Tuesday, January 17, 2023

ধৰ্ম, ঈশ্বর এবং নৈতিকতা


 ধৰ্ম এবং ঈশ্বর বিশ্বাস প্রতিটা মানুষের একটা ব্যক্তিগত বিষয়৷ ধৰ্ম এবং ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস যে কেউ রাখতেই পারে অথবা না রাখতেও পারে,সেটা তাদের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়৷ কিন্তু কথা হলো ধৰ্ম এবং ঈশ্বর বিশ্বাস মানুষের সহজাত প্ৰবৃত্তি নয়! সহজাত কথাটা বলতে জন্মগতভাবে লাভ করা মানুষের বৈশিষ্ট্যকেই বোঝায়৷ উদাহরণ স্বরূপ: ক্ষুধা, রাগ, যৌন অভিলাষা ইত্যাদি প্ৰবৃত্তিগুলো সকলেরই থাকে ৷ প্ৰাবল্য অথবা নিয়ন্ত্ৰণ কম বেশি হলেও এই সহজাত প্ৰবৃত্তিগুলো সকল সুস্থ মানুষের মধ্যে দেখা যায়৷ কিন্তু ঈশ্বরের বিশ্বাস করে না অথবা ঈশ্বরের চেতনার মধ্যে উপাসনা, ধৰ্মের উপর বিশ্বাস রাখাটা মানুষের সহজাত প্ৰবৃত্তি নয়৷ মনোবিজ্ঞানের দিক থেকেও ঈশ্বর বিশ্বাস মানুষের সহজাত প্ৰবৃত্তি রূপে গণ্য করা হয় না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঈশ্বর বিশ্বাসীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে , এর মানে ইহা নয় যে মানুষের সহজাত প্ৰবৃত্তিও কমে যাচ্ছে ৷ যদি ঈশ্বর বিশ্বাস মানুষের সহজাত প্ৰবৃত্তি নয় তবে এই ধারণা আসে কোথা থেকে?

একটা শিশুর জন্ম হয় নাস্তিক হিসেবে৷ সদ্যজাত শিশুটি এটুকুও বুঝতে পারে না যে তার ধৰ্ম কি আর ঈশ্বরও বা কি বস্তু ? ঘরের পরিবেশ এবং সমাজ ব্যবস্থাই একটা শিশুকে ধৰ্মীয়করণ বা ঈশ্বর বিশ্বাসী হিসেবে বানিয়ে নিতে সহায়তা করে৷ তার ইচ্ছা, চাহিদা কে উপেক্ষা করে অৰ্থাৎ বাধ্য করানো হয়৷ মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের বিশ্বাস নিয়ে ছোটবেলা থেকেই একটা পরিবেশের সৃষ্টি করা হয় যে শিশু অবস্থা থেকে মনে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্ৰতি এমন একটা দৃঢ় ধারণা আঁকড়ে ধরে যা পরবর্তী সময়ে বহু কম সংখ্যকই এই বিশ্বাস থেকে মুক্ত হতে পারে৷ প্ৰতিটা শিশুই জন্মলগ্নে অনুসন্ধিৎসু হয়ে জন্ম নেয়, কিন্তু তাদের অনুসন্ধিৎসু মনকে ধ্বংস করা হয় এভাবে --
ছোট্ট একটা শিশু তার বাবাকে যদি প্ৰশ্ন করে ‘বাবা, আমাদের পৃথিবী, মানুষ এসব কে সৃষ্টি করেছেন?
বাবার সহজ উত্তর : “ সবকিছু, ঈশ্বরই”,
সে আবার জিজ্ঞেস করে “বাবা, এই ঈশ্বরকে কে সৃষ্টি করেছেন?”
বাবা, বিরক্তিকর উত্তর: “কেন একটার পেছনে লেগে আছিস’ ? বুঝবে না বাবা, এগুলো বলতে নেই, ঈশ্বর খারাপ পাবেন ৷”

মন্দিরে প্ৰণাম- প্ৰাৰ্থনা, মসজিদে নামাজ, জিকির বা চার্চে গডের সম্মুখে প্রে করতেই হবে। ঈশ্বর-আল্লাহ-গডের গুণকীৰ্তনের মধ্য দিয়ে ছোটবেলা থেকেই ঈশ্বর নামের কাল্পনিক ধারণা বিভিন্ন ভাবে মানুষের মনে এভাবে মিশিয়ে দেয়া হয় যে জীবনের পরবর্তী সময়ে এর থেকে মুক্ত হওয়ার প্ৰবণতা ক্ষীণ হয়ে পড়ে ৷ এভাবেই মানুষের মনে ঈশ্বরের ধারণা দৃঢ়ভাবে প্রবেশ করে ঈশ্বর এবং ধৰ্মের ভয় দেখিয়ে ভালো হওয়ার শিক্ষা দেয় হয়ে থাকে। ধৰ্ম এবং ঈশ্বর বিশ্বাসের ভয় মানুষকে সৎ পথে আনার হাজার বছরের যে বৌদ্ধিক প্ৰক্ৰিয়া, সেই প্ৰক্ৰিয়ায় যে ব্যৰ্থতা রয়েছে তা বহু সময়ে বহু ভাবে আমাদের উপলব্ধি ও প্রমাণিত হয়েছে ৷ এই ধরনের প্ৰক্ৰিয়ার বিফলতাই সৃষ্টি করেছিল ‘রাম মন্দির-বাবরি মসজিদের নামে হত্যা আর হিংসা। এইধরনের প্ৰক্ৰিয়ার বিফলতার জন্যই ধৰ্মীয় ধারণার বিপরীতে কথা বলা জিওৰ্দানো ব্ৰুনোকে জ্বালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল ৷ এই প্ৰক্ৰিয়ার বিফলতাই সৃষ্টি করেছে ইছলামিক মৌলবাদের, আফগানিস্তান,ইরান, সহ মুসলিম বিশ্বে চলছে ধর্মযুদ্ধ,নারী নির্যাতন, অশান্তি ৷ এতসব ঐতিহাসিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও, যারা ধর্মে নৈতিকতা এবং ঈশ্বরের ভয় শেখায়, তারা কি সন্ত্রাসীদের ঈশ্বর এবং ধার্মিকদের ঈশ্বরের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে?

ধৰ্ম এবং ঈশ্বরের নামেই তো চারিদিকে চলছে হত্যা-হিংসা, সন্ত্ৰাস ৷ একটা ধৰ্মের উপর অন্য একটা ধৰ্মের আক্ৰমণ, হুংকার৷ এই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্ৰ করে গড়ে উঠেছে আধুনিক চাঁদাবাজি সংস্কৃতিরও৷ ধৰ্মের রোষানলে উঠে পড়ে লেগেছে রাজনীতির বিষবাষ্প! ধৰ্ম রক্ষার নামে অলি-গলিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ৷ তথাপিও কমছে কি হত্যা-হিংসার জেনোসাইড ? ধাৰ্মিক হওয়ার প্ৰতিযোগিতায় কোনো ধাৰ্মিক ঘোষখোর বা অসৎ উপায়ে পাওয়া টাকা দিয়ে সমাজে প্ৰতিপত্তিশীল দেখাবার জন্য দান খয়রাত করছে মন্দির, মসজিদে ৷ আর ঐশী আবেগ বা অনুভূতিতে আল্লাহর নামে আত্মঘাতী বোমারু নিয়ে হচ্ছে অগ্রসর ৷ ধৰ্ম, ঈশ্বর এবং আধ্যাত্মিকতাতেই এইসকল মানুষকে কেন নৈতিকতার শিক্ষা দেয়া হয়না ? সন্ত্ৰাসবাদী এবং বিভিন্ন কেলেংকারীতে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা এই মানুষগুলোকে জিজ্ঞাসা করা হলে ঠিকই বলবে ঈশ্বরের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস। কোনো ধাৰ্মিক বা ধৰ্ম প্ৰচারক হয়তো বলবেন ঈশ্বরের প্ৰতি আস্থা না থাকার দরুণ এহেন অপকৰ্মে হয়তো লিপ্ত হয়েছে ৷ কিন্তু তার প্ৰমাণ কি করতে পারবেন? এখানে বিগত দিনের ‘দ্যা টেলিগ্ৰাফ’ পত্রিকায় প্ৰকাশিত খবরের কথা মনে পড়ে গেল ৷ ইংলেণ্ড থেকে প্ৰকাশিত বিখ্যাত ‘দ্যা টেলিগ্ৰাফ‌’ (২২ মাৰ্চ, ২০১৬) পত্রিকায় প্ৰকাশিত খবর অনুযায়ী নেডারলেণ্ডে অপরাধের মাত্ৰা এতোই হ্ৰাস পেয়েছিল সেদেশে পাঁচটা জেলখানায় ১৩,০০০ টা কোঠা শূণ্য হয়ে পড়েছিল। সেইজন্য এই পাঁচটা কারাগার বন্ধ হয়ে থাকাটাও স্বাভাবিক। যার ফলে কারাগারে কর্মচারীদের চাকরির স্থায়িত্ব সংক্ৰান্তে প্ৰশ্নবোধক চিহ্নে এসে ছিল ৷ আকৰ্ষণীয় কথা হলো দেশটির মোট জনসংখ্যার ৮৩% মানুষই নাস্তিক বা অজ্ঞেয়বাদী৷ কেবল মাত্ৰ ১৭% মানুষ ধৰ্ম কিম্বা ঈশ্বর-বিশ্বাসী। অন্যদিকে, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্ৰের মোট জনসংখ্যার ৯০% মানুষ আস্তিক; ধৰ্ম এবং ঈশ্বরের উপর তাদের অটল আস্থা। কিন্তু বি.বি.সি.-র দেয়া তথ্য অনুসারে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্ৰে মোট জেলবন্দীর সংখ্যা প্ৰায় বিশ লক্ষেরও অধিক৷ এদিকে নেডারলেণ্ডে অপরাধীর অভাবে কারাগার বন্ধ হয়ে যাওয়ার অৱস্থায় সৃষ্টি হয়েছিল৷ অপরদিকে সমস্ত আমেরিকার কারাগারের প্ৰায় একশো শতাংশ কোঠাই অপরাধীদের দ্বারা পূৰ্ণ হয়ে আছে। সেইজন্য নাস্তিকের সংখ্যাধিক্য থাকা দেশ থেকে, ধৰ্ম এবং ঈশ্বরের প্রতি আস্থাশীল লোকেরা গিজগিজাই থাকা আমেরিকাতে অপরাধের মাত্ৰা বেশি!

বিজ্ঞানের বলে আমরা বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডে নতুন দৃষ্টিভংগীতে দেখার সক্ষম হয়েছি৷ কিন্তু বিজ্ঞান কখনও জিজ্ঞেস করে নাই যে ঈশ্বর আছেন না নাই! বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই প্ৰশ্ন গুরুত্বহীন৷ আদিম কাল থেকেই মানব সভ্যতা দুটা বড় প্ৰশ্নের মুখামুখি হয়ে আসছে ৷ একটা হলো ‘কিভাবে’ এবং অন্যটি ’কেন’৷ যে ’কিভাবে’ এই প্ৰশ্নের উত্তর সন্ধানে লাগলো তাঁরা বিজ্ঞান জগতে প্রবেশ করলো আর যে ’কেন’ প্ৰশ্ন নিয়ে অগ্রসর হতে লাগলো, তাঁদের একটা সময়ে স্তব্ধ হতে হলো ৷ যেখানে তথ্যের অভাব ছিল অৰ্থাৎ মানুষের সীমাবদ্ধতা বা বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ছিল৷ যার ফলে ঈশ্বরের নামে অলৌকিক শক্তির ধারণাটি এসে দাঁড়ালো৷ সেইজন্য ঈশ্বরের বিপক্ষে আৰু কোনো প্ৰশ্নের স্থান নেই৷ আর জিজ্ঞাসা বা অনুসন্ধান সেখানে স্তব্ধ হয়ে পড়লো ।

ঈশ্বর হচ্ছে মানুষের মনের সৃষ্টি৷ প্ৰাকৃতিক পৰ্যবেক্ষণের পর কল্পনায় কিছু কথা সংযোজন করলেই ‘ঈশ্বর’র মতো কোন এক ধারণার সৃষ্টি হয়৷ ভারতের অৰ্থাৎ সিন্ধু উপত্যকার ঈশ্বরসমূহের কাল্পনিক রূপসমূহ যদি দেখা যায় তবে লক্ষণীয় যে তাদের সাদৃশ্য ভারতীয়দের সঙ্গে রিলেটেড ৷ অৰ্থাৎ দেবী দূৰ্গার কাল্পনিক রূপটিতে যেভাবে আলঙ্কারিক সৌন্দৰ্যে আৰ্য দেবী হিসেবে অঙ্কন করা হয়েছে ঠিক সেইভাবে বাঘের ছাল, অৰ্ধ উলংগ এজন অনাৰ্য দেবতা হিসেবে শিবের চিত্ৰরূপ দেয়া হয়েছে ৷ ঠিক সেইভাবে আফ্ৰিকা বা গ্ৰীসে দেবতাদের যদি দেখা হয় সেই কাল্পনিক রূপ সমূহ আফ্ৰিকা বা গ্ৰীসের মানুষের সঙ্গে মিল দেখা যায়৷ এই কাল্পনিক ঈশ্বরকে কেন্দ্ৰ করে পৃথিবীর সৰ্বাধিক ধৰ্মের সৃষ্টি হয়েছে ৷ যেগুলো ধৰ্ম বেশি প্ৰাচীন সেখানে ঈশ্বরের বিভাগের কথা বলার বিপরীতে তুলনামূলকভাবে নতুন ধৰ্ম(খ্ৰীষ্টান, ইসলাম, প্রমুখ) এবং পুরানো ধৰ্মের সংশোধনী হিসেবে একজন ঈশ্বরের ধারণা দেয়া হয়েছে।

দেখা যায় একজন বিজ্ঞানী আস্তিক হলে, এই বিজ্ঞানী বহু আস্তিকের উদাহরণ হয়ে উঠেন ৷ ঈশ্বর, ধৰ্ম বিশ্বাসের কথা আসলে অনেকেই উচ্চ শিক্ষিত ডিগ্রীধারী বা প্ৰফেশনেল ডিগ্ৰীধারী মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে নিজের বিশ্বাসকে দৃঢ়ভাবে প্ৰতিষ্ঠা করতে দেখা যায়৷ কিন্তু কথা হলো প্ৰফেশনেল ডিগ্ৰীর সাথে একজনের চিন্তাধারার মানসিকতা সদায় সমানুপাতিক না ও হতে পারে ৷ অৰ্থাৎ একজন ভালো উচ্চ শিক্ষিত মানুষের চিন্তাধারাও থেকে কখনো একজন অশিক্ষিত মানুষের ভালো চিন্তা, ভালো আদৰ্শ হতে পারে ৷ তদুপরি বহুজনের প্ৰশ্ন বা যুক্তি, যদি ঈশ্বর অস্থিত্ব নেই এই পৃথিবীতে তবে কেন বেশি ঈশ্বর বিশ্বাসী? এই প্ৰশ্নের উত্তর একটা ঐতিহাসিক উদাহরণ দিয়ে কিছু উপলব্ধি করতে পারি৷ আজ থেকে হাজার হাজার বছর পূর্বে অধিকাংশ মানুষই বিশ্বাস করেছিল যে পৃথিবী স্থির অৰ্থাৎ সূৰ্যই পৃথিবীর চারিদিকে প্ৰদক্ষীন করে৷ সেইমতে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাও দেয়া হয়েছিল৷ হাজার হাজার বছর ধরে সেই ধারণা মানুষের মধ্যে প্ৰচলিত ছিল৷ কিন্তু সেইসময়ত জিওনাৰ্ড ব্ৰুনো, কপাৰ্নিকাস, গেলিলিওকে মুখ্য করি যুক্তিবাদী এবং অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী মুষ্টিমেয় কিছুসংখ্যক সংখ্যাগরিষ্ঠদের স্রোতের বিপরীতে গিয়ে এই ধারণার বিরোধিতা করেছিল৷ যার জন্য তাদেরকে বিভিন্নভাবে শাস্তি প্ৰদান করা হয়েছিল ৷ কিন্তু বৰ্তমান সময়ে পূৰ্বের ধারণার বিপরীতে সূৰ্যকেন্দ্ৰিক ধারণার বৈজ্ঞানিক সত্য রূপ মেনে নিয়েছি ! সেইজন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিশ্বাস মানেই বৈজ্ঞানিক প্ৰমাণ নাও হতে পারে। আস্তিকের সংখ্যা থেকে নাস্তিক, নিরশ্বরবাদী বা অজ্ঞেয়বাদীর সংখ্যা পৃথিবীতে বহু পরিমাণে কম যদিও বিগত দশক থেকে বহু দেশে নাস্তিক বা মুক্তমনা মানুষের সংখ্যা দ্ৰুত বৃদ্ধির বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্ৰতিবেদন দেখা গেছে ৷

কিছু সংখ্যক মানুষ মনে করেন যে একজন ব্যক্তি যে ঈশ্বর বা ধর্মকে মানে না সে “বিশৃঙ্খল, অহংকারী, অনৈতিক, অমানবিক।নৈতিকতা এবং ধর্ম-বিশ্বাসকে বিভ্রান্ত করা অনেকের মনে জাগা এটি স্বাভাবিক প্রশ্ন ৷ কিন্তু ঈশ্বর বা ধৰ্মের ভয় দেখিয়ে নৈতিকতার শিক্ষা দেয়া একটা অবৈজ্ঞানিক ধারণা। নৈতিকতা মানে শুধু ঈশ্বরের বিশ্বাস নয় অথবা ঈশ্বরকে কেন্দ্ৰ করে তৈরি করা কোনো ধৰ্মাচরণও নয়৷ নৈতিকতা মানে সকাল-বিকেল ঈশ্বরের গুণকীৰ্তন করা নয়৷ নৈতিকতা মানে কোনো ধৰ্মের ধর্মীয় রীতিনীতির উপর আস্থা রেখে ভক্তিভাব নয়৷ নৈতিকতা হল সাধারণ নিয়ম ও প্রবিধানের সমষ্টি যা কারো ক্ষতি না করে নিজের এবং সমাজের উপকার করা ৷ উচ্চ-নীচ, হিন্দু মুসলমান সকল জাতি-ধৰ্মের মানুষ সমান মানবীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার মানসিকতাই হচ্ছে নৈতিকতা৷ নৈতিকতা হল এই ধারণা যে ঘুষ না নিয়ে কিছু সঠিক কাজ করা ৷ নৈতিকতা হল হৃদয়ে উপলব্ধি করা যে আমরা নিজের স্বার্থে সমাজে অন্যদের ক্ষতি না করা৷ কারো কোন ক্ষতি না করা, চুরি না করা এবং সবার সাথে ভালবাসা ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখতে কোন ধর্মের প্রয়োজন নেই৷ এই ন্যূনতম নৈতিকতা পশুর মধ্যে ও দেখা যায়৷ নৈতিকতা এবং ঈশ্বর বিশ্বাস সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়৷ নৈতিকতা এসেছে মানুষের সমাজের জন্য নিজে তৈরী করে নেয়া কিছু সমাজনীতি থেকে ৷ সেইজন্য নৈতিকতা সমাজে নীতির সঙ্গে জড়িত শব্দ৷ সমাজ ছাড়া অন্য প্রাণীদের কোনো কৃত্রিম নৈতিকতা নেই৷ নৈতিকতা যেহেতু সমাজ নীতির সঙ্গে জড়িত শব্দ, অনেকেই ঈশ্বর বিশ্বাস, ধর্ম এবং আধ্যাত্মিকতাকে সমাজনীতির অংশে নৈতিকতার অধীনে নিয়ে আসেন ৷ কিন্তু ধৰ্ম, ঈশ্বর এবং আধ্যাত্মিকতাকে সমাজনীতির অধীনে এনে নৈতিকতার মৰ্যাদা দিলে কখনো কখনো এর পরিণতি হয় ভয়াবহ ৷ এই ধরনের নীতি থেকে উদ্ভূত নৈতিকতা মসজিদ ভেঙে মন্দির নির্মাণ বা মন্দির ভেঙে মসজিদ নির্মাণের পক্ষে। এই ধরনের নীতি থেকে সৃষ্ট নৈতিকতা আবার রাম রহিমের মতো ধর্মীয় নেতাদের জন্ম দিতে পারে।

ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস (World Happiness Report) রিপোর্ট অনুযায়ী, রাষ্ট্রসংঘ দ্বারা পরিচালিত একটি বার্ষিক জরিপে দেখায় যে ধর্ম এবং ঈশ্বর বিশ্বাসের সাথে নৈতিকতার কোন সম্পর্ক নেই। দেশসমূহের জরিপে রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক, মানবাধিকার এবং ধর্মীয় বিশ্বাস সহ আরও অন্যান্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্বের ১৫৬টি দেশের জরিপ অনুযায়ী, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক এবং নরওয়ে এ বছর বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। দুঃখজনকভাবে, ভারত 140 তম স্থানে রয়েছে৷মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ ধর্মীয় দেশ রয়েছে ৫০ এর নীচে৷ ঠিক সেইভাবে Institute for Economics and Peace (IEP)র তত্ত্বাবধানে সমীক্ষা চালিয়ে ২০১৮ সনের Global Peace Indexর প্ৰতিবেদনে ভারতের সুখী সূচকে একটি বিভ্রান্তিকর জায়গায়! মজার ব্যাপার হল, ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর জোর দেয় এমন লোকে ভরা একটি দেশের মধ্যে সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সুখের সম্পর্ক বিপরীত। এর মানে হল যে দেশগুলিতে বেশি সংখ্যক মানুষ যারা ঈশ্বর এবং ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস করে তাদের সুখের স্তর নিম্নতর হয়, যেখানে কম সংখ্যক মানুষ যারা ঈশ্বর এবং ঈশ্বরে বিশ্বাস করে তাদের সুখের স্তর বেশি। প্রতিবেদনে শীর্ষ পাঁচটি দেশে স্বঘোষিত নাস্তিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি নাস্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষে পরিপূর্ণ দেশগুলোতে মানুষের মধ্যে খুন-হানাহানি বেশি হওয়া উচিত ছিল বলে প্রচলিত ধারণা! কিন্তু কেন এমন দেশগুলো বেশি সুখী? যদিও পরিসংখ্যান একটি সম্পূর্ণ উপসংহার টানতে পারে নাই যে ঈশ্বর বা ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষকে অপরাধ করতে প্ররোচিত করে, আমরা এই ধরনের পরিসংখ্যান থেকে একটি যৌক্তিক উপসংহার টানতে পারি যে ধর্ম এবং ধর্মীয় বিশ্বাস অপরাধ থেকে মানুষের সিংহভাগকে দূরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে!

https://acrobat.adobe.com/link/review?uri=urn:aaid:scds:US:ce19b742-66be-3ed7-9344-87971e5be4a4


Tuesday, January 10, 2023

নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের হাল হকিকত


"Not all battles are fought for victory. Some are fought to tell the world that someone was there on the battlefield"
--- রাবিশ কুমার

সম্ভবত "টিভি জার্নালিজম"- এর অধ্যায়টা শেষ হল। এনডিটিভিকে এখন আদানিদের সংবাদমাধ্যম বলতে আর কোনো সংশয় নেই। ১৯৮৪ সালে প্রণয় রায় এবং রাধিকা রায় নিউ দিল্লি টেলিভিশন লিমিটেড (NDTV) শুরু করেছিলেন। ঠিক তখনই প্রাথমিকভাবে সংবাদের প্রোডাকশন কোম্পানি হিসেবে পথ চলা শুরু করেছিল এনডিটিভি।ভারতের টেলিভিশন দুনিয়ায় এনডিটিভি সংস্থা প্রথম স্বাধীন সংবাদসংস্থা হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। গোটা টেলিভিশন দুনিয়া তখন সরকারি দূরদর্শনের হাতে। এনডিটিভি সেই সময় থেকে নিউজ প্রোডাকশন হাউস হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। ১৯৯৮ সাল থেকে এনডিটিভি ভারতের প্রথম ২৪ ঘণ্টার স্বাধীন সংবাদ চ্যানেল হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। সে সময় স্টার ইন্ডিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজ শুরু করেছিল এনডিটিভি। ২০০৩ সালে এনডিটিভি ২৪ ঘণ্টার হিন্দি চ্যানেল এবং পরবর্তী সময়ে ২৪ ঘণ্টার বানিজ্য চ্যানেলও শুরু করে।

ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম'‌ সংস্থা প্রতিবছরই বিভিন্ন দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার তালিকা প্রকাশ করে৷ দেখা যাচ্ছে, দু'বছর আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের স্থান ১৩৩ হলেও গত বছর সেটা এসে দাঁড়িয়েছে ১৩৬-তে৷ আর এ বছর তা আরও দু'ধাপ নেমেছে৷ গ্লোবাল মিডিয়া ওয়াচডগ রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২২ সালের বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারতের র‌্যাঙ্কিং ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫০-এ নেমে এসেছে। বিগত বছরের রিপোর্টে, ভারত ১৪২ তম স্থানে ছিল। সর্বোচ্চ সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় শীর্ষ তিনটি দেশের অবস্থান, নরওয়ে (৯২.৬৫ স্কোর), ডেনমার্ক (৯০.২৭) এবং সুইডেন (৮৮.৮৪)। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে শীর্ষস্থান পেয়েছে নরওয়ে৷ এই নিয়ে টানা দু'বছর শীর্ষস্থানে তারা৷

বিশ্বের সবচেয়এ বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত৷ এ দেশে আইনসভা, আমলাতন্ত্র এবং বিচারব্যবস্থার পর সংবাদমাধ্যমকে বলা হয়, ‘‌গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ'‌৷ সেই স্তম্ভ এখন নড়বড়ে৷ বলছে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকের স্বাধীনতারক্ষা সংগঠন ডাব্লিউপিএফ‌৷ গত ২৫শে এপ্রিল এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি তাদের সমীক্ষার ফল প্রকাশ করেছে৷ রিপোর্ট মতে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় একসঙ্গে আরও দু'‌ধাপ তলিয়ে গিয়েছে ভারত৷ স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের তালিকায় ভারতের স্থান ছিল ১৩৬ নম্বরে৷ এবার তা ১৩৮ নম্বরে গিয়ে ঠেকেছে৷ ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া, দাম দিয়ে কেনার চেষ্টা ছাড়াও সাংবাদিকদের প্রাণনাশের ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে৷ রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স বা আরএসএফ-এর এই বার্ষিক রিপোর্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের খুন হওয়ার ঘটনা৷ তালিকার সবচেয়ে নীচে স্থান পেয়েছে উত্তর কোরিয়া৷ তার ঠিক ওপরেই রয়েছে এরিট্রিয়া, তুর্কমেনিস্তান, সিরিয়া এবং চীন৷ তবে গত বছরের মতো এবারও চীন নিজেদের অপরিবর্তিত রেখেছে৷

মুক্তমনা বুদ্ধিজীবী হত্যা আগেই শুরু হয়েছিল। ২০১৩ সালের আগস্টে জাতপাতবিরোধী সামাজিক কর্মী ও মুক্তমনা নরেন্দ্র দাভোলকরকে খুন করে হিন্দুত্ববাদীরা। ২০১৫ সালে খুন হন উগ্র হিন্দুত্বের সমালোচক গোবিন্দ পানসারে এবং প্রথিতযশা পণ্ডিত এমএম কালবুর্গি। ভারতে যুক্তি, মুক্তবুদ্ধি, উদারতার যে আর কোনও স্থান নেই, একের পর এক হত্যাকাণ্ডে সে কথাই যেন বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে হত্যাকারীরা। স্বাভাবিক ভাবেই ছাড় মেলেনি সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের। একের পর এক সাংবাদিককে ধর্ষণ ও খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, সরকারের ও কর্পোরেটের মনপূত খবর হয়নি বলে সরে যেতে হয়েছে হিন্দুস্তান টাইমসের সম্পাদক ববি ঘোষ, ইপিডব্লিউ’র সম্পাদক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা, এবং দ্য ট্রিবিউনের হরিশ খারের মতো প্রবীণ সম্পাদককে।

আরও উল্লেখযোগ্য ভাবে সংস্থাটির সমীক্ষা রিপোর্টে সংবাদমাধ্যমের এই অধঃপতনের জন্য ‘‌উগ্র হিন্দুত্ব'‌ এবং ‘‌উগ্র জাতীয়তাবাদ'-‌কে দায়ী করা হয়েছে৷ অর্থাৎ আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থাটি তাদের সমীক্ষায় এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী দিকেও আঙুল তুলেছে৷ বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে ভারতে মহিলা সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ-‌সহ মোট তিন জন খুন হয়েছেন৷ বহু ক্ষেত্রে আইনের অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে৷ ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪-‌এ ধারায় মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে৷ বলা হয়েছে, ভারতীয় জনতা পার্টির তথ্য-‌প্রযুক্তি বিভাগের কর্মীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত সাংবাদিকদের অনুসরণ করেন৷ সেইসঙ্গে গালমন্দ করেন৷ অপমানজনক পোস্ট করেন৷ এমনকি সাংবাদিকদের প্রকাশ্যে খুনের হুমকিও দেন৷ সংবাদপত্রে‌ সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেই সুকৌশলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে ‘‌দেশদ্রোহী'‌ বা ‘‌জাতীয়তাবাদ-‌বিরোধী'‌ তকমা সেঁটে দেওয়ার কাজ করে থাকেন শাসকদলের তথ্য-‌প্রযুক্তি বিভাগের কর্মীরাই৷ নিউজ ওয়েবসাইট দ্য কুইন্টের সাংবাদিক দীক্ষা শর্মা ও মহম্মদ আলি, সংবাদসংস্থা এএনআই-এর অভয় কুমার, ফার্স্টপোস্টের দেবব্রত ঘোষ, এনডিটিভি’র সোনাল মেহরোত্রা কাপুরকে এমনই হুমকির মুখে পড়তে হয়। ধারাবাহিক ভাবে চূড়ান্ত হেনস্থার শিকার রানা আয়ুব, সাগরিকা ঘোষ, মতো নামজাদা সাংবাদিকরাও।

কৃষক দুর্দশা, গোরক্ষক বাহিনী, নিছক জাত-‌পাত ও নারী সুরক্ষার মতো বিষয়গুলিতে সরকারের সমালোচনা করলেই ধেয়ে আসছে হুমকি৷ অনেকেই ভয় পেয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছেন৷ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছেন৷ আর যাঁরা ভয় না পেয়ে নিজেদের কাজ করে চলেছেন, তাঁরা হয় খুন হচ্ছেন, নয়ত শারীরিক ভাবে নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন৷ নিঃসন্দেহে বিষয়টা শোচনীয়৷ সম্প্রতি সরকার-‌স্বীকৃত সাংবাদিকদের স্বীকৃতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি৷ দেশের তো বটেই সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক স্তরে নিন্দিত হওয়ার পরে তিনি পিছু হটেছেন৷ তবে সূচকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের স্থান নেমে যাওয়ার পেছনে সংবাদমাধ্যমের নিজের ভূমিকাও রয়েছে৷ বিশেষজ্ঞদের মতে, মিডিয়া-‌হাউসগুলি সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করছে৷ কেউ কেউ প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে ভুয়ো সংবাদ পরিবেশন করছেন৷ এগুলো বন্ধ না হলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা অসম্ভব৷ তাইতো আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এনভি রামানা, আগে যেভাবে আলোড়ন ফেলা খবর প্রকাশ করত সংবাদমাধ্যম, তেমনটা আর দেখা যায় না এখন।

আজকের সংবাদ মাধ্যমের বিষয়ে ব্যক্তিগত মতামত জানানোর স্বাধীনতা হারিয়ে যাচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত ভাবে তদন্তমূলক সাংবাদিকতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের দুনিয়া থেকে। যেখানে কথা ছিল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সমষ্টিগত ব্যর্থতা তুলে ধরা সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক তৈল মর্দন কোন ভাবেই প্রশ্রয় দেয়া ঠিক নয়। এক কথায়, জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব নিতে হবে সংবাদ মাধ্যমকে। একটা সময় ছিল যখন অধীর আগ্রহে সংবাদপত্রের অপেক্ষায় থাকতাম। সেই সময়ে দেশের বড় বড় সব কেলেঙ্কারি ফাঁস করেছে সংবাদমাধ্যমে। তখন সংবাদপত্রগুলি আমাদের হতাশ করেনি। গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে লেখা সংবাদপত্রের প্রতিবেদন পরবর্তীতে গুরুতর প্রভাব ফেলত। কিন্তু এখন, একটি বা দুটি বাদে, সেই ধরনের সাড়া ফেলে দেওয়া কোনও প্রতিবেদন চোখে খুবই কম পড়ে।

গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদ মাধ্যম। নির্ভীক সংবাদ পরিবেশনই এই স্তম্ভকে শক্তিশালী করে তুলে, যার ওপর ভিত্তি করে শক্তিশালী হয় গণতন্ত্র। সেখানে তদন্তমূলক সাংবাদিকতা বরাবরই সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। কিন্তু বর্তমানে সংবাদ পরিবেশন নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে।সাংবাদিক, প্রতিষ্ঠান, বহু ক্ষেত্রেই উঠছে প্রশ্ন। খবরের চ্যানেল দেখলেই বোঝা যায় যে মোটামুটিভাবে একপক্ষীয় খবরেরই প্রাধান্য পায় সেখানে। জনগণের মনে প্রশ্ন এনডিটিভির মালিকানা বদলে ভারতে অন্য কেউ কি সরকারকে এভাবে চ্যালেঞ্জ করবে ? সরকার-বিরোধী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল এনডিটিভি। সন্ধ্যার পর যখন প্রায় সব খবরের চ্যানেলে একতরফা খবর পরিবেশন করে এই অবস্থায় কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা যেত এনডিটিভিতে। আসলে আশায় মরে চাষা, সেই অর্থে এখন আমরা প্রত্যেকেই চাষা। সেই আশা, লাল-নীল-গেরুয়া ‘রঙ’ ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া একদিন আর কঠিন মনে হবে না। ‘কাইট-ফ্লায়িং জার্নালিজম', ভারতের সাংবাদিকতা চমক সৃষ্টিতে যতটা এগিয়ে যাচ্ছে–দায়িত্ববোধ, বস্তুনিষ্ঠতা ও সততার বিচারে ততটাই পড়ছে পিছিয়ে।

Sunday, January 1, 2023

সাইবার ক্রাইম : মানব জাতির অস্তিত্বে প্রশ্ন ?


১।
তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে সাইবার অপরাধ ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাসের মতো। সাম্প্রতিককালে সমগ্র বিশ্ববাসী সাইবার অপরাধের বৰ্ধিত দুঃশ্চিন্তায় আক্রান্ত। প্রতিনিয়ত বড় বড় সাইবার অপরাধের পরও দেশের কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষিত-দক্ষ জনবল ও সচেতনতার অভাবেই সাইবার অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। কম্পিউটার এবং ইণ্টারনেটের উপরে মানুষের নিৰ্ভরশীলতা যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, একইভাবে তৎপর হয়ে উঠছে সাইবার অপরাধীর চক্রসমূহ। সাইবার সংক্রান্ত সরকারের বিরুদ্ধে অপরাধ কে বলা হয় সাইবার টেররিজম (Cyberterrorism)বলে। সাইবার পর্নোগ্রাফি, সাইবার স্টকিং, সাইবার ডিফেমেশনের মতো ইত্যাদি ঘটনা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘটা অপরাধের তালিকায় পরে। অনলাইনে জুয়া, ফিশিং, কপিরাইট উল্লঙ্ঘণ, ক্রেডিট কার্ড ফ্রডের মতো ঘটনা পড়ে সম্পত্তি সংক্রান্ত সাইবার ক্রাইমের আওতায়।

ভারতে সাইবার অপরাধে দায়ের করা অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২০ সালে সাইবার অপরাধসংক্রান্ত মামলা ১১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সৰ্বসাধারণের মস্তিষ্কগত চিন্তার অগোচরেই কিছু সূক্ষ্ম কাজ দ্বারা এই অপরাধ সম্ভবপর হয়। কিছুসংখ্যক এই শ্ৰেণীর অপরাধীদের কম্পিউটার এবং ইণ্টারনেটের অসাধু ব্যবহারই ধীরে ধীরে এর উৎপত্তি। তাঁরা এই জ্ঞান কল্যাণমূলক কাজে প্ৰয়োগ করে সমাজ উত্তরণে মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু তা না করে নিজ বিদ্যা-বুদ্ধি ট্রেপের গেড়াকলে খাটিয়ে গোটা বিশ্বব্যাপি সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে। 

বর্তমানে সাইবার অপরাধ সারা বিশ্বে অপরাধ তালিকার শীর্ষে রয়েছে। সম্প্রতি দ্য ইকোনমিস্টের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায় যে, বার্ষিক ৯০ মিলিয়ন সাইবার হামলায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫৭৫ বিলিয়ন ডলারের সমান। নিত্যনতুন সাইবার অপরাধের কৌশলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাইবার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যবসাও বেড়ে চলেছে। ব্যাংক অব আমেরিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সাল নাগাদ এটি ১৭০ বিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হয়েছে। এই অপরধী চক্ৰসমূহকে 'হেকার' (Hacker) নামে সাধারণত আমরা জানি। ইংরেজী Hack শব্দের অৰ্থ হচ্ছে অন্যের কম্পিউটার থেকে অবৈধভাবে তথ্য আহরণ করা, অর্থাৎ তথ্য চুরি করা। এই অসাধু কাৰ্য অতি ক্ষুদ্ৰ স্তর থেকে বৃহত্তম স্তরে ঘটতে পারে। সেজন্য একজন হেকার সাইবার অপরাধী। অবশ্য তাদের মধ্যেও মাত্ৰার ব্যাপক তারতম্য আছে। পুতুল চোর থেকে হাতি চোর পর্যন্ত সকল স্তরের হেকার বৰ্তমান সময়ে নিরিহ জনসাধারণের নিদ্ৰাহরণ করছে। সঙ্গে সাইবার অপরাধের মাত্ৰা হ্ৰাস করতে কর্তৃ পক্ষসমূহও নানান প্ৰতিরোধমূলক ব্যবস্থা উদ্ভাবন তথা অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যদি গাছের শাখায় শাখায় অনুসন্ধান করে , তো হেকার পাতায় পাতায়। সাধারণ হেকারের চোখ যদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বেংক একাউন্টের উপর থাকে। কিন্তু তার বিপরীতে হাতিচোররূপী হেকার-চক্ৰ একটি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করে তুলতে পারে।

ছোট্ট পরিসরে যে হেকারগুলো আছে এদের কবলে একবারও পড়েন নাই সম্ভবতঃ এমন খুব কম সংখ্যক মানুষ আছেন। সাইবার অপরাধী চক্র সাধারণ মানুষকে অতি সহজেই প্ৰবঞ্চনায় ফেলে। প্রবঞ্চনায় ফেলতে নানা ধরনের ট্রেপ তৈরি করে। এই জালে ফেলতে এই হেকার সাধারণ মানুষকে নানা প্রলোভন দেখায়। তারপর একবার ঠগা খেয়ে অনেকের চোখ খুলে। সজাগতা সকল সমস্যার শেষ সমাধান নয়। সাধারণ মানুষকে লুট করার না না কৌশল উদ্ভাবনে একজন সাইবার অপরাধীর প্ৰচুর সময় এবং মেধা ব্যয় করতে হয়। ফলে সাইবার অপরাধ রোধে কর্তৃপক্ষসমূহও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। পাসওয়ার্ড’, ’অ টি পি ইত্যাদি পদ্ধতিসমূহ প্রারম্ভে প্ৰচলিত থাকা সত্ত্বেও হেকারের হাতে বহু মানুষ প্ৰবঞ্চিত হয়েছেন। অনেক মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে যাওয়ার খবরও শোনা যায়। ক্ষুদ্র পরিসরের এই সাইবার ক্রাইম রোধ করতে প্রসাশনের সাইবার শাখা রয়েছে সত্য। কিন্তু এইসব অপরাধীদের ধরতে কতটা সফল হয়েছে তা সন্দেহের বিষয়। সমীক্ষায় দেখা যায় প্রায় নিরানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে এই অপরাধের বলি হওয়া সাধারণ মানুষ সুবিচার পায় না। প্রশাসন নিয়ম মাফিক অভিযোগ গ্রহণ করেন ঠিকই কিন্তু অপরাধী ধরার দৃষ্টান্ত খুব বিরল।

২।
এখন কথা হলো, সাইবার অপরাধীদের এইসব দৌরাত্ম্য অব্যাহত থাকলে সমগ্র ইন্টারনেট ব্যবস্থার উপরে জনগণ আস্থা রাখবে না। যার ফলে গ্রাহকদের সাথে সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। লক্ষণীয় যে, দেশের বেংকিং সিস্টেম ইতিমধ্যে একশো শতাংশ কম্পিউটার - ইন্টারনেট নির্ভর এবং এর নির্ভরযোগ্যতা অটুট রাখা বেংক কতৃপক্ষের অতি প্রয়োজনীয়। যদিও বেংকের তরফ থেকে গ্রাহকদের শতর্কতামূলক বার্তা দেয়া হয়, যেকোনো পরিস্থিতিতে অ টি পি, পাসওয়ার্ডের গোপনীয়তা যেন ভঙ্গ না করা হয়। কিন্তু এরপরও কিছু সংখ্যক মানুষ সাইবার অপরাধীর শিকার হয়ে পড়েন - এমন কিছু ঘটনা সংঘটিত হয় যা স্বাভাবিক মানুষ অতি সহজেই জালে ফেঁসে যান। এখানে আমার সঙ্গে ঘটা একটা ঘটনা পাঠক মহল শেয়ার করতে চাই। তিন বা চার মাস হবে এই ঘটনার। আমার হোয়াটসঅ্যাপে বিদ্যুৎ কতৃপক্ষ (APDCL) থেকে এধরণের একটা মেসেজ আসে। যেহেতু আমার মোবাইল নাম্বার টা রেজিস্ট্রার ছিল, আমি ভাবলাম হয়তো হোয়াটসঅ্যাপে এসেছে। এই মেসেজে লিখা ছিল ইংরেজিতে, বাংলায় এর অনুবাদ হলো 'আপনার বিলটি আপডেট হয়নি একটা ভেরিফিকেশন করতে হবে, ইমেল আপডেটের মাধ্যমে তা করতে হবে।' নিচে দেয়া ছিল একটা মোবাইল নাম্বার আর বন্ধনীতে লিখা ছিল ডিসট্রিক ম্যানেজার (District Manager)। তো যেই মেসেজটা পড়লাম তখনই বিলের রিসিভ কপি টা নিয়েও দেখি এটা তো ঠিকই ছিল, বিল দেয়া হয়েছে আগেই। তারপর ভাবলাম এমন বোধহয় হতে পারে, ভেরিফিকেশন তো এখন অনেক ক্ষেত্রেই দিতে হয়। তাই হয়তো, ফোন করে নেই। একজন হিন্দিভাষী ফোন রিসিভ করলেন। উপরের উল্লেখিত পুরো ঘটনা বলার পর ঐ ব্যক্তি আমার ইমেইল চেয়ে নিয়ে একটা লিংক পাঠালেন। এই লিংকে ক্লিক করার পর দেখি ঐ ব্যক্তি আমার ফোন সে নিজে ওপারেট করছে। সঙ্গে সঙ্গেই একটা ভেরিফিকেশন স্ক্রীণ আমার সামনে আসলো। সেখানে আমরা নাম, ঠিকানা, ইমেইল, পেন নং (PAN), আধার নং(AADHAR) এসব দেয়ার অপশন ছিল। আমিও ওর ট্রেপে পড়তে থাকি। যখনই পেন নংটা লিখতে যাই হঠাৎ মনে আসলো একবার আমার বন্ধু যে ইলেক্ট্রিক অফিসে চাকরিরত তাকে ফোন করে নেই। আর এদিকে আমি কি করছি না করছি সব দেখছে হিন্দিভাষী ঐ মানুষটি। বন্ধুটি সেদিন কতবড় হেলপ করেছে তাকে কিভাবে যে ধন্যবাদ জানাই, এর ভাষা আমার জানা নেই। সেদিন খুব বকে ছিল আমাকে - 'স্যার কি অবসর, তোর সাথে এতো সময় ফোনে কথা বলার!' সাথে সাথে ওর ফোন কেটে মোবাইল সুইচ অফ করি।

৩।
উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও সাইবার অপরাধ-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা হু-হু করে বেড়েই চলছে। এ অপরাধের রাশ টেনে ধরতে সরকার নানান পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। Federal Bureau of Investigation (FBI) থেকে যে রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে তাতে রীতিমতো আতঙ্ক তৈরি হয়। কারণ, ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, সাইবার ক্রাইমে বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ স্থানে রয়েছে ভারত।কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে ২০১৭ সালে সাইবার অপরাধের ২১ হাজার ৭৯৬টি মামলা ছিল, ২০১৮ সালে ২৭ হাজার ২৪৮টি এবং ২০১৯ সালে সংখ্যাটি বেড়ে ৪৪ হাজার ৭৩৫টি মামলা হয়েছিল। সাইবার মামলার বিষয়ে ভারতের এ-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে অবহিত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ২০২০ সালে দেশে সাইবার অপরাধসংক্রান্ত মোট ৫০ হাজার ৩৫টি মামলা হয়েছে। যেখানে ২০১৯ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৪৪ হাজার ৭৩৫টি। ২০২০ সালের সাইবার অপরাধের এই তথ্য ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) ‘ক্রাইম ইন ইন্ডিয়া, ২০২০’ প্রতিবেদন থেকে নেওয়া হয়েছে। ২০১৯ ও ২০২০ সালের মধ্যে পার্থক্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মামলার ১১.৮ শতাংশ বেড়েছে।কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে ২০১৭ সালে সাইবার অপরাধের ২১ হাজার ৭৯৬টি মামলা ছিল, ২০১৮ সালে ২৭ হাজার ২৪৮টি এবং ২০১৯ সালে সংখ্যাটি বেড়ে ৪৪ হাজার ৭৩৫টি মামলা হয়েছিল। ২০১৯ সালে মোট অপরাধের মধ্যে সাইবার ক্রাইমের হার ছিল ৩.৩ শতাংশ, যা এখন ৩.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালে রেজিস্ট্রীকৃত সাইবার অপরাধ মামলার ৬০.২ শতাংশ (৩০ হাজার ১৪২টি মামলা) প্রতারণামূলক উদ্দেশ্য সম্পর্কিত, যেখানে ৬.৬ শতাংশ (৩ হাজার ২৯৩টি মামলা) যৌন নির্যাতনের মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সাইবার অপরাধের নতুন পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া পাঞ্জাব, রাজস্থান, গোয়া ও আসামের মতো কয়েকটি রাজ্যে একটিও সাইবার সেল না থাকায় অপরাধ বন্ধ না করার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে কমিটির একটি রিপোর্টে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, কর্ণাটক, উত্তরপ্রদেশ ও অন্ধ্রপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোতে মাত্র একটি বা দুটি সাইবার সেল স্থাপন করা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

ভারতে সাইবার ক্রাইম কমানোর জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি Indian Computer Emergency Response Team (CERT-In) দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এবং বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছে। বিভিন্ন ধরনের অনলাইন প্রতারণার ঘটনাগুলি খুব গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করছে এই সংস্থা। সমীক্ষা বলছে, ভারতীয়রাই সবচেয়ে বেশি সাইবার অপরাধের শিকার। এই দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশই সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। জানা গিয়েছে, পৃথিবীতে ৬৫ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীই সাইবার অপরাধের শিকার। সেখানে ভারতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই অপরাধের শিকার ৭৬ শতাংশ। তবে শুধু পুলিশের মাধ্যমে নয়, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন ব্যবহারকারীদের সতর্ক হতে হবে আগে। ভারতে সাইবার অপরাধ মোকাবিলা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এবছর জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে ৮২টি মামলা দায়ের হয়েছে সাইবার ক্রাইম সংক্রান্ত। সমীক্ষায় উঠে এসেছে আরও একটা বড় তথ্য। ভারতে একটি সাইবার অপরাধ সমাধানের জন্য যেখানে গড়ে ৪৪ দিন সময় লাগে, সেখানে অন্যান্য দেশে এই মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লাগে গড়ে মাত্র ২৮ দিন। সুতরাং লড়াইটা যে মোটেও সহজ নয়, তা বলাই বাহুল্য। লক্ষণীয় যে এখন ব্যাপকভাবে প্রসারিত সাইবার ক্রাইম কি মানব জাতির অস্তিত্বে প্রশ্ন করতে ভাবায় ?

Sunday, December 25, 2022

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২, কাতার


'কে লইবে মোর কার্য, কহে সন্ধ্যারবি। শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।
মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল, স্বামী, আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।'

চোখে ঘুম হারিয়ে মোবাইল,টিভির পর্দায় কিবা লুসাইলের দর্শক আসনে বসে ইতিহাসে স্বাক্ষী রইল ভারত তথা পুরো বিশ্বের ফুটবল প্রেমীরা। আর্জেন্টিনা ৩-ফ্রান্স ৩। একটা গোল যদি এমবাপে বা মেসির পা স্পর্শে বক্সে ঢুকে যায় আর লিখা হবে ইতিহাসে পাতা। রুদ্ধশ্বাস খেলা। টানটান উত্তেজনার অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত ছিল রেকর্ড জয়ের স্নায়ুবিক চাপ। গোলরক্ষক এমিলিও মার্তিনের দক্ষতায় ৩৬ বছর পর আবারও শিরোপা আসলো মেসির আর্জেন্টিনায়। লিওনেল মেসিদের বিশ্বকাপ জয়ে উচ্ছ্বাসের ঢেউ দোহা থেকে বুয়েন্স এইরেস হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা ফুটবলবিশ্বে। এবারের আগে আর্জেন্টিনা সবশেষ বিশ্বকাপ জিতেছিল মারাদোনার জাদুতেই। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে তার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স তাকে শুধু আর্জেন্টিনায় নয়, গোটা বিশ্বে করে তুলেছিল রূপকথার মহানায়ক। আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার দে পল খুশিতে, খুঁজে পাচ্ছেন না অনুভূতি ব্যাখ্যা করার ভাষা।'২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে তারা শিরোপা ঘরে তুলতে পেরে ম্যাচ শেষে তিনি বললেন, যোগ্য দল হিসেবেই জিতেছে আর্জেন্টিনা।'

কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের মাসকটের নাম ছিল লা-ইব। আরবি এ শব্দের অর্থ 'অত্যন্ত দক্ষ খেলোয়াড়'। যদিও লা-ইব দেখতে অনেকটা ক্যাসপার- দ্য ফ্রেন্ডলি-র ভুতের মতো। এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেয় ৩২টি দেশ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ধারা বর্ণনায় ছিলেন হলিউডের খ্যাতিমান অভিনেতা মরগ্যান ফ্রিম্যান। তার সাথে ছিলেন ২০ বছর বয়সী ঘানেম আল মুফতাহ। এক বিরল রোগের কারণে জন্ম থেকেই তার পা নেই। তাদের দুজনেই বক্তব্যে বিশ্ব ঐক্য ও সাম্যের কথা ফুটে। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চ কাঁপিয়েছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ব্যান্ড বিটিএসের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য জং কুক। এবারের বিশ্বকাপের থিম সং 'ড্রিমার্স' গানেই পারফর্ম করেন তিনি। তবে বিশ্বকাপ মানে মনেপড়ে শাকিরার 'ওয়াকা ওয়াকা' বা কান - এর 'ওয়েব ইন ফ্লেগ'-র কথা। দর্শকরা সত্যিকার অর্থে এইধরণের কিছু থেকে খুব মিস করছিলেন। কাতার বিশ্বকাপ উদ্বোধনীতে ছিল চোখ ধাঁধানো আলোর খেলা, ড্রামস পারফর্মেন্স, বর্ণিল আতশবাজির খেলা। তবে কাতারের মত ছোট একটি দেশ, যেখানে পেশাদারী ফুটবলের তেমন কোন ঐতিহ্য নেই, তারা কীভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার পেল, তা নিয়ে বিতর্কও তো কম হয়নি! একাধিক বিষয় নিয়ে বিতর্ক চলে কাতার বিশ্বকাপ ঘিরে।

২০১৪ ও ২০১৮ সালে ব্রাজিল ও রাশিয়া বিশ্বকাপ আয়োজনে ১৫ বিলিয়ন ডলারের কম খরচ হয়েছিল৷ ২০১০ সালে কাতারকে যখন ২০২২ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হয়, তখন সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়েছিল ৬৫ বিলিয়ন ডলার৷ কিন্তু দেখা গেল বিশ্বকাপ আয়োজন করার জন্য কাতার প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করা হয়! টাকার অঙ্কে কত হতে পারে? প্রায় ১৬ লক্ষ ৩৩ হাজার কোটি টাকার মতো । বিশ্বকাপের আয়োজনকে কেন্দ্র করে বারবার বিতর্কে জড়িয়েছে কাতার। কখনও LGBTQ নাগরিকদের স্বীকৃতি না দেওয়া আবার স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজে যুক্ত পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের ঘটনা, খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে কাতার প্রশাসন।মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত ১৫,০২১। এসব শ্রমিক ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার নাগরিক। মৃত্যুর এই সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে কাতারে এসব দেশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।তবে কি মৃত্যু উপত্যকায় চলছে আনন্দযজ্ঞ? কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে এমনই প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মিডিয়া। সাতটি স্টেডিয়াম-সহ নানা নির্মাণ কাজে ২০১০-২০ সময়কালে নাকি অন্তত সাড়ে ছ’হাজার অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে কাতারে। এর মধ্যে রয়েছেন ভারতের ২৭১১ জন, নেপালের ১৬৪১ জন, বাংলাদেশের ১০১৮ জন, শ্রীলঙ্কার ৫৫৭ জন।

নতুন বিতর্কের মধ্যে ছিল টিকিটের দাম। আগের সব রেকর্ডকে ছাপিয়ে গিয়েছে কাতার বিশ্বকাপের টিকিটের দাম। রাশিয়া বিশ্বকাপের থেকে গড়ে ৪০ শতাংশ বেশি এ বারের। ফাইনালের টিকিট কিনতে ফুটবলপ্রেমীদের ঘটি-বাটি বিক্রি করার উপক্রম। ফাইনালের টিকিটের দাম গড়ে ৬৮৪ পাউন্ড বা ৬৬ হাজার টাকার বেশি। ২০১৮ সালের ফাইনালের টিকিটের গড় দামের থেকে যা ৫৯ শতাংশ বেশি। রাশিয়া বিশ্বকাপে টিকিটের গড় দাম ছিল ২১৪ পাউন্ড বা প্রায় ২১ হাজার টাকা। এ বার তা বেড়ে হয়েছে ২৮৬ পাউন্ড বা প্রায় ২৮ হাজার টাকা। গত ২০ বছরে কোনও বিশ্বকাপের টিকিটের গড় দাম এত বেশি ছিল না।প্রকৃতপক্ষে বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক দেশ হিসেবে তেলসমৃদ্ধ ছোট দেশ কাতারকে বেছে নেওয়াটা একটি বড় রাজনৈতিক ঘটনা। যাইহোক অন্যদিকে না গিয়ে চলে আসা যাক মূল ট্রেকে।

কাতার বিশ্বকাপ প্রতিবাদের মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছেন একের পর এক ফুটবলার। বিতর্কও কম হচ্ছে না এই বিশ্বকাপকে ঘিরে। জার্মান সিনিয়র ফুটবল দল অভিনব পদ্ধতিতে কার্যত বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার (FIFA) বিরুদ্ধে 'বিদ্রোহ' ঘোষণা করলেন অ্যান্টনি রুডিগাররা। নাকে হাত দিয়ে নাক চেপে ফিফার বিরুদ্ধে অভিনব প্রতিবাদ দেখালেন তাঁরা। কাতারে সমকামীতা নিষিদ্ধ। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হয়েছে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, সুইডেন, নরওয়ে, এবং ওয়েলস। প্রতিবাদের অঙ্গ হিসেবে তারা একটি বিশেষ আর্মব্যান্ড তৈরি করে। যার নাম দেওয়া হয় ‘ওয়ান লাভ’ আর্মব্যান্ড। এই রামধনু রঙা এই ব্যান্ড পরেই মাঠে খেলতে নামার কথা ছিল এই দেশগুলোর ফুটবলারদের। কিন্তু বাঁধা দেয় ফিফা। তাই নাকে হাত দিয়ে নাক চেপে এক অভিনব প্রতিবাদ করে জার্মানরা।

খলিফা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘ই’-র ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল জাপান ও চার বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল জাপান। প্রতিটা খেলায় সাধারণ গ্যালারিতে সমর্থকরা খাবার খান, পানীয় পান করে থাকেন। সমর্থিত দলের খেলা দেখে গ্যালারি ছেড়ে চলে যান সমর্থকরা। আর গ্যালারিতে যত্রতত্র পড়ে থাকে জলের বোতল, খাবারের প্যাকেট। এদিন ম্যাচের শেষে জলের বোতল, খাবারের প্যাকেট পরিষ্কার করতে দেখা গেল জাপানের সমর্থকদের। যা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিমেষের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। বড় বড় নীল রঙের ডিসপোসাল ব্যাগ নিয়ে গ্যালারিতে যত্রতত্র পড়ে থাকে জলের বোতল, খাবারের প্যাকেট পরিষ্কার করেন। জাপানের সমর্থকদের পাশাপাশি ফুটবলাররাও ম্যাচের শেষে সুন্দর করে সাজঘর সাজিয়ে দেন। তবে জাপানি সমর্থকদের অভিনব সাফাই অভিযান মন জয় করে নেয় নেটিজেনদের।

নারীদের বেলা সব সময়েই দাবিয়ে রাখা পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা। তবে বিশ্বকাপ হলেই কি ? কাতার কি আর পিছিয়ে থাকতে পারে ? পোশাক পরিধান নিয়ে কাতার বিশ্বকাপে ছিল বেশ কড়াকড়ি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ মতে, কাতারে পা রাখা ভিনদেশি নারী সমর্থকদের বলা হচ্ছে, তারা যাতে খোলামেলা পোশাক না পরেন। মূলত কাঁধ ও হাঁটু ঢেকে রাখতে হবে। দর্শকদের কোনো বিশেষ পোশাক পরতে বলা হচ্ছে না। তারা নিজেদের পছন্দের পোশাকই পরতে পারেন। তবে খোলামেলা পোশাক পরা যাবে না। শুধু স্টেডিয়াম নয়, মিউজিয়াম ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরে গেলেও শরীর ঢাকা পোশাক পরতে হবে। তবে ব্যতিক্রম দেখা যায় ক্রোয়েশিয়ার এক মডেল কে দেখে। নিজের দলকে সমর্থন জানাতে কাতার বিশ্বকাপে দর্শক হয়ে এসেছেন ক্রোয়াট মডেল ইভানা নোল। তবে সেসব সমালোচনাকে মোটেই পাত্তা দেননি ইভানা। উল্টো দোহার সৈকতে বিকিনি পরে ঘুরাফেরায় দেখা যায় তাকে।

যদিও ৬-২ ব্যবধানে হেরেছে ইরান। তবে হেরে গিয়েও জিতে গেল তাঁরা। প্রতিবাদের ভাষা তো বিভিন্ন রকম হয়। চিৎকার করলেই সব সময় প্রতিবাদ হয় এমন নয়। নীরব থেকেও জানানো যায় প্রতিবাদের আগুন। সেটাই আজ প্রমাণ করল ইরান ফুটবল দল। মাঠের লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের কাছে বড় ব্যবধানে হেরে গেলেও মানবতার লড়াইয়ে বড় অঙ্গীকার রেখে গেল আমির নাসের,হোসেনি, তারেমিরা। দু’মাস আগে প্রতিবাদী মাহশা আমিনির মৃত্যুর পর থেকে ফুঁসছে ইরান। দেশে প্রতিবাদ থেমে যায়নি। প্রচুর মানুষের প্রাণ গেছে পুলিশের কাছে। তবুও ভয় পাইনি সাধারণ মানুষ। ইরানের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার সরদার আজমুন পর্যন্ত কিছুদিন আগে বিরাট প্রতিবাদ করেছিলেন সরকারের বিপক্ষে। এমনকি গুলি খেতেও রাজি ছিলেন। তাকে শেষ মুহূর্তের দলে রেখেছিল ইরান ফুটবল ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু অত্যন্ত নিন্দনীয় যা করেছে আমির নাসের কে মৃত্যদণ্ডের আদেশ দিয়ে। বিশ্বকাপে জাতীয় সংগীত গাইল না ইরান! ফুটবলে হেরেও জিতে গেল মানবতার যুদ্ধে। তবে এক্ষেত্রে মরক্কোও পিছিয়ে নেই।দীর্ঘ ৩৬ বছর পর, ২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশ মরক্কো। ১৯৮৬ -র মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল তারা। যদিও সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হারে। নিজেদের ধরে রেখেছে চতুর্থ স্থানে। কাতার বিশ্বকাপে স্পেনকে হারিয়ে প্যালেস্টাইনের পতাকা (Palestine Flag) নিয়ে ‌সেলিব্রেশন করে হাকিমি–জিয়েচরা। এর অর্থ হল বিশ্বের সামনে ইজরায়েলের আগ্রাসন থেকে প্যালেস্টাইনের মুক্তির দাবি।

প্রগতিশীল শিক্ষা আমাদেরকে খোলামেলা চিন্তা করতে শেখায়, ব্যক্তিস্বাধীনতা সম্পর্কে শেখায় এবং মানুষের পাশাপাশি সমস্ত প্রাণীকে ভালবাসতে শেখায়। সমাজের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে ভালোবাসতে শেখায়। আশ্চর্যের বিষয় এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ। বিবাহ বহির্ভুত কাপোল নাকি বিশ্বকাপ সময়ে কাতারে যেতে পারবে না। গেলে জরিমানা বা জেল। পাশ্চাত্যে বিবাহ প্রথা কম। বিবাহ ছাড়াই দু'জন হয়তো সারা জীবন ঘর সংসার করে, সন্তান সন্ততি নিয়ে সুখে থাকে। সেসব পশ্চিমা কাপোল তাহলে কাতার যেতে পারবে না! দুজন পুরুষ বা দু'জন নারী একসাথে গিয়ে খেলা উপভোগ করলে, এক কক্ষে থাকলে সন্দেহ করা হবে তারা সমকামি কি না। সমকামি হলে শাস্তি। ২১ বছরের নীচে হোটেল বারে মদ খেলে ৩০০০ দিনার জরিমানা বা ৬ মাসের জেল। সি-বীচে বিকিনি পড়া নিষেধ। পুরুষরাও খালি গায়ে রাস্তায় বের হতে পারবে না। কাতারে ছিল LGBTQ র উপর, নারীদের পোশাকের উপর নিষেধাজ্ঞা যেমন নিয়ম কানুনের জতুগৃহে আটকে পড়েছিল এবারের বিশ্বকাপ। অনেক সময় মনে হতো বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের কি প্রয়োজন ছিল ধর্মীয় জলসার আয়োজন করলেই পারতো ! 

কাতার বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক ও বিজ্ঞাপনী চুক্তিগুলো থেকে রেকর্ড সাড়ে সাতশো কোটি ডলার আয় করেছে ফিফা। ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও ট্র্যাজিক হিরোই হয়ে রইলেন কিলিয়ান এমবাপে। চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা রানার্স আপ ফ্রান্স, তৃতীয় স্হান ক্রোয়েশিয়া,গোল্ডেন বল মেসি( আর্জেন্টিনা), গোল্ডেন বুট এমবাপে (ফ্রান্স) ,গোল্ডেন গ্লাভস মার্টিনেজ (আর্জেন্টিনা),তরুন সেরা ফুটবলার ফার্নান্দেজ (আর্জেন্টিনা)। ২০২৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসতে যাচ্ছএ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে । ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দিয়েগো ম্যারাডোনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে, দোহায় ছাদখোলা বাসে ট্রফি নিয়ে উদযাপন মেসিদের। ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে লুসাইলকে স্মরণীয় করে রাখলো আলবিসেলেস্তেরা।১৯৩০ সালে শুরু হওয়া ফিফা বিশ্বকাপের ২২তম আসরের আয়োজক দেশ কাতার। কাতারের আয়োজক হওয়া নিয়ে আলোচনা যেমন ছিল, ছিল নানামুখী সমালোচনাও।অনেকটা ইসলামী বিধিনিষেধের উর্ধ্বে গিয়ে কাজ করেছে কাতার। এটাও কম বড় কথা নয়। তবে সব কিছু ছাপিয়ে ইতিহাসের অন্যতম সফল এক বিশ্বকাপ শেষ করে মরুর এই দেশটি। সবার মনে থাকবে কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ (Qatar World Cup 2022)।

Friday, December 16, 2022

গৃহবধূ আত্মহত্যা : বিবাহ সংক্রান্ত সমস্যা


আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘সেইডেয়ার’ থেকে ।সুইসাইড বা আত্মহত্যা আজ আর কারো কাছে অপরিচিত নয়। হয়তো এমন কোনো দিন খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হবে যেদিন দেশের কোথাও না কোথাও আত্মহত্যা ঘটেনি। পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট, ফেসবুক, টিভি অন করলেই কোনো না কোনো আত্মহত্যার খবর সামনে ভেসেই আসে। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো আত্মহত্যার নৈতিকতার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করেছেন। তিনি মনে করেছেন, যখন কেউ রাষ্ট্রীয় আইনে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত হন অথবা দুর্ভাগ্যবশত জীবন ধারণে অপারগ হন অথবা অপ্রত্যাশিত অপমানে জর্জরিত হন তখন তার আত্মহত্যা করা অনৈতিক নয়। অনৈতিক হয় না। একটি সূত্রমতে, গোটা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৮ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে থাকেন। তার মানে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ১ জন করে আত্মহননের পথ বেছে নেন। এই সংখ্যার মধ্যে ভারতেই ২০২১-এ আত্মহত্যার কারণে মৃত্যু হয়েছে ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৩৩ জনের। এমনই তথ্য উঠে এসেছে ‘ন্যাশনাল ক্রাইম স্টেশন ব্যুরো’-র সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে। এনসিবি-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে প্রতি ১০ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে ১২০ জনের মৃত্যুর কারণই হল আত্মহত্যা।

আমাদের সমাজে আত্মহত্যা যেকোনো ঘাতক ব্যাধি থেকে অধিক দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং ইহা সমাজ তথা দেশকেও রাখছে সর্বক্ষণ ভীতির মুখে। বর্তমানে যেকোনো বয়সের মানুষই আত্মহত্যা নামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বিয়ে নামক দাসপ্রথায় আবদ্ধ হয়ে সম্প্রতি বাড়ছে গৃহবধূ আত্মহত্যা। বিবাহিত মেয়েদের আত্মহত্যার ক্ষেত্রে পরিবার কিংবা স্বামীর ইন্ধন দেখা যায়। নারীর ক্ষেত্রে অধিকাংশই ইভ টিজিং, যৌতুকের চাপ, অভাব, হতাশা, পারিবারিক কিংবা সামাজিক নির্যাতনের মতো ঘটনায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। একজন নারী বিয়ের পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দৈনন্দিন জীবন সংসারে প্রাত্যহিকতার বেড়াজালে আটকে পড়েন। মন খুলে কথা বলার বা কথা শোনার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার যেহেতু অভাব রয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি নারীকে যে নানা ধরণের মানসিক নিগ্রহের শিকার হতে হয়, তার একটি বড় অংশ হয় নেতিবাচক নানা শব্দের মাধ্যমে। কোন ঝগড়া বিবাদে নারী বিভিন্ন ধরনের মৌখিক সহিংসতার শিকার হয়।  খেয়াল করেছি হয়তো, আমাদের আশপাশে প্রচলিত বেশিরভাগ গালিগালাজ এর সাথে স্ত্রী লিঙ্গের সম্পর্ক রয়েছে। অনেক তিরস্কারমূলক শব্দের মধ্যে পুরুষবাচক তো কোন শব্দই নেই।

নারীরা আসলে খুব সহনশীল, কিন্তু সহ্যেরও একটা সীমা রয়েছে। বেশিরভাগ মেয়েরই ১৮ বছর হবার সাথে সাথেই বিয়ে হয়ে যায়, যেটা বিয়ের আইনগত বয়স বা এর থেকে কমবয়সী মেয়েদেরকে পরিয়ে দেয়া হয় বিয়ের শিকলে। সে স্ত্রী এবং পুত্রবধূ হয়ে শ্বশুর ঘরে যায় আর তার গোটা সময়টা কাটায় ঘরের চার দেয়ালের মাঝে - রান্না, ধোয়ামোছা আর ঘর গৃহস্থালির নানা কাজে। বিয়ে প্রথায় লোভী পুরুষ মানসিকভাবে নির্যাতন করে স্ত্রী কে, তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ পর যাতে সামাজিকভাবে আবার দ্বিতীয়, তৃতীয় বা তার অধিক নারীর কাছ থেকে পেতে পারে সে চরম সুখ। তার ওপর আবার চাপিয়ে দেয়া হয় নানা ধরনের বিধিনিষেধ। ব্যক্তি স্বাধীনতা বলতে তার কিছুই প্রায় থাকে না। থাকে না আর্থিক স্বাধীনতাও - নিজস্ব অর্থ বলতে তার হাত থাকে প্রায় শূন্য। তার শিক্ষা বা ভবিষ্যতের স্বপ্ন সব কিছু তাকে বিসর্জন দিতে হয়। তার আশা আকাঙ্ক্ষার ধীরে ধীরে অপমৃত্যু শুরু হয়। ফলে হতাশা আর ব্যর্থতার গ্লানি তাকে গ্রাস করতে শুরু করে। তখন তার কাছে শুধু জীবনধারণ একটা যন্ত্রণার মত মনে হয়।

আমাদের সমাজে আত্মহত্যাকে ধর্মীয় দৃষ্টিতে পাপ হিসেবে দেখা হয়। ফলে কেউ নির্যাতন, নিপীড়ন ও অবহেলার শিকার হয়ে যদিও বা বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ, ধর্মীয় কারণে তার অন্তুষ্টিক্রিয়ায় ও দেয়া হয় নানা ধরনের ফতুয়া। আত্মহত্যার কারণ যতই সংবেদনশীল হোক না কেন এক্ষেত্রে। আত্মহত্যার পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। সহজে একজন মানুষ তার নিজ জীবনের পরিসমাপ্তি চায় না। যে কোনোভাবে বেঁচে থাকার আকাঙ্খাই প্রবল এবং বড় সত্য মানবজীবনে।

ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ভারতে গত বছর ২২ হাজার ৩৭২ জন গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ ভারতীয় গৃহবধূদের মধ্যে আত্মহত্যার হার প্রতিদিন গড়ে ৬১ আর মিনিটের হিসাাবে প্রতি ২৫ মিনিটে একজন। ২০২০ সালে মোট এক লক্ষ ৫৩ হাজার ৫২ টি আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে - তার মধ্যে ১৪.৬% ক্ষেত্রেই আত্মহত্যা করেছেন গৃহবধূরা। আর মোট আত্মহত্যার ৫০ শতাংশেরও বেশি ঘটনায় গৃহবধূরাই আত্মহননের পথে গেছেন।১৯৯৭ সালে আত্মহত্যার পরিসংখ্যান সংকলন করতে শুরু করে এবং সেটা তারা করে পেশার ভিত্তিতে। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে ভারতে প্রতিবছর বিশ হাজারের বেশি গৃহবধূ আত্মহত্যা করছেন। ২০০৯ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছিল ২৫ হাজার ৯২। বিগত ৫ বছরে ১৩৫৩০ জনের আত্মহত্যায় উত্তরপূর্বে শীর্ষে আসাম,দেশে শীর্ষে মহারাষ্ট্র (৯৬৬৫০)
-কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ দপ্তর। রিপোর্টে এধরনের আত্মহত্যার জন্য সবসময়ই দায়ী করা হয়েছে "পারিবারিক সমস্যা" অথবা "বিবাহ সংক্রান্ত সমস্যাকে"। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ ব্যাপক মাত্রার পারিবারিক সহিংসতা। সরকার পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে অংশ নেয়া নারীদের ৩০% বলেছেন, তারা স্বামীদের হাতে নিগ্রহ ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। সেইসাথে প্রতিদিন জীবনের ঘানি টানা আর সংসারের প্রাত্যহিক শ্রম তাদের দাম্পত্য জীবনকে কঠিন করে তুলছে, সংসারে তাদের জন্য দমবন্ধ করা অবস্থা তৈরি হচ্ছে।

চলমান পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে জীবন কাটানোর পরেও অনেক নারী যে তাদের মাথা ঠিক রেখে জীবন চালাতে পারছেন, তার একটা বড় কারণ হল তাদের পেছনে ব্যক্তিগত সাহায্য সমর্থনের অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ।আত্মহত্যার এই সামাজিক ব্যাধি শতভাগ নির্মূল করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। মানুষ হিসেবে নিজেকে জানতে হবে। সামাজিক দায়িত্ববোধ, পারিবারিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক অনুশাসনগুলো যথার্থভাবে মেনে চললেই অনেকাংশে এটা রোধ করা সম্ভব। মানুষ হিসেবে কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, যদি উপলব্ধি করেন সমাজ প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য, তবে তার পক্ষে আত্মহত্যা সম্ভব নয়। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা সাধারণত দুইধরনের।ইমপালসিভ (হঠাৎ আত্মহত্যা) এবং ডিসিসিভ (সিদ্ধান্ত নিয়ে বা পূর্বপরিকল্পিত)। তবে ডিসিসিভ আত্মহত্যাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য। আত্মহত্যা হুট করে হয় না। অনেক পরিকল্পনা করে এগোতে হয়। এ সময় আশপাশের মানুষ যদি একটু খেয়াল করেন তাহলে তারা সমস্যাগুলো বুঝতে পারেন। এ অবস্থায় যদি তারা উদ্যোগী হয় তাহলে বিষয়টি তখন পারিবারিকভাবে সমাধানে এগিয়ে মীমাংসা করা সম্ভব হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, গৃহবধূদের বাবা-মায়েরা তখন এই বিষয়ে বেখেয়ালে থাকেন, আবার কখনো কখনো নিজেরাই মেয়ের মনকে বিষিয়ে তোলেন। এভাবে তারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে শেষে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা নিতে ছুটে যান।

আত্মহত্যার বিষয়টি নিয়ে সমাজে খোলাখুলিভাবে কথা বলা হয় না। বিষয়টি এখনও গোপন রাখার প্রবণতা দেখা যায়, কারণ আত্মহত্যাকে পরিবারের জন্য লজ্জার বিষয় হিসাবে অনেকে দেখেন। গ্রাম এলাকায় ময়না তদন্তের প্রয়োজন থাকে না এবং অপেক্ষাকৃত ধনী পরিবারগুলো বিভিন্ন পন্থা অবলম্বনে আত্মহত্যাকে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হিসাবে নথিভুক্ত করায়। অনেক সময় প্রশাসনের নথিও যাচাই করা হয় না।এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের অনেক ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। যৌতুক, গৃহনির্যাতন, বহুবিবাহ সম্পর্কিত খবর ও এগুলোর কুফলের পাশাপাশি আত্মহত্যার পথে না গিয়ে বিকল্প পথে জীবন গঠনের উপায় নিয়ে বেশি বেশি সংবাদ প্রকাশিত হওয়া দরকার। তাহলে তা এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারবে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আত্মহত্যার প্রবণতা কমিয়ে আনতে শিশুকাল থেকেই মা-বাবার আন্তরিক আচরণ বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। আত্মহত্যার পেছনে যেসব কারণ দায়ী এসব চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে এর প্রবণতা বাড়তেই থাকবে।বিগত দিনে গৃহবধূ আত্মহত্যার কারণগুলো দর্শীয়ে, প্রত্যেক প্লেটফোর্মে, সামাজিক মাধ্যম, গণমাধ্যমের সাহায্যে মনোবিজ্ঞানী বিশেষজ্ঞ দ্বারা সচেতনতামূলক কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কলেজ, ইউনিভার্সিটি লেভেলে কোর্স কারিকুলামে এই ধরণের বিষয় ইনক্লুড করা। যাতে পরবর্তীতে একজন নারী সহজেই সংযত রাখতে পারে, মানসিক ভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে,বিয়ে নামক দাসপ্রথার বিরুদ্ধে লড়তে পারে। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবাইকে সজাগ, সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে, সকলকে সচেতন করতে হবে।

Thursday, December 15, 2022

ইরান ফুটবলারের মৃত্যুদণ্ড প্রসঙ্গে


ইরান পুঁজিবাদ অনুসারী দেশ।নারী–পুরুষ–ছাত্র–যুব নির্বিশেষে সমাজের সমস্ত অংশের ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণে এই গণআন্দোলনের শক্তি এতটাই বেড়েছে যে তা ক্ষমতাসীন মৌলবাদী–ফ্যাসিবাদী শাসকের চোখে চোখ রেখে অত্যাচারী জমানা বদলের আওয়াজ তুলছে৷ রাষ্ট্রের দমনপীড়নে ইতিমধ্যেই চারশোর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে৷আজ ইরানে যা চলছে তা হলো প্রগতিশীলতার বধ্যভূমি প্রস্তুত করা। এটা কি কোন সভ্য দেশের কাজ ? ধুর। একজন কে মৃত্যু দণ্ড দিলেই কি আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে ? একসময় শাহ র আমলে হিজাব বা বোরখা পুরো নিষিদ্ধ ছিল ১৯৮৯ ধর্মীয় অন্ধকার কে পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয়।

একটা পুঁজিবাদী দেশে ধর্মীয় বিধিনিষেধ দিয়ে অন্ধকারে ঠেলে দেয়া কতটা আক্রমণাত্মক তা ইরানকে দেখলেই বুঝা যায়। কারণ ভীতি প্রদর্শন করে মালাই খাওয়া দস্তুর। আসলে এটা শুধু ইরানে না, ধর্মীয় অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে প্রগতিশীলতা পিছনে ফেলে দেয়া হয়। কাতার বিশ্বকাপে মরক্কো কে তো দেখেছিই। আশরাফ হাকিমিরা ধর্মীয় গেড়াকল থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে নতুন আঙ্গিকে সাজিয়ে তুলেছে বিশ্বদরবারে। আসলে ইরান আমেরিকাকে ফলো করেই ধর্মীয় অন্ধকার আবার ফিরিয়ে এনেছে। ধর্মের নামে রাজনীতি এটা তো আবহমান কালের প্রচলিত ধারা।

রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর 'রামরাজ্য ও মার্ক্সবাদ' বইয়ে লিখছেন 'বিবর্তন বাদ ধর্মের মূলে এমন আঘাত করে যে তার ভিত্তিই নড়ে ওঠে। নিজের নিন্দনীয় পুঁজিবাদী সমাজ বহাল রাখার জন্য ধর্ম ও ঈশ্বরের সবথেকে বড় পৃষ্ঠপোষক আমেরিকা এজন্যই তাদের বেশ কিছু --বিশ্ব বিদ্যালয় গুলোতে বিবর্তনবাদ বিষয়ক পঠন-পাঠন ও আলোচনা বন্ধ করে দিয়েছে ।' (পৃঃ ৫৭)

জার্মান সংবাদপত্র ‘আনজেরে জাইট’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘তুদে পার্টি’র আন্তর্জাতিক মুখপাত্র মহম্মদ ওমিদভার জানাচ্ছেন, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইরানে ৪০ শতাংশের বেশি জনগণ দারিদ্র সীমার নিচে৷ বেকারত্ব ভয়াবহ, কোনও কোনও প্রদেশে তা ৭০ শতাংশের বেশি৷ এর সঙ্গে জুড়ে আছে শাসকদের সীমাহীন দুর্নীতি৷ আর চলছে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের নির্মম দলন৷ সৌদি আরবের শাসকরা এবং আফগানিস্তানের তালিবানরা মহিলাদের উপর যে ধরনের ফতোয়া জারি করেছে, ইরানেও তাই৷ মানুষ হিসাবে যে বুনিয়াদি অধিকার থাকা উচিত, তার কিছুই ইরানের মহিলাদের নেই৷ এমনকী তার নিজের শরীরের উপর নিজের অধিরকারটুকুও নেই৷

ইরান ধর্মীয় মৌলবাদীদের দ্বারা শাসিত একটি পুঁজিবাদী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র৷ এ যে কী দুঃশাসন ইরানের জনগণ বিশেষ করে মহিলারা তা উপলব্ধি করছেন জীবন দিয়ে৷ মৌলবাদী শাসকরা মেয়েদের বিয়ের বয়স ধার্য করেছিল ৯ বছর৷ জনগণের প্রবল প্রতিবাদের সামনে পড়ে ২০০২ সালে পার্লামেন্ট মেয়েদের বিয়ের বয়স বাড়িয়ে করে ১৩ বছর৷ অধিকারের প্রশ্নে নারী–পুরুষের বৈষম্য ব্যাপক৷ পুরুষেরা মুখে তালাক বললেই বিবাহ–বিচ্ছেদ হয়ে যায়৷ কিন্তু নারী বিবাহ বিচ্ছেদ চাইলে তাকে যেতে হবে কোর্টে৷ একজন বিবাহিত মহিলা বিদেশে যাওয়ার পাসপোর্ট পাবে না, যদি না স্বামী লিখিত অনুমতি দেয়৷ সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক বৈষম্য৷ স্বামী মারা গেলে তার সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার নগণ্য, মাত্র সাড়ে ১২ শতাংশ৷ কিন্তু স্ত্রী মারা গেলে, তার সম্পত্তি পুরোটাই পাবে স্বামী৷ পৈত্রিক সম্পত্তিতে মেয়ের ভাগ ছেলেদের অর্ধেক৷ বিচারবিভাগে মেয়েদের চাকরির কোনও অধিকার নেই৷ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও মেয়েদের দাঁড়ানো নিষিদ্ধ৷ কোনও কোনও ধর্মীয় নেতা এমনও বাণী দিচ্ছে যে মহিলাদের মস্তিষ্কের শক্তি পুরুষের অর্ধেক৷ সব মৌলবাদের বহিরঙ্গে পার্থক্য যাই থাক, মর্মবস্তুতে এরা এক৷ এদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রগতির পথে প্রতিবন্ধক৷

ইরান আদালতের মতে, ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে শত্রুতা’। সম্পূর্ণ নির্বোধতা আর কাপুরুষতা। মূল কথা হলো আমির নাসের আজদানির মৃত্যুদণ্ড,নিন্দনীয় এবং কুপমূন্ডকতা ছাড়া কিছু নয়। সবশেষে পুঁজিবাদ ও ধর্মীয় অন্ধকার নিপাত যাক।

Tuesday, December 13, 2022

বিতর্কিত দেওয়াল লিখন জেএনইউ-তে


আবারও বিতর্ক ঘিরে দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় জেএনইউ ( Jawahar Lal Nehru University) । এবারের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে কোন অজ্ঞাত পক্ষের দ্বারা দেয়াল লিখন হয় --- ক্যাম্পাসের ভেতরে স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের দেওয়ালে কারা যেন লাল কালিতে লিখে রাখল ফতোয়ার ঢং-এ একাধিক বিতর্কিত বার্তা। কোথাও লেখা হয়েছে ‘ব্রাহ্মণরা ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাও’, কোথাও লেখা ‘বানিয়ারা (বৈশ্য) দূর হটো’, কোথাও বা ‘শাখায় (সংঘ) ফিরে যাও’, ‘আমরা বদলা নিতে আসছি’ ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে একটি বিবৃতি জারি করা হয়েছে৷ 

অজ্ঞাতনামাদের কুকীর্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের দেওয়াল ব্রাহ্মণ তথা বৈশ্যবাদের বিরুদ্ধে স্লোগানে ভরে উঠল। রীতিমতো শাসানি দিয়ে বলা হল ‘ব্রাহ্মণরা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাও’, ‘ব্রাহ্মণ ভারত ছাড়ো’ আবার কোনওটিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখা রয়েছে, ‘এখানে রক্ত ঝরবে’, ‘ব্রাহ্মণ-বৈশ্য, আমরা তোমাদের জন্য আসছি। আমরা সংখ্যায় বেশি রয়েছি।’ ইতিমধ্যে এই ঘটনা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিনীত জিন্দাল দিল্লি পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন। এই মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনত দণ্ডবিধির ধারা ১৫৩এ/বি, ৫০৫, ৫০৬, ৩৪ এর অধীনে মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে বলে দিল্লি পুলিশের দাবি।

এমনিতেই দেশের প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জেএনইউ বা জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ডান ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের মধ্যে কথায় কথায় হরদম সংঘাত সেখানে রোজকার বিষয়। গেরুয়া শিবিরের তরফে জেএনইউ-র বামমনস্ক ছাত্র সংগঠনের পড়ুয়াদের কখনো ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’, কখনও ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে। কেন্দ্রীয় শাসক দলীয় শিবিরের কাছে আজও জেএনইউ পঠনপাঠনের পীঠস্থান নয়, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদের আঁতুরঘর’ বলে চিহ্নিত করা হয়। জেএনইউ দেয়াল লিখন কোন নতুন বিষয় নয়। সময়ে সময়ে অনেক রাজনৈতিক বিতর্কে বেশ চর্চায় রয়েছে। কিন্তু এবারের বিতর্কের ঝড় বেশ তাৎপর্য বহন করছে। বিশেষ করে দুটো সম্প্রদায়কে কোন অজ্ঞাত পক্ষ আক্রমণ করার জন্য বেছে নিয়েছে। তবে এবারের বিষয় ব্রাহ্মণ ও বানিয়া সমাজে আক্রমণ করায় এর তীব্র প্রতিক্রিয়া সংবাদ শিরোনাম দখল করেছে।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে চলা বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচন তথা আগামী লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ধরণের স্পর্শকাতর বিষয় উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে করা হয়েছে বলে বুদ্ধিজীবী মহলে সরগোল চলছে। যদিও এই ধরণের ইস্যুর বাস্তব ভিত্তি নেই, তদুপরি একটা জাতিয়তাবাদী বিষয় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এনে একে অপরের সাথে সংঘাত বাঁধানো কি কোন সংকীর্ণতার কাজ নয় ? মানে, দেয়াল লিখন দিয়ে কি বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে ?

আচ্ছা, বিশ্লেষণের সুবিধার্থে ব্রাহ্মণ-বানিয়া (বৈশ্য) বিরোধী শ্লোগান লিখা পক্ষকে যদি বামপন্থা বা দলিত সংগঠনের বিচারধারার মানুষ ধরে নেয়া হয়, তবে এই ধরণের শ্লোগান লেখার পেছনে লুকিয়ে আছে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমির সাথে বর্তমান উচ্চবর্ণের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মানসিকতা এবং বিশেষ করে সংবিধানের ১০৩ নং সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চবর্ণের আর্থিকভাবে দুর্বলদের দেয়া ১০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চিন্তা বা নির্বাচনে দলিত বামপন্থী এবং অন্য শ্রেণীর ব্যাক্তিকে বিজেপির বিরুদ্ধে একজোট করার চিন্তা। যেখানে তাদের বিচারধারা দরশায় জাত-পাত, উচ্চ - নীচের বিভাজনে ব্রাহ্মণ্যবাদের নামে ব্রাহ্মণ বানিয়া শ্রেণী শৈক্ষিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বা আরও বিভিন্ন দিকে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরও দলিত ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণী থেকে বহুগুণ অগ্রসর হয়ে আছে তা বিভিন্ন প্রতিবেদনে লক্ষিত। তবু বামপন্থী বা দলিত বিচারধারার কারোর দ্বারা যদি এইধরণের দেয়াল লিখন হয় তবে এটা জাতিগত আক্রমণ। এইধরণের সংকীর্ণ মানসিকতা এবং কাজ নিন্দনীয়।

অপরদিকে, এই দেয়াল লিখনের কাজ যদি এবিভিপি বা বিজেপি সমর্থিত কারো কাজ হয়ে থাকে, ধরে নেয়া হয়, তবে একটা অযৌক্তিক বিষয় নির্বাচনে ইস্যু বানিয়ে উচ্চবর্ণের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা বা জেএনইউ-র বামপন্থী বা দলিত গতিবিধি সাম্প্রদায়িকতা ছড়াচ্ছে দেখিয়ে দেশের জনগণকে বামপন্থী বা বিজেপি বিরোধী সমর্থন থেকে নিজেদের দিকে টেনে আনার অভিপ্রায়। অথবা দেশে জাতিবাদ বা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। যদি এবিভিপি বা এই ধরনের কারো দ্বারা এই দেয়াল লিখন হয় তবে এটাও নিন্দনীয়।

এখন কথা হলো এই দেয়াল লিখন কি কোন বামপন্থী- দলিত বা এবিভিপি ছাড়া কোন তৃতীয় পক্ষের ষড়যন্ত্র। এইধরণের বিভেদমূলক মন্তব্য কারা করেছে, নিশ্চয় রাতের অন্ধকারে লিখা দেয়াল লিখন দিনের আলোয় উদ্ভাসিত হবে। কিন্তু নীরব দর্শক গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা থেকে এই আশা করতে পারে কি একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সঠিক তথ্য সিনাক্তকরণ হবে ?

আসলে এইধরণের ঘটনা কোন রাজনৈতিক মুনাফা না দেশহীতের কাজে ঠিক কোনটা তা স্পষ্ট ফুটে উঠছে না। এইধরণের বিভেদকামী বিষয় নিয়ে ভারতবর্ষে শান্তি সম্প্রীতি বিনষ্ট করে কোনভাবেই 'জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন' নেয়া সম্ভব নয়। যেকোন উন্নয়নশীল দেশ বিকাশ ও উন্নয়নে তাদের ফোকাস সেখানে ধর্মীয় মেরুকরণ, জাতীবাদ, নারী নির্যাতন, সাম্প্রদায়িকতা বাদ দিয়ে মননশীল প্রগতির পথে। তাই বিকাশ ও উন্নয়ন হোক প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। দল - পন্থা নির্বিশেষে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংগঠন এক গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল কাজে দেশের উন্নয়নে দূরদর্শী এবং দায়িত্বশীল হওয়ার সময় এখনই।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...