"Not all battles are fought for victory. Some are fought to tell the world that someone was there on the battlefield"
--- রাবিশ কুমার
সম্ভবত "টিভি জার্নালিজম"- এর অধ্যায়টা শেষ হল। এনডিটিভিকে এখন আদানিদের সংবাদমাধ্যম বলতে আর কোনো সংশয় নেই। ১৯৮৪ সালে প্রণয় রায় এবং রাধিকা রায় নিউ দিল্লি টেলিভিশন লিমিটেড (NDTV) শুরু করেছিলেন। ঠিক তখনই প্রাথমিকভাবে সংবাদের প্রোডাকশন কোম্পানি হিসেবে পথ চলা শুরু করেছিল এনডিটিভি।ভারতের টেলিভিশন দুনিয়ায় এনডিটিভি সংস্থা প্রথম স্বাধীন সংবাদসংস্থা হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। গোটা টেলিভিশন দুনিয়া তখন সরকারি দূরদর্শনের হাতে। এনডিটিভি সেই সময় থেকে নিউজ প্রোডাকশন হাউস হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। ১৯৯৮ সাল থেকে এনডিটিভি ভারতের প্রথম ২৪ ঘণ্টার স্বাধীন সংবাদ চ্যানেল হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। সে সময় স্টার ইন্ডিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজ শুরু করেছিল এনডিটিভি। ২০০৩ সালে এনডিটিভি ২৪ ঘণ্টার হিন্দি চ্যানেল এবং পরবর্তী সময়ে ২৪ ঘণ্টার বানিজ্য চ্যানেলও শুরু করে।
ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম' সংস্থা প্রতিবছরই বিভিন্ন দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার তালিকা প্রকাশ করে৷ দেখা যাচ্ছে, দু'বছর আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের স্থান ১৩৩ হলেও গত বছর সেটা এসে দাঁড়িয়েছে ১৩৬-তে৷ আর এ বছর তা আরও দু'ধাপ নেমেছে৷ গ্লোবাল মিডিয়া ওয়াচডগ রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২২ সালের বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারতের র্যাঙ্কিং ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫০-এ নেমে এসেছে। বিগত বছরের রিপোর্টে, ভারত ১৪২ তম স্থানে ছিল। সর্বোচ্চ সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় শীর্ষ তিনটি দেশের অবস্থান, নরওয়ে (৯২.৬৫ স্কোর), ডেনমার্ক (৯০.২৭) এবং সুইডেন (৮৮.৮৪)। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে শীর্ষস্থান পেয়েছে নরওয়ে৷ এই নিয়ে টানা দু'বছর শীর্ষস্থানে তারা৷
বিশ্বের সবচেয়এ বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত৷ এ দেশে আইনসভা, আমলাতন্ত্র এবং বিচারব্যবস্থার পর সংবাদমাধ্যমকে বলা হয়, ‘গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ'৷ সেই স্তম্ভ এখন নড়বড়ে৷ বলছে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকের স্বাধীনতারক্ষা সংগঠন ডাব্লিউপিএফ৷ গত ২৫শে এপ্রিল এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি তাদের সমীক্ষার ফল প্রকাশ করেছে৷ রিপোর্ট মতে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় একসঙ্গে আরও দু'ধাপ তলিয়ে গিয়েছে ভারত৷ স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের তালিকায় ভারতের স্থান ছিল ১৩৬ নম্বরে৷ এবার তা ১৩৮ নম্বরে গিয়ে ঠেকেছে৷ ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া, দাম দিয়ে কেনার চেষ্টা ছাড়াও সাংবাদিকদের প্রাণনাশের ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে৷ রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স বা আরএসএফ-এর এই বার্ষিক রিপোর্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের খুন হওয়ার ঘটনা৷ তালিকার সবচেয়ে নীচে স্থান পেয়েছে উত্তর কোরিয়া৷ তার ঠিক ওপরেই রয়েছে এরিট্রিয়া, তুর্কমেনিস্তান, সিরিয়া এবং চীন৷ তবে গত বছরের মতো এবারও চীন নিজেদের অপরিবর্তিত রেখেছে৷
মুক্তমনা বুদ্ধিজীবী হত্যা আগেই শুরু হয়েছিল। ২০১৩ সালের আগস্টে জাতপাতবিরোধী সামাজিক কর্মী ও মুক্তমনা নরেন্দ্র দাভোলকরকে খুন করে হিন্দুত্ববাদীরা। ২০১৫ সালে খুন হন উগ্র হিন্দুত্বের সমালোচক গোবিন্দ পানসারে এবং প্রথিতযশা পণ্ডিত এমএম কালবুর্গি। ভারতে যুক্তি, মুক্তবুদ্ধি, উদারতার যে আর কোনও স্থান নেই, একের পর এক হত্যাকাণ্ডে সে কথাই যেন বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে হত্যাকারীরা। স্বাভাবিক ভাবেই ছাড় মেলেনি সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের। একের পর এক সাংবাদিককে ধর্ষণ ও খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, সরকারের ও কর্পোরেটের মনপূত খবর হয়নি বলে সরে যেতে হয়েছে হিন্দুস্তান টাইমসের সম্পাদক ববি ঘোষ, ইপিডব্লিউ’র সম্পাদক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা, এবং দ্য ট্রিবিউনের হরিশ খারের মতো প্রবীণ সম্পাদককে।
আরও উল্লেখযোগ্য ভাবে সংস্থাটির সমীক্ষা রিপোর্টে সংবাদমাধ্যমের এই অধঃপতনের জন্য ‘উগ্র হিন্দুত্ব' এবং ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ'-কে দায়ী করা হয়েছে৷ অর্থাৎ আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থাটি তাদের সমীক্ষায় এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী দিকেও আঙুল তুলেছে৷ বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে ভারতে মহিলা সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ-সহ মোট তিন জন খুন হয়েছেন৷ বহু ক্ষেত্রে আইনের অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে৷ ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪-এ ধারায় মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে৷ বলা হয়েছে, ভারতীয় জনতা পার্টির তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগের কর্মীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত সাংবাদিকদের অনুসরণ করেন৷ সেইসঙ্গে গালমন্দ করেন৷ অপমানজনক পোস্ট করেন৷ এমনকি সাংবাদিকদের প্রকাশ্যে খুনের হুমকিও দেন৷ সংবাদপত্রে সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেই সুকৌশলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে ‘দেশদ্রোহী' বা ‘জাতীয়তাবাদ-বিরোধী' তকমা সেঁটে দেওয়ার কাজ করে থাকেন শাসকদলের তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগের কর্মীরাই৷ নিউজ ওয়েবসাইট দ্য কুইন্টের সাংবাদিক দীক্ষা শর্মা ও মহম্মদ আলি, সংবাদসংস্থা এএনআই-এর অভয় কুমার, ফার্স্টপোস্টের দেবব্রত ঘোষ, এনডিটিভি’র সোনাল মেহরোত্রা কাপুরকে এমনই হুমকির মুখে পড়তে হয়। ধারাবাহিক ভাবে চূড়ান্ত হেনস্থার শিকার রানা আয়ুব, সাগরিকা ঘোষ, মতো নামজাদা সাংবাদিকরাও।
কৃষক দুর্দশা, গোরক্ষক বাহিনী, নিছক জাত-পাত ও নারী সুরক্ষার মতো বিষয়গুলিতে সরকারের সমালোচনা করলেই ধেয়ে আসছে হুমকি৷ অনেকেই ভয় পেয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছেন৷ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছেন৷ আর যাঁরা ভয় না পেয়ে নিজেদের কাজ করে চলেছেন, তাঁরা হয় খুন হচ্ছেন, নয়ত শারীরিক ভাবে নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন৷ নিঃসন্দেহে বিষয়টা শোচনীয়৷ সম্প্রতি সরকার-স্বীকৃত সাংবাদিকদের স্বীকৃতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি৷ দেশের তো বটেই সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক স্তরে নিন্দিত হওয়ার পরে তিনি পিছু হটেছেন৷ তবে সূচকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের স্থান নেমে যাওয়ার পেছনে সংবাদমাধ্যমের নিজের ভূমিকাও রয়েছে৷ বিশেষজ্ঞদের মতে, মিডিয়া-হাউসগুলি সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করছে৷ কেউ কেউ প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে ভুয়ো সংবাদ পরিবেশন করছেন৷ এগুলো বন্ধ না হলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা অসম্ভব৷ তাইতো আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এনভি রামানা, আগে যেভাবে আলোড়ন ফেলা খবর প্রকাশ করত সংবাদমাধ্যম, তেমনটা আর দেখা যায় না এখন।
আজকের সংবাদ মাধ্যমের বিষয়ে ব্যক্তিগত মতামত জানানোর স্বাধীনতা হারিয়ে যাচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত ভাবে তদন্তমূলক সাংবাদিকতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের দুনিয়া থেকে। যেখানে কথা ছিল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সমষ্টিগত ব্যর্থতা তুলে ধরা সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক তৈল মর্দন কোন ভাবেই প্রশ্রয় দেয়া ঠিক নয়। এক কথায়, জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব নিতে হবে সংবাদ মাধ্যমকে। একটা সময় ছিল যখন অধীর আগ্রহে সংবাদপত্রের অপেক্ষায় থাকতাম। সেই সময়ে দেশের বড় বড় সব কেলেঙ্কারি ফাঁস করেছে সংবাদমাধ্যমে। তখন সংবাদপত্রগুলি আমাদের হতাশ করেনি। গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে লেখা সংবাদপত্রের প্রতিবেদন পরবর্তীতে গুরুতর প্রভাব ফেলত। কিন্তু এখন, একটি বা দুটি বাদে, সেই ধরনের সাড়া ফেলে দেওয়া কোনও প্রতিবেদন চোখে খুবই কম পড়ে।
গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদ মাধ্যম। নির্ভীক সংবাদ পরিবেশনই এই স্তম্ভকে শক্তিশালী করে তুলে, যার ওপর ভিত্তি করে শক্তিশালী হয় গণতন্ত্র। সেখানে তদন্তমূলক সাংবাদিকতা বরাবরই সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। কিন্তু বর্তমানে সংবাদ পরিবেশন নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে।সাংবাদিক, প্রতিষ্ঠান, বহু ক্ষেত্রেই উঠছে প্রশ্ন। খবরের চ্যানেল দেখলেই বোঝা যায় যে মোটামুটিভাবে একপক্ষীয় খবরেরই প্রাধান্য পায় সেখানে। জনগণের মনে প্রশ্ন এনডিটিভির মালিকানা বদলে ভারতে অন্য কেউ কি সরকারকে এভাবে চ্যালেঞ্জ করবে ? সরকার-বিরোধী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল এনডিটিভি। সন্ধ্যার পর যখন প্রায় সব খবরের চ্যানেলে একতরফা খবর পরিবেশন করে এই অবস্থায় কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা যেত এনডিটিভিতে। আসলে আশায় মরে চাষা, সেই অর্থে এখন আমরা প্রত্যেকেই চাষা। সেই আশা, লাল-নীল-গেরুয়া ‘রঙ’ ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া একদিন আর কঠিন মনে হবে না। ‘কাইট-ফ্লায়িং জার্নালিজম', ভারতের সাংবাদিকতা চমক সৃষ্টিতে যতটা এগিয়ে যাচ্ছে–দায়িত্ববোধ, বস্তুনিষ্ঠতা ও সততার বিচারে ততটাই পড়ছে পিছিয়ে।
No comments:
Post a Comment