Tuesday, April 19, 2022

শেষ দেখা !


চারিদিকে বারুদের গন্ধ,

যেকোনো দিন মৃত্যু হতে পারে,আবার কবে দেখা হবে কেউ জানে না। 
হয়তো এটাই শেষ দেখা।

রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে ব্যার্থ। রাষ্ট্র নেতারা উপহার দিয়েছে একরাশ ভয়। রাষ্ট্র নেতাদের বিরুদ্ধে কথা বলা নাকি দেশদ্রোহীতা। 

আজ মানবতা হেরেছে নগ্ন সভ্যতার কাছে। 
যুদ্ধই নাকি আধুনিক সভ্যতা।

Sunday, March 27, 2022

বিচারপতি আগা হায়দার, ভগৎ সিংয়ের কোর্টরুম কমরেড (Justice Agha Haider, Courtroom comrade of Bhagat Singh)


 “আমি অভিযুক্তদের (ভগত সিং এবং তার সহযোগীদের) আদালত থেকে কারাগারে সরিয়ে দেওয়ার আদেশের পক্ষ ছিলাম না এবং যাইহোক আমি এর জন্য দায়ী নই।  সেই আদেশের ফলে আজ যা ঘটেছে তার থেকে আমি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করছি।”

 

 বিচারপতি সৈয়দ আগা হায়দার, ১২ মে ১৯৩০


 লাহোরের স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের সদস্য হিসেবে বিচারপতি সায়্যদ আগা হায়দার কর্তৃক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর জন্য ভগৎ সিং, সুখদেব, রাজগুরু এবং অন্যান্য ভারতীয় বিপ্লবীদের বিচারের জন্য দেওয়া উপরোক্ত আদেশটি সর্বদা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।  ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে।


 ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত 1929 সালের এপ্রিলে দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভার অভ্যন্তরে ধোঁয়া বোমা নিক্ষেপ করার পরে জাতীয়তাবাদীদের কল্পনাকে বরখাস্ত করেছিলেন, যার জন্য উভয়ের বিচার ও সাজা হয়েছিল।  তারা জেলে থাকাকালীন ভগৎ সিংকে সন্ডার্স নামে একজন ইংরেজ পুলিশ অফিসার হত্যা মামলার সহ-অভিযুক্ত করা হয়।  জাতীয়তাবাদী যুবকদের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া থেকে আতঙ্কিত করার জন্য ব্রিটিশ সরকার বিচারের বাইরে একটি চমক তৈরি করতে চেয়েছিল।  1930 সালের লাহোর অধ্যাদেশ নং III প্রবর্তন করে ভাইসরয় একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তৈরি করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল 'যথাযথ বিচারিক পদ্ধতি' বাইপাস করা এবং শক্তিশালী ব্রিটিশ ক্রাউনকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য ভগৎ সিং এবং তার সহযোগীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া।

 

 অধ্যাদেশটি ১ মে প্রবর্তিত হয় এবং প্রধান বিচারপতি শাদি লালকে 'বিশেষ ট্রাইব্যুনাল'-এর জন্য তিনজন বিচারককে 'যথাযথভাবে বাছাই' করার ক্ষমতা দেওয়া হয়।  শাদি লাল সম্পূর্ণরূপে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে বিচারপতি সৈয়দ আগা হায়দার, দুই ইংরেজ বিচারক কলসডট্রিম এবং হিলটনের সাথে, বিশেষ ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্য বুঝতে পারবেন এবং যথাসময়ে 'ইংরেজি বিচার' প্রদান করবেন।  ট্রাইব্যুনাল 5 মে তার 'কাজ' শুরু করে এবং একই দিনে বিপ্লবীদের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবীরা একটি চিঠি লেখেন, "আমরা এই প্রহসনমূলক অনুষ্ঠানের পক্ষ হতে অস্বীকার করছি এবং এখন থেকে আমরা এই মামলার কার্যক্রমে অংশ নেব না"।


 যাইহোক, আগা হায়দারের বুকের ভিতরে একটি ভারতীয় হৃদস্পন্দন ছিল তা খুব কমই কেউ জানত।  12 মে বিপ্লবীদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।  তারা ইনকিলাব জিন্দাবাদ (বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক) স্লোগান দেয় এবং সরফরোশি কি তামান্না গাইতে থাকে।  (একটি উর্দু বিপ্লবী গান) যার পরে পুলিশ, বিচারপতি কোল্ডস্ট্রিমের নির্দেশে, আদালতে তাদের পিটিয়ে গুরুতর শারীরিক আঘাত করে।  আগা হায়দার তা সহ্য করতে না পেরে প্রতিবাদ জানান।

 

 তাঁর বই, দ্য এক্সিকিউশন অফ ভগত সিং: লিগ্যাল হেরেসিস অফ দ্য রাজ, সতবিন্দর সিং জুস লিখেছেন, “তিনি (আঘা হায়দার) আদালতের সহিংসতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা ট্রাইব্যুনালের সভাপতি বিচারপতির নির্দেশে প্ররোচিত হয়েছিল।  কোল্ডস্ট্রিম।  তার কর্মকাণ্ড অবশ্যই অন্যান্য বিচারকদের জন্য সম্পূর্ণ ধাক্কা হিসাবে এসেছে।  এটি লাহোরের প্রধান বিচারপতিকে (শাদি লাল) হতবাক করে দিয়েছে।  তিনি বিচারপতি আগা হায়দারকে নিরাপদ দুই হাত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।  কিন্তু লোকটা কারো বোকা ছিল না।  এখানে একজন ওয়েস্টার্নাইজড ইন্ডিয়ান গ্র্যান্ডি ছিল যা কট্টর হতে ইচ্ছুক ছিল না।"

 

 12 মে সহিংসতার পর, বিপ্লবীরা এবং তাদের পরামর্শদাতারা ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম বয়কট করে।  বিচারের সমস্ত ছলনা জানালা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ট্রাইব্যুনাল 'অভিযুক্ত' বা 'বিবাদী আইনজীবী'-এর অনুপস্থিতিতে তার কার্যক্রম শুরু করে।  আগা হায়দার তা সহ্য করতে না পেরে বিচারকের চেয়ার থেকে ‘রক্ষার’ ভূমিকা নেন।  পুলিশের হাজির করা সকল সাক্ষীদের জেরা শুরু করেন তিনি।  পুলিশ সাক্ষী হিসাবে জয় গোপাল, পহিন্দ্র নাথ ঘোষ, মনমোহন ব্যানার্জি এবং হংস রাজ ভোহরাকে হাজির করে।  আগা হায়দার অন্য দুই ইংরেজ বিচারকের মত তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেননি।  ট্রাইব্যুনালের সামনে পুলিশ এই অনুমোদনকারীদের ‘আবৃত্তি’ করার জন্য যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে তিনি ছিদ্র করেছেন।  জুস লিখেছেন, "অভিযুক্তের পক্ষে আইনী প্রতিনিধিত্বের অনুপস্থিতিতে, ন্যায়বিচারের প্রান্ত যাতে বলিদান না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য তিনি এটি নিজের উপর নিয়েছিলেন"।

 

 ৩০ মে আগা হায়দার যখন রাম শরণ দাসকে জেরা শুরু করেন তখন ট্রাইব্যুনালের পুরো নাটকটি উন্মোচিত হয়।  দাসকে ট্রাইব্যুনালের সামনে স্বীকার করতে হয়েছিল, “আমি একটি নথি দিতে চাই যা দেখায় যে অনুমোদনকারীদের কীভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়।  আমি নথি হাতে.  আমি পুলিশের হেফাজতে থাকতে চাই না।  এই নথিটি একজন পুলিশ অফিসার আমাকে দিয়েছিলেন যিনি আমাকে হৃদয় দিয়ে শিখতে বলেছিলেন।  এটি আমার সাথে থাকা অফিসার দ্বারা আমাকে দেখানো হয়েছিল।  তারা পরিবর্তনের সাথে সাথে এটি অফিসার থেকে অফিসারে চলে গেছে।  আমি নথি হাতে দিচ্ছি।"


 বিচারে আগা হায়দার যে প্রভাব ফেলেছিল তা অনুমান করা যায় যে সাতজন প্রত্যক্ষদর্শীকে আদালতে হাজির করা হয়েছিল, ছয়জন তার কাছ থেকে জেরা করার পর শত্রুতা করেছিলেন।

 

 ট্রাইব্যুনালের শেষ দিন ছিল 20 জুন এবং এটি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট ছিল যে আগা হায়দার ভারতীয় বিপ্লবীদের মৃত্যুদণ্ড দেবেন না।  ইংরেজ সরকার স্থির ছিল।  স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের নামে তারা যে পুরো থিয়েট্রিক তৈরি করেছিল তা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল।  কারণ, তিনজন বিচারকই মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে একমত না হলে তা দেওয়া যেত না।

 

 সরকার তার সমর্থনে আগা হায়দারকে 'শান্ত' করার জন্য একজন প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল কিন্তু লোকটিকে এই বলে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, "আমি একজন বিচারক, কসাই নই।"

 

 একটি কোর্স সংশোধন হিসাবে, আগা হায়দারকে প্রধান বিচারপতি শাদি লাল দ্বারা "স্বাস্থ্যের কারণে" ট্রাইব্যুনাল থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়েছিল।  এই সময় বিচারকের সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মেরুদণ্ড ছিল না এবং ভগৎ সিং, সুখদেব এবং রাজগুরুকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ‘ইংলিশ জাস্টিস’ করা হয়েছিল।


 আগা হায়দার চাকরি ছেড়ে সাহারানপুরে (ইউপি) আসেন এবং 1937 সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের পর তার নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন।  এখনও তার নাতি-নাতনিরা তাকে এইভাবে স্মরণ করে:

 

 "মেরাহ তালুক উস খানদান সেহ হ্যায়/জিসকে বাজুরগোঁ নেহ, আংগ্রেজ কেহ সামনেহ কলম তোরদি "


 ('আমাকে হুমকি দিও না কারণ আমি সেই রাজবংশ থেকে এসেছি, যাদের পূর্বপুরুষরা তাদের বিবেকের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ একটি আদেশে স্বাক্ষর করার পরিবর্তে, তাদের ব্রিটিশ প্রভুদের আদেশের অধীনেও তাদের হাতের পেন্সিল ভাঙতে দ্বিধা করেননি')।

  

 লিখেছেন, সাকিব সেলিম;  যিনি ইতিহাসবিদ ও লেখক।

অনুবাদক:  জাহিদ

Tuesday, August 4, 2020

"হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে"

"ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে
অন্ধ সে জন মারে আর মরে"

উপরের কথাগুলো লিখার শুধু একটাই উদ্দেশ্য যে কোন ধর্মের ধর্মীয় মৌলবাদ এর বৈশিষ্ট্য এক। সারা পৃথিবী জুড়ে ধর্মীয় মৌলবাদ। আমার ধর্মই ভালো, আমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ এই মনোভাব নিয়েই অন্য ধর্মের মানুষের উপর অত্যাচার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ভাঙ্গা, ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ ভাঙ্গা, এই নোংরা খেলা চলছে। যেমন ধরে নেয়া যায় ঐ শ্লোগানটা (মন্দির ওঁহি....)।  মজার বিষয় হলো প্রত্যেকটা ধর্মগ্রন্থ এবং ধর্মই বলছে অন্য ধর্মের উপর আঘাত করা অত্যন্ত নিন্দনীয় অতএব যখন ধর্মীয় গুরুদের নেতৃত্বে এই অত্যাচার ধ্বংসলীলা চলছে সেদেশের মানুষ হাসিমুখে সেটাকে মেনেও নিচ্ছে।
 আশ্চর্যের বিষয় কিছুদিন আগে যখন বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির হবে এই রায় দিল একশ্রেণীর মানুষ তারা রাগ প্রকাশ করলেন এটা ঠিক নয় এটা করা উচিত হয়নি ,সেই একই মানুষ যখন ঐতিহাসিক সোফিয়া মিউজিয়াম কে মসজিদ হল, পাকিস্তানে গুরুদুয়ারা ভেঙে মসজিদ হল তখন তারা আনন্দ প্রকাশ করছে । আবার উল্টোটা যদি দেখি যারা বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে রাম মন্দির হয়েছে বলে আনন্দ প্রকাশ করছে তারা আবার গুরুদুয়ারা ভেঙে মসজিদ হচ্ছে বলে বিরোধিতা করছে এটার থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় ধর্মীয় মৌলবাদ যে দেশে যেখানে তারা শক্তিশালী বা সেই দেশের সরকারকে মদদ দিয়ে চালিত করে সেখানে অন্য ধর্মের উপর অত্যাচার হবে এটা স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
তাই পৃথিবীর যে কোন ধর্মের মৌলবাদকে আমি তীব্র ঘৃণা প্রদর্শন করি ও তাদের এই ক্রিয়াকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাই।

ভারতবর্ষে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারি ইত্যাদির স্বল্পতা কোনদিনই ছিলোনা, দুর্দশা নিয়েই তাদের নিত্যি বেঁচে থাকা, তার সাথে গত ২৭ বছর ধরে ‘অযোধ্যা মামলা’ গন্ধমাদন যোগ হয়ে জীবন আজ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন রাজীব গান্ধী সেই যে অযোধ্যায় কল্পিত ‘রামমন্দির’র তালা খুলে দিলেন, যার ফলস্বরূপ ভারতীয় জনতার জীবনে এক অশুভ, অনাকাঙ্ক্ষিত অধ্যায় শুরু হয়ে গেলো। সাম্প্রদায়িকতা, যা শাসকের অস্ত্র হিসাবে আগেও ব্যবহৃত হতো, তা এক প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হিসাবে ভারতীয় উপমহাদেশে একেবারে গেড়ে বসলো। ইতিহাস সাক্ষী আছে, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরে, শুধু এই দেশেই নয়, সমগ্র উপমহাদেশেই এক চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা গেছিলো। এই তুরুপের তাসটি এখন ভারতীয় রাজনীতির ‘শক্তিশেল’। 

সাম্প্রদায়িকতা ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় বিভেদবোধের হাত ধরে প্রকাশ পেয়েছে, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও যে তার অস্তিত্ব একেবারেই নেই, তা হয়তো বলা চলে না, তবে এই ভূখণ্ডে এটি যেন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভিশাপের স্থায়ী রূপ নিয়েছে, যাকে কেউ কেউ এক ঐতিহাসিক ভবিতব্য বলে অভিহিত করেছেন। ধর্মীয় আচার-আচরণকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিভেদ-চেতনার সহিংস প্রকাশ ঘটতে দেখা গেছে বারবার। ধর্মীয় উদারতা, এই প্রবণতাকে শেষ পর্যন্ত রুখতে পারেনি, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের এতটাই জোর। রবীন্দ্রনাথ ব্যক্ত করেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম তার ধর্ম নয়। অর্থাৎ তিনি মানবিকতাকেই ধর্মবোধ বিবেচনা করেছেন। ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবোধের সুড়সুড়ি কতটা হিংস্র হতে পারে, তা আমরা প্রত্যক্ষ্য করেছি ১৯৯২ সালের ৬ ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে, যা ভারতবর্ষের বুকে একটা দগদগে ক্ষত এঁকে দিয়েছে একদল ধর্মোন্মাদের বিষাক্ত কালো হাত ধরে। তারা আজও সমানভাবে সক্রিয়, তাদের যাবতীয় বিভাজনের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণের স্বার্থে ব্যবহৃত ধর্মীয় দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতা বারবার এসেছে রক্তের ঢেউ তুলে, এর বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রতিবাদও হচ্ছে, কিন্তু ধর্মীয় সংস্কৃতির শক্তি আমাদের এই উপমহাদেশে, অতিমাত্রায় প্রবল বলেই বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদ বা প্রতিবাদ গৌণ পর্যায়ে রয়ে গেছে। রাষ্ট্রনীতি ও রাজনীতি তাই ক্ষমতার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ধর্ম ও ধর্মীয় সংস্কৃতিকে ব্যবহার করেছে অমানবিক ধারায় এবং সফলও হয়েছে। 
বাবরি মসজিদ-রাম মন্দির নিয়ে হিন্দু-মুসলমানের শতাব্দী প্রাচীন বিরোধের আইনি নিষ্পত্তি হয় গত বছরের নভেম্বরে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চের রায়ে অযোধ্যার বিতর্কিত স্থানে রাম মন্দির নির্মাণ ও বিকল্প স্থানে মুসলমানদের মসজিদ নির্মাণের জমি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। মন্দির নির্মাণে একটি ট্রাস্ট গঠনের নির্দেশনাও দেওয়া হয় ওই রায়ে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুসারে গঠিত হয় শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট। মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য তারা পাঁচ আগস্ট চূড়ান্ত দিন নির্ধারণ করে। সেই অনুযায়ী, আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় অযোধ্যায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মূল অনুষ্ঠান শুরু হবে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

ও হ‍্যাঁ, অনেকটা কথা তো বলে ফেললাম। শেষটাই বলে ফেলি ,একটা বছর হলো আজও শব্দ শুনি "কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি" ?  তবে কতটা উন্নয়নের শিখরে উঠতে পেরেছে ,এটাই ভবিতব্য ! উল্টো সুরে এখন কাশ্মীরি পণ্ডিতরা ৩৭০ ধারা এবং পূর্ণ রাজ‍্যের দাবিতে সরব। 

আমি ভাবলে অবাক হই , এই অর্থহীন  লেখালিখির কি কোন মানে আছে ?  লিখেবা কি  হবে ? আমি সাধারণ  একজন মানুষ, জনারণ্যে মিশে থাকা হাস্যকর শান্তিপ্রিয়  লোক , যে যাবতীয় বাহ্যিক  সামাজিক উত্তেজনা  থেকে নিজেকে এক পাশে সরিয়ে  রেখে ,এক কাল্পনিক ভারতবর্ষে বাস করে , ভাবে , শান্তিপ্রিয় এক মানবিক  স্বর্গরাজ্যে  আছি | এই চূড়ান্ত মূর্খের স্বর্গে  বাস করতে করতে , কখনো মনে হয় নি , অশনি সংকেতের  বারুদ  যে কোনো সময় আমার পায়ের নিচে নিরাপত্তাহীনতার  মাটিকে  টলিয়ে দিতে পারে এক মুহূর্ত্বে....|

Monday, July 13, 2020

এমনকি কারাগারের দেয়ালও ভারভারা রাওকে লেখা থেকে বিরত রাখতে পারেনি

কথা হলো আমরা করোনা মহামারীতে জর্জরিত। না, এতে বিচলিত হওয়ার মতো কিচ্ছু হয়নি! আমরা কি আর হারিয়ে যাচ্ছি ! কারণ ঢঙ্গিদের গণতন্ত্রগ্রাসী আচরণ বানিজ্যটা বেশ রমরমা চলছে। আর আমরা কী আর করতে পারি বলুন ঢাক ঢোল বাজিয়ে মোমবাতি জ্বালানো ছাড়া।

অমিতাভ বচ্চনের মতো ভারভারা রাও তার যৌবনে যদি সিনেমা জগতে পা রাখতেন, তাহলে তিনিও একটি চকচকে হাসপাতাল পাওয়ার যোগ্য ছিলেন।, এখন তিনি কারাবন্দি এবং অসুস্থ।  দু'জনই একই বয়সের ... জাতি একজনের জন্য প্রার্থনা করছে, অপরের জীবন সম্পর্কে উল্লেখ এবং চিন্তা কজনের কতটুকু আছে তা আঙুলে গোনা যাবে। তারপরও আঙ্গুলের উপর কিছু জায়গা এখনও থাকতে পারে।  ভারভরা রাও একজন কবি, সাহিত্য সমালোচক এবং বিখ্যাত সমাজসেবক।  ১৯৫৭ সাল থেকে কবিতা লেখা।  সাধারণ জনতার পক্ষে কাজ করা,খেটে খাওয়া মানুষদের কথা বলা, এমন রাজনৈতিক চেতনা রয়েছে যা স্পষ্টতই ক্ষমতাসীনদের খোঁচা দিতো।

 অমিতাভ যখন পর্দায় নাচছিলেন, দোলা দিচ্ছিলেন, অর্থোপার্জন করছিলেন, তেলুগু সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত আলোচক ভারভরা রাও রাস্তায় পাবলিক গান গেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিতেছিলেন। জনান্দোলন গড়ে তুলেছিলেন ছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে। না , ভাবতে পারেন অমিতাভ বচ্চন নিয়ে এতো গাজ্বালা কেন ? অমিতাভের প্রতি একটুও ভ্রুকুটি নয়। কিন্তু পার্থক্য কেন ? ভীম কোরেগাঁও মামলায় সরকার রাওকে নকশালপন্থী বলে দাবি করেছিল এবং তা সরকারের বিরুদ্ধে রয়েছে, যেহেতু আজকাল সমস্ত রাজনৈতিক-সামাজিক কর্মীদের সাথে যা করা হয়  ।  আজও বিচার শুরু হয়নি!  আমরা বিনোদনের জন্য সিনেমাটিক নায়ক চাই, তবে আমরা কি সত্যিকারের নায়কদের চাই না সুস্থ সমাজের জন্য? না, ভারভারা রাও আপনার কাছে ভোট ভিক্ষে করতে আসবেন না কখনও; কিন্তু একমুহূর্তের জন্যেও যদি আপনি এই অসহ্য সমাজব্যবস্থার বদল চান, তা'লে ভারভারা রাও আপনার সেই দ্রোহচেতনার কবি।

 রাজার যা পছন্দ করেন এই বাজনা বাজানোর রীতিটা তো আর নতুন নয়!  আচ্ছা, এখন যখন অমিতাভ বচ্চন অসুস্থতার পরে আরোগ্যের বন্যা চলছে সারা দেশে, তখন ভারভারা রাওকেও মনে রাখবেন .. সর্বোপরি, একজন প্রবীণ সিনেমা জগতের এবং অন্যজন সত্যিকারের জীবনের সংগ্রামকে বাঁচিয়ে রেখেছেন!  সরকারের কী কাজ নয় যে যারা রাজনৈতিক কারণে বন্দী তাদের সাথে সঠিকভাবে আচরণ করার ? মানুষ যদি বেঁচেই না থাকে তাহলে আদর্শের লড়াই আরও পরে করা যায় ভাই!  ভারভারা রাও তো সম্পত্তির যোগ করেননি বা পানামা পেপার দিয়ে কর ফাঁকিরও অভিযোগ উঠলো না, শুধু বিজ্ঞান মনস্ক চিন্তার কথা বলেছিল .. ড্রাম প্লেট নিয়ে করোনাকে তাড়িয়ে দেওয়ার ভান তিনি খুব কমই করতে পারতেন ! 

আপনি যদি শিরদাঁড়া সোজা রেখে একমুহূর্তের জন্যেও শাসককে, রাষ্ট্রকে 'না' বলার সৎসাহস রাখেন, তবে ভারভারা রাও আপনার কবি। সব মিলিয়ে তার যুদ্ধটি ছিল আধুনিক মতাদর্শের মাধ্যমে উন্নত মানব সমাজের গঠন, তাহলে অন্যায় ভাবে কারও অধিকার খর্ব করে কারাবন্দির অধিকার থাকতে পারে কীভাবে?  না, ভারভারা রাও ফিল্মি নায়ক নন, ভোটবাজ নেতা নন, জুমলা ক'রে সংবাদ-শিরোনামে আসা ব্যক্তি নন, শাসকের পা-ছোঁয়া হেঁহেঁ-কবি নন। ভারভারা রাও আপনার কবি, ভারভারা রাও আপনার মতো শোষিত ও অবদমিত প্রত্যেক মানুষের জেগে ওঠার রেগে ওঠার ক্ষেপে ওঠার আপসহীন লড়াইয়ের মুখ। নিপীড়িত শ্রেণি-বর্ণ-ধর্ম-লিঙ্গের প্রতিরোধের কবি ভারভারা রাও। যিনি লিখেছেন স্বাধীনতার কথা তার কবিতায়। নীচের দুটি কবিতা রইল, তার চেতনার কথা ---- 
১ ) This is jail for the voice and the feet
But the hand hasn’t stopped writing
The heart hasn’t stopped throbbing
Dream still reaches to the horizon of light
Travelling from this solitary darkness
Of course, in this jail moon is not allowed
To share his light,
But who can stop me from
Marching into the dawn of the eastern sun.
২ ) From amidst the people who speak
Came into the trees that do not.
From the rocking movements
And the air filled with slogans
Came into the swinging dumb trees
And the high walls trying to arrest wind।

এবং এই বলেই শেষ করছি, রাওয়ের ওপর আক্রমণ আমাদের সবার ওপর আক্রমণ। আর হ‍্যাঁ এটা বলা বেশ সাহসীকতার কাজ নয় হিম্মতের প্রয়োজন। তাই দাবি একটাই রাওয়ের অবিলম্বে মুক্তি চাই।

Thursday, July 9, 2020

সমকামিতাঃ একটি সহজাত বা প্রাকৃতিক বিষয়

সমকামিতার মতো একটা স্পর্ষকাতর বিষয় নিয়ে  লিখতে বসে ভাবছিলাম কোথা থেকে শুরু করবো। আজ পর্যন্ত সমকামিতা নিয়ে অনেক লেখালেখিবা বিশ্লেষণ হয়েছে। তবুও নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে এই লেখা। উদ্দেশ্য হল পক্ষে আওয়াজ তোলা। যাইহোক,আজকের পৃথিবীতে সমকামিতার ব্যাপারটা আর লুকোচুরির পর্যায়ে নেই।  Gay Pride Day এখন আর শুধু সমকামিদের অধিকার আর গৌরব বহন করে না অনেকের জন্যই এটার অর্থ আরও  ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে।  এটাকে সামগ্রিক মানবাধিকারের একটা অংশ হিসেবেও দেখা হয়।

সমকামিতা কি?

সমকামিতা বা সমপ্রেম বলতে সমলিঙ্গের ব্যাক্তির প্রতি রোমান্টিক আকর্ষন, যৌন আকর্ষন বা যৌন আচরণকে বুঝায়। সংস্কৃত ‘সম’ শব্দটির অর্থ সমান বা অনুরূপ এবং ‘কাম’ শব্দের অর্থ হচ্ছে যৌন চাহিদা। বিশ্বের প্রায় ৫% মানুষ সমকামী। 

সমকামিতার কারণঃ 
সমকামিতা কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণে নির্ধারিত হয় না। এটি জিনগত, হরমোনগত ও পরিবেশগত একাধিক কারণের সমষ্টিগত প্রভাবের ফল।

১)জিনগতঃ

১৯৯৩ সালে ডিন হ্যামারের করা একটি গবেষনায় বলা হয় সমকামিতার জন্য জিন দায়ী। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে একটি গবেষনায় এই ফলাফল সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করা হয়। ২০১৭ সালে নেচার জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে সমকামিতার জন্য কোন জিনদ্বয় দায়ী। তাই দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় যে সমকামিতার জন্য জিন দায়ী।

২)মস্তিষ্কগতঃ

 সমকামিতা নামক এই যৌন অভিমুখিতার সাথে মস্তিষ্কের সংযোগ রয়েছে। মস্তিষ্কের INAH3 নামক অংশটি পুরুষের ক্ষেত্রে নারীর তুলনায় বড় হয়। কিন্তু সাইমন লিভ্যে নামক একজন স্নায়ুবিজ্ঞানী দেখেছেন সমকামী পুরুষের INAH3 আর বিষমকামী নারীর INAH3 প্রায় সমান। অর্থাৎ সমকামী পুরুষের INAH3 বিষমকামীর পুরুষের চেয়ে আকারে সংকুচিত। তবে এ সংকোচন কতটা? এটা হচ্ছে মহিলাদের INAH3 এর আকারের ন্যায়। এই গবেষণাটি পুনঃপ্রতিলিপিত করা হয়েছে, যা আগের গবেষণাটিকে নিশ্চিত করে। আরো দেখা গিয়েছে বিষমকামীদের সাথে সমকামীদের INAH3 এলাকার প্রস্থচ্ছেদ ও নিউরনের সংখ্যায় কোনো পার্থক্য নেই।

এই জায়গা থেকে অনেকের ধারণা হয়েছিল, সমকামী পুরুষদের হয়তো, বিষমকামী নারীর ন্যায় হাইপোথ্যালামাস থাকে। কিন্তু আরেকটি গবেষণা থেকে দেখা গিয়েছে, পুরুষ সমকামীদের সুপ্রাকায়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াস; বিষমকামী পুরুষ ও নারীর তুলনায় দ্বিগুণ। গবেষণায় আরো দেখা গিয়েছে পুরুষ ও নারী সমকামীর বাম এমিগডালা বিস্তৃত এবং পক্ষান্তরে নারী পুরুষ বিষমকামীর ডান এমিগডালা বিস্তৃত। দেখা গিয়েছে, দুইটি মস্তিষ্কগোলার্ধকে সংযোগকারী শ্বেত তন্তু সমৃদ্ধ এন্টিরিওর কমিশার, নারী ও পুরুষ সমকামীতে; বিষমকামী পুরুষের তুলয়ানায় বড়।

অনেকে বলতে পারেন, হয়তো জন্মের পরে, সমকামিতার দরুণ মস্তিষ্কের নানা অংশের এই পরিবর্তন ঘটেছে, হয়েছে সংকোচন-প্রসারণ। কিন্তু ২০১০ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষনা থেকে বলা হচ্ছে, মস্তিষ্কের এই ধরনের বিকাশ মার্তৃগর্ভেই বিকশিত হয়, যা সামাজিক কারণে কোনো ধরনের প্রভাবে প্রভাবিত হয় না।

৩)পরিবেশগতঃ

এছাড়া যুক্তরাস্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব মেডিসিন এর এক গবেষনায় দেখা গিয়েছে সমকামী  পুরুষ বা নারীদের নারী আত্মীয়রা অধিক সংখ্যক সন্তান উৎপাদন করে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে সমকামী পুরুষদের এক বা একাধিক বড় ভাই থাকে। পরিশেষে বলা যায় যে সমকামীতাএকটি সহজাত বা প্রাকৃতিক বিষয়। 


তথ্যসূত্রঃ

1)http://science.sciencemag.org/content/261/5119/321.long
2)https://www.newscientist.com/article/dn26572-largest-study-of-gay-brothers-homes-in-on-gay-genes/
3)https://www.nature.com/articles/s41598-017-15736-4
4)http://science.sciencemag.org/content/253/5023/1034
5)https://linkinghub.elsevier.com/retrieve/pii/S0018506X01916800
6)https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/000689939090350K?via%3Dihub
7)https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/18559854
8)https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/7571001
9)https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/19955753
10)https://link.springer.com/article/10.1007%2Fs00439-005-0119-4
11)http://www.pnas.org/content/115/2/302
12)https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/15539346
13)https://bn.m.wikipedia.org/wiki/Handedness_and_sexual_orientation
14)https://osf.io/zn79k
15)https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/10410197
16)http://nymag.com/news/features/33520/
17) https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/14570558

Tuesday, June 30, 2020

কেইসড্রাট

স্ট্রিট লাইট
নেই তেল, চারদিক ঘিরে আছে অন্ধকার
হামাগুড়ি দেয়া ইঁদুর ছানা 
রেখাহীন গর্ভে সুড়ঙ্গ খোদে ওরা, এখন বাহুবলী।
আমি জড়পদার্ধ 
বিউগল বাজাতে জানি, বড় বিউগল!
আমার কী দোষ - না স্বেচ্ছায় এসেছি এখানে
এই দুর্দশা গ্রস্থে ভরপুর মাঠে।

আমাদের এ জীবন যেহেতু কমার্শিয়াল চিন্তার,
ব‍্যাপার চলছে 
এক চিলতে রুদ্দুর ও,
জলন্ত অঙ্গারে পরাজিত জীবন্ত আত্মারা 
গলায় দড়ি দিয়ে সময়ের দাবি রাখে
কেইসড্রাটের ডালে।

Tuesday, October 22, 2019

ডিটেনশন ক‍্যাম্প : এটাই আমার রাষ্ট্র ?

(১)
মাত্র দেড়’শ বছরের কিছু আগে-পরে জানা গেছিলো, সমস্ত ইতিহাসই আসলে শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস। যুগে যুগে সভ্যতার অগ্রগমনের সাথে সাথে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়ে তৈরী হয়ে এসেছে ইতিহাস, কিন্তু যা সত্যিই শাসকের শ্যেন দৃষ্টি থেকে মুক্তি পায়নি, ফলে আজকেও যখন মুষ্টিমেয় শাসকের হাতেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, তখন ইতিহাস যে তাদের মর্জিমাফিকই হতে হবে, তাতে চমকে যাওয়ার কিছু নেই। এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজকের ভারতবর্ষ। আরও স্পষ্ট করে বললে, একটা জাতি আজ চরম আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে তার নিজস্বতা, পরিচিতি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। জাতিটার নাম বাঙালি! প্রায় সাত দশক আগে, সংবিধান সভায় নাগরিকত্বের প্রশ্নে ব্যাপক আলোচনার পরে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা ঐতিহাসিক বলেই চিহ্নিত হওয়া উচিৎ।  গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল ধারাকে স্বীকৃতি দিয়েই স্বাধীন ভারত গড়ে উঠেছিলো তার নিজ সভ্যতায়, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের প্রতিক্রিয়াশীল ধারাকে উপেক্ষা করে, ভোটাররাই নাগরিক সেটাই ছিল মূল দীক্ষা। সংবিধান সভায় নাগরিকত্ব চিহ্নিতকরণের ব্যাপারে ‘jus soli’ প্রক্রিয়াকেই গ্রহণযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত নেন, যা নির্দেশ করে, “রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের মধ্যে জন্মের অধিকারে নাগরিকত্ব’ এবং সেই সময়ে সংবিধান সভা’র সদস্যরা এটিকেই নাগরিকত্বের সবচেয়ে আধুনিক প্রক্রিয়া হিসাবে গ্রহণ করেন। একইসাথে, নাগরিকত্বের প্রাচীন ধারণা, ‘jus sanguin’, যা নির্দেশ করে, “জাতি, গোত্র, ধর্ম বা সম্প্রদায় ভিত্তিতে নাগরিকত্ব”-তাকে অচল বলে বর্জন করা হয়। এই নাগরিকত্বের গৃহীত ধারণা প্রসঙ্গে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল বলেছিলেন, ‘আলোকিত, আধুনিক, সভ্য’; যাকে আজকের শাসক ভুলিয়ে দিয়ে আবার সেই প্রাচীন বংশতালিকা ও সম্প্রদায়গত অমূলক, অবৈজ্ঞানিক ধারণাটিকেই ফিরিয়ে আনতে চাইছে, শুধুমাত্র নিজেদের নির্বাচনী মুনাফার আশায়।

আজ যেভাবে ‘নাগরিক সংশোধনী বিল’ (ক্যাব) এনে শুধু নাগরিকত্বের গৃহীত সিদ্ধান্তকেই পালটে দিতে চাইছে নাগপুর-দিল্লির গেরুয়ারা এমনটা নয়, তারা এমনকি সংবিধানে বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতার মূল ধারাণাটিকেও বদলে দিতে চাইছে। এই পালটে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই শিবিরের  সামনে কোন যুক্তি নেই, যা আছে তা হলো, বাঙালির মধ্যে ধর্মীয় ফাটল ধরিয়ে পুরো বাঙালির সমূলে নিপাত। এখন নাগরিকদেরই শাসকের এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোটা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, কারণ সেটা তার অধিকার রক্ষার একমাত্র পথ। প্রখ্যাত আমেরিকান সমর-সাংবাদিক ডেভিড হ্যাকওয়ার্থ-র করা একটি উদ্ধৃতি এক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, “If a policy is wrongheaded feckless and corrupt I take it personally and consider it a moral obligation to sound off and not shut up until it's fixed.” গলা তুলে চিৎকার করাই শুধু নয়, যতক্ষণ না এই এনআরসি, ক্যাব ইত্যাদি নিয়ে সরকারের ধ্যাষ্টামো খতম হচ্ছে, ততক্ষণ প্রতিবাদ, প্রতিরোধ জারী রাখাটাই একমাত্র কর্তব্য।

আমরা এক নতুন শব্দবন্ধে তৈরী হচ্ছি, ‘বিদেশী', জবরদস্তী বিদেশী হিসাবে চিহ্নিতকরণের যে প্রক্রিয়া এখানে চলেছে, তার থেকেই এমন অসহায় শব্দবন্ধ সৃষ্টি হয়, যা এখানে আমাদের অসহায়ত্বকেই প্রমাণ করে। ভাললাগলো পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী নেতাদের হুংকার শুনে। বাহ্,  কথাগুলো বললেই যেন তেলে জল ছেটা দিলে যা হয় তেমন লাগে "বাংলায় ডিটেনশন ক‍্যাম্প হলে গুড়িয়ে দেব, বাংলায় এন আর সি করতে হলে আমাদের লাশের ওপর দিয়ে করতে হবে"। কিন্তু কথা হলো কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার অসম শাখায় এতো চুপচাপ কেন? ঠিক বুঝে ওঠতে পারলাম না। সবার মত তো এক হওয়ার কথা ছিল, তবে দ্বিমত কেন কমরেডগন। অসম কি ভারতের বাইরে? না কি,ভারতীয় কমিউনিস্ট চিন্তা ও অসমের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে? ঠিক বুঝতে পারছি না।

            (২)

ডিটেনশন ক্যাম্প! সভ্য মানুষের মাথা বিগড়ে দেওয়া দুটি শব্দ! যেখানে নরক যন্ত্রণা পেয়ে মৃত্যুকে আপন করে নেয় সাধারণ নিরপরাধী মানুষেরা!  নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মতো ভারতের সর্বত্র গড়ে উঠছে ডিটেনশন ক্যাম্প। ভাবছেন কারা থাকবে? ঐ তো দুলাল চন্দ্র পাল, প্রভা রায়, হুশেন আলী, সুন্দর  মোহন রায়, নগেন দাস,বাসুদেব বিশ্বাস,জব্বার আলি,সুরজ আলি,সন্তোষ বিশ্বাস, নজরুল ইসলাম,ইসমাইল তালুকদার,প্রভা রায়, সু্ব্রত দে,পুনা মুণ্ডার মতো যে শ্রমজীবী মানুষরা যারা ডিটেনশন ক্যাম্পে প্রাণ হারালেন, তাদের মতো শ্রমজীবী মানুষরা। তারা কী করবেন? তারা আমেরিকার জেল ব্যবসার কয়েদী কালো আদমির মতো বহুজাতিক নাইক কোম্পানীর জোতা বানানোর কাজে বেগার খাটবেন ও বেঘোরে তিলে তিলে প্রাণ হারাবেন।

অসমিয়া গণতান্ত্রিক সমাজ ডিটেনশন ক্যাম্পের বিরোধী, তাঁরা অসমকে মানবতার বধ্যভূমি বানাতে চান না। ১৯ লাখ এনআরসি-ছুটদের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের মতো একটা বিপদজনক জায়গায় পাঠানোর তাঁরা বিরোধী কিনা এখনও জানা যায়নি। এফটি একটি ন্যায়িক ব্যবস্থা নয়, সেখানে এই গরিব মেহনতি মানুষের কী পরিণতি হবে তা অনিশ্চিত। কিন্তু দুলাল পরিবারের লড়াইয়ের মোক্ষম সময় তারা ডিটেনশন ক্যাম্পের বিরুদ্ধে সময়ের দাবির চাইতে কম সোচ্চার হওয়াটা সত্যিই পীড়াদায়ক।

তেজপুর ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি অবস্থায়  বছর ৬৫'র দুলাল পালের বিনা চিকিৎসায় অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তাতে আমাদের কি? উনি কি আমার পরিবারের কেউ? তবে আমি কেন দুঃখিত হব। ঠিক আছে, মর্মাহত হয়েছি। আজ অফিস থেকে ফেরার পথে বন্ধু বলল "আমার পরিবারের নাম এন আর সি তালিকায় এসেছে পুরো শুদ্ধ বানানে। আমি উইপোকা নই, ঘুসপেটিয়া নই । কাজেই আমার চিন্তার কারণ নেই, নো টেনশন । আমার আবার কিসের চিন্তা। ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি যারা রয়েছে এ নিয়ে তাদের পরিবার ভাবুক না।" তো এতেই আমরা আনন্দিত!  শোণিতপুরের ঢেকিয়াজুলির আলিশিঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা ৬২ বছরের বৃদ্ধ দুলাল চন্দ্র পালকে তেজপুরের ডিটেনশন  ক্যাম্পে বন্ধি করা হয়। দুইটা বছর এই হিটলারী কনসেনট্রেশ ক্যাম্পে তাকে ঠেলে দেয়া হয়েছে মৃত্যু পথে।
       
            (৩)

দুলাল পালকে বিদেশী ঘোষণা করে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের যে অর্ডার বেরিয়েছিল সেটা এবং পরে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের অর্ডারকে বহাল রেখে  গৌহাটি হাইকোর্টের ১৮/০১/২০১৯ তারিখের যে রায়, সেখানে লিখা ---
১৯৬৫ সনের জমির নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও মুল যে কারণে দুলাল পালকে বিদেশী ঘোষণা করা হয় তা হলো উনি যে ১৯৬৫ থেকে ১৯৯৩ অবধি ভারতে স্বাভাবিক ভাবে থাকার কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেন নি। "Considering entire materials on record and also discussion made above it is appeared that OP unable to produced any documents in this case to prove that either father of OP or OP ordinarily resided in Assam since 1965 till to 1993"। আশ্চর্যজনকভাবে ১৯৬৫  সনের জমির কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের অর্ডারে বলা হয় যে উনি ২৫/৩/১৯৭১ এর পরে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে এসে আসামে বসবাস করছেন এবং এই কারনেই উনি বিদেশি।  "Further it appears that OP ....... entered into Assam//India without authority subsequent to 25/3/1971and hence he is termed to be a foreigner/ illegal migrant of post 25/3/1971 stream. The case is decided accordingly." উল্লেখযোগ্য যে গ্রাম পঞ্চায়েত এবং গাওবুড়ার কিছু নথিপত্র অগ্রাহ্য করা হয় এই কারন দেখিয়ে যে যারা এইসব সার্টিফিকেট ইসু করেছিলেন উনারা কোর্টে এসে সাক্ষী দিয়ে এই  নথিপত্রের সত্যতা প্রমাণ করেন নি। হাইকোর্টের রায়ে একই কারণ দেখানো হয়েছে।

একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এনারসি এবং ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়াতে বেশ কিছু পার্থক্য আছে। আসামের ক্ষেত্রে এনারসি তে নাম সন্নিবিষ্ট করতে শুধু দুটো কাগজ দেখাতে হয় -১) ২৫/৩/১৯৭১ সনের আগে আসামে থাকার প্রমাণ (নিজের অথবা নিজের পূর্বপুরুষের) এবং ২) ১৯৭১ এর আগে নিজের কোনো নথিপত্র না থাকলে পূর্বপুরুষের নথিপত্র দেখাতে হবে এবং একই সাথে পূর্বপুরুষের সাথে সংযোগকারী নথিপত্র দেখাতে হবে। এর বিপরীতে, নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের  প্রক্রিয়া আরও বিশদ। এটাও প্রমাণ করতে হবে যে একজন সাধারণ ভাবে আসামে অথবা ভারতবর্ষে বসবাস করছেন কি না। আসামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাগরিকত্ব আইনের ধারা 6A (2) অনুযায়ী - " Subject to the provisions of sub-sections (6) and (7), all persons of Indian origin who came before the 1st day of January, 1966 to Assam from the specified territory (including such of those whose names were included in the electoral rolls used for the purposes of the General Election to the House of the People held in 1967) and who have been ordinarily resident in Assam since the dates of their entry into Assam shall be deemed to be citizens of India as from the 1st day of January, 1966." এখন প্রশ্ন হলো একজন সাধারণ গরীব শ্রেণীর মানুষের পক্ষে নথিপত্র দেখিয়ে কিভাবে প্রমান করা সম্ভব যে he or she has been ordinarily resident in Assam since the date of entry? যারা স্কুল বা কলেজে পড়াশোনা করেছেন অথবা যারা চাকরি করেন তাদের জন্য এই প্রমাণ যোগাড় করা হয়তো সম্ভব।  কিন্তু অশিক্ষিত, ভূমিহীন, গরীব শ্রেণীর মানুষদের পক্ষে সম্ভব কি? নথিপত্র দেখিয়ে ভারতবর্ষের কতজন গরীব শ্রেণীর মানুষ প্রমাণ করতে সক্ষম হবেন যে they have ordinarily resided in India since birth? এই অবস্থায় গ্রাম পঞ্চায়েত সার্টিফিকেটও যদি গ্রহনযোগ্যতা না পায় তার মানেই কি ওরা বিদেশি? বাস্তবকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে এইভাবে মুলত প্রান্তিক মানুষদের বিদেশি ঘোষণা করা কতটুকু  মানবিক?




----- শুধু কাগজ দেখিয়ে এনআরসি, ডি, ডিটেনশন ক‍্যাম্পের আক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়া যাবেনা, প্রয়োজন এক সঙ্ঘবদ্ধ গণ আন্দোলন, যা শাসকের রাতের ঘুম উড়িয়ে দেবে। অনেক সহ্য করা হয়েছে, আর নয়; এবার চোখের জলকে বারুদে পরিণত করার সময়, সব হিসাব এবার আমাদেরও বুঝে নিতে হবে।
তথ‍্যঋণ : লিখেছেন অরূপ বৈশ‍্য ( https://www.tarangabarta.com/assam-and-d/)
                শেষাংশ ও ছবি Debasish দা'র ওয়াল থেকে।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...