Tuesday, May 7, 2019

প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথ


অন্তর মম বিকশিত করো
অন্তরতর হে।
নির্মল করো, উজ্জ্বল করো
সুন্দর করো হে!
আজ ২৫শে বৈশাখ সেই সুন্দরের উপাসক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভ জন্মদিন। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে বাবা দেবেন্দ্রনাথ ও মা সারদা দেবীর কোল আলো করে ধুলির ধরায় গুরুদেবের আগমন ঘটেছিল। ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ দিয়ে যার দর্শনকথার শুরু তার গৌরবময় পরিসমাপ্তি ঘটে ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করে/ বিচিত্র ছলনা জালে হে ছলনাময়ী’র-মধ্য দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে অনেক লেখা আছে, থাকবে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে নানা মানুষ লেখেন। লেখার কি শেষ আছে? রবীন্দ্রনাথকে মেলে ধরা সহজ কোন কাজ নয়। তবু তাঁকে জেনে বুঝে আর তাঁকে নিয়ে লিখতে চান এমন মানুষদেরও অভাব নেই। আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে কিছু লেখা হয়তো আমার ধৃষ্টতা হবে, তবু লিখছি।
আলংকারিক অর্থে জনক কথাটা এমনই যত্রতত্র ব্যবহার হচ্ছে যে আমার মন বলতে চায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা প্রবন্ধের জনক। বিদ্যাসাগরের আগে প্যারিচাঁদ মিত্র 'ডেভিড হেয়ারের জীবনচরিত' প্রবন্ধ রচনা করেন। একদিকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ভুদেব মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিবনাথ শাস্ত্রী, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, প্রমথ চৌধুরীর  মাঝে রবীন্দ্রনাথও রয়েছেন এক বড় প্রাবন্ধিক হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবন্ধসাহিত্য বিশাল। আয়তন অনুযায়ী তা পাঠকের তেমন মনোযোগ আকর্ষণ করেনি। রবীন্দ্রনাথ রচনাবলির প্রবন্ধের বর্ণানুক্রমিক তালিকা লক্ষ করা যায় অক্ষয় চন্দ্র চৌধুরী থেকে হিসাব পর্যন্ত কবি আট শতের অধিক প্রবন্ধ রচনা করেন। তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে যেমন 'অক্ষয় চন্দ্র চৌধুরী' জীবনস্মৃতি থেকে এবং 'গ্রহলোক' বিশ্বপরিচয় থেকে নিয়ে প্রবন্ধ তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, সাহিত্য, কাব্য, ছন্দ, কৌতুক, আত্মা, ছবি, রূপ, অরূপ সৌন্দর্য, জগৎ, ধর্ম, উপনিষদ ইতিহাস, মহৎ ব্যক্তি, দেশহিতৈষা, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, ভারতীয় সভ্যতা, বাংলা সাহিত্য, বিশ্বসাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর অসংখ্য প্রবন্ধ রচিত হয়। তাঁর বক্তৃতা ও অভিভাষণগুলোও প্রবন্ধ হিসেবে চিহ্নিত। এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের সুভাষিতগুলো তিনটি গ্রন্থ সংকলিত হয় : রবীন্দ্র প্রবন্ধে সংজ্ঞা ও পার্থক্যবিচার, রবীন্দ্ররচনার রবীন্দ্রব্যাখ্যা ও রবীন্দ্রবাক্যে আর্ট, সংগীত ও সাহিত্য।

২৯ আগস্ট ১৯৩৯ সালের শান্তিনিকেতনে প্রদত্ত এক ভাষণে কবি বলেন, 'কাব্যভাষার একটা ওজন আছে, সংযম আছে; তাকেই বলে ছন্দ। গদ্যের বাছবিচার নেই, সে চলে বুক ফুলিয়ে। সেই জন্যই রাষ্ট্রনীতি প্রভৃতি প্রাত্যহিক ব্যাপার প্রাঞ্জল গদ্যে লেখা চলতে পারে। কিন্তু গদ্যকে কাব্যের প্রবর্তনায় শিল্পিত করা যায়। তখন সেই কাব্যের গতিতে এমন কিছু প্রকাশ পায়, যা গদ্যের প্রাত্যহিক ব্যবহারের অতীত। গদ্য বলেই এর ভেতরে অতিমাধুর্য-অতিলালিত্যের মাদকতা থাকতে পারে না। কোমলে-কঠিনে মিলে একটা সংযত রীতির আপনা-আপনি উদ্ভব হয়। নটীর নাচে শিক্ষিতপটু অলংকৃত পদক্ষেপ। অপর পক্ষে, ভালো চলে এমন কোনো তরুণীর চলনে ওজন-রক্ষার একটি স্বাভাবিক নিয়ম আছে। এই সহজ সুন্দর চলার ভঙ্গিতে একটা অশিক্ষিত ছন্দ আছে, যে ছন্দ তার রক্তের মধ্যে, যে ছন্দ তার দেহে। গদ্যকাব্যের চলন হলো সেই রকম- অনিয়মিত উচ্ছৃঙ্খল গতি নয়, সংযত পদক্ষেপ।'

১৩০১ সালে 'প্রাঞ্জলতা' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে বলেন : 'আমাদের বাংলা ভাষায়, কি খবরের কাগজে, কি উচ্চ শ্রেণীর সাহিত্যে সরলতা এবং অপ্রমত্ততার অভাব দেখা যায়- সকলেই অধিক করিয়া, চীৎকার করিয়া এবং ভঙ্গিমা করিয়া বলিতে ভালোবাসে, বিনা আড়ম্বরে সত্য কথাটি পরিষ্কার করিয়া বলিতে কাহারও প্রবৃত্তি হয় না। কারণ এখানে আমাদের মধ্যে একটা আদিম বর্বরতা আছে; সত্য প্রাঞ্জল বেশে আসিলে তাহার গভীরতা এবং অসামান্যতা আমরা দেখিতে পাই না, ভাবের সৌন্দর্য কৃত্রিম ভূষণে এবং সর্বপ্রকার আতিশয্যে ভারাক্রান্ত হইয়া না আসিলে আমাদের নিকট তাহার মর্যাদা নষ্ট হয়।'

বাংলা সাহিত্যে পৌরুষের অভাব ও পীড়াদায়ক ভাবরসের প্রাচুর্য লক্ষ করে রবীন্দ্রনাথ নিরাশ হননি, অতীতে দৈন্যকে উপেক্ষা করে তিনি যে আশার বাণী শোনালেন তা আজও প্রেরণার উৎস : '... সমাজ যখন পরিব্যাপ্ত ভাবাবেগে নিজের অবস্থাবন্ধনকে লঙ্ঘন করিয়া আনন্দে ও আশায় উচ্ছ্বসিত হইতে থাকে, তখনই সে হাতের কাছে যে তুচ্ছ ভাষা পায় তাহাকেই অপরূপ করিয়া তোলে, যে সামান্য উপকরণ পায় তাহার দ্বারাই ইন্দ্রজাল ঘটাইতে পারে। এইরূপ অবস্থায় যে কী হইতে পারে ও না পারে তাহা পূর্ববর্তী অবস্থা হইতে কেহ অনুমান করিতে পারে না।'

তাঁর 'আত্মপরিচয়' রবীন্দ্রনাথ নিজের রচনার প্রাচুর্য সম্পর্কে উল্লেখ করে মন্তব্য করেন, 'আমি জানি, আমার রচনার মধ্যে সেই নিরতিশয় প্রাচুর্য আছে, যাহা বহুপরিমাণে ব্যর্থতা বহন করে। অমরত্বের তরণীতে স্থান বেশি নাই, এই জন্য বোঝাতে যতই সংহত করিতে পারিব বিনাশের পারের ঘাটে পৌঁছিবার সম্ভাবনা ততই বেশি হইবে। মহাকালের হাতে আমরা যত বেশি দিব ততই বেশি সে লইবে, ইহা সত্য নহে। আমার বোঝা অত্যন্ত ভারী হইয়াছে- ইহা হইতেই বোঝা যাইতেছে ইহার মধ্যে অনেকটা অংশে মৃত্যুর মার্কা পড়িয়াছে।'

প্রমথ চৌধুরীকে এক পত্রে রবীন্দ্রনাথ বলেন : 'শাস্ত্রে আছে মৃত্যুতেই ভবযন্ত্রণার অবসান নেই, আবার জন্ম আছে। আমাদের যে লেখা ছাপাখানার প্রসূতিঘরে একবার জন্মেছে তাদের অন্ত্যেষ্টি সৎকার করলেও তারা আবার দেখা দেবে। অতএব সেই অনিবার্য জন্ম-প্রবাহের আবর্তন অনুসরণ করে প্রকাশকেরা যদি বর্জনীয়কে আসন দেন সেটাকে দুষ্কর্ম বলা চলবে না।' প্রবন্ধের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'ঘুষাঘুষি' প্রবন্ধে বলেন : 'ছবিতে যেমন চৌকা জিনিসের চারিটা পাশই একসঙ্গে দেখানো যায় না, তেমনি প্রবন্ধেও একসঙ্গে একটি বিষয়ের একটি, বড়োজোর দুইটি দিক দেখানো চলে।'
আবার 'পত্রালাপে' তিনি বলেন, 'নিজের নাসাগ্রভাগের সমসূত্র ধরে ভূমিকা থেকে উপসংহার পর্যন্ত একেবারে সোজা লাইনে চললে নিতান্তকলে- তৈরি প্রবন্ধের সৃষ্টি হয়, মানুষের হাতের কাজের মতো হয় না। সে রকম আঁটাআঁটি প্রবন্ধের বিশেষ আবশ্যক আছে, এ কথা কেউ অস্বীকার করিতে পারে না; কিন্তু সর্বত্র তারই বড়ো বাহুল্য দেখা যায়। সেগুলো পড়লে মনে হয় যেন সত্য তার সমস্ত সুসংলগ্ন যুক্তিপরম্পরা নিয়ে একেবারে সম্পূর্ণভাবে কোথা থেকে আবির্ভূত হলো। মানুষের মনের মধ্যে সে যে মানুষ হয়েছে, সেখানে তার যে আরো অনেকগুলি সমবয়সী সহোদর ছিল, একটি বৃহৎ বিস্তৃত মানসপুরে যে তার একটি বিচিত্র বিহারভূমি ছিল, লেখকের প্রাণের মধ্যে থেকেই সে যে প্রাণ লাভ করেছে, তা তাকে দেখে মনে হয় না; এমন মনে হয় যেন কোনো ইচ্ছাময় দেবতা যেমন বললেন, 'অমুক প্রবন্ধ হউক' অমনি অমুক প্রবন্ধ হলো : 'লেট দেয়ার বি লাইট অ্যান্ড দেয়ার ওয়াজ লাইট।'
প্রবন্ধে সংজ্ঞা রচনার গুরুত্ব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'সংজ্ঞা রচনা করা যে দুরূহ তাহার প্রধান কারণ এই দেখিতেছি যে, একটি কথার সহিত অনেকগুলি জটিল ভাব জড়িত হইয়া থাকে, লেখকেরা সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞার মধ্যে তাহার সকলগুলি গুছাইয়া লইতে পারেন না- অনবধানতা দোষে একটা না একটা বাদ পড়িয়া যায়।'

রবীন্দ্র প্রবন্ধে সংজ্ঞা ও পার্থক্যবিচারে এর ভূমিকায় আমি বলি, 'লেখক তাঁর প্রবন্ধের যুক্তিসম্বন্ধ প্রতীয়মান করতে গিয়ে কোনো ক্ষেত্রে একটি শব্দ ব্যবহারের পূর্বে তার একটি সংজ্ঞা দিয়ে থাকেন, আবার কোনো ক্ষেত্রে দুটি সমার্থক শব্দ বা দুটি বিপরীতার্থক শব্দের পার্থক্য-নির্দেশ করে নিজের বক্তব্যকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। গদ্য ও পদ্যের পার্থক্য রয়েছে, সে সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ বেশ সচেতন ছিলেন। গদ্য লেখার সময় তিনি রীতিমত (তাঁর কথায়) লড়াই করতেন।'"
বাংলাভাষা পরিচয়ে কবি বলেন, 'খাঁটি বাংলা ছিল আদিম কালের সে বাংলা নিয়ে এখনকার কাজ ষোলো-আনা চলা অসম্ভব।' তাঁর কথা 'আমাদের শিক্ষার ক্ষেত্র যতই বাড়ছে ততই দেখতে পাচ্ছি, আমাদের চলতি ভাষার কারখানায় জোড়তোড়ের কৌশলগুলো অত্যন্ত দুর্বল।' তবে তিনি বলছেন, 'এ কথাও জেনে রাখা ভালো, খাস বাংলায় এমনসব বলবার ভঙ্গী যা আর কোথাও পাওয়া যায় না।' তাঁর কথা : 'আমাদের বোধশক্তি যে শব্দার্থজালে ধরা দিতে চায় না, বাংলা ভাষা তাকে সেই অর্থের বন্ধন থেকে ছাড়া দিতে কুণ্ঠিত হয়নি, আভিধানিক শাসনকে লঙ্ঘন করে সে বোবার প্রকাশ-প্রণালীকেও অঙ্গীকার করে নিয়েছে।'

১৩৪১ সালের বৈশাখে রবীন্দ্রনাথ 'গদ্যছন্দ' প্রবন্ধে বলেন, ''আজ সরস্বতীর আসনই বল, আর তাঁর ভাণ্ডারই বল, প্রকাণ্ড আয়তনের। সাবেক সাহিত্যের দুই বাহন, তার উচ্চৈঃশ্রবা আর তার ঐরাবত, তার শ্রুতি ও স্মৃতি; তারা নিয়েছে ছুটি। তাদের জায়গায় যে যান এখন চলল, তার নাম দেওয়া যেতে পারে লিখিতি। সে রেলগাড়ির মতো, তাতে কোনোটা যাত্রীর কামরা কোনোটা মালের। কোনোটাতে বস্তুর পিণ্ড, সংবাদপুঞ্জ, কোনোটাতে সজীব যাত্রী অর্থাৎ রসসাহিত্য। তার অনেক চাকা, অনেক কক্ষ; একসঙ্গে মস্ত মস্ত চালান। স্থানের এই অসংকোচে গদ্যের ভূরিভোজ।' ২৫ চৈত্র ১৩০১ সালে 'বাংলা জাতীয় সাহিত্য'-এ রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'ছন্দের একটা অনিবার্য প্রবাহ আছে, সেই প্রবাহের মাঝখানে একেবারে ফেলিয়া দিতে পারিলে কবিতা সহজে নাচিতে নাচিতে ভাসিয়া চলিয়া যায়; কিন্তু গদ্যে নিজে পথ দেখিয়া গায়ে হাঁটিয়া নিজের ভারসামঞ্জস্য করিয়া চলিতে হয়, সেই পদব্রজ বিদ্যাটি রীতিমত অভ্যাস না থাকিলে চাল অত্যন্ত আঁকা-বাঁকা এলোমেলো এবং টলমলে হইয়া থাকে।'- বাংলা জাতীয় সাহিত্য ৮/৪১৮/৪১৯
হেমেন্দ্রবালা কেবীকে এক পত্রে রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'মানবের ধর্মবিষয়টা নিয়ে অঙ্ফোর্ডে বক্তৃতা দিয়েছিলুম, সেটা বই আকারে বেরিয়েচে। বাংলা ভাষায় বক্তব্যটা সহজ করে তোলা সহজ নয়, চেষ্টা করতে হচ্ছে খুব বেশি করে।'- চিঠিপত্র ৯/১৮৮

রবীন্দ্রনাথের গান বা কবিতা, সুর বা ছন্দ, যেভাবে আমাদের মনকে স্পর্শ করেছে, তেমন করে তাঁর প্রবন্ধ আমাদের মনে সাড়া দেয়নি। আমি অন্যত্র বলি, 'রবীন্দ্র-প্রবন্ধের বিস্ময়কর বাঁধুনি ও চিত্তাকর্ষক প্রসঙ্গ-বৈচিত্র্য তেমন যেন আদর পায়নি। রবীন্দ্র-বাক্য বেদবাক্য নয়, তাঁর বক্তব্য সকলে স্বীকার করে নেবেন এমন কথাও নয়। কারো কাছে তাঁর কথায় কোথাও অত্যুক্তি, আবার কোথাও ঊনোক্তি ধরা পড়বে। কারো কাছে আবার তাঁর মন্তব্য বিনয়বিরুদ্ধ, বক্তব্য যুক্তিশাস্ত্রের পরখে অশাস্ত্রীয়ও মনে হতে পারে।' তাঁর রাজনৈতিক মত সম্বন্ধে শচীন্দ্রনাথ সেন ইংরেজিতে একটি বই লেখেন- 'পলিটিক্যাল ফিলসফি অব রবীন্দ্রনাথ'। এই বই সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, 'বইখানি পড়ে আমি নিজের মতের ঠিক চেহারাটা পেলুম না।' ওই গ্রন্থের আলোচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রনৈতিক মত' প্রবন্ধে লিখেছিলেন : 'আমি জানি, আমার মত ঠিক যে কী তা সংগ্রহ করা সহজ নয়। বাল্যকাল থেকে আজ পর্যন্ত দেশের নানা অবস্থা এবং আমার নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দীর্ঘকাল আমি চিন্তা করেছি এবং কাজও করেছি। যেহেতু বাক্য রচনা করা আমার স্বভাব, সেইজন্যে যখন যা মনে এসেছে, তখনি তা প্রকাশ করেছি। রচনাকালীন সময়ের সঙ্গে, প্রয়োজনের সঙ্গে সেইসব লেখার যোগ বিচ্ছিন্ন করে দেখলে তার সম্পূর্ণ তাৎপর্য গ্রহণ করা সম্ভবপর হয় না। যে মানুষ সুদীর্ঘকাল থেকে চিন্তা করতে করতে লিখেছে তাঁর রচনার ধারাকে ঐতিহাসিকভাবে দেখাই সংগত।'

একদিকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, 'নিজের রচনা উপলক্ষে আত্মবিশ্লেষণ শোভন হয় না। তাকে অন্যায় বলা যায় এই জন্যে যে, নিতান্ত নৈর্ব্যক্তিকভাবে এ কাজ করা অসম্ভব- এইজন্য নিষ্কাম বিচারের লাইন ঠিক থাকে না।' আবার অপরদিকে নিজের লেখা সম্পর্কে ওকালতি করা ভদ্ররীতি নয় জেনেও প্রয়োজনে সেই প্রথার খাতিরে তাঁর দ্বারা ঔদাসীনের ভান করা হয়ে ওঠেনি। নিজের রচনা সম্বন্ধে বিচারক হওয়া বেদস্তুর জেনেও তিনি বলেছেন, দায়ে পড়লে ওকালতি করা চলে। আর বিপন্ন বোধ করলেও তিনি বেশ কোমর বেঁধেই ওকালতি করেছেন। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য বরাবরই বলে এসেছেন, ''নবসৃষ্টির যত দোষত্রুটিই থাকুক না কেন- মুক্তি কেবল ঐ কাঁটাপথেই- বাঁধা সড়ক গোলাপ ফুলের পাপড়ি দিয়ে মোড়া হলেও সে পথ আমাদের পৌঁছিয়ে দেবে শেষটায় চোরা গলিতেই।'' তাঁর মতে, অতীতকাল যত বড়ই হোক নিজের সম্বন্ধে বর্তমান কালের একটা স্পর্ধা থাকা উচিত, মনে থাকা উচিত তার মধ্যে জয় করবার শক্তি আছে। রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন কীর্তি থেকে প্রেরণা পেতে চেয়েছেন নিজের প্রাণে নবজন্মকে আহ্বান করার জন্য- নিজের চিত্তকে সাধনার বৃহৎ ক্ষেত্রে জাগরূক রাখবার জন্য। তার ওপর তিনি দাগা বুলোতে চাননি। তিনি বলতেন, ''অজন্তা কাংড়া ভ্যালি বা মোগল আর্টের উপর দাগা বুলিয়ে ব্যবসায়ী যাচনদারের কাছে ওরিয়েন্টাল আর্ট বলে খ্যাতি লাভ করলেও, এমন কেউ বেওকুফ নেই যে ঐ দাগা বুলিয়ে যাওয়াটাকেই শিল্প সাধনার চরম বলে মানবে।''

১৩৩৩ সালে 'সাহিত্য সম্মেলন' প্রদত্ত রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য দিয়ে এ প্রবন্ধের উপসংহার টানা যেতে পারে। 'বাংলাসাহিত্য আমাদের সৃষ্টি। এমন-কি, ইহা আমাদের নূতন সৃষ্টি বলিলেও হয়। অর্থাৎ ইহা আমাদের দেশের পুরাতন সাহিত্যের অনুবৃত্তি নয়। আমাদের প্রাচীন সাহিত্যের ধারা যে-খাতে বহিত, বর্তমান সাহিত্য সেই খাতে বহে না। আমাদের দেশের অধিকাংশ আচার-বিচার পুরাতনের নির্জীব পুনরাবৃত্তি। ... কেবল আমাদের সাহিত্যই নূতন রূপ লইয়া নূতন প্রাণে নূতন কালের সঙ্গে আপনযোগসাধনে প্রবৃত্ত। এইজন্য বাঙালিকে তাহার সাহিত্যই যথার্থভাবে ভিতরের দিক হইতে মানুষ করিয়া তুলিতেছে। ... বাঙালির চিত্তের আত্মপ্রকাশ একমাত্র বাংলা ভাষায়, এ কথা বলাই বাহুল্য। কোনো বাহ্যিক উদ্দেশ্যের খাতিরে সেই আত্মপ্রকাশের বাহনকে বর্জন করা, আর আর মাংস সিদ্ধ করার জন্য ঘরে আগুন দেওয়া, একই জাতীয় মূঢ়তা।'

Saturday, May 4, 2019

তোমার স্মরণে

আজ দার্শনিক, রাজনীতিবিদ, ‘দাস ক্যাপিটাল’-র স্রষ্টা কার্ল মার্কস-র ২০১তম জন্মদিন। যিনি মানবমুক্তির স্বপ্নই শুধু নয়, এই সমাজ পরিবর্তনের নির্দিষ্ট লক্ষ্যও বাতলেছেন, যা আজও মুক্তিকামী মানুষের দিশা হিসাবে সারা পৃথিবীব্যপী সমাদৃত। যিনি শেখান, সমস্ত ইতিহাসই আসলে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস-তখন তাঁর মেধা ও ধীশক্তিকে কুর্নিশ জানাতেই হয়। তিনি একজন প্রেমিকও, যিনি উজাড় করা উথালপাথাল ভালোবাসতে পারেন, প্রেয়সী জেনি-র উদ্দেশ্যে লিখতে পারেন কবিতা; যাতে ভালোবাসা শব্দের বুননে ওম-ভরা আলোয়ান তৈরি করে। আজ তাঁর কবিতাতেই তাঁকে স্মরণ -  

সান্ধ্যভ্রমন

কি দেখছ পাহাড়ের কিনারে দাঁড়িয়ে
কেন ফেলছ নম্র দীর্ঘশ্বাস
সূর্য আলো ছড়িয়ে বাতাসের ভিতর ডুবে যাচ্ছে
পাহাড়ের চূড়াকে চুম্বন করে জানাচ্ছে বিদায়।
এইসব তুমি আগে কখনও দেখ নি।
সূর্যের পরিধী ধীরে ধীরে বেড়েছে,
ভোরের আকাশ; তারপর দুপুর ...
এখন উপত্যকায় ডুবে যাচ্ছে।
সত্যিই ঐ আলো
ক্রিমসন রঙের ভাঁজ যেন।
তারপর তার অনিচ্ছুক চোখ চায় না যেতে
বাস করতে চায় নারীর কামনায়।
আমরা শান্তিতে হাঁটি। জেনির পায়ের শব্দে
খাড়ির কিনারায় প্রতিধ্বনি জাগে।
হালকা বাতাস চুমু দেয় ওর শালে;
ওর চোখ মধুর মেদুর।
আহ, প্রেম! আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
জেনি কাঁপছে রক্তিম গোলাপের মত,
আমি ওর হৃদয় স্পর্শ করি, নিচে অস্তমিত সূর্য –
প্রেক্ষাপট নক্ষত্রখচিত ...
এই জন্যই খাড়ির কাছে এসেছি,
এ জন্যই দীর্ঘশ্বাস ফেলি;
সন্ধ্যের আলো জ্বলে উঠলে ও ভেসে যায়
তারপর, ওপর থেকে ইশারায় ডাকে ।

জেনির প্রতি

শব্দরা-মিথ্যে আর অগভীর ছায়া ছাড়া আর কী!
চারপাশে জাগছে জীবন ...
তোমার ভিতর- মৃত ক্লান্ত এই আমি বইয়ে দেব
আমার ভিতরের সবটুকু শক্তি।
যদিও বিশ্বের ঈর্ষনীয় ঈশ্বর বহু আগে থেকেই
গভীর দৃষ্টিতে পরখ করে চলেছেন মানুষের অভ্যন্তরীন আগুন
এবং চিরদিন দরিদ্র মানব
ঈশ্বরের বুকের জ্যোর্তিময় সাংঘর্ষিক শব্দে আহত;
যেহেতু, আত্মার মধুর আলোকের প্রতি বন্য গতিতে
নির্গত হয় আবেগ;
প্রিয়তমা, এসবই হতে পারে তোমার মুক্ত পৃথিবী
যা তোমাকে সিংহাসনচ্যূত করবে, তোমাকে টেনে
নামাবে ধূলায়
নাচগান সব করে দেবে ভন্ডুল ...
জীবন বিকাশমান হলেও- জীবনকে কর্ষিত কর!

নকশাল আন্দোলনে বাংলা সাহিত্যের প্রভাব

ভারতের আকাশে ছিল বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ। এই ট‍্যাগলাইনটা আজকের বা আমার কথা নয়।  গত শতকের সত্তরের দশকে এক বিপ্লবী অভূত্থান। যা ঠিক আর দশটা দশকের মতো ছিল না।  যার নামকরণ করেছিল চীনের পিকিং রেডিও। সেই সময় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েছিল। রাইফেল, রেডবুক দিকে দিকে মুক্তি আনছে— এই ছিল আহ্বান। তবে পশ্চিম বাংলার নকশালবাড়ি গ্রামে যা শুরু হয়েছিল, তার তুলনা মেলা ভার! ১৯৬৭ সালের ২৫ মে নকশালবাড়ি জেলায় কৃষকরা সংগঠিত হয়ে ভূস্বামী আর তাদের ভাড়াটে গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বারুদ যেন দিয়াশলাইয়ের আগুন পেল, দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়ে এ কমিউনিস্ট আন্দোলন। কমিউনিস্ট আন্দোলনের এমন চেহারা এ উপমহাদেশে আগে কখনো দেখা যায়নি। আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) আর নায়কের নাম চারু মজুমদার। আজ ভারতে ঐতিহাসিক নকশালবাড়ি আন্দোলনের অর্ধশত বছর (২৫মে ) পেরিয়ে ৫২তে পা দিয়েছে। আন্দোলনের মতাদর্শ ছিল মাও সে তুংয়ের চিন্তাধারা। আর নকশালদের আহ্বান ছিল ‘সত্তরের দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করুন’।
.....না দিলে জোতদারের গলাকাটা যাবে' দেয়ালে এই লেখাও মুছে গেছে বহু আগেই কিন্তু নকশাল আন্দোলনের স্মৃতি, চেতনা,রাজনীতি কিংবা ইতিহাস কোনোটাই এতটুকু বিস্মৃত হয়নি। সশস্ত্র কৃষক আন্দোলনের সূচনা, তাতে অচিরেই যোগ দেন হাজার হাজার তরুণ - নকশালবাড়ির গন্ডী ছাড়িয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে ভারতের নানা প্রান্তে। নকশালবাড়ি আন্দোলন বছরকয়েকের মধ্যে স্তিমিত হয়ে এলেও অনেকেই মনে করেন আজ পঞ্চাশ বছর পরেও সেই আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা কিন্তু হারিয়ে যায়নি।

সেদিনের নকশালবাড়ি আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল যে সিপিআই-এমএল দলটি, তার আজকের প্রধান নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যর কথায়, "নকশালবাড়ি স্বাধীন ভারতের একটা টার্নিং পয়েন্ট। প্রধানত এটা ছিল কৃষক আন্দোলন, আর আজকের ভারতেও কৃষকরা কিন্তু সঙ্কটে। কিন্তু নিজেদের জীবন-জীবিকা বাঁচাতে, জমি বাঁচাতে সারা দেশ জুড়ে আজও যে কৃষকরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন আমার মতে সেটা নকশালবাড়িরই ঐতিহ্য।"
"দ্বিতীয়ত সে সময় যে ধরনের ছাত্র-যুব আন্দোলন দেখা গিয়েছিল, তা প্রায় স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে তুলনীয়। হাজারে হাজারে ছাত্র গ্রামে চলে যাচ্ছেন, কৃষকের আন্দোলনে পাশে দাঁড়াচ্ছেন - এ জিনিস তো অভাবনীয় ছিল। আজকের ছাত্রদের মধ্যেও আমি সে প্রবণতা দেখি - ক্যাম্পাসে যেমন, ক্যাম্পাসের বাইরেও তেমন।"
চারু মজুমদার-কানু সান্যাল-জঙ্গল সাঁওতালদের নেতৃত্বে সেদিনের নকশালবাড়ি আন্দোলন মোটেই ব্যর্থ হয়নি বলেই তার দাবি, কিন্তু নেতৃত্বের দুর্বলতাই যে আসলে সেই আন্দোলনকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারেনি - তা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই।
নকশাল আন্দোলন কারো কাছে ছিল বিপ্লবের যাত্রা, কারো কাছে সন্ত্রাস। যে যেভাবেই মূল্যায়ন করুন না কেন, সে সময়কে মুছে দেয়া অসম্ভব। হাজার হাজার তরুণ নিজের সার্টিফিকেট পুড়িয়ে দিয়ে, নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে সশস্ত্র লড়াইয়ে নেমে পড়েছিল। গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাওয়ের তত্ত্ব বাস্তবায়ন করতে শহরের নিরাপদ গৃহ ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা তখন গ্রামে কৃষকের পর্ণকুটিরে হাজির। বাদ যায়নি বিভাগের সেরা ফল করা ছাত্রটিও। নকশাল আন্দোলন একদিকে যেমন ভারতের রাজনৈতিক জীবনকে আলোড়িত করেছিল, তেমনি নাড়া দিয়েছিল সংস্কৃতি, সাহিত্যের জগতকেও। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল অনেক কালজয়ী উপন্যাস, গল্প, নাটক, কবিতা, গান। এক্ষেত্রে ভারতের আরো অনেক ভাষার চেয়ে বাংলা ভাষার সৃষ্টিই মনে হয় অধিকতর সমৃদ্ধ। আর হবেইবা না কেন? নকশালবাড়ির জন্ম তো বাংলাতেই। মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা তো কালজয়ী সাহিত্য, যা অন্য অনেক ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে।

জেলের দেয়ালে লিখেছেন নকশালবাড়িরই বিপ্লবী কবি –
“ভাঙছি বলেই সাহস রাখি গড়ার
ভাঙছি বলেই সাজিয়ে নিতে পারি
স্বপ্নের পর স্বপ্ন সাজিয়ে তাই
আমরা এখন স্বপ্নের কারবারি।”
শুরুর দিন থেকেই নকশালবাড়ির সঙ্গে হাত ধরাধরি করে এগোলো বাংলা কবিতা।নকশালবাড়ির প্রভাবে বাংলা কবিতায় বস্তুত ঘটে গেছে অনেক ভাঙচুর, রূপান্তর। নকশালবাড়ির মতাদর্শে সুসজ্জিত কবিরা প্রথম থেকেই ঘোষণা করেছেন তাঁদের শ্রেণী অবস্থান। দিলীপ বাগচি,দূর্গা মজুমদার, সরোজ দত্ত, মুরারি মুখোপাধ্যায়, সৃজন সেনের  মতো কবিরা একদিকে যেমন শব্দে আগুন জ্বালিয়েছেন, তেমনি মাঠের লড়াইয়েও শামিল হয়েছিলেন। কবিরা খুন হয়েছেন, কারাগারে গিয়েছেন, নির্যাতন সয়েছেন। নকশাল আন্দোলনের কবিতায় স্থান পেয়েছে সরাসরি রাজনৈতিক আহ্বান, মতবাদ, সশস্ত্র সংগ্রাম, কৃষক সংগ্রামের গাথা। প্রতিটা কবিতা যেন লড়াইয়ে নামার সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক! সারা জীবন ধূম উদ্গীরণের চেয়ে অন্তত একবারের জন্য হলেও জ্বলে ওঠবার আহ্বান। এর পর কয়েক বছর নকশাল আন্দোলন ধনী, ভূস্বামীদের, পুলিশের দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠল। সাধারণ ঘরের তরুণরা ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে পড়লেন পার্টির সশস্ত্র আন্দোলনে। নকশাল আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাধারণ মানুষের বিপ্লবী রূপান্তর। মানুষের ক্ষুধার যন্ত্রণা যে বিপ্লবের জননী, সে গল্প এবার সত্য হয়ে দেখা দিল। দান-খয়রাত নয়, রাষ্ট্রে নিজের অধিকার নিয়ে মানুষের বাঁচতে চাওয়ার দাবি উঠেছিল।

ওরা ছিল স্বপ্নের কারিগর। নকশালবাড়ির মতাদর্শে সুসজ্জিত কবিরা প্রথম থেকেই ঘোষণা করেছেন তাঁদের শ্রেণী অবস্থান। প্রতিটা কবিতা ছিল এক একটা অস্ত্র। নকশালবাড়ির আগমনী বার্তায় কবি দিলীপ বাগচি জানিয়ে দিলেন  তার প্রেক্ষাপট, তার প্রতিজ্ঞা—
“ও নকশাল নকশাল নকশালবাড়ির মা
ও মা তোর বুগত্ অকেতা ঝরে
তোর খুনত্ আঙ্গা নিশান লঘ্যা
বাংলার চাষী জয়ধ্বনি করে।।
... ও মা তোর বুগত্ অকেতা ঝরে
সেই অকেতা হইতে জন্ম নিবে
জঙ্গাল সাঁওতাল বাংলার ঘরে ঘরে...”

নকশালবাড়ির সংগ্রামে প্রভাবিত কবিরা একদিকে যেমন দ্বিধাহীনভাবে তাদের শ্রেণী অবস্থান স্পষ্ট করছিলেন পাশাপাশি তাঁরা সংশোধনবাদ সহ যে কোন সুবিধাবাদী অবস্থানের বিরুদ্ধেও তাদের লেখনিকে ব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি। একদিকে যখন শান্তির তত্ত্ব আওড়ে জনগণকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা চালাচ্ছে নয়া সংশোধনবাদ, আর সর্বহারার মহান শিক্ষক কমরেড মাওয়ের নেতৃত্বে চলছে এর বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রাম, তখন নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাবে আলোড়িত কবির কবিতায় উঠে আসছে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি দৃঢ় সমর্থন। কবি তাঁর কবিতায় ন্যায় যুদ্ধ ও অন্যায় যুদ্ধের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা টানছেন। ‘শ্রমিকের রাজনীতি ’ কবিতায় সৃজন সেন লিখলেন –
যার হাতে বন্দুক
তার হাতে ক্ষমতা
এটাই তো পৃথিবীর ইতিহাস
শোষকেরা সেটা জানে
জানে সেটা শোষিতেরা
বিপরীতমুখী দুই বিশ্বাস…
সৃজন সেন আরও লিখলেন ওই একই কবিতায় –
শোষকের রাষ্ট্রের
পক্ষের বন্দুক
শ্রমিকরা চায় হোক স্তব্ধ
সে মহান লক্ষ্যে
শ্রমিকের বন্দুক
সৃষ্টির ডঙ্কার শব্দ।

শহীদ কবি সরোজ দত্ত  তাঁর ‘কোনো এক বিপ্লবী কবির মর্মকথা ’ কবিতায় স্পষ্ট করে ঘোষণা করেন তাঁর শ্রেণী অবস্থান –
গণগগনের পথে অগ্নিরথ জনমানবের
যাহারা টানিয়া আনে তাহাদের সহকর্মী আমি ’

কিংবা শহীদ কবি দ্রোণাচার্য ঘোষ লিখছেন
‘আমার মুক্তির ডাক’ কবিতায় –
‘আমার মুক্তির ডাক আকাশে বাতাসে
শ্রমিকের কৃষকের মাঝে শুধু ভাসে,
আমার স্বপ্নের রঙ লাল –
বয়সের শব্দে শুধু শোষণ ছেঁড়ার দিনকাল।

শহীদ কবি মুরারি মুখোপাধ্যায়ের ‘তুমি কৃষক’ কবিতায় সরাসরি কৃষক বিদ্রোহের ডাক –
হে কৃষক বিদ্রোহ কর
ঘোরতর বিদ্রোহ
তা’ না হলে ঘুচিবে না
তোমাদের এই দুর্গ্রহ।
সত্তরের আরেকজন কবি পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে দেন ‘আমাকে নির্দেশ দাও ’ কবিতায় –

আমি কোন বসন্তদিনের ফেলে রাখা রাখি ফেরত চাই না আজ
জানতে চাই না ভবিষ্যতের নিশ্চিন্ত নির্ভরতা
শৃঙ্খলিত মানুষের চলার ছন্দের মধ্যে
জেগে উঠেছে যে ঘুম ভাঙার গান
হে সময়, আমাকে তুমি তার প্রতি অনুগত থাকতে সাহায্য করো
হাতুড়ির ঘা মেরে
প্রতিদিন রক্তের ভিতর তোমার অবিরাম নির্দেশ পাঠাও।

কবি দুর্গা মজুমদার তাঁর 'গাণ্ডীবে টঙ্কারে দিল’ কবিতায়--

“নতজানু হয়ে তিলে তিলে ক্ষয়ে বাঁচবার নাম
আমি রাখলাম
মরণের স্তব—
খুনের বদলে খুন না ঝরিয়ে মরবার নাম
আমি রাখলাম
শ্মশানের শব!
মারার তাগিদে আড়ালে গা-ঢেকে বাঁচবার নাম
আমি রাখলাম
সংগ্রামী গৌরব—
মরণের মুখে থুথু ছুড়ে দিয়ে মরবার নাম
আমি রাখলাম
সশস্ত্র বিপ্লব!!
নকশাল আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন গ্রামের গরিব, ভূমিহীন কৃষকরা। তাদের শতবছরের বঞ্চনার ক্ষোভে আগুন জ্বালিয়েছিল নকশালবাড়ি। নকশাল আন্দোলনে যুক্ত চারজন তরুণ কবি খুন হয়েছিলেন পুলিশের গুলিতে, জেলখানায় বন্দি অবস্থায়। এদের মধ্যে আছেন কবি দ্রোণাচার্য ঘোষ, তিমিরবরণ সিংহ, অমিয় চট্টোপাধ্যায় ও মুরারি মুখোপাধ্যায়। তিমিরবরণ সিংহ ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। নকশাল আন্দোলনে গ্রামে গিয়েছিলেন কৃষকদের সংগঠিত করতে। ১৯৭১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বহরমপুর জেলে নিহত হয়েছিলেন পুলিশের গুলিতে। অমিয় চট্টোপাধ্যায় বেহালা পৌরসভার কাউন্সিলর হয়েছিলেন। নকশাল আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পুরুলিয়ার গ্রামাঞ্চলে পার্টির কাজ শুরু করেন। গ্রামে কাজ করতেন ‘সাগর’ ছদ্মনামে। গ্রেফতার হয়ে ঠিকানা হয় জেলখানা এবং জেলের অভ্যন্তরেই তাকে হত্যা করা হয়।

নকশাল আন্দোলন দমাতে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের জবাবে পাল্টা জবাব দেয়ার প্রত্যয়ে তরুণ কবি মুরারি মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘কলকাতা বদলা নিতে জানে’। কবিতা কি চিঠি— সবখানেই মুরারি ছিলেন সমাজ বদলের আকাঙ্ক্ষায় অস্থির। ‘কলকাতা বদলা নিতে জানে’ যেন সে সময়ের এক জীবন্ত দলিল। যুগের ক্রোধ যেন মুরারির কলমে ভাষা পেল। মুরারি বলছেন তার বন্ধু কাজল আর সমীরের রক্ত কলকাতাকে আরো উত্তাল করেছে; ভোটের রাজনীতিকে বিদায় দিয়ে রক্তাত্ত সংগ্রাম, প্রতিশোধের কথা বলেছেন। শহরের বাবুদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। আহ্বান জানিয়েছেন বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ার। আর শেষমেশ উচ্চারণ করেছেন নকশালবাদীদের নেতা চীনা বিপ্লবের নেতা মাও সে তুংয়ের নাম—
‘পূর্ব দিগন্তে রক্ত সূর্য মাও সে তুঙ
টুটল আঁধার, কোটি সেনানীর ভাঙলো ঘুম
আজ এই দিনে যোদ্ধার বেশে তোমায় পেলাম
কৃষকের কলকাতা লাল সেলাম।’
নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতায় আবার একই সাথে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধেই তীব্র ঘৃণা আর জেহাদ –
“এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না
এই জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ আমার দেশ না
এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না
এই রক্ত স্নাত কসাইখানা আমার দেশ না
আমি আমার দেশকে ফিরে কেড়ে নেব”
(এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না)
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পোষাক ছাড়ার প্রসঙ্গ উঠলেই মনে পড়ে এক কবিতা ‘উলঙ্গ রাজার ’ কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে নিয়ে –
“হেইও হো! হেইও হো!
পোশাক ছাড়া, নীরেন! তুমি,
তুমিও ন্যাংটো!
কিন্তু ঘরে তেমন একটি
আয়না রাখে কে?”
কবিতার শৈল্পিক মানের এ বিতর্কে অর্জুন গোস্বামী নকশালবাদী কবিতার পক্ষেই রায় দিয়েছেন, ‘এটা সত্তরের দশক। এই দশক প্রত্যক্ষ করেছে শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে শোষিতশ্রেণীর লড়াই। এই দশকেই প্রমাণিত হয়েছে যে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকচক্রকে উপরে উপরে যতই শক্তিশালী বলে মনে হোক না কেন আসলে তারা হলো কাগুজে বাঘ। স্বভাবতই এই দশকের মানুষের সচেতনতা অনেক বেশি। আমরা এমন কোন কবিতা পড়তে চাই না যাতে আছে হতাশা, আছে যন্ত্রণার গোঙানি। আমরা এমন কবিতা পড়তে চাই যাতে ধরা পড়বে শোষণের আসল স্বরূপ, যে কবিতা পড়ে অনুপ্রেরণা পাবেন লক্ষ লক্ষ খেটে খাওয়া মানুষ এবং যে কবিতা প্রকৃতই হবে শোষিতশ্রেণীর সংগ্রামী হাতিয়ার। আমাদের মধ্যে অনেকে বলেন কবিতা হলো এমন একটা জিনিস যা ঠিক স্লোগান নয়। আমাদের বক্তব্য হলো কবিতার বিষয় ও কবিতার আঙ্গিক এই দুটোর মধ্যে আগে বিষয়, পরে আঙ্গিক। বক্তব্যকে সাধারণের উপযোগী করে বলার জন্য কবিতা যদি কারুর কাছে স্লোগান বলে মনে হয় তবে সেই স্লোগানই হলো সত্তরের দশকের শ্রেষ্ঠ কবিতা।’

কবিতার পাশাপাশি গল্প,উপন্যাসে ধরা রয়েছে নকশাল আন্দোলন। কিছু রচিত হয়েছে আন্দোলন চলাকালে আবার কিছু পরবর্তীকালেও। গল্পগুলোয় রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও তরুণদের দুঃসাহসী রাজনীতির বিবরণ পাওয়া যায়। মহাশ্বেতা দেবীর দ্রৌপদী গল্পটি দিয়ে শুরু করা যাক। দোপিদ যখন বলল , “কাপড় কী হবে, কাপড়? লেংটা করতে পারিস, কাপড় পরাবি কেমন করে? মরদ তু? চারদিকে চেয়ে দ্রৌপদী রক্তমাখা থুথু ফেলতে সেনানায়কের সাদা বুশ শার্টটা বেছে নেয় এবং সেখানে থুথু ফেলে বলে, হেথা কেও পুরুষ নাই যে লাজ করব। কাপড় মোরে পরাতে দিব না। ...দ্রৌপদী দুই মর্দিত স্তনে সেনানায়ককে ঠেলতে থাকে এবং এই প্রথম সেনানায়ক নিরস্ত্র টার্গেটের সামনে দাঁড়াতে ভয় পান, ভীষণ ভয়।” অসম্ভব প্রতিবাদী কণ্ঠ। নকশাল আন্দোলনে  আদিবাসীরা বেশ ভালোভাবেই যুক্ত হয়েছিল। আর  মহাশ্বেতা দেবী আদিবাসীদের সংগ্রাম বাংলা ভাষায় যেভাবে লিখেছেন।আর কেই বা লিখতে পেরেছেন!
‘বলো, হাতদিয়ে রোখা যায় কি সূর্যের কিরণ? হত্যা করে রোখা যায় কি বিপ্লব?' না রোখা যায় না। ওরা অপ্রতিদ্বন্দ্বী।” যেখানে নকশাল রাজনীতি চিত্রায়িত হয়েছে। সেই দীপংকর চক্রবর্তীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী গল্পটির কথা।  সে সময়ের রাজনীতির তাত্ত্বিক লড়াই, ঝোঁক সবই ধরা রয়েছে এ গল্পে। মূলত গল্পের এ ঘটনা পাঠককে দেখিয়ে লেখক তার গল্পকে একটি নিরেট সরল রাজনৈতিক করে তুলেছেন। দীপংকর চক্রবর্তী এ গল্প লিখেছেন সেই উত্তাল সময়ে, ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনীক পত্রিকায় গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল। অপ্রতিদ্বন্দ্বী গল্পটি ছোটগল্পের শিল্পমান সেভাবে অর্জন করতে পারেনি। গল্পটি নেহাতই রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন হয়েছে। নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত আরো অসংখ্য ছোটগল্পের মধ্যে রয়েছে— হাসান আজিজুল হকের আমরা অপেক্ষা করছি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পলাতক ও অনুসরণকারী, বিমল করের নিগ্রহ, সমরেশ বসুর শহিদের মা, দেবেশ রায়ের কয়েদখানা, সুবিমল মিশ্রের মাংস বিনিময় হল, নবারুণ ভট্টাচার্যের খোঁচড়, জয়া মিত্রের স্বজন বিজন, বশীর আলহেলালের মোকাবিলা প্রভৃতি।

নকশাল আন্দোলন নিয়ে রচিত হয়েছে উপন্যাসও। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উপন্যাসের মধ্যে আছে— স্বর্ণ মিত্রের গ্রামে চলো (১৯৭২), মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা (১৯৭৩) ও অপারেশন? বসাই টুডু (১৯৭৮), শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের শ্যাওলা (১৯৭৭), শৈবাল মিত্রের অজ্ঞাতবাস (১৯৮০), জয়া মিত্রের হন্যমান, সমরেশ মজুমদারের কালবেলা প্রভৃতি।
স্বর্ণ মিত্রের গ্রামে চলো উপন্যাসটি নকশাল আন্দোলনে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের অংশ নেয়ার বিবরণ দেখায়। প্রেসিডেন্সির ছাত্র অনিরুদ্ধ বাগচী ওরফে রঘুর নকশাল হয়ে গ্রামে কৃষক সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার কাহিনী। নকশাল আন্দোলনে প্রেসিডেন্সির ছাত্রদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। স্বর্ণ মিত্র তার উপন্যাসে সেই ছবিটা দেখাতে চেয়েছিলেন। পুরো উপন্যাসে একজন শহুরে তরুণ গ্রামের এই কষ্টকর সংগ্রামে কীভাবে অংশ নিয়েছিলেন, তার বিবরণ পাওয়া যায়। উঠে এসেছে কৃষকদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। মাঝে মাঝেই এসেছে পরিস্থিতি অনুযায়ী মাও সে তুংয়ের উক্তি।নকশাল আন্দোলন নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস বোধহয় মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা। মহাশ্বেতা দেবী লিখছেন, ‘অপরাধের মধ্যে ব্রতী এই সমাজে, এই ব্যবস্থায় বিশ্বাস হারিয়েছিল।’ ব্রতীর ঘর সার্চ করে পুলিশ উদ্ধার করে নকশালদের স্লোগানের খসড়া। সত্তরের দশকের অতি পরিচিত সব স্লোগান। ব্রতীর প্রেমিকা নন্দিনী পুলিশি হেফাজতে প্রায় অন্ধ হয়ে যায়, দীর্ঘদিন সলিটারি সেলে থেকে সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তার সাথে সমরেশ মজুমদারের কালবেলা।বইটির ভূমিকায় লেখক বলেছেন, তিনি এতে একটি নির্দিষ্ট সময়কে শব্দে বন্দী করতে চেয়েছেন, একত্র করে প্রকাশ করতে চেয়েছেন তখনকার নির্যাস। সমাজতন্ত্রের চেহারাকে রূপ এক কথাও ফুটে উঠেছে কালবেলায়। অনিমেষদের ভুলগুলো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রয়োজন ছিল। চে গ্যেভারাও বলেছিলেন, “বিপ্লব তো আর গাছে ধরা আপেল নয় যে পাকবে আর পড়বে, বিপ্লব অর্জন করতে হয়”।কালবেলার সমগ্র নির্যাস শুধু একটি উক্তি দিয়েই প্রকাশ করা সম্ভব,“বিপ্লবের আরেক নাম মাধবীলতা”।

গল্প, কবিতা, উপন্যাসের বাইরে নকশাল আন্দোলন নাটক, গান, সিনেমাসহ আরো অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাব রেখেছিল। সেসব নিয়ে যথেষ্ট আলোচনার সুযোগ এ লেখায় হচ্ছে না। তবে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ নামের পথপ্রদর্শক বাংলা ব্যান্ডটির কথা সামান্য উল্লেখ করতে চাই। ব্যান্ডটির মূল উদ্যোক্তা বলা যায় গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে। মনিদা নামে পরিচিত গৌতম ছাত্রজীবনেই নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে গৌতম গ্রেফতার হয়েছিলেন। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন, সইতে হয়েছে নির্যাতন। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে প্রশাসনের নির্দেশে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। তারপর ১৯৭৬ সালে জন্ম নেয় কিংবদন্তি বাংলা ব্যান্ড ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’।

নকশাল আন্দোলনের তাত্ত্বিক ব‍্যাখ‍্যা দেওয়া, বা তার সাফল্য বা বিফলতার বিচারের কতটা প্রয়োজন । প্রয়োজন হলো সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতিতে নকশাল আন্দোলনের প্রসার ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা। আসল কথা হলো স্বাধীন ভারতে বাম আন্দোলন নিয়ে বাংলা সাহিত্যে এতো আলোচনা আর কোন আন্দোলন নিয়ে এমন হয় নি।
যেভাবে মাও সেতুঙ বলেছিলেন, ” একদিকে রয়েছে ক্ষুধার জ্বালা, অবহেলা, ও অত্যাচার আর অন্যদিকে রয়েছে মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষন ও নিপীড়ন। এই বাস্তব সত্য সর্বত্র রয়েছে আর মানুষের কাছে তা প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনা ই মনে হয়। সেই প্রতিদিনের ঘটনাকে নিয়ে লেখক শিল্পীরা তার মধ্যে ফুটিয়ে তোলেন তার মধ্যেকার দ্বন্দ্ব–সংঘাত, ও সংগ্রামকে এবং এমন রচনা সৃষ্টি করেন যা জনগণকে জাগিয়ে দেয়, তাদের প্রেরণায় উদ্দীপ্ত করে তোলে, ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তাদের পরিবেশকেই পরিবর্তন করে দিতে উদ্বুদ্ধ করে তোলে।”

Wednesday, May 1, 2019

সন্ত্রাসবাদ : কিছু নতুন কথা

আজকাল “সন্ত্রাসবাদ”—শব্দটির সাথে শিশুরাও পরিচিত । আন্তর্জাতিক নিউজ চ্যানেল থেকে শুরু করে পাড়ার চায়ের দোকানের বৈঠকি আড্ডা সর্বত্রই শুনতে পাই সেই একই শব্দ । সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ তো প্রাতঃকর্মের মতো রোজের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে । আজ এখানে বিস্ফোরণে এতজন মরেছে তো কাল ওখানে আত্মঘাতী হানায় এতজন । শুনতে পাই ঠিকই , কিন্তু বিশ্বজুড়ে এর কোনও সমাধান না থাকায় ব্যাপারটা গা’সওয়া করে নেওয়া ছাড়া আমাদের উপায়ও নেই ।
সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞাগুলি সাধারণত জটিল এবং বিতর্কিত এবং সন্ত্রাসবাদের সহিংসতা ও সহিংসতার কারণে তার জনপ্রিয় ব্যবহারের শব্দটি একটি তীব্র কলঙ্ক তৈরি করেছে। এটি বিপ্লবীদের বিরোধীদের বিরুদ্ধে ফরাসি বিপ্লবের সময় ব্যবহৃত সন্ত্রাসের উল্লেখ করার জন্য ১৭৯০-এর দশকে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। ম্যাক্সিমিলিয়েন রবসেস্পিয়ারের জ্যাকবিন পার্টি গিলোটিন দ্বারা ব্যাপক মৃত্যুদণ্ডের সাথে জড়িত সন্ত্রাসের একটি রাজত্ব করেছিল। যদিও এই ব্যবহারের সন্ত্রাসবাদটি তার দেশীয় শত্রুদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র দ্বারা সহিংসতার একটি কাজ বোঝায়, তবুও ২0 শতকের এই শব্দটিকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সহিংসতার উদ্দেশ্যে নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে, সরকারকে নীতি প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা বা বিদ্যমান হত্তয়া শাসন।
সন্ত্রাসবাদ আইনত সব বিচার বিভাগে সংজ্ঞায়িত করা হয় না; বিদ্যমান আইনগুলি সাধারণত কিছু সাধারণ উপাদান ভাগ করে। সন্ত্রাসবাদ সহিংসতার ব্যবহার বা হুমকি জড়িত এবং কেবলমাত্র সরাসরি শিকারের মধ্যেই নয় বরং বিস্তৃত শ্রোতার মধ্যে ভয় সৃষ্টি করতে চায়। এটা যে ডিগ্রী নির্ভর করে তা সন্ত্রাসবাদকে প্রচলিত এবং গেরিলা উভয় যুদ্ধ থেকে পৃথক করে। যদিও প্রচলিত সামরিক বাহিনী নিয়মিতভাবে শত্রুদের বিরুদ্ধে মানসিক যুদ্ধে ব্যস্ত থাকে, তবে বিজয়ের প্রধান উপায় অস্ত্রের শক্তি। একইভাবে, গেরিলা বাহিনী, যা প্রায়শই সন্ত্রাস ও অন্যান্য প্রচারের কাজগুলিতে নির্ভর করে, সামরিক বিজয় অর্জন করে এবং মাঝে মাঝে সফল হয় (উদাঃ ভিয়েতনাম ভিয়েত কং এবং কম্বোডিয়ায় খেমার রুজ)। সন্ত্রাসবাদ এভাবেই ভয় সৃষ্টির জন্য সহিংসতার নিয়মিত ব্যবহার, এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সরাসরি সামরিক বিজয় সম্ভব হয় না। এর ফলে কিছু সামাজিক বিজ্ঞানীর নেতৃত্বে গেরিলা যুদ্ধের "দুর্বল অস্ত্র" এবং সন্ত্রাসবাদের "দুর্বলতম অস্ত্র" হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাপক ভয় সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় প্রচারকে আকৃষ্ট ও বজায় রাখার জন্য, সন্ত্রাসীদের ক্রমবর্ধমান নাটকীয়, সহিংস ও উচ্চ-প্রোফাইল আক্রমণের সাথে জড়িত থাকতে হবে। এদের মধ্যে হাইজ্যাকিং, হোস্টগেট, অপহরণ, গাড়ী বোমা হামলা, এবং প্রায়শই আত্মঘাতী বোমা হামলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দৃশ্যত এলোমেলো হলেও, সন্ত্রাসী হামলার শিকার এবং অবস্থানগুলি প্রায়ই তাদের শক মূল্যের জন্য সাবধানে নির্বাচিত হয়।স্কুল, শপিং সেন্টার, বাস এবং ট্রেন স্টেশন, এবং রেস্টুরেন্ট এবং নাইটক্লাবগুলি উভয়কেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে কারণ তারা বিশাল জনতাকে আকৃষ্ট করে এবং কারণ সেগুলি এমন জায়গা যেখানে বেসামরিক জনসংখ্যার সদস্য পরিচিত এবং এতে তারা সহজে অনুভব করে। সন্ত্রাসবাদ লক্ষ্য সাধারণত তাদের সবচেয়ে পরিচিত জায়গায় নিরাপত্তার জনসাধারণের জ্ঞান ধ্বংস করা হয়। প্রধান লক্ষ্যগুলি কখনও কখনও দূতাবাস বা সামরিক স্থাপনাগুলির মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক প্রতীকগুলিতে বিল্ডিং বা অন্যান্য অবস্থানগুলি অন্তর্ভুক্ত করে। সন্ত্রাসীর আশঙ্কা হচ্ছে যে সন্ত্রাসের ধারনা এই কর্মকাণ্ডের ফলে জনসংখ্যার একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রান্তের দিকে রাজনৈতিক নেতাদের চাপিয়ে দেবে।
সাধারণ মানুষের কাছে সন্ত্রাসবাদের বিশেষ কতকগুলো বৈশিষ্ট্য আছে —
১) সন্ত্রাসবাদ সাধারণ মানুষ ও সরকারের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ।
২) আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয় হিংসাত্মক বা নাশকতা মূলক ক্রিয়াকলাপের দ্বারা ।
৩) আতঙ্ক বা সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হয় কোন সু সংগঠিত দল বা জনগোষ্ঠী দ্বারা ।
৪) আতঙ্ক সৃষ্টি করে তারা সেই জনগোষ্ঠী কে বা সরকার কে কোনও কাজ করতে বা কোনও কাজ না করতে বাধ্য করে বা বাধ্য করার চেষ্টা করে ।
৫) তাদের কার্যকলাপের মূলে থাকে অন্ধবিশ্বাস । এই অন্ধবিশ্বাস যে, একমাত্র তাদের পথেই মানুষের তথা সমাজের মঙ্গল সম্ভব।
৬) তাদের অন্ধবিশ্বাসের বাস্তব রূপদানের জন্য তারা সব কিছু করতে পারে। এমন কি নিজেদের মৃত্যু ঘটাতেও এরা পিছপা হয় না ।
বিশ্ব জঙ্গিবাদ মানবসমাজকে ঠেলে দিতে চাইছে এমন একটি অন্ধকার সময় ও স্থানের দিকে, যেখানে গণতান্ত্রিক সমাজের ধারণাগুলো বিলুপ্ত। যেখানে বিশ্বজনীন নিয়মনীতি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। সেটা তারা করতে চাইছে সমাজ কাঠামোতে ভাঙন ধরিয়ে চতুর কৌশলে মানবসমাজে বিভাজন সৃষ্টির মাধ্যমে। সভ্য মানুষের বিশ্বাস, সংস্কার কিংবা আচার-আচরণের মূলে কুঠারাঘাত দিয়ে ভয়াল বিপর্যয় ঘটিয়ে নিত্যনতুন নির্মম সন্ত্রাস, অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ড ও অরাজক পরিস্থিতিতে অসহনীয় পারিপার্শ্বিকতা তৈরি করে। যাতে নাগরিক মানুষের মনে সন্দেহ, সংশয়, আতঙ্ক ও ত্রাস সৃষ্টি হয় এবং সুশীল সমাজে স্বাধীনতা ও সাধারণ মানুষের বাঞ্ছিত জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হতে হতে সামাজিক পরিবেশজুড়ে নেমে আসে মৃত্যুশীতল বিপর্যয়। কেননা সমাজবদ্ধ মানুষের সুস্থ চেতনাই মানব সভ্যতাকে এগিয়ে দেয় সুস্থতর ভবিষ্যৎ নির্মাণের দিকে। মানুষকে করে তোলে মানবিক গুণাবলির আদর্শের ধারক।
বৈশ্বিক ‘সন্ত্রাসবাদ' শব্দটি বহুল আলোচিত হয় নাইন ইলেভেনের ঘটনার পর যখন মার্কিন যু্ক্তরাষ্ট্রে বুশ সরকার ‘ওয়ার অন টেরর' ঘোষণা করেন, যদিও এর ব্যবহার অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছিল৷ কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ‘জঙ্গিবাদ' ও ‘সন্ত্রাসবাদ' শব্দ দু'টোর অর্থ ও ব্যবহার কোথায় ও কীভাবে হচ্ছে তা নিয়ে ব্যাপক মতপার্থক্য ও ধোঁয়াশা দেখা যাচ্ছে৷ কোনটাকে জঙ্গিবাদ ও কোনটাকে সন্ত্রাসবাদ বলা হচ্ছে তা নিয়েও পরিষ্কার ধারণার অভাব দেখা গেছে৷ সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন যে, জঙ্গিবাদ হলো এক ধরনের বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতি আনুগত্য থেকে উৎসারিত, যা সমাজে প্রতিষ্ঠিত নয় এবং তার জন্য সহিংসতার পথ বেছে নেয়া হতে পারে৷ আর সন্ত্রাসবাদ জঙ্গিবাদের একটি পথ হতে পারে আবার আলাদা একটি আচরণ হতে পারে যেখানে মূল লক্ষ্য আতঙ্ক তৈরি৷
পৃথিবীতে জঙ্গিবাদ সৃষ্টির প্রধান কারণগুলো কোন পরিস্থিতিতে তৈরি হয়, তার ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে অপরাধ জগতের অজস্র তথ্যবৃত্তান্ত। যেখানে সন্ত্রাস সংঘটনকারীদের পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে তাদের জঙ্গিবাদী কার্যকারণ সম্পর্ক মেলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন সন্ত্রাস বিশ্লেষকরা। আর সে জন্যই জিজ্ঞাসা জেগেছে, বর্তমান বিশ্বে জঙ্গিবাদের এই বিপুল উত্থান কিসের কারণে? সে কি দারিদ্র্যের কশাঘাত, ধর্মীয় উন্মাদনার যুক্তিহীন উন্মেষ, রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের কুটিল অভিপ্রায়, বিপ্লবী বাসনা, মানসিক নাকি সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবরুদ্ধ বিদ্রোহে?
সমাজের বিভিন্ন ধরণের ঘটনার উপর নির্ভর করে সন্ত্রাসবাদেরও বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে । তবে মুলতঃ সন্ত্রাসবাদ কে চার ভাগে ভাগ করা যেতে পারে । ক) রাজনৈতিক খ) সামাজিক,গ) ধর্মীয় ও ঘ) মনস্তাত্ত্বিক । তবে বর্তমান সময়ে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদই সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে পরিচিত ও আলোচিত রূপ ।অনেকে আধুনিক জঙ্গিবাদের মূল কারণকে রিলিজিয়াস ফ্যানাটিজম বা ধর্মীয় উন্মাদনার বিস্তার বলে বিশ্বাস করেন। ধর্মীয় উগ্রতা বর্তমান সময়ে জঙ্গিবাদের পরিবেশ সৃষ্টিতে অনুক‚ল ভূমিকা তৈরি করছে। কিন্তু সেটাই কি শুধু মূল কারণ? পৃথিবীর নানা ধর্মমতে এমন অজস্র অনুসারী রয়েছেন, যারা নিজেরা ধর্মান্ধ হয়েও কোনো ধরনের সহিংস নীতির প্রতি মোটেই বিশ্বস্ত নন। এরমধ্যে কিছু উগ্র ধর্মান্ধরা ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করে এর অপব‍্যাখ‍্যা করছে। যার প্রতিফলন এই সন্ত্রাসবাদ।
জঙ্গি প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি অর্জন, তাদের পরিপুষ্টি লাভের পেছনে সর্বদাই যে দেশীয়ভাবে রাষ্ট্রীয় শক্তির সমর্থন থাকে, তা নয়। তবে বাস্তব সত্য হলো, অর্থনৈতিক অভিপ্রায় নিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লোভ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রের মধ্যেই যেমন ছোট ছোট জঙ্গি সংগঠনের জন্ম হচ্ছে, তেমনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও আঞ্চলিক পর্যায়ে শক্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়ে অথবা এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপর রাষ্ট্রের প্রতিহিংসা চরিতার্থের উপায় হিসেবে এখনো কিছু কিছু রাষ্ট্র পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এদের সৃষ্টি করে যাচ্ছে আর্থিক ও নৈতিক সহযোগিতায় সমর্থন জুগিয়ে। কেননা বর্তমান জঙ্গিবাদ রাজনৈতিক আন্দোলন কিংবা আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য লক্ষ্যে পৌঁছানোর এমনই এক মোক্ষম অস্ত্র, যা ছায়াযুদ্ধ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে সরাসরি সৈন্য নামিয়ে যুদ্ধ ঘোষণার পরিবর্তে। তাই সর্বজনীনভাবে বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা থাক কিংবা না-ই থাক, জঙ্গিদের আইনবহির্ভূত অনৈতিক কর্মধারা থেমে নেই একেবারেই। বরং বিজ্ঞান ও নব্য প্রযুক্তির নিত্য নতুন দিক উন্মোচনের পাশাপাশি জঙ্গিদের জঙ্গিত্ব সৃষ্টির অভিনব সব কৌশলপদ্ধতি বিস্ময়কর প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলেছে অপ্রতিহত প্রতিযোগিতার সুনির্দিষ্ট পথ ধরে। রোবোটিক, জেনিটিক, নিওরোসায়েন্স, বায়োটেকনোলজির আবিষ্কার যেমন অব্যাহত অগ্রগতিতে আমূল বদলে দিচ্ছে মানুষের জীবনধারা আর বিচিত্র জীবের পৃথিবীকে, তেমনি আধুনিক প্রযুক্তির সদ্ব্যবহারে আন্ডারগ্রাউন্ডে সন্ত্রাসীরাও তাদের জঙ্গিবাদে জাগিয়ে তুলছে নতুন সৃষ্টির উন্মাদনা।
জঙ্গি মানসিকতা নিশ্চিতভাবেই সমাজের কিছুসংখ্যক মানুষের এমন এক সাইকোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য, যা শক্তিমান প্রভাবশালীদের কাছ থেকে আর্থিক, নৈতিক, আদর্শগত ও আইনগত আনুক‚ল্য লাভ করে মানবসমাজের ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে এবং পরিস্থিতিতে একেকভাবে বাস্তবতা পায়। বাস্তবে তার সক্রিয় প্রকাশ তখনই ঘটে, যখন সেই মনস্তত্ত্ব দেশীয় শক্তি অথবা আন্তর্জাতিক মহলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়। তাই দেহ-মনের বিভিন্ন রোগ সৃষ্টির পেছনে যেমন কার্যকারণ সম্বন্ধ খুঁজে সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দান করা চলে, জঙ্গিবাদকে সব ক্ষেত্রেই সেভাবে বিশ্লেষণ করা যায় না। জঙ্গিবাদের বৈজ্ঞানিক কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয়ও তাই অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। যা-ই হোক, সন্ত্রাস নির্মূলের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সন্ত্রাসবাদের বিপুল উত্থানে বিশ্বের মধ্যে তৈরি হয়েছে আরো একটি বিশ্ব। তার নাম জঙ্গি বিশ্ব। কারণ, জঙ্গি প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বজুড়ে এত বেশি দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি করে চলেছে তাদের সদস্য সংখ্যা, তার প্রভাব পৃথিবীর প্রতিটি কোণেই আলোড়ন তুলেছে।
সন্ত্রাসবাদ, জনসংখ্যার ভয়ে সাধারণ জলবায়ু তৈরির জন্য সহিংসতার নিয়মিত ব্যবহার, যাতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আনতে পারে। জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় গোষ্ঠী, বিপ্লবীদের দ্বারা এবং এমনকি সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা পরিষেবা এবং পুলিশ কর্তৃক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির দ্বারা ডানপন্থী ও বামপন্থী উভয় উদ্দেশ্যগুলি নিয়ে রাজনৈতিক সংগঠনগুলি সন্ত্রাসবাদ চালাচ্ছে।

Monday, April 29, 2019

আমাদের অধিকার : প্রসঙ্গ মে দিবস


অনেক অর্থ 'প্রথম মে'র সাথে যুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ব্যাপক স্বীকৃতি পেয়েছে, এটি আমাদের সমাজকে' শ্রমিকশ্রেণীর 'গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।অতএব, অনেক দেশে, 1 মে 'মে দিবস' বা 'আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস' হিসাবে পালন করা হয়। অনেক দেশে এই দিনটি একটি সরকারি সরকারী ছুটির দিন যা শ্রমিক শ্রেণীর কারণগুলি তুলে ধরার জন্য মিটিং এবং রাস্তার বিক্ষোভের দ্বারা চিহ্নিত। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিনটি পালনের ১৩৩ তম বার্ষিকী  মানব সভ্যতা গড়ে উঠেছে শ্রমিকেরই শ্রমে, ঘামে। গিজার পিরামিড, আগ্রার তাজমহল, চীনের মহাপ্রাচীর, প্যারিসের আইফেল টাওয়ারসহ যে স্থাপনার কথাই বলা হোক না কেন সেখানে মিশে আছে অগণিত শ্রমিকের শ্রম। অথচ বরাবরই সমাজের শোষিত ও অবহেলিত অংশ শ্রমজীবী মানুষ। যারা তৈরি করেন বিশাল স্থাপনা, যারা শ্রম দেন কারখানায়, যাদের হাতে ঘোরে অর্থনীতির চাকা বণ্টনব্যবস্থার নির্মম বিচারে সেই শ্রমজীবী মানুষ বাস করেন বস্তিতে, তাদেরই ঘরে থাকে না অন্ন, তারা পরেন অমলিন কাপড় আর তারাই বঞ্চিত চিকিৎসা ও শিক্ষা থেকে। মহান মে দিবস শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার ঘোষণার দিবস।

শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই ইউরোপজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে শিল্প কারখানা। এসব কারখানায় মূলত ভূমিহীন চাষি, ভূমিদাস ও ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীকে শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত করা হয়। প্রথম থেকেই কারখানায় শ্রমিকরা মালিকের শোষণ ও নিপীড়নের শিকার হতে থাকে। সে সময় কারখানায় নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ন্যূনতম বয়সসীমা ছিল না। কোনো নির্দিষ্ট শ্রম ঘণ্টাও মানা হতো না। ছিল না ন্যূনতম মজুরির বিধান এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। নিতান্ত শিশুদেরও অমানুষিক পরিশ্রম করানো হতো। ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করানো হতো নারীদেরও। দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টাও শ্রম দিতে বাধ্য করা হতো শ্রমিকদের। খাবারের জন্য ছুটির ব্যবস্থা ছিল না। মালিকপক্ষ যেমন খুশি মজুরি দিত।

ধীরে ধীরে এসব নির্যাতন ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হতে থাকে। শ্রমিকরা সংগঠিত হতে থাকেন।
আঠারশ শতকের মধ্যভাগ থেকেই ইউরোপ ও আমেরিকায় শ্রমিকরা বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত হতে থাকেন। ১৮৮৪ সাল থেকেই শ্রমিকরা ১৮৮৬ সালের ১ মের মধ্যে ৮ ঘণ্টা শ্রমদিবস কার্যকর করার দাবি জানাতে থাকেন। কিন্তু মালিকপক্ষ সে দাবি মেনে নেয় না। ১৮৮৬ সালের ৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমিকরা সমাবেশ করেন। ৮ ঘণ্টা কর্মসময় নির্ধারণের দাবিতে এই সমাবেশ চলছিল। অদূরে ছিল পুলিশের দল। এই সময় আন্দোলনকে ভ-ুল করার জন্য অজ্ঞাত পরিচয় এক ব্যক্তি পুলিশের ওপর বোমা নিক্ষেপ করে।শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও পুলিশের গুলিবর্ষণ।

আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে ৪ জন শ্রমিক নিহত হন। একজন পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হন। পরদিন ৫ মে উইসকনসিনের মিলওয়াকিতে ধর্মঘটরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশের গুলিতে এক বালকসহ ৭ জন নিহত হন। পুলিশ হত্যার দায়ে গ্রেপ্তার হন অগাস্ট স্পিসসহ ৮ শ্রমিক নেতা। ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর অগাস্ট স্পিসসহ ৬ শ্রমিক নেতাকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয় যদিও তারা ছিলেন নিরপরাধ। একজনের ১৫ বছরের জেল হয়। আরেকজন বন্দি অবস্থায় আত্মহত্যা করেন। সেই বোমা নিক্ষেপকারীর পরিচয় অজানাই থেকে যায়।

১৮৮৯ সালে প্যারিসে ফরাসি বিপ্লবের শতবর্ষে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেসে শিকাগোর শ্রমিক আন্দোলন স্মরণে প্রতিবছর পহেলা মে উদযাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরের বছর দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রমিক সংগঠনসমূহ দ্বারা গৃহীত হয়।

১৯০৪ সালে নেদারল্যান্ডসের অ্যামস্টারডামে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্টদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দৈনিক ৮ ঘণ্টা শ্রমসময় নির্ধারণের দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে সারা বিশ্বের মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য পহেলা মে দিবসে কাজ বন্ধ রাখা এবং শান্তিপূর্ণ মিছিল ও সমাবেশ আয়োজনের আহ্বান জানানো হয়। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন এবং কমিউনিস্ট ও বামপন্থি সংগঠনগুলো মে দিবসে শ্রমিকদের কর্মবর্জন ও মিছিল-সমাবেশের আয়োজন করতে থাকে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সাবেক কমিউনিস্ট দেশগুলোতে পহেলা মে সাধারণ ছুটি এবং শ্রমিক দিবস হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হতো। বর্তমানে চীন, উত্তর কোরিয়া, কিউবা ও কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন বিভিন্ন দেশে মে দিবস গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়।
যাইহোক, আজকাল তাদের সরকারগুলির প্রকৃতি নির্বিশেষে বিশ্বের প্রায় সব দেশে তাদের সমস্যাগুলির একটি বর্ধিত উপলব্ধি হয়েছে। শ্রমিকদের উদ্বেগ তাদের সংশ্লিষ্ট সরকারের দ্বারা ভালভাবে সংযত হয়। মানবাধিকার দাবিতে দুর্যোগ লক্ষ লক্ষ মানুষের মানসিক চিকিত্সা। তাদের অধিকার এখন আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত এবং সর্বত্র কাজ করা হচ্ছে। এই স্বীকৃতি স্বরে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) 1919 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এটি 1946 সালে জাতিসংঘের প্রথম বিশেষ সংস্থা হয়ে ওঠে। আইএলও সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানব ও শ্রম অধিকারকে উৎসাহিত করার জন্য নিবেদিত, এটি প্রতিষ্ঠার মিশন অনুসরণ করে শ্রম শান্তি সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। আজ, আইএলও সৎ কাজ এবং অর্থনৈতিক ও কাজের পরিবেশ সৃষ্টিকে অগ্রিম সহায়তা দেয় যা স্থায়ী শান্তি, সুবিধাবাদীতা এবং অগ্রগতিতে মানুষ এবং ব্যবসায়ীদের অংশীদারিত্ব দেয়। তার ট্রিপার্টাইট কাঠামো সমস্ত নারী ও পুরুষের জন্য উপযুক্ত কাজের প্রচারের জন্য একটি অনন্য প্ল্যাটফর্ম সরবরাহ করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে কর্মক্ষেত্রে অধিকার প্রচার করা, সুষ্ঠু কর্মসংস্থানের সুযোগসুবিধা উৎসাহিত করা, সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো এবং কাজের সাথে সম্পর্কিত সমস্যাগুলির উপর সংলাপ জোরদার করা।

ভারতে, প্রথম মে দিবস উদযাপন ১৯২৩ সালে হিন্দুস্তানের শ্রম কিশন পার্টির মাদ্রাজে (চেন্নাই) মেরিনা বিচে সংগঠিত হয়েছিল। এই অনুষ্ঠানটি হিন্দুস্তানের লেবার কিশন পার্টি ও মালয়পুরাম সিঙ্গারভেলু চেটিয়ার দ্বারা সংগঠিত হয়েছিল, যিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হয়েছিলেন। আজ, এটি একটি দেশব্যাপী ব্যাংক এবং সরকারি ছুটির দিন। এটি প্রতিবাদ এবং সমাবেশের জন্য একটি দিন। বিভিন্ন শ্রম ট্রেড ইউনিয়নের মতো সংগঠনগুলি সরকারের সামনে তাদের দাবি তুলে ধরার প্রক্রিয়া চালায়। তারা দাবি করে যে তাদের স্বার্থগুলি তাদের নিয়োগকর্তাদের পাশাপাশি সরকারও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। লাল পতাকা - এখন বাম আন্দোলনের প্রতীক - এই অনুষ্ঠানেও ভারতের প্রথমবারের মত ব্যবহার করা হয়েছিল। একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল যে সরকারকে ছুটির দিন হিসাবে মে দিবস ঘোষণা করা উচিত।

ভারতীয় সংবিধান শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করে পর্যাপ্ত পরিমাণে ধেয়ান দিয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ (১৯-c) অধিকার দিয়েছে যে প্রত‍্যেক নাগরিক সংস্থা বা সমিতি গঠন করতে পারবে। অনুচ্ছেদ ৩৮ এ বলা হয়েছে রাজ‍্য প্রত‍্যেক নাগরিককে উন্নয়নের লক্ষ্যে সামাজিক ন‍্যায়, বৈসাদৃশ্য মিটিয়ে সকলের প্রতি সমান ও উপযুক্ত ব‍্যবস্থা নেয়া। তাছাড়া শুধু ব‍্যক্তিগত ভাবে নয় সমষ্টিগত ভাবেও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া। অনুচ্ছেদ ৩৯ সরাসরি ভাবে রাজ‍্যকে সুরক্ষিত রাখতে হবে-- ১) যে প্রত‍্যেক নাগরিকদের অর্থাৎ সকল নারী পুরুষ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে জীবিকা নির্বাহের ব‍্যবস্থা দিতে হবে। ২) ব‍্যবহার যোগ্য সম্পদ বন্টন করা জনগণের মধ্যে সমান ভাবে। ৩) যে এমন ব‍্যবস্থা নিতে হবে যাতে অর্থনীতির প্রতি খেয়াল রাখা এবং উৎপাদনে ক্ষতির সম্মুখীন না হয়। ৪) প্রত‍্যেক নারী পুরুষের মধ্যে সমকাজে সমপারিশ্রমিক দেয়া, শিশুদের প্রতি খেয়াল রাখা যাতে এদের অপব্যবহার না হয়। এর সাথে লক্ষ্য রাখা যাতে আর্থনীতির উন্নতির জন্য দুর্বলদের প্রতি অনুপযোগী হয়। অনুচ্ছেদ ৪১ বলছে প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। অনুচ্ছেদ ৪২ সরাসরি ভাবে বলছে যে ব‍্যবস্থা রাখা মাতৃত্বের জন্য। অনুরূপ ভাবে অনুচ্ছেদ ৪৩ শর্তআরোপ করছে যে চেষ্টা করা উপযুক্ত আইনপ্রণয়ন করা বা অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রদান করা অথবা শ্রমিক, কৃষক তথা কলকারখানার কর্মীদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক,অবসর, আনন্দ উপভোগ তথা অন্যান্য সুযোগ সুবিধার ব‍্যবস্থা করা। অনুচ্ছেদ ৪৩(A) রাজ‍্যের প্রতি সরাসরি বলছে যে শ্রমিকদের প্রতি উপযুক্ত আইন প্রণয়ন তথা দায়িত্ব গ্রহণ করে মেনেজমেন্ট,কলকারখানার কতৃপক্ষ যাতে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তার ব‍্যবস্থার খেয়াল রাখে।

শ্রমিক এবং কর্মচারীদের সাহায্যের জন্য এখন আমাদের দেশে আলাদা মন্ত্রণালয়ের ব‍্যবস্থা আছে (Ministry of Labour and Employment)। ইহা ভারত সরকারের খুবই পুরাতন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রক। এই মন্ত্রকের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে সাধারণত শ্রমিক তথা কর্মচারীদের রক্ষা ও নিরাপদ রাখা, যারা বিশেষ করে গরীব, পিছিয়ে পড়া, তাদের সুস্থ কর্মসংস্থানের পরিবেশ দেয়া এবং বৃত্তীমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

শ্রমিক কর্মচারীদের উন্নয়নের লক্ষ্যে আমাদের বিভিন্ন ধরণের আইনের আওতায় আনা হয়। তাছাড়া ৪৪ ধরণের সংবিধিবদ্ধ আইনের অভিনীত করেছে কেন্দ্রীয় সরকার নূন্যতম পারিশ্রমিক,দুর্ঘটনা তথা সামাজিক সুরক্ষা, পেশাগত ও শারীরিক সুরক্ষা, শাস্তিমূলক ব‍্যবস্থা, ট্রেন্ড ইউনিয়ন গঠন ইত্যাদি। কিছু শিল্পজাত আইন যেমন ট্রেন্ড ইউনিয়ন আইন ১৯২৬,ট্রেন্ড ইউনিয়ন সংশোধনী আইন ২০০১, শিল্পজাত কর্মসংস্থান আইন ১৯৪৬,শিল্পজাত কর্মসংস্থান নিয়ম ১৯৪৬, শিল্পজাত প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭, শ্রমিক উপনিবেশ আইন (Plantation labour act) ১৯৫১। আরও কিছু আইন যা শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজের সময়,কাজের ধরণ নিরূপণ করে--  ডক কর্মীদের আইন ( সুরক্ষা,স্বাস্থ্য, কল‍্যাণ) ১৯৮৬, খনি সংক্রান্ত আইন ১৯৫২, এবং কলকারখানা সংক্রান্ত আইন ১৯৪৮।

আরও কিছু আইন যা শিশু শ্রমের বিষয়ে তাহলো-- শিশু শ্রম (নিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ) আইন ১৯৮৬,শিশুদের (কাজে বাঁধা দেওয়া) আইন ১৯৩৩। মহিলাদের জন্য সম পারিশ্রমিক আইন ১৯৭৬। সামাজিক সুরক্ষায় আরও কিছু আইন প্রণোদিত করা হয়। কর্মচারী ক্ষতিপূরণ আইন ১৯২৩, কর্মচারী ক্ষতিপূরণ আইন(সংশোধিত) ২০০০, কর্মচারী জীবনবীমা আইন ১৯৪৮, কর্মচারী প্রভিডেন্ট ফাণ্ড এবং বিবিধ নিয়ম সংক্রান্ত আইন ১৯৫২,কর্মচারী প্রভিডেন্ট ফাণ্ড এবং বিবিধ নিয়ম সংক্রান্ত আইন (সংশোধিত) ১৯৯, গ্রেচ‍্যুয়েটি আইন ১৯৭২, কর্মচারী বাধ‍্যবাধকতা সংক্রান্ত আইন ১৯৩৮ এবং মাতৃত্ব সংক্রান্ত আইন ১৯৬১ ইত্যাদি। কিছু আইন আছে মিকা খনি শ্রমিক কল্যাণ তহবিল আইন, ১৯৪৬, লেমস্টোন হিসাবে শ্রম কল্যাণ সম্পর্কিত এবং বেদি শ্রমিক কল্যাণ তহবিল আইন, ১৯৭৬, বেদি শ্রমিক কল্যাণ আইন আইন, ১৯৭৬, বেদি শ্রমিক কল্যাণ আইন আইন বিধিমালা, ১৯৭৭, আয়রন ওরে খনি, মেংগানিজ ওরে খনি এবং ক্রোম ওরে খনি শ্রমিক কল্যাণ তহবিল আইন, ১৯৭৬, আয়রন আকরিক মাইনস, মংানিজ ওরে মাইন্স অ্যান্ড ক্রোম ওরে মাইন্স লেবার ওয়েলফেয়ার সেস অ্যাক্ট,১৯৭৬ এবং সিন ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার ফান্ড অ্যাক্ট, ১৯৮১ ইত্যাদি।

আন্তঃ-রাজ্য অভিবাসী কর্মীদের (কর্মসংস্থান এবং পরিষেবার শর্তাবলী নিয়ন্ত্রন) আইন,১৯৭৯ এর মতো চুক্তি শ্রম সম্পর্কিত কিছু নিয়ম রয়েছে। এছাড়াও বেতন সংক্রান্ত কিছু আইন রয়েছে। এগুলি হল মজুরী পরিশোধ আইন, ১৯৩৬, মজুরির বিধি, ১৯৩৭, মজুরি প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০০৫, ন্যূনতম মজুরী আইন, ১৯৪৮, ন্যূনতম মজুরি (কেন্দ্রীয়) বিধি, ১৯৫০ এবং কর্মরত সাংবাদিক ( মজুরি হার সংশোধন) আইন, ১৯৫৮ ইত্যাদি। এই আইন শ্রম শ্রেণীরকে সুরক্ষা প্রদান করে। যেমন, উদাহরণস্বরূপ, ফ্যাক্টরি আইনটি লোভী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির দ্বারা শোষিত হওয়া থেকে শ্রমিকদের সুরক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে এবং কারখানাটির অভ্যন্তরে কাজের পরিবেশগুলির উন্নতির জন্যও প্রদান করে।

অসংগঠিত সেক্টরের শ্রমিকদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। ২০০৯ -১০ সালে জাতীয় নমুনা জরিপ সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, দেশের আয়োজিত ও অসংগঠিত সেক্টরে মোট কর্মসংস্থান ৪৬.৫ কোটি রুপি ছিল যা সংগঠিত খাতে ২৮ কোটি টাকা ছিল। অলাভজনক সেক্টরে ৪৩.৭ কোটি শ্রমিকের ব্যালেন্স!অসংগঠিত সেক্টরে ৪৩.৭ কোটি শ্রমিকের মধ্যে ২৪.৬ কোটি শ্রমিক কৃষি খাতে কাজ করছে, নির্মাণ কাজে প্রায় ৪.৪ কোটি এবং বাকিরা উৎপাদন ও সেবা করছে। অসংগঠিত সেক্টরের শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, বেতার, হ্যান্ডলুম শ্রমিক, জেলে ও মাছধরা, টডি টেপার, চামড়া শ্রমিক, রোপণ শ্রমিক, বেদি শ্রমিক, 'অসংগঠিত শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা আইন, ২০০৮' প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনের বিধান অনুযায়ী, সামাজিক নিরাপত্তা পরিকল্পনার গঠন, যেমন জীবন ও অক্ষমতা, স্বাস্থ্য ও মাতৃত্ব সুবিধা, বৃদ্ধ বয়স সুরক্ষা এবং সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোন সুবিধা প্রণয়ন করার সুপারিশ করার জন্য একটি জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা বোর্ড গঠন করা হয়েছে। অসমর্থিত শ্রমিকদের জন্য। তারা এখন বীমা কভারেজ দেওয়া হয়।

এই সব সত্ত্বেও, আমাদের স্বীকার করতে হবে যে আমাদের দেশের অ-সংগঠিত সেক্টরে শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি করতে এখনও অনেক কিছু করা উচিত। আইন অনেক কিন্তু সমস্যা তাদের সঠিক বাস্তবায়ন মিথ্যা। স্বল্পমেয়াদী ভিত্তিতে জড়িত গরীবদের প্রতি অবিচারের আশেপাশে এখনও মঞ্জুরিয়া সম্পর্কে বেশিরভাগ বিতর্ক রয়েছে। রিপোর্ট করা হয়েছে যে অসংগঠিত সেক্টরের শ্রমিকরা কম মজুরি এবং সংশোধনমূলক কাজ করে দীর্ঘতর কাজ করতে বাধ্য হয় এই বিষয়ে ব্যবস্থা এখনও প্রণয়ন করা হয়। শ্রমিকরাও তাদের আক্রোশ এবং দুঃখের জন্য আংশিকভাবে দায়ী। শ্রমিক-সংগঠিত ও অসংগঠিত উভয় ক্ষেত্রেই-শ্রেণী বেতনের বিকাশ এখনো হয়নি। একটি 'মিথ্যা চেতনা' দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, তারা এখন বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং উপ-গোষ্ঠীগুলিতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে যার ফলে তাদের ঐক্য ও সংহতির অভাব রয়েছে।

রাজনৈতিক স্বীকৃতি শ্রমিকদের যৌথ যুদ্ধ তাদের সাধারণ maladies জন্য একটি গুরুতর বাধা। রাজনৈতিক দলগুলি শ্রমিকদের প্রকৃত স্বার্থের খরচে তাদের পক্ষপাতমূলক স্বার্থকে উত্সাহিত করার জন্য বিভিন্ন দিক থেকে তাদের আকর্ষণ করে। এভাবে কর্তৃপক্ষ শ্রম সমস্যার মোকাবেলা সহজ করে অন্যের বিরুদ্ধে এক খেলায়। তা সত্ত্বেও, শ্রমিকরা আমাদের দেশের অর্থনীতির পটভূমির কথা অস্বীকার করতে পারে না। আমাদের মতো একটি জাতি প্রকৃতভাবে অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না এবং যদি তার কার্যকর শক্তি অসুখী হয় তবে সেটি সফল হতে পারে না। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধুমাত্র কার্যকর এবং সত্য যখন সরকার ও ব্যবস্থাপনা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কেন্দ্রীয় গুরুত্ব উপলব্ধি করবে। মেশিন এবং প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার সত্ত্বেও শ্রম বা মানুষের হাত তাত্পর্য এখনও আছে। কার্ল মার্কস এভাবে দৃঢ়ভাবে দৃঢ়ভাবে দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন যে, শ্রম একটি ভাল মানের মান যোগায়। অতএব, সরকারকে তার কার্যকে অসন্তুষ্ট করতে সরকারের পক্ষ থেকে অসন্তুষ্ট হতে হবে। একই সাথে, এটি নিশ্চিত যে শ্রমিকরা বিভক্ত এবং নীরব বসে বসে স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচার পাবে না। মার্কস বলেছিলেন, তাদেরকে তাদের শৃঙ্খলা ছাড়া কিছুই হারাতে হবে না কারণ তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
ভারত, বাংলাদেশসহ এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের ৮০টিরও বেশি দেশে মে দিবস সাধারণ ছুটি ও শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে মে দিবস শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয় না। যুক্তরাষ্ট্রে সেপ্টেম্বর মাসে শ্রমিক দিবস পালিত হয়। শ্রম দিবসটি শিথিল এবং পুনরুজ্জীবিত করার সময়। এটি এমন সময় যারা সম্মানিত শ্রমিকদের অধিকারের জন্য লড়াই করে এবং সংস্কার নিয়ে আসে তাদের সম্মানের সময়। এটি শুধুমাত্র অল্প কয়েকজন লোকের কাছে এসেছিল এবং অন্যদেরকে এমন কাজ করার জন্য উত্সাহিত করেছিল যাতে শ্রমিকদের তাদের বৈধ অধিকার দেওয়া হয়।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...