Thursday, January 26, 2023

প্রসঙ্গ পুঁজিবাদ : মহামন্দার গহ্বরে অর্থনীতি


আমরা বেশ সগৌরবে স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছরের 'অমৃত মহোৎসব' পালন করেছি ঠিকই কিন্তু আরও কোনঠাসা করে ফেলেছি শ্রমজীবী মানুষের জীবন। যাদের শ্রমের বিনিময়ে জিডিপি বাড়ে, জাতীয় আয় বাড়ে — তাঁরাই দেশপ্রেমের এই হুজুগে আজ অমানিশায়। শ্রমিকের জীবনে তাই স্বাধীনতার স্বাদ মানে একেবারেই অন্যরকম কিছু !!পুঁজিবাদের বাজার অর্থনীতি আজ এমনভাবে গোটা বিশ্বকে হাতের মুঠোয় ভরে মানুষের রক্ত চুঁষে খাবার জন্য তিল তিল করে আমার আপনার বাড়ির ভিতর থেকে রান্না ঘরে ঢুকে পড়েছে। তারসাথে ফ‍্যাসিবাদও নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছে ওতপ্রোতভাবে। কিছু বছর আগেও দুটো হাতের চরিত্র যদিও ছিল ভিন্ন। আজ পুঁজিবাদ ও ফ‍্যাসিবাদের দুটো হাত এক হতে চলেছে।

১৯৯১ সালের ২৬শে ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক শিবির পতনের সাথে সাথে পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদ এবং বিশ্ব পুঁজিপতিরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ঘোষণা করেছিলেন যে মানবজাতির মুক্তি আনবে পুঁজিবাদ। তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া থাকাকালীন পুরো পৃথিবী ছিল দুই মেরুতে। ১৯৯১ সনের পর গোটা বিশ্ব এক কাতারে আসে। অর্থাৎ পুঁজিবাদী অর্থনীতির কেন্দ্রস্থল আমেরিকা, তাঁর নির্দেশে পরিচালিত হয় গোটা বিশ্ব অর্থনীতি। আইএমএফ, ওয়ার্ড বেংক এবং আমেরিকার কোষাগারের যৌত মিলনে ১৯৮৯ সনে অর্থনীতিবিদ উইলিয়ামসনের (John Williamson) নেতৃত্বে ওয়াশিংটন ঐক্যমত (Washington Consensus) নামে বিশ্বায়ন বা মুক্ত অর্থনীতির ধারণা সমগ্র বিশ্বে প্রবর্তন করা হয়েছিল। সেই সময় তদানীন্তন বিত্তমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিং এই তথ্য আমদানি করেন এবং সেইসাথে ভারতেও তা ইমপ্লিমেন্ট হয়। তার সাথে উচ্চস্বরে ঘোষণা হল — বিশ্বায়ন বা মুক্তবাজার বা নব্য উদার অর্থনীতি বিশ্বের সকল স্তরের মানুষের দুঃখ দুর্দশা দূর করবে। সেই একই লক্ষ্যে ডঃ মনমোহন সিং ভারতেও নেহেরুভিয়ান মিশ্র অর্থনীতির অবসান ঘটিয়ে নব্য উদার অর্থনীতির প্রবর্তন করেন।

'সারভাইভাল অফ দ্য রিচেস্ট'। অক্সফ্যামের রিপোর্টে দেখা গেল বিশ্বজোড়া অসাম্যের করুণ চিত্র। ধনীদের আয়ের পাশাপাশি বাড়ছে দরিদ্র, ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা। তারই মধ্যে বিশ্বজোড়া আর্থিক মন্দার ভ্রূকুটি। দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে আর্থিক বৃদ্ধির হার। আর্থিক সমৃদ্ধিতে ক্ষীর খাওয়া কর্পোরেট দানবরা শ্রমজীবী মানুষদের ঠেলে দেয় মন্দার ফল ভোগে। আসলে এটাই তো পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় দস্তুর। জিডিপি বৃদ্ধির হার, জাতীয় আয় বৃদ্ধির পরিসংখ্যান আমজনতার জীবনে কোনো সুদিনের বার্তা নিয়ে আসে না। অক্সফ্যামের রিপোর্ট বলছে, ভারতে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা ৫০% মানুষ পেয়েছেন জাতীয় আয়ের মাত্র ১৩%। এই মন্দার মধ্যেও আন্তর্জাতিক কর্পোরেট সংস্থার আয় বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যারফলে সম্পদ কমছে নিম্নবিত্ত আর গরিব মানুষের। যদিও শাক দিয়ে মাছ ডাকা হচ্ছে তারপরও আসল চিত্রটা সকলে সামনেই উঠে আসছে।

'নতুন বছরে প্রকাশিত সারভাইভাল অফ দ্য রিচেস্ট নামের রিপোর্ট জানাচ্ছে, পঁচিশ বছরের মধ্যে প্রথম বিশ্বে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে।  বাড়ছে পেটভরা পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যা। বিনিময়ে ধনকুবেরদের সম্পত্তির পরিমাণ রেকর্ড হারে বাড়ছে। ২০২০ সাল থেকে বিশ্বে যত সম্পদ বেড়েছে তার দুই তৃতীয়াংশের মালিক মাত্র এক শতাংশ মানুষ। অতিমারিতে তাদের সম্পদ বিপুল পরিমাণ বেড়েছে। বিলিয়নেয়ারদের (যাদের সম্পদের পরিমাণ ১০০ কোটি ডলার বা তার বেশি) প্রতিদিন গড়ে ২৭০ কোটি ডলার সম্পদ বাড়ছে। পাশাপাশি ৮০ হাজার কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত। দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধিতে কোটি কোটি মানুষের টিকে থাকাই দায়।

রিপোর্টে ভারতের অসাম্যের লজ্জাজনক চিত্রও উঠে এসেছে। বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গরীব মানুষের বাস ভারতে। বিশ্ব ক্ষুধা সূচক, মানব উন্নয়ন সূচকে এই দেশের চিত্র প্রতিবেশী অনেক দেশের থেকেই খারাপ। রিপোর্ট জানাচ্ছে, আর্থিক দিক থেকে উপরে থাকা ১০ শতাংশ ধনী দেশের মোট সম্পদের ৭২ শতাংশের মালিক। দেশে যে পরিমাণ সম্পদ বেড়েছে, তার ৬২ শতাংশের মালিক এক শতাংশ ধনকুবের। অর্থাৎ আর্থিক বিকাশের ক্ষীরের সিংহভাগ খেয়েছে এই এক শতাংশ ধনকুবের। পাশাপাশি নিচে থাকা ৫০ শতাংশ মানুষ দেশের মোট সম্পদের মাত্র তিন শতাংশের মালিক। বলার অপেক্ষা রাখে না, যে নিচের তলায় থাকা ৩০ শতাংশ মানুষ আক্ষরিক অর্থেই আজ রিক্ত।

রিপোর্টেও সেই তথ্য ধরা পড়েছে। ভারতের ৭০ শতাংশ মানুষ পেটভরা পুষ্টিকর খাবার পান না। অপুষ্টিজনিত রোগে এই দেশে প্রতি বছর ১৭ লক্ষেরও বেশি মানুষ মারা যান। দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, বেকারত্ব বাড়ছে। রিপোর্ট জানাচ্ছে, দেশের ৮৪ শতাংশ পরিবারের প্রকৃত আয় অতিমারীর বছরে (২০২০-২১) কমেছে। অথচ কর্পোরেট সংস্থাগুলির মুনাফা বেড়েছে ৭০ শতাংশ। অতিমারীর দুবছরে ভারতে বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা ৬৪ জন বেড়ে হয়েছে ১৬৬। দেশে ১০০ জন ধনী ব্যক্তির মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৫৪ লক্ষ কোটি টাকার বেশি। ভুললে হবে না, ২০২২-২৩ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে মোট বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ ৪০ লক্ষ কোটি টাকারও কম। শুধুমাত্র আদানি কোম্পানির কর্ণধারের সম্পদ অতিমারীতে বেড়েছে আট গুণ। আর ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো জানাচ্ছে, ২০২১ সালে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১১৫ জন দিনমজুর আত্মহত্যা করেছেন।'

তারসাথে জাতি ও লিঙ্গগত বৈষম্যের শিকার আর্থিক অসাম্যের সঙ্গে। 'অক্সফ্যাম রিপোর্ট জানাচ্ছে, এ দেশে লিঙ্গ বৈষম্যের সঙ্গে আর্থিক অসাম্যের সম্পর্ক বেশি প্রকট। মহিলাপ্রধান পরিবারগুলোর দারিদ্র্যের বিচারে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অবস্থাই সবচেয়ে করুণ। ভারতে প্রতি সাতটি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবার মহিলাপ্রধান। কর্মরত মহিলাদের মধ্যে মাত্র ১৯ শতাংশ নিয়মিত বেতন পান। পুরুষদের মধ্যে এই হার ৬০ শতাংশ। পুরুষ শ্রমিক এক টাকা রোজগার করলে, মহিলা শ্রমিক পান ৬৩ পয়সা। উচ্চবর্ণের শ্রমিক যত মজুরি পান, দলিতরা পান তার ৫৫ শতাংশ মজুরি। শহর ও গ্রামের মধ্যেও আয়ের বৈষম্য রয়েছে। গ্রামাঞ্চলের শ্রমিক শহরাঞ্চলের অর্ধেক আয় করেন।' তাহলে কি বলা যায় কর্পোরেটদের রোষানলে কেবল 'সংবিধানের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাকেই বিপন্ন করছে না, গড়ে তুলছে চূড়ান্ত অসাম্যের দেশ' ?

১৯৯১ সনের পর থেকে আজ ৩২ বছর অতিক্রান্ত। পরিতাপের বিষয় যে পৃথিবী আমেরিকা থেকে শুরু করে কোন দেশেই দরিদ্র পীড়িত মানুষের অবসান ঘটাতে পারে নাই। অন্যদিকে এই নব্য উদারনীতি বছরে বছরে বিভিন্ন দেশে আর্থিক সংকট তৈরি করছে এবং যার ফলস্বরূপ ২০০৮ সালে সমগ্র বিশ্ব মহামন্দায় নিমজ্জিত হয়েছিল। বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদরা ঘোষণা করতে বাধ্য হচ্ছেন যে ২০০৮ এর মহামন্দা থেকে ২০২২-২৩ সনের বিত্তীয় বছরে গভীর সংকটে নিমজ্জিত হওয়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে। গত সাত অক্টোবর ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংকের বাৎসরিক অধিবেশনে আইএমএফ এর পরিচালনা সঞ্চালক জর্জিওভা (Kristalina Ivanova Georgieva) ব্যক্ত করেন বিশ্বের অর্থনীতি এক অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে আমেরিকা সহ ইউরোপের বহু দেশ অর্থনীতি সংকটে আক্রান্ত। রাষ্ট্রসঙ্ঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিশ্বে পুঁজিবাদী অর্থনীতি ২০০৮ সাল থেকেও গভীর মহামন্দার দিকে ধাবিত ( The world is headed towards a global recession and prolonged stagnation unless we quickly change the current policy course of monetary and fiscal tightening in advanced economics.) এতে রাষ্ট্রসংঘ ধারণা করছে যে বিশ্বের জিডিপির বিকাশ ২.২% হ্রাস হবে। রাষ্ট্রসংঘ আরও বলছে যে দেশগুলোতে দরিদ্র শ্রেণী সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হবে ( they are hitting the poorest the hardest )। অর্থনৈতিক সংকটের সাথে সাথে দেশগুলোতে আর্থসামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হবে এবং জলবায়ু নিয়ন্ত্রণেও বাধা হবে।

পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থাটাই চূড়ান্ত অন্যায় এবং অমানবিয়। সেখানে শ্রমের উচিত মূল্য না দিয়ে মুনাফা লাভ করা হয়। শ্রমশক্তির দাম যত কম হবে, মুনাফা ততই বাড়বে। জিডিপি বাড়লে আর্থিক বিকাশ হবে। কিন্তু না, সেখানেই চলে আসল খেলা। শ্রমের অসাম্যতা তৈরি করে এখানে চলে আর্থিক মুনাফা বৃদ্ধির ধান্ধা। ২০০৭-০৮ সালের আর্থিক মহামন্দা এখনও কেটে উঠতে পারেনি গোটা পৃথিবী সহ ভারতও, কিন্তু আবারও রোমন্থনের পথে ধাবিত হচ্ছে আর্থিক মন্দার দিকে। সেইজন্য অর্থনৈতিক মহামন্দা থেকে ভারতকে কিভাবে উত্তরণের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় সেটাই এখন ভাববার বিষয়।

তথ্যসূত্রঃ 
১) https://www.britannica.com/topic/1991-Soviet-coup-attempt
২) 
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Washington_Consensus
৩) https://en.m.wikipedia.org/wiki/2007%E2%80%932008_financial_crisis
৪) https://www.oxfam.org/en/press-releases/richest-1-bag-nearly-twice-much-wealth-rest-world-put-together-over-past-two-years
৫) 
https://meetings.imf.org/en/2022/Annual
৬) 
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Kristalina_Georgieva

https://epaper.bartalipi.in/

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...