Tuesday, September 10, 2019

নৈতিকতার নিরিখে শিক্ষক দিবস


"শিক্ষকের দায়িত্বপূর্ণ কর্তব‍্যভার গ্রহণ করিতে পারে, এমন একদল লোক সৃষ্টি করিতে হইবে; তাহা হইলেই আমাদের উদ্দেশ্য সফল হইবে। মাতৃভাষায় সম্পূর্ণ দখল, প্রয়োজনীয় বহুবিধ তথ্যে যথেষ্ট জ্ঞান, দেশের কুসংস্কারের কবল হইতে মুক্তি -- শিক্ষকদের এই গুণগুলি থাকা চাই। এই ধরণের দরকারী লোক গড়িয়া তোলাই আমার সংকল্প।" ---- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগর

শিক্ষা হল একটি জাতির মূল চালিকাশক্তি। 'শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড'। শিক্ষার আলো মানুষের মনকে আলোকিত ও বিকশিত করে। তাই শিক্ষাই ভালো মানুষ তৈরি করে। আর এর কারিগর হলেন শিক্ষক। আমি মনে করি একটা কথা আমাদের মনে রাখা খুবই জরুরি, একজন আদর্শ শিক্ষকই মানুষকে সুষ্ঠ ও সমৃদ্ধ সামাজিক জীব হিসেবে তৈরি করতে পারেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন," বিশ্ব সত‍্যের সাথে ব‍্যক্তিসত্বার সামঞ্জস্য বিধানের অর্থই হল শিক্ষা"। প্রত‍্যেকটা জাতি তার প্রগতিশীল চিন্তা ও মননের অনুশীলনে কল‍্যানকামী সমাজে পৌঁছে। প্রগতিশীল এই পৃথিবীতে একজন শিক্ষক কে শুধু উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করলে চলবে না। তারজন্য প্রয়োজন গুণ ও নীতিগত আদর্শের, যুক্তিবাদী ও কুসংস্কার মুক্ত চারিত্রিক দৃঢ়তা, এবং বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার প্রতিফলন। আমাদের জীবনে শিক্ষা পর্যায়ক্রমে চলে। জন্ম থেকে আমৃত্যু পর্যন্ত। প্রথমে মা, তারপর পরিবার, প্রতিবেশী, পরিবেশ- এভাবেই চলতে থাকে শিখন প্রণালী।

আর এযাবৎ পৃথিবীতে যিনি শিক্ষাদান করে থাকেন 'শিক্ষক'। উনার গুণগত কর্মের প্রতিফলনে গোটা বিশ্ব আলোকিত। কারণ আদর্শের স্বরূপ হিসেবে একজন শিক্ষক তার জীবনের ব্রতী হয়ে যায় সমাজ সংস্কার। তাই এটা নৈতিকতা যে আমাদের প্রয়োজন এই সমাজ সংস্কারক ব‍্যক্তিত্বের অন্ধকার থেকে আলো দেখানো পথে চলা এবং এই বিশেষ ব‍্যক্তিদের নিয়ে অনুসন্ধানমূলক কাজ করা। যাতে পরবর্তী প্রজন্ম সুরাহার সূত্র সন্ধান পায়। আজ বিশ্ব ক‍্যালেণ্ডারের বিভিন্ন তারিখে শিক্ষক দিবস পালন করা হয়। ইউনেস্কো ১৯৯৪ সাল থেকে ৫ অক্টোবর কে 'বিশ্ব শিক্ষক দিবস' ঘোষণা করে। আমাদের দেশ ভারতবর্ষে ও ৫ সেপ্টেম্বর প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিনে শিক্ষক দিবস পালন করে। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরই ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। ছাত্র ও গুণমুগ্ধ বন্ধুরা যখন তাঁর জন্মদিন পালন করতে চাইলে তিনি বলেন 'জন্মদিনের পরিবর্তে ৫ সেপ্টেম্বর যদি শিক্ষক দিবস উদযাপন হয় তবে আমি বিশেষরূপে অনুগ্রহ লাভ করবো।

এই রাষ্ট্রনেতার জন্মদিনে আমরা শিক্ষক দিবস অনেক উৎসাহ এবং উদ্দীপনার সাথে উদযাপন করে থাকি। এইদিন শিক্ষক দিবস পালনের মধ্যে কতটা সুবিধা অসুবিধা সেটা নিয়ে লেজটানা অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু প্রগতিশীল চিন্তনে যা বারবার প্রশ্ন জন্মায় ---- এই রাষ্ট্রনেতারই জন্মদিনে শিক্ষক দিবস কতটা যুক্তিপূর্ণ, নৈতিকতার নিরিখে যদি বিচার করা যায় তবে প্রশ্ন এটাই আসে আদর্শের ভিত্তিতে তিনি কোন মতাদর্শে বিশ্বাসী? এই লেখনীতে ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের বিরূপ বা বিরোধিতা করার কোন উদ্দেশ্য নয়। শুধু নিদৃষ্ট এই দিন কে আমরা কেন শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করবো এই নিয়ে আলোচনা।

ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ দর্শনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার বিষয় ছিল, " বেদান্ত দর্শনের বিমূর্ত পূর্বকল্পনা " ( The Ethics of the Vedanta and it's Metaphysical Presuppositions)। একজন আদর্শ শিক্ষক তাঁর চিন্তা ও আচরণে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে থাকেন। ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক কর্তব‍্যে ধারা ৫১ (ক)র ৮ নং কর্তব‍্যে বলা হয়েছে বিজ্ঞানমনস্কতা,মানবতাবাদ, অনুসন্ধান ও সংস্কারের বিকাশ"। আধ‍্যাত্মতত্ত্ববাদ দিয়ে কিভাবে আদর্শ শিক্ষক হওয়া যায় তা জানা নেই। তবে এটা স্পষ্ট যে, আধ‍্যাত্ববাদের শেকড়ে ধরে কুসংস্কার, গোঁড়ামিমুক্ত তথা বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার কখনই বিকশিত হতে পারে না।

ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণ মনে করতেন, নারীশিক্ষা এমন হ‌ওয়া উচিত, যাতে একজন নারী আদর্শ মা এবং গৃহকর্মে নিপুণা হয়ে ওঠেন [১]  Dr Sitaram Jaiswal, Bharatiya Shiksha ka Itihaas, 1981, Prakashan Kendra, Sitapur Road, Lucknow, Page 259।তিনি বর্ণ(কাস্ট)-প্রথায় বিশ্বাস রাখতেন। তিনি মনে করতেন জ্ঞান আহরণ করা শুধুমাত্র ব্রাহ্মণের কর্তব্য। অন্যান্য বর্ণের মানুষরা 'মনু সংহিতা' মেনে কর্ম করবে [২] Sarvepalli Radhakrishnan, Bharatiya Darshan (Hindi translation of Indian Philosophy), Volume 1, 2004, Rajpal & Sons, Delhi, Page 422।রাধাকৃষ্ণাণ তাঁর ব‌ই 'দ্য হিন্দু ভিউ অফ লাইফ'-এ দাবি করেছেন 'হিন্দু' সংস্কৃতি ৪০০০ বছরের পুরনো। বলা বাহুল্য, যা সঠিক নয়। তিনি তাঁর 'ইন্ডিয়ান ফিলোজফি' ব‌ইতে বলেন, হিন্দুবাদ একটি যাপন ধারা এবং হিন্দুধর্ম সবচেয়ে সহনশীল ধর্ম। গৌতম বুদ্ধ অজ্ঞেয়বাদী ছিলন, কিন্তু রাধাকৃষ্ণাণ দাবি করেছেন যে বুদ্ধ 'প্রার্থণা মার্গী' ছিলেন এবং  সর্বোচ্চ শক্তিতে বিশ্বাস করতেন। বুদ্ধ সম্পর্কে বিশ্বের দার্শনিকদের মধ্যে তিনিই একমাত্র এই মত পোষণ করতেন। তিনি মনে করতেন গীতা বুদ্ধের আগেকার সময়ে লেখা। আম্বেদকর প্রমাণ করেন এই ধারণা সঠিক নয় [৩] Dr Babasaheb Ambedkar Writing and Speeches, Volume 3, 1987, Chapter 13।  রাধাকৃষ্ণাণ বিশ্বাস করতেন, ভারতবর্ষে ভগবান মানুষ সৃষ্টি করেছেন। এই বিশ্বাসের পথ ধরেই আসে 'ব্রহ্মার মুখ থেকে ব্রাহ্মণের সৃষ্টিকথা'। যা শুধু বৈজ্ঞানিক বিবর্তনবাদ কে অস্বীকার করে না, উপরন্তু সামাজিক শোষণের প্রতিষ্ঠান বর্ণাশ্রমকে স্বীকার করে। এইসব বহুবিধ কারনে রাহুল সংকীর্তায়ন রাধাকৃষ্ণাণকে যথার্থই 'একজন সংকীর্ণ ধর্ম প্রচারক' হিসেবে অভিহিত করেছেন [৪], Rahul Sankrityayan, Darshan Digdarshan, 1944, Preface, Page 5 বলেছেন 'feeder to exploitation in India." দার্শনিক দিক ছাড়াও ব্যক্তি রাধাকৃষ্ণাণের বিরুদ্ধে কুম্ভীলকবৃত্তি (রচনা চুরি)-র অভিযোগ ওঠে। ১৯২৯ সালে যদুনাথ সিনহা অভিযোগ করেন, তাঁর থিসিস থেকে রাধাকৃষ্ণাণ বেশ কিছুটা অংশ 'ইন্ডিয়ান ফিলোজফি, খন্ড ২'-তে ব্যবহার করেন কোনরকম ঋণস্বীকার ছাড়াই।

যেখানে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগর শাস্ত্রীয় শিক্ষাকে সম্বলিত করে নিজেকে তৈরি করেন এক মানবতাপ্রেমী ও যুক্তিবাদী সমাজ সংস্কারক। ঈশ্বরচন্দ্র বলেন," কতগুলো কারণে সংস্কৃত কলেজে বেদান্ত ও সাংখ্য আমাদের পড়াতেই হয়। কিন্তু সাংখ্য ও বেদান্ত যে ভ্রান্ত সে সম্পর্কে এখন আর বিশেষ মতভেদ নেই।' আমরা বাবা সাহেব আম্বেদকর কে কীভাবে ভুলতে পারি! সারা বিশ্ব যেখানে 'Symbol of Knowledge' বলে তাঁকে জানে। যে আমাদের সংবিধান প্রণয়ন করেন। তিনি শিক্ষা সম্পর্কে বলেন, যদি দুই টাকা উপার্জন কর তবে এক টাকা দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ কর। আর এক টাকা দিয়ে বই কিনে সন্তানদের শিক্ষিত কর।

আর এখানেই কী শেষ! সাবিত্রী বাই ফুলে, জ‍্যাতিবা ফুলের কথা আমরা কিভাবে ভুলতে পারি। যে সাবিত্রী বাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। যে যুগে নারী শিক্ষা শব্দটাই অজানা। সেই যুগে আধুনিক নারী শিক্ষার গোড়াপত্তন করেছিলেন। এইসবের জন‍্য তৎকালীন সমাজ তাদের ছেড়ে কথা বলে নি। তাদের সহ‍্য করতে হয় অকথ্য নির্যাতন। তো প্রশ্ন হলো, আমরা যারা বিজ্ঞানমনস্ক, প্রগতিশীল-আধুনিকতায় বিশ্বাসী, আমরা তাহলে কি সংবিধান মানছি!? না, আমরাও প্রথাগত আধ‍্যাত্ববাদ দর্শনকে ফলোআপ করছি। শিক্ষার লক্ষ্য যদি পরমাত্মা বা বিশ্ব আত্মার উপলব্ধি বোঝায় তবে এই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য কী -- তা নিয়ে অবশ্যই মনে প্রশ্ন জাগে?

আজও ভারতবর্ষে শিক্ষার খাতে অনেকটা উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। পড়াশোনা খরচ বাড়ার সাথেই মাঝ পথে ছেড়ে দিচ্ছে পড়ুয়ারা। তাই বাড়ছে বিদ‍্যালয় ছুট ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা। আর অন‍্যদিকে বিজ্ঞানের অস্বিকৃতের পাশাপাশি চলছে বিকৃত ইতিহাসের উপর মননচর্চা। অনেক ক্ষেত্রে নামধারী শিক্ষক যে রচনা করছেন জাতির অধঃপতনে বিকৃত ইতিহাস। অবৈজ্ঞানিক ধ‍্যানধারণার পাশাপাশি চলছে বৈদিক সিলেবাসের সুপারিশ। তাই তলিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের অগ্রগামীর সাথে নিজের প্রগতিশীলতা। সেইজন্য বোধহয় শিক্ষার উদ্দেশ্য কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি বা বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ হারিয়ে অন্তরের মধ্যে বুদ্ধি অগম‍্য যে সত্তা বর্তমান, তার উপলব্ধিতে আমরা মরিয়া। আর সংবিধানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিজ্ঞানমনস্কতার বিপরীত চিন্তা।

একজন শিক্ষক যেখানে ' Friend, Philosopher & Guide ' সেখানে আমরা শিক্ষক হিসেবে প্রয়োজন ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে প্রগতিশীল চিন্তার বিকাশ ঘটানো। নচেৎ শুধু নিদৃষ্ট একজনের গলায় মালা পরিয়ে শিক্ষার ব‍্যাপকতাকে সংকীর্ণ করা। শিক্ষার ক্ষেত্রে যারা বিশ্বের মানসিকতার সাথে তাল মিলিয়ে সংস্কারের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। তাঁদের মতাদর্শকে সামনে রেখেই শিক্ষার প্রসার ঘটানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। যিনি ঊষর মরুতে বৃষ্টি নামান, তিনিই যদি হয়ে থাকেন শিক্ষক। তবে অনৈতিক কাজে না জড়িয়ে শৈক্ষিক অবক্ষয়ে হাত বাড়াই। এটাই হোক মূল লক্ষ্য।


No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...