Wednesday, September 21, 2022

আইএনএস বিক্রান্ত, 'সাগরের সিকান্দার'

দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা অটুট রাখতে আরও এক ধাপ এগোল ভারত। গত ২ সেপ্টেম্বর কোচিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে আইএনএস বিক্রান্ত তুলে দেওয়ার ফলে শুধুমাত্র যে ভারতের হাতে দ্বিতীয় এক বিমানবাহী রণতরী এল তা-ই নয়, সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বিক্রান্ত ভারতকে সেই আন্তর্জাতিক কুলীন গোষ্ঠীতে স্থান দিল, যারা একক প্রচেষ্টায় এ-হেন বৃহৎ মাপের রণতরী বানাতে সক্ষম।

 প্রথমত লক্ষণীয় বিষয় যে ভারতে নির্মিত আইএনএস বিক্রান্তে ব্যবহৃত সমস্ত কিছুই স্বদেশীয় নয়। অর্থাৎ কিছু যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকেও আমদানি করা হয়েছে। যাইহোক, সমগ্র প্রকল্পের ৭৬ শতাংশ দেশে উপলব্ধ সংস্থান দ্বারা গঠিত। এটি অবশ্যই একটি বিরাট অর্জন। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের আমলে আইএনএস বিক্রান্তের নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। ২০১৩ সালের ১২ অগস্ট কোচিতে সেই কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী একে অ্যান্টনি।

যুদ্ধজাহাজ বিক্রান্ত নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় স্তরের ইস্পাত প্রস্তুত করেছিল স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (SAIL)। এই স্টিল তৈরিতে ভারতীয় নৌবাহিনী এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন গবেষণাগারের (ডিআরডিএল) সহায়তাও নেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছে যে SAIL-এর এই ইস্পাত তৈরি করার ক্ষমতা ভবিষ্যতেও দেশকে অনেক এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। নৌবাহিনীর মতে, এই যুদ্ধজাহাজের জিনিসপত্র দেশীয়, যার মধ্যে রয়েছে ২৩ হাজার টন ইস্পাত, আড়াই হাজার টন ইস্পাত, ২৫০০ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক তার, ১৫০ কিলোমিটার পাইপ এবং ২০০০টি বাল্ব। এ ছাড়া এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ারের অন্তর্ভুক্ত হুল বোট, এয়ারকন্ডিশন থেকে শুরু করে রেফ্রিজারেশন প্ল্যান্ট এবং স্টিয়ারিং যন্ত্রাংশও দেশেই তৈরি হয়েছে।

সরকারী তথ্য অনুসারে, ভারতের অনেক বড় উদ্যোগীক নির্মাতারা এই বিমানবাহী রণতরী নির্মাণে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে ভারত ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড (BEL), ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড (BHEL), কির্লোস্কর, এলএন্ডটি (L&T), কেলট্রন, জিআরএসই, ওয়ার্টসিলা ইন্ডিয়া এবং অন্যান্য। এছাড়া জাহাজে দেশীয় যন্ত্রপাতি তৈরিতেও সহায়তা করেছে শতাধিক মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প।
বর্তমানে মাত্র পাঁচ থেকে ছয়টি দেশের বিমানবাহী রণতরী তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। এখন ভারতও এই ক্যাটাগরিতে যোগ দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ভারতের একটি বিমানবাহী রণতরী নির্মাণ নৌক্ষেত্রে তার সক্ষমতা দেখিয়েছেন বিশ্বদরবারে।

আসলে, অতীতেও ভারতের বিমানবাহী রণতরী ছিল। তবে ছিল ব্রিটিশ বা রাশিয়ান। যেখানে আগে ভারতের দুটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার - আইএনএস বিক্রান্ত-1 এবং আইএনএস বিরাট ছিল ব্রিটেন থেকে কেনা 'এইচএমএস হারকিউলিস' এবং 'এইচএমএস হার্মিস'। একই সময়ে, ভারতীয় নৌবাহিনীর একমাত্র বিমানবাহী জাহাজ - আইএনএস বিক্রমাদিত্য, সোভিয়েত যুগের যুদ্ধজাহাজ - 'অ্যাডমিরাল গোর্শকভ', যা ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে কিনেছিলো। অর্থাৎ আইএনএস বিক্রান্তকে নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করায় ভারত এখন বিমানবাহী রণতরী নির্মাণে সক্ষম দেশ হয়ে উঠেছে।

 মজার ব্যাপার হল ভারতে নির্মিত প্রথম এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ারের নাম আইএনএস বিক্রান্ত। যেখানে এর আগে ভারতের প্রথম এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার - এইচএমএস হারকিউলিস যা ব্রিটেন থেকে কেনা হয়েছিল এর নামও আইএনএস বিক্রান্ত ছিল। বলা হয়, এর পেছনে রয়েছে ভারতের প্রথম বিমানবাহী রণতরীটির প্রতি ভালোবাসা ও গর্বের অনুভূতি। 1997 সালে ডিকমিশন হওয়ার আগে, আইএনএস বিক্রান্ত সময়ে সময়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় নৌবাহিনীকে শক্তিশালী রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

এই দিনে প্রধানমন্ত্রী নতুন প্রতীক-যুক্ত নৌবাহিনীর পতাকারও উন্মোচন করলেন। নৌবাহিনীর পতাকায় প্রতীক পরিবর্তন নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু এই বার ঔপনিবেশিক আমলের স্মৃতিবাহী সেন্ট জর্জ’স ক্রস সরিয়ে সেখানে জাতীয় পতাকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছত্রপতি শিবাজির সময়ের মুদ্রার প্রতীক। বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য "নৌবাহিনীর প্রতীকে তাঁকে স্থান দেওয়ার অর্থ সেনাবাহিনীর ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিটি নষ্ট করার সচেতন প্রয়াস। তাঁর ভাষণের মধ্য দিয়েও যেন প্রধানমন্ত্রী প্রকারান্তরে বোঝাতে চেয়েছেন, ঔপনিবেশিক গোলামি থেকে মুক্ত হয়ে নৌসেনা অতঃপর হিন্দু জাতীয়তাবাদের দিকে পা বাড়াল। স্মরণে রাখা ভাল, একটি গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী কোনও দলীয় মতাদর্শ প্রচারের স্থান নয়। নৌবাহিনীর এক উজ্জ্বল দিনে ঠিক সেই কাজটিই করে নরেন্দ্র মোদী দেশের গৌরবকেই খাটো করলেন।" তবে বিক্রান্তের মোতায়েন, প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের স্বনির্ভরতার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আইএনএস বিক্রান্ত ভারত-প্যাসিফিক এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলে আগামী দিনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে অবদান রাখবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

Saturday, September 10, 2022

বিদ্যালয় একত্রিকরণ ও কিছু কথা


সাক্ষরতা একটি মানবাধিকার। দারিদ্র দূর করে সকলের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ৫০ বছরের বেশি হল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয় প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে। ৮ সেপ্টেম্বর সারা বিশ্বে জুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস (International Literacy Day)। বিশ্ব জুড়ে নিরক্ষরতা দূর করে স্বাক্ষরতা এবং শিক্ষার হার বাড়ানোর লক্ষ্যে ইউনেস্কোর তরফে এই দিনটির প্রচার করা হয়। সকলকে এই দিনটির মাধ্যমে বোঝানো হয় শিক্ষা এবং স্বাক্ষরতার গুরুত্ব, এবং এটা কীভাবে মানুষকে তাঁর সামাজিক অধিকার এবং মানবাধিকার পেতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধি মানেই দারিদ্র, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার দিকে এগোনো। শিক্ষাকে সব স্তরে পোঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ১৯৬৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দিনটিকে প্রথম আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস বা ‘ইন্টারন্যাশনাল লিটারেসি ডে’ হিসাবে ঘোষণা করেছিল। সেদিন থেকে প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্তে, নানা দেশে এই দিনটি নানা ভাবে আন্তর্জাতিক সক্ষরতা দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে।

আচ্ছা এখন সাক্ষরতা প্রসঙ্গের সাথে মিল রেখে অন্য কথায় যাওয়া যাক। রাজ্যের কিছু সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকার কর্তৃক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো চলছে একত্রিকরণ। ২০টি জেলার ১৭১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ করে কাছাকাছি বিদ্যালয়ের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। আগের সরকারের আমলে রাজ্যে প্রায় ৭,০০০ প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে আশেপাশের স্কুলের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছিল। 2022 সালের ম্যাট্রিক পরীক্ষায় শূন্য ফলাফল দেখায় সরকার ১৫টি জেলার ৩৪টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং হাই মাদ্রাসা বন্ধ করার কাজ সম্পন্ন করেছে । সরকার নিশ্চিত যে সেই বিদ্যালয়সমূহে শিক্ষক ভালভাবে পড়ান নাই, সেই বিদ্যালয়গুলোতে থাকা সেই অঞ্চলের জনগণ পঢ়াশোনার প্ৰতি আগ্রহী নয়, সেই অঞ্চলের শিক্ষাৰ্থীদের সরকারের হয়ে চিন্তা করা সকলের একই ধারণা যে এরা ‘গাধা’। সেইজন্য ‘গাধা’র নামে সরকারি ধন খরচ হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। এবার স্পষ্টভাবে বলি তাদেরকে ‘গাধা’ বলে সম্বোধন আমি করছি না বা এই স্পর্ধা আমার নেই। সরকারের হয়ে চিন্তা করা সকল, মন্ত্ৰী-বিধায়ক, পরামৰ্শদাতা একাংশ বুদ্ধি দিয়ে চলা লোক, স্ব-স্বাৰ্থসিদ্ধির জন্য সরকারের কথায় তাল মিলিয়ে গান গাওয়া সকলের চিন্তাতেই সেই অঞ্চলের শিক্ষাৰ্থীরা ‘শিক্ষার প্ৰতি আগ্রহহীন’, ‘গাধা’। সরকার পক্ষের কাউকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তারা সঙ্গে সঙ্গে বলে দেবে না। কিন্তু স্কুল বন্ধের কারণ ব্যাখ্যা করা গেলে সবাই বুঝতে পারবে এটাই চূড়ান্ত সত্য।

বন্ধ স্কুলগুলোর শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সরকার। সরকার কি তথ্য প্রমাণ করাতে পারবে যে একজন শিক্ষকের অবহেলার কারণে একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান খারাপ হয়েছে? যে সরকার স্কুলটি বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে তারা কি প্রমাণ দিয়ে জনগণকে বোঝাতে পারবে যে স্কুলটি এলাকায় অবস্থিত সেখানে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার কোন প্রভাব নেই?

সরকার কি নিশ্চিত যে, এবার যারা ব্যর্থ হয়েছে তাদের ছাড়া যেসব এলাকায় শিক্ষার মান খারাপের অভিযোগে স্কুল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেখানে আর কোনো শিক্ষার্থীর জন্ম হবে না? সেসব স্কুলের আওতাভুক্ত এলাকায় যদি আর কোনো মানুষ না জন্মায়, সরকার নিশ্চিত যে এটাই শেষ প্রজন্ম, তাহলে বেশি কিছু বলার দরকার নেই। সরকারের চোখে 'গাধা' প্রমাণিত শিশুরা যখন সই করতে জানে তখন তারা পড়া বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু সরকার যদি নিশ্চিত না হয় যে ওইসব এলাকায় আর কোনো শিশুর জন্ম হবে না, তাহলে উঠতি শিশুরা স্কুলে যাবে কোথায়? নাকি সরকার ওইসব এলাকায় ‘গাধার’ জন্ম দেওয়া বন্ধ করার জন্য বাধ্যতামূলক বন্ধ্যাকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে, যাতে সেখানে আর স্কুলের প্রয়োজন না হয়!

ফলাফলের উপর ভিত্তি করে একটি বিদ্যালয় বন্ধ করা হলে এলাকায় শিক্ষার মারাত্মক ক্ষতি হয়। এলাকায় এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে দেওয়া হয় না। দরুন মাজুলির একটি গ্রামের একমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি পরীক্ষায় ফেল করার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কারণে বন্ধ করা শিশুদের কথা না বললেও স্কুলের বাকি শিক্ষার্থীদের কী হবে? যদি তারা পড়াশোনা করতে চায় তবে তাদের একটি বা দুই নদী পার হতে হবে বা বালির মধ্যে দিয়ে দুই তিন কিলোমিটার দূরে অন্য স্কুলে হেঁটে যেতে হবে। বর্ষায় তো সেভাবে যাওয়াই যায় না।

এভাবে এক স্কুলের শিক্ষার্থীরা যখন অন্য স্কুলে চলে যায়, তখন কি ওই স্কুলে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য জায়গা থাকবে? যেসব স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের ওপর এভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে সরকার পক্ষ থেকে কি বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেয়া হবে ?

বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের কী হবে? তাদের তো ঐ স্কুলের প্রয়োজনে রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের পড়াতে ও পাস করতে না পারায় 'অদক্ষ' শিক্ষক-কর্মচারীরা বিলম্বে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে বিরত রাখা হবে ?না, চাকরি পরিবর্তন হয়ে যাবে! বন্ধ স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কী হবে? তিনি কি আবার সহকারী শিক্ষক হবেন? পদের অবনতি হলে ওই প্রধান শিক্ষকরা কি আইনি ব্যবস্থা নেবেন না? নাকি অন্য শিক্ষকদেরও জ্যেষ্ঠতা হ্রাস পেলে তারা চুপ থাকবে? কারণ সরকারি চাকরিতে জ্যেষ্ঠতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেহেতু এখন পর্যন্ত চাকরি সংক্রান্ত কোনো আপত্তি লক্ষ্য করা যায়নি, তাই বোঝা যায় তাদের জ্যেষ্ঠতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বন্ধ স্কুলের নামে রয়েছে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী। তাহলে স্কুল বন্ধের শাস্তি কার? শাস্তি শুধু স্কুলের আওতাভুক্ত এলাকার মানুষ ও ছাত্র ছাত্রীদের। অর্থাৎ হয়রানির শিকার শুধু এরাই।

বন্ধ স্কুলের ঘর ও অন্যান্য সম্পত্তির কী হবে? সংক্ষেপে, ঘরটি মর্গে পরিণত হবে, দুষ্টচক্রের জন্য মদ এবং জুয়ার আসর হবে। আর কিছু হোক আর না হোক ! সরকার নির্দেশ দিতে পারে যে অন্যান্য সম্পত্তি প্রতিবেশী স্কুলগুলিতে হস্তান্তর করা হবে কিন্তু তা কি হস্তান্তর করতে রাজি হবে স্কুল কমিটির সদস্য বা এলাকার মানুষ ? দেশে অনেক স্কুল আছে যেগুলো জনগণের অনুদানে কেনা হয়েছে জনগণ কি সহজে তাদের নির্মাণ ও অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি ছেড়ে দেবে? ফলস্বরূপ, অনেক সম্পত্তি ধ্বংস হবে, বা হারিয়ে যাবে। তবে স্বাধীনতা দিবস ও প্রজাতন্ত্র দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে হবে শিক্ষক-কর্মচারীদের। স্কুল বন্ধ করার ক্ষেত্রে সরকারের মূল উদ্দেশ্য ব্যয় কমানো। এমন বিভ্রান্তির কারণে যদি স্কুল বন্ধ থাকে, তাহলে খরচ কমবে কোথায়? বিদ্যালয় বন্ধ করে একটি এলাকার শিশু ও জনগণের অসুবিধা সৃষ্টি করা ছাড়া আর কিছুই হবে না।

"সরকার স্কুল বন্ধ করার আরেকটি গোপন কারণ হল শিক্ষার সম্পূর্ণ বেসরকারীকরণ। একের পর এক সরকারি সম্পদ বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দেওয়ার পর কোনো দপ্তরকে দক্ষতার সঙ্গে চালাতে অযোগ্য মন্ত্রীদের ভরপুর সরকার শিক্ষা সম্পূর্ণভাবে কোনো না কোনো মালিকের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে নানা অজুহাতে স্কুল বন্ধ করে দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুল ইন্টিগ্রেশন। বিভিন্ন কারণে সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বেসরকারি খাতে পাঠাতে বাধ্য হবেন।"

ইতিমধ্যে, বেশিরভাগ উচ্চ ও মধ্যবিত্ত এবং কিছু নিম্ন মধ্যবিত্তরা বেসরকারি স্কুলগুলির প্রতি মুগ্ধ। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। বিভিন্ন কারণে, আমিও আমার সন্তানদের বেসরকারি স্কুলে পাঠাই। তবে সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে কিছু নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র অভিভাবকদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা গ্রহণে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হবে হয়তো এটি সরকার কর্তৃক বুঝতে বোধহয় অসুবিধা হচ্ছে।

এর ফলে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখা সুবিধাভোগীদের সরকার পক্ষে রাজনৈতিক লাভ হবে। তাহলে যে রাজনীতিবিদরা একদল অশিক্ষিত মানুষকে দেশের নাগরিক বানিয়েছেন এবং রাজনীতিবিদরা তাদের সন্তানদের ইংল্যান্ড বা দেশের স্টার স্কুলে পড়ান, তাদের পক্ষে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিকল্পিত ভাবে রাজনীতি পরিচালনা করা সহজ হবে। কারণ সেই অশিক্ষিত নাগরিকরা সরকারের উপকারভোগী এবং শক্তিশালী সমর্থক হয়ে উঠবে। সেই ক্যাটাগরিতে সংখ্যা বাড়বে। কারণ দেশে দারিদ্র্যসীমার ওপারে ভোটারের সংখ্যা এখনো কম নয়। এই দরিদ্রদের অবস্থার কোন উন্নতি হবে না, শিক্ষার অভাব তাদেরকে আরও দরিদ্র করে তুলবে। স্কুল বন্ধ করে সরকার এমন দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্র করবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

সরকার বিভিন্ন জায়গায় মডেল স্কুল খুলেছে। সরকার কি স্কুল খোলায় শতভাগ পাসের নিশ্চয়তা দিতে পারে? সরকার কি বন্ধ স্কুলের সব শিক্ষার্থীকে এসব স্কুলে ভর্তি করা নিশ্চিত করবে? আমরা আশা করি যে জনপ্রতিনিধিরা জনগণের উদ্বেগের মধ্যে দিনরাত কাটান তারা যে সমস্ত এলাকায় বিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সেখানে সকল শিক্ষার্থীর জন্য সহজলভ্য শিক্ষা নিশ্চিত করবেন। এটাও উল্লেখ করা দরকার যে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। এর সঙ্গে সরকারের গুণগত ও উন্নত পরিকাঠামো দেয়ার পরিবর্তে শিক্ষানুষ্ঠান সমুহকে চিরতরে বন্ধ করে দেয়া রাজ্যজুড়ে এক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন দল, সংগঠন, ব্যাক্তি বিশেষ সরকারের এই সিদ্ধান্তকে পুনঃ বিবেচনা করার জন্য দাবি জানিয়েছে।

Friday, September 9, 2022

ইজরায়েল অধিকৃত গোলান হাইটস





বর্তমান বিশ্বের বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ভূখণ্ড হচ্ছে গোলান হাইটস। যাকে নিয়ে ১৯৬৭ সাল থেকে ইজরায়েল এবং সিরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ, সংঘাত এবং বিবাধ চলে আসছে। আরব এবং ইজরায়েলের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ১৯৪৮-৪৯ সালে। এবং এর পরবর্তীতে প্রধানত ১৯৫৬ সালে দ্বিতীয় যুদ্ধ, ১৯৬৭ সালে তৃতীয় যুদ্ধ,১৯৭৩ সালে চতুর্থ যুদ্ধ, এবং ১৯৮২ সালে পঞ্চমতম যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটেছিল।পেলেস্টাইন কে কেন্দ্র করে ১৯৬৭ সালে ইজরায়েলের সাথে ইজিপ্ট, সিরিয়া এবং জর্ডানের মধ্যে তৃতীয় বৃহৎ যুদ্ধের সূচনা হয়। ইতিহাসে 'সিক্স ডে ওয়ার' হিসেবে চিহ্নিত এই যুদ্ধে ইজরায়েল গাজা স্ট্রীপ এবং সিনাই উপদ্বীপ ইজিপ্টের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছিল। জর্ডানের কাছ থেকে ইজরায়েল পূর্ব জেরুজালেম এবং ওয়েষ্ট বেংক অধিকার করে। এবং এর সঙ্গে সিরিয়ার 'গোলান হাইটস' অবৈধভাবে দখল করে নেয় ইজরায়েল।

ইজরায়েল এবং আরও তিনটি রাষ্ট্র ক্রমে ইজিপ্ট, সিরিয়া এবং জর্ডানের মাঝে চলা ছয়দিনের যুদ্ধ ১৯৬৯ সনের ৫জুন থেকে ১০ জুন পর্যন্ত চলছিল। এই যুদ্ধে আরবের এই কয়টি রাষ্ট্র ইজরায়েলের হাতে পরাস্ত হয়। ইজরায়েল এই যুদ্ধে সিরিয়ার অতি মূল্যবান ভূখণ্ড 'গোলান হাইটস' দখল করে ইহাতে আজও কব্জা করে রেখেছে। ইজরায়েল সিরিয়ার কাছ থেকে 'গোলান হাইটস' বলপূর্বক ভাবে কেড়ে নেয়ার ঘটনাটা ইতিমধ্যে (১৯৬৭-২০২২) পঁচপান্ন বছর সম্পূর্ণ হল। ১৯৭৩ সনে পুণ: 'গোলান হাইটস' কে কেন্দ্র করে ইজরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে চতুর্থতম যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ঠিকই। তবে এই যুদ্ধে আবারও ইজরায়েলের হাতে সিরিয়া পরাজয় বরণ করে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বিগত ৭৫ বছরে পেলেস্টাইন এবং 'গোলান হাইটস' - র বিষয় দুটি সর্বাধিক চর্চিত।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে অস্থিরতার প্রধান কারণ হচ্ছে ইজরায়েলের কর্তৃত্বশীল সম্প্রসারণ। 'গোলান হাইটস' কে কেন্দ্র করে সুদীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে ইজরায়েল এবং সিরিয়ার মধ্যে চলে থাকা হিংসাত্মক ঘটনা প্রবাহের বিষয়ে জানার জন্য আমাদের কুড়ি শতকের ভূ-রাজনৈতিকের ইতিহাস অধ্যয়ণের প্রয়োজন। গ্রেটব্রিটেনের ভূতপূর্ব বৈদেশিক সচিব আর্থোর জেমস্ বালফে- র ১৯১৭ সনের ৭ নভেম্বর জারি করা 'Balffur Declaration ' অনুসারে আরব পেলেস্টাইনের ভূখণ্ডে ইহুদীদের জন্য একটি পৃথক দেশ গঠনের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৮) প্রবল প্রতাপশালী অটোমান তুর্কী,অষ্ট্রিয়া,হাংগেরী, জার্মানি, এবং বুলগেরিয়া বিধ্বস্ত হওয়ার পর সমগ্র পৃথিবীর সমীকরণ পাল্টে যেতে থাকে। বিশ্বে প্রথমবারের মতো ১৯২০ সনে গঠন হয় 'জাতিসংঘ' নামক এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা। আধুনিক যুগের পেলেষ্টাইন এবং সিরিয়া এই সময়ে অটোমান তুর্কীর অধীনে ছিল। অটোমান তুর্কীরা ১৫১৬ সন থেকে ১৯১৭ সন পর্যন্ত সেলেস্টাইন এবং সিরিয়া সম্পূর্ণ ৪০১ বছর রাজত্ব করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের অনুমোদন অনুসারে পূর্বের অটোমান সাম্রাজ্যের অংশস্বরূপ সেলেস্টাইন বিট্রিশের অধীনে আসে এবং ফ্রান্স দখল করে সিরিয়া। কিন্তু ১৯৩৯ সন থেকে ১৯৪৫ সন পর্যন্ত আবার পৃথিবীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হওয়ায় জাতিসংঘের প্রাসংগিকতা শেষ হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিরা জার্মানির সঙ্গে জাপান ও ইতালিতে পতন হওয়ার পর বিশ্ব শান্তি এবং নিরাপত্তার জন্য ১৯৪৫ সনে রাষ্ট্রসঙ্ঘ (UN) এর জন্ম হয়। রাষ্ট্রসঙ্ঘ গঠনের সাথে সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসি জার্মানিতে ইহুদীদের ওপরে করা অমানুষিক নির্যাতন ও নৃশংস গণহত্যার কথাগুলো অধিক রাজনৈতিক চর্চা লাভ করে।

সেই অনুসারে রাষ্ট্রসঙ্ঘ ১৯৪৭ সনের ২৭ নভেম্বরে গৃহীত ১৮১ নং প্রস্তাব মর্মে ব্রিটেনের অধীনে থাকা পেলেস্টাইন ভূখণ্ডকে ইহুদী এবং আরবদের মধ্যে বিভক্ত করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। উক্ত প্রস্তাব অনুসারে ঐতিহাসিক জেরুজালেম কে 'বিশেষ আন্তঃরাষ্ট্রীয় অঞ্চল' হিসেবে স্বয়ং রাষ্ট্রসঙ্ঘই নিরীক্ষণ করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রসংগক্রমে অধুনালুপ্ত জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুসারে ১৯২২ সন থেকে ১৯৪৮ সন পর্যন্ত ব্রিটেনের অধীনে ছিল। রাষ্ট্রসঙ্ঘই আরব রাষ্ট্রগুলোর আপত্তি এবং আশংকাসমূহকে নিষ্পত্তি না করে পেলেস্টাইনে গৃহহীন ইহুদীদের জন্য ইজরায়েল নামের একটি রাষ্ট্র গঠন করে নেওয়া পদক্ষেপের জন্যই আজও মধ্যপ্রাচ্যে দৈনিক কাঁচা রক্ত এবং বারুদের ধোঁয়া নির্গত হয়ে আসছে। গ্রেটব্রিটেন ১৯৪৮ সনের ১৪ মে পেলেস্টাইন থেকে সেনা প্রত্যাহার করার পরদিনই ইজরায়েল নামক একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয় মধ্যপ্রাচ্যে। আর তদানীন্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি হেরী এস ক্রুমেন ইজরায়েল কে একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। ইহার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া স্বরূপ ১৯৪৮ সনের ১৫ মে ইজিপ্ট, সিরিয়া,জর্ডান, লেবানন এবং ইরাক নবগঠিত ইজরায়েলের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধ ১৯৪৯ সনের মার্চ মাস পর্যন্ত চলতে থাকে। আরব-ইজরায়েলের এই প্রথম যুদ্ধে আরব রাষ্ট্রগুলো পরাজিত হয় যদিও ইজিপ্ট ইজরায়েলের গাজা দখল করতে সক্ষম হয়। কিন্তু আরব এই পরাজয় কে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে নাই। আরব ইজরায়েলের পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকার সময়েও ১৯৫৬ সনে 'সুয়েজ সংকট ' আরম্ভ হয়। ইজিপ্টের মধ্যে অবস্থিত সুয়েজ খাল মানবনির্মিত এক কৃত্রিম জলপথ। বলাবাহুল্য সুয়েজ খাল এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে সংযোগ করার সঙ্গে লোহিত সাগর এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যে সমন্বয় স্থাপন করেছে।

ইজিপ্টের রাষ্ট্রপতি গ'মেল আবদেল নাছের ১৯৫৬ সনে সুয়েজ খালকে রাষ্ট্রীয়করণ করে ইহাতে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। ইজিপ্টের এই কার্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। রাষ্ট্রপতি নাছের সিনাই উপদ্বীপে সামরিক বাহিনী মোতায়ন করে ইজরায়েলের এইলেট বন্দর এবং ষ্টেইন অব টাইরান অবরোধ করে ইজরায়েল জাহাজ সমূহের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং এর সঙ্গে সঙ্গে আরম্ভ হয় দ্বিতীয় আরব ইজরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ।এই যুদ্ধে ইজিপ্টের বিরুদ্ধে ইজরায়েলের সঙ্গ দেয় ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। ইজরায়েল এই সুবাদে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সহযোগিতায় ইজিপ্টের সিনাই উপদ্বীপ তার দখলে আনে। কিন্তু রাষ্ট্রসঙ্ঘের হস্তক্ষেপে যদিও ১৯৫৬ সনের ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ থামে। তবে ইজিপ্টের ষ্টেইট অব টাইরান এবং এইলেট বন্দর মুক্ত করে দেয় এবং ইজরায়েল সিনাই উপদ্বীপ থেকে নিজের সেনা প্রত্যাহার করে। রাষ্ট্রসঙ্ঘও সিনাই উপদ্বীপে শান্তিরক্ষা বাহিনী নিয়োগ করে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের হস্তক্ষেপের ফলে দীর্ঘ দশ বছর আরব দেশ এবং ইজরায়েলের মধ্যে বিশেষ উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় নাই। কিন্তু ১৯৬৬ সনের নভেম্বর মাসে ইজরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনী জর্ডানের ওয়েষ্ট বেংকে ১৮ জন মানুষকে গুলি করে নিহত করে এবং ১৯৬৭ সনের এপ্রিল মাসে সিরিয়ায় ৬টি মিগ বিমান দ্বারা বিদ্ধস্ত করার ফলে আবার মধ্যপ্রাচ্য উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যার ফলে তৃতীয় আরব-ইজরায়েলের মধ্যে যুদ্ধের পথ প্রশস্ত হয়ে যায়। ইজিপ্ট এই প্রতিবাদে আবার ২২মে ইজরায়েলের এইলেট বন্দর অবরোধ করে এবং জর্ডান একত্রে ইজরায়েলের উপর আক্রমণ শুরু করে। ১৯৬৭ সনের ৫জুন ইজিপ্ট, সিরিয়া ও জর্ডান মিলে ইজরায়েলের উপর আক্রমণ চালায়। ১০ জুন পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলতে থাকে। তৃতীয় বারের এই যুদ্ধে ইজরায়েলের ৭৭৯ এবং আরব রাষ্ট্রসমূহের ২১০০০ সৈন্য নিহত হয়।

১৯৬৭ সনের ছয় দিনের আরব - ইজরায়েলের এই তৃতীয় যুদ্ধে ইজরায়েল সিরিয়ার ভূখণ্ডের 'গোলান হাইটস' অবৈধভাবে দখল করে নেয়। রাষ্ট্রসঙ্ঘ ১৯৬৭ সনের গ্রহণ করা ২৪২ নং প্রস্তাব অনুসারে ইজরায়েল কে সিরিয়ার 'গোলান হাইটস ' ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু আমেরিকা,ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মদদপুষ্ট ইজরায়েল রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই আদেশ প্রত্যাখান করে। যার ফলে সিরিয়া নিজের 'গোলান হাইটস' উদ্ধার করার জন্য ইজিপ্টের সাথে সংযুক্ত হয়ে চতুর্থবারের জন্য ১৯৭৩ সনের ৬ অক্টোবরে ইজরায়েল আক্রমণ করে যদিও ইজরায়েল এই যুদ্ধে আরব জয়ী হয়।এই যুদ্ধে ইজরায়েলের ২৮০০ জন সৈন্য এবং সিরিয়ার ৩০০০ এর অধিক সেনা শহিদ হয়।১৯৭৪ সনের ৩১ মে রাষ্ট্রসঙ্ঘ 'গোলান হাইটস'কে বাফার জোন (Buffer Zone) হিসেবে ঘোষণা করে তাতে রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে। ইজরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে আমেরিকার মধ্যস্থতায় ১৯৯১ সনে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে শান্তি আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু ইজরায়েলের আগ্রাসন মানসিকতায় ২০০০ সালে এই আলোচনা ইতি টানে। ইহার পরবর্তী সময়ে তুর্কির মধ্যস্থতায় আবার ২০০৮ সনে ইজরায়েল এবং সিরিয়ার মধ্যে 'গোলান হাইটস'নিয়ে আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু ২০০৯ সনে ইজরায়েলের কট্টর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত বেঞ্জামিন নেটান্যাহু নির্বাচিত হওয়ার পর সিরিয়ার সাথে আলোচনার দুয়ার বন্ধ হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক ভাবেই 'গোলান হাইটস'হচ্ছে সিরিয়ার নিজস্ব ভূখণ্ড। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুসারে সিরিয়া ফ্রান্সের অধীনে যায় এবং সেইসময় হতে 'গোলান হাইটস' সিরিয়ার অংশ হয়ে ছিল। সিরিয়াই ১৯৪৬ সালে ফ্রান্সের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদস্যপদ গ্রহণ করে। কিন্তু ইজরায়েল ১৯৬৭ সনের যুদ্ধতে সিরিয়া আক্রমণ করে 'গোলান হাইটস'-র উপর অবৈধ দখল করে। কেবল এখানেই শেষ নয়, ইজরায়েল রাষ্ট্রসঙ্ঘ কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১৯৮১ সনে 'গোলান হাইটস'কে ইজরায়েলের ভৌগলিক মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করে।

'গোলান হাইটস' হচ্ছে সিরিয়ার একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ মালভূমি। সিরিয়ার 'গোলান হাইটস'-র ১৮৬০ বর্গ কিলোমিটার ভূখণ্ডের ভিতরে বর্তমান ১১৫০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল ইজরায়েলের অবৈধ দখলে ১৯৬৭ সন থেকে। জর্ডান, লেবানন, ইজরায়েল এবং সিরিয়ার মধ্যে 'গোলান হাইটস'অবস্থিত। রাজনৈতিক এবং তাৎপর্যের সঙ্গে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ, উর্বর কৃষিভূমি এবং জলসম্পদের জন্য 'গোলান হাইটস'-র গুরুত্ব অপরিসীম। বরাফাবৃত গোলান মালভূমি ওখ পাহাড়িয়া অঞ্চলসমূহ পানীয় জলের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস। 'গোলান হাইটস' থেকেই জর্ডান নদী বয়ে এসে গেলিলি সাগরে মিলিত হয়েছে। ইজরায়েলের এক তৃতীয়াংশ জল 'গোলান হাইটস'যোগান দেয়। সিরিয়ার থেকে বলপূর্বক ভাবে 'গোলান হাইটস' দখল করে বর্তমানে ইজরায়েল তাতে লক্ষাধিক ইহুদীদের বাসস্থান ও কর্মসংস্থান দেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ইজরায়েলের দুষ্কার্যে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে আমেরিকাই। রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৮১ সনের ১৭ ডিসেম্বর গৃহীত করা ৪৯৭ নং প্রস্তাব অনুসারে ইজরায়েল 'গোলান হাইটস' কে নিজের ভূখণ্ডে মিলিয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে অবৈধ ও বেআইনি বলে অভিহিত করেছে। কিন্তু রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই ঐতিহাসিক প্রস্তাব নাকোচ করে প্রাক্তন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৯ সনের ২৫ মার্চ রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই প্রস্তাব কে ঘোর আপত্তি জানিয়ে 'গোলান হাইটস'কে ইজরায়েলের ভূখণ্ড বলে স্বীকৃতি প্রদান করা ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সমগ্র বিশ্বতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। আমেরিকা ছাড়া পৃথিবীর আর কোন দেশই গোলান হাইটস কে ইজরায়েলের ভূখণ্ড বলে স্বীকৃতি দেওয়ার ধৃষ্টতা বা ভণ্ডামি করে নাই। আমেরিকার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে ইজরায়েলের মধ্য দিয়ে ইরান, সিরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যতে অশান্তি এবং অস্থিরতা বৃদ্ধি করে আরবের রাষ্ট্রগুলোর থেকে কাঁচা তেল আহরণ করে সেই দেশসমূহে বিক্রি করা।

ইজরায়েলের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নাফতালী বেনেটে গত ২০২১ সনের ২৬ ডিসেম্বর এই কথা ঘোষণা করেন যে ইজরায়েল আগামী পাঁচ বছরের ভিতরে 'গোলান হাইটসে' ইহুদী লোকের জন্য ৭৩০০ টি নতুন আবাস নির্মাণ করবে। উল্লেখযোগ্য যে ইজরায়েল ইতিমধ্যে আমেরিকার আশির্বাদে 'গোলান হাইটস'এ নিজস্ব আইন, প্রশাসন এবং বিচার প্রক্রিয়া বিধিবদ্ধ করেছে। 'গোলান হাইটস'এ ইজরায়েল আগামী পাঁচ বছরে সর্বমোট ৩১৭ নিযুত মার্কিন ডলার খরচ করবে যাতে সেখানে পর্যটন, উদ্যোগ, চিকিৎসা, বাণিজ্য, পরিবহন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়। ১৯৬৭ সালের পূর্ব পর্যন্ত সিরিয়ার 'গোলান হাইটস এ আরবীয়দের বসবাস ছিল। ইজরায়েল সেখানে দখল করে ২০০ এর অধিক আরবীয় গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় এবং পর্যায়ক্রমে একলক্ষের ও অধিক বাসিন্দাদের বিতাড়িত করে। বর্তমানে 'গোলান হাইটস'এ প্রায় ৫৩০০০ হাজার মানুষ বসবাস করছে। এরমধ্যে ২৭০০০ ইহুদী, ২৪০০০ দ্রুজ আরবী এবং প্রায় ২০০০ আলাবিট মুসলিম আছে। দ্বিতীয়ত, ইজরায়েল ২০১৫ সন থেকে সিরিয়ার 'গোলান হাইটস' এ অবৈধভাবে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানে আছে। আমেরিকার AFEK oil and Gas নামের কোম্পানী ইতিমধ্যে কম্পন জরীপ সম্পন্ন করে প্রায় এক বিলিয়ন বেরেল পরিমাণ খনিজ তেলের সন্ধান পেয়েছে। একমাত্র ইজরায়েলের পরিবেশ কর্মী এবং প্রতিবাদী সংগঠনগুলোর বাঁধা দেওয়ায় ইজরায়েল সরকার 'গোলান হাইটস'এ তেল উৎপাদন করতে অগ্রসর হতে পারছে না। ইজরায়েল তার দেশের ইন্ধন চাহিদা পূরণ করার জন্য আংগোলা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ইজিপ্ট, নরওয়ে, রাশিয়া, আজারবাইজান এবং কাজাখস্তান থেকে পেট্রোলিয়ামজাত সামগ্রী আমদানি করে আসছে।

রাশিয়া তার নিজস্ব ভৌগলিক নিরাপত্তা অক্ষুন্ন রাখার জন্য ইউক্রেনের বিরুদ্ধে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে আরম্ভ করা বিশেষ সামরিক অভিযান কে অবৈধ আগ্রাসন বলে আমেরিকা এবং ইজরায়েল অভিহিত করেছে এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রস্তাবকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ২৪২ এবং ৪৯৭ নং দুইটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নাকচ করে 'গোলান হাইটস' র উপর বলপূর্বক আগ্রাসন আমেরিকার কূট কৌশল অনুসারী ইজরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার কাজ এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ। আমেরিকার কাছে ইজরায়েলের এই প্রভুত্ববাদ সমগ্র বিশ্বের জন্যই এক চিন্তার বিষয়।

Sunday, September 4, 2022

জন্মশতবর্ষে বেঁচে থাকার কবিতায় বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


১৯২০ সনের ২রা সেপ্টেম্বর ভারতের অধুনা বাংলাদেশের ঢাকার বিক্রমপুরে তাঁর জন্ম। আজীবন সুন্দর সমাজ গঠনের স্বপ্নকে অবলম্বন করেই তাঁর সৃজন। বাল্যকাল থেকেই তিনি একরােখা ধরনের মানুষ। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আমৃত্যু। তাঁর কবিতায় ভাষিত হয়েছে সমগ্র দুনিয়ার প্রতারিত মানুষের বেদনা, মানবতা-বিরোধী ঘটনার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ তীব্র-প্রতিবাদ। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'গ্ৰহচ্যুত’ তাঁকে কবি পরিচিতি না দিলেও ‘রানুর জন্য' গ্রন্থে পেয়েছেন পাঠকদের স্বীকৃতি। ‘উলুখড়ের কবিতা', ‘সভা ভেঙে গেলে’, ‘মানুষখেকো বাঘেরা বড় লাফায়’, ‘এই জন্ম জন্মভূমি','লখিন্দর', ভিয়েতনাম ভারতবর্ষ, ও অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে 'বেঁচে থাকার কবিতা’ তাঁর অন্যতম। আজীবন আধুনিক বাংলা কবিতার জন্য তাঁর চিন্তা যে কত প্রাসঙ্গিক আজও তা তাঁর কবিতা পড়লেই জানা যায়।

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর কবিতায় শিশুর রক্ত, গুলি, মন্ত্রী, সাংবাদিক, খুনি, গুন্ডা, লাশ, খিদে, ফ্যান, কান্না এসব কিছুই আছে। থাকবেই তো। দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তুর আগমন, খাদ্যাভাব, কালোবাজারি এইসব কিছুই তার চারপাশে ঘটে চলেছে। কেননা তাঁর নিজের জীবনকেও নিয়ন্ত্রিত করেছে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী মনন। এই বিশ্বাসেই রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন, কারাবাস করেছেন। তাঁর 'রাজা আসে যায়' কবিতা বাংলায় এক প্রবাদ-বাক্যের স্থান করে নিয়েছে। একজন সংবেদী কবি সেসব ভুলে থাকতে পারেন না। আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ৩০-৩১ ডিসেম্বর, ১৯৬৭-তে তিনি লিখছেন জেলখানার কবিতা/২। তাঁর কবিতায় বিষয়ের বৈচিত্র্য লক্ষ করার মতো। সুকান্ত, নজরুল, মাও সেতুংয়ের লং মার্চ, ম্যাক্সিম গোর্কির মতো মানুষের গন্ধ পাওয়া যায়। তিনি পঙ্‌ক্তিতে পঙ্‌ক্তিতে রক্ত ঝরা সময়কে তুলে ধরেছেন।

আমার ভারতবর্ষ কবিতায় কবি শােষিত মানুষের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নে শােষকদের বাদ দিয়ে নতুন ভারতবর্ষ গড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন—“আমার ভারতবর্ষ পঞ্চাশ কোটি নগ্ন মানুষের/যারা সারাদিন রৌদ্রে খাটে, সারারাত ঘুমুতে পারে না/ক্ষুধার জ্বালায়, শীতে। আধুনিক সভ্যতার করালরূপ কবিকে ব্যথিত করে। তাই যুদ্ধের বিরুদ্ধে’ কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘চলাে আমরা চাঁদের দেশে যাই/চলাে আমরা সময় থাকতে যে যার দেশের জাতীয় পতাকা/চাঁদের দেশের সবার চাইতে উঁচু পাহাড়টার/চুড়ায় দিই উড়িয়ে, তার মাটিকে করি সােনার চেয়ে দামী।কবি সাধারণ শােষিত মানুষের বেঁচে থাকার জন্য চেয়েছেন, ‘একটা পৃথিবী চাই/শুকনাে কাঠের মত মায়েদের/শরীরে কান্না নিয়ে নয়/তাদের বুক ভর্তি অফুরন্ত ভালােবাসার/ শস্য নিয়ে। অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় তাঁর কবিতায় মিলে প্রকৃতির প্রতি টান। প্রকৃতি যে মানুষের সঙ্গী তা নিয়ে লিখেছেন, চাঁদের আলােয় গাছেদের সভা, বসন্তের উদ্দাম হাওয়ায়/মন কোথা চলে যায় বলে/মনকে আগলায় সভা করে।

কবি ও কবিতা সম্পর্কে এক অদ্ভুত ভাবনা ছিল বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর। তিনি বলতেন, “কবিতা লেখেন মানুষ, কবিতা যাঁরা পড়েন তারাও মানুষ। এই মনুষ্য জাতীয় প্রাণীরা আমাদের স্বদেশ মহাভারতে বর্তমানে যে জীবন যাপন করেন, তা কিন্তু মনুষ্য জীবন নয়। এই জীবনের আমূল পরিবর্তন যদি অনির্দিষ্টকালের মধ্যে সম্ভব না হয়, তাহলে একদিন আমাদের কবিতাও হবে পশু সমাজের কবিতা ।”(লা পোয়েজি,নবম বর্ষ, ১ম সংখ্যা)

দেশভাগ, খাদ্য আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, জরুরি অবস্থা, নকশাল আন্দোলন— তাঁর জীবনের নানা সময়ে যে সমস্ত সামাজিক ঝঞ্ঝা এসেছে, প্রতিটিতে কবি তাঁর চেতনা ও কলম নিয়ে সক্রিয়ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কখনও কোনও আপস করেননি। প্রাপ্তির লোভে কেঁপে যায়নি তাঁর লক্ষ্যভেদী কণ্ঠস্বর। একের পর এক অমর কবিতায় লিখেছেন ----
“তোমার কাজ আগুনকে ভালোবেসে উন্মাদ হওয়া নয়,
আগুনকে ব্যবহার করতে শেখা।
অস্থির হয়োনা
শুধু প্রস্তুত হও।” (পৃথিবী ঘুরছে)।
তরুণদের প্রতি এই আহ্বান আর কোনো কবি এভাবে জানিয়েছেন কিনা, আমার জানা নেই । অসুস্থ হওয়ার কয়েক মাস আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘরোয়া এক সভায় তিনি বলেন, “আর কোনো কাজ পারিনা বলেই কবিতা লিখি। অন্য কিছু পারলে কি আর লিখতাম?” কবিতার ভাষায়,
“ছত্রিশ হাজার লাইন কবিতা না লিখে
যদি আমার সমস্ত জীবন ধরে
একটি বীজ মাটিতে পুঁততাম
একটি গাছ জন্মাতে পারতাম! (মহাদেবের দুয়ার)
এই উপলব্ধিতে কেউ একদিনে পৌঁছাতে পারে না, অতিক্রম করতে হয় দীর্ঘ পথ, দীর্ঘ সময় ধরে। এই পথচলায় তাঁর অভিজ্ঞান কম নয়। পথের বিস্তর বাধা পেরিয়ে কবি হেঁটে চলেন। চলার পথে এ দেখা এক আশ্চর্য দেখা। মানুষের আত্মতৃপ্তির সমস্ত মেকি আস্তরণ ভেদ করে তিনি গড়ে তোলেন এক অনন্য কবিতা দর্পণ। 'স্বদেশ ও স্বদেশচেতনার আগুনে পুড়ে নাড়িছেঁড়া স্বাধীনতা, রক্তের বিনিময়ে দাউদাউ অগ্নিলেহন জন্মভিটে কেড়ে নিল, দেশের শাষণের বদল হলো শুধু মানচিত্রে। দেশকে এক কাল্পনিক দেবীর আসনে বসিয়ে অবশেষে এই ডানাভাঙা সমর্পণ !' প্রতারিত এই মানুষদের উদ্দেশ্যে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লেখেন
“মানুষ রে, তুই সমস্ত রাত জেগে
নতুন করে পড়,
জন্মভূমির বর্ণপরিচয়!”

প্রতিবাদী চেতনার অভাব আজকের দিনে সর্বত্র। দেশ-কাল-রাষ্ট্র বড্ড বেশি সংকটে এবং এর কারণ এক কৃত্রিম বস্তুবাদী জীবনের প্রতি আকর্ষণ। সেক্ষেত্রে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কলম ধরেছিলেন সাধারণ নিরন্ন মানুষের জন্য, রাষ্ট্রশক্তির শােষণের বিরুদ্ধে, দেশ তার কাছে ছিল পবিত্র এক আশ্রয়। সব মিলে তার কবিতার ভাব ও শিল্পীসত্তা আজকের দিনেও যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত হন। ক্যানসারে আক্রান্ত কবি ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের ১১ শে জুলাই ৬৫ বৎসর বয়সে কলকাতায় প্রয়াত হন। কবির অনেক প্রত্যাশা ছিল সমাজের কাছ থেকে ; হয়তাে বা ক্ষোভে যন্ত্রণায় তিনি সমাজ থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন বার্ধক্যের সূচনাপর্বেই। ২রা সেপ্টেম্বর, আজ শতবর্ষ পরে এসেও আমাদের সেই কথাটাই নতুন করে জানিয়ে দিয়ে যায়। কবি বীরেন্দ্র সরাসরি প্রতিবাদের রাস্তায় যেতে পছন্দ করতেন। প্রতিদিনই একজন প্রকৃত কবির জন্মদিন, প্রতিবছরই তাঁর জন্মশত বছর। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে জানাই শ্রদ্ধা। কবির জন্মশতবর্ষে আমরা কি সময়ের দাবি নিয়ে কবির মতো দায়বদ্ধ হতে পারি !

'ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়...'


ক্ষুধা, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং সব ধরনের অপুষ্টি দূর করার চ্যালেঞ্জ দিন দিন বেড়েই চলেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, কোভিড-১৯ মহামারী আমাদের কৃষি ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সমাজে অসমতাকে আরও উন্মোচিত করেছে, যার ফলে বিশ্বে ক্ষুধা এবং মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। বৈশ্বিক অগ্রগতি সত্ত্বেও, শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির প্রবণতা - যেমন স্টান্টিং এবং অপচয়, প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি এবং শিশুদের অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলতা - একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। তদুপরি, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মাতৃ রক্তাল্পতা এবং স্থূলতা একটি উদ্বেগের বিষয়।

স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পান না প্রায় ৯৭ কোটি ভারতীয়। মানে, ১৩০ কোটির ‘গর্বিত’ ভারতবাসীর মধ্যে ৯৭ কোটি মানুষেরই দু’বেলা জীবনধারণের উপযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার জোটে না। অর্থাৎ, মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭১ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার জোগাড় করতে পারেন না। শুধু তাই নয়, ভারত অনাহার-অপুষ্টির এই তালিকায় আফ্রিকার খুব কাছাকাছিই আছে। যা রীতিমত উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্যকর বা সুষম খাদ্য কেনার ক্ষমতার উপর আন্তঃদেশীয় একটি তুলনামূলক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ভারতের ৭১ শতাংশ মানুষের পুষ্টিকর খাদ্য কেনার ক্ষমতা নেই। সংখ্যায় যার পরিমাণ প্রায় ৯৭ কোটি। আরও লজ্জার বিষয় এই যে, ভারতেরই পিছনে রয়েছে আফ্রিকা। যেখানে ৮০ শতাংশ মানুষের পুষ্টিকর খাবার জোটে না। গোটা এশিয়ায় ৪৩.৫ শতাংশ মানুষ এই আওতায় পড়েন। সুতরাং, বোঝাই যাচ্ছে, একা ভারতই কীভাবে অপুষ্টি, অনাহার, অর্ধাহার ও সুষম খাদ্যাভাবের দৌড়ে এশিয়ার মুখ উজ্জ্বল করে রয়েছে !

দি স্টেট অফ ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২২’ নামে রিপোর্টটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যই বলছে, ২০২০ সালে বিশ্বের প্রায় ৩০৭ কোটি মানুষ ভালোভাবে খেতে পাননি। সেখানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ ভারতেই তিন ভাগের একভাগ মানুষের বাস। ফাওয়ের তথ্যে বলা হয়েছে, একজন মানুষের সারাদিনে সুষম খাবার খেতে যা খরচ হওয়ার কথা, তাতে ভারতে ৪ জনের পরিবারে মাসে ৭৬০০ টাকা লাগে। অর্থাৎ ভারতের ৯৭ কোটি মানুষই এই পরিমাণ ক্রয়ক্ষমতার নীচে বসবাস করেন।

এই তালিকায় দেখা যাচ্ছে, চীনের ১২ শতাংশ, ব্রাজিলে ১৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৪৯ শতাংশ, নেপালের ৮৪ শতাংশ, বাংলাদেশে ৭৩.৫ এবং পাকিস্তানের ৮৩.৫ শতাংশ মানুষ সুষম আহার পান না। ভারতের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষই ভরতুকির খাবার বা সরকারি রেশনের উপরে নির্ভরশীল। অর্থাৎ, সরকার পোষিত খাবার না পেলে, তাঁদের দুর্দশা কী হবে, তা নিয়েও যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে।

প্রায় ৮০ কোটি, বা ৬০% ভারতীয়, সরকার-প্রদত্ত ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য রেশনের উপর নির্ভর করে, যেখানে সুবিধাভোগীরা বিশেষ মহামারী ছাড়াও প্রতি মাসে প্রতি কিলোগ্রামে মাত্র 2-3 টাকা হারে পাঁচ কেজি রেশন পান। যা প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনার আওতায় পাঁচ কেজি রেশন। যাইহোক, পরিকল্পনাটি প্রায়শই সমালোচিত হয় যে যদিও ক্যালোরি সরবরাহ হচ্ছে কিন্তু পর্যাপ্ত পুষ্টি হচ্ছে না।

জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য জরিপ ( National Family Health Servey), 22টি রাজ্যে ভারত সরকার পরিচালিত এই সমীক্ষার ফলাফল দেখায় যে দেশে অপুষ্টির ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। মহিলাদের মধ্যে সাধারণত অ্যানিমিয়ায় শিশুরা অপুষ্টিতে জন্ম নেয়। এই কারণে,১৩ টি রাজ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে কম। ১২টি রাজ্যে, একই বয়সের শিশুদের ওজন উচ্চতা অনুযায়ী নয়।

 এই সমীক্ষাটি আসাম, বিহার, মণিপুর, মেঘালয়, সিকিম, ত্রিপুরা, অন্ধ্রপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট, কর্ণাটক, মিজোরাম, কেরালা, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, হিমাচল প্রদেশ, লাক্ষাদ্বীপ, দাদরা ও নগর হাভেলি এবং মহারাষ্ট্রে করা হয়েছে। সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুসারে, মেঘালয়ের পরে বিহার দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ৪৩ শতাংশ শিশু যারা তাদের বয়সের অনুপাতে ছোট। গুজরাটে এই সংখ্যা ৩৯ শতাংশ।অর্থাৎ গুজরাট ও বিহারের মতো রাজ্যে শিশুদের সঠিক বিকাশ হচ্ছে না। তারা অপুষ্টিতে ভুগছে। এ কারণে তাদের মধ্যে দৈর্ঘ্য কম হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিহারে সবচেয়ে কম ওজনের শিশুর সংখ্যা ২২.৯%।

 তবে দেশের বেশিরভাগ রাজ্যেই শিশুমৃত্যুর হার কমেছে। এর কারণ হিসেবে ভ্যাকসিনেশন হলেও ক্ষুধা ও অপুষ্টির পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। এখন আমাদের দেখার পালা আদৌ কি ভারত এই সংকট নিরসনে সাফল্য অর্জন করবে?

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...