যাইহোক আর একটু শ্বাস ফেলার সময় পাওয়া গেলো। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন। ৩১ জুলাই থেকে ৩১ আগষ্ট হয়েছে। রাজ্য জুড়ে ব্যাপক বন্যার ফলে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে চুড়ান্ত খসড়া প্রকাশের তারিখ। আর একটু একটু করে যত এগিয়ে আসছে দিন। আক্ষরিক অর্থে ভয়ে শুকিয়ে যাচ্ছি। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মতে অনেক বিদেশীদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাই সময় বর্ধিত হওয়ায় একটু সুযোগ পাওয়া যাবে। ওই তালিকায় নাম না থাকলে হয়ে যাব অনাগরিক। তারপর ডিটেনশন ক্যাম্প। তালিকায় নাম না থাকলে জন্মস্থানের কোনো গুরুত্ব নেই। বলতে পারেন মানুষের চেয়ে রাষ্ট্র যখন বড় হয়ে ওঠে, তখন দেশ থাকে না আর। আছে শুধু ডিটেনশন ক্যাম্প।, এই ক্যাম্প দেশহীনদের জন্য তৈরি হয়েছে। আমরা তো ইহুদিদের কথা পড়েছি, নাৎসিবাহিনীর কথাও। বাসব দা'র একটা প্রবন্ধে পড়েছিলাম এক কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের কাহিনির কথা। ওই ক্যাম্পে নাৎসিবাহিনী মজা করার জন্য এক সত্তর বছরের বৃদ্ধকে বলে, তাদের সামনে তার মেয়ের সঙ্গে যৌনসঙ্গম করতে হবে। প্রাণে বাঁচতে সেই বৃদ্ধ যখন তার মেয়ের সঙ্গে যৌনসঙ্গম শুরু করে, নাৎসিবাহিনীর লোকরা বৃদ্ধের লিঙ্গ কেটে নেয়। উফফ্ .....
না, না এখানে তা শুরু হয়নি। হলেও বা কিচ্ছু করার নেই। আমি তালিকাভুক্ত নই, আমার দেশ নেই, পরিচয় নেই। কী করতে পারি আমি? যা হবে তা মাথা পেতে নেওয়াটাই বাঞ্চনীয়। কি বলেন!
আমরা জানি অসমে এনআরসি নবায়নের আধার অসম চুক্তির ৬ নম্বর ধারা। আটের দশকের প্রথমদিকে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন হয়েছিল অসমে। ওই আন্দোলন থামাতে রাজীব গান্ধী চুক্তি করেন প্রফুল্ল মহন্ত ও ভৃগু ফুকনের সঙ্গে। তখনই ঠিক হয়, ১৯৭১ সালের পরে যাঁরা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, তাঁরা বিদেশি। চলতি এনআরসি নবায়ন প্রক্রিয়ার শেষপর্বের নির্দেশ হয়েছে অসমে। কেউ যদি বিদেশি হন, তাহলে তাঁর ছেলেমেয়েও বিদেশি হবেন। অর্থাৎ, ধরা যাক, আমার বাবা বিদেশি, ১৯৭২ সালে অসমে এসেছেন। আর আমি জন্মেছি ১৯৭৩ সালে। বাবা বিদেশি বলে আমিও বিদেশি হয়ে যাব। বাবার অপরাধে (যদি অপরাধ হয়) শাস্তি পাবে সন্তান। এটা কোন আইনে সম্ভব জানি না। কিন্তু ভারতের অন্যান্য রাজ্যে এনআরসি হোক ভারতীয় নাগরিকত্ব আইনের ভিত্তিতে। অর্থাৎ জন্মসূত্রে ভারতীয়, বিবাহসূত্রে ভারতীয়, একটানা ৬ বছর থাকলে ভারতীয়। তাহলে বাবা বিদেশি হলেও, সন্তান যদি ভারতে জন্মায়, সে ভারতীয় নাগরিক।
এনআরসি প্রক্রিয়া চলাকালীন কেন্দ্রীয় সরকার সিটিজেন অ্যামেন্ডমেন্ট বিল (সিএবি বা সংক্ষেপে ক্যাব) আনে। এর পর থেকে অসমের এনআরসি সেবাকেন্দ্রের লোকজনের ব্যবহারও একটু বদলে যায়। দ্বিতীয় খসড়া তালিকায় যে ৪০ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছিল, তাঁদের মধ্যে ৩৬ লক্ষ পুনরাবেদন করেছেন। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুনরাবেদনের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর যেসব মুসলমান এদেশে এসেছেন, তাঁরা তো আইনানুযায়ী বিদেশিই, ক্যাব আইনে পরিণত হলে ওই সময়ের পর যেসব হিন্দু এদেশে বা বলা যায়, এই রাজ্যে মানে অসমে, এসেছেন সবাই নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন। আর একথা কে না জানে, বাংলাদেশ থেকে কোনো হিন্দু ভারতে এলে তিনি বাঙালিই হবেন।
আসামের সব ফরেনার্স ডিটেনশন ক্যাম্প নাকি গুঁড়িয়ে দেবে-এমনই আশ্বাস দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদী। এছাড়াও মোদীর নানারকমের জনকল্যাণমুখী প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাস করে বিপুল সংখ্যক মানুষ ব্যাপকহারে ভোট দিয়ে তাঁর প্রধানমন্ত্রী পদকে সুনিশ্চিত করেছিল। কিন্তু তাঁর প্রতিশ্রুতিগুলো যে মিথ্যে, মোদী তা দ্রুতগতিতে প্রমাণ করে চলেছেন। নির্বাচনী আশ্বাসের ঠিক উল্টোটাই দেখা যাচ্ছে - নতুন করে গড়া হচ্ছে বিদেশি বন্দিশালা। আসাম সরকারের বিদেশি ট্রাইব্যুনালে শনাক্ত হওয়া ‘বিদেশি’ নাগরিকদের জন্য রাজ্যে ইতিমধ্যেই ছয়টি বন্দিশালা রয়েছে, যেখানে সরকারের দ্বারা চিহ্নিত ‘অবৈধ’ বিদেশিদের রাখা হয়, যারা মূলতঃ বাংলাভাষী। আসামের মানবাধিকার সংগঠনের দাবি, এই বন্দিশালা আসলে মৃত্যুপুরী। কোন সুস্থ পরিকল্পনা ছাড়াই চরম অব্যবস্থার মধ্যে ডিটেনশান ক্যাম্পগুলিতে ‘বিদেশি’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে নাগরিকদের আটকে রাখা হয়। একই পরিবারের লোকদের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে রাখা হয়। এ বছরের ৩১শে জুলাইয়ের মধ্যে বিতর্কিত এনআরসি'র চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হবে। এবার অন্ততঃ ৯লাখ আসামবাসীর গায়ে 'বিদেশী' তকমা লাগছে। তাই আসাম সরকার তাদের বন্দিশালায় ঢোকানোর বন্দোবস্ত করতে চাইছে। ইতিমধ্যে সেখানকার ছয়টি বন্দিশালায় থাকা ৯৮৬জন আবাসিকের প্রায় সবাই ধর্মীয় ও ভাষিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য। শুধু গোয়ালপাড়ায় তিন হাজার 'বিদেশি' থাকার উপযুক্ত বন্দিশালা বানাতে ৪৬কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ এনআরসি তালিকা প্রকাশের আগেই আসাম সরকার আরও বন্দিশালা বানাতে চলেছে, কারণ পক্ষপাতদুষ্ট ও অমানবিক এনআরসি প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ মানুষ তাদের নাগরিকত্ব হারাতে চলেছেন। নতুন করে আরও ২০০ টি বিদেশি ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের ও দশটি ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরীর পথে এগোচ্ছে মোদী সরকার। এই খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে সারা অসম বাঙালি ঐক্যমঞ্চ প্রশ্ন তুলেছে, ক্ষমতাসীন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে এই ডিটেনশন ক্যাম্প কাদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে?
নাগরিকত্বের নামে এক অবর্ণনীয় অত্যাচার চলেছে, যার ফলে বহু মানুষ হারাচ্ছেন তাদের মানসিক ভারসাম্য, চরম আশঙ্কায় অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। মোদী সরকারের এই এনআরসি নিয়ে চূড়ান্ত ছেলেখেলায় নারকীয় যন্ত্রণার শিকার হচ্ছে লাখো গরিব মানুষ। এনআরসি-র নাম করে হিন্দুদের ‘শরণার্থী’ আর মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসাবে চিহ্নিতকরণের যে অন্যায় খেলা বিজেপি শুরু করেছে, তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলাটাই এখন প্রাথমিক কর্তব্য হিসাবে গণ্য হওয়া উচিৎ।
দেশটাকেই একটা ডিটেনশন ক্যাম্প বানিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে, অন্ততঃ বাঙালিদের জন্য তো বটেই! গত বছরই চল্লিশ লক্ষ মানুষকে নাগরিকত্ব হারাতে হয়েছে আসামে। এবার আরও ১ লক্ষ ২ হাজার ৪৬২ জনের নাম যুক্ত হলো ওই ৪০ লক্ষের সাথে। এবারে যেটা খানিক ব্যতিক্রম, আলাদা আলাদা করে জানানো হবে তালিকায় থাকা মানুষদের বাড়ির ঠিকানায় চিঠি দিয়ে। ব্যাপারটা হয়তো সাম্প্রতিক ব্যক্তি সন্ত্রাসবাদী বিল-র মতো করেই করতে চাইছে। যে চিঠি পাঠানো হবে তাতে কারণগুলোকে আলাদা করে দেখানো হবে, যাতে একসাথে সরকারের ওপর চাপ তৈরী না হয়। বিপুলসংখ্যক সমর্থন নিয়ে ভারতের মসনদে এসে এখন যা খুশী তাই করতে পারে বলে মনে করছে মোদী সরকার। Schedule of the Citizenship Rules 2003-র অনুচ্ছেদ ৫ অনুসারে, এইসব মানুষ নাগরিকত্ব হারিয়েছেন। আইন তৈরী করে ও তাকে মর্জিমাফিক সংশোধন করে মানুষকে রাষ্ট্রহীন করার মতো অমানবিক কাজ করে মোদী সরকার বিশ্বের সামনে এক ঘৃণ্য নজির সৃষ্টি করেছেন। ঘোষিত ভিনদেশী বা সন্দেহজনক নির্বাচক তকমা দিয়ে এভাবেই দেশের মানুষকে নিজভূমে পরবাসী করার খেলায় মেতেছে। ডিটেনশন ক্যাম্পের দুঃসহ দিন, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, আত্মহত্যা; এসবের সাথে আরও লক্ষাধিক বাঙালি যুক্ত হলো।
এ ভূমি স্বদেশ না বিদেশ, জানা হয়নি অনেক মানুষেরই। ইতিহাসের পর্যালোচনায় না গিয়ে এটুকু বলা যায়, ডি-ভোটার তারাই হচ্ছেন, ডিটেনশন ক্যাম্পেও তারাই যাচ্ছেন, মূলত যারা গরীব মুসলমান কিংবা হিন্দু সম্প্রদায়ের, যাদের ঘর ভেসে যায় প্রতিবছর বানে এবং নদীধ্বসে। নো-ম্যানস ল্যান্ডের দিকে পা বাড়িয়ে আছেন এই সব মানুষ। এই ৪২ লক্ষ মানুষকে অত্যন্ত সুচতুর বিশ্লেষন করেই এই বিলের আওতায় আনা হয়েছে। আইএমডিটি অ্যাক্টের দুর্বলতা সংশোধন করে, তাকে বিদেশী বিতাড়নের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে তৈরী করা হয়েছে। দেশভাগের অভিশপ্ত যন্ত্রণাভোগী ছিন্নমূল বাঙালির সামনে এখন প্রশ্ন, তারা কি ডিটেনশন ক্যাম্পের দুঃসহ দিন কাটাবেন? আত্মহত্যা করবেন? মৌলিক অধিকার হারাবেন? নাকি ঘুরে দাঁড়াবেন? এই ‘রাষ্ট্রহীন’ মানুষগুলোর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নাগরিক সুরক্ষার ভার কে নেবে? তাদের স্ট্যাটাস কি হবে?
এই অভূতপূর্ব মানবিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, এই মুহূর্তে সচেতনভাবে জাত ও ধর্মভিত্তিক বিদ্বেষ সৃষ্টির প্রতিবাদ করতে, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সমবেত প্রয়াস জরুরী। শ্রমজীবী মানুষকে ভুল বুঝিয়ে তাদের মধ্যে বিভাজন তৈরী করার স্বার্থে এনআরসি বা ‘নাগরিক সংশোধনী বিল, ২০১৬’ কে হাতিয়ার করছে এই চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল সরকার। দাবি তুলুন, সোচ্চার হোন; বাতিল করতে হবে এই এনআরসি ও ‘সিটিজেনশিপ বিল’, যা বিশেষভাবে বাঙালিদের বিনাশ করার চক্রান্ত ছাড়া কিছু নয়। আসুন, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সামিল হই। প্রতিরোধ গড়ি এই ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে। কে হে তুমি, উপর্যুপুরি দ্বিতীয়বার সংসদীয় ক্ষমতা দখলের উন্মত্ততায় ‘ধরা কে সরা জ্ঞান’ করতে চাইছো? দেশের সামাজিক - সাংস্কৃতিক চরিত্র বদলে ফেলার অপচেষ্টা, ইতিহাসকে বিকৃত করার এই চক্রান্ত ব্যর্থ করতেই হবে যে কোনো মূল্যে। সমস্ত শুভবোধসম্পন্ন মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধে সামিল হয়ে, এই অপশক্তিকে সমূলে উৎপাটন করতে না পারলে, ইতিহাস কিন্তু এই প্রজন্মকে ক্ষমা করবে না।
খেটে খাওয়া গরীব মানুষগুলো গোটা বিশ্বজুড়ে ক্ষমতা ভাগাভাগির যুগে জানের ও পেটের দায়ে পেরিয়েছেন সীমান্তের কাঁটাতার। শিক্ষা তো দূর, দুবেলা দু-মুঠো খেতে পায়না; তারা কিভাবে যোগাড় করবেন বৈধ নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র? ধূর্ত সরকার বলে, এনআরসি-তে নাম আছে বলে ভোটার তালিকায় নাম থাকবে না, এমনটা নয়। কতোটা অমানবিক, স্বৈরাচারী হলে একথা বলা যায়! বৈধ আর অবৈধর মধ্যে নিত্য নতুন গন্ডি টানে রাষ্ট্র। মানুষ বৈধতা প্রমাণের জন্য রাষ্ট্রের দুয়ারে লাইন দেয়। পরিচয় হারানো মানুষগুলোকে করজোরে সরকারকে বলতে হয়; এই দেশটা আমাদেরও। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কোনো অধিকার নেই এ দেশের নাগরিককে বে-নাগরিক করার। রাস্তায় নেমে প্রতিরোধ না করলে, জাতীয় নাগরিকপঞ্জিকে হাতিয়ার করে বাঙালির অস্তিত্বকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে হিন্দু হিন্দি হিন্দুস্তান বেশধারী নরেন্দ্র মোদী সরকার।