দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা অটুট রাখতে আরও এক ধাপ এগোল ভারত। গত ২ সেপ্টেম্বর কোচিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে আইএনএস বিক্রান্ত তুলে দেওয়ার ফলে শুধুমাত্র যে ভারতের হাতে দ্বিতীয় এক বিমানবাহী রণতরী এল তা-ই নয়, সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বিক্রান্ত ভারতকে সেই আন্তর্জাতিক কুলীন গোষ্ঠীতে স্থান দিল, যারা একক প্রচেষ্টায় এ-হেন বৃহৎ মাপের রণতরী বানাতে সক্ষম।
প্রথমত লক্ষণীয় বিষয় যে ভারতে নির্মিত আইএনএস বিক্রান্তে ব্যবহৃত সমস্ত কিছুই স্বদেশীয় নয়। অর্থাৎ কিছু যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকেও আমদানি করা হয়েছে। যাইহোক, সমগ্র প্রকল্পের ৭৬ শতাংশ দেশে উপলব্ধ সংস্থান দ্বারা গঠিত। এটি অবশ্যই একটি বিরাট অর্জন। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের আমলে আইএনএস বিক্রান্তের নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। ২০১৩ সালের ১২ অগস্ট কোচিতে সেই কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী একে অ্যান্টনি।
যুদ্ধজাহাজ বিক্রান্ত নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় স্তরের ইস্পাত প্রস্তুত করেছিল স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (SAIL)। এই স্টিল তৈরিতে ভারতীয় নৌবাহিনী এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন গবেষণাগারের (ডিআরডিএল) সহায়তাও নেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছে যে SAIL-এর এই ইস্পাত তৈরি করার ক্ষমতা ভবিষ্যতেও দেশকে অনেক এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। নৌবাহিনীর মতে, এই যুদ্ধজাহাজের জিনিসপত্র দেশীয়, যার মধ্যে রয়েছে ২৩ হাজার টন ইস্পাত, আড়াই হাজার টন ইস্পাত, ২৫০০ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক তার, ১৫০ কিলোমিটার পাইপ এবং ২০০০টি বাল্ব। এ ছাড়া এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ারের অন্তর্ভুক্ত হুল বোট, এয়ারকন্ডিশন থেকে শুরু করে রেফ্রিজারেশন প্ল্যান্ট এবং স্টিয়ারিং যন্ত্রাংশও দেশেই তৈরি হয়েছে।
সরকারী তথ্য অনুসারে, ভারতের অনেক বড় উদ্যোগীক নির্মাতারা এই বিমানবাহী রণতরী নির্মাণে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে ভারত ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড (BEL), ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড (BHEL), কির্লোস্কর, এলএন্ডটি (L&T), কেলট্রন, জিআরএসই, ওয়ার্টসিলা ইন্ডিয়া এবং অন্যান্য। এছাড়া জাহাজে দেশীয় যন্ত্রপাতি তৈরিতেও সহায়তা করেছে শতাধিক মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প।
বর্তমানে মাত্র পাঁচ থেকে ছয়টি দেশের বিমানবাহী রণতরী তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। এখন ভারতও এই ক্যাটাগরিতে যোগ দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ভারতের একটি বিমানবাহী রণতরী নির্মাণ নৌক্ষেত্রে তার সক্ষমতা দেখিয়েছেন বিশ্বদরবারে।
আসলে, অতীতেও ভারতের বিমানবাহী রণতরী ছিল। তবে ছিল ব্রিটিশ বা রাশিয়ান। যেখানে আগে ভারতের দুটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার - আইএনএস বিক্রান্ত-1 এবং আইএনএস বিরাট ছিল ব্রিটেন থেকে কেনা 'এইচএমএস হারকিউলিস' এবং 'এইচএমএস হার্মিস'। একই সময়ে, ভারতীয় নৌবাহিনীর একমাত্র বিমানবাহী জাহাজ - আইএনএস বিক্রমাদিত্য, সোভিয়েত যুগের যুদ্ধজাহাজ - 'অ্যাডমিরাল গোর্শকভ', যা ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে কিনেছিলো। অর্থাৎ আইএনএস বিক্রান্তকে নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করায় ভারত এখন বিমানবাহী রণতরী নির্মাণে সক্ষম দেশ হয়ে উঠেছে।
মজার ব্যাপার হল ভারতে নির্মিত প্রথম এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ারের নাম আইএনএস বিক্রান্ত। যেখানে এর আগে ভারতের প্রথম এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার - এইচএমএস হারকিউলিস যা ব্রিটেন থেকে কেনা হয়েছিল এর নামও আইএনএস বিক্রান্ত ছিল। বলা হয়, এর পেছনে রয়েছে ভারতের প্রথম বিমানবাহী রণতরীটির প্রতি ভালোবাসা ও গর্বের অনুভূতি। 1997 সালে ডিকমিশন হওয়ার আগে, আইএনএস বিক্রান্ত সময়ে সময়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় নৌবাহিনীকে শক্তিশালী রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
এই দিনে প্রধানমন্ত্রী নতুন প্রতীক-যুক্ত নৌবাহিনীর পতাকারও উন্মোচন করলেন। নৌবাহিনীর পতাকায় প্রতীক পরিবর্তন নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু এই বার ঔপনিবেশিক আমলের স্মৃতিবাহী সেন্ট জর্জ’স ক্রস সরিয়ে সেখানে জাতীয় পতাকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছত্রপতি শিবাজির সময়ের মুদ্রার প্রতীক। বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য "নৌবাহিনীর প্রতীকে তাঁকে স্থান দেওয়ার অর্থ সেনাবাহিনীর ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিটি নষ্ট করার সচেতন প্রয়াস। তাঁর ভাষণের মধ্য দিয়েও যেন প্রধানমন্ত্রী প্রকারান্তরে বোঝাতে চেয়েছেন, ঔপনিবেশিক গোলামি থেকে মুক্ত হয়ে নৌসেনা অতঃপর হিন্দু জাতীয়তাবাদের দিকে পা বাড়াল। স্মরণে রাখা ভাল, একটি গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী কোনও দলীয় মতাদর্শ প্রচারের স্থান নয়। নৌবাহিনীর এক উজ্জ্বল দিনে ঠিক সেই কাজটিই করে নরেন্দ্র মোদী দেশের গৌরবকেই খাটো করলেন।" তবে বিক্রান্তের মোতায়েন, প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের স্বনির্ভরতার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আইএনএস বিক্রান্ত ভারত-প্যাসিফিক এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলে আগামী দিনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে অবদান রাখবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।