Monday, April 22, 2019

কিসের ভয় হবেই জয়: লেনিন

"লড়াই করো, লড়াই করো, লড়াই করো, লড়াই
যতদিন না বিজয়ী হও
যদি একবার হারো, বারবার লড়ো, বারবার লড়ো, বারবার
যতদিন না বিজয়ী হও
কিসের ভয়, হবেই জয়
দূর করে ফেলো যত সংশয়
এবার তৈরি হও
এই তো যুক্তি জনগণের
এ পথে মুক্তি জনগণের
অমিত শক্তি জনগণের
তুমি তো তাদেরই একজন
তুমি একাকী কখনও নও
তাদেরই সঙ্গে এক হয়ে আজ মুক্তি শপথ নাও
যুদ্ধে শামিল হও আজ, যুদ্ধে শামিল হও"

তার পুরো নাম ভ্লাদিমির ইলিচ উইলিয়ানভ। কিন্তু বিশ্বের অসংখ্য মুক্তিকামী ও প্রতিবাদী মানুষের কাছে তার পরিচয় তাদের প্রিয় নেতা লেনিন।
১৮৭০ সালের ২২ এপ্রিল জন্ম নেওয়া এই মহান নেতা তার জীবদ্দশায় মুক্তিকামী মানুষের জন্য করেছেন অনেক কিছু। জন্ম রাশিয়ায় হলেও সারা পৃথিবীর মানুষের কাছেই তার সমান মর্যাদা। মুক্তিকামী সব মানুষের প্রিয় এই নেতা ছিলেন অক্টোবর এবং মহান নভেম্বর বিপ্লবে বলশেভিকদের প্রধান নেতা। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান এবং লেনিনবাদ তত্ত্বের প্রবক্তা।১৯১৭ সালের মহান নভেম্বর বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন লেনিন। নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। বিংশ শতাব্দীর মানব সভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম দিকচিহ্নকারী ঘটনা হলো নভেম্বর বিপ্লব। এই বিপ্লব শোষণভিত্তিক সমাজের অবসান সূচিত করল। পুঁজি ও মুনাফার স্বার্থে নয়, শোষিত-বঞ্চিত জনগণের স্বার্থে রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে তার প্রথম প্রতিফলন ঘটল। বিপ্লব সফল করা, শিশু সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে সমস্ত ষড়যন্ত্র ও আক্রমণ থেকে রক্ষা করা এবং একটি পশ্চাত্পদ পুঁজিবাদী দেশে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার কাজ এই সমস্ত ক্ষেত্রেই ছিল লেনিনের অসাধারণ নেতৃত্ব। পুঁজির শোষণ, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও যুদ্ধ— এ সমস্ত কিছুর বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সংগ্রামকে সম্পূর্ণ নতুন স্তরে উন্নীত করার ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়ন অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ

মার্কসীয় মতবাদকে নানাভাবে বিকশিত করলেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। সে জন্যই তার মৃত্যুর পর বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, এই মতবাদকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ হিসাবে অভিহিত করাই হবে সঠিক। তারপর থেকেই সমগ্র বিশ্বে এই মতবাদকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ হিসাবে অভিহিত করা হয়। মার্কসবাদী মতাদর্শকেও সমৃদ্ধ করলেন লেনিন সমগ্র জীবন ধরেই বিপ্লবী সংগ্রামের মধ্যে নিয়োজিত ছিলেন লেনিন। লেনিনের মধ্যে প্রকৃত মার্কসবাদী হিসাবে তত্ত্ব ও কর্মের অসাধারণ সমন্বয় ঘটেছিল। মাত্র ৫৪ বছর বয়সে এই মহান বিপ্লবী নেতার জীবনাবসান ঘটে। সমগ্র জীবন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের মধ্যে ব্যাপৃত থাকার সঙ্গে সঙ্গে মার্কসবাদী মতাদর্শ আত্মস্থ করা ও তাকে আরও সমৃদ্ধ করার কাজেও তিনি ঐতিহাসিক অবদান রেখে গেছেন। আজ মহামতি লেনিনের ১৫০তম জন্মদিনে জানাই শ্রদ্ধার্ঘ্য।

লাল সেলাম কমরেড।

Friday, April 19, 2019

বিবর্তন এক রোমাঞ্চিত যাত্রা

বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন এমন কিছু ঘটনা ঘটে যেগুলি প্রচলিত ধ্যান ধারণা কিংবা চিন্তাকে ভীষণ ভাবে আলোড়িত করে মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। এই ঘটনাটির একটা গালভরা নাম আছে। এই বৈপ্লবিক ঘটনাগুলিকে বলা হয় "প্যারাডাইম শিফট"। এই মুহুর্তে সেরকম একটা প্যারাডাইম শিফট সম্বন্ধে তোমাদের বলতে বসেছি যার সূচনা হয়েছিল প্রাকৃতিক নির্বাচন মতবাদের মাধ্যমে।

প্রাকৃতিক নির্বাচন সম্বন্ধে বিস্তারিত জানবার আগে আমাদের জৈব বিবর্তন সম্পর্কে একটু জানা দরকার। তার আগে বলো তো বিবর্তন কি ? হ্যাঁ, বিবর্তন হচ্ছে পরিবর্তন বা বদলে যাওয়া। অনেক কিছুর ই বিবর্তন হয়। যেমন ধরো ভাষার বা শব্দের বিবর্তন। একটা উদাহরণ দিই তাহলে আরেকটু সহজে বুঝতে পারবে, যেমন ধরো "অরেঞ্জ" মানে কি জানো তো ? ঠিক ধরেছ, ইংরেজিতে এই শব্দটির অর্থ হচ্ছে কমলালেবু। কিন্তু তোমাদের কি বিশ্বাস হয় সংস্কৃত "নবরঙ্গ" শব্দ থেকেই এই অরেঞ্জ শব্দটা এসেছে? বিশ্বাস না হওয়ার ই কথা। কিন্তু সংস্কৃতে কমলালেবু কে ডাকা হত "নবরঙ্গ" নামে। বার বার এত বড় শব্দ বলা যেহেতু বেশ কঠিন আর ঝক্কির। তাইএই নবরঙ্গ শব্দটিই পারস্যের বণিকদের মুখে মুখে হয়ে গেল "নরঙ্গ"। আরবের মানুষেরা কথায় কথায় এই নরঙ্গ কে ডাকা শুরু করল নরঞ্জ নামে। এবার যখন ইতালীয় কিংবা ফ্রেঞ্চ লোকজনের কাছে এই "নরঞ্জ" পৌঁছাল তখন তারা প্রথমের ন টাকে ফেলে দিল নিজেদের উচ্চারণের সুবিধের জন্য। এভাবে এক ভাষার নবরঙ্গ থেকে কমলালেবু বিবর্তনের মাধ্যমে হয়ে উঠল আরেক ভাষার অরেঞ্জ। ঠিক এভাবেই জীবজগতে চলে বিবর্তনের খেলা। বিভিন্ন প্রজাতির পরিবর্তনের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে বিবর্তনের ধারায় চলে আসা জীবজগত।অর্থাৎ বিবর্তন বলতে আমরা বুঝি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জীবের গাঠনিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ক্রমপরির্তনকে। কিন্তু এই পরিবর্তনটা হয় কিভাবে ? কেউ কি এই পরিবর্তনের নকশা প্রণয়ন করে দেয় ? কিংবা কেউ কি ঠিক করে দেয় কোন জীবটি বিবর্তনের ধারায় জীবজগতের রঙ্গমঞ্চে টিকে থাকবে আবার কোনটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে ? বিজ্ঞানের ভাষায় এক কথায় এর উত্তর হচ্ছে  "না"। তবে ? এই বিবর্তনের স্বরূপটা ঠিক কি রকম?  এই স্বরূপ নিয়ে সর্বপ্রথম যে মানুষটি স্পষ্ট একটা ধারণা আমাদের দেন তার নাম চার্লস রবার্ট ডারউইন।

খুব সহজ করে যদি আমরা বলতে চাই তাহলে জীববিজ্ঞানে ডারউইনের মূল অবদান হচ্ছে দুটো যা "বিবর্তন" সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে আমাদের সবচে বেশি সাহায্য করেছে।ডারউইন ই সর্বপ্রথম পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে প্রমাণ করে দেখান যে, জীবজগত স্থিতিশীল নয়- এই জীবজগতের পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কোটি কোটি বছর এর বিবর্তনের মাধ্যমেই জীবের পরিবর্তন ঘটেছে ও ঘটে চলেছে আর এই নিরন্তর পরিবর্তনটি হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে। এই "প্রাকৃতিক নির্বাচন" আমাদের চারপাশে অহরহ ঘটে চলছে। যেমন তোমরা দেখেছ তো যে আম গাছে মুকুল ধরে হাজার-হাজার। কিন্তু সেই সব মুকুল থেকে কি আম হয় ? না। কেননা সেই মুকুলের অনেকাংশ ঝরে পড়ে যায় ঝড়-বৃষ্টির কারণে। আবার পোকার আক্রমণের কারণে মুকুলের পরিমাণ আরো কমে যায়। অবশিষ্ট যেসব মুকুল থেকে আম ধরে সেগুলোর একটা অংশ আবার ঝড়-বৃষ্টির কারণে বড় হবার আগেই ঝরে যায়, পোকার আক্রমণেও মরে যায় অনেকগুলো। এখন দেখো আম গাছে যে পরিমাণ মুকুল ধরে, সে তুলনায় গাছে আম হয় অত্যন্ত নগণ্য পরিমাণ। আবার এই নগণ্য পরিমাণ আমের বীজ থেকে নতুন আমের চারা হয় আরো অনেক কম পরিমাণ।অন্যদিকে দেখো মাছের পেটে যে পরিমাণ ডিম থাকে তার বেশিভাগই ডিম ছাড়ার পর শিকারী মাছের খাবারে পরিণত হয়, পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে অনেক ডিম উর্বর হতে পারে না। এমন কী স্রোতেও প্রচুর ডিম নষ্ট হয়ে যায়।অবশিষ্ট যে পরিমাণ ডিম থেকেও মাছের পোনা হয় তারও একটা অংশ আবার বড় মাছের খাদ্যের শিকার হয়। এই সব প্রতিকূলতাকে বুড়ো  আঙুল দেখিয়ে মাছের যে পোনাগুলি শেষমেশ বেঁচে থাকে, তাদের মধ্যেও বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের সংগ্রহ করা কিংবা শত্রু মাছের নজর এড়িয়ে টিকে থাকার মত নানা ধরণের "জীবন সংগ্রাম" চলতে থাকে। তাহলে দেখো কোন জীব যদি অসংখ্য সন্তানের জন্ম দেয়ও শেষমেশ তাদের মধ্যে অল্প কয়েকটিই টিকে থাকে। অর্থাৎ কোন প্রজাতির প্রতিটি সদস্য যদি অনেকগুলি সন্তান করে জন্ম দেয়ও সার্বিকভাবে তাতে ওই প্রজাতিটির জীবসংখ্যার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটে না। কারণ জন্মলাভের পর প্রতিটি জীবকে খাদ্যের জন্য, বসবাসের জন্য, শত্রুর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করবার জন্য কিংবা বংশরক্ষা করবার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যেতে হয়। এই সংগ্রামে যে বিভিন্ন সুবিধা তৈরির মাধ্যমে টিকে থাকতে পারে ওই প্রাণীর তার নতুন বংশধরকেও রেখে যেতে পারে। ডারউইনের ভাষায় এটি 'পরিবর্তনযুক্ত উত্তরাধিকার' (Descent with Modification)। ডারউইন বলেছিলেন দীর্ঘসময় ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এভাবেই 'পরিবর্তনযুক্ত উত্তরাধিকার' থেকে সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির উদ্ভব হয়। নতুন প্রজাতির উৎপত্তি সহ জীবের বেঁচে থাকা, বিলুপ্তি কিংবা সংগ্রাম - এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে সার্বিকভাবে বলা হয় প্রাকৃতিক নির্বাচন।

জীবজগতের বিবর্তন নিয়ে আমরা আজকে যা জানি তা মূলত গড়ে উঠেছে এই "প্রাকৃতিক নির্বাচন" এর প্রক্রিয়ার উপরে ভিত্তি করে যাকে আমরা বলি জৈববিবর্তন তত্ত্ব বা Evolution Theory. এখানে "Theory" কথাটা কিন্তু ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। হয়ত অনেকে মনে করেন যে তত্ত্ব বা থিওরি শুধু বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ব্যাপারটা সত্য নয়। আসলে আমরা হয়ত অনেক সময় মুখে মুখে এমন অনেক কথা বলি যেগুলির প্রচলিত অর্থ ছাড়াও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ অর্থ রয়েছে। তাই থিওরি বা তত্ত্ব বলতে আমরা নিজেরা যা ই বুঝি না কেন বিজ্ঞানজগতে এর একটি আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। আমেরিকার জাতীয় বিজ্ঞান পরিষদের মতে, "বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হল প্রাকৃতিক কোনো একটি ঘটনা বা বাস্তবতার (phenomenon) প্রতিপাদিত ব্যাখ্যা। তত্ত্ব, বাস্তবতা কিংবা প্রকৃতিকে যৌক্তিকভাবে বর্ণনা করার একটি সমীকরণ ছাড়া কিছুই না।" আর তাই যার বাস্তব অস্তিত্ব নেই এমন কোনো কিছু নিয়ে বিজ্ঞানীরা কখনও তত্ত্ব প্রদান করেন না। কোন পর্যবেক্ষণ যখন বিভিন্ন ধাপে এবং বিভিন্ন রূপে প্রমাণিত হয় তখন তাকে বাস্তবতা বা সত্য (fact) বলে ধরে নেওয়া হয়। আর তত্ত্ব হচ্ছে সেই বাস্তবতাটি কিভাবে ঘটছে তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা। প্রক্রিয়াটি বুঝতে পারলে কোন বাস্তবতা ব্যাখ্যা করবার জন্য কোন প্রস্তাবনা দেওয়া হলে তা কিভাবে ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাংগ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হয়ে ওঠে সেটি পরিষ্কার হতে  পারে।

জীববিবর্তনের যে ধারা, এই ধারা শুরু হয়েছে প্রাণের উদ্ভবের শুরু থেকেই। এখানে একটি কথা বলে রাখা দরকার যে বিবর্তন তত্ত্ব কখনও প্রাণের উৎপত্তি কিভাবে হল সেটা নিয়ে মাথা ঘামায় না। অবশ্যই প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানের নানা শাখায় নানা ধরণের প্রকল্প , তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে কিন্তু  প্রাণের উৎপত্তি বিবর্তন তত্ত্বের আলোচ্য বিষয় নয়। বিবর্তন তত্ত্ব আলোচনা করে প্রজাতির উদ্ভব কিরূপে হয়। প্রজাতির উদ্ভব আর বিবর্তনের এই ধারা এমন এক গল্পের যে গল্পের শেষ নেই। এই গল্প অন্তহীন ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে কালের পরিক্রমার সাথে সাথে। এই চলমান প্রক্রিয়ায় কোন প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে আবার কোন প্রজাতি টিকে রয়েছে অসীম সংগ্রামের ফলে।

বিবর্তনের পুরো প্রক্রিয়াটি চলে ভীষণ ধীর গতিতে। এত ধীরে এই প্রক্রিয়াটি চলে যে শাদা চোখে এই পরিবর্তন দেখাটা সম্ভব নয়। তবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীবের বিবর্তন তুলনামূলক কম সময়ে হয় বলে মাইক্রো লেভেলে এই বিবর্তনটি কিভাবে হয় সে সম্বন্ধে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা প্রতিদিনই বিবর্তনের মূলনীতির উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক বের করছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে , এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে। এই ব্যাকটেরিয়া গুলি নিজেদের পরিবেশে যেভাবে বিবর্তিত হয় তা বিবর্তন তত্ত্ব দ্বারা ব্যখ্যা করা যায়। এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ব্যাকটেরিয়ার বিবর্তনের কৌশল জেনে বিজ্ঞানীরা তা প্রতিরোধ করবার উপায় সম্বন্ধে গবেষণা করে যাচ্ছেন। এর পরে বলা যায় এইডস রোগের জন্য দায়ী এইচ আই ভি ভাইরাসের কথা। এই ভাইরাসের প্রতিষেধক বের করবার জন্য বিজ্ঞানীরা গত কয়েক দশক নিরন্তর গবেষণা করে যাচ্ছেন। কিন্তু এখনো তারা খুব একটা ফলপ্রসূ উপায় বের করতে পারেন নি। কেন ? আসলে এর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ঘটানো এই ভাইরাসের ভয়ানক বিবর্তনের খেলা। আমাদের শরীরে বংশগতির ধারক ও বাহক রূপে যেরকম ডিএনএ রয়েছে এই ভাইরাসগুলির দেহে কিন্তু তা নেই। রয়েছে প্রাচীন আরএনএ যার মাধ্যমে তারা পরবর্তী প্রজন্মে তাদের জিন ছড়িয়ে দিতে পারে। যেহেতু তাদের ডিএনএ নেই তাই স্বাধীন ভাবে বংশবৃদ্ধি করবার জন্য তারা মানুষের কোষকে ব্যবহার করতে শুরু করে। মানুষের কোষে থাকা কিছু প্রোটিনকে ব্যবহার করে এরা মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ে। মানুষের কোষে থাকা অবস্থাতেই ভাইরাসটির অসংখ্য প্রতিলিপি বা কপি সৃষ্টি হয়। মানুষের শরীরে ভাইরাস যখন আস্তে আস্তে বিস্তার লাভ করতে থাকে তখন এই ভাইরাসগুলির গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের আকস্মিক পরিবর্তন ঘটে থাকে। এই পরিবর্তনগুলি হয় আকস্মিক আর একেবারেই বিক্ষিপ্ত ও এলোমেলো ভাবে। এই ধরণের পরিবর্তনকে বলা হয় মিউটেশন।  শুধু এই ভাইরাস নয় যেকোন জীবে ই মিউটেশন ঘটতে পারে। এই মিউটেশন ঘটার কারণ কিন্তু প্রাণীকে বাড়তি সুবিধে দেওয়া এরকম নয়। অনেক সময় মিউটেশন জীবকে বাড়তি সুবিধা দেয় আবার অনেক সময় উদ্দেশ্যবিহীন ভাবেও ঘটে। যাই হোক, রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ নামের একটি এনজাইম রয়েছে যেটি এই ভাইরাসের দেহে থাকে। মানুষের শরীরে এই এনজাইমটি থাকে না। এই এনজাইমটিকে কাজে লাগিয়ে ভাইরাস অসংখ্য ধরণের মিউটেশন ঘটাতে পারে।যার ফলে পরবর্তী প্রজন্মের ভাইরাস গুলি অনবরতভাবে নতুন নতুন ধরণের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন একই ভাইরাসের বিভিন্ন প্রকরণ তৈরি করতে পারে। তাহলে ব্যাপারটা খানিকটা এরকম আমরা যে শত্রুকে ধরাশায়ী করতে চাই সেই শত্রুর প্রকৃত রূপ ই আমরা ঠিকমত বুঝতে পারছি না। বিবর্তনের মাধ্যমে নিজেকে সে নানাভাবে পরিবর্তিত করে ফেলছে আর রক্তবীজের বংশধরের মত ছড়িয়ে পড়ছে। এই বিবর্তনগুলি ঘটছে আমাদের চোখের সামনে অতি দ্রুত মানুষের শরীরের ভিতর। যার ফল দাঁড়াচ্ছে এরকম যে, প্রত্যেক এইডস রোগীর পরিস্থিতি এবং তার দেহের ভিতরে থাকা এইচআইভি ভাইরাসের বিবর্তনের ধারা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীদের ওষুধ বানাতে হবে যেটা ভীষণ কষ্টসাধ্য একটি ব্যাপার। তাই এই ভাইরাসের বিবর্তনের প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটনের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা কার্যকরী প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

বিবর্তন তত্ত্ব ব্যবহার করে অভয়ারণ্য নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ইদানীং গবেষকগণ  ইভো ডেভো টেকনিক ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের জীবের বিবর্তন প্রক্রিয়া কিরূপে হবে তা বুঝতে করতে পারেন। এরকম একেকটি প্রায়োগিক ক্ষেত্রই হচ্ছে বিবর্তন তত্ত্বকে কষ্টি পাথর দিয়ে যাচাই করে নেওয়ার মত একেকটা পরীক্ষা। এই প্রত্যেকটি পরীক্ষাতেই বিবর্তন তত্ত্ব সফলভাবে পাশ করে গেছে। আর তাই আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বিবর্তন তত্ত্ব একটি শক্তিশালী এবং কার্যকরী তত্ত্ব হিসাবে বিজ্ঞানীদের কাছে পরিগণিত হচ্ছে। ভূতত্ত্ববিদ্যা, খণিজজীববিদ্যা, অণুজীববিজ্ঞান, জীনতত্ত্ব, প্রাণরসায়ন,অণুপ্রাণবিজ্ঞান, বাস্তুসংস্থানসহ জীববিজ্ঞানের এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে বিবর্তন তত্ত্বকে উপেক্ষা করে কোন গবেষণা করা হয়। বিজ্ঞানী থিওডসিয়াস ডবঝনস্কি তো বলেইছিলেন, "জীববিজ্ঞানকে বিবর্তনবাদের আলোকে না দেখলে কোনো কিছুই আর কোনো অর্থ বহন করে না।" তাই যদি জীবনকে বুঝতে হয়, জানতে ইচ্ছে হয় প্রাণের-প্রকৃতির এই খেলা তাহলে বিবর্তনের গল্প সম্বন্ধে আমাদের জানতে হবে। সেই গল্প, যে গল্পের শেষ নেই।

* সবাইকে জানাই ডারউইন দিবসের শুভেচ্ছা। *

Thursday, April 18, 2019

অভিজিৎ দা'র স্মরণে

ধর্মগুলোর ইতিহাসের সাথে মুক্তমনা,সত্যান্বেষী, যুক্তিবাদী মানুষের রক্তের ইতিহাস মিশে আছে। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে ধর্মগুলোর প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে ধর্মান্ধদের হাতে মুক্তচিন্তার মানুষের খুন-নির্যাতন।
প্রাচীন গ্রীসে মহা দার্শনিক সক্রেটিসকে বিষপান করে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছিল, প্রচলিত ধর্ম, রীতিনীতি, দেবদেবীর সমালোচনা করার অভিযোগে, যুব সমাজের মধ্যে সত্য প্রচার করে জনপ্রিয়তা অর্জন করার অপরাধে। প্রাচীন কালে ভারত বর্ষে অনেক চার্বাকী দর্শনের মনীষী ও তাঁদের শিষ্যরাও হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিলেন। ৪১৫ খ্রীষ্টাব্দে ধর্মবায়ুগ্রস্ত খ্রীস্টানের দল আলেকজান্দ্রিয়ার দর্শনের অধ্যাক্ষা হাইপোথেশিয়াকে উপর্যুপরি ধর্ষণের পরে নির্মমভাবে হত্যা করে। নবী মহাম্মদের বিরুদ্ধে বিদ্রূপাত্মক কবিতা লেখার অভিযোগে ১২০ বছর বয়সী ইহুদি কবি আবু আফাক, কবি আসমা-বিনতে মারওয়ান নামক এক পাঁচ সন্তানের জননীকে নির্মমভাবে খুন করা হয়। মহাম্মদের নির্দেশে যখন আসমাকে হত্যা করা হয়েছিল, সে সময়ে এই হতভাগ্য মা তাঁর এক সন্তানকে বুকের দুধ পান করাচ্ছিলেন।

মনসুর হাল্লাজ নামক মরমী সাধককে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাঁকে শুধু হত্যা করেই ইসলামিস্টরা ক্ষ্যান্ত হয় নি, তাঁর মৃতদেহকে অগ্নিতে ভস্মীভূত করা হয়। ইসলামিস্টদের হাতে আরো খুন হন মরমী মতবাদের সাধক শিহাবউদ্দিন সুহরাওয়ার্দী, আল-যাদ ইবনে যিরহাম, জিলান দিমিস্কি,অন্ধ কবি বশশার ইবনে বুরজ সহ অসংখ্য ভিন্ন চিন্তার মানুষ।

খ্রিস্টান ধর্মান্ধরা জিওর্ডানো ব্রুনোকে জীবন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। ইতালীয় পণ্ডিত লুসিলিও ভ্যানিনিকে প্রথমে জিহবা ছিঁড়ে ফেলে দিয়, পরে জীবন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে হত্যা করে। খ্রিস্টান ধর্মান্ধদের হাতে নিহত হন ফ্রান্সিস কেট, ধর্মদ্রোহী লিগেট, মাইকেল সার্ভিটাস সহ আরো অসংখ্য মুক্তচিন্তক। খুন হওয়ার পাশাপাশি নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হওয়া অসংখ্য মানুষের কথা এখানে আলোকপাত নাই বা করলাম।

ধর্মান্ধ খুনীদের হাতে যুগেযুগে খুন হওয়ার তালিকায় যুক্ত হয়েছে এদেশের এক ডজনের বেশী মুক্তচিন্তক লেখক, ব্লগার, অনলাইন এক্টিভিস্ট ও প্রকাশকের নাম; যুক্ত হয়েছে আমাদের প্রিয় অভিজিৎ রায়ের নাম।

অভিজিৎ রায় এক আলোকবর্তিকা, আলো হাতে এক আঁধারের যাত্রী। তিনি আমাদের মাঝে জ্বেলেছিলেন মুক্তচিন্তার আলোর মশাল। তাঁর জ্বেলে যাওয়া সেই আলোতেই আজ আমরা অসংখ্য তরুণ-যুবা উদ্ভাসিত। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর লেখনীতে তিনি আমাদের চেতনায় চিরভাস্বর।

অভিজিৎ দা কলম তুলে নিয়েছিলেন মুক্তচিন্তার পক্ষে, বিজ্ঞান ও যুক্তির পক্ষে, ধর্মহীন মানবিক সমাজের পক্ষে। তিনি বলতেন,

“মুক্তি আসুক যুক্তির পথ ধরে; আর জীবন হোক দীপান্বিত।”

ব্যক্তি জীবনে নিধার্মিক হলেও, সকল ধর্মীয় গণ্ডীর বাইরে মানুষের প্রতি তাঁর ছিল সমান শ্রদ্ধাবোধ, ছিল অপরিসীম ভালোবাসা। যে ধর্মের চাপাতি সন্ত্রাসীদের হাতে তিনি নির্মমভাবে খুন হয়েছেন, সেই ধর্মের মানুষ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন,

“ইসলাম হচ্ছে আর ক’টি সাধারণ বিশ্বাসের মত একটি বিশ্বাসমাত্র যা কখনই সমালোচনার ঊর্দ্ধে নয়। কিন্তু ‘মুসলিম’ তো কোন বিশ্বাস নয়, মুসলিমরা হল রক্ত-মাংসের মানুষ- যাদের রয়েছে আশা, আকাঙ্ক্ষা, ভালবাসা আর সুন্দরভাবে বেঁচে থাকবার অধিকার।”

অভিজিৎ রায়ের জন্ম ১৯৭১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। তাঁর পিতা ড. অজয় রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তিনি অংশ নিয়েছিলেন উনসত্তুরের অসহযোগ আন্দোলনে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ছিলো তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ। মায়ের নাম শেফালি রায়। পিতার কর্মসূত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় কেটেছে শৈশব, কৈশোর। বাবার হাতেই তাঁর মুক্তচিন্তার হাতেখড়ি। অভিজিৎ রায়ের ভাষায়ঃ

“বাবা আমাকে ‘রাজপুত্রে’র মত বড় করতে পারেননি বটে, কিন্তু বাবাই আমাকে যত রাজ্যের বইয়ের জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের শেলফে হাজারো বইয়ের পাশাপাশি ছিলো মুক্তধারার কিশোর –বিজ্ঞানের মজার মজার সমস্ত বই। জাফর ইকবালের‘মহাকাশে মহাত্রাশ’ কিংবা স্বপন কুমার গায়েনের ‘স্বাতীর কীর্তি’ কিংবা ‘বার্ণাডের তারা’ এগুলো তার কল্যানেই পড়া। বাবাই আমাকে হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন সুকুমার রায়ের রচনা সমগ্র। হযবরল-এর বিড়াল, পাগলা দাশু আর হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়রীর কথা জেনেছি তার কাছ থেকেই। বাবাই আমার মনে বপন করেছিলেন মুক্তবুদ্ধি আর সংশয়ের প্রথম বীজ। বাবাই আমাকে আবৃত্তি করতে শিখিয়েছিলেন রবিঠাকুরের প্রশ্ন কবিতা।”

অভিজিৎ রায় পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভিতরে অবস্থিত উদয়ন স্কুলে। উদয়ন স্কুল থেকে ১৯৮৮ সালে এসএসসি পাশ করেন তিনি। এরপরে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৯০ সালে এইচএসসি পাশ করার পরে ভর্তি হন বুয়েটে। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এ ডিগ্রী নিয়ে, এরপরে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর থেকে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন আমেরিকার আটলান্টা শহরে।
২০০১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন প্রথম বাংলা কমিউনিটি ব্লগসাইট মুক্তমনা ব্লগ। এই ব্লগের মাধ্যমেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষী মুক্তচিন্তার লেখক ও পাঠকদের একত্রিত করতে সক্ষম হলেন। ক্রমান্বয়ে মুক্তমনা হয়ে উঠল মুক্তচিন্তকদের মিলন মেলা। তিলেতিলে গড়া মুক্তমনার আর্কাইভ আজও বাংলা ব্লগে অদ্বিতীয়। মুক্তমনা ব্লগ আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মের বর্বর, অজানা অধ্যায়গুলো, ধর্মের অসরতা ও অবৈজ্ঞানিক দিকগুলো। আজকে নাস্তিকতা, মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞান চেতনার যতটা বিকাশ ঘটেছে এর পিছনে মুক্তমনা ব্লগের অবদান অনেক অনেক বেশী। আজ, আমরা যারা ধর্মীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলছি, মানবিক সমাজের কথা বলছি, মানবতার কথা বলছি, নারী অধিকারের কথা বলছি, সমকামীদের অধিকারের কথা বলছি- তার পিছনে অভিজিৎ রায়ের প্রতিষ্ঠিত মুক্তমনা ব্লগের অসামান্য অবদান ছিল, আছে এবং থাকবে।

অভিজিৎ রায়ের লেখা ব্লগগুলো যেভাবে আমাদের আলোকিত করছে, তেমনি তাঁর লেখা প্রতিটি বই-ই মাস্টারপিস। প্রতিটি বই-ই আমাদের চিন্তার নতুন দ্বার উম্মেচিত করেছে। বিশেষ করে ‘ অবিশ্বাসের দর্শন (২০১১, সহলেখক: রায়হান আবীর),‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ (২০১৪)- বই দু’টির কথা না বললেই নয়। এই বই দু’টি ধর্মান্ধ ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের ভীতকে কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। ধর্মান্ধরা তাঁর লেখনীর শক্তির কাছে, যুক্তির শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে তাঁকে হত্যার পথ বেছে নিল।

২০১৫ সালের আজকের এইদিনে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ইসলামি চাপাতি সন্ত্রাসীদের আক্রমণের শিকার হন। ঘৃণ্য সন্ত্রাসী বাহিনী রেহাই দেয় নি তাঁর সাথে থাকা স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকেও। দুজনকেই নির্মমভাবে কুপিয়ে ফেলে রেখে যায় ইসলামী সন্ত্রাসীরা। আশেপাশে অনেক মানুষ, এমনকি একটু দূরে পুলিশ অবস্থান করলেও, এদের কেউ-ই তাঁদের সাহায্যের জন্য ছুটে আসেনি। অবশেষে জীবন আহমেদ নামক একজন ফটো সাংবাদিক ছুটে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে যান। মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে বন্যা আহমেদ ফিরতে পারলেও আমাদের প্রিয় অভিজিৎ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন চিরতরে। সেই সাথে তিনি প্রমাণ করে গেলেন তিনি যা লিখেছিলেন,ভুল কিছু লিখেন নি। ইসলাম নামের বর্বর ধর্মের কুৎসিত চেহারাটাই সকলের সামনে আরেক বার প্রকাশিত হলো সবার সামনে। অভিজিৎ রায়ের নির্মম হত্যাকাণ্ড এক লজ্জা, সভ্যতার লজ্জা, লেখালেখি করা কিংবা লেখালেখিকে প্রমোট করার জন্য কাউকে হত্যা করা-এ এক অসভ্যতা, এ এক মধ্যযুগীয় বর্বরতা। মধ্যযুগীয় পাষণ্ডতা। ধর্মীয় বিশ্বাসের ভাইরাস আক্রান্ত পশুরা হয়তো জানেনা, হত্যা করে সত্যকে ঢেকে রাখা যায় না, আড়াল করা যায় না, মুক্তচিন্তাকে থামিয়ে রাখা যায় না।

অভিজিৎ রায়ের মৃত্যু আমাদের মুক্তচিন্তার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। অভিজিৎ রা বারে বারে জন্মায় না। কিন্তু অভিজিৎ রায়ের দৈহিক মৃত্যু ঘটলেও তিনি আমাদের চেতনার মাঝে বেঁচে আছেন, থাকবেন।

জীবিত অভিজিৎ রায়ের লেখনি যেমনটি শানিত ছিল, ধর্মের মৃত্যু ঘন্টা বাজাতে সরব ছিল, ধর্মান্ধদের আত্মায় কাঁপন ধরিয়ে দিতে সক্ষম ছিল, মৃত অভিজিৎ রায়ের লেখনি আরো বেশী শক্তিশালী। আরো অনুপ্রেরণাদায়ী। দুর্গম পথে চলা দুরন্ত পথিকদের চলার পথের শক্তি। অভিজিৎ রায় তার লেখনীর মাধ্যমে, লেখনীর চেতনা ছড়িয়ে আরো শক্তিশালী ভাবে আমাদের মাঝে অবস্থান করছেন।

অভিজিৎ রায়ের লেখনির ছড়িয়ে পড়ুক চারদিকে, বিস্তার ঘটুক মুক্তচিন্তার, রক্তাক্ত ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারীর এই শোকের দিনে, ‘অভিজিৎ দিবসে’ এইটুকুই প্রত্যাশা।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...