Saturday, February 23, 2019

চে গুয়েভারা : এক জীবন্ত 'বিপ্লবের ফেরিওয়ালা'

"একজন মানুষের মুখ আঁকিতে একজন সত্যিকারের মানুষের মুখ আঁকতে আমার হাত কেঁপে যায়।

আমি অনুভব করি, তাঁর মাথার ওপর অন্য আকাশ তাঁর পায়ের নিচে অন্য মাটি যে রাস্তা দিয়ে তিনি হেঁটে যান তা আমার স্বপ্নে দেখা কখনও তা দুঃস্বপ্ন বলে মনে হয়, আমাকে ভয় দেখায়"

আর্নেস্তো চে গুয়েভারার জীবন কোন এক ফিল্মের মতো। যার সবসময় ছিল একটাই লক্ষ্য সমাজের জন্য কিছু করা, লড়াই একমাত্র প্রত্যেক ব্যক্তি সমান,এর মধ্যে কোন বিরহবোধ নেই।২৩ বছর বয়সে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটারের যাত্রা এবং কিউবার বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দের মধ্যে তাকে এক বিপ্লবী যার তুলনা মহামানবের সাথে করা হয়েছে।

লম্বা চুল, মুখে দাড়ি, ঠোঁটে সিগার,খাকি ইউনিফর্ম এবং তারকা খচিত টুপি, আর্নেস্তো চে গুয়েভারা এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি এখনও বিপ্লবী যুবসমাজের একটি অংশ। রক কনসার্ট থেকে মুভমেন্ট পর্যন্ত, আপনি অবশ্যই তরুণদের টি-শার্টে এই যুব আইকনের ছবি এবং স্লোগান সহ প্ল্যাকার্ড দেখতে পাবেন। এভাবে চে গুয়েভারাকে প্রতিটি মতাদর্শের একজন তরুণ নায়ক বলে মনে করলেও বামপন্থী মতাদর্শে যোদ্ধা হিসেবে আমাদের প্রেরণার জায়গা। যে সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে জনগণের হৃদয়ে বিপ্লবের আলো সৃষ্টি করেছিলেন। সে আজও বেঁচে আছে, জ্বলছে। চে গুয়েভারা দুইভাবে জনপ্রিয় হয়েছিলেন, কিছু লোক তাকে হত্যাকারী চে গুয়েভারা বলে এবং কিছু লোক তাকে বিপ্লবী বলে লাল সালাম কমরেড হিসাবে উপস্থাপন করি।

চে গুয়েভারার জীবন একটি সিনেমার মতো যা আপনি বারবার দেখতে চাইবেন। চে গুয়েভারা কী ছিলেন, তা আপনি এভাবেই বুঝতে পারবেন যে, তৎকালীন ফ্রান্সের মহান দার্শনিক জঁ পল সার্ত্রে সেই ব্যক্তিকে তার সময়ের সবচেয়ে পরিপূর্ণ মানুষ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। চে গুয়েভারা সর্বদা এমন একটি সমাজের জন্য লড়াই করেছেন যেখানে প্রতিটি মানুষ সমান, কারও মধ্যে কোনও বৈষম্য থাকবে না। কিউবার বিপ্লবের এই নায়ক চে গুয়েভারা আমৃত্যু সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। সেজন্যই তিনি আজকের যুবসমাজের নায়ক যিনি মাটিতে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চান। জন লি অ্যান্ডারসন, যিনি চে গুয়েভারার উপর বই লিখেছেন, বলেছেন যে চে গুয়েভারা এখনও তরুণদের নায়ক কারণ তিনি জীবন দিয়ে বিপ্লবকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। একজন বিপ্লবী নিজেকে মুছে দিয়েও বিপ্লবকে বাঁচিয়ে রাখেন চে গুয়েভারার এই ভাবনা আজও তরুণদের মনে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

চে গুয়েভারা সবসময় বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেন, কিন্তু চে তার বন্ধু আলবার্তো গ্রানাডোর সাথে দক্ষিণ আমেরিকায় সাইকেল ভ্রমণে যাওয়ার সময় জীবনের এটি একটি আগ্নেয়গিরি হিসাবে বিস্ফোরিত হয়েছিল।২৩ বছর বয়সে প্রায় ১০০০০ কিলোমিটার ভ্রমণ করার সময় চে যে সমাজগুলি দেখেছিলেন তা তাকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। দক্ষিণ আমেরিকা সফরের সময় তিনি দেখেছিলেন যে সমাজ কীভাবে দুই ভাগে বিভক্ত, যেখানে একদিকে মানুষ বিশ্বের সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরপুর জীবনযাপন কাটাচ্ছে, অন্যদিকে এমন একটি সমাজ রয়েছে যাদের খাবার ছিল না। দুই বারের জন্য। হ্যাঁ, অসুস্থ হওয়ার পর কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। শোষিত হচ্ছিল শ্রমিক ও দরিদ্ররা। এসবই চে গুয়েভারার মনে দাফন করা আগুনকে আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করেছিল। এই ভ্রমণের পর, চে তার নিজ শহরে ফিরে আসেন এবং তার ডাক্তারি পড়া শেষ করেন।

যাইহোক, তখন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নও তার মন থেকে চলে গিয়েছিল এবং বিপ্লবী হওয়ার স্বপ্ন এসেছিল যে এই সামন্তবাদী শক্তিকে কীভাবে উপযুক্ত জবাব দিতে পারে।১৯৫৩ সালের পর, তিনি জানতে পারলেন যে আমেরিকার প্রতিবেশী গুয়াতেমালায় কিছু দল উঠছে, যারা সামন্তবাদের বিরোধিতা করছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। চে গুয়েভারাও তাদের সঙ্গে ছিলেন। সে সময় গুয়াতেমালায় প্রেসিডেন্ট জ্যাকব আরবেঞ্জের অধীনে সরকার ছিল। জ্যাকব তার জায়গায় অনেক ভূমি সংস্কার আইন আনার চেষ্টা করছিলেন, যা সাধারণ নিপীড়িত মানুষের উপকারে আসবে। কিন্তু এই আইনের কারণে 'ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি' নামে একটি কোম্পানি, যেটিতে আমেরিকার কিছু পুঁজিপতিরও অর্থ ছিল, বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আমেরিকা এত বড় ক্ষতি হতে দিতে চাইছিল না, তাই এখানে একটি অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল এবং রাষ্ট্রপতি জ্যাকবের সমস্ত সমর্থকদের হয় বন্দী করা হয়েছিল বা হত্যা করা হয়েছিল। সেই সময়ে, চে গুয়েভারা জ্যাকবের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন, যে কারণে তিনি গুয়াতেমালা ছেড়ে মেক্সিকোতে আসেন এবং ডাক্তারের চাকরি নেন। মেক্সিকোতে, তিনি কিউবা থেকে বহিষ্কৃত ফিদেল কাস্ত্রোর ভাই রাউল কাস্ত্রোর সাথে দেখা করেন এবং এখান থেকে চে গুয়েভারা কিউবা বিপ্লবের বিখ্যাত মুখ হয়ে ওঠেন।

চে গুয়েভারা এই সময়ে ফিদেল কাস্ত্রোর সাথে দেখা করেন এবং পরে তার সেরা বন্ধু হন। তিনি কিউবার বিপ্লবের যোদ্ধাদের গেরিলা যুদ্ধ শিখিয়েছিলেন, যা কিউবার মার্কিন-সমর্থিত স্বৈরাচারী সরকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। পরে তিনি কিউবার বিপ্লবের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ হয়ে ওঠেন এবং ফিদেল কাস্ত্রোর সরকারে মন্ত্রী হন। যদিও গুয়েভারা কখনই ক্ষমতার প্রতি লোভী ছিলেন না, তিনি একজন যোদ্ধা হিসেবে জীবনযাপন করতেন, যে কারণে তিনি পরে এই অবস্থান ছেড়ে দেন এবং বলিভিয়ার বিপ্লবে অংশগ্রহণ করতে যান, যেখানে তিনি সিআইএ কর্তৃক নিহত হন।

কিউবায় যখন বিপ্লব শুরু হয়, তখন সেখানে একনায়ক বাতিস্তার সরকার ছিল, যার পূর্ণ সমর্থন ছিল আমেরিকার। আমেরিকার সমর্থন ছিল কারণ আমেরিকান জনগণের প্রচুর অর্থ কিউবার তেল এবং অন্যান্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছিল এবং তারা কিউবা থেকে অর্থ উপার্জন করছিল। তবে এসবের মাঝেও কিউবার সাধারণ মানুষ চরম দারিদ্র্য ও অনাহারের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল। কিউবায় বিপ্লবের পিছনে একটি বড় কারণ ছিল যে আমেরিকা, যে আমেরিকা নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করেছিল, তার সমস্ত ধনী লোক এখানে কিউবায় মাদক ও পতিতাবৃত্তির ঘাঁটি তৈরি করেছিল। যা কিউবার জনগণ পছন্দ করেনি এবং তাদের মনে আমেরিকা ও বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বাড়তে থাকে। ফিদেল কাস্ত্রো এই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শিঙা ফুঁকিয়েছিলেন, যার ফলস্বরূপ আর্নেস্তো চে গুয়েভারা সামনে এসে তাকে সমর্থন করেছিলেন।

চে গুয়েভারার কৌশল এবং গেরিলা যুদ্ধ আমেরিকান এবং বাতিস্তার সৈন্যদের পরাস্ত করে এবং ১৯৫৯ সালে কিউবার ক্ষমতা উৎখাত করে। চে গুয়েভারা যেভাবে কিউবার জনগণকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো কিউবায় একই মার্কসবাদী ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেছিলেন। এই সরকারে চে গুয়েভারাকে শিল্প মন্ত্রণালয় দেওয়া হয় এবং তিনি 'ব্যাংক অফ কিউবার' প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা না করলেও এত বড় পদ পেয়েও সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতেন। যারা তাকে ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন তারা বিশ্বাস করেন যে ফিদেল কাস্ত্রো হয়তো কিউবায় মার্কসবাদী ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেছিলেন, কিন্তু সেই পুরো সরকারে যদি সত্যিকারের মার্কসবাদী কেউ থেকে থাকেন তবে তিনি ছিলেন একা চে গুয়েভারা। চে গুয়েভারাও একবার ভারতে এসেছিলেন শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন। যখন জহরলাল নেহরু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।


 'চে' একটি ফরাসি শব্দ যার অর্থ বন্ধু। চে গুয়েভারা একমাত্র ব্যক্তি যিনি আমেরিকার মতো একটি বড় সামন্তবাদী দেশের জন্য বিশ্বজুড়ে অনেক ভিয়েতনাম তৈরি করেছিলেন। এই ব্যক্তিটি তার বিপ্লবের সাথে মানুষের অন্তরে এমন আগুন স্থাপন করেছিল যে সামন্ত বাহিনীর পক্ষে দাঁড়াতে কঠিন ছিল। আমেরিকান সাংবাদিক জন অ্যান্ডারসন, যিনি বিবিসির সাথে কথা বলার সময় যে চে গুয়েভারা বইটি লিখেছিলেন, বলেছেন, 'আমি চীনের তুষার বোর্ডে, জাপানের শিশুদের, জাপানের বাচ্চাদের মধ্যে চে গেভারের ছবি দেখেছি। চে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে কিউবার কাছাকাছি আনা হয়। কিউবা অনেক দশক ধরে সেই পথ অনুসরণ করেছে। চে শক্তিশালী আমেরিকার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সক্ষম ছিল, এক বা দুই নয়, বরং অনেক ভিয়েতনাম।"আমেরিকার সামন্তবাদী বাহিনী যে কোন মূল্যে চে গুয়েভারা কে নির্মূল করতে চেয়েছিল। প্রতিরোধ সংগ্রামে,বিপ্লবের ফেরিওয়ালা চে গুয়েভারা।তিনি কখনো গুয়েতেমালা কখনো কিউবা, কখনো পেরু- নিকারাগুয়া-কঙ্গো আবার কখনো বলিভিয়ার শোষিত নির্যাতিতদের কাছে ছুটে গেছেন,তাদের সংগ্রামে মুক্তির মশাল হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কোথাও সফল হয়েছেন, কোথাও হন নি -পরাজিত হয়েও মুক্তিসংগ্রামের ভিত্তি প্রস্তুত করেছেন। লাতিন আমেরিকা জুড়ে নিরন্তর মুক্তিসংগ্রামের চেতনা তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে ফিরে এসেছে বারবার। মার্কসবাদী লেনিনবাদী মতাদর্শে নিষ্ঠাবান, বিশ্ববিপ্লবের স্বপ্ন বুকে নেওয়া, চলমান বিপ্লবের জীবন্ত প্রতিমূর্তি চে কে কোনো একটি দেশের মধ্যে আটকে রাখা সম্ভব ছিল না। কিউবায়,সফল বিপ্লবের পর ১৯৬৫ সালে চলে যান আফ্রিকার কঙ্গোয়,সেখানে গৃহযুদ্ধে অংশ নিতে। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সেই সময়- সোভিয়েত রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের প্রশ্নে(চে মনে করতেন সমাজতন্ত্র অধঃপতিত হয়েছে) তাঁর সাথে ফিদেলের গুরুতর মতপার্থক্য দেখা দেয়,তাঁকে মন্ত্রিত্বের পদ থেকে অপসারিত করে অন্য পদমর্যাদা দেওয়া হয়।কিন্তু চে আর কিউবা থাকতে রাজী ছিলেন না।মহান আন্তর্জাতিকতা বোধে উদ্বুদ্ধ চে অন্যান্য নিপীড়িত দেশের মুক্তিসংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেন। কঙ্গোর পর,পাড়ি দেন বলিভিয়ায়। সেখানে মার্কিন মদতপুষ্ট স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে চলছিল সমাজতন্ত্রীদের মরণপণ সংগ্রাম। চে তাঁর গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশলে সমৃদ্ধ করে তোলেন তাদের সংগ্রাম। অবশেষে, সেনাবাহিনীর সাথে তুমুল সংঘর্ষের পর বিপ্লবীরা পরাজিত হন(৭অক্টোবর'৬৭)।গুরুতর আহত অবস্থায় চে ধরা পড়েন। ৯অক্টোবর সরকারের নির্দেশে বন্দী চে কে গুলি করে হত্যা করে বলিভিয়ান সেনা। ফায়ারিং স্কোয়াডে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি নির্ভীক চে শেষবারের মতো শান্ত গলায় বলে উঠেন-'I know you are here to kill me.Shoot, coward -you are only going to kill a man, not ideas.'

মাত্র ৩৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন মানবসেবায় উৎসর্গীকৃত মহাপ্রাণ -কমরেড আর্নেস্তো চে গুয়েভারা। মৃত্যুর অর্ধশতক পরেও,জীবিত চে র মতো মৃত চে আজও সমুজ্জ্বল -প্রতিবাদের জ্বলন্ত মশাল। তিনি, দেশে দেশে চলা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত মানুষের অনুপ্রেরণা। নিহত হলেও আজও বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন সংগ্রামী মানুষের চেতনায় দৃপ্ত অননুকরণীয় ভঙ্গিমায় কমানদান্তে আর্নেস্তো চে গুয়েভারা।

প্রসঙ্গে মানবাধিকার

নশ্বর পৃথিবীটার বিরাট আস্ফালন!
একমুঠো পরিধির রাসানাগারে
জঠর ভেদ... চলছে....
উদারতার সাজসজ্জায় অনৈতিক মূল‍্যায়ন!
শবের মিছিলে লাল অক্ষরে ব‍্যনার
ফ‍্যেশন, যুগের বিবর্তন।

লিখতে বসলেই দেখি....
ভুলের সাতকাহন প্রাচীন থেকে বর্তমান স্বমহিমায়।
তবু একগাদা বুর্জোয়ামী খেলাফতে
নির্দ্বিধায় শ্রেষ্ঠ জীবরা, ব‍্যস্ত পদ-লেহনে
ম‍রুক না বুড়ো পাগুলো রাজধানী তটে
......শষ‍্যের গুরুত্ব হ্রাসে।
কুর্নিশ তোমায়!

আরও কুর্নিশ......
ঐ দলবদ্ধ যৌবনের সেনাপতিকে।
'জয় শ্রীরাম' হবে মানবতার শ্লোগান!
ধর্মের রাজনীতিতে সুমহান----
বাবরি আর রামমন্দির এখন অমৃত সমান!
রাজপথে পুড়ুক ওরা, রক্তে হোলি খেলা
থামাসনে ঈশ্বরবাদী মনুমেন্ট গড়া।

মানবাধিকার প্রত্যেকটা মানুষের জন্মগত অধিকার। মানবাধিকার কথার অর্থ হলো মানুষের অধিকার।প্রত‍্যেকটা মানুষই চায় নির্ভেজাল অক্সিজেন। মানব সমাজের ভিত্তি হচ্ছে ন‍্যায় বিচার, সুষ্ঠ জীবন যাপন,সহজাত মর্যাদার স্বীকৃতি। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে গুরুত্বের সাথে আলোচিত ও অবহেলিত প্রসঙ্গটির নাম মানবাধিকার। ১৯৪৮ সাল থেকে জাতিসংঘের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর যথাযোগ্য মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা এবং মানবতাবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে ঘোষিত হয় সার্বজনীন মানবাধিকার দিবস।
মানবাধিকার ব‍্যক্তিকে স্বাধীনতা, ন‍্যায়,সমতা,মর্যাদা রক্ষক জীব রূপে ক্ষমতা দিয়ে থাকে। Robert L. Barker  বলেন, Human Rights are the opportunity to be accorded the some progressive and obligations as to race, sex, language, or religion. [Robert L. Barker (edit): The Social work Dictionary, NAS, New York, 1995, p.- 173] অর্থাৎ মানবাধিকার হলো কিছু সুযোগ-সুবিধা, যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে সকলের জন্য সমান। সুতরাং মানবাধিকারকে একটা Mechanism or Instrument অথবা মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা যায় যা সকল মানুষের জন্য সহজাত ও সার্বজনীন এবং যা ব্যক্তির আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতির জন্য সহায়ক।

মানবাধিকারের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বা   মূলনীতি :
সার্বজনীনতা : মানবাধিকার সারা পৃথিবীতে সকল মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে সকল মানুষ এই অধিকারগুলো সমানভাবে ভোগ করতে পারবে।
অবিচ্ছেদ্য নিরবচ্ছিন্নতা : যথাযথ বা ন্যায়সঙ্গত কোন কারণ ব্যতিরেকে কোন দেশ বা রাষ্ট্র মানবাধিকারসমূহ বা কোন একটি মানবাধিকারও কখনও কেড়ে নিতে পারবে না।
পারস্পরিক নির্ভরশীলতা : মানবাধিকার সমূহ একটি অপরটির সাথে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত ও নির্ভরশীল। একটিকে অপরটি থেকে পৃথক করা যায় না। যেমন : সার্বজনীন চিকিৎসা বা শিক্ষার অধিকারটি কোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির ওপর নির্ভর করে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা মুক্তি এবং সচেতনতা ছাড়া চিকিৎসার অধিকার পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
সমতা ও বৈষম্যহীনতা : মানবাধিকারগুলো জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, রাজা, প্রজা ভেদে কোন পার্থক্য করা যাবে না। সকল মানুষ সমানভাবে এই অধিকারগুলো ভোগ করবে।
আইনের শাষণ ও কর্তব্যপরায়ণতা : ব্যক্তির ক্ষেত্রে মানবাধিকারগুলো ভোগ করতে হলে অবশ্যয়ই কর্তব্য পালন করতে হবে। নিজের অধিকার পেতে হলে অবশ্যয়ই অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আবার রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে অবশ্যই জনগণের এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করার পজিটিভ Policy গ্রহণ করতে হবে এবং কোন কারণে এই অধিকার লঙ্ঘন করলে জবাবদিহি করতে হবে।
মানবাধিকারগুলোকে ৫ ভাগে ভাগ করা যায়:
১. রাজনৈতিক অধিকার : ভোটাধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার।
২. নাগরিক অধিকার : জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার। মতামত এবং অভিব্যক্তি প্রকাশের অধিকার।
৩. অর্থনৈতিক অধিকার : ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কাজের পরিবেশের অধিকার।
৪. সামাজিক অধিকার : বাসস্থান, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার অধিকার।
৫. সাংস্কৃতিক অধিকার: প্রত্যেকের নিজ নিজ প্রথা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকার।
মৌলিক মানবাধিকারসমূহ:
জাতিসংঘ ঘোষিত সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী প্রধান প্রধান মানবাধিকার সমূহ নিম্নরূপ :
সমতা এবং বৈষম্যহীনতার অধিকার
জীবন ধারণ এবং স্বাধীনতা লাভের অধিকার
খাদ্যের অধিকার
চিকিৎসার অধিকার
শিক্ষার অধিকার
রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের অধিকার
মতপ্রকাশ ও বাকস্বাধীনতার অধিকার
সমিতি বা সংগঠন করার অধিকার
শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার অধিকার
ভোটাধিকার
ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার
নিজ সংস্কৃতি চর্চার অধিকার
তথ্য পাওয়ার অধিকার
সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ গ্রহণ করার অধিকার
নির্যাতন ও বন্দিদশা থেকে মুক্তির অধিকার
আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার
স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার
গোপনীয়তার অধিকার
জাতীয়তার অধিকার
বিয়ে ও পরিবার গঠনের অধিকার
কর্মসংস্থান লাভের অধিকার
সামাজিক নিরাপত্তা লাভের অধিকার

মানবাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা : সমতা ও বৈষম্যহীনতার ভিত্তিতে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকারগুলোকে শ্রদ্ধা করা, রক্ষা করা এবং পরিপূর্ণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের।
১. শ্রদ্ধা করার বাধ্যবাধকতা (Obligation to Respect): বলতে বুঝায় ব্যক্তির প্রাপ্য অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এমন কিছু করবে না যাতে কোন নাগরিকের অধিকার ক্ষুন্ন হয়।
২. অধিকার রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা (Obligation to protect): যদি তৃতীয় কোন পক্ষ কোন নাগরিকের অধিকার ভোগে বাধা প্রদান করে, রাষ্ট্র সেই বাধা থেকে নাগরিকের অধিকারকে সুরক্ষা করবে।
৩. পরিপূর্ণ করার বাধ্যবাধকতা (Obligation to fulfill) : রাষ্ট্র প্রত্যেক নাগরিকের অধিকারগুলোকে তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এগুলোকে সহজলভ্য ও উন্নতর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে। এ ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি বা সামাজিক উদ্যোগকে সহযোগিতা প্রদান করতে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে।
৪. পদক্ষেপ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা (Obligation to take step) : নাগরিকের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রতি সম্মান রেখে যথাযথ পন্থায় ধারাবাহিকভাবে অর্জনের জন্য সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে রাষ্ট্রের। [ Universal Human Rights act, 217 A, 10th December,1948 Paris]
            পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন‍্যায় ভারতেও ১৯৯৩ সনে মানবাধিকার আইন লাগু হয়। যদিও ভারতের বহু রাজ্যে আজও মানবাধিকার কমিশন গঠন হয় নি। বিশ্ব মানবাধিকার কমিসনের লিখিত ধারাগুলির মধ্যে বেশীর ভাগই ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে থাকা মৌলিক অধিকারের মধ্যে স্তান পেয়েছে। ভারত সামাজিক, সাংস্কৃতিক অধিকারের সনদে স্বাক্ষর করে নি কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে আর্থ সামাজিক বিভিন্ন দাবীকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।
              যদিও মানবাধিকার নিয়ে জাতিসংঘ এক অভিনব প্রয়াস হাতে নিয়েছে। তাস্বত্বেয় অন্য দেশের কথা বাদ দিয়ে যদি ভারতবর্ষের মানবাধিকার লংঘনের কথা বলি তবে এনিয়ে পুরো একটা গ্রন্থ রচনা করা যাবে। এমনেষ্টি ইন্টারনেশনেল সংস্থার শুধু ২০১৮ এর রিপোর্ট অনুযায়ী ---- ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন(মুসলিম), কিছু কট্টরপন্থি হিন্দু সংস্থার দানবীয় রূপ, শিল্পজাত প্রকল্পের জন‍্য আদিবাসী উৎপাটন,ব‍্যপক ভাবে দলিতদের নিয়ে নোংরা রাজনীতি। তীব্র ভাবে দাঙ্গাবাজদের হিংস্রতা বিশেষ করে গো-রক্ষক দল, কলেজ ইউনিভার্সিটি তে ফ্রী স্পিচে আক্রমণ। এখানেই শেষ নয় আরও তীব্র ভাবে মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে নারী ও শিশুদের প্রতি। চলতি বছরে ধর্ষণ কাণ্ডে এক রেকর্ডও গড়লো।  সামগ্রিক ভাবে কাঠুয়া, বুলন্দ শহর, তথা ঐ বাইশটা গ্রাম নিষ্পেষিত হয়েছে Statue of Unity স্থাপন, কৃষকরা আজও ধর্ণা দিচ্ছে অধিকার নিয়ে। আমাদের রাজ‍্যগুলোর মধ্যে অসম ও পিছিয়ে নেই। NRC তে বাঙালি হেনাস্থা,ডিটেনশনে হিটলারি কায়দায় চলছে নির্যাতন, শেষ রক্ষা হয়নি একশো বছরের বৃদ্ধও।
                সারা বিশ্বে এখন মানবাধিকারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যেকটি দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মানবাধিকার সংস্থা। নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে হবে আমাদেরই। মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি, ঘোষণাসমূহ এবং দেশীয় আইন গভীরভাবে অধ্যয়ন করা। অঞ্চলে অঞ্চলে জনগণকে জাগ্রত করতে হবে মানবাধিকার কর্মীদের দ্বারা। মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে র‌্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনার এর আয়োজনের মাধ্যমে জনগণকে মানবাধিকার সচেতন করে তোলা। সর্বোপরি, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে হাতে হাত রেখে সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হওয়া ।
পরিশেষে বলা যায়, ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসকে সামনে রেখে সবাই নিজের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হওয়া এবং অন্যের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করা উচিত নতুনভাবে।

কবিতা রা


১) কথা ছিলো
--------------------------------

কথা ছিলো----
মার্টারের গগনবিদারী চিৎকারে স্তব্দ হবেনা প্রকৃতি,
তাঁর আঁচলে মুখ লুকাবেনা কোনো মুখোশধারী প্রেমিক!

কথা ছিলো----
গৌরি,কুলদীপ,সুজাত'রা অবাধ স্বাধীনতায় আকাশের বুক ছুঁবে,
তপ্ত রৌদ্রে চৌচির মাঠে বর্ষার ঢল নামাবে!

কথা ছিলো----
নির্ভয়াদের ছোপ ছোপ রক্তের দাগ লেগে থাকা কামিজ দেখে
পথিক অট্টহাসি দিবেনা,
মাতৃত্বের শাশ্বত টানে চিত্তে শ্রদ্ধা ধারণ করবে!

কথা ছিলো----
রুক্ষ জমিনে আবার সোনার ফসল হবে
শেখুবাইর মতো আরও কত শত লংমার্চে !

কথা ছিলো----
কর্মে মহান হবে ধর্মে মহান হবে
প্রতিটা বিশ্বাসালয় ঠাসা বয়স্ক রচনাগারে !

কথা ছিলো----
বোশেখের প্রথম প্রহরে মঙ্গল স্নান হবে,
নরনারী জাতীয় সত্তায় আলোকিত 'মি টু' শ্লোগানে  !

কথা ছিলো----
হিমুর চোখের ভিতরে অনুরাগের জল থাকবে,
প্রেমিকের দেয়া ধোকার আড়ালে পরকীয়া লাজ পাবে !

কথা ছিলো----
রাজপথ নতুন করে আর রক্ত-স্নানে রঞ্জিত হবেনা,
রাজপথের বুকে শুধু স্লোগান ধরবে!

২)
মানুষের পৃথিবী টা
◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆
মানুষের পৃথিবীটা আস্ত একটা যৌনখানা
ন্যাংটো হয়ে যেই বিছানাটা নাচতে শুরু করলো
ফরমান এলো
মানচিত্রের কাঁধের কাছ থেকে আড়াই কেজি মাংস কেটে নেয়া হবে
অবাক হবেন না।

শুকনো জিহ্বা কত টানবে উপচে পড়া ব্লাউজের রস
রয়েল-বেঙ্গল টা ন‍্যাশনেল পার্কে
স্বপ্ন বিহারে বিভোর
আর্য-শ্লোকের বর্জ‍্য চিৎকারে
থালায় প্রসাদ, চেষ্টায় ঘুম ভাঙানো।

৩) হলুদ হ‍্যালোজেন

মিথ্যাগুলো কে লুকালেই আবারও নতুন আরও কিছু মিথ্যা নিয়ে উঠে
রাজপথে দিয়ে যেতে যেতে দেখা পাই
শুয়ে আছে ভারি কোন নারীর মতো অনাসক্ত চাঁদের কোয়া;
নিজের জন্য উপযোগী করে আবার
অনেক কিছু ঐ উত্তেজনার স্বীকার,
-------- হলুদ হ‍্যালোজেন !

হ্যাঁ, তার বুক জুড়ে ভিখারির গীত,
ভাড়াটে উপচে পড়া স্তন, চাটবেই !
ভীষন বিভক্ত হয়ে কেঁদে চলে মোমের মিছিল
দুর্দশারা চলুক ভিসুবিয়াস ছেড়ে আরও.......
কোথাও নেই কোথাও নেই, চেঁচিয়ে লাভ হবে !
এসিড রেইন এ আহত
এক এক ফোঁটা অক্সিজেন।

৪) লাল সেলাম

অস্তাগমে লাল রবি টার চিলতে হাসি
বিষাদ সাগরে এক লক্ষণ রেখা টানে
ঢলে পড়া বিকেল অতিত সময়ে,
দুর্ভিক্ষের থালা কাড়ে, এক আশির্বাদ রূপে
অজস্র কঙ্কাল রূপী হাসি নীলছবির রাবণালয়ে
সাদা কাপড় ও অগ্নিপরীক্ষা দেয়।

বিভাজনে মন্দ ঈশপের গল্প ঐতিহ্য
বেশ‍্যা যেমন কিছু সময়ের জন্য শরীরের কয়েকটি অংশ ভাড়া দেয়
মানুষ গুলোও শিখেছে অন্তর ভাড়া দেওয়া
প্রেম, ভক্তি, শ্রদ্ধা-------
যদি পারে ন‍্যাপকিন বানাবে !

মুখ গহ্বরে গুংগানির আওয়াজ শুনে
শুধু স্তব্ধ অশ্রু টা পড়ে
গড়ে যায় চোখের পাশ নালা দিয়ে,
হঠাৎ উতলে পড়া দুধাঘাতে
আহতরা প্রতিদিন সংযমী মেহনতে
--------- লাল সেলাম ঐ সংযত মনকে।

৫) পরকীয়া

ক্ষণে ক্ষণে তীব্র প্রতিক্রিয়া
এক আকারে সঞ্চিত পুঁজি মোহনবাগানে
ঢেউ খেলে অতৃপ্ত চাহনি,
আশার পূর্ণ কিরণে নৈরাশ্য ঝড়ে
ভোগের অংশটি হাতছাড়া।
অদৃশ্যের চাওয়াটা অন‍্যরকম হাঁটে
সড়কের ঠিক মাঝখানে
মনে হয় অম্লান কামনা মহীরুহ মেহগনি ছায়া ফেলে
তোমার আমার পথে,
ব‍্যবহৃত শরীর টা দুজনার,শরমে-সংকোচে
সামাজিক মুখ তোমার আঁচলে ডেকে
দেখিনা তো কোনো ভুল তাতে----
তবু কেন সম্মুখীন প্রশ্নবোধকে?
জীবনের মরণপারে আমি আর প্রেম
মিলে যাই পারাবারে।

৬) কামনার দংগোল

মধ‍্য রাত্রি.....
তা ও শান্তি জুটলো না,
বসে ছিলাম কাগজের পাশে
ভাবছিলাম কয়েকটি পরিচিত শব্দ জোড়ো করে
সারিতে সাজাবো,
নিঃশব্দ......
হঠাৎ নগ্ন ব্রা'টা কাঁধে, শিউরে উঠি
দেখি দুলে ওঠা জোড়া স্তনের উপচে পড়া প্রদর্শন
আর তার চূড়ায় পিকাসোয়ী কারুকার্য;
ধীরে ধীরে সুপ্ত রাক্ষস জাগ্রতের পথে।

আলগা হয়ে যাওয়া বসনখানি শরমে........
নগ্ন কটিদেশে তোমার নিক্কণে,
নিঃশ্বাসে বেড়ে যাওয়া উষ্ণতা
বেপরোয়া,পরিচয় ভুলে পরিণত অন্য রূপে
কামনার দংগোলে নগ্ন শরীরে
জাগ্রত প্রশ্রবন ডাকছে মাতাল বেসে
তৈরী সে তীক্ষ্ম বর্শার আঘাত সইতে
দীর্ঘ পরিশ্রম ঝরা ঘামে, আনন্দ আর আনন্দ
সর্পিল বাঁধনে আমায় বাঁধো তুমি কাম রঙে।।

৭) জন্ম নয়, মৃত্যু......

আড়ষ্টতায় পিছু হটে বৃথা সংলাপ
দালালেরা দলিত হয় দালানের ওপারে।
সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটে।
অবসাদে শরীর এলিয়ে দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে
ঘুম আসে ,
আমি ও চন্দ্রালোকের ভেতরে পিদিম জ্বালি
মর্তের পৃথিবীতে নামাই রোগ জরা...
শিহরিত প্রতিটা অঙ্গচুল নিরব----
মুখগহ্বরের গোঙানিতে।

রেহাই নেই ,মুখে ফেবিকুইক আঠা!
তবে জন্মাতে পারে রক্ত হিংসার মাঝে;
'শান্তি'র' দৌড়ে বেটারা
স্বীকৃতি পাওয়া প্রাদান‍্য!!

৮) পঁচা হৃৎপিণ্ডের মিলনায়তন

বিলাস প্রাসাদে আজ কাপুরুষ মেলা
নিত‍্য নতুন ছোরা, নাম সভ‍্যতা !
দিকে দিকে ছিটা রক্তের জখম;
শুকছে নষ্ট শকুন, স্বাধীনতা হরণ
পঁচা হৃৎপিণ্ডের মিলনায়তন---
বোকারা পুড়ছে, দ‍্যাখ্
স্মিতহাস‍্য শয়তানের মুখ, ওরে ঐ নির্বোধ।

থাক্..... থাক যতসব আঁচলে বাঁধা
মরুক না ওরা, কাজ টা পদলেহা;
লোহিতে মিশুক নিষ্পাপ লাল কণা,
চিহ্নহীন গোরে-----
এ-সভ‍্যতা, সূচনায় নতুন যুগ আবিষ্কার মূহুর্তে!

৯) #মি...টু

এই মেয়ে শুন্, রাখ তোর ভেল্কিবাজী
ক্ষমতায় কে জানিস তো----
বেশ বেড়েছে তোর মাদার ইন্ডিয়া পনা
নিজেকে কি ভাবছিস
তাসলিমা, না এঞ্জেলা।
তোর শ্লোগানে, কলমে
কাঁপবে বেটাদের শিবলিঙ্গ---!
বন্ধ হবে কলঙ্কিত সিথিঁর সিঁদুর
কিবা যোনির রসটানা,
ভেবেছিস শুধরোবে সমাজ?
বালও ছিড়তে পারবি না।

হাসি পায় তোদের নৌটক্কিতে
-----বলে কি #মি....টু।
দ‍্যেখ্ গুরু থেকে শুরু
সংস্কারি বাবাও ঐ লিষ্টে;
সাহস এলো কোত্থেকে,
জানিস তো কতশত নজির রেখেছি
আরও রাখবো, আমি ক্ষুধার্ত.......
হ‍্যাঁ করেছি যৌন নির্যাতন, স্ফূর্তি
কোন অসুবিধা, আমার জন্মগত অধিকার।
কে, ও.... প্রসাশন
টানবে ব্রা-পেন্টি নীচে ঐ উলস গদিতে।
গলাটা আর ফাটিয়ে লাভ নেই
দ‍্যাখ্ .......দ‍্যাখ্
মন্দির টা আমার মসজিদ টাও
তোর কোনটা বল্,
গোলাম কিনেছি ক‍্যেশে
আরও কিনবো অফারে।
সুখী হতে পারিস----
কাঙালের চাহিদা পূরণে।।

১০) ভেতরের কন্ঠে
◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆
আত্মহত্যার আগে অপেরা শোনালে ভালো লাগবে আমার
আমি রবীন্দ্র সংগীত শুনেছি সাথে নজরুল ও
আর কবিতা.....
একটু হলেও শুনবো "আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে"
বাকি রাখিনি আল-মাহমুদ বলো আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
তৃষ্ণাটা মিটতো,কিন্তু------
মানুষ সঙ্গমের সময় 'ভালোবাসি' শব্দটা বেশী বলে,
এর মতই।
ঘুরে আসুন গণতন্ত্র---
হিউম‍্যানিটি মিথ্যার ভিড়ে,লেট মি ফাক্।

মানুষগুলো এই গোলকের ভিতর
উচ্ছিষ্ট পাহাড়ের ঢলের মতো,
থিয়েটারে ন‍্যাংটো আদম-ইভ ফুল মুভি
ঠিক মূহুর্ত অবিকল শ্রীজাতের 'অভিশাপ'
ক্ষুধা নিবৃত্তি,
চলমান সংঘর্ষ সেই ট্রেডিশনে
আরও অপরিপক্ক মস্তিষ্ক জন্মালো।
শ্বাসরোধ সফলতা রক্তবমিতে ইষ্টিশন।

১১) লিফলেটে প্রত‍্যাশা
◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆
জানেন তো?
নির্বাচন এলে এদেশে সবচেয়ে বেশি শঙ্কায় থাকে সংখ্যালঘুরা।
আশ্বাসের নিঃশ্বাস ফেলা লিফলেটে
ঘরে ঘরে নির্বাচনী প্রচারে বিষাদ সাগরে অমৃত মন্থন।
যাক গে সে কথা
পর পুরুষের যৌনাঙ্গ চষি কোন লাভে !

জানেন তো যু্দ্ধ হলো পৃথিবীর অর্ধেক মা বাবার বুক খালি করার উপায়!
দেখাযায় নীতিমালাও বেশ‍্যার সাথে একপাতে,
নারী ও শিশু বিক্রির একমাত্র স্বর্ণসূত্র হলো যুদ্ধই!

যুদ্ধের কথা শুনলে
আমার স্ত্রীর ঠোঁটের আয়না ভেঙে পড়ে,
গহনাগুলো খোলেপড়ে ব‍্যাথার গোপনে;
যুদ্ধের গন্ধে শাড়ি মরে, শরীরও মরে।

যাওয়ার আগে জেনে যান
নারীর স্তন পৃথিবীর অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর জিপ তাই
এই শহর গ্রামের ক্ষুধা যখন মিটে যায় তখনও সে দ্রৌপদীর হাতের সূর্যথালি।

বেঁচে থাকতে থাকতে আর দুর্দশায় একরাশ দুশ্চিন্তার চিন্তার মগজটা !

১২) ভায়া অনুভব

প্রতিটা ভোরের জন্মলগ্নে একরাশ আশা ডানা মেলে
পুরোনো ঝেড়ে লোনা জলের তিক্ততা মুছে
চেয়েছিল বিধ্বস্ত অবহেলার বুকে আসবে,
বিভাজন ভেঙ্গে প্রেম-আনন্দ জিহ্বায় স্বাদ অনুভবে-----
শৈল্পিক সাজে পরিত্যক্ত কাঁটাতার!

অবশেষে সত‍্যটা জানলাম।
সুখপাঠ‍্যের মালা- জপা রোদপোড়া দিনগুলো
অন্ধকারে জাহাজ ডুবানো প্ল্যানে,
আর, ঐযে সবুজের সমারোহে
ক‍্যান ভর্তি অক্সিজেন ও হীনবীর্যে
ভাগ্যে পুনরাবৃত্তি মল আর মলের শোধন।

১৩) সিঁধ

ফিরে এসে দেখি জমাট বেঁধেছে
অজস্র ভুলের অভিজ্ঞতা;
নীড় ভাঙা প্রজাপতিরা বাৎসল‍্য রোদে পোড়া,
মিছিলের স্মরণ সভায়
বরফ গলে গলে অসুস্থ সূর্য চলে যাচ্ছে
সিঁধ কাটা ঘরে। আর,
রক্তের সাথে ভূমি--বুলেটের মিলনে
নতুন কিছু দুর্বল জীবনের উৎপত্তি,
নগরের সুইসাইড স্কোয়াডে স্বৈরশাসক
বিলোনিয়া বর্ডারে সহবাসের তাস খেলে------
অহংকার উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বাসী অন্ধকার
সম্পাদক ও কবি একপাতে ভাত খাচ্ছে।

ওদের জানা নেই
বই কিভাবে খোলে রোদে দিতে হয়,
বাক-ধ্বনির ব‍্যলান্স টা ওরা জানে
বেমালুম এসিড-পাঞ্জাব চালে,
কিন্তু.....
লেকচারের ঘনিষ্ঠ ধনুকে
প্রতিশ্রুতি শব্দগুলো তিরবিদ্ধ।

১৪) চুক্তি

আমাদের তো প্রেমিক হবার কথা ছিল।
আমাদের কথা ছিল না মূল,কান্ড,শাখা-প্রশাখা পেরিয়ে যাবার---
অনেক পথ হেঁটে মৌলবাদে যাত্রা করবার!
আমাদের তো কথাই ছিল
ডানা মেলবার।

সেই কবে এলাম,দেখছি---
হে উদাসীন,হে প্রিয়তম,প্রিয়তমাগণ,
হে দম্ভ,আর কত!
আর কত কথা না রাখবার,কাজ না করবার কথা!
ভাবতে ভাবতে, নিজেকে বলি---
ভালোই তো ছিলে, মরতে গেলে কেনো?
শ‍্যাম্পেনের চুমুকে উপচে পড়া স্তনের নৃত‍্য
ফেরারি'র নৈশ ভোজনে।
তুমিও পাবে !

১৫)
রোজনামচা

পৃথিবীর ক্লান্ত পথে ব‍্যর্থতার ভীড়ে
দলাদলির অন্ধকার জোৎস্নার মুখ
হলদেটে রুদ্দুরের ছায়াপথে
খোদ্দের খোঁজে ।
ঘুনপোকের সহবাসের নিঃশব্দ শিৎকারে
আর শিরোনামের ভালোবাসা আবেশে
মিশে যায় ক্লেদাক্ত ভুঁইফোড়া গন্ধ।

অবিধান হাঁপিয়ে ওঠে ভ্রষ্টের সমবাহু সংলাপে
রোজনামচায় অসংখ্য ভক্তদের ভীড়ে
পীরাকি দেখায় বিষাক্ত বিষে।

১৬) ধূসর শহর

মিলনের গানে শুধু উপেক্ষিত;
ক্ষুধা আর প্লাবনের ঢেউ নিশীথ বিকট ছায়ায়
লোলুপ আমন্ত্রন, সংশয়ে.....
সমৃদ্ধ ইতিহাস মাকড়সা ঝালে।

সত্যিই, মানুষগুলো বড়ই আলোড়িত করে আমায়।
নৈরাশ‍্যের বাজারে ওরা----
মানুষ রুপী খেকো;
মৃত ভালোবাসা পরিযায়ী বুকে।
মধুবনে মদের যজ্ঞ---
আমি চিৎকার করে বলছি এই ধূসর শহরে
ঝুলন্ত গ্রহগুলো,
বিশ্বাসের পিঠে হৃদয় হন্তা।

১৭) তথাস্তু

ভুলের সাতকাহনে মিথ্যার মোড়ক উন্মোচনে
মৌলিক বুভুক্ষিত জীবন,
উৎসবে মাতে জনতার প্রাণ কেঁড়ে।
কত জননীর সন্তান কফিন বন্দি
কত সোহাগি শাঁখা ভাঙে নিশ্চুপ পাথরে
কত শ্রবণকুমার মরছে ঐ জলাশয় পারে----
জননীর বুকে হিংস্র আঘাত কষে
পুড়া গন্ধ বারুদের দেশে।

বলছো স্বাধীনতা !
চুলের খোপা ধরে আছাড় মারছে যারা
সম্প্রীতি ফসিলে ভাগাড়ে পুড়ছে তারা----
বিষন্ন সন্ধ্যায় মৃত আকাঙ্খারা,
তথাস্তু, একটু সময় দেবে !

১৮) ফণী

একটি ভোরের গোপন হত্যা
দাঁড়িয়ে রয়েছে ঠিক আমার মতই,
নশ্বর দেহের কারিগরি শিক্ষা
---------- করুণায় অশ্রুসিক্ত।
কাল রাতের অসম্ভব আনন্দগুলো
অন্তরের কালো শিরোনামের নাটকে
বিশ্বাসের হাত ধরে বাতি নিভে
------অন্ধকারে।

সৃজনী শব্দগুলো মৃত, জঠর ভেদ করে
মৃত‍্যুকে স্বীকার জন্মানো কঠিন
---- ফণী।

১৯) এক ঝাঁক মিথ‍্যার মুক্ত বিচরণে
◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆◆
অজস্র নীতিমালার প্রেক্ষাপটে এক দুরভিসন্ধি,
সুরাহার সন্ধানে বিমূর্ত প্রতিমা
তপ্ত রক্ত খোঁজে লোকালয়ে,
রাজধানীর খেকোগুলো আরেক ভঙ্গিমায়
হামাগুড়ি দিয়ে পাড়ি দেয় মফস্বলে।
ক‍্যনভাসে পুরাতন রবে দলবদ্ধ যৌবন ভাঙছে আশ্বাসের মিউজিয়াম
পুড়ছে যত হরিৎ ইতিহাস,আর
ভালোবাসার শান্তনা দাউদাউ করে---
সিগারেটের মতো ক্রমশ ছোট হওয়া সংক্ষিপ্ত জীবনটা
পঁচা স্বপ্নগুলোর শোকের অগ্নুৎপাতে ভস্ম।

এক ঝাঁক মিথ্যার মুক্ত বিচরণে.........

২০) নশ্বর পৃথিবীটা

নশ্বর পৃথিবীটার বিরাট আস্ফালন!
একমুঠো পরিধির রাসানাগারে
জঠর ভেদ... চলছে....
উদারতার সাজসজ্জায় অনৈতিক মূল‍্যায়ন!
শবের মিছিলে লাল অক্ষরে ব‍্যনার
ফ‍্যেশন, যুগের বিবর্তন।

লিখতে বসলেই দেখি....
ভুলের সাতকাহন প্রাচীন থেকে বর্তমান স্বমহিমায়।
তবু একগাদা বুর্জোয়ামী খেলাফতে
নির্দ্বিধায় শ্রেষ্ঠ জীবরা, ব‍্যস্ত পদ-লেহনে
ম‍রুক না বুড়ো পাগুলো রাজধানী তটে
......শষ‍্যের গুরুত্ব হ্রাসে।
কুর্নিশ তোমায়!

আরও কুর্নিশ......
ঐ দলবদ্ধ যৌবনের সেনাপতিকে।
'জয় শ্রীরাম' হবে মানবতার শ্লোগান!
ধর্মের রাজনীতিতে সুমহান----
বাবরি আর রামমন্দির এখন অমৃত সমান!
রাজপথে পুড়ুক ওরা, রক্তে হোলি খেলা
থামাসনে ঈশ্বরবাদী মনুমেন্ট গড়া।

২১) এইসময়

কালের মহীরুহে জীর্ণ স্তবক দ্বিধায়
চূর্ণ শব্দের বিচরণে, বেলা শেষে হিসাব কষে আঙ্গুলে
দীর্ঘশ্বাস ফেলা সময়গুলো জমাট বেঁধে যবনিকা টানে,
বোধহয় ক্ষণিকের রঙ্গমঞ্চ মিছে।
দাবার গুটির মতো এ জীবনের বৈশিষ্ট্য
হাতি,পেয়াদার পথচলা। কখনও ঘোড়ার মতো;
কখনও বা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত ক্ষমতা
ঠেলে দেয় আঁতুরঘরে।
ভরসার কাঁধে মাথা রাখা... নিজের পায়ে কুড়াল মারা
কম নয় তাতে ভাগ‍্যের জিম্মাদার ও,
সুযোগে পুতুল নাচায় সেও।

ভোররাতের শেষ লগ্নে আবারও কড়া নাড়ে প্রশ্নরা
বিচ্ছেদ এইসময়----ছয় ঋতু বারোমাস ভেজা যন্ত্রণা,
পরিযায়ী বুকে কী লিখি
যেতে হবে......
ডাক দিয়েছে এলার্মঘড়ি।

২২) ভুঁইফোড়া গন্ধে লালকেল্লা

একগাদা মিথ‍্যার বিজয় অভিযানে
গোড়ালি ফেটে রক্ত ক্ষরণ সাক্ষী রাজভবন
বয়স্ক হাড় আওয়াজ তোলে
ন‍্যায‍্য দাও বাঁচাতে চাই রণভেরি আহ্বান,
জীবনের ঘ্রাণে মূল্যহীনে রক্তাক্ত পতাকা;
কালজয়ী গানে বিরহী নিনাদ ছলনায় সারথী
ঝুলন্ত মানচিত্রে ক্ষুধিতের কান্না
" মিত্রোঁও..... আর না ..........আর না।

চাবুকের অধিকারে মখমলি চাদর
হাই ভোল্টেজ চেতনা
গড়াসনে আর বিবেকের ফুটবল, সাবধান বেঢপ কারিগর,
সুটকানো স্তনে অমৃত খোঁজে
আঁধারে ধ্রুবতারা,
চল্ চল্ সব হোক দুর্গম পথ
আজ যে সাম‍্যের গান বড়ই দুর্বল।

গর্জে ওঠো গ্রাম শহর বন্দর, জেগেছে জননী সন্তান বীরদর্পে
ভুঁইফোড়া গন্ধে লালকেল্লা,  ধনতেরাসে মগ্ন
ঘিরে ফেল সিংহাসন, নিপীড়িত সমাজ
প্রতিবাদ প্রতিবাদ প্রতিবাদ, ইনকিলাব জিন্দাবাদ।

২৩)  যাও, তাকে ডাক দাও

যাও, তাকে ডাক দাও---
অনেক শুনেছে
এবং এসে দেখে যাক একবার ঐ ঘুমন্ত শহরকে,
যেখানে অজস্র ভিখিরি আর ভিখিরি......
ওরা নির্মম ---
ক্রংক্রিটের দেয়ালে প্রাইমার ঘষে ছলনার মিশ্রণে।
ওরা অভিজ্ঞ!---
মূহুর্তে আবেগ কে জয় করে শিল্পের নিয়মে।
ওরা রবিন হুড---
বারুদ নিয়ে খেলে যৌবন প্রশিক্ষণ শিবিরে।
ওরা ধার্মিক---
নিমেষে গুটি হাটায় তোমার আমার মাঝে।

যাও.... তাকে ডাক দাও
একবার দেখে যাক ঘুমন্ত শহরকে।

২৪) বিকল্প পৃথিবী সন্ধানে

বিকল্প পৃথিবী সন্ধানে--ওরা জোট বেঁধেছিল
বপেছিল বুক চেরা সাহসের বীজ
আর------
গড়েছিল রক্তিম পাহাড়চূড়া ইষ্টিশন,
যেখানে ন'টার গাড়ি ঠিক সময়েই আসতো।
মুখোশ পদবীর স্খলিত বুলেটে
চৌচির বজ্রসুঠাম, মহিমা অমাবস্যার চাদরে,
নষ্ট স্বর্গটাও জং লাগা কলিজার গন্ধে
সভ‍্যতা শেষ,ফিরেছে প্রাচীনে।

এখানে ডুবে গেছে সূর্য-দর্শন-হিষ্ট্রি
পড়ছে ভ্রূণ রাস্তায় ধুলোর মতো,কন্ডম ফেটে
বুড়ো ভামেরা টানছে যোনি, অবাধে অতর্কে
ডেগে জ্বাল হচ্ছে কৃষ্টি-সংস্কৃতি।

বিকল্প পৃথিবী সন্ধানে.........
চল্ জোট হই আবার মর্তের বিপরীতে।

২৫) এই প্রজন্ম শুকনো কনক্রিটের মতো

একটি নিভৃত অঞ্চল
হারিয়েছে তার মান-যশ লাবনি সবুজ
বর্ণিল স্নিগ্ধতার তাজা প্রাণগুলোও
         যা বিলিয়ে ছিল স্বেচ্ছায়----- অনুরণনে সেই গান !
সেই গান--- ছিল মিছিলের আর্তনাদ, অগ্নিবীণার টান
                 পরিবর্তন.........
ডিজে'র তালে লেট মি ফাক।

এই প্রজন্ম শুকনো কনক্রিটের মতো
নির্লজ্জ..... গরু আর কুকুরের লড়াই, লিগ‍্যাসির লড়াই
রক্ত কেটে দেখে স্বর্গেরর শয়তানরাই,
অন‍্যদের অবিকলে
৩১শে ডিসেম্বর সেলিব্রেশনে, নিজেরটা গলা টিপে।

এই প্রজন্ম কিনেছে দাসত্ব
     গুম--ইতিহাস কারারুদ্ধ
ডি' এর অভিশাপে এই প্রজন্ম আবদ্ধ।।

২৬) ।। একবিংশের যীশু।।

(কলকাতার যীশু নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রয়াণে ।)

একমুঠো মিঠেল রোদ ফুটপাতে ছিল রাখা
ধার চেয়েছিলাম তার সর্দারের কাছে----
রক্ত-মাংসের অভিনয়ে নয়
পুতুল নাচের পর্দা উঠে গেলো
মূকাভিনয়ে।

মিঠেল রোদগুলো ও তাৎক্ষণিকতাতে বিশ্বাসী,
সভ‍্যতার প্রাচীন কাল থেকে
পাহাড়--মরু স্খলিত ট‍্যাটু,ভিসুবিয়াসের মতো,
বিষাদের কালো মেঘ--
বৃষ্টি নামুক এই শহরে।

লালবাতি,ফেরিওয়ালা, বাঘমার্কা ডাবল-ডেকার,কলকাতা শহর--
ষ্টেটবাসটাও ভিখারি জনতার আর্তনাদে,
বদলায় নি 'সম্পূর্ণ এক উলঙ্গ শিশুও'।

কলকাতার যীশুর কথায়-
' এখন রোদ্দুর ফের অতিদীর্ঘ বল্লমের মতো
মেঘের হৃৎপিণ্ড ফুঁড়ে'

নির্বাক শহরটা আজও আসে নাই
অগ্নিবীণার মিছিলে!

২৭) গ্রাম

চেন এই সুজলা সুফলা ধরা
স্নিগ্ধ পরশতা, অমল মূরতি যেথা
গাঙ চিল কুয়াশার দেশ,
লক্ষীপেঁচার ডাক, কাক ভোরে ঘাসে ভেজা নূপুরের হাক,
শুনেছো কাঠটুকরির বেলগাছে কান্না
বা জীবনানন্দের কবিতার মতো---- ধানসিঁড়ির
সেই নৌকা যার পাল ছেঁড়া !
ছিল এক দিঘিতে জল খাওয়া
দশমী তে সলমনের ঘরে মদ ফিরনি আর গলাগলি করা
ঠিক বিপরীতে  পার্টি হতো
অর্জুনের ঘরে ঈদের সে.....টা।

সেই কবের কথা..... আজ বেমানান
আজ একদল পুবে মুতে আর একদল পশ্চিমে,
ঈশ্বর প্রাপ্তিতে মন্দিরের চূড়া ভাঙে
মসজিদে মাইকের শব্দে !

হারিয়ে গেছে বিকেলের চা-য়ের আড্ডা।

২৮) হোক কবিতা

বাতাসে ভুঁইফোড়া গন্ধ
ঢেউ বাতাস জল কাদায় মূর্তি গড়ি স্থবির,
শকুনিরা হাসে ধর্মের ঘরে তালা মেরে।
এ শহর কবির নয়, নয় কোন বীর একাদশের
এ শহর বর্বর ধর্মান্ধদের।

নিঝুম রাত্তিরে তার কানে কানে
জানিয়ে দেয় -----
শীতকালীন দূরত্ব শহরে নেমে এসেছে
প্রতি সন্ধ্যায়;
ধূসর রাস্তায়
খোলা কন্ডমের বার্তায়।
এরসঙ্গে মিশে গেছে অহেতুক ভয়
সর্বত্র আগুন জ্বলছে;
ব‍্যস্ত
অপুষ্টির কঙ্কালেরা বানিজ‍্যে দেবতারে নিয়ে
গলে পড়ে যাচ্ছে প্রাচীন স্থাপত্য;
শহুরে কুকুরদের দাপটে
ঠকবাজ সব মক্কা বারানসী
সুটকানো স্তনে কস্তুরী লেপে!
তাই ঘোষণা একটাই
মৃত ঈশ্বর বলে।

২৯) ফুসফুস
       (গল্প কবিতা)

যার হৃদয় নেই তার ভালোবাটাও দুর্জয় সন্ত্রাসে। আসলে হৃদয়টা মানে দিশেহারা পাগলামি, অনুরাগ, স্তুতিপাঠ। যারা, দেহে হৃদয়ের মুক্ত বাতাস মানে ভাবে বিবর। আমার হৃদয় রাত্রি অমানিশায় লুকিয়ে থাকা চাঁদ। হৃদয় মানে আলগে যাওয়া প্রতিটা জোড়া। উদারতার সাজসজ্জায় কাঁটা ফোঁটানোর ছোট্ট প্রয়াস।অন্ধকার আর মাকড়সার জাল। হৃদয়হীন যৌনতা। শুধু মানসিক সান্ত্বনা। মনুষ্যত্বটাও ওর উপর ভরম্ভর। তবে আজকাল আর ছাইপোঁকার মধ্যে।

একবার ভেবে দেখ ঐ আশেপাশে। না সুদূর আসমুদ্র হিমালয় পারে। স্বর্গের বিচরিত নন্দন কাননে শয়তানের আশ্রয় স্থান। নরকের ভয়ে খুঁজে দেখ নিজে কয়গজ নীচে। টিপে দিচ্ছে গলাটাও রঙিন স্বপ্নের বাসর রাতে, কালো চুলের কালো স্বপ্নে।

তুঁই তো রাজা নস্? তবে কেন? কেন,
হা করে গিলে খাস তার মাংস। এই হৃদয়টা ও তোর নয়। আছে শুধু ফুসফুস। শুন্ মাঝে মাঝে ডাক্তার দেখাস্ ঐ জীবন্ত হাসপাতালে।

৩০) প্রত‍্যাশা

তখন কোথায় ছিল বোরখা নামক বস্তা?
তখন কোন বিধাতা সৃষ্টি করতে পারে নাই, সম্মান বাঁচানোর জন্য এক টুকরো কাপড়!
মিথ্যা অজুহাতে ছুঁড়া হলো এই মর্ত‍্যধামে, লজ্জা কোথায় ছিল---গড়বার সময়ে।

তখন কোথায় ছিল বিধাতা আর বিধাতার সৃষ্টি।
কাঁপে নি পৃথিবী, কাঁপে নি কোন জালিমের বুক।
আজও রাস্তায় অবুঝ শিশুর মাথা  খাওয়া দেহটা পড়ে থাকে নর্দমায়,
ঈশ্বরের অস্তিত্ব আরো বেশি বিলীন হয়ে যায়।
আমরা মেনেই নিয়েছি আমাদের অত্যাচারিত রক্তাত্ব দেহ। সাথে বিধাতাকেও।

কিন্তু শোষণের জবাব দিতে যেদিন ফারাক ধরলো আল্লার নির্দেশিত পুস্তকে,সেদিন মেনে নিলাম এই দুনিয়ায়  সৃষ্টিকর্তা নিতান্তই একটা নিষ্প্রয়োজনের নাম।
নিজের অস্তিত্ব যে বিধাতা এই সময়ে প্রমাণ করে না কি দরকার সেই বিধাতার?
কি দরকার সেই গাদা গাদা নাজিলকৃত পুস্তক যা একজন মানুষকে মানুষ হতে শিক্ষা দেয় না।
রজস্রাবে পূঁজিলে যারে প্রবেশ নেই তাঁর অশুদ্ধ মন্দিরে!

ভেঙে ফেল মন্দির-মসজিদ নামে কল্পিত ঈশ্বরের দালানকোঠা পুড়া হোক এর গায়ে লেগে থাকা প্রতিটি ইট,বিকৃত পুস্তক তার সাথে ঐ মগজ।
সেখানে গড়বে ল‍্যাব,যুক্তিবাদী মঞ্চ,শিল্পকলা একাডেমি,মুক্তমনা চিন্তা।
আরও.........চাই।

৩১) একাকীত্বের নিদারুণ আর্তনাদ

এ জীবন ফুরিয়ে অচিরেই
ঝরে যাবে আশার সঞ্চার বাণী অশ্রু জলে
সিক্ত হয়ে পড়ন্ত বিকেলে,
আধম‍রা ভালোবাসাগুলোও
হৈমন্তিক রস শুষে কঙ্কাল প্রায়
নিরেট বরফ, ঐ আদিম কালের।

আলোর শেষ বিন্দুটাকেও অভিলাষী মন
চেয়ে ছিল বেশি নাহলেও----
কম সোহাগ দেবে
বুকের উর্বর জমিতে পুঁতে রাখা জীবন কে,
কিন্তু কৈ, পাঁজরে ধমনী ছেড়া শব্দে
শিরায় শিরায় বাজছে
একাকীত্বের নিদারুণ আর্তনাদ।

৩২)  একটি ক্ষণস্থায়ী হেঁচকি

একটি ক্ষণস্থায়ী হেঁচকি
যার সম্মুখীন হচ্ছে গোড়ালি ফাঁটা
কিছু জীবন
যেখানে রয়েছে ভয় আর অহংকারের মিশ্রণ।
যন্ত্রণারা এক একটা শ্বাস নিচ্ছে
ফোলা ফুসফুসে বিষাক্ত অক্সিজেন,
নিখোঁজ রয়েছে আজও
গৌরবের ইতিহাস‍,
শ্লোগান এসেছে জনগণেরা এখানে রাজা!
চারিদিকে হৈ হৈ রব........
প্রজাতন্ত্র........প্রজাতন্ত্র!
তবে যে পুড়ছে গণতন্ত্র
সংবিধানের দরজা খোলা
উন্মাদ শাসনতন্ত্র।

ক্রমশ বাড়ছে দুর্দিন
জ্বলছে নগর, স্বপ্ন প্রহর রোজনামচায়
গো-মাংস আর গো-মাতার লড়াই
সহস্রাব্দে ক্রুসেডে
হাওয়ার ডালিম থেকে বেরিয়ে আসা ঐ সাপটা
আমার পায়ে নেতিয়ে পড়তেই বুঝলাম
মানুষগুলো বিষাক্ত ,সাপের প্রতি।

৩৩) তৃতীয় শ্রেণীর এক আমি

তৃতীয় শ্রেণীর  জীবন,কুকুরের মত কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকি ছানাপোনা নিয়ে।নিজেই বানিয়েছি নিজের নিয়ম।রোজ রোজ ফলের দোকানে ঢু মেরে আসি,আরেকটু কম দাম হলেই কিনে আনব পোয়া খানেক আঙ্গুর বা কোন প্রিয় ফল।প্রেমিকা ছিল সুচরিতা সেন,বিভোর ছিল মন সঙ্গম স্বপ্নে।বিকিয়েছিলাম আমি তারে হৃদয়।
পাইনি তারে তবু কি হয়েছে?রাহেলা বেগম তো বউ হয়েছে হাসিমুখে সব মেনে নিয়ে।বিছানায় শুধু গদি আটা নেই।কঠিন তক্তপোষে শুয়ে তবু সুখটান দেই।
পুঁটি মাছের ঘ্রান আসে রান্নাঘর থেকে।জুতোর সুকতলি খুইয়ে জুটিয়েছি তবু মাস ইনকাম।বাবার জমি বেচা টাকায় ডিগ্রিও জুটিয়েছি তিনখান।
গুমোট জানালাহীন ঘরে তৃতীয় শ্রেণীর জীবন।
মাইনেটা বাড়লেই একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নেব।তিন রুমের।রাহেলাকে কথা দিয়েছি।ওর ফোলা ফোলা গালে এখন আন্দামান নিকোবর এর মত মেসতার দাগ।আমি বোধহয় বুড়িয়েছি কিছুটা।ছেলেটার অসুখ করেছে খুব,ডাক্তার দেখাতে হবে,,সেও এক রকম টাকার খেলা খুব।বাবার ভিটেটা এবার বেচেই দেব।
কন্যাটাকে সামনের বছর এ স্কুল ছাড়িয়ে সস্তা কোন
স্কুলে দেব,খরচ কমে যাবে বেশ।
তবু রাস্তার মোড়ে ভিক্ষুককে দেখে আমি মনে মনে আত্মপ্রসাদ লাভ করি,,,আমি ওর চে তবু ভাল আছি।

৩৪) ক‍্যাসান্দ্রা

রাফখাতায় পড়ন্ত বিকেলের মতো খশে পড়ছে অশৃঙ্খল শব্দগুলো
ইস্তাহার-ম‍্যেমোরেণ্ডামে শুধু দিচ্ছে মিছিল
পরিবর্তন করে রাজসাক্ষী নতুন ইতিহাসে,
কারাগারে পুলিশ রাজপথে নেতারা ধর্ণায় অজুহাত,
বহুগামিতার কারণে, উচ্ছৃঙ্খলতার কারণে
একের পর এক গড়ছে পতিতাপল্লি রাষ্ট্রের বুকে।

আমার সুইসাইড নোটে থাকবে রাষ্ট্র তথা সেইসব ছেলে মেয়েদের কথা
মানসিক বিকারগ্রস্তদের কথা, যারা লুটছে-----
পীড়নের দায়ে ফাঁসির দাবি জানাই !

৩৫) ঈশ্বরের মৃত্যু হয়েছে ----

যুগে যুগে ঈশ্বর জন্মায়
কালের বেলায় ওবেলায়  আবার মরে যায়
দরিদ্র মানুষের ঘরে কিবা ক্ষুধার্তের ভাত ভাত শব্দ ফায়ারে
সোমালিয়া, আফগান,আরাকান কিবা সুদানের গলিতে
মরতে দেখেছি কত ঈশ্বরকে
রক্তে ঐশ্বী বাণী নিয়ে দাঙ্গার কোন রাতে যুদ্ধের হুংকারে।

মন্দির, মসজিদ, প‍্যাগোডায় কত মরেছে ঈশ্বর
কিম,স‍্যুকি,বাগদাদি রা এখন ইয়ার
ঈশ্বর তো সম্পদ কিবা পুঁজির হাতিয়ার !!
আজ মরে গেছে
মমি হয়ে মৃত মিশরের পিরামিডে,হেরা-শাবরিমালায়

নীল নদ , টাইগ্রীস,সাঙ্গু,নাফ নদীর তীরে
কত ভেসেছে, দেখেছি
মৃত মায়ের স্তন টানছে ফুটপাতে
ক্ষুধার্ত ঐ শিশুটি
দেখেছি লাশের স্তুপে মাছির সাথে
শেষ মৃত্যু পাঞ্জা লড়তে !!

আমিও পাল্টাতে চাই---
ক্ষুধা থেকে বড় ধ‍র্ম আর অন্ন থেকে বড় ঈশ্বর থাকলে।

৩৬) রক্তিম অ আ ক খ

অতঃপর বুঝলাম
আমার পরিচয় গোপন রাখার তথ্য,
শ্বাসের দৈর্ঘ্য মেপে হৃৎপিণ্ডের ধুক ধুকানি
প্রতিদ্বন্দ্বীরা এখন মেরুকরণের পাটাতনে
উল্টো পুরাণ, হাতে কলমে সবকিছুতেই
বর্ণমালার শব্দ মিছিল। আর প্লাস্টিকের ঘোরপ‍্যাঁচে
বুকের রক্ত ঢেলেছি ষ্ট্রিটে
যুথিবদ্ধ শব্দ উচ্চারণে।

ভাষা হোক উন্মুক্ত
বাতাসে ধ্বনিত রক্তিম অ আ ক খ।

৩৭) নীরবতার ক‍্যালিগ্রাফি

----- ওই শ্রাবন্তীর স্বর্গোদ‍্যানে
এখন উঁকুনদের বাস।হারিয়ে গেছে বেহিসেবি উতল বাতাস,
নির্ভেজাল জল,বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত,
মেঘমালার নির্জর সঙ্গীত,
নিঃসঙ্গ গলি আজকাল এক একটা বিস্ফোরিত রাজপথ।
মহামান্য রাষ্ট্র--
উঁচু করে রাখা ঐ কবিদের মাথার দাম কত!!?
যেগুলোর উলুধ্বনি.... শঙ্খধ্বনি শুনে
গণতন্ত্রের কথা বলে একনায়কেরা।

ভাঙা টেবিলে
শতাব্দীর শেষ প্রান্তে
দেহ থেকে ভেসে আসা নাভিকাটা আর্তনাদ
শুধু খব‍রের কাগজে হেডলাইন।

চিলেকোঠায় পুরোনো পোশাক
কুচকুচে কালো আঁধারে,
রাম রহিমরা মৌলবাদের জিগির তোলে
---ঐ শহরে, বন‍্যা আসছে
গোড়ালি ফাঁটা রক্তক্ষরণে লাল হয়ে।

৩৮) নাট‍্যশালার গ্রীনরুম থেকে

এবং তাদের হত্যা করা হল
ব‍্যস্ততার ভীড়ে,
অত‍্যন্ত দক্ষতার সাথে প‍্যাঁচানো ইন্দ্রজালে
মেয়াদ ভিত্তিক লাইসেন্স পেয়ে কসাইরা---
অবৈধ ক্ষমতার সুফলে
উলঙ্গ চোখে অন্ধ কানুন হ‍্যালোজেন হাতে,আজও!!

রক্তে ভাসছে আমার দেশের আঙিনা
এসেছিলাম ফিরে যাচ্ছি
বুলেটের চেয়ে মুখোশ ভয়ংকর
কি আছে আর; তরুণ তরুণীর হাতে মোমবাতি
ছাড়া।নিজের ছায়া নিজে গ্রহণ করা,
অভ‍্যস্থ এখন জনগন, নাট‍্যশালার গ্রীনরুম থেকে
নকল রাজা অট্টহাসিতে!!

৩৯) ফোঁটা ফোঁটা উত্থান

অস্তিত্ব জুড়ে শুধু বিস্মরণের বক্ররেখা
বুঝিনি এমন নিঝুম ভাষ‍্য,
নির্মোহ মন,আবেদন করে ট্রেন্ড
অলিখিত রোদ্দুর আর
অজানা উঠোন জুড়ে পড়ে থাকা
আঁচলস্পর্শী বিনম্র নিবেদন।

এই শহরে সন্ধ্যায় নেমে আসতেই
ত্রিযামায় লুকোনো অজানিত স্বপ্ন
মায়াবী নক্ষত্রে শুধু প্রবাসী ভাবনা।
জমাট অভিমান
নিথর রূপকথার রাজত্বে
ঠিক একপশলা বৃষ্টি!
সুতোর ম‍্যাজিকের মতো
ক্রমশ কমছে তার দৈর্ঘ্য,
শুধু অনন্ত অজ্ঞাত ঢেউয়ে
গতিমুখ বদলে দিচ্ছে।


৪০) একবিংশের যীশু


 (কলকাতার যীশু নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রয়াণে ।)


একমুঠো মিঠেল রোদ ফুটপাতে ছিল রাখা

ধার চেয়েছিলাম তার সর্দারের কাছে----

রক্ত-মাংসের অভিনয়ে নয়

পুতুল নাচের পর্দা উঠে গেলো

মূকাভিনয়ে।


মিঠেল রোদগুলো ও তাৎক্ষণিকতাতে বিশ্বাসী,

সভ‍্যতার প্রাচীন কাল থেকে

পাহাড়--মরু স্খলিত ট‍্যাটু,ভিসুবিয়াসের মতো,

বিষাদের কালো মেঘ--

বৃষ্টি নামুক এই শহরে।


লালবাতি,ফেরিওয়ালা, বাঘমার্কা ডাবল-ডেকার,কলকাতা শহর--

ষ্টেটবাসটাও ভিখারি জনতার আর্তনাদে,

বদলায় নি 'সম্পূর্ণ এক উলঙ্গ শিশুও'।


কলকাতার যীশুর কথায়-

' এখন রোদ্দুর ফের অতিদীর্ঘ বল্লমের মতো

মেঘের হৃৎপিণ্ড ফুঁড়ে'


নির্বাক শহরটা আজও আসে নাই

অগ্নিবীণার মিছিলে!

Monday, February 18, 2019

"সেনাবাহিনীতে ঢুকলেই মৃত্যু অনিবার্য"--- এই ধারণা কেন হচ্ছে মানুষের মনে?

কিছুই লিখবো না ভাবছিলাম। কিন্তু যখন দেশ ও সেনার উপর হামলা তখন শত বাধা থাকলেও তা অতিক্রম করে জাতীয় শোকে শোকাহত হওয়া প্রতিটা মানুষের দায়িত্ব এবং কর্তব‍্য। আমার ক্ষেত্রেও ঠিক একই অবস্থা। শোকের সময় নীরবতাও অনেক কথা বলে ।এক একটা মর্মান্তিক ঘটনা একদিকে স্তব্ধ করে,অন্য দিকে বিস্মিত করে । আমি পাকিস্তান রাষ্ট্র ব‍্যবস্থার ঘোর বিরোধী। সেখানে মানবাধিকার পদদলিত, নারীর অধিকার অবহেলিত,মৌলবাদী শক্তির যথেচ্ছাচার,রুটি রুজির ব‍্যবস্থা নাই,কৃষক তার মূল্য পায় না,শিক্ষা স্বাস্থ্য নূন্যতম সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত ভদ্রলোক সমাজের ভেতরকার ঘৃণ্য পশুত্বকে বেআব্রু হতে দেখে।তাও চুপ করে থাকতাম ।কিন্তু সকাল থেকে বিভিন্ন রাজ্যে থেকে যা খবর আসছে তা উদ্বেগজনক। কোথাও আবার নীরিহ জনতার উপর হামলা,কাশ্মীরিদের  ফিরে যেতে বাধ্য করা, এবসব ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক।সবই হচ্ছে পুলিশ প্রশাসনের সামনে ।ভুলে যাবেন না আমার দেশ এখনও ধর্ম নিরপেক্ষ ।চল্লিশ জন গরীব সিআরপিএফ জওয়ানের মৃত্যু যেমন যন্ত্রণা বিষাদের তেমনি গর্হিত অপরাধ সন্ত্রাসী আর মুসলিম সমার্থক শব্দ করে তোলা।দেশকে ভালবাসলে উগ্র জাতীয়তাবাদের জোয়ারে গা নাভাসিয়ে মেরুকরনের রাজনীতিকে প্রতিহত করা আমাদের খুব জরুরি ।ধর্ম ও জোট নিরপেক্ষ ভারতের জয় হোক ।

কিন্তু নিহত হয়েছে আমার দেশের ৪২টি তরতাজা প্রাণ।আমার ভাই।গরীব মায়ের সন্তান। যার মাইতে চলতো পুরো পরিবার।কাদের গাফলতিতে এদের মৃত্যু হয়েছে, এই প্রশ্ন করা কি আমাদের প্রয়োজন নয় না শুধু মোমবাতি জ্বালিয়ে সমবেদনা জানাতে হবে। একদম,মোমবাতি জ্বালিয়ে সমবেদনা জানানো তার পাশাপাশি উত্তর জানতে হবে। তাহলে এই তরুণ আত্মারা শান্তি পাবে। দেশের অভ‍্যন্তরে যে মীরজাফর,জগৎ শেঠ,দুর্লভরা রয়েছে,যারা নিজ স্বার্থে দেশের গোপন তথ্য ফাঁস করে,তাদের কে চিহ্নিত করা হোক।

শ্রীনগরের জঙ্গীহানা তুলে দিলো কিছু প্রশ্ন! কী কী প্রশ্ন? আসুন প্রশ্নগুলো তোলা যাক!

প্রশ্ন ১:
আগামী ১০ - ১৫ দিনের ভিতর বড়ো জঙ্গীহানার সম্ভাবনা আছে এই গোয়েন্দা রিপোর্ট থাকা সত্ত্বেও এতবড়ো আক্রমন হলো কি করে? তাহলে কি কোনো "বিশেষ উদ্দেশ্য" সাধনের জন্য গুরুত্বহীন করে রাখা হয়েছিলো এই রিপোর্টকে?

প্রশ্ন ২:
এতবড়ো আক্রমন নিখুত পুর্বপরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব নয়! সেই পরিকল্পনার সবথেকে গুরুত্বপূর্ন অংশ হলো কবে, কোন রাস্তা দিয়ে, কোন সময়, কতজন জওয়ান, কিসে করে যাচ্ছেন তার পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর হামলার অন্ততঃ ৭ দিন আগে জঙ্গীদের কাছে পৌছে যাওয়া! বাহিনীর একদম ভেতরের এই খবর কারা পৌছে দিল জঙ্গীদের কাছে?

প্রশ্ন ৩:
হামলা হতে পারে এই খবর থাকা সত্বেও এতবড় বাহিনীর যাওয়ার পথের প্রতি ৪০ - ৫০ মিটার অন্তর অন্তর রাস্তার দুইধারে যে পাহারা থাকার কথা তা ছিলো না কেন?

প্রশ্ন ৪:
খুব তাৎপর্যপূর্ন ঘটনা যে এই জঙ্গীহানা নিয়ে নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার সময় জেনারেল শংকর রায়চৌধুরী সহ অনান্য প্রাক্তন আর্মি অফিসাররা কেন বারবার রাজনৈতিক নেতাদের কথা বলছেন? তাহলে কি তাদের বিপুল অভিজ্ঞতায় তারা এই ঘটনার পিছনে অন্যকিছুর হাত দেখতে পাচ্ছেন যেটা তারা সরাসরি মিডিয়াকে বলতে পারছেন না, কিন্তু আকারে, ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন?

প্রশ্ন ৫:
উরির আর্মি ক্যাম্পে অভুতপুর্ব জঙ্গীহানার পরে প্রশ্ন উঠেছিলো যে ওইদিনই উরি ক্যাম্পে একটি রেজিমেন্টের ডিউটি শেষ হচ্ছে আর আরেকটি রেজিমেন্ট সবে ঢুকেছে এবং যে কারনে বেশ কিছু জওয়ান বাইরে অস্থায়ী তাবুতে আছে এই অত্যন্ত গোপন খবর জঙ্গীদের কাছে কিভাবে গেলো?

প্রশ্ন ৬:
উরির জঙ্গী আক্রমনের পর আক্রমনের কায়দা থেকে সন্দেহ হয়েছিলো যে এই ঘটনার সাথে ভিতরের কারো যোগসাজশ আছে এবং আর্মির তরফ থেকে এই ঘটনার সর্বোচ্চ পর্যায়ের তদন্তের কথা বলা হয়েছিলো! তারপর কি হলো? কেন চাপা পরে গেলো তদন্ত? কাদের ইশারায় দেশের নিরাপত্তার সাথে এমন ভয়ংকর কম্প্রোমাইজ করা হলো?

প্রশ্ন ৭:
দেশে কোনো বড়ো সিভিল ঘটনা ঘটার আশেপাশেই কেন হয় বড়ো জঙ্গীহানা? উরির জঙ্গীহানা ও সার্জিকাল স্ট্রাইকের সাথে নোটবন্দী, কালকের জঙ্গীহানার সাথে লোকসভা ইলেকসনের সময়ের মধ্যে এমন অদ্ভুত মিল কিভাবে হয়? যখনই অন্যকিছু কাজ করেনা এবং দেশপ্রেমের চাদর দিয়ে আসল ইস্যুকে ঢেকে দিয়ে কাজ হাসিল করার প্রয়োজন হয় তখনই যেন রক্তে লাল হয়ে ওঠে জওয়ানদের শরীর! নিছকই কাকতালীয় নাকি পিছনে আছে অন্য কোনো খেলা?

প্রশ্ন ৮:
কেমন একটু সন্দেহ হচ্ছে না? ভেবে দেখুন আমার আপনার দেশপ্রমের আগুনকে উশকে দিয়ে সেই আঁচে অন্য কেউ হাত সেকছে নাতো? শুধুমাত্র ক্ষমতা দখলের জন্য আমাদের দেশপ্রেমকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করার তাগিদে সরকার নিঃশব্দে, আমাদের সবার চোখের আড়ালে নিজেরাই খুন করছে নাতো আমাদের জওয়ান ভাইদের?

আমাদের পরিবারের, আমাদের ভাই, দেশের সীমানায় অতি কঠিন পরিস্থিতিতে ডিউটি দেয়, প্রবল তুষারপাতে, প্রচন্ড গরমে, প্রকৃতপক্ষে এতো কষ্ট সহিষ্ণু সেনা বাহিনী পৃথিবীতে খুব কম আছে।(প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি)। তাদের এই কঠিন কষ্টকর জীবনের শরিক কেউ নয় - নেতা মন্ত্রী, আমলা, সামরিক অফিসার, কেউ নয়। তাদের জামা জুতো কেনায় দুর্নীতি হলে চুপ করে থাকবো ? এমনকি কফিন, বুলেট প্রুফ জ্যকেটেও দুর্নীতি, আর আমরা প্রতিবাদ করবো না ? 42 টি মৃতদেহ দেখিয়ে এই প্রশ্নগুলো থামিয়ে দেওয়া যাবে না। বরং আমাদের ভাইয়ের রক্ত প্ৰশ্ন তুলতে বলে।

এই প্রশ্ন ক্ষমতাকে। যাদের উপর দেশ চালনার দায়িত্ব তাকে। তা সে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন। এই প্রশ্ন করাটাই গণতন্ত্র। যখন যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন এই প্রশ্ন করতে যেন আমরা পিছু পা না হই। সর্বদাই যেন আঙ্গুল তুলে প্ৰশ্ন করতে পারি, তুমি যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে শাসক হয়েছ, যে দলেরই হও। পুলওয়ামার সন্ত্রাসের দায়িত্ব নিয়েছে জৈশ ই মোহাম্মদ আর আমাদের মাথায় ঢোকানো হচ্ছে দোষ সব নন্দ ঘোষের।

বদলা চাই বদলা চাই বলে চিৎকার করে অথবা বিচ্ছিন্ন ভাবে ধামাচাপা দিয়ে প্রশ্নগুলো যেমন লুকানো যায় না।উরি, পাঠানকোট,পুলওয়ামা একটার পর একটা ঘটনা ঘটে আর সেনাদের প্রাণ যায়। আমাদের নিরাপত্তায় বোধহয় কোথায় গলদ আছে।তেমন ভাবে ভবিষ্যৎ এ আরও একটা পুলওয়ামা হওয়াতেও আটকানো সম্ভব নয়।

#নিন দেশদ্রোহী বলে গালিগালাজ শুরু করে দিন।

Thursday, February 7, 2019

আজাদ হিন্দ ফৌজ : অনূদিত গল্প

"A true revolutionary is one who never acknowledges defeat, ..... A true revolutionary believes in the justice of his cause and is confident that his cause is bound to prevail in the long run."
( Netaji )

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস! একটি নাম! এক কিংবদন্তী! এক ইতিহাস! এবং এক বিস্মৃত অধ্যায়! ১৯৪৫, ১৮ই আগস্ট! তাইহোকু বিমানবন্দর! বিমান দুর্ঘটনার কথিত কাহিনী! এবং এক কিংবদন্তীর অন্তর্ধান! তারপর কেটে গেছে প্রায় সাত দশকেরও বেশী সময়!আজও কিনারা হয়নি সেই রহস্যের! আজও লেখা হয়নি পুরো ইতিহাস! আজও ধামাচাপা পড়ে আছে ভারতীয় স্বাধীনতা অর্জনের নেপথ্য কাহিনী! আজও সারা ভারত জুড়ে একঘরে করে রাখা হয়েছে নেতাজীর অবদান!

তাইহোকু বিমানবন্দরের ঘটনার পর জল অনেকদূর গড়িয়েছে! ঘটনার দুই বছরের মধ্যেই ক্ষমতা হস্তান্তর করে মুখ রক্ষা করতে হয়েছে বৃটিশকে! ভারতবর্ষের রাষ্ট্রিক কাঠামোয় ব্রাত্য করা হয়েছে সুভাষ বোসকে! তথাকথিত স্বাধীনতার ইতিহাসে সুকৌশলে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে নেতাজীর ভূমিকাকে! আর একদিকে ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তি পঁয়তাল্লিশের আগস্ট থেকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়িছে নেতাজীকে! এই একমাত্র একজন, যিনি বৃটিশকে বৃটিশের ভাষাতেই পাল্টা জবাব দিতে পেরেছিলেন! আর সেখানেই বৃটিশের অহং এ চোট লেগেছিল মারাত্মক! তাই নেতাজীকে ধরতে না পারার আক্ষেপে বিমান দুর্ঘটনার কথিত কাহিনীর পর থেকেই তাদের প্রধান টার্গেট হয়ে ওঠেন চন্দ্রবোস! প্রধান আতঙ্কও বটে!

"He has again escaped; if Subhas Chandra Bose comes again we will lose whole of Asia"
বক্তা বিখ্যাত মার্কিণ সেনাপতি ম্যাক আর্থার!

হ্যাঁ, সেদিন ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তি এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত ছিল নেতাজী সম্বন্ধে! আর সেই আতঙ্ক থেকেই সেই ১৮ই আগস্টের তাইহোকু বিমান বন্দরের বিমান দুর্ঘটনার মাত্র দুই বছরের মধ্যে তড়িঘড়ি ভারতীয় বৃটিশভক্তদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত করতে বাধ্য হল প্রবল পরাক্রান্ত সেই বৃটিশ! নয়ত কোনো ভাবে নেতাজী দেশে ফিরে এলে তাদের যে আম ও বস্তা দুইই যাবে, এ বিষয়ে বৃটিশের কোনো সন্দেহ ছিল না! আর এই সত্যই স্পষ্ট করে নেতাজী মারা যাননি সেই দিন! স্পষ্ট করে তথাকথিত ভারতীয় স্বাধীনতা এসেছিল ঠিক কোন পথে!

ম্যাক আর্থারের এই বক্তব্যটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম! মনে রাখতে হবে এই বক্তব্যের আগে ইউরোপে জার্মানী বিধ্বস্ত! হিটলার আত্মহত্যা করেছেন! জাপান হিরোশিম-নাগাসাকির ক্ষত নিয়ে, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছে মার্কিণদের শক্তির কাছে! তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে চূর্ণবিচূর্ণ অক্ষশক্তি! এই রকম নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরেও নতুন আবিষ্কৃত পারমানবিক শক্তিতে বলিয়ান মদমত্ত প্রবল শক্তিধর মার্কিণরা কিনা আতঙ্কিত বঙ্গসন্তান চন্দ্রবোসকে নিয়ে?

হ্যাঁ ঠিক তাই! নেতাজীকে নিয়ে ইঙ্গমার্কিণ শক্তির এই আতঙ্কের মূল কারণ দুটি! তারা নেতাজীকে চিনতে একটুকুও ভুল করেনি! আর তাইহোকুর বিমানদুর্ঘটনাকে বিশ্বাস করার মতো নির্বোধও তারা ছিল না! এটাই ইতিহাস!

এই প্রসঙ্গে দেখা যাক "The Last Years of British India" গ্রন্থে লেখক Michael Edwards ঠিক কি বলছেন ; "....British had not feared Gandhi; the reducer of violence; they no longer feared Nehru; who was rapidly assuming the lineaments of civilized statesmanship....The British however; still feared Subhas Bose...."

তাই স্বভাবতঃই ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তি সেদিন আতঙ্কে ভুগছিল শুধুমাত্র নেতাজীর ফিরে আসার সম্ভাবনায়! তাই একদিকে পাগলের মতো তারা খুঁজে গেছে চন্দ্রবোসকে! আর একদিকে কংগ্রেস ও লীগ নেতৃত্বকে নিজেদের সমস্ত শর্তে রাজী করিয়ে, ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনায় এগোতে হল অকল্পনীয় দ্রুততায়!

তাইহোকু বিমানকাণ্ডের পর নেতাজীর অন্তর্ধানের সাথেই শেষ হল আজাদ হিন্দ ফৌজের স্বাধীনতা যুদ্ধ ! কিন্তু সেখানেই শেষ হল না আইএনএর প্রভাব! সেই প্রভাবের স্বরূপ বোঝা গেল, লালকেল্লায় শুরু হওয়া আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিচার পর্বে! সারা ভারতবর্ষ জুড়ে তখন আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দীদের মুক্তির দাবিতে সরব সমস্ত রাজনৈতিক পক্ষ! তাই দেশের জনমত অনুধাবন করে বিয়াল্লিশের ভারত ছাড়োর পর প্রায় নেতিয়ে পরা জাতীয় কংগ্রেস এগিয়ে এল বন্দীমুক্তির দাবিতে! বৃটিশ মুখপাত্র হিউ টয়ের ভাষায়, "....As a political weapon the I.N.A. had been of the greatest use to the Congress in India." এই সুযোগে দেশবাসীকে নিজের দিকে টেনে আনা সহজ হল কংগ্রেসের!

ঠিক এই কথাই শোনা গেল মাইকেল এডওয়ার্ডসের লাস্ট ইয়ার্স অফ বৃটিশ রাজ গ্রন্থে, "The I.N.A. trials were used by Congress propagandists to glorify the right to rebel against foreign rule."

সেদিনের জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ যথার্থই অনুধাবন করেছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দীদের মুক্তির দাবীর স্বপক্ষে না দাঁড়ালে জনগণের কাছে তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাবে! তাই জওহরলাল নেহরু, ভুলাভাই দেশাই প্রমুখ ছয়জনকে নিয়ে গঠন করা হল আই.এন.এ ডিফেন্স কমিটি! নেতাজীর ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে রাজনীতির প্রেক্ষাপটে! বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লীমেন্ট এটলীর কথায়, "We were sitting on the top of the volcano!"

কিন্তু কোন ভলক্যানোর কথা বলছেন এটলী ? প্রবল পরাক্রান্ত বৃটিশের ভয়টা ঠিক কোনখানে ? পট্টভি সীতারামাইয়া তাঁর ‘দ্য হিস্ট্রী অফ দ্য ইণ্ডিয়ান ন্যাশানাল কংগ্রেস’ গ্রন্থে লিখছেন, "It looked as though the I.N.A. itself eclipsed the Indian National Congress and the exploits of war and violence abroad threw into obscurity the victories of non-violence at home." (Vol-2: p-784)

কি সাংঘাতিক কথা! কংগ্রেসের নিয়ম-তান্ত্রিক আন্দোলন কি তবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে? ওদিকে বৃটিশ সমর বিভাগের রিপোর্ট অনুযায়ী, "The I.N.A. affair was threatening to tumble down the whole edifice of the Indian army."

এটলীর অবস্থা সত্যই সঙ্গীন!

আই.এন.এ.র বিচার পর্বে সত্যিই বৃটিশের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়েছিল ! কারণ যে দুইটি স্তম্ভ ভারতে বৃটিশের সাম্রাজ্যকে ধরে রাখতে বরাবর সাহায্য করে এসেছে, সেই জাতীয় কংগ্রেস এবং বৃটিশ সেনাবাহিনীর প্রভুভক্ত ভারতীয় সেনাদের উপর নেতাজী ও তাঁর আজাদ হিন্দ বাহিনীর প্রভাব দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছিল! পরিস্থিতির এই পরিবর্তনে বৃটিশের সামনে একটাই পথ খোলা ছিল, নেতাজীর পুনরাবির্ভাবের পূর্বেই মানে মানে বৃটিশভক্ত কংগ্রেস ও লীগ নেতৃত্বের কাছে শর্ত সাপেক্ষে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেওয়া! আর সেই লক্ষ্যেই সাম্প্রদায়িক ভাগ বাঁটোয়ারা করে দেশভাগের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নেতাজীর প্রভাব সম্পূর্ণ ধুয়ে দেওয়া! আর ঠিক সেটাই তারা করল!

জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্ব, আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতি সারা দেশের অনুরাগকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে সেই আবেগকে ইন্ধন করে দেশবাসীর আনুগত্য নিজেদের দিকে টেনে নিয়ে, ভারতবর্ষের রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা অনেকটাই বাড়িয়ে নিল! যার ফল পাওয়া গেল হাতে হাতে, ১৯৪৬এর ৪ঠা জানুয়ারী লালকেল্লা থেকে আই.এন.এ-র জেনারেল শাহনওয়াজ খান, কর্নেল সেইগল এবং ধীলন এর ঐতিহাসিক মুক্তির পর নির্বাচনে কংগ্রেসের জয়-জয়াকারে! বৃটিশ মুখপাত্র হিউ টয়ের মতে, এই বিচার পর্বেই বোঝা যায়, নেতাজীর এই অপরিসীম প্রভাব কংগ্রেসের রাজনৈতিক অগ্রগতির পক্ষে কতটা সুবিধে করে দিল! আর স্বভাবতঃই কংগ্রেসের এই অগ্রগতি বৃটিশের পক্ষে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিল!

আজাদ হিন্দ বাহিনীর সংগ্রামের দেশজোড়া আবেগের পিঠে সওয়ার হয়ে জাতীয় কংগ্রেসের এ হেন সাফল্যে বৃটিশের একটি দুর্ভাবনা ঘুচল! দেশবাসীর মনকে এবার নেতাজীর দিক থেকে ঘুরিয়ে আবার অহিংস আন্দোলনের সাফল্যের রূপকথায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা সহজ হবে! হলোও ঠিক তাই! আর এবিষয়ে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দের মতো বৃটিশের এমন সৃহৃদ আর কে আছে! অবশ্য মুসলীম লীগ নেতৃত্বও এই বিষয়ে জাতীয় কংগ্রেসের থেকে কোনো অংশেই পিছিয়ে ছিল না! আর এই দুই পক্ষের নাকের ডগায় সাম্প্রদায়িক বিভেদের উস্কানীমূলক ক্ষমতার ভাগ বাঁটোয়ারার টোপ ঝুলিয়ে দেশভাগের সুনিপুন ষড়যন্ত্রের খাল কেটে নেতাজীর আদর্শের চিরতরে সলিল সমাধি ঘটিয়ে তবেই দেশ ছাড়ল বৃটিশ! নিজের শর্তে!

১৯৪৬এ নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে সেদিনের পরিস্থিতি সম্বন্ধে সাবধান করে বলা হল, "Although the Indian National Army has been disbanded following the futile attempt to 'liberate' India with Japanese support; it is still an explosive political issue and more emotionally surcharged than any to be found here.... "

নেতাজী ও তার আই.এন.এ-র প্রভাব নিয়ে এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত ছিল ইঙ্গমার্কিণ শক্তি ! এবং আশঙ্কা যে মোটেই অমূলক ছিল না সেই সত্য প্রমাণ হল ১৮ই ফেব্রুয়ারী! শুরু হলো বিখ্যাত নৌবিদ্রোহ! বিদ্রোহের প্রথম সূত্রপাত বোম্বাইতে! তারপর ক্রমশ তা ছড়িয়ে পড়ল করাচী, মাদ্রাজ, বিশাখাপত্তম প্রভৃতি বন্দরে!

আবারও বৃটিশ মুখপাত্র হিউ টয়ের ভাষ্যে, "There can be little doubt that the serious naval mutinies and the unrest in the other two services early in 1946; owed something to its (I.N.A.) influence."

এবার দেখা যাক কি ছিল নৌবিদ্রোহীদের দাবীর মধ্যে! একটি প্রধান দাবী ছিল, আজাদ হিন্দ ফৌজের সমস্ত বন্দীদের দ্রুত মুক্তি দিতে হবে! সরাসরি আবারও নেতাজীর আই.এন.এ-র প্রভাব! আটাত্তরটি জাহাজের নৌসেনারা বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন একে একে! বৃটিশের পক্ষে মাত্র দশটি জাহাজ! সমস্ত জাহাজ থেকে বৃটিশের পতাকা নামিয়ে তোলা হল কংগ্রেস, লীগ ও কম্যুনিস্ট পার্টির পতাকা! নৌবাহিনীর নাম পরিবর্ত্তন করে রাখা হল, ইণ্ডিয়ান ন্যাশানাল নেভি!

তরুণ নৌসেনাদের এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যে আহ্বান জানানো হলো বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাদেরকে! বিদ্রোহী নৌসেনাদের নিয়ে গঠিত সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি এম এস খান তাঁর সহযোগীদের নিয়ে রাজনীতিবিদদের কাছে গিয়ে হতবাক হয়ে গেলেন! কেউ তাদের ডাকে সাড়া দিতে রাজী নয়! সবচেয়ে বড়ো ধাক্কা খেলেন লৌহমানব, জাতীয় কংগ্রেসের নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের কাছ থেকে! নেহরু রুষ্ট হয়ে উঠলেন নৌবিদ্রোহের সমর্থনে হরতাল ডাকায় ! গান্ধী বললেন, "Why should they continue to serve; if service is humiliating for them or India."
প্যাটেল বললেন, "...Bunch of young hotheads messing with things they had no business in.."

টাইমস অফ ইণ্ডিয়ায় লেখা হল, "As a result of the extravagant glorification of the I.N.A. following the trials in Delhi; there was released throughout India a flood of comment which had inevitable sequel in mutinies and alarming outbreaks of civil violence..."

নিউইয়র্ক টাইমসের মতে, "....Stimulated by the propaganda of CHANDRA BOSE; the pro-Japanese leader who had won followers among Moslems and Hindus alikes...."

বৃটিশ মন্ত্রীসভায় বড়লাট লর্ড ওয়াভেল প্রেরিত রিপোর্টে পরিস্কার জানানো হলো, পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ! সর্বস্তরের মানুষের কাছেই বৃটিশ সরকার অপ্রিয় হয়ে উঠছে!

আবুল কালাম আজাদের মতে, "A most remarkable change had in the meantime come about in all the public services..all the three branches of the Armed Forces -the Navy; the Army; and the Air Force -were inspired by a new spirit of patriotism...these sentiments were wide-spread; not only among officers but also among the ranks."

এই রকম অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার বদলে সেদিন বৃটিশের প্রধান সহায় হয়ে দাঁড়ালো জাতীয় কংগ্রস ও মুসলীম লীগের নেতৃবৃন্দ! এটাই ভারতবর্ষের ইতিহাস !
নেতাজীর ভাবাদর্শের ছোঁয়ায় গোটা দেশ যখন দেশপ্রেমে সংগ্রাম মুখর, তখনই আঘাত এল ঠিক পেছন দিক থেকে!

নৌবিদ্রোহীদের নেতাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল! লৌহ মানব! তিনি তাদের প্রতিশ্রুতি দিলেন, তাদের সব দাবী-দাওয়া পূরণের জন্যে বৃটিশের সাথে তারা কথা বলবেন! নৌবিদ্রোহীদের যাতে কোনো শাস্তি পেতে না হয়, সেই বিষয়ে কংগ্রেস তাদের পাশে থাকতে অঙ্গীকারাবদ্ধ ! বাদ গেল না মুসলীম লীগও ! মহম্মদ আলী জিন্না তাদের জানালেন, তাদের প্রতি যাতে ন্যায় বিচার হয়, তিনি ও লীগ সর্বতোভাবে সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখবেন এবং তাদের অভিযোগ পুরণের জন্যেও তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন! ২২শে ফেব্রুয়ারী ১৯৪৬! বিদ্রোহীরা সেই প্রতিশ্রুতি মত সমস্ত সেন্টারে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেন ! হাঁফ ছাড়ল বৃটিশ! এবার ডাইরেক্ট একশন!

জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের নেতৃবৃন্দের প্রতিশ্রুতি পেয়ে বিদ্রোহী নৌসেনারা যখন যুদ্ধ বন্ধ করে, প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণের আনন্দে মাতোয়ারা, ঠিক তখনই বৃটিশ সৈন্য বোঝাই যুদ্ধ জাহাজগুলি থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে কামানের গোলা ছুটে এল তাদের দিকে তাক করে! প্রথমে শান্তির পতাকা লাগানো বৃটিশের যুদ্ধ জাহাজগুলি এগিয়ে আসতে দেখে তারা ভেবেছিল, তাদেরই সমসাথীরা প্রীতিবিনিময় করতে এগিয়ে আসছে জাতীয় নেতাদের প্রতিশ্রুতি পেয়ে! কিন্তু শান্তির পতাকার আড়াল থেকে ছুটে এল বৃটিশের লক্ষ্যভেদী গোলা!
জাতীয় নেতারা বৃটিশের কথা মতো কাজ করেছেন! এবার বৃটিশের পালা তাদের হাতে নিরাপদে ক্ষমতা হস্তান্তর করে যাওয়া! পারস্পরিক স্বার্থরক্ষার চুক্তি!

ফণিভূষণ ভট্টাচার্য তার নৌবিদ্রোহের ইতিকথায় সেদিনের এই চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে জানান অতর্কিত এই হানায় বিদ্রোহীদের দেড়শর ওপর সৈন্য অকুস্থলেই শহীদ হন! কিন্তু তাতেও দমবার পাত্র ছিলেন না কেউ কেউ! বীর সৈনিক মদন সিং "খাইবার" জাহাজের বেতারে আবার যুদ্ধ ঘোষণা করলেন! অল আউট যুদ্ধের ডাক দিয়ে শুরু করলেন গোলাবর্ষণ! দেশের জনগণের উদ্দেশে বললেন, " See our national leaders. They are nothing but traitors of our motherland..." ফলে লড়াই করেও বিনা শর্তে আত্মসমর্পণে বাধ্য হতে হল তাদের! কিন্তু আজও বিশেষ জানা যায়নি, কত হাজার জন গ্রেফ্তার হয়েছিল, বা কার কি শাস্তি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত!

পেছন দরজা দিয়ে কুটকৌশলে নৌবিদ্রোহ দমন করলেও বৃটিশ প্রশাসন বুঝে গেল ভারতীয় সৈন্য দিয়ে আর আগের মত ভারতবর্ষকে পদানত রাখা যাবে না! কারণ, এই সৈন্যদের মধ্যে আজাদ হিন্দ বাহিনী ও নেতাজীর প্রভাবে স্বাধীনতার আকাঙ্খা জেগে উঠছে! এখন আর তারা শুধুমাত্র বেতনভুক্‌ কর্মী নয়, স্বাধীনদেশের সৈন্যরূপেই নিজেদের ভাবতে চাইছে! ফিল্ড-মার্শাল অকিনলেক রিপোর্ট পাঠালেন; সেই সময়ে ৬,৭০৪ জন অফিসার সহ প্রায় ২২ লক্ষ ভারতীয় সৈন্যের মধ্যে প্রায় ৭০% সৈন্যই আই.এন.এ-র প্রতি সহানুভূতিশীল এবং স্বাধীনতার পক্ষে! বৃটিশ দেখল এই অবস্থায় নেতাজী একবার ভারতে ফিরে এলে, একজন বৃটিশও হয়ত জ্যান্ত ফিরতে পারবে না বৃটেনে! সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল তারা!
১৯৪৫-এর ১৮ই আগস্টের তাইহোকুর বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যুকে ইঙ্গমার্কিণ শক্তি আদৌ বিশ্বাস করেনি বলেই তারা ভেবেছিল ১৯৪৬-এর মতো অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে নেতাজী একবার ফিরে এলে গোটা ভারতবর্ষে গণবিপ্লব ঘটে যাবে! খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের মতো বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের সহায়ক দলগুলি! ফলে চিরকালের মতোই ভারতবর্ষ হাতছাড়া হয়ে যাবে তাদের! লণ্ডন অবজারভারে লেখা হল, "India today is a vast powder magazine with exclusive potentialities exceeding those at any period of Indo-British history since Mutiny."

ঠিক, না আর ঝুঁকি নেওয়া যায় না! এই ঝুঁকি এড়াতে গেলে শাসনক্ষমতা হস্তান্তরিত করে যাওয়াই ভালো!

এই সময় বৃটিশ দুটি কাজ করল একসাথে! প্রথমেই জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের নেতৃবৃন্দকে সতর্ক করে দেওয়া হল, ভারতীয় রাজনীতি যেভাবে নেতাজীর বৈপ্লবিক ভাবাদর্শ ও আই.এন.এ-র প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ছে, তাতে ভারতীয় রাজনীতির ভরকেন্দ্র গান্ধী-জিন্নার সমর্থকদের হাত থেকে চন্দ্রবোসের অনুগামীদের হাতে চলে যেতে পারে! ফল মিলল হাতে হাতে! রাজনীতির সমস্ত স্তর থেকেই মুছে ফেলা শুরু হল নেতাজী ও আই.এন.এ-র প্রভাব! ইতিহাসের পাতায় নির্বাসিত করা হল, উপমহাদেশের ভাগ্য পরিবর্ত্তনের এই নির্ণায়ক অধ্যায়! আর এই সূত্রেই উপমহাদেশের তিন অংশেই নেতাজীকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়েছে গত সাত দশকে! সত্য বড়ো কঠিন! বলেছিলেন বিশ্বকবি!

দ্বিতীয়ত, বৃটিশ ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে, সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশভাগের গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল! এ বিষয়েও সহযোগী রূপে কাছে টেনে নিল কংগ্রেস ও লীগ নেতৃত্বের প্রধান অংশকে! এই কাজে বাংলা, বিহার, পাঞ্জাবে গোপনে অস্ত্র ও গুণ্ডাবাহিনী সরবরাহ করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়ে, দেশভাগের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, নেতাজী ও আই.এন.এ-র প্রভাবিত অসাম্প্রদায়িক ঐক্যবোধের স্বদেশচেতনাকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হল সহজেই! আর এই পথেই সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশভাগ করে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে উভয় পক্ষের টিকিই ইঙ্গমার্কিণ শক্তির হাতে শতাব্দীব্যাপী বাঁধা রাখা নিশ্চিত করল বৃটিশ প্রশাসন! আজ যা কঠোর বাস্তব!

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা! দেশভাগ! একদিকে চৌদ্দো পুরুষের ভিটেমাটি, সহায় সম্পদ, জীবিকা ত্যাগ করে সীমানা পেরিয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয়! নতুন জায়গায় নতুন করে শূন্য থেকে জীবন শুরু করার কঠোর সংগ্রাম! আর একদিকে স্বাধীন দেশের ক্ষমতাতন্ত্রের চাকভাঙ্গা মধু খেতে দলতন্ত্রের রাজনীতিতে বুদ্ধির শান দেওয়া! এসবের মাঝে কত সহজেই তলিয়ে গেলেন নেতাজী তার অসাম্প্রদায়িক দেশপ্রেমের দুর্ম্মর ভাবাদর্শ নিয়ে! বিস্মৃতির অন্তরালে চলে গেল আই.এন.এ! নৌবিদ্রোহের অকথিত কাহিনী, বিশ্বাসঘাতকতার নির্লজ্জ ইতিহাস সব- সবই ধামা চাপা পড়ে গেল বৃটিশ ও তার ভারতীয় সহযোগীদের সুনিপুণ কৌশলে! এটাই সেদিনের ইতিহাস! ইঙ্গমার্কিণ শক্তির দুরন্ত সাফল্য!

রাজনৈতিক ইতিহাসের এটাই এক সাধারণ ধর্ম! ক্ষমতার কেন্দ্রে বিজয়ী শক্তির অঙ্গুলি হেলনে অর্দ্ধসত্যের সাথে অসত্যের জাল বুনে প্রচারিত হয় জনসাধারণকে পরিচালিত করার জনপ্রিয় ইতিহাস! রামায়ণ মহাভারতের যুগ থেকে শুরু করে এটাই মানব সভ্যতার চরম সত্য! উপমহাদেশের স্বাধীনতার নামে ক্ষমতা হস্তান্তরের ইতিহাসে আজ তাই ব্রাত্য নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস ও তাঁর বৈপ্লবিক ভাবাদর্শ! স্বাধীন ভারতের সৈন্যবাহিনীতে ঠাঁই হয়না আজাদ হিন্দ ফৌজ ও নৌবিদ্রোহের দেশপ্রেমী বীর সেনানীদের! ইতিহাসের পাতায় তাদের ত্যাগ, বীরত্ব ও কৃতিত্বকে ধামাচাপা দেওয়া হয় নিপুণ কৌশলে! প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অস্পষ্ট হতে থাকে প্রকৃত ইতিহাসের অকথিত কাহিনী!

অথচ সেদিন ইঙ্গমার্কিণ শক্তি হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে নেতাজীকে! কোথায় অন্তর্ধান করল চন্দ্রবোস! ভারতে ঢোকার সমস্ত পথে অতন্দ্র প্রহরা! কোনো ভাবেই যেন ভারতে ঢুকতে না পারে নেতাজী! কিন্তু বিশ্বাস নেই লোকটাকে! নিশ্ছিদ্র প্রহরার জাল কেটে বেড়িয়ে গিয়েছিল লোকটা! বারবার চেষ্টা করেও তারপর আর তার নাগাল পায়নি, প্রবল পরাক্রান্ত ইঙ্গমার্কিণ শক্তি! তাই আর ঝুঁকি নিয়ে বেশিদিন অপেক্ষা করতে পারেনি বৃটিশ মন্ত্রীসভা! ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্যে ১৯৪৮ সালকে স্থির করলেও একবছর আগেই এদেশে তাদের সহযোগীদের হাতে তড়িঘড়ি ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়ে চলে যেতে হল তাদের! এতটাই প্রবল ছিল সেদিন নেতাজী ছায়া বৃটিশের আতঙ্কসরূপ হয়ে!

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসের ছায়া কতটা প্রবল ছিল সেদিনের বৃটিশ প্রশাসনে, সেকথা লেখা আছে মাইকেল এডওয়ার্ডসের ‘দ্য লাস্ট ইয়ার্স অফ বৃটিশ ইণ্ডিয়া’ গ্রন্থে! লেখকের মতে, "The ghost of Subhas Bose; like Hamlet's father; walked the battlements of the Red Fort; and his suddenly amplified figure over-awed the conferences that were to lead to independence."
এখানেই শেষ নয়! বৃটিশ মুখপাত্র হিউ টয়ের মতে, "There can be little doubt that the Indian National Army; not in its unhappy career on the battlefield; but in its thunderous disintegration; hastened the end of British rule in India."

ইতিহাসের কি করুণ পরিণতি! যে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্যে নেতাজীর এতবড়ো সংগ্রাম, যে সংগ্রামে তাঁর ডাকে হাজার হাজার ভারতীয় সামিল হয়েছিলেন, যে সংগ্রামে শতশত আজাদী-সৈন্য শহীদ হল, যে সংগ্রামের প্রভাব পড়ল বৃটিশ সেনাবাহিনীর সকল বিভাগে কর্মরত ভারতীয় সৈন্যদের ওপর; সেই স্বাধীনতা এল না! অথচ তার বদলে তথাকথিত ভারতীয় স্বাধীনতার নামে ক্ষমতার হস্তান্তর হল পেছনের দরজা দিয়ে সেই নেতাজীরই পুনরাবির্ভাবের আতঙ্কে! আজ এসত্য স্পষ্ট, ১৯৪৫এর ১৮ই আগস্ট সত্যি সত্যিই তাঁর মৃত্যু হলে বৃটিশ অত তড়িঘড়ি পাততাড়ি গোটাতো না! কিন্তু একথাও সত্য, পাততাড়ি গোটালেও তারা নেতাজীর স্বপ্নের স্বাধীনতাকে চিরতরে ব্যর্থ করে যেতে সফল হয়েছিল সেদিন!
====উপসংহার====
দেশবিভাগের লজ্জার মধ্যে দিয়ে এল ১৯৪৭-এর ১৫ই আগস্ট! সম্পূর্ণ বৃথা গেল নেতাজীর আকুল আবেদন! "I have no doubt that if India is divided; she will be ruined. I vehemently oppose the Pakistan scheme for the vivisection of our motherland; our divine motherland shall not be cut up."

অথচ ক্ষমতার মধুলোভী রাজনীতিবিদরা সেদিন দেশভাগের জন্যে বৃটিশের ষড়যন্ত্রে সামিল হতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি! তারাই স্বাধীন ভারতে নেতাজী, তাঁর ভাবাদর্শ ও আই.এন.এ-র বীর সেনানীদের সবরকম ভাবে একঘরে করে রাখার সুবন্দোবস্ত করেছিলেন অনমনীয় দৃঢ়তায়!

স্বাধীন ভারতে আই.এন.এর সৈন্যরা কি পুরস্কার পেয়েছিল দেখা যাক!

লৌহমানব সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল

"Sardar Patel; India's first Home-Minister; explained to me in 1950 that he had been very careful indeed not to reinstate any of the officers who had gone over to Subhas Bose's I.N.A. He also saw to it that they did not thrive in politics."
[Reporting India: Taya Zinkin]

এবার জাতির জনক নেহরু!

"He (Nehru) wanted them to be kept out of politics and made no hint of any possibility of their being reinstated in the Indian army before or after the transfer of power."
[The Indian National Army: K.K.GHOSE.]

আর মহাত্মা গান্ধী? তিনি আজাদী সৈনিকদের চাষ-আবাদ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন নিজের নিজের গ্রামে ফিরে গিয়ে!
ইতিহাসের পাতায় আজও তাই একঘরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়!

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...