্ট দুর্দান্ত, কিন্তু, তারা মোটেও বিজ্ঞানমনষ্ক নয়। তারা বিজ্ঞানকে আয়ত্ত্ব করতে পারে, তত্ত্বের মারপ্যাঁচ, জটিল-কঠিন সমীকরণ বুঝতে পারে, তা দিয়ে বিভিন্ন প্রজেক্টও করতে পারে কিন্তু, সৃজনশীলতার বেলায় অত্যন্ত কাঁচা। অর্থ্যাৎ, জানাশোনা সমীকরণ, জানাশোনা সমস্যা এরা সমাধান করতে পারে, কিন্তু উদ্ভাবনী শক্তি গড়পড়তা নেই বললেই চলে। বিজ্ঞানশিক্ষার পরেই এদের লক্ষ্য থাকে কোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করা অথবা বিদেশে পাড়ি জমানো। আমাদের দেশের সর্বোপরি বিজ্ঞানশিক্ষার যে চল, যে কাঠামো রয়েছে সেটাই এই সৃষ্টিশীলতাকে নষ্ট করার জন্য দায়ী বলে মনে হয়। তাছাড়া, আমাদের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা, ওয়ার্কিং সেক্টরের অভাব এসবও গভীরভাবে জড়িত। এসব ছাড়াও আরও একটি ব্যাপারকে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় তা হলো, আমাদের সমাজে বিজ্ঞানশিক্ষা একটি এলিট স্থান অধিকার করেছে। এখানে ছেলেমেয়েদের চাপ দিয়ে বিজ্ঞান পড়তে দেওয়া হয়। অনেকের হয়তো থাকে না যথেষ্ট আগ্রহ। তাছাড়া সেই পুরাতন কুসংস্কারগুলোকেও আরও সযত্নে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অর্থনৈতিক অবস্থা তাকে বাধ্য করে এই ভাবতে যে – কোনোমতে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শেষ করতে পারলেই হলো, তাহলেই মিলে যাবে একটা চাকুরী। এইরকম মানসিকতা থেকে বিজ্ঞানকে শুধু চর্চা করাই হয়, নিজেকে শুধু কর্পোরেট জগতের জন্য প্রস্তুত করাই হয় কিন্তু, প্রকৃত বিজ্ঞান শিক্ষার ফলে মস্তিষ্কে যে যুক্তিবোধ ও বিজ্ঞানমনষ্কতার অনুরণন ঘটার কথা, তা আর ঘটার সুযোগ পায় না। কুসংস্কার, অপশিক্ষা আর রাষ্ট্রীয় দৈন্যের ফলে অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে যায় এইদেশের বেশীরভাগ শিক্ষার্থীর বিজ্ঞানমনষ্কতা; বিজ্ঞান আটকে যায় সীমিত পরিসরের মধ্যে। বিজ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞানমনষ্কতা এক জিনিস নয়। বিজ্ঞানমনষ্ক একজন ব্যক্তি সর্বদাই স্বশিক্ষিত এবং শুভব্রতচারী। তাঁরা যদিও জনহিতকর কাজে নিয়োজিত থাকেন। বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষের মধ্যে স্বাধীনতাবোধ জাগ্রত হতে বাধ্য। আর, স্বাধীনতাবোধ কর্তৃত্বতন্ত্রের পতন ঘটানোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী চেতনা। এতে রাষ্ট্র নামক কর্তৃপক্ষের অস্তিত্ব ধ্বংসের মুখোমুখি হয়। একজন বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষ সমাজের সংস্কার সাধন করেন ঠিকই তথাপি খোদ রাষ্ট্রই তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। আবার, উল্টোদিকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানশিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে টেকনোলজির প্রতি অন্ধমোহ সৃষ্টি করে। আর, টেকনোলজির প্রতি অন্ধমোহ পারমাণবিক বোমার জন্যও ভালোবাসার জন্ম দিতে পারে। বিজ্ঞানকে তাই ক্ষুদ্র পরিসরে আটক করে ফেললে তা জন্ম দেবে স্রেফ চমকপ্রদ কর্পোরেট খেলনার। এসব খেলনা দিয়ে মানুষ খেলবে ঠিকই, পয়সাও আসবে বহুত, কিন্তু, সংস্কার ভাঙবে না।

Thursday, January 26, 2023

প্রসঙ্গ পুঁজিবাদ : মহামন্দার গহ্বরে অর্থনীতি


আমরা বেশ সগৌরবে স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছরের 'অমৃত মহোৎসব' পালন করেছি ঠিকই কিন্তু আরও কোনঠাসা করে ফেলেছি শ্রমজীবী মানুষের জীবন। যাদের শ্রমের বিনিময়ে জিডিপি বাড়ে, জাতীয় আয় বাড়ে — তাঁরাই দেশপ্রেমের এই হুজুগে আজ অমানিশায়। শ্রমিকের জীবনে তাই স্বাধীনতার স্বাদ মানে একেবারেই অন্যরকম কিছু !!পুঁজিবাদের বাজার অর্থনীতি আজ এমনভাবে গোটা বিশ্বকে হাতের মুঠোয় ভরে মানুষের রক্ত চুঁষে খাবার জন্য তিল তিল করে আমার আপনার বাড়ির ভিতর থেকে রান্না ঘরে ঢুকে পড়েছে। তারসাথে ফ‍্যাসিবাদও নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছে ওতপ্রোতভাবে। কিছু বছর আগেও দুটো হাতের চরিত্র যদিও ছিল ভিন্ন। আজ পুঁজিবাদ ও ফ‍্যাসিবাদের দুটো হাত এক হতে চলেছে।

১৯৯১ সালের ২৬শে ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক শিবির পতনের সাথে সাথে পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদ এবং বিশ্ব পুঁজিপতিরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ঘোষণা করেছিলেন যে মানবজাতির মুক্তি আনবে পুঁজিবাদ। তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া থাকাকালীন পুরো পৃথিবী ছিল দুই মেরুতে। ১৯৯১ সনের পর গোটা বিশ্ব এক কাতারে আসে। অর্থাৎ পুঁজিবাদী অর্থনীতির কেন্দ্রস্থল আমেরিকা, তাঁর নির্দেশে পরিচালিত হয় গোটা বিশ্ব অর্থনীতি। আইএমএফ, ওয়ার্ড বেংক এবং আমেরিকার কোষাগারের যৌত মিলনে ১৯৮৯ সনে অর্থনীতিবিদ উইলিয়ামসনের (John Williamson) নেতৃত্বে ওয়াশিংটন ঐক্যমত (Washington Consensus) নামে বিশ্বায়ন বা মুক্ত অর্থনীতির ধারণা সমগ্র বিশ্বে প্রবর্তন করা হয়েছিল। সেই সময় তদানীন্তন বিত্তমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিং এই তথ্য আমদানি করেন এবং সেইসাথে ভারতেও তা ইমপ্লিমেন্ট হয়। তার সাথে উচ্চস্বরে ঘোষণা হল — বিশ্বায়ন বা মুক্তবাজার বা নব্য উদার অর্থনীতি বিশ্বের সকল স্তরের মানুষের দুঃখ দুর্দশা দূর করবে। সেই একই লক্ষ্যে ডঃ মনমোহন সিং ভারতেও নেহেরুভিয়ান মিশ্র অর্থনীতির অবসান ঘটিয়ে নব্য উদার অর্থনীতির প্রবর্তন করেন।

'সারভাইভাল অফ দ্য রিচেস্ট'। অক্সফ্যামের রিপোর্টে দেখা গেল বিশ্বজোড়া অসাম্যের করুণ চিত্র। ধনীদের আয়ের পাশাপাশি বাড়ছে দরিদ্র, ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা। তারই মধ্যে বিশ্বজোড়া আর্থিক মন্দার ভ্রূকুটি। দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে আর্থিক বৃদ্ধির হার। আর্থিক সমৃদ্ধিতে ক্ষীর খাওয়া কর্পোরেট দানবরা শ্রমজীবী মানুষদের ঠেলে দেয় মন্দার ফল ভোগে। আসলে এটাই তো পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় দস্তুর। জিডিপি বৃদ্ধির হার, জাতীয় আয় বৃদ্ধির পরিসংখ্যান আমজনতার জীবনে কোনো সুদিনের বার্তা নিয়ে আসে না। অক্সফ্যামের রিপোর্ট বলছে, ভারতে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা ৫০% মানুষ পেয়েছেন জাতীয় আয়ের মাত্র ১৩%। এই মন্দার মধ্যেও আন্তর্জাতিক কর্পোরেট সংস্থার আয় বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যারফলে সম্পদ কমছে নিম্নবিত্ত আর গরিব মানুষের। যদিও শাক দিয়ে মাছ ডাকা হচ্ছে তারপরও আসল চিত্রটা সকলে সামনেই উঠে আসছে।

'নতুন বছরে প্রকাশিত সারভাইভাল অফ দ্য রিচেস্ট নামের রিপোর্ট জানাচ্ছে, পঁচিশ বছরের মধ্যে প্রথম বিশ্বে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে।  বাড়ছে পেটভরা পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যা। বিনিময়ে ধনকুবেরদের সম্পত্তির পরিমাণ রেকর্ড হারে বাড়ছে। ২০২০ সাল থেকে বিশ্বে যত সম্পদ বেড়েছে তার দুই তৃতীয়াংশের মালিক মাত্র এক শতাংশ মানুষ। অতিমারিতে তাদের সম্পদ বিপুল পরিমাণ বেড়েছে। বিলিয়নেয়ারদের (যাদের সম্পদের পরিমাণ ১০০ কোটি ডলার বা তার বেশি) প্রতিদিন গড়ে ২৭০ কোটি ডলার সম্পদ বাড়ছে। পাশাপাশি ৮০ হাজার কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত। দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধিতে কোটি কোটি মানুষের টিকে থাকাই দায়।

রিপোর্টে ভারতের অসাম্যের লজ্জাজনক চিত্রও উঠে এসেছে। বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গরীব মানুষের বাস ভারতে। বিশ্ব ক্ষুধা সূচক, মানব উন্নয়ন সূচকে এই দেশের চিত্র প্রতিবেশী অনেক দেশের থেকেই খারাপ। রিপোর্ট জানাচ্ছে, আর্থিক দিক থেকে উপরে থাকা ১০ শতাংশ ধনী দেশের মোট সম্পদের ৭২ শতাংশের মালিক। দেশে যে পরিমাণ সম্পদ বেড়েছে, তার ৬২ শতাংশের মালিক এক শতাংশ ধনকুবের। অর্থাৎ আর্থিক বিকাশের ক্ষীরের সিংহভাগ খেয়েছে এই এক শতাংশ ধনকুবের। পাশাপাশি নিচে থাকা ৫০ শতাংশ মানুষ দেশের মোট সম্পদের মাত্র তিন শতাংশের মালিক। বলার অপেক্ষা রাখে না, যে নিচের তলায় থাকা ৩০ শতাংশ মানুষ আক্ষরিক অর্থেই আজ রিক্ত।

রিপোর্টেও সেই তথ্য ধরা পড়েছে। ভারতের ৭০ শতাংশ মানুষ পেটভরা পুষ্টিকর খাবার পান না। অপুষ্টিজনিত রোগে এই দেশে প্রতি বছর ১৭ লক্ষেরও বেশি মানুষ মারা যান। দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, বেকারত্ব বাড়ছে। রিপোর্ট জানাচ্ছে, দেশের ৮৪ শতাংশ পরিবারের প্রকৃত আয় অতিমারীর বছরে (২০২০-২১) কমেছে। অথচ কর্পোরেট সংস্থাগুলির মুনাফা বেড়েছে ৭০ শতাংশ। অতিমারীর দুবছরে ভারতে বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা ৬৪ জন বেড়ে হয়েছে ১৬৬। দেশে ১০০ জন ধনী ব্যক্তির মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৫৪ লক্ষ কোটি টাকার বেশি। ভুললে হবে না, ২০২২-২৩ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে মোট বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ ৪০ লক্ষ কোটি টাকারও কম। শুধুমাত্র আদানি কোম্পানির কর্ণধারের সম্পদ অতিমারীতে বেড়েছে আট গুণ। আর ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো জানাচ্ছে, ২০২১ সালে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১১৫ জন দিনমজুর আত্মহত্যা করেছেন।'

তারসাথে জাতি ও লিঙ্গগত বৈষম্যের শিকার আর্থিক অসাম্যের সঙ্গে। 'অক্সফ্যাম রিপোর্ট জানাচ্ছে, এ দেশে লিঙ্গ বৈষম্যের সঙ্গে আর্থিক অসাম্যের সম্পর্ক বেশি প্রকট। মহিলাপ্রধান পরিবারগুলোর দারিদ্র্যের বিচারে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অবস্থাই সবচেয়ে করুণ। ভারতে প্রতি সাতটি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবার মহিলাপ্রধান। কর্মরত মহিলাদের মধ্যে মাত্র ১৯ শতাংশ নিয়মিত বেতন পান। পুরুষদের মধ্যে এই হার ৬০ শতাংশ। পুরুষ শ্রমিক এক টাকা রোজগার করলে, মহিলা শ্রমিক পান ৬৩ পয়সা। উচ্চবর্ণের শ্রমিক যত মজুরি পান, দলিতরা পান তার ৫৫ শতাংশ মজুরি। শহর ও গ্রামের মধ্যেও আয়ের বৈষম্য রয়েছে। গ্রামাঞ্চলের শ্রমিক শহরাঞ্চলের অর্ধেক আয় করেন।' তাহলে কি বলা যায় কর্পোরেটদের রোষানলে কেবল 'সংবিধানের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাকেই বিপন্ন করছে না, গড়ে তুলছে চূড়ান্ত অসাম্যের দেশ' ?

১৯৯১ সনের পর থেকে আজ ৩২ বছর অতিক্রান্ত। পরিতাপের বিষয় যে পৃথিবী আমেরিকা থেকে শুরু করে কোন দেশেই দরিদ্র পীড়িত মানুষের অবসান ঘটাতে পারে নাই। অন্যদিকে এই নব্য উদারনীতি বছরে বছরে বিভিন্ন দেশে আর্থিক সংকট তৈরি করছে এবং যার ফলস্বরূপ ২০০৮ সালে সমগ্র বিশ্ব মহামন্দায় নিমজ্জিত হয়েছিল। বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদরা ঘোষণা করতে বাধ্য হচ্ছেন যে ২০০৮ এর মহামন্দা থেকে ২০২২-২৩ সনের বিত্তীয় বছরে গভীর সংকটে নিমজ্জিত হওয়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে। গত সাত অক্টোবর ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংকের বাৎসরিক অধিবেশনে আইএমএফ এর পরিচালনা সঞ্চালক জর্জিওভা (Kristalina Ivanova Georgieva) ব্যক্ত করেন বিশ্বের অর্থনীতি এক অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে আমেরিকা সহ ইউরোপের বহু দেশ অর্থনীতি সংকটে আক্রান্ত। রাষ্ট্রসঙ্ঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিশ্বে পুঁজিবাদী অর্থনীতি ২০০৮ সাল থেকেও গভীর মহামন্দার দিকে ধাবিত ( The world is headed towards a global recession and prolonged stagnation unless we quickly change the current policy course of monetary and fiscal tightening in advanced economics.) এতে রাষ্ট্রসংঘ ধারণা করছে যে বিশ্বের জিডিপির বিকাশ ২.২% হ্রাস হবে। রাষ্ট্রসংঘ আরও বলছে যে দেশগুলোতে দরিদ্র শ্রেণী সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হবে ( they are hitting the poorest the hardest )। অর্থনৈতিক সংকটের সাথে সাথে দেশগুলোতে আর্থসামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হবে এবং জলবায়ু নিয়ন্ত্রণেও বাধা হবে।

পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থাটাই চূড়ান্ত অন্যায় এবং অমানবিয়। সেখানে শ্রমের উচিত মূল্য না দিয়ে মুনাফা লাভ করা হয়। শ্রমশক্তির দাম যত কম হবে, মুনাফা ততই বাড়বে। জিডিপি বাড়লে আর্থিক বিকাশ হবে। কিন্তু না, সেখানেই চলে আসল খেলা। শ্রমের অসাম্যতা তৈরি করে এখানে চলে আর্থিক মুনাফা বৃদ্ধির ধান্ধা। ২০০৭-০৮ সালের আর্থিক মহামন্দা এখনও কেটে উঠতে পারেনি গোটা পৃথিবী সহ ভারতও, কিন্তু আবারও রোমন্থনের পথে ধাবিত হচ্ছে আর্থিক মন্দার দিকে। সেইজন্য অর্থনৈতিক মহামন্দা থেকে ভারতকে কিভাবে উত্তরণের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় সেটাই এখন ভাববার বিষয়।

তথ্যসূত্রঃ 
১) https://www.britannica.com/topic/1991-Soviet-coup-attempt
২) 
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Washington_Consensus
৩) https://en.m.wikipedia.org/wiki/2007%E2%80%932008_financial_crisis
৪) https://www.oxfam.org/en/press-releases/richest-1-bag-nearly-twice-much-wealth-rest-world-put-together-over-past-two-years
৫) 
https://meetings.imf.org/en/2022/Annual
৬) 
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Kristalina_Georgieva

https://epaper.bartalipi.in/

Thursday, January 19, 2023

ধর্ম ও বিজ্ঞান দ্বন্ধ


মহাবিশ্ব সৃষ্টির পেছনে ঈশ্বরের কোন ভূমিকা নেই মহাবিশ্ব পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মনীতি অনুযায়ী স্বতস্ফুর্তভাবে সৃষ্টি হয়েছে। মহাবিশ্বের উৎপত্তি এবং অস্তিত্বের ব্যাখ্যায় ঈশ্বরের আমদানি একেবারে হাস্যকর - স্টিফেন হকিন্স

১|
বিশ্বের কোনো ধর্মীয় নেতা বিজ্ঞান চর্চাকে উৎসাহিত করেন না কারণ বিজ্ঞান প্রকৃতির চিরন্তন সত্য এবং যা ধর্মীয় নেতাদের দ্বারা পরিচালিত ধর্মীয় ব্যবসাকে ধ্বংস করবে।  ধর্ম মানুষ চাইলেই পরিবর্তন করতে পারে বা চাইলে নতুন ধর্ম প্রবর্তন করতে পারে এবং নতুন নাম দিয়ে নতুন ঈশ্বর তৈরি করতে পারে।কেউ তার ধর্মে দীক্ষিত হোক বা না হোক সেটা অন্য বিষয়।  আপনার পরিবার যদি তা পালন করতে থাকে, তবুও হাজার বছর পর সেই ধর্ম পালনকারীর সংখ্যা হাজারের মধ্যে হতে পারে।  ধর্ম এবং ঈশ্বর (ঈশ্বর) যেমন বিভিন্ন মানুষের জন্য আলাদা হতে পারে, তেমনি বিজ্ঞান শুধু পৃথিবীতে নয়, মহাবিশ্বের সর্বত্র একই, কারণ বিজ্ঞান চিরন্তন সত্য।

বিজ্ঞানের নিয়ম সমূহ (Laws of Nature) ব্ৰহ্মাণ্ড সৃষ্টির আগে থেকেই ছিল।আসলে, প্রকৃতির নিয়মই হল বিজ্ঞান।প্ৰকৃতির নিয়ম অৰ্থাৎ আমাদের মহাবিশ্ব ১৩৭০ বিলিয়ন বছর আগে বিগ ব্যাং-এ গঠিত হয়েছিল বিজ্ঞানের নিয়মে। বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ প্ৰবাহ ,চুম্বকত্ব, মাধ্যকৰ্ষণিক বল ইত্যাদি হতে আর অন্যান্য বহু নিয়ম (Laws of Nature) এর ফলে কঠিন, তরল এবং বায়বীয় পদার্থের আয়তন বৃদ্ধি পায়। এগুলো সবই প্রাকৃতিক ঘটনা । প্রকৃতির উপরোক্ত নিয়মের সাহায্যে, মানুষ আজ আরামে বসবাসের জন্য বিভিন্ন মেশিন, যানবাহন এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর তৈরি করতে সক্ষম।প্রকৃতি যদি ইচ্ছামত উপরোক্ত আইন পরিবর্তন করতে পারত, তাহলে আমরা অনেক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হই, অর্থাৎ প্রকৃতি নিজেই উপরোক্ত আইন পরিবর্তন করতে পারবে না।যদি প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়ম পরিবর্তন করতে পারে, তাহলে কোনো এক সময়ে আমাদের মহাবিশ্বের যেকোনো গ্রহে জ্বালানিচালিত যানবাহন যেখানে থাকবে সেখানেই থাকবে, যদি তারা গরম হয়ে গেলে পদার্থের আয়তন না বাড়ায়।একইভাবে বিদ্যুতের নিয়ম পরিবর্তন করা হলে মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানে থাকা বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলো অসম্পূর্ণ হয়ে যাবে।কিন্তু আমাদের মহাবিশ্ব সৃষ্টির পর থেকে প্রকৃতির নিয়ম এভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ নেই।পদাৰ্থের ভর অনুযায়ী মাধ্যকৰ্ষণিক বল থাকে।পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টির আগে থেকেই এগুলো আমাদের মহাবিশ্বে ছিল, আজও আছে এবং মানুষ হারিয়ে গেলেও ভবিষ্যতেও থাকবে।তাই বিজ্ঞান চিরন্তন সত্য।কিন্তু ধর্মগুলো মানবসৃষ্ট।এই ধর্মগুলোর সত্যতার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। খ্রিস্টান সম্প্রদায় কোপার্নিকাস, ব্রুনো এবং গ্যালিলিওর বিবৃতিতে "পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র হিসাবে" সম্পর্কে বাইবেলের ভুল বর্ণনাকে সংশোধন করে যে "পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়।

ধর্মের অসত্যটা যুক্তি দিয়ে তুলে ধরলেই কেউ ধর্ম বিদ্বেষী হয়ে যায় না। ঈশ্বর একটি কাল্পনিক শব্দ, ঈশ্বর নামে কিছু থাকলে এতদিনে প্রমাণিত হতে কি বাকি থাকতো। না নিশ্চয় বাকি থাকতো না।এককথায় স্ক্রিজোফোনিয়াতে আক্রান্ত মানুষরাই দৈব বাণী শুনতে পারে আর তাদের কল্যাণেই পৃথিবীতে গড়ে উঠে ঈশ্বর ও ধর্মের সৃষ্টি। ধর্ম বিশ্বাসী আবেগী ধার্মিকগণ সচরাচর মানবিক আচরণের সকল সংজ্ঞার সমীকরণ ধর্মের বাণী দিয়ে ব্যাখ্যা করে ছক্কা মেরে বসেন, কিন্তু গুণাক্ষরেও একটি বারের জন্যে চিন্তা করে দেখেন না যে পৃথিবীতে হাজার হাজার ধর্মের জন্ম হয়েছে আবার তা সময়ের গহ্বরে হারিয়েও গেছে। যে ধর্মগুলো আধুনিক বিশ্বের বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় এখনও ধুকে ধুকে টিকে আছে, যেখানে সকল ধরণের মধ্যযুগীয় আচার, নিয়ম-কানুন দিয়ে সেই সব ধর্ম গ্রন্থগুলো পরিপূর্ণ, হাস্যকর বিষয় হচ্ছে আবেগী ধার্মিকগণ সেই সব অমানবিক আচার, নিয়ম-কানুন গুলোকে বৈজ্ঞানিক আবরণ লাগাতে উঠে পড়ে লেগেছেন।

ডারউইনের বিবর্তন বাদ, সৌরজগতের সূর্যকেন্দ্রিক মডেল, এবং বিগ ব্যাং। এইসব বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, যুক্তি প্রমাণ ও ব্যাখ্যা ধর্ম দ্বারা প্রতিরোধ করা চেষ্টা করা হয়েছে ও হচ্ছে। বিজ্ঞান এবং নাস্তিকতার উত্থানকে রেনেসাঁ নামে দ্রুত সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক বিকাশের সময়কে দায়ী করা যেতে পারে যা প্রায় পাঁচশত বছর আগে ইউরোপে শুরু হয়েছিল। এই রেনেসাঁ এটি পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধগুলিকে বিশ্বে আধিপত্যের দিকে পরিচালিত করে। উদার, বুদ্ধিজীবী এবং নাস্তিকতাবাদ মনোভাবগুলিকে দিন দিন মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। অনেক ধর্মীয় নেতা এই মূল্যবোধগুলিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কেউ কেউ বিজ্ঞানের সাথে বৃহত্তর চুক্তির জন্য ধর্মগ্রন্থের পুনর্ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন বা এই ব্যাখ্যা গুলোকে নিজেদের মনের মাধুরী দিয়ে সাজাবার চেষ্টা করেছেন। 

বিজ্ঞানের প্রমাণ ও যুক্তি বিশ্ব ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের অসামঞ্জস্যের দিকে তুলে ধরেছিল, ফলে যেখানে যারা পরিবর্তন করতে অনিচ্ছুক তারা নিজেদেরকে সংস্কারকদের থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল। ফলস্বরূপ, পুরানো ধর্মগুলি নতুন সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে, প্রত্যেকেরই ঐতিহ্যগত বিশ্বাসের নিজস্ব ব্যাখ্যা দিতে থাকে।  উদহারণসরূপ বলা যায় যে অনেক আবেগী ধার্মিকগণ ধর্ম গ্রন্থের মাঝে বিগ ব্যাং খোজার চেষ্টা করছেন ,চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করার লেখা হয়েছে কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে জোয়ার ভাটার যে ব্যাপক পরিবর্তন হবার কথা ছিল সে বিষয়ে কেনই বা বিন্দু মাত্র কিছুই লেখা হলো না? এভাবে গোঁজামিল দিয়ে লেখার কারণটাই বা কি? বা  আরও বলা যায়, যদি মহাবিশ্ব একটি বিস্ফোরণ দিয়ে শুরু হয় তবে কেউ দাবি করতেই পারেন যে ঈশ্বর বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন, যদিও ধর্ম গ্রন্থে এসব কোথাও লেখা নেই। যদি ডাইনোসরের জীবাশ্ম পাওয়া যায় তাহলে ঈশ্বর আমাদের বিশ্বাস পরীক্ষা করার জন্য সেগুলো সেখানে রেখেছেন বলে অনেকেই দাবি করতেই পারেন তবে ধর্ম গ্রন্থে এসব কোথায় লেখা নেই বা থাকে না, কারণ যিনি ধর্ম গ্রন্থগুলোকে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে এনেছেন তিনি হয়তো গ্রন্থের কিছু পাতা ভুল করে ঈশ্বরের টেবিলে ফেলে এসেছেন। এসব প্রশ্ন মনের মাঝে উদয় হলে কি নরকের আগুনে পুড়তে হবে? যদি পৃথিবী কোটি কোটি বছর পুরানো হয়, তাহলে জেনেসিসের গল্পে একটি দিন শত কোটি বছরের সমান। এগুলি বাইবেলের প্রকৃত ব্যাখ্যা যা বিজ্ঞান দ্বারা জোরপূর্বক অস্তিত্বের জন্য বাধ্য করা হয়েছে। সক্রেটিস যেমন অনুমান করেছিলেন, এটি অনুসন্ধানী মনের শূন্যতা যা আমাদের সত্যের দিকে চালিত করে। এবং, এমনকি যদি একটি ধর্ম নিরঙ্কুশ সত্যের উপর আঘাত করে, তবে এই সত্যটি জানে এমন গোঁড়া ধারণা সর্বদা একই দাবি করা অন্যান্য ধর্মের সাথে বিরোধ সৃষ্টি করবে। এই কারণেই ধর্ম সংঘর্ষের জন্ম দেয় এবং কেন যে কোনো ধরনের বিশ্বাসের ক্ষতি হয়।

২|
প্রাতিষ্ঠানিক ঈশ্বর কি গণিতের উত্তর পরিবর্তন করতে পারেন ? না, পারেন না। প্রকৃতির সব চিরন্তন সত্য গণিতের নিয়ম অনুসারেই ঘটছে। আমরা তাপ এবং আলো পাই কারণ হাইড্রোজেন পরমাণুগুলি সূর্যের কেন্দ্রে উচ্চ মাধ্যাকর্ষণ চাপের অধীনে হিলিয়াম পরমাণুতে ফিউজ করে, শক্তিশালী ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ তৈরি করে যা পুরো সৌরজগতে ছড়িয়ে পড়ে।  তারা হল চলমান বিদ্যুতের ভাণ্ডার।  আমাদের সূর্য-আকারের নক্ষত্রগুলির একটি আলোক-দানকারী জীবনকাল সাধারণত ১ বিলিয়ন বছর থাকে, যার অর্থ হল যে যতক্ষণ পারমাণবিক ফিউশন চলতে থাকে ততক্ষণ আলো এবং তাপ বিকিরণ চলতে থাকে।  মহাকর্ষ বল (Mass) বস্তুর ভর দ্বারা নির্ধারিত হয়।  ভর যত বেশি, মহাকর্ষ বল তত বেশি। পদার্থ নিজেই গ্রাভিটন (Graviton) নামক একটি কণা নির্গত করে যা মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তৈরি করে।  কোন ঈশ্বর ১কেজি  ভরের বস্তুর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে ২কেজি ভরের বস্তুর চেয়ে বেশি করতে পারেন না।  এটাই গণিতের সত্য। বৃহস্পতি গ্রহ পৃথিবীর তুলনায় ১১গুণ প্রশস্ত এবং তিনশো গুণ বেশি বড় এবং এর মাধ্যাকর্ষণ ১০ গুণ বেশি।  সমান উচ্চতা থেকে পতিত একটা নুড়ি ১কেজি বলে (ত্বরণ ৯.৮১কেজি. মিটার / সেকেন্ড বর্গ) পৃথিবীতে আঘাত করলে তা ১০কেজি (ত্বরণ ১০×৯.৮১কেজি. মিটার/সেকেন্ড বর্গ) শক্তি নিয়ে বৃহস্পতি গ্রহে আঘাত করবে।  সবচেয়ে বড় মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ব্ল্যাক হোলে ঘটে, যা পাশ দিয়ে যাওয়া আলোকে আকর্ষণ ও শোষণ করতে পারে।

আমাদের তারকামণ্ডল কেন্দ্রে একটি বিশাল Supermassive Black hole রয়েছে ৪ মিলিয়ন সূর্যের ভর যাকে বিজ্ঞানীরা Sagittarius A নাম দিয়েছেন। সৌরজগৎ সহ তারকামণ্ডল সমস্ত পদার্থ এটিকে ঘিরে ঘোরে।  এই ঘটনাগুলিও গণিত দ্বারা নির্ধারিত হয়।  মহাকর্ষের কারণে গ্যালাক্সির মধ্যে সংঘর্ষও হয়।  যখন তারার কেন্দ্রে হাইড্রোজেন ফিউজ হয়, হিলিয়াম পরমাণুগুলি কার্বন পরমাণুতে ফিউজ হয় এবং তারপরে কার্বন পরমাণুগুলি লোহার পরমাণুতে ফিউজ হয়।  এইভাবে, একটি নক্ষত্রের কেন্দ্রে ভারী পরমাণু জমা হওয়ার ফলে একটি শক্তিশালী মহাকর্ষীয় বল তৈরি হয় যা সূর্যের চেয়ে ৮/৯ গুণ বড় একটি নক্ষত্রকে একবারে বিস্ফোরিত করতে পারে এবং তীব্র ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ এবং খুব শক্তিশালী Gamma ray, X- ray সহ পদার্থ সৃষ্টি করতে পারে এবং Nebulae মেঘ তৈরি হয়। এই বিস্ফোরণকে Supernova বলা হয়। 

Nebulae মেঘগুলিও ছোট তারা গঠন করতে পারে। এইভাবে তারার Supernova  র জন্য গ্রহ, উপগ্রহ, ধূমকেতু, গ্রহাণু এবং উল্কা ইত্যাদি উৎপত্তি হয়। সেইজন্য গ্ৰহ, উপগ্ৰহ, ধুমকেতু, Asteroid, উল্কা আদি উৎপত্তি হয় । অৰ্থাৎ আমরা সকলই মৃততারার অংশ। তাই আমাদের ব্ৰহ্মাণ্ডের সকল শক্তিই মাধ্যকৰ্ষণ বল এবং পরমাণুতে থাকা বিদ্যুৎ চুম্বকত্বের থেকে  বিভিন্ন শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়া কোনো ঈশ্বর, আল্লাহ বা গডের সৃষ্টি কৰা নয় । শক্তি রূপান্তরের এই প্ৰক্ৰিয়া কোনো কাল্পনিক ঈশ্বর, আল্লাহ, এমনকি গড এটি পরিবর্তন করতে পারে না। সবকিছুই গণিতীয় (Mathematical) সম্বন্ধমতে চলে। আমাদের পৃথিবীত সৃষ্টি হওয়া বাতাস, ঝড়, ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির উদ্গীরণ, সাগরীয় স্রোতের মাধ্যকৰ্ষণ বল , তাপের প্ৰভাবে হয় । এগুলো প্রত্যেকটা একে অপরের সঙ্গে গাণিতিক মেলবন্ধনে যুক্ত। এই গণিত কোনো কাল্পনিক ঈশ্বর আল্লাহ বা গড এটা পরিবর্তন করতে পারবেন না।

৩|
অধিকাংশ ধর্মগ্রন্থ মতে, জীবের আত্মা থাকে বুকে। কিন্তু বিজ্ঞান মতে একটা জীব চালিত হয় মগজ দ্বারা। এক কথায় সকল জীবের দেহে কম বেশি বিদ্যুৎ থাকে। এরমধ্যে সবথেকে বেশি থাকে ইলেক্ট্রিক ফিসের (Electric Fish)। একটি পূর্ণবয়স্ক বৈদ্যুতিক ইল মাত্র ২ মিলি সেকেন্ড ৬০০ ভোল্ট  বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, যা আমাদের বাসা বাড়িতে সংযুক্ত বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় প্রাপ্ত ভোল্টের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। জানা যায় ৬০০ থেকে ৮৬০ ভোল্ট পর্যন্ত বিদ্যুত উৎপাদন করতে  ৬  ফুট লম্বা  ইল ৬০০০ পেশী কোষকে ব্যবহার করে। আমাদের মগজ এবং কলিজার পাম্পটা বৈদ্যুতিক পালস (Pulse) র সহায়ত কাজ করে। জীবের মগজ Electric circuit একটা কম্পিউটার থেকেও বহু গুণ জটিল। মগজ দেহের বিভিন্ন অংশে নিৰ্দেশনা বৈদ্যুতিক পালসের দ্বারাই দিয়ে থাকে। তাই একটা জীব চালিত হয় তার মগজ দ্বারাই। আমাদের কলিজার পাম্পের কাৰ্যক্ষমতা যদি হ্ৰাস পায়, চিকিৎসক বেটারিযুক্ত Space maker  লাগিয়ে দেন। সেইজন্য আত্মা বলে যে বস্তু সেটা বুকের মধ্যে থাকে না । জীবের আত্মা যদি বলতেই হয় তবে মগজকে ধরে নিতে হবে। ডলফিন মাছ আমাদের চিকিৎসা বিভাগে ব্যবহৃত Ultra sonography থেকে শক্তিশালী Sonography waves ব্যবহার করে গর্তের ভেতর লুকিয়ে থাকা শিকার খুঁজে ধরে খেয়ে থাকে।

বিজ্ঞানে কোনো সৰ্বজ্ঞ নেই। অৰ্থাৎ বিজ্ঞানে কোনো গুরু, মাসিহা বা নবী-রসূল নেই। কোন একজন যদি সূত্ৰ আবিষ্কার করে যাওয়া জ্ঞান নিয়ে আরও একধাপ অগ্রসর হোন, এইভাবে বিভিন্ন জনে বিভিন্ন বিষয়ে আবিষ্কার করা  ব্ৰহ্মাণ্ডের চিরসত্য কথাগুলো রিসার্চ করে করে বিজ্ঞান চৰ্চা আজকের এই অবস্থায় আসতে পেরেছে। বিজ্ঞানে কোনো হিন্দু বিজ্ঞান,মুছলমান বিজ্ঞান বলে শ্ৰেণীবিভাজন থাকে না কারণ ইহা  চিরসত্য কথা। একটা গণিতের শুদ্ধ উত্তর এটাই আসবে কিন্তু সেই গণিতের অশুদ্ধ উত্তর যেকোনো অৰ্থাৎ লাখো হাজার সংখ্যা দেয়া যাবে। 

ধৰ্ম এবং বিজ্ঞানের এখানেই পাৰ্থক্য। প্ৰত্যেক ধৰ্মেই নিজের ধর্মকেই শ্ৰেষ্ঠ বলে দাবি করেন সকল ধৰ্মগুরুরা। ধৰ্মগুরুকে  যদি আপনি প্ৰশ্ন করেন কেন এভাবে হবে, তখনই গুরু রেগে অগ্নিশর্মা। কারণ ধৰ্মে গুরুর বাণীই হল চিরন্তন সত্য কথা।কিন্তু বিজ্ঞানে সব কিছু নিজে পরীক্ষা করে সত্য নিরূপণ হওয়া কথাগুলোই গ্ৰহণ করে । বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ডিগ্ৰীধারী একজন লোক অবৈজ্ঞানিক চিন্তা ধারার হতে পারে অন্যদিকে যে ব্যক্তি কোনদিন স্কুলে যায় না সেও বৈজ্ঞানিক মানসিকতার একজন ব্যক্তি হতে পারে। উল্লেখ্য যে মানুষ ছাড়া মহাবিশ্বের প্রায় সব প্রাণীই বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা নিয়ে বাস করে তারা তাদের ইন্দ্রিয় দিয়ে যে কোনো পরিবেশ বা বস্তু অধ্যয়ন করে এবং পদক্ষেপ নেয়।

সমাজ সংস্কারক কাজ করতে হলে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই নিজের মত প্রকাশ করতে হবে, কেউ মানুক বা না মানুক। আমার মত মূলত নারীর সমানাধিকারের পক্ষে, মানবতার পক্ষে, যুক্তিবাদ এবং বিজ্ঞান মনস্কতার পক্ষে। পৃথিবীকে আমাদের সন্ত্রাসমুক্ত এবং বাসযোগ্য করা ছাড়া উপায় নেই। সবার মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা এবং সবার জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া উপায় নেই। জীবনের শেষ শ্বাসটুকু পর্যন্ত অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্ধকারে ডুবে মরতে দেখা কি আর সহ্য করা যায় !! পৃথিবীতে যত সরকার আছেন, সবারই ধর্ম নিয়ে রাজনীতি ত্যাগ করতে হবে। বিজ্ঞানমনস্কতার প্রচার ও প্রসার হওয়া ছাড়া উপায় নেই। ধর্মান্ধতা মানুষকে কখনো বাঁচাতে পারে না, 'বাঁচায় বিজ্ঞান, বাঁচায় যুক্তিবুদ্ধি'।

Tuesday, January 17, 2023

মুসলিম নারীর আর্থ-সামাজিক অবস্থান


(১)

"আমি শাহবানু মুসলিম মেয়ে, তবু ইসলাম আমাকে দেখে না ! আমার জন্য হাদিস কেউ না, শরিয়ত তুমি এত নিষ্ঠুর"

পুরুষতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয় পরিবারতন্ত্রে - আর নারীকে শৃঙ্খলিত রাখার মধ্যে তার বিস্তার। নারী জন্মসূত্রে অবলা, পুরুষের পর জন্মেছিল নারী। উত্তরাধিকার উৎপাদনে নারী গণ্ডিবদ্ধ গৃহজীবনে হয়ে ওঠে পরিচারিকা।সমান অধিকার যে নারীর স্বাভাবিকভাবেই প্রাপ্য এবং কোনোভাবেই তা পুরুষের দেওয়ার জিনিস নয়, এই সারসত্যটা আমাদের সমাজ এখনও বুঝে উঠতে পারেনি। উপরন্তু নারীকে বোঝানো হয়েছে পুরুষের আজ্ঞাবাহী হওয়াটা তাদের অবশ্যকর্তব্য। ঘরের কাজ-বাইরের কাজ, এই শ্রেণিবিভাগটাও একান্তভাবেই পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার ফসল। তবে এই প্রপোগেণ্ডা এখন মিথে পরিণত।পিতৃতান্ত্রিক সমাজ মনে করে যে, তারা নারীকে সমান অধিকার দিয়ে থাকে। এবং একই সাথে কয়েক হাজার বছর ধরে মেয়েদের মাথায় ঢোকানো হয়েছে যে, তারা আদতে ‘ইনফিরিয়র ক্লাস’ এবং পুরুষের আজ্ঞাবাহী হওয়াটা তাদের অবশ্যকর্তব্য। ধর্ম থেকে সামাজিক জীবন, যাবতীয় শেকল মেয়েদের জন্যই সৃষ্টি। ঘরের কাজ-বাইরের কাজ, এই শ্রেণিবিভাগটাও একান্তভাবেই পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার ফসল।

ভারতবর্ষের সামাজিক, জাতীয়তাবাদী ও রাজনৈতিক আন্দোলন এসে মিশেছিল নারী প্রগতি আন্দোলনের মোহনায়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতবর্ষে মহিলাদের অবস্থার খুব একটা হেরফের হয় না। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এই বঞ্চনা মিটিয়ে কীভাবে মেয়েদের সমান অধিকার দিয়ে তাদের ক্ষমতায়ন করা যেতে পারে তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা ইতিমধ্যেই হয়েছে। কিন্তু পুরুষতন্ত্রের ডামাডোলে প্রতি এগারো মিনিটে একজন মহিলা খুন হচ্ছেন নিজের ইন্টিমেট পার্টনার অর্থাৎ স্বামী, বাবা, ভাই দ্বারা। হচ্ছে কন্যা ভ্রূণ হত্যাও। ভারতবর্ষে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ অবস্থান দলিত আর সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলিম মহিলারা।

মুসলিম সমাজে নারীর অবস্থার অবনতি হয়েছে চতুর্দশ শতাব্দীতে ফিরোজ তুঘলক (১৩৫১) থেকে সিকান্দার লোদীর · (১৪৮৯-১৫৭৭) সময়কালে। কারণ নারীদের ধর্মীয় পবিত্র স্থানে যাওয়ার স্বাধীনতাও ছিল না, এমনকি বোরখা ছাড়া মেয়েদের চলাফেরা সর্বাবস্থায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। একদা ‘অবাঙালি মুসলমানদের পোশাক’ বলে চিহ্নিত যে আচ্ছাদন আপামর বাঙালি মুসলিম মেয়েদের কাছে ব্রাত্য ছিল – সেই হিজাব, বোরখার ‘বাঙালি’ দোকান এখন গজিয়ে উঠেছে। কারণ হিসাবে মূলত দুটো মত উঠে আসে – প্রথমত ধর্মীয় ভক্তিরসের প্রাধান্য এবং দ্বিতীয়ত পশ্চিমা ফ্যাশনের সাথে পশ্চিম-বিরোধী ইসলামিক সংস্কৃতির প্রতিযোগিতা। মূলত পাশ্চাত্যে উদ্ভূত ব্যক্তিস্বাধীনতাকামী ও নারীবাদী স্লোগান ‘মাই বডি-মাই চয়েস’ -কে বুমেরাঙের মত ব্যবহার করছে এই পর্দাসীন মেয়েরা।

নিজস্ব ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থানে পিছিয়ে থাকার জন্য মুসলিম কম্যুনিটিতে মেয়েদের অবস্থার প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি এখনও। মুসলমান মেয়েদের পিছিয়ে থাকার কারণ খুঁজতে গেলে ভিতরে ও বাইরে - অর্থাৎ তাদের পরিবারের ভিতরে ও সমাজে – দু জায়গাতেই দৃষ্টি দিতে হবে। মুসলমানদের বেশিরভাগই গ্রামে বসবাস করায়, অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মতোই মুসলমান মহিলারা সকল রকম সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। চাষবাস বা অন্যান্য শারীরিক শ্রমনির্ভর জীবিকা, সাক্ষরতার নীচু হার ও দুর্বল স্বাস্থ্য পরিসেবার কারণে মুসলমানদের মধ্যে নানা বিষয়ে অক্ষমতা দেখা দেয় ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হয়। নিজ সম্প্রদায়ের ভিতর থেকেই এক শ্রেণীর মানুষ মুসলমান মেয়েদের শিক্ষা, অধিকার ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করে। বাড়ির মেয়েরা পড়াশুনা বা কাজের জন্য বাইরে যাবে কেন- এ নিয়ে পরিবারের মধ্যে অশান্তি লেগেই থাকে। এই কারণেই বহু মুসলিম কিশোরীর অসম্ভব প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায়। অনেক সময় মুসলমান পরিবার গুলোতে অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। ফলে শিশুরাই শিশুর মা হয়ে যাচ্ছে। শারীরিক গঠন পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগেই সন্তান জন্ম দেওয়ার কারণে মা ও শিশু কারোরই পুষ্টি ঠিকঠাক হয় না এবং তারা স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যায় ভোগে। জাস্টিস রাজিন্দার সাচারের নেতৃত্বাধীন কমিটি ২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে যে রিপোর্ট প্রকাশ করে তাতে কিছু নগ্ন সত্য বেরিয়ে আসে। ৬-১৪ বছর বয়সী বাচ্চাদের গ্রুপে ২৫% মুসলিম শিশু স্কুল থেকে ড্রপ আউট হয়। মাত্র ১৭% মাধ্যমিক পাশ করে। সরকারি স্কুল রিপোর্টকার্ড (২০১৪-১৫) অনুযায়ী, গড়পড়তা ৫০% মুসলিম মহিলা স্কুলে গিয়ে থাকে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এই রিপোর্ট থেকে পাওয়া যায় -- ক্লাস ওয়ান থেকে টুয়েলভের মধ্যে প্রায় ৪০% মুসলিম মেয়ে স্কুল থেকে ড্রপ আউট হয়। এবং এই ড্রপ আউট সবচেয়ে বেশি হয় মাধ্যমিকের পর। অর্থাৎ, মাধ্যমিক পাশ করার পর অধিকাংশ মুসলিম মেয়ে আর পড়ার সুযোগ পায় না।

২০১১-‌এর সেন্সাস অনুযায়ী, আমাদের দেশে ১৪.২৩% মানুষ ইসলাম ধর্মের। এর আগে সাচার কমিটি রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতীয় মুসলিমদের ৩১% পভার্টি লাইনের নিচে বাস করে। মোট মুসলিম কম্যুনিটির ৪৮% হল মহিলা আর সেন্সাস ২০১১-‌তে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে যে, ভারতীয় মুসলিম মহিলাদের ৪৮.১১% নিরক্ষর। অর্থাৎ প্রায় চার কোটির বেশি ভারতীয় মুসলিম মহিলা নিজের নামটাও লিখতে পারেন না। কিন্তু এই মুহূর্তে ভারতীয় মুসলিম মহিলাদের শিক্ষাক্ষেত্রে অবস্থান মোটেই উল্লেখ্য নয়।

২০০৪-০৫ সালে সাচার কমিটি রিপোর্ট মতে, মোট জনসংখ্যার ৪.৪% মুসলিম যুবক গ্রাজুয়েশন পড়তে যায়। ২০০৯-১০ সালের স্যাম্পল সার্ভেতে সংখ্যাটা একটু বেড়ে হয় ১১%। ২০১৩-১৪-‌তে উচ্চশিক্ষায় মুসলিম যুবক-যুবতীদের অংশগ্রহণ বেড়ে হয় ১৮% এবং ২০১৮-‌তে তা ৩৭%-‌এ দাঁড়িয়েছে। এটা খুব স্বাভাবিক একজন অশিক্ষিত এবং আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে দুর্বল মানুষ নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবেন না। ইউনেস্কো EMPOWERMENT-‌এর সংজ্ঞা দিচ্ছে, “… the expansion of assets and capabilities of poor people to participate in, negotiate with, influence, control, and hold accountable institutions that affect their lives.”। অর্থাৎ, জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একজন মানুষের ক্ষমতাহীন থেকে ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠার পদ্ধতিটাকেই আমরা এমপাওয়ারমেন্ট বলছি। মহিলাদের ক্ষেত্রে আর্থ-সামাজিক ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্য হল এমন একটি আদর্শ সমাজ সৃষ্টি করা যেখানে মহিলারা সবরকম অত্যাচার আর বঞ্চনার হাত থেকে বেরিয়ে স্বাধীনভাবে নিজের মত বাঁচতে পারবেন।

আমাদের দেশে যেখানে মেয়েদের পায়ে শেকল বেঁধে রাখাটাই দস্তুর সেখানে উইমেন এমপাওয়ারমেন্টের মত স্বাধীন ধারণা প্রতিষ্ঠিত করাটা অবশ্যই খুব শক্ত কাজ।আর্টিকেল ১৫-‌তে বলা হয়েছে যে, সরকার লিঙ্গের ভিত্তিতে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য করতে পারবে না। আর্টিকেল ১৫ (A) আর (E)-‌তে মহিলাদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণকে শাস্তির আওতায় ফেলা হয়েছে। ২০০১ সালে National Policy for The Empowerment of Women বিলটি পাশ করানো হয়।
ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভের ২০০০ সালের রিপোর্টে শহর এলাকায় ৬.০৩% আর গ্রামে মাত্র ১.২২% গ্রাজুয়েট মুসলিম মহিলা পাওয়া গিয়েছিল। তবে গত দেড় দশকে এই অবস্থার খানিক হলেও পরিবর্তন ঘটেছে। All India Survey on Higher Education (২০১৭-১৮)-‌এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গত পাঁচ বছর উচ্চশিক্ষায় মুসলিম মহিলাদের এনরোলমেন্ট বেড়েছে ৪৬%, যা অত্যন্ত ইতিবাচক।

(২)

সার্বিকভাবে মুসলিম নারীর লেখাপড়ার সুযোগ বেড়ে গেলেও শরীয়ত, পর্দা ও ধর্মীয় কুসংস্কারে মুসলিম নারী এখনও পুরুষতন্ত্রের গেঁড়াকলে। সেই জায়গা থেকে বেগম রোকেয়ার কর্মযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল সত্য। পিছিয়ে থাকা নারী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি তার বলিষ্ঠ হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তমসাবৃত অবস্থা থেকে আলোর অভিমুখী করেছিলেন নারীকে। তাই প্রগতি চেতনার দিশারী, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া প্রথমেই বিদ্রোহ করেন পুরুষ নয়, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। আর তাঁর লেখনী পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ‘ধারাবাহিক ধর্মযুদ্ধ’। মুসলিম সমাজে নারী জাগরণে, সমস্ত প্রগতিশীল ভাবনার এক সংহত রূপ সংগ্রামী নারী বেগম রোকেয়ার জীবন ও কর্মধারায় প্রকাশ পেয়েছে।

'ইসলামে নারী হল মূর্তিমতী কাম। যে নারী একদিন তাকে করেছিল স্বর্গভ্রষ্ট, লিপ্ত করেছিল পাপ কাজে, তাই তাকে অর্থ্যাৎ নারীকে ইসলাম ক্ষমা করেনি কোনদিন। কোরানের চতুর্থ সুরা- ‘সুরা নিসা’। ‘নিসা’ শব্দের অর্থ নারী। সুরার নামকরণ থেকে বোঝা যায় এখানে নারীর বিধি-বিধান-নির্দেশ উপদেশ তুলে ধরা হয়েছে। এখানে নারীর সম্পত্তির অধিকারের কথা বলা হয়েছে। যদিও তা যৎসামান্য। এই সুরা যদিও নারীর জন্য রচিত তবুও কিন্তু এখানেও কোরানের স্রষ্টা পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষিত হয়েছে--- “পুরুষ নারীর রক্ষা কর্তা। কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের ওপর বিশিষ্টতা দান করেছেন, আর এজন্য যে, পুরুষরা তাদের ধনসম্পদ থেকে ব্যয় করে।”(সুরা নিসা, ৪/৩৪)
আবার বলা হয়েছে -- “নারীদের পরিচালক হচ্ছে পুরুষরাই। কারণ, আল্লাহ তাদের মধ্যে অন্যের উপরে মর্যাদা দান করেছেন। (সুরা নিসা, ৬/৩৪) 
ইসলাম ধর্ম পুরুষকে করেছে বহুভোগ্যা। সুরা নিসার প্রথমে আল্লাহ বলে দিলেন -- “তবে বিয়ে করবে (স্বাধীন) নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভালো লাগে, দুই, তিন বা চার জনকে। আর যদি আশঙ্কা কর যে সুবিচার করতে পারবে না তবে একজনকে বা তোমাদের অধিকার ভুক্ত দাসীকে। এভাবেই তোমাদের পক্ষপাতিত্ব না করার সম্ভবনা বেশি।” (সুরা নিসা, ৪/৩) এমনকি নারী অবাধ্য হলে তাকে প্রহার করার কথাও কোরানে বলা হয়েছে -- “স্ত্রীদের মধ্যে যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদেরকে ভাল করে উপদেশ দাও, তারপর তাদের বিছানায় যেওনা ও তাদেরকে প্রহার করো। যদি তারা তোমাদের অনুগত হয় তবে তাদের বিরুদ্ধে কোন পথ খুঁজবে না।” (সুরা নিসা ৪/৩)

যদিও আবার অনেকে মনে করেন -- “ইসলামই প্রথম ঘোষণা করল, পুরুষের ন্যায় নারী জাতিরও আছে স্বাধীনতার অধিকার, মুক্তির অধিকার। শিশু কন্যার আছে বাঁচার অধিকার। বিধবার আছে বিবাহ করার পূর্ণ অধিকার। কুমারীর আছে স্বামী পছন্দের সম অধিকার। পুরুষের ন্যায় মহিলারও আছে বিবাহবিচ্ছেদে সমান দাবী৷ আইনের সম অধিকার। পাপ ও পুণ্যের সম অধিকার। আরধনা ইবাদতে সম অধিকার। শিক্ষাতে সম অধিকার। নারী মনুষ্য সমাজের অর্ধেক, তার দাবিও অর্ধেক। এই পৃথিবীতে পুরুষের প্রয়োজন যতটা, নারীর দরকারও ততটাই। একটি পরিবারের এক পা, এক হাত, এক চোখ, এক কান যুবকের, দ্বিতীয় গুলোর মালিক যুবতী৷ ইসলাম ঘোষণা করল, এই পৃথিবীতের সমস্ত কিছুতেই নারীর প্রকৃতিগত, প্রবৃত্তিগত, স্বভাবগত, এবং যা কিছুই তার সহজাত, সর্বস্থানেই পুরুষের সঙ্গে তার সম অধিকার আছে। সমগ্র মানবমন্ডলীর অর্ধাংশকে প্রথম মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিল কে, ইসলাম।পুরুষের পুংলিঙ্গের নিকট নারীর স্ত্রী লিঙ্গ তো কোনদিনই লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। কেবল প্রয়োজন-অপ্রয়োজন যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ইসলামই তাকে সম-স্থান, সমসম্মান দিল।"

আরব্য রজনীর অংসখ্য উপাখ্যানে দেখা যায় পুরুষ এক নারী থেকে অন্য নারীতে ছুটেছে, এক নারীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকেনি- যাকে ইসলাম আদর্শরূপে গ্রহণ করেছে। তাই ইসলামের কাছে বিয়ে একটা অসম চুক্তি, একটা প্রহসন ছাড়া অন্য কিছু নয়। এর জন্য একজন মুসলমান পুরুষ চারজন বৈধ স্ত্রী রাখার পরও যৌন সম্ভোগের জন্য যত খুশী দাসীকে সম্ভোগ করতে পারে, তাতে ইসলামী আইনে বা নৈতিকতায় কোন বাধা নেই। দাসী সম্ভোগ ইসলামে বৈধ। বিয়ে সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন -- ‘‘ইসলামি আইনে বিয়ের চুক্তি মালিক-শ্রমিকের চুক্তির থেকেও ভয়াবহ ও শোষণমূলক, কেননা ওখানে চুক্তি করে’ই একজনকে দেয়া হয় অশেষ অধিকার এবং আরেকজনের প্রায় সমস্ত অধিকার বাতিল হয় কিছু সুযোগ সুবিধার বিনিময়ে। ইসলামি আইনে স্ত্রী হচ্ছে চুক্তিবদ্ধ দাসী, যে স্বামীকে দেবে যৌনতৃপ্তি ও বৈধ সন্তান। কিন্তু স্বামী যখন ইচ্ছে মনের খেয়ালে শুধু তিনবার ‘তালাক’ বলে ছেড়ে দিতে পারবে তাকে। চুক্তির কথা বলা হলেও ইসলামি বিয়েতে পুরুষ ও নারীটি চুক্তিতে আসে না, চুক্তিতে আসে পুরুষ ও নারীর অভিভাবক।”
আবার তিনি বলেছেন --- ইসলামে বিয়ে যেহেতু চুক্তি, তাই তা চিরস্থায়ী নয়, যে-কোনো সময় স্বামী তা বাতিল করতে পারে। তালাক মুসলমান নারীর জীবনে সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দ, ওই বজ্ৰ যে- কোনো সময় নীলাকাশ থেকে তার মাথায় এসে ফাটতে পারে। মুসলমান পুরুষ চারটি বৈধ বিয়ে করতে পারে, পঞ্চম একটিও করতে পারে। পঞ্চম বিয়ে করলে বিয়েটি বাতিল হয় না, শুধু দরকার পড়ে আগের একটি স্ত্রীকে এক-দুই-তিন করে তালাক দেয়া। মুসলমান পুরুষের জন্যে তার চারটি স্ত্রী সম্ভোগই শুধু বৈধ নয়, সে তার ক্রীতদাসীদের সাথেও সঙ্গম করতে অধিকারী।’

(৩)

'নারী হয়ে কেউ জন্মায় না, কেউ কেউ নারী হয়ে ওঠে'। অর্থাৎ জৈবিকভাবে একটা শিশু স্ত্রী অঙ্গ নিয়ে জন্মায় এটুকুই প্রাকৃতিক সত্য। একটা শিশু কি জানে জন্মলগ্ন থেকে সে নারী না পুরুষ। পদে পদে তাকে হিজাব পরিয়ে, পুতুল খেলিয়ে, রান্নাবাটি ধরিয়ে দিয়ে, মেকআপ দিয়ে, খোলা আকাশ থেকে সরিয়ে ঘরে বন্ধ করে, সামাজিকভাবে তাকে মেয়েলি করে তোলা হয়। “ধর্ম মেয়েদের চিরকালের শত্রু। ধর্ম মেয়েদের শেকল পরায়। আমি কথামানবী স্বহস্তে ঈশ্বরের পূজা করতে গেলাম, ধর্ম বলল, পূজা পুরুষের অধিকার, ব্রাহ্মণ পুরুষের। আমি প্রতিবাদ করলাম, ধর্মের কবি তুলসীদাস বললেন, ‘ঢোল গাঁওয়ার শূদ্র পশু নারী ইয়ে সব হ্যায় তাড়নকে অধিকারী’ পুরুষ তালাক দিলে আমি খোরপোশ চাইলাম, ধর্ম বলল আল্লা নারীর খোরপোশের বিধান দেয়নি, আপনারা বলুন, কথামানবী কী করবে? কী করবে শাহবানু?” মিরান্ডা ডেভিজ তাঁর 'Thirdworld Women : Second Sex' বইয়ে যথার্থই লিখেছেন, “As they begin to recognise and identify the specific nature of their double oppression many women in the third world realise that when needed they may join the guerrila movement, participate in the economy, enter politics and organise trade unions, but at the end of the day they are still seen as women, second class citizens, inferior to men, bearers of children and domestic servants.”

 কাজি নজরুল লিখেছেন, ‘আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই’। মুসলিম সম্প্রদায়ের মেয়েদের অনেক সমস্যার মধ্যে একটা বড় সমস্যা হল সম্পত্তির সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া। শরিয়তে বলা আছে ছেলে আর মেয়ে কখনই সম্পত্তির সমান অধিকার পাবে না। ছেলেদের থেকে মেয়েরা কম পাবে। আর আজকের এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়েও এই নিয়ম মানা হচ্ছে। 'আমি আমার দাদা, ভাইয়ের মত পড়াশোনা শিখেছি, কষ্ট করে বাইরে গিয়ে পড়েছি, হয়তো চাকরির তাগিদে আর পাঁচটা ছেলের মতোই বাইরে গিয়ে কষ্ট করে টিকে থাকার জন্য লড়াই করবো। অন্য ছেলেদের মতো সংসারের হাল ধরবো, আমার মা বাবাও হয়তো গর্ব করে অথবা চোখের জল (খুশির) ফেলে বলবে আমার মেয়ে, ছেলের থেকে একটুও কম না। পাড়া প্রতিবেশী সবাই বলবে ছেলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে ওই মেয়ে। ও কম কি! কিন্তু সম্পত্তি ভাগের সময় তখন যে প্রমাণ করে ছাড়ে, হ্যাঁ মেয়ে তুমি কম। কম বলেই আমার সমান অধিকার নেই আমার নিজের বাড়িতে, নিজের সম্পত্তিতে। আমার মা বাবা যতই বলুন আমরা ছেলে মেয়ের ভেদাভেদ করি না কিন্তু ছেলে-মেয়ের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করতে গিয়ে সেই শরিয়তের প্রসঙ্গ তুলবে' (শাম্মী বিশ্বাস)। আজ মানুষের মানবিকতা কোথায় হারিয়েছে! হাদিসের অজুহাত দেখিয়ে যে নিয়ম চালু রেখেছে,শুধুমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের প্রতি বঞ্চনা কি চলতে দেওয়া যায়?
নজরুল দুঃখ করে বলেছিলেন:‌
‘‌বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে
আমরা তখন বসে,
বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি
ফেকাহ হাদিস চষে।’‌

ইসলামের সর্বশক্তিমান আল্লাহ পিতৃতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা। ইসলামের জন্মলগ্নে নারীর যে স্বাধীনতা ছিল- তা কিন্তু পরবর্তীকালে আর থাকেনি। ইসলামের বিজয়রথ যতই এগিয়েছে পুরুষরা নারীর অধিকারকে করেছে পদানত, করেছে বন্দী আর পরিণত করেছে হারেমে। এর ফলে নারী হয়ে উঠেছে পুরুষের কামনার বস্তু। হয়ে উঠেছে ফিতনা- বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী। যুদ্ধক্ষেত্রে যাবার সময়ে নারীকে তারা বহন করেছে সাথে, কিন্তু তা একান্তভাবে উপভোগের জন্য। পুত্র সন্তান উৎপাদনের জন্য আর দৈহিক তৃষ্ণা নিবারণের জন্য। মুসলিম পুরুষের উত্তরাধিকার আরব পুরুষ যারা সম্ভোগ পরায়ন।

মানব সমাজের জন্মলগ্ন থেকেই নারী পুরুষের চেয়ে হীন অবস্থায় ছিল, ছিল পরাধীন। এ কথা স্বয়ং এঙ্গেলস মার্কসবাদের সূত্র ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন --- "That woman was the slave of man at the commencement of society is one of the most absurd notions that have come down to us from the period of Enlightenment of the 18th Century."যে কোন দেশের, যে কোন ধর্মের নারীর সামাজিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি যে প্রায় সমস্ত চিত্রটাই এক। হয়তো সামান্য কিছু ব্যতিক্রম নজরে আসে। কিন্তু নারীর নারী হওয়া, তাকে মানুষ না ভাবা কিংবা নারীর অধিকার, সামাজিক মূল্যবোধ বা অবস্থান, পুরুষের সঙ্গে সম-অধিকারের প্রশ্ন উঠলেই ধর্মের দোহাই দিয়ে তাদেরকে সমাজের নীচুতলার বাসিন্দা করে রাখা হয়েছে। যে সমাজের কথাই বলি না কেন প্রত্যেক সমাজেই নারীকে হীন চোখে দেখা হয়েছে। নারীকে নারী করেই রাখা হয়েছে, মানুষ হতে দেয়নি। মানুষ তৈরীর আঁতুড় ঘরে যে শিক্ষা, অর্থনীতি- সব কিছু থেকে তাদেরকে করেছে বঞ্চিত। তাই বলতে দ্বিধা নেই এই যে নারী এবং পুরুষের সম্পর্ক তা গড়ে উঠেছে 
স্বাভাবিক প্রেমের তাগিদে নয়, সংসারের তথা সন্তান উৎপাদনের প্রয়োজনের ভিত্তিতে।

তথ্যসূত্রঃ
১) https://www.census2011.co.in/religion.php
২) https://en.m.wikipedia.org/wiki/Sachar_Committee
৩) https://sksew.com/welcome/singlepost/muslim-women-education-patriarchy-india
৪) তদেব, মেধাজন্ম, কথামানবী, তদেব, পৃষ্ঠা-১০২
৫) তদেব, পৃষ্ঠা ১০৪-১০৫
৬) ভারতীয় সমাজে নারীর অবস্থান, পৃঃ ৩৩-৩৮
৭) হুমায়ূন আজাদ, নারী, আগামী প্রকাশনী
৮) ফরহাদ মজহার, বোরখা, এবাদতনামা
৯) Miranda Davies, Third World, Second Sex Woman's Struggles and National Liberation 
১০) Friedrich Engels Origin of the Family, Private Property, and the State, March-May, 1884

https://acrobat.adobe.com/link/review?uri=urn:aaid:scds:US:c2afc244-a4c8-3413-a6b5-d98bb43d1569

টিকে থাকার লড়াইয়ে 'ধর্মগুলো সব রূপকথা'


সম্প্রতি একটা বিষয় লক্ষ্য করছি, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারা বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে কোরানের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। কলেজ পড়ুয়া থেকে শুরু করে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার পর্যন্ত রয়েছেন ধর্মগ্রন্থের সাথে বিজ্ঞানের বিশ্লেষণে। সত্যজিৎ রায়ের মহাপুরুষ ছবিটিতে দেখেছিলাম পদার্থ বিজ্ঞানে পিএইচডি করা এক ভদ্রলোক "ত্রিকালজ্ঞ মহাপুরুষ" এর অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করতেন। ওই ভদ্রলোকের বিশ্বাস ত্রিকালজ্ঞ মহাপুরুষ অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সব দেখতে পারেন। 

মহাপুরুষটি দার্শনিক সক্রেটিসের সাথে গ্রিসের এথেন্সে আড্ডা দিয়েছেন তাও আড়াই হাজার বছর আগে। গৌতম বুদ্ধ তাঁর শিষ্য ছিলেন। ব্যাবিলনের বাজার থেকে তাঁর বর্তমানব সেবক (রবিঘোষ) কে পেয়েছেন। ১৯৬৫ সালে নির্মিত ছবিটি রাজশেখর বসু (পশুরাম) এর ছোটগল্প বিরিঞ্চিবাবা অবলম্বনে তৈরী। ছবিটিতে ওই মহাপুরুষের প্রচুর ভক্ত ছিল কলকাতা শহরে। তারা সকলেই শিক্ষিত, বড় একাডেমিক এবং সমাজের উঁচু মাথা কিন্তু যুক্তি বিবেচনার অভাবে ভোগেন। রাজশেখর বসু গল্পটি লিখেছেন শত বছর আগে। আজ শত বছর পর সেই মহাপুরুষেরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের ধর্মগ্রন্থীয় ব্যাখ্যা দিয়ে রীতিমত সাড়া ফেলে দিয়েছেন।

"Science without religion is lame, religion without science is blind." অর্থাৎ "বিজ্ঞান ধর্ম ছাড়া খোঁড়া, ধর্ম বিজ্ঞান ছাড়া অন্ধ।" এই বাক্য বহু বছর অন্ধের মতো ব্যবহার করেছে ধর্মের প্রাসঙ্গিকতা প্রমানের জন্য। এই বাক্যটাকে তারা বিখ্যাত করেছেই তাদের ধর্মকে বিজ্ঞানসম্মত প্রমানের প্রয়োজনে। কালক্রমে এই বাক্য হাতবদল হয়ে সেইটা এখন উপমহাদেশের ধর্মান্ধদের হাতে পড়েছে।

আর্লবার্ট আইনস্টাইন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বক্তৃতা দিতেন। শিক্ষার্থীরা তাকে নানাধরণের প্রশ্নে জর্জরিত করতো। সবচেয়ে যে প্রশ্নগুলো বেশি করা হতো তার একটি হল, ভবিষ্যতে কী আছে? জবাবে নিরাসক্ত ভঙ্গিতে আইনস্টাইন বলতেন, ‘ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি চিন্তা করি না মোটেও। কারণ, এটা এমনিতেও তাড়াতাড়িই আসে।' আইনস্টাইনকে আরও একটি সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করত তা হল, "আপনি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন?" উত্তরে আইনস্টাইন সর্বদা একই উত্তর দিতেন," বাইবেলের ঈশ্বর নয় বরং আমি স্পিনোজার ঈশ্বরকে বিশ্বাস করি।" বারুচ ডি স্পিনোজা ছিলেন একজন ডাচ দার্শনিক। দেকার্তের সাথে সপ্তদশ শতাব্দীতে দর্শনের অন্যতম দুর্দান্ত যুক্তিবাদী হিসাবে বিবেচিত হতেন স্পিনোজা। স্পিনোজার ঈশ্বর বলতেন, প্রার্থনা বন্ধ কর। পৃথিবীর পথে বেরিয়ে এসো। তোমার জীবন উপভোগ কর। আমি চাই তুমি নাচ, গাও, আনন্দ কর, মজা কর। আমি তোমার জন্য যা কিছু সৃষ্টি করেছি তার পুরোটা উপভোগ কর।

আমার এক বন্ধু ফিজিক্সে মাস্টার্স করছে তার অভিমত, পৃথিবী সূর্য্যের চারপাশে ঘুরছে এটা কখনোই বিশ্বাস করা যাবে না। পরীক্ষায় পাশ করার জন্য এসব পড়তে হবে মাত্র। তার কথায় আরও অবাক হই যখন তার এক পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের কথা সে বলে। সোসিওলজিতে পিএইচডি, তিনি বিশ্বাস করেন তার স্ত্রীর উপর জ্বীনের আছর আছে, স্ত্রীকে মনোচিকিৎসকের কাছে না নিয়ে তিনি হুজুরের পানি পড়া, তেল পড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকছেন। 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবুল হোসেন মানব দেহের হার গবেষণা করে আরবি হরফের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর গবেষণার বিষয়বস্ত হলঃ "Development of Co-relation Between Interdisciplinary Science and Religion" (আন্তঃবিভাগীয় বিজ্ঞান এবং ধর্মের মধ্যে সহ-সম্পর্কের বিকাশ)। তাঁর মতে মানুষের কঙ্কালের গঠন কোরান তত্বের উপর ভিত্তি করেই গঠিত। সবচেয়ে অবাক করা ঘটনা উনি তার পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন জাপান থেকে।'

মানুষের মনে ধর্মবোধ কী করে জাগ্রত হল এই বিষয়ে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন এর তিনটি কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। প্রথম কারণ হল ভয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগ-ব্যাধি, হিংস্র পশুদের আক্রমণ ইত্যাদি বিপত্তির কারণে মানুষ অসহায় বোধ করে, ভয় পায়। এর থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য মানুষ বড় পাহাড়, বড় গাছ, সূর্য, চন্দ্র কে ঈশ্বর মেনে সন্তুষ্টি লাভের জন্য বন্দনা শুরু করে। মনে করে এইসব নিয়ন্ত্রণ করছে কোনো এক অদৃশ্য শক্তি। তাকে খুশি করতে পারলে বিপত্তির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। পরবর্তীতে সেই অদৃশ্য শক্তির নাম ঈশ্বর, গড বা আল্লাহ বা জিহোভা। তাকে স্তুতির জন্য তৈরি হয় অর্গানাইজড রিলিজিওন বা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম। দ্বিতীয় কারণ সমাজে ন্যায়নীতির একটা মানদণ্ড তৈরি করার জন্য মানুষের মধ্যে ধর্মবোধ তৈরি হয়।তৃতীয় কারণ, যে বিষয় সম্পর্কে যুক্তি তৈরী করা যায় না সেগুলোকে ঈশ্বরের অলৌকিকত্ব হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়। ফলে এই অলৌকিক শক্তির প্রতি বিশ্বাস না করে উপায় থাকে না। এই অন্ধবিশ্বাসের মূলে একে একে আঘাত করে দার্শনিক বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞান ভয়ের কারণগুলো ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়।

আবার বাংলা বা ইংরেজি সাহিত্য পড়া একজন মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক হওয়ায় ধর্ম-অবিশ্বাসী হতে পারেন। অন্যদিকে পদার্থ বা রসায়ন বিজ্ঞান পড়া একজন মানুষ শুধু বিজ্ঞান-মনস্ক না হওয়ায় ধর্ম-বিশ্বাসী হতে পারেন। এবার চলুন দেখি সাহিত্যে কিভাবে ধর্মীয় প্রচার কাজ করছে। কিছু দিন থেকে সামাজিক মাধ্যমে এসে থাকা ইংরেজি ভাষায় A for Apple, এর বিপরীতে A for Arjuna,. B for Balaram, C for Chanakya, D for Dhruva, E for Eklavya দেখে খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। ভুল বললে ক্ষমা করবেন।

এই কনসেপ্ট যিনি নিয়ে এসেছেন হয়তো ভুলে গেছেন যে A ইংরেজি বর্ণমালার একটা শব্দ এবং A দিয়ে শুধু ইংরেজি শব্দ চর্চাই মূলত পড়ুয়াদের জন্য দরকারি। কারণ আমাদের ছেলেমেয়েরা, ছাত্রছাত্রীদের ইংরেজি ভাষা আয়ত্বের জন্য ইংরেজি শব্দভাণ্ডার জানা একান্ত জরুরি। তাই A for Apple, B for Ball, C for Cat , D for Dog জানা আমাদের শিশুদের জন্য প্রয়োজন। আচ্ছা মনে করেন যদি বাংলায় অজগর, আম, ইঁদুর, ঈগল এর পরিবর্তে অন্য কোন ভাষার শব্দ ব্যবহার করি তবে কি নিজের ভাষা জানার কোন উপায় থাকবে ?

ঈশ্বরকে বাদ দিয়েও যে ধর্ম হতে পারে, যেমন বৌদ্ধ ধর্ম, আবার ধর্মকে বাদ দিয়েও ঈশ্বর হতে পারে। যেমন স্পিনোজার ঈশ্বর। এই ঈশ্বরের বন্দনা হয় না। অনুভব করা যায়। যেমন রবীন্দ্রনাথের নিভৃত প্রাণের দেবতা। বিস্ময়ে ভয় নয়--জাগে প্রাণ। সৃষ্টি হয় আনন্দ। ভালোবাসা। প্রেম। যে ফুলটি ফোটে--মনে হয় ফুলটি আমি। যে শিশুটি টলোমলো পায়ে হাঁটতে হাঁটতে পড়ে যায়, কেঁদে ওঠে, আবার উঠে পড়ে- - হেসে ওঠে, মনে হয় এই শিশুটিও আমি। আর শিশুটির মা বলে উঠছে--আহা বাছা। সেই মাও আমি। ওর বাবা মানুষটিও আমি। আকাশের তারাটিও আমি। আমিই সকল কিছু। আমিই সে। সে-ই আমি।

এই আমি তাহলে হলো প্রাকৃতিক সুশৃঙ্খলা মাত্র। একেই স্পিনোজা বলেছেন ঈশ্বর। আইনস্টাইন এই ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন। এই ঈশ্বর কাউকে উদ্বিগ্ন করে না। ভয় দেখায় না। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে ধর্ম আর ধর্মীয়গ্রন্থের সাথে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা দিয়ে, বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দিচ্ছে প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ-আয়শারা ধর্মের সাথে প্রতিটা বিভাগের রিলেশন। দেশে ধর্ম ও বিজ্ঞানে অদানকারী মানুষে ভরে গেছে কিন্তু সমাজ সংস্কারে আমাদের দরকার সত্যিকারের বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। তাই খুব সংযত ও যুক্তিসংগত ভাবে অটল বিশ্বাসী কুপমূন্ডকগণদের 'সব ধর্মই ক্ষতিকর এবং অসত্য' বোঝাতে হবে।

https://acrobat.adobe.com/link/review?uri=urn:aaid:scds:US:fa1a2edb-501e-31f4-840e-c369c7980167


'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...