Sunday, January 1, 2023

সাইবার ক্রাইম : মানব জাতির অস্তিত্বে প্রশ্ন ?


১।
তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে সাইবার অপরাধ ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাসের মতো। সাম্প্রতিককালে সমগ্র বিশ্ববাসী সাইবার অপরাধের বৰ্ধিত দুঃশ্চিন্তায় আক্রান্ত। প্রতিনিয়ত বড় বড় সাইবার অপরাধের পরও দেশের কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষিত-দক্ষ জনবল ও সচেতনতার অভাবেই সাইবার অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। কম্পিউটার এবং ইণ্টারনেটের উপরে মানুষের নিৰ্ভরশীলতা যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, একইভাবে তৎপর হয়ে উঠছে সাইবার অপরাধীর চক্রসমূহ। সাইবার সংক্রান্ত সরকারের বিরুদ্ধে অপরাধ কে বলা হয় সাইবার টেররিজম (Cyberterrorism)বলে। সাইবার পর্নোগ্রাফি, সাইবার স্টকিং, সাইবার ডিফেমেশনের মতো ইত্যাদি ঘটনা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘটা অপরাধের তালিকায় পরে। অনলাইনে জুয়া, ফিশিং, কপিরাইট উল্লঙ্ঘণ, ক্রেডিট কার্ড ফ্রডের মতো ঘটনা পড়ে সম্পত্তি সংক্রান্ত সাইবার ক্রাইমের আওতায়।

ভারতে সাইবার অপরাধে দায়ের করা অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২০ সালে সাইবার অপরাধসংক্রান্ত মামলা ১১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সৰ্বসাধারণের মস্তিষ্কগত চিন্তার অগোচরেই কিছু সূক্ষ্ম কাজ দ্বারা এই অপরাধ সম্ভবপর হয়। কিছুসংখ্যক এই শ্ৰেণীর অপরাধীদের কম্পিউটার এবং ইণ্টারনেটের অসাধু ব্যবহারই ধীরে ধীরে এর উৎপত্তি। তাঁরা এই জ্ঞান কল্যাণমূলক কাজে প্ৰয়োগ করে সমাজ উত্তরণে মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু তা না করে নিজ বিদ্যা-বুদ্ধি ট্রেপের গেড়াকলে খাটিয়ে গোটা বিশ্বব্যাপি সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে। 

বর্তমানে সাইবার অপরাধ সারা বিশ্বে অপরাধ তালিকার শীর্ষে রয়েছে। সম্প্রতি দ্য ইকোনমিস্টের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায় যে, বার্ষিক ৯০ মিলিয়ন সাইবার হামলায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫৭৫ বিলিয়ন ডলারের সমান। নিত্যনতুন সাইবার অপরাধের কৌশলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাইবার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যবসাও বেড়ে চলেছে। ব্যাংক অব আমেরিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সাল নাগাদ এটি ১৭০ বিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হয়েছে। এই অপরধী চক্ৰসমূহকে 'হেকার' (Hacker) নামে সাধারণত আমরা জানি। ইংরেজী Hack শব্দের অৰ্থ হচ্ছে অন্যের কম্পিউটার থেকে অবৈধভাবে তথ্য আহরণ করা, অর্থাৎ তথ্য চুরি করা। এই অসাধু কাৰ্য অতি ক্ষুদ্ৰ স্তর থেকে বৃহত্তম স্তরে ঘটতে পারে। সেজন্য একজন হেকার সাইবার অপরাধী। অবশ্য তাদের মধ্যেও মাত্ৰার ব্যাপক তারতম্য আছে। পুতুল চোর থেকে হাতি চোর পর্যন্ত সকল স্তরের হেকার বৰ্তমান সময়ে নিরিহ জনসাধারণের নিদ্ৰাহরণ করছে। সঙ্গে সাইবার অপরাধের মাত্ৰা হ্ৰাস করতে কর্তৃ পক্ষসমূহও নানান প্ৰতিরোধমূলক ব্যবস্থা উদ্ভাবন তথা অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যদি গাছের শাখায় শাখায় অনুসন্ধান করে , তো হেকার পাতায় পাতায়। সাধারণ হেকারের চোখ যদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বেংক একাউন্টের উপর থাকে। কিন্তু তার বিপরীতে হাতিচোররূপী হেকার-চক্ৰ একটি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করে তুলতে পারে।

ছোট্ট পরিসরে যে হেকারগুলো আছে এদের কবলে একবারও পড়েন নাই সম্ভবতঃ এমন খুব কম সংখ্যক মানুষ আছেন। সাইবার অপরাধী চক্র সাধারণ মানুষকে অতি সহজেই প্ৰবঞ্চনায় ফেলে। প্রবঞ্চনায় ফেলতে নানা ধরনের ট্রেপ তৈরি করে। এই জালে ফেলতে এই হেকার সাধারণ মানুষকে নানা প্রলোভন দেখায়। তারপর একবার ঠগা খেয়ে অনেকের চোখ খুলে। সজাগতা সকল সমস্যার শেষ সমাধান নয়। সাধারণ মানুষকে লুট করার না না কৌশল উদ্ভাবনে একজন সাইবার অপরাধীর প্ৰচুর সময় এবং মেধা ব্যয় করতে হয়। ফলে সাইবার অপরাধ রোধে কর্তৃপক্ষসমূহও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। পাসওয়ার্ড’, ’অ টি পি ইত্যাদি পদ্ধতিসমূহ প্রারম্ভে প্ৰচলিত থাকা সত্ত্বেও হেকারের হাতে বহু মানুষ প্ৰবঞ্চিত হয়েছেন। অনেক মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে যাওয়ার খবরও শোনা যায়। ক্ষুদ্র পরিসরের এই সাইবার ক্রাইম রোধ করতে প্রসাশনের সাইবার শাখা রয়েছে সত্য। কিন্তু এইসব অপরাধীদের ধরতে কতটা সফল হয়েছে তা সন্দেহের বিষয়। সমীক্ষায় দেখা যায় প্রায় নিরানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে এই অপরাধের বলি হওয়া সাধারণ মানুষ সুবিচার পায় না। প্রশাসন নিয়ম মাফিক অভিযোগ গ্রহণ করেন ঠিকই কিন্তু অপরাধী ধরার দৃষ্টান্ত খুব বিরল।

২।
এখন কথা হলো, সাইবার অপরাধীদের এইসব দৌরাত্ম্য অব্যাহত থাকলে সমগ্র ইন্টারনেট ব্যবস্থার উপরে জনগণ আস্থা রাখবে না। যার ফলে গ্রাহকদের সাথে সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। লক্ষণীয় যে, দেশের বেংকিং সিস্টেম ইতিমধ্যে একশো শতাংশ কম্পিউটার - ইন্টারনেট নির্ভর এবং এর নির্ভরযোগ্যতা অটুট রাখা বেংক কতৃপক্ষের অতি প্রয়োজনীয়। যদিও বেংকের তরফ থেকে গ্রাহকদের শতর্কতামূলক বার্তা দেয়া হয়, যেকোনো পরিস্থিতিতে অ টি পি, পাসওয়ার্ডের গোপনীয়তা যেন ভঙ্গ না করা হয়। কিন্তু এরপরও কিছু সংখ্যক মানুষ সাইবার অপরাধীর শিকার হয়ে পড়েন - এমন কিছু ঘটনা সংঘটিত হয় যা স্বাভাবিক মানুষ অতি সহজেই জালে ফেঁসে যান। এখানে আমার সঙ্গে ঘটা একটা ঘটনা পাঠক মহল শেয়ার করতে চাই। তিন বা চার মাস হবে এই ঘটনার। আমার হোয়াটসঅ্যাপে বিদ্যুৎ কতৃপক্ষ (APDCL) থেকে এধরণের একটা মেসেজ আসে। যেহেতু আমার মোবাইল নাম্বার টা রেজিস্ট্রার ছিল, আমি ভাবলাম হয়তো হোয়াটসঅ্যাপে এসেছে। এই মেসেজে লিখা ছিল ইংরেজিতে, বাংলায় এর অনুবাদ হলো 'আপনার বিলটি আপডেট হয়নি একটা ভেরিফিকেশন করতে হবে, ইমেল আপডেটের মাধ্যমে তা করতে হবে।' নিচে দেয়া ছিল একটা মোবাইল নাম্বার আর বন্ধনীতে লিখা ছিল ডিসট্রিক ম্যানেজার (District Manager)। তো যেই মেসেজটা পড়লাম তখনই বিলের রিসিভ কপি টা নিয়েও দেখি এটা তো ঠিকই ছিল, বিল দেয়া হয়েছে আগেই। তারপর ভাবলাম এমন বোধহয় হতে পারে, ভেরিফিকেশন তো এখন অনেক ক্ষেত্রেই দিতে হয়। তাই হয়তো, ফোন করে নেই। একজন হিন্দিভাষী ফোন রিসিভ করলেন। উপরের উল্লেখিত পুরো ঘটনা বলার পর ঐ ব্যক্তি আমার ইমেইল চেয়ে নিয়ে একটা লিংক পাঠালেন। এই লিংকে ক্লিক করার পর দেখি ঐ ব্যক্তি আমার ফোন সে নিজে ওপারেট করছে। সঙ্গে সঙ্গেই একটা ভেরিফিকেশন স্ক্রীণ আমার সামনে আসলো। সেখানে আমরা নাম, ঠিকানা, ইমেইল, পেন নং (PAN), আধার নং(AADHAR) এসব দেয়ার অপশন ছিল। আমিও ওর ট্রেপে পড়তে থাকি। যখনই পেন নংটা লিখতে যাই হঠাৎ মনে আসলো একবার আমার বন্ধু যে ইলেক্ট্রিক অফিসে চাকরিরত তাকে ফোন করে নেই। আর এদিকে আমি কি করছি না করছি সব দেখছে হিন্দিভাষী ঐ মানুষটি। বন্ধুটি সেদিন কতবড় হেলপ করেছে তাকে কিভাবে যে ধন্যবাদ জানাই, এর ভাষা আমার জানা নেই। সেদিন খুব বকে ছিল আমাকে - 'স্যার কি অবসর, তোর সাথে এতো সময় ফোনে কথা বলার!' সাথে সাথে ওর ফোন কেটে মোবাইল সুইচ অফ করি।

৩।
উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও সাইবার অপরাধ-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা হু-হু করে বেড়েই চলছে। এ অপরাধের রাশ টেনে ধরতে সরকার নানান পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। Federal Bureau of Investigation (FBI) থেকে যে রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে তাতে রীতিমতো আতঙ্ক তৈরি হয়। কারণ, ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, সাইবার ক্রাইমে বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ স্থানে রয়েছে ভারত।কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে ২০১৭ সালে সাইবার অপরাধের ২১ হাজার ৭৯৬টি মামলা ছিল, ২০১৮ সালে ২৭ হাজার ২৪৮টি এবং ২০১৯ সালে সংখ্যাটি বেড়ে ৪৪ হাজার ৭৩৫টি মামলা হয়েছিল। সাইবার মামলার বিষয়ে ভারতের এ-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে অবহিত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ২০২০ সালে দেশে সাইবার অপরাধসংক্রান্ত মোট ৫০ হাজার ৩৫টি মামলা হয়েছে। যেখানে ২০১৯ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৪৪ হাজার ৭৩৫টি। ২০২০ সালের সাইবার অপরাধের এই তথ্য ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) ‘ক্রাইম ইন ইন্ডিয়া, ২০২০’ প্রতিবেদন থেকে নেওয়া হয়েছে। ২০১৯ ও ২০২০ সালের মধ্যে পার্থক্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মামলার ১১.৮ শতাংশ বেড়েছে।কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে ২০১৭ সালে সাইবার অপরাধের ২১ হাজার ৭৯৬টি মামলা ছিল, ২০১৮ সালে ২৭ হাজার ২৪৮টি এবং ২০১৯ সালে সংখ্যাটি বেড়ে ৪৪ হাজার ৭৩৫টি মামলা হয়েছিল। ২০১৯ সালে মোট অপরাধের মধ্যে সাইবার ক্রাইমের হার ছিল ৩.৩ শতাংশ, যা এখন ৩.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালে রেজিস্ট্রীকৃত সাইবার অপরাধ মামলার ৬০.২ শতাংশ (৩০ হাজার ১৪২টি মামলা) প্রতারণামূলক উদ্দেশ্য সম্পর্কিত, যেখানে ৬.৬ শতাংশ (৩ হাজার ২৯৩টি মামলা) যৌন নির্যাতনের মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সাইবার অপরাধের নতুন পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া পাঞ্জাব, রাজস্থান, গোয়া ও আসামের মতো কয়েকটি রাজ্যে একটিও সাইবার সেল না থাকায় অপরাধ বন্ধ না করার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে কমিটির একটি রিপোর্টে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, কর্ণাটক, উত্তরপ্রদেশ ও অন্ধ্রপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোতে মাত্র একটি বা দুটি সাইবার সেল স্থাপন করা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

ভারতে সাইবার ক্রাইম কমানোর জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি Indian Computer Emergency Response Team (CERT-In) দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এবং বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছে। বিভিন্ন ধরনের অনলাইন প্রতারণার ঘটনাগুলি খুব গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করছে এই সংস্থা। সমীক্ষা বলছে, ভারতীয়রাই সবচেয়ে বেশি সাইবার অপরাধের শিকার। এই দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশই সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। জানা গিয়েছে, পৃথিবীতে ৬৫ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীই সাইবার অপরাধের শিকার। সেখানে ভারতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই অপরাধের শিকার ৭৬ শতাংশ। তবে শুধু পুলিশের মাধ্যমে নয়, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন ব্যবহারকারীদের সতর্ক হতে হবে আগে। ভারতে সাইবার অপরাধ মোকাবিলা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এবছর জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে ৮২টি মামলা দায়ের হয়েছে সাইবার ক্রাইম সংক্রান্ত। সমীক্ষায় উঠে এসেছে আরও একটা বড় তথ্য। ভারতে একটি সাইবার অপরাধ সমাধানের জন্য যেখানে গড়ে ৪৪ দিন সময় লাগে, সেখানে অন্যান্য দেশে এই মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লাগে গড়ে মাত্র ২৮ দিন। সুতরাং লড়াইটা যে মোটেও সহজ নয়, তা বলাই বাহুল্য। লক্ষণীয় যে এখন ব্যাপকভাবে প্রসারিত সাইবার ক্রাইম কি মানব জাতির অস্তিত্বে প্রশ্ন করতে ভাবায় ?

Sunday, December 25, 2022

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২, কাতার


'কে লইবে মোর কার্য, কহে সন্ধ্যারবি। শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।
মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল, স্বামী, আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।'

চোখে ঘুম হারিয়ে মোবাইল,টিভির পর্দায় কিবা লুসাইলের দর্শক আসনে বসে ইতিহাসে স্বাক্ষী রইল ভারত তথা পুরো বিশ্বের ফুটবল প্রেমীরা। আর্জেন্টিনা ৩-ফ্রান্স ৩। একটা গোল যদি এমবাপে বা মেসির পা স্পর্শে বক্সে ঢুকে যায় আর লিখা হবে ইতিহাসে পাতা। রুদ্ধশ্বাস খেলা। টানটান উত্তেজনার অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত ছিল রেকর্ড জয়ের স্নায়ুবিক চাপ। গোলরক্ষক এমিলিও মার্তিনের দক্ষতায় ৩৬ বছর পর আবারও শিরোপা আসলো মেসির আর্জেন্টিনায়। লিওনেল মেসিদের বিশ্বকাপ জয়ে উচ্ছ্বাসের ঢেউ দোহা থেকে বুয়েন্স এইরেস হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা ফুটবলবিশ্বে। এবারের আগে আর্জেন্টিনা সবশেষ বিশ্বকাপ জিতেছিল মারাদোনার জাদুতেই। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে তার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স তাকে শুধু আর্জেন্টিনায় নয়, গোটা বিশ্বে করে তুলেছিল রূপকথার মহানায়ক। আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার দে পল খুশিতে, খুঁজে পাচ্ছেন না অনুভূতি ব্যাখ্যা করার ভাষা।'২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে তারা শিরোপা ঘরে তুলতে পেরে ম্যাচ শেষে তিনি বললেন, যোগ্য দল হিসেবেই জিতেছে আর্জেন্টিনা।'

কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের মাসকটের নাম ছিল লা-ইব। আরবি এ শব্দের অর্থ 'অত্যন্ত দক্ষ খেলোয়াড়'। যদিও লা-ইব দেখতে অনেকটা ক্যাসপার- দ্য ফ্রেন্ডলি-র ভুতের মতো। এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেয় ৩২টি দেশ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ধারা বর্ণনায় ছিলেন হলিউডের খ্যাতিমান অভিনেতা মরগ্যান ফ্রিম্যান। তার সাথে ছিলেন ২০ বছর বয়সী ঘানেম আল মুফতাহ। এক বিরল রোগের কারণে জন্ম থেকেই তার পা নেই। তাদের দুজনেই বক্তব্যে বিশ্ব ঐক্য ও সাম্যের কথা ফুটে। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চ কাঁপিয়েছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ব্যান্ড বিটিএসের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য জং কুক। এবারের বিশ্বকাপের থিম সং 'ড্রিমার্স' গানেই পারফর্ম করেন তিনি। তবে বিশ্বকাপ মানে মনেপড়ে শাকিরার 'ওয়াকা ওয়াকা' বা কান - এর 'ওয়েব ইন ফ্লেগ'-র কথা। দর্শকরা সত্যিকার অর্থে এইধরণের কিছু থেকে খুব মিস করছিলেন। কাতার বিশ্বকাপ উদ্বোধনীতে ছিল চোখ ধাঁধানো আলোর খেলা, ড্রামস পারফর্মেন্স, বর্ণিল আতশবাজির খেলা। তবে কাতারের মত ছোট একটি দেশ, যেখানে পেশাদারী ফুটবলের তেমন কোন ঐতিহ্য নেই, তারা কীভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার পেল, তা নিয়ে বিতর্কও তো কম হয়নি! একাধিক বিষয় নিয়ে বিতর্ক চলে কাতার বিশ্বকাপ ঘিরে।

২০১৪ ও ২০১৮ সালে ব্রাজিল ও রাশিয়া বিশ্বকাপ আয়োজনে ১৫ বিলিয়ন ডলারের কম খরচ হয়েছিল৷ ২০১০ সালে কাতারকে যখন ২০২২ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হয়, তখন সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়েছিল ৬৫ বিলিয়ন ডলার৷ কিন্তু দেখা গেল বিশ্বকাপ আয়োজন করার জন্য কাতার প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করা হয়! টাকার অঙ্কে কত হতে পারে? প্রায় ১৬ লক্ষ ৩৩ হাজার কোটি টাকার মতো । বিশ্বকাপের আয়োজনকে কেন্দ্র করে বারবার বিতর্কে জড়িয়েছে কাতার। কখনও LGBTQ নাগরিকদের স্বীকৃতি না দেওয়া আবার স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজে যুক্ত পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের ঘটনা, খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে কাতার প্রশাসন।মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত ১৫,০২১। এসব শ্রমিক ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার নাগরিক। মৃত্যুর এই সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে কাতারে এসব দেশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।তবে কি মৃত্যু উপত্যকায় চলছে আনন্দযজ্ঞ? কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে এমনই প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মিডিয়া। সাতটি স্টেডিয়াম-সহ নানা নির্মাণ কাজে ২০১০-২০ সময়কালে নাকি অন্তত সাড়ে ছ’হাজার অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে কাতারে। এর মধ্যে রয়েছেন ভারতের ২৭১১ জন, নেপালের ১৬৪১ জন, বাংলাদেশের ১০১৮ জন, শ্রীলঙ্কার ৫৫৭ জন।

নতুন বিতর্কের মধ্যে ছিল টিকিটের দাম। আগের সব রেকর্ডকে ছাপিয়ে গিয়েছে কাতার বিশ্বকাপের টিকিটের দাম। রাশিয়া বিশ্বকাপের থেকে গড়ে ৪০ শতাংশ বেশি এ বারের। ফাইনালের টিকিট কিনতে ফুটবলপ্রেমীদের ঘটি-বাটি বিক্রি করার উপক্রম। ফাইনালের টিকিটের দাম গড়ে ৬৮৪ পাউন্ড বা ৬৬ হাজার টাকার বেশি। ২০১৮ সালের ফাইনালের টিকিটের গড় দামের থেকে যা ৫৯ শতাংশ বেশি। রাশিয়া বিশ্বকাপে টিকিটের গড় দাম ছিল ২১৪ পাউন্ড বা প্রায় ২১ হাজার টাকা। এ বার তা বেড়ে হয়েছে ২৮৬ পাউন্ড বা প্রায় ২৮ হাজার টাকা। গত ২০ বছরে কোনও বিশ্বকাপের টিকিটের গড় দাম এত বেশি ছিল না।প্রকৃতপক্ষে বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক দেশ হিসেবে তেলসমৃদ্ধ ছোট দেশ কাতারকে বেছে নেওয়াটা একটি বড় রাজনৈতিক ঘটনা। যাইহোক অন্যদিকে না গিয়ে চলে আসা যাক মূল ট্রেকে।

কাতার বিশ্বকাপ প্রতিবাদের মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছেন একের পর এক ফুটবলার। বিতর্কও কম হচ্ছে না এই বিশ্বকাপকে ঘিরে। জার্মান সিনিয়র ফুটবল দল অভিনব পদ্ধতিতে কার্যত বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার (FIFA) বিরুদ্ধে 'বিদ্রোহ' ঘোষণা করলেন অ্যান্টনি রুডিগাররা। নাকে হাত দিয়ে নাক চেপে ফিফার বিরুদ্ধে অভিনব প্রতিবাদ দেখালেন তাঁরা। কাতারে সমকামীতা নিষিদ্ধ। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হয়েছে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, সুইডেন, নরওয়ে, এবং ওয়েলস। প্রতিবাদের অঙ্গ হিসেবে তারা একটি বিশেষ আর্মব্যান্ড তৈরি করে। যার নাম দেওয়া হয় ‘ওয়ান লাভ’ আর্মব্যান্ড। এই রামধনু রঙা এই ব্যান্ড পরেই মাঠে খেলতে নামার কথা ছিল এই দেশগুলোর ফুটবলারদের। কিন্তু বাঁধা দেয় ফিফা। তাই নাকে হাত দিয়ে নাক চেপে এক অভিনব প্রতিবাদ করে জার্মানরা।

খলিফা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘ই’-র ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল জাপান ও চার বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল জাপান। প্রতিটা খেলায় সাধারণ গ্যালারিতে সমর্থকরা খাবার খান, পানীয় পান করে থাকেন। সমর্থিত দলের খেলা দেখে গ্যালারি ছেড়ে চলে যান সমর্থকরা। আর গ্যালারিতে যত্রতত্র পড়ে থাকে জলের বোতল, খাবারের প্যাকেট। এদিন ম্যাচের শেষে জলের বোতল, খাবারের প্যাকেট পরিষ্কার করতে দেখা গেল জাপানের সমর্থকদের। যা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিমেষের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। বড় বড় নীল রঙের ডিসপোসাল ব্যাগ নিয়ে গ্যালারিতে যত্রতত্র পড়ে থাকে জলের বোতল, খাবারের প্যাকেট পরিষ্কার করেন। জাপানের সমর্থকদের পাশাপাশি ফুটবলাররাও ম্যাচের শেষে সুন্দর করে সাজঘর সাজিয়ে দেন। তবে জাপানি সমর্থকদের অভিনব সাফাই অভিযান মন জয় করে নেয় নেটিজেনদের।

নারীদের বেলা সব সময়েই দাবিয়ে রাখা পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা। তবে বিশ্বকাপ হলেই কি ? কাতার কি আর পিছিয়ে থাকতে পারে ? পোশাক পরিধান নিয়ে কাতার বিশ্বকাপে ছিল বেশ কড়াকড়ি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ মতে, কাতারে পা রাখা ভিনদেশি নারী সমর্থকদের বলা হচ্ছে, তারা যাতে খোলামেলা পোশাক না পরেন। মূলত কাঁধ ও হাঁটু ঢেকে রাখতে হবে। দর্শকদের কোনো বিশেষ পোশাক পরতে বলা হচ্ছে না। তারা নিজেদের পছন্দের পোশাকই পরতে পারেন। তবে খোলামেলা পোশাক পরা যাবে না। শুধু স্টেডিয়াম নয়, মিউজিয়াম ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরে গেলেও শরীর ঢাকা পোশাক পরতে হবে। তবে ব্যতিক্রম দেখা যায় ক্রোয়েশিয়ার এক মডেল কে দেখে। নিজের দলকে সমর্থন জানাতে কাতার বিশ্বকাপে দর্শক হয়ে এসেছেন ক্রোয়াট মডেল ইভানা নোল। তবে সেসব সমালোচনাকে মোটেই পাত্তা দেননি ইভানা। উল্টো দোহার সৈকতে বিকিনি পরে ঘুরাফেরায় দেখা যায় তাকে।

যদিও ৬-২ ব্যবধানে হেরেছে ইরান। তবে হেরে গিয়েও জিতে গেল তাঁরা। প্রতিবাদের ভাষা তো বিভিন্ন রকম হয়। চিৎকার করলেই সব সময় প্রতিবাদ হয় এমন নয়। নীরব থেকেও জানানো যায় প্রতিবাদের আগুন। সেটাই আজ প্রমাণ করল ইরান ফুটবল দল। মাঠের লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের কাছে বড় ব্যবধানে হেরে গেলেও মানবতার লড়াইয়ে বড় অঙ্গীকার রেখে গেল আমির নাসের,হোসেনি, তারেমিরা। দু’মাস আগে প্রতিবাদী মাহশা আমিনির মৃত্যুর পর থেকে ফুঁসছে ইরান। দেশে প্রতিবাদ থেমে যায়নি। প্রচুর মানুষের প্রাণ গেছে পুলিশের কাছে। তবুও ভয় পাইনি সাধারণ মানুষ। ইরানের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার সরদার আজমুন পর্যন্ত কিছুদিন আগে বিরাট প্রতিবাদ করেছিলেন সরকারের বিপক্ষে। এমনকি গুলি খেতেও রাজি ছিলেন। তাকে শেষ মুহূর্তের দলে রেখেছিল ইরান ফুটবল ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু অত্যন্ত নিন্দনীয় যা করেছে আমির নাসের কে মৃত্যদণ্ডের আদেশ দিয়ে। বিশ্বকাপে জাতীয় সংগীত গাইল না ইরান! ফুটবলে হেরেও জিতে গেল মানবতার যুদ্ধে। তবে এক্ষেত্রে মরক্কোও পিছিয়ে নেই।দীর্ঘ ৩৬ বছর পর, ২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশ মরক্কো। ১৯৮৬ -র মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল তারা। যদিও সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হারে। নিজেদের ধরে রেখেছে চতুর্থ স্থানে। কাতার বিশ্বকাপে স্পেনকে হারিয়ে প্যালেস্টাইনের পতাকা (Palestine Flag) নিয়ে ‌সেলিব্রেশন করে হাকিমি–জিয়েচরা। এর অর্থ হল বিশ্বের সামনে ইজরায়েলের আগ্রাসন থেকে প্যালেস্টাইনের মুক্তির দাবি।

প্রগতিশীল শিক্ষা আমাদেরকে খোলামেলা চিন্তা করতে শেখায়, ব্যক্তিস্বাধীনতা সম্পর্কে শেখায় এবং মানুষের পাশাপাশি সমস্ত প্রাণীকে ভালবাসতে শেখায়। সমাজের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে ভালোবাসতে শেখায়। আশ্চর্যের বিষয় এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ। বিবাহ বহির্ভুত কাপোল নাকি বিশ্বকাপ সময়ে কাতারে যেতে পারবে না। গেলে জরিমানা বা জেল। পাশ্চাত্যে বিবাহ প্রথা কম। বিবাহ ছাড়াই দু'জন হয়তো সারা জীবন ঘর সংসার করে, সন্তান সন্ততি নিয়ে সুখে থাকে। সেসব পশ্চিমা কাপোল তাহলে কাতার যেতে পারবে না! দুজন পুরুষ বা দু'জন নারী একসাথে গিয়ে খেলা উপভোগ করলে, এক কক্ষে থাকলে সন্দেহ করা হবে তারা সমকামি কি না। সমকামি হলে শাস্তি। ২১ বছরের নীচে হোটেল বারে মদ খেলে ৩০০০ দিনার জরিমানা বা ৬ মাসের জেল। সি-বীচে বিকিনি পড়া নিষেধ। পুরুষরাও খালি গায়ে রাস্তায় বের হতে পারবে না। কাতারে ছিল LGBTQ র উপর, নারীদের পোশাকের উপর নিষেধাজ্ঞা যেমন নিয়ম কানুনের জতুগৃহে আটকে পড়েছিল এবারের বিশ্বকাপ। অনেক সময় মনে হতো বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের কি প্রয়োজন ছিল ধর্মীয় জলসার আয়োজন করলেই পারতো ! 

কাতার বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক ও বিজ্ঞাপনী চুক্তিগুলো থেকে রেকর্ড সাড়ে সাতশো কোটি ডলার আয় করেছে ফিফা। ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও ট্র্যাজিক হিরোই হয়ে রইলেন কিলিয়ান এমবাপে। চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা রানার্স আপ ফ্রান্স, তৃতীয় স্হান ক্রোয়েশিয়া,গোল্ডেন বল মেসি( আর্জেন্টিনা), গোল্ডেন বুট এমবাপে (ফ্রান্স) ,গোল্ডেন গ্লাভস মার্টিনেজ (আর্জেন্টিনা),তরুন সেরা ফুটবলার ফার্নান্দেজ (আর্জেন্টিনা)। ২০২৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসতে যাচ্ছএ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে । ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দিয়েগো ম্যারাডোনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে, দোহায় ছাদখোলা বাসে ট্রফি নিয়ে উদযাপন মেসিদের। ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে লুসাইলকে স্মরণীয় করে রাখলো আলবিসেলেস্তেরা।১৯৩০ সালে শুরু হওয়া ফিফা বিশ্বকাপের ২২তম আসরের আয়োজক দেশ কাতার। কাতারের আয়োজক হওয়া নিয়ে আলোচনা যেমন ছিল, ছিল নানামুখী সমালোচনাও।অনেকটা ইসলামী বিধিনিষেধের উর্ধ্বে গিয়ে কাজ করেছে কাতার। এটাও কম বড় কথা নয়। তবে সব কিছু ছাপিয়ে ইতিহাসের অন্যতম সফল এক বিশ্বকাপ শেষ করে মরুর এই দেশটি। সবার মনে থাকবে কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ (Qatar World Cup 2022)।

Friday, December 16, 2022

গৃহবধূ আত্মহত্যা : বিবাহ সংক্রান্ত সমস্যা


আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘সেইডেয়ার’ থেকে ।সুইসাইড বা আত্মহত্যা আজ আর কারো কাছে অপরিচিত নয়। হয়তো এমন কোনো দিন খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হবে যেদিন দেশের কোথাও না কোথাও আত্মহত্যা ঘটেনি। পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট, ফেসবুক, টিভি অন করলেই কোনো না কোনো আত্মহত্যার খবর সামনে ভেসেই আসে। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো আত্মহত্যার নৈতিকতার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করেছেন। তিনি মনে করেছেন, যখন কেউ রাষ্ট্রীয় আইনে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত হন অথবা দুর্ভাগ্যবশত জীবন ধারণে অপারগ হন অথবা অপ্রত্যাশিত অপমানে জর্জরিত হন তখন তার আত্মহত্যা করা অনৈতিক নয়। অনৈতিক হয় না। একটি সূত্রমতে, গোটা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৮ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে থাকেন। তার মানে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ১ জন করে আত্মহননের পথ বেছে নেন। এই সংখ্যার মধ্যে ভারতেই ২০২১-এ আত্মহত্যার কারণে মৃত্যু হয়েছে ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৩৩ জনের। এমনই তথ্য উঠে এসেছে ‘ন্যাশনাল ক্রাইম স্টেশন ব্যুরো’-র সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে। এনসিবি-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে প্রতি ১০ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে ১২০ জনের মৃত্যুর কারণই হল আত্মহত্যা।

আমাদের সমাজে আত্মহত্যা যেকোনো ঘাতক ব্যাধি থেকে অধিক দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং ইহা সমাজ তথা দেশকেও রাখছে সর্বক্ষণ ভীতির মুখে। বর্তমানে যেকোনো বয়সের মানুষই আত্মহত্যা নামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বিয়ে নামক দাসপ্রথায় আবদ্ধ হয়ে সম্প্রতি বাড়ছে গৃহবধূ আত্মহত্যা। বিবাহিত মেয়েদের আত্মহত্যার ক্ষেত্রে পরিবার কিংবা স্বামীর ইন্ধন দেখা যায়। নারীর ক্ষেত্রে অধিকাংশই ইভ টিজিং, যৌতুকের চাপ, অভাব, হতাশা, পারিবারিক কিংবা সামাজিক নির্যাতনের মতো ঘটনায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। একজন নারী বিয়ের পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দৈনন্দিন জীবন সংসারে প্রাত্যহিকতার বেড়াজালে আটকে পড়েন। মন খুলে কথা বলার বা কথা শোনার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার যেহেতু অভাব রয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি নারীকে যে নানা ধরণের মানসিক নিগ্রহের শিকার হতে হয়, তার একটি বড় অংশ হয় নেতিবাচক নানা শব্দের মাধ্যমে। কোন ঝগড়া বিবাদে নারী বিভিন্ন ধরনের মৌখিক সহিংসতার শিকার হয়।  খেয়াল করেছি হয়তো, আমাদের আশপাশে প্রচলিত বেশিরভাগ গালিগালাজ এর সাথে স্ত্রী লিঙ্গের সম্পর্ক রয়েছে। অনেক তিরস্কারমূলক শব্দের মধ্যে পুরুষবাচক তো কোন শব্দই নেই।

নারীরা আসলে খুব সহনশীল, কিন্তু সহ্যেরও একটা সীমা রয়েছে। বেশিরভাগ মেয়েরই ১৮ বছর হবার সাথে সাথেই বিয়ে হয়ে যায়, যেটা বিয়ের আইনগত বয়স বা এর থেকে কমবয়সী মেয়েদেরকে পরিয়ে দেয়া হয় বিয়ের শিকলে। সে স্ত্রী এবং পুত্রবধূ হয়ে শ্বশুর ঘরে যায় আর তার গোটা সময়টা কাটায় ঘরের চার দেয়ালের মাঝে - রান্না, ধোয়ামোছা আর ঘর গৃহস্থালির নানা কাজে। বিয়ে প্রথায় লোভী পুরুষ মানসিকভাবে নির্যাতন করে স্ত্রী কে, তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ পর যাতে সামাজিকভাবে আবার দ্বিতীয়, তৃতীয় বা তার অধিক নারীর কাছ থেকে পেতে পারে সে চরম সুখ। তার ওপর আবার চাপিয়ে দেয়া হয় নানা ধরনের বিধিনিষেধ। ব্যক্তি স্বাধীনতা বলতে তার কিছুই প্রায় থাকে না। থাকে না আর্থিক স্বাধীনতাও - নিজস্ব অর্থ বলতে তার হাত থাকে প্রায় শূন্য। তার শিক্ষা বা ভবিষ্যতের স্বপ্ন সব কিছু তাকে বিসর্জন দিতে হয়। তার আশা আকাঙ্ক্ষার ধীরে ধীরে অপমৃত্যু শুরু হয়। ফলে হতাশা আর ব্যর্থতার গ্লানি তাকে গ্রাস করতে শুরু করে। তখন তার কাছে শুধু জীবনধারণ একটা যন্ত্রণার মত মনে হয়।

আমাদের সমাজে আত্মহত্যাকে ধর্মীয় দৃষ্টিতে পাপ হিসেবে দেখা হয়। ফলে কেউ নির্যাতন, নিপীড়ন ও অবহেলার শিকার হয়ে যদিও বা বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ, ধর্মীয় কারণে তার অন্তুষ্টিক্রিয়ায় ও দেয়া হয় নানা ধরনের ফতুয়া। আত্মহত্যার কারণ যতই সংবেদনশীল হোক না কেন এক্ষেত্রে। আত্মহত্যার পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। সহজে একজন মানুষ তার নিজ জীবনের পরিসমাপ্তি চায় না। যে কোনোভাবে বেঁচে থাকার আকাঙ্খাই প্রবল এবং বড় সত্য মানবজীবনে।

ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ভারতে গত বছর ২২ হাজার ৩৭২ জন গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ ভারতীয় গৃহবধূদের মধ্যে আত্মহত্যার হার প্রতিদিন গড়ে ৬১ আর মিনিটের হিসাাবে প্রতি ২৫ মিনিটে একজন। ২০২০ সালে মোট এক লক্ষ ৫৩ হাজার ৫২ টি আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে - তার মধ্যে ১৪.৬% ক্ষেত্রেই আত্মহত্যা করেছেন গৃহবধূরা। আর মোট আত্মহত্যার ৫০ শতাংশেরও বেশি ঘটনায় গৃহবধূরাই আত্মহননের পথে গেছেন।১৯৯৭ সালে আত্মহত্যার পরিসংখ্যান সংকলন করতে শুরু করে এবং সেটা তারা করে পেশার ভিত্তিতে। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে ভারতে প্রতিবছর বিশ হাজারের বেশি গৃহবধূ আত্মহত্যা করছেন। ২০০৯ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছিল ২৫ হাজার ৯২। বিগত ৫ বছরে ১৩৫৩০ জনের আত্মহত্যায় উত্তরপূর্বে শীর্ষে আসাম,দেশে শীর্ষে মহারাষ্ট্র (৯৬৬৫০)
-কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ দপ্তর। রিপোর্টে এধরনের আত্মহত্যার জন্য সবসময়ই দায়ী করা হয়েছে "পারিবারিক সমস্যা" অথবা "বিবাহ সংক্রান্ত সমস্যাকে"। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ ব্যাপক মাত্রার পারিবারিক সহিংসতা। সরকার পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে অংশ নেয়া নারীদের ৩০% বলেছেন, তারা স্বামীদের হাতে নিগ্রহ ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। সেইসাথে প্রতিদিন জীবনের ঘানি টানা আর সংসারের প্রাত্যহিক শ্রম তাদের দাম্পত্য জীবনকে কঠিন করে তুলছে, সংসারে তাদের জন্য দমবন্ধ করা অবস্থা তৈরি হচ্ছে।

চলমান পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে জীবন কাটানোর পরেও অনেক নারী যে তাদের মাথা ঠিক রেখে জীবন চালাতে পারছেন, তার একটা বড় কারণ হল তাদের পেছনে ব্যক্তিগত সাহায্য সমর্থনের অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ।আত্মহত্যার এই সামাজিক ব্যাধি শতভাগ নির্মূল করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। মানুষ হিসেবে নিজেকে জানতে হবে। সামাজিক দায়িত্ববোধ, পারিবারিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক অনুশাসনগুলো যথার্থভাবে মেনে চললেই অনেকাংশে এটা রোধ করা সম্ভব। মানুষ হিসেবে কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, যদি উপলব্ধি করেন সমাজ প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য, তবে তার পক্ষে আত্মহত্যা সম্ভব নয়। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা সাধারণত দুইধরনের।ইমপালসিভ (হঠাৎ আত্মহত্যা) এবং ডিসিসিভ (সিদ্ধান্ত নিয়ে বা পূর্বপরিকল্পিত)। তবে ডিসিসিভ আত্মহত্যাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য। আত্মহত্যা হুট করে হয় না। অনেক পরিকল্পনা করে এগোতে হয়। এ সময় আশপাশের মানুষ যদি একটু খেয়াল করেন তাহলে তারা সমস্যাগুলো বুঝতে পারেন। এ অবস্থায় যদি তারা উদ্যোগী হয় তাহলে বিষয়টি তখন পারিবারিকভাবে সমাধানে এগিয়ে মীমাংসা করা সম্ভব হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, গৃহবধূদের বাবা-মায়েরা তখন এই বিষয়ে বেখেয়ালে থাকেন, আবার কখনো কখনো নিজেরাই মেয়ের মনকে বিষিয়ে তোলেন। এভাবে তারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে শেষে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা নিতে ছুটে যান।

আত্মহত্যার বিষয়টি নিয়ে সমাজে খোলাখুলিভাবে কথা বলা হয় না। বিষয়টি এখনও গোপন রাখার প্রবণতা দেখা যায়, কারণ আত্মহত্যাকে পরিবারের জন্য লজ্জার বিষয় হিসাবে অনেকে দেখেন। গ্রাম এলাকায় ময়না তদন্তের প্রয়োজন থাকে না এবং অপেক্ষাকৃত ধনী পরিবারগুলো বিভিন্ন পন্থা অবলম্বনে আত্মহত্যাকে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হিসাবে নথিভুক্ত করায়। অনেক সময় প্রশাসনের নথিও যাচাই করা হয় না।এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের অনেক ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। যৌতুক, গৃহনির্যাতন, বহুবিবাহ সম্পর্কিত খবর ও এগুলোর কুফলের পাশাপাশি আত্মহত্যার পথে না গিয়ে বিকল্প পথে জীবন গঠনের উপায় নিয়ে বেশি বেশি সংবাদ প্রকাশিত হওয়া দরকার। তাহলে তা এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারবে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আত্মহত্যার প্রবণতা কমিয়ে আনতে শিশুকাল থেকেই মা-বাবার আন্তরিক আচরণ বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। আত্মহত্যার পেছনে যেসব কারণ দায়ী এসব চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে এর প্রবণতা বাড়তেই থাকবে।বিগত দিনে গৃহবধূ আত্মহত্যার কারণগুলো দর্শীয়ে, প্রত্যেক প্লেটফোর্মে, সামাজিক মাধ্যম, গণমাধ্যমের সাহায্যে মনোবিজ্ঞানী বিশেষজ্ঞ দ্বারা সচেতনতামূলক কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কলেজ, ইউনিভার্সিটি লেভেলে কোর্স কারিকুলামে এই ধরণের বিষয় ইনক্লুড করা। যাতে পরবর্তীতে একজন নারী সহজেই সংযত রাখতে পারে, মানসিক ভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে,বিয়ে নামক দাসপ্রথার বিরুদ্ধে লড়তে পারে। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবাইকে সজাগ, সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে, সকলকে সচেতন করতে হবে।

Thursday, December 15, 2022

ইরান ফুটবলারের মৃত্যুদণ্ড প্রসঙ্গে


ইরান পুঁজিবাদ অনুসারী দেশ।নারী–পুরুষ–ছাত্র–যুব নির্বিশেষে সমাজের সমস্ত অংশের ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণে এই গণআন্দোলনের শক্তি এতটাই বেড়েছে যে তা ক্ষমতাসীন মৌলবাদী–ফ্যাসিবাদী শাসকের চোখে চোখ রেখে অত্যাচারী জমানা বদলের আওয়াজ তুলছে৷ রাষ্ট্রের দমনপীড়নে ইতিমধ্যেই চারশোর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে৷আজ ইরানে যা চলছে তা হলো প্রগতিশীলতার বধ্যভূমি প্রস্তুত করা। এটা কি কোন সভ্য দেশের কাজ ? ধুর। একজন কে মৃত্যু দণ্ড দিলেই কি আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে ? একসময় শাহ র আমলে হিজাব বা বোরখা পুরো নিষিদ্ধ ছিল ১৯৮৯ ধর্মীয় অন্ধকার কে পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয়।

একটা পুঁজিবাদী দেশে ধর্মীয় বিধিনিষেধ দিয়ে অন্ধকারে ঠেলে দেয়া কতটা আক্রমণাত্মক তা ইরানকে দেখলেই বুঝা যায়। কারণ ভীতি প্রদর্শন করে মালাই খাওয়া দস্তুর। আসলে এটা শুধু ইরানে না, ধর্মীয় অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে প্রগতিশীলতা পিছনে ফেলে দেয়া হয়। কাতার বিশ্বকাপে মরক্কো কে তো দেখেছিই। আশরাফ হাকিমিরা ধর্মীয় গেড়াকল থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে নতুন আঙ্গিকে সাজিয়ে তুলেছে বিশ্বদরবারে। আসলে ইরান আমেরিকাকে ফলো করেই ধর্মীয় অন্ধকার আবার ফিরিয়ে এনেছে। ধর্মের নামে রাজনীতি এটা তো আবহমান কালের প্রচলিত ধারা।

রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর 'রামরাজ্য ও মার্ক্সবাদ' বইয়ে লিখছেন 'বিবর্তন বাদ ধর্মের মূলে এমন আঘাত করে যে তার ভিত্তিই নড়ে ওঠে। নিজের নিন্দনীয় পুঁজিবাদী সমাজ বহাল রাখার জন্য ধর্ম ও ঈশ্বরের সবথেকে বড় পৃষ্ঠপোষক আমেরিকা এজন্যই তাদের বেশ কিছু --বিশ্ব বিদ্যালয় গুলোতে বিবর্তনবাদ বিষয়ক পঠন-পাঠন ও আলোচনা বন্ধ করে দিয়েছে ।' (পৃঃ ৫৭)

জার্মান সংবাদপত্র ‘আনজেরে জাইট’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘তুদে পার্টি’র আন্তর্জাতিক মুখপাত্র মহম্মদ ওমিদভার জানাচ্ছেন, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইরানে ৪০ শতাংশের বেশি জনগণ দারিদ্র সীমার নিচে৷ বেকারত্ব ভয়াবহ, কোনও কোনও প্রদেশে তা ৭০ শতাংশের বেশি৷ এর সঙ্গে জুড়ে আছে শাসকদের সীমাহীন দুর্নীতি৷ আর চলছে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের নির্মম দলন৷ সৌদি আরবের শাসকরা এবং আফগানিস্তানের তালিবানরা মহিলাদের উপর যে ধরনের ফতোয়া জারি করেছে, ইরানেও তাই৷ মানুষ হিসাবে যে বুনিয়াদি অধিকার থাকা উচিত, তার কিছুই ইরানের মহিলাদের নেই৷ এমনকী তার নিজের শরীরের উপর নিজের অধিরকারটুকুও নেই৷

ইরান ধর্মীয় মৌলবাদীদের দ্বারা শাসিত একটি পুঁজিবাদী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র৷ এ যে কী দুঃশাসন ইরানের জনগণ বিশেষ করে মহিলারা তা উপলব্ধি করছেন জীবন দিয়ে৷ মৌলবাদী শাসকরা মেয়েদের বিয়ের বয়স ধার্য করেছিল ৯ বছর৷ জনগণের প্রবল প্রতিবাদের সামনে পড়ে ২০০২ সালে পার্লামেন্ট মেয়েদের বিয়ের বয়স বাড়িয়ে করে ১৩ বছর৷ অধিকারের প্রশ্নে নারী–পুরুষের বৈষম্য ব্যাপক৷ পুরুষেরা মুখে তালাক বললেই বিবাহ–বিচ্ছেদ হয়ে যায়৷ কিন্তু নারী বিবাহ বিচ্ছেদ চাইলে তাকে যেতে হবে কোর্টে৷ একজন বিবাহিত মহিলা বিদেশে যাওয়ার পাসপোর্ট পাবে না, যদি না স্বামী লিখিত অনুমতি দেয়৷ সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক বৈষম্য৷ স্বামী মারা গেলে তার সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার নগণ্য, মাত্র সাড়ে ১২ শতাংশ৷ কিন্তু স্ত্রী মারা গেলে, তার সম্পত্তি পুরোটাই পাবে স্বামী৷ পৈত্রিক সম্পত্তিতে মেয়ের ভাগ ছেলেদের অর্ধেক৷ বিচারবিভাগে মেয়েদের চাকরির কোনও অধিকার নেই৷ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও মেয়েদের দাঁড়ানো নিষিদ্ধ৷ কোনও কোনও ধর্মীয় নেতা এমনও বাণী দিচ্ছে যে মহিলাদের মস্তিষ্কের শক্তি পুরুষের অর্ধেক৷ সব মৌলবাদের বহিরঙ্গে পার্থক্য যাই থাক, মর্মবস্তুতে এরা এক৷ এদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রগতির পথে প্রতিবন্ধক৷

ইরান আদালতের মতে, ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে শত্রুতা’। সম্পূর্ণ নির্বোধতা আর কাপুরুষতা। মূল কথা হলো আমির নাসের আজদানির মৃত্যুদণ্ড,নিন্দনীয় এবং কুপমূন্ডকতা ছাড়া কিছু নয়। সবশেষে পুঁজিবাদ ও ধর্মীয় অন্ধকার নিপাত যাক।

Tuesday, December 13, 2022

বিতর্কিত দেওয়াল লিখন জেএনইউ-তে


আবারও বিতর্ক ঘিরে দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় জেএনইউ ( Jawahar Lal Nehru University) । এবারের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে কোন অজ্ঞাত পক্ষের দ্বারা দেয়াল লিখন হয় --- ক্যাম্পাসের ভেতরে স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের দেওয়ালে কারা যেন লাল কালিতে লিখে রাখল ফতোয়ার ঢং-এ একাধিক বিতর্কিত বার্তা। কোথাও লেখা হয়েছে ‘ব্রাহ্মণরা ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাও’, কোথাও লেখা ‘বানিয়ারা (বৈশ্য) দূর হটো’, কোথাও বা ‘শাখায় (সংঘ) ফিরে যাও’, ‘আমরা বদলা নিতে আসছি’ ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে একটি বিবৃতি জারি করা হয়েছে৷ 

অজ্ঞাতনামাদের কুকীর্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের দেওয়াল ব্রাহ্মণ তথা বৈশ্যবাদের বিরুদ্ধে স্লোগানে ভরে উঠল। রীতিমতো শাসানি দিয়ে বলা হল ‘ব্রাহ্মণরা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাও’, ‘ব্রাহ্মণ ভারত ছাড়ো’ আবার কোনওটিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখা রয়েছে, ‘এখানে রক্ত ঝরবে’, ‘ব্রাহ্মণ-বৈশ্য, আমরা তোমাদের জন্য আসছি। আমরা সংখ্যায় বেশি রয়েছি।’ ইতিমধ্যে এই ঘটনা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিনীত জিন্দাল দিল্লি পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন। এই মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনত দণ্ডবিধির ধারা ১৫৩এ/বি, ৫০৫, ৫০৬, ৩৪ এর অধীনে মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে বলে দিল্লি পুলিশের দাবি।

এমনিতেই দেশের প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জেএনইউ বা জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ডান ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের মধ্যে কথায় কথায় হরদম সংঘাত সেখানে রোজকার বিষয়। গেরুয়া শিবিরের তরফে জেএনইউ-র বামমনস্ক ছাত্র সংগঠনের পড়ুয়াদের কখনো ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’, কখনও ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে। কেন্দ্রীয় শাসক দলীয় শিবিরের কাছে আজও জেএনইউ পঠনপাঠনের পীঠস্থান নয়, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদের আঁতুরঘর’ বলে চিহ্নিত করা হয়। জেএনইউ দেয়াল লিখন কোন নতুন বিষয় নয়। সময়ে সময়ে অনেক রাজনৈতিক বিতর্কে বেশ চর্চায় রয়েছে। কিন্তু এবারের বিতর্কের ঝড় বেশ তাৎপর্য বহন করছে। বিশেষ করে দুটো সম্প্রদায়কে কোন অজ্ঞাত পক্ষ আক্রমণ করার জন্য বেছে নিয়েছে। তবে এবারের বিষয় ব্রাহ্মণ ও বানিয়া সমাজে আক্রমণ করায় এর তীব্র প্রতিক্রিয়া সংবাদ শিরোনাম দখল করেছে।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে চলা বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচন তথা আগামী লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ধরণের স্পর্শকাতর বিষয় উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে করা হয়েছে বলে বুদ্ধিজীবী মহলে সরগোল চলছে। যদিও এই ধরণের ইস্যুর বাস্তব ভিত্তি নেই, তদুপরি একটা জাতিয়তাবাদী বিষয় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এনে একে অপরের সাথে সংঘাত বাঁধানো কি কোন সংকীর্ণতার কাজ নয় ? মানে, দেয়াল লিখন দিয়ে কি বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে ?

আচ্ছা, বিশ্লেষণের সুবিধার্থে ব্রাহ্মণ-বানিয়া (বৈশ্য) বিরোধী শ্লোগান লিখা পক্ষকে যদি বামপন্থা বা দলিত সংগঠনের বিচারধারার মানুষ ধরে নেয়া হয়, তবে এই ধরণের শ্লোগান লেখার পেছনে লুকিয়ে আছে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমির সাথে বর্তমান উচ্চবর্ণের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মানসিকতা এবং বিশেষ করে সংবিধানের ১০৩ নং সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চবর্ণের আর্থিকভাবে দুর্বলদের দেয়া ১০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চিন্তা বা নির্বাচনে দলিত বামপন্থী এবং অন্য শ্রেণীর ব্যাক্তিকে বিজেপির বিরুদ্ধে একজোট করার চিন্তা। যেখানে তাদের বিচারধারা দরশায় জাত-পাত, উচ্চ - নীচের বিভাজনে ব্রাহ্মণ্যবাদের নামে ব্রাহ্মণ বানিয়া শ্রেণী শৈক্ষিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বা আরও বিভিন্ন দিকে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরও দলিত ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণী থেকে বহুগুণ অগ্রসর হয়ে আছে তা বিভিন্ন প্রতিবেদনে লক্ষিত। তবু বামপন্থী বা দলিত বিচারধারার কারোর দ্বারা যদি এইধরণের দেয়াল লিখন হয় তবে এটা জাতিগত আক্রমণ। এইধরণের সংকীর্ণ মানসিকতা এবং কাজ নিন্দনীয়।

অপরদিকে, এই দেয়াল লিখনের কাজ যদি এবিভিপি বা বিজেপি সমর্থিত কারো কাজ হয়ে থাকে, ধরে নেয়া হয়, তবে একটা অযৌক্তিক বিষয় নির্বাচনে ইস্যু বানিয়ে উচ্চবর্ণের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা বা জেএনইউ-র বামপন্থী বা দলিত গতিবিধি সাম্প্রদায়িকতা ছড়াচ্ছে দেখিয়ে দেশের জনগণকে বামপন্থী বা বিজেপি বিরোধী সমর্থন থেকে নিজেদের দিকে টেনে আনার অভিপ্রায়। অথবা দেশে জাতিবাদ বা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। যদি এবিভিপি বা এই ধরনের কারো দ্বারা এই দেয়াল লিখন হয় তবে এটাও নিন্দনীয়।

এখন কথা হলো এই দেয়াল লিখন কি কোন বামপন্থী- দলিত বা এবিভিপি ছাড়া কোন তৃতীয় পক্ষের ষড়যন্ত্র। এইধরণের বিভেদমূলক মন্তব্য কারা করেছে, নিশ্চয় রাতের অন্ধকারে লিখা দেয়াল লিখন দিনের আলোয় উদ্ভাসিত হবে। কিন্তু নীরব দর্শক গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা থেকে এই আশা করতে পারে কি একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সঠিক তথ্য সিনাক্তকরণ হবে ?

আসলে এইধরণের ঘটনা কোন রাজনৈতিক মুনাফা না দেশহীতের কাজে ঠিক কোনটা তা স্পষ্ট ফুটে উঠছে না। এইধরণের বিভেদকামী বিষয় নিয়ে ভারতবর্ষে শান্তি সম্প্রীতি বিনষ্ট করে কোনভাবেই 'জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন' নেয়া সম্ভব নয়। যেকোন উন্নয়নশীল দেশ বিকাশ ও উন্নয়নে তাদের ফোকাস সেখানে ধর্মীয় মেরুকরণ, জাতীবাদ, নারী নির্যাতন, সাম্প্রদায়িকতা বাদ দিয়ে মননশীল প্রগতির পথে। তাই বিকাশ ও উন্নয়ন হোক প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। দল - পন্থা নির্বিশেষে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংগঠন এক গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল কাজে দেশের উন্নয়নে দূরদর্শী এবং দায়িত্বশীল হওয়ার সময় এখনই।

Monday, November 28, 2022

মূল্যবোধ : নৈতিকতার নিরিখে বিশ্লেষণ


মানুষের জীবনবোধের সঙ্গে নৈতিক মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যদিও মানুষ প্রাণী তবুও সে পশু নয়। তাইতো সমাজ বিজ্ঞানী ডেভিড পোপেনোরের মতে -- ' ভালো মন্দ, ঠিক বেঠিক, কাঙ্খিত অনাকাঙ্ক্ষিত সমাজের সদস্যদের যে ধারণা তার নামই মূল্যবোধ। মূল্যবোধের অবক্ষয় এখন চারিদিকে প্রকট হয়েছে। মূল্যবোধ বলতে সকলের মনে একটা ধারণা আসে যদিও সুস্পষ্টভাবে কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবু মূল্যবোধ সাধারণত আচার আচরণের একধরণের মান বা বোধ, কিছু আদর্শগত সমষ্টি যার দ্বারা মানুষ যেকোন কাজের ভালোমন্দ, শুদ্ধতা অশুদ্ধতা যাচাই করে অগ্রসর হতে পারে। মহাত্মা গান্ধীর মূল্যবোধের শিক্ষা বলতে সত্যবাদিতা, অহিংসা, নির্ভিকতা, সামাজিক সচেতনতা এবং দায়িত্ববোধ, সেবা প্রমুখ বিষয়ের উপর জোর দেয়া হয়। অর্থাৎ মূল্যবোধ কেবলমাত্র ব্যক্তিগত ভালোমন্দ বিচার করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় ইহার সামাজিক দিকগুলোও আছে যেগুলো খুব প্রয়োজনীয়। মূল্যবোধ হলো মানুষ তাঁর নিজের এবং সমাজের জন্য এক বিশেষ ' কোড অব কনডাক্ট' যার দ্বারা একজন মানুষ অথবা সমাজ উত্তরণের দিকে অগ্রসর হতে পারে।

মূল্যবোধ সবসময় একটা জায়গায় থেমে থাকে না। World Value Survey মূল্যবোধের ওপর বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। এই সংস্থার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বিভিন্ন শাখার বিজ্ঞানীরাও। এর এক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে যে মূল্যবোধ বা ভ্যালু বলা বস্তুটি কখনও একজায়গায় স্থির থাকে না। সমাজ পরিবর্তন, বিবর্তনের সাথে সাথে মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটে। World Value Survey (WVS) - এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী যখনই কোন দেশের ঔদ্যোগিক বিকাশ ( industrialization ) এবং তার উত্তর -ঔদ্যোগিক জ্ঞান সমাজের (post industrial knowledge society) দিকে যতই এগোচ্ছে ততই ঐ দেশের পরম্পরাগত মূল্যবোধ যেমন - পিতামাতা ও সন্তানের মধ্যে বন্ধন, পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক, ধর্মীয় গুরুত্ব, অন্যান্য এসবের প্রতি টান কমছে। তবে হ্যাঁ, ধর্মনিরপেক্ষ - যুক্তিবাদী ( Secular rational values) মূল্যবোধের মান বাড়ছে। এই পরম্পরাগত পারিবারিক সম্পর্ক বা ধর্মীয় ক্ষেত্রে যে মূল্যবোধের অবক্ষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে, এর ফলে কি মানুষের মধ্যে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য কতটা অবনতি হয়েছে? WVS এর প্রতিবেদনে বলা হয় ১৯৮১-২০০৭ সন পর্যন্ত মানুষের সুখ শান্তি এবং জীবনের সন্তুষ্টি বেড়েছে। World happiness index - এ নৈতিকতা ও মূল্যবোধের নিরিখে সুখি দেশের তালিকা প্রস্তুত করে। সেখানে আমরা দেখতে পাই সেই সুখি দেশগুলোর মধ্যে শান্তি, শৃঙ্খলা, সন্তুষ্টি, সৌজন্যতা, সহনশীলতা, প্রগতিশীলতা বিদ্যমান।তাহলে আমরা নিশ্চয় বুঝতে পারছি মূল্যবোধ কোনো অচল-অটল বস্তু নয়। সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটে।

কিন্তু এখন কথা হলো আসলে মূল্যবোধের আধার কি ? ইহা কি এমনিতেই গড়ে উঠে না এর কোন সামাজিক প্রেক্ষাপট আছে ? আমরা নিশ্চয় সেই উলঙ্গ রাজার কথা জানি। যেখানে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেছেন - 'সবাই দেখছে যে রাজা উলঙ্গ, তবুও সবাই হাততালি দিচ্ছে। সবাই চেঁচিয়ে বলছে; শাবাশ শাবাশ।' গল্পটা সবাই জানি। কিন্তু সেই গল্পের ভেতরে শুধু প্রশান্তি বাক্য উচ্চারণ কিছু আপাদমস্তক ভিতু, ফাঁকিবাজ, অথবা নির্বোধ স্তাবক ছিলনা। একটা শিশুও ছিল। সত্যবাদী, সরল, সাহসী একটা শিশু। এখন প্রশ্ন হলো রাজসভায় যারা মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের মূল্যবোধের অবস্থান কোথায়? মূল্যবোধ আসলে কোন বিমূর্ত বস্তু নয়। মূল্যবোধ সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, দ্বারা প্রভাবিত। আজকাল বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের মতবাদের প্রচার চলছে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ মতবাদ প্রচারে বিভিন্ন চিন্তা একত্রে প্রসারিত করার চেষ্টায়। এক দলতো জোরপূর্বক তার মূল্যবোধ চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টায়। বিশ্বের সমস্ত ঘটনাবলি মানুষের নখদর্পণে। বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক সফলতা আর নিত্যনতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে সবকিছু আজ মানুষের সাধ্যে। তা সত্ত্বেও পৃথিবী হয়ে পড়েছে হিংস্র, অশান্ত আর নৈরাজ্যের ঠাঁই। বর্তমান সমাজে বস্তুগত সমৃদ্ধির পরও এক বিরাট সংখ্যক মানুষের মধ্যে দেখা যায় অনৈতিকতা, সীমাহীন দুর্নীতি, ছলচাতুরী, চুড়ান্ত মিথ্যাচার । ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতার শীর্ষে থাকাটা স্থির করে নিয়েছে মানুষ।

এমন এক সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে যেখানে প্রগতিশীল, ঔদ্যোগিক ধ্যান ধারণার বিপরীতে মৌলবাদী, একাত্ববাদী ধ্যানধারণার বিকাশ। সৃষ্টি হয়েছে ভয়- শংকা - বিদ্বেষের পরিস্থিতি। ধর্মীয় মৌলবাদ এবং তজ্জনিত হিংস্রতায় সমাজ এক অস্থির সময়ে বিরাজ করছে। এটা সমগ্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমরা এখন ঔদ্যোগিক সভ্যতার দিকে এগোচ্ছি। উত্তর -ঔদ্যোগিক স্তর পেতে এখনও বাকি। এখনও আমরা অবৈজ্ঞানিক ধ্যান ধারণায় আচ্ছন্ন। তার সাথে আমাদের ঠেলা হচ্ছে ধর্ম-জাত-পাত, অসহিষ্ণুতা, নিম্নগামী যুক্তি তর্কের পরিবেশে। তাইতো এই দ্রোহকালে ভুলে গেছি সৌজন্য বিনিময়। তবে এইভাবে কি মূল্যবোধের উত্তরণ সম্ভব ? মূল্যবোধের জন্ম সমাজেই হতে হবে। বিজ্ঞানী ব্রাউনের মতে - ' যদি পৃথিবীতে নৈতিকতার মান প্রযুক্তিগত কলাকৌশলের বৈপ্লবিক অগ্রগতির সাথে অগ্রসর না হয়, তাহলে আমরা নিশ্চিন্ন হয়ে যাবে। শিক্ষার বিস্তার বিজ্ঞানের চমকপ্রদ আবিষ্কারের ফলে প্রযুক্তিগত বিরাট প্রসার ঘটছে, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে নৈতিকতার মান অগ্রসর হয় নি। মূল্যবোধের উত্তরণ ঘটছে না। তবে সংকীর্ণ চিন্তার পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভয়ানকভাবে উত্থান ঘটছে ধর্মীয় মৌলবাদের। এমন এক প্রচলিত সমাজে এর পরিবর্তনের দায়ভার কে নেবে? এরজন্য আমাদের শিক্ষক - অভিভাবক দুজনেরই সমান অংশীদারিত্বে পরিবর্তন সম্ভব। কারণ আগত ভবিষ্যত সমাজের মূল্যবোধ রক্ষার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। অর্থাৎ আজকের যেসকল স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাঁদেরই।

সমাজে শিক্ষকের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের ব্যাক্তিগত জীবনে যদি লক্ষ্য করি তবে দেখা যায় কোন এক আদর্শ শিক্ষকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পরিচর্যায় আমরা আজ এতোটা এগিয়েছি। তাঁদের ব্যাক্তিত্ব, কথাবার্তা, চিন্তাধারা, ভাবনায় আমরা মুগ্ধ। নৈতিক শিক্ষা বা বিদ্যায়তনিক শিক্ষায় যদিও উনাদের মতো অগ্রসর হতে পারিনি তবে আমাদের ব্যাক্তিত্বের ক্ষেত্রে কতটা ফলপ্রসূ তা নিশ্চয় আমরা বুঝতে পারি। কারণ ছাত্রর জীবনে একটা ছেলে বা মেয়ে ঘরের পর সবথেকে বেশি সময় কাটায় স্কুলে। সেখানে একে অপরের সঙ্গে মেলামেশা, সহপাঠীদের সঙ্গে সহমর্মিতা, গুরুজনদের প্রতি ভক্তি, সত্যের প্রতি নিষ্ঠা, মুক্ত চিন্তার ক্ষমতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এসবের মূল্যবোধের ধারণা ও অভ্যাস সেখানেই গড়ে উঠে। আর এই অভ্যাস গড়ে তোলার মূল নায়ক হলেন শিক্ষক। শিক্ষকই হচ্ছেন Role Model । একজন শিক্ষক পুঁথিগত জ্ঞানদানের সাথে সাথে একজন পথপ্রদর্শক, সহানুভূতিশীল, বন্ধুভাবাপন্ন ব্যাক্তি। যিনি ছাত্রছাত্রীদের মূল্যবোধ ও নৈতিকতার নিঃশুল্ক জ্ঞান দিয়ে থাকেন। সেইক্ষেত্রে একজন শিক্ষক শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষক নন, সমাজেরও। তাই শিক্ষকের দায়িত্ব হলো যতটুকু জানা ততটুকুই সঠিকভাবে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করা। মূল্যবোধ ও নৈতিকতার নিরিখে জাপান বেশ এগিয়ে। জাপানের একটি কথা আছে - 'A poor teacher tells, an average teacher teaches, a good teacher explains, and a great teacher inspires.' একজন শিক্ষক ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করার জন্য, সৎ পথে চলার জন্য, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার নিরিখে সমাজ জীবনে সুস্থ মস্তিষ্কে অগ্রসর হওয়ার জন্য প্রথমে নিজেকে সেইমতে গড়তে হবে। তাহলে তিনি ছাত্রছাত্রীর আদর্শ হিসেবে পরিগণিত এবং তাঁর প্রদত্ত শিক্ষাকে ছাত্রছাত্রীরা চিরদিন স্মরণ রাখবে।

সেই একই ভাবে আমরা যারা অভিভাবক আছি তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটা শিশুর প্রথম শিক্ষা তার ঘর থেকেই শুরু। চোখ খোলার পর ঘরকেই সে আপন করে নেয়। একটি শিশু প্রথমেই তার বাবা মা -র কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে বড় হয়। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কিধরনের ভূমিকা পালন করতে হয়, সততা, তাদের বিশ্বাস, আচার ব্যাবহার সবকিছুই বাবা মায়ের কাছ থেকে শেখে। অভিভাবকের মধ্যে যদি অসদাচরণ, অযৌক্তিক চিন্তা চেতনা, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার দেখা যায় তবে সেই শিশুটিও মানসিকভাবে সেইভাবেই গড়ে উঠে। সমাজে যদি মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রয়োজন আছে, ভালোবাসা, সৎ অসৎ বিচারের প্রয়োজন আছে তবে তার বীজ ঘরেই রোপণ করতে হবে এবং এর মূল হতে হবে মা-বাবা দুজনেই। মানবসমাজ সেই প্রাচীনকাল থেকেই মূল্যবোধ কে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। আকারে ক্ষুদ্র দ্বীপ হলেও নৈতিকতার জন্য ইংরেজরা পুরো বিশ্ব জয় করেছিল। অনৈতিক কাজ দ্বারা ক্ষমতাসীন হলেও ধ্বংস অনিবার্য। পি বি শেলীর বিখ্যাত 'Ozymandias' -এ বলেছিলেন - My name is Ozymandias, King of kings, Look on my works, ye mighty and despair.'

আলোচনার পরিসমাপ্তিতে এটুকু বলা যায় যে আমরা দিন দিন যেভাবে নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে হারিয়ে ফেলছি তাতে বর্তমান সমাজ রোগাক্রান্ত। পারস্পরিক মমত্ববোধ,প্রেম, সৌজন্যতা এসব আমরা হারিয়ে ফেলেছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে, যেখানে একটা সুস্থ সমাজ উপহার দিতে পারি। নীতি - ঔচিত্যবোধ, সামাজিক ন্যায় বিচার, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহিষ্ণুতা, শ্রমের মর্যাদা, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ, রাষ্ট্রীয় আনুগত্য চর্চার মাধ্যমে উন্নত, সভ্য ও কলুষমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব। সঠিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চাই পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

তথ্যসূত্রঃ
১) আনন্দবাজার পত্রিকা নবীন প্রজন্মের অবক্ষয় এখন সর্বত্র, ২৪ আগষ্ট, ২০১৯।
২) www. Worldvaluesservey.org
৩) www. Worldhappiness.report
৪) www. Wikipedia.org

Monday, November 21, 2022

শরিয়া আইন আগ্রাসনে আফগান মহিলারা


আফগানিস্তানে পূর্ণ শরিয়া আইন প্রয়োগের নির্দেশ তালেবান নেতার। আফগানিস্তান থেকে যখন সোভিয়েত সৈন্যরা পিছু হটলো, তখন ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে উত্তর পাকিস্তানে এই তালেবান আন্দোলনের জন্ম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনীর প্রায় দুই দশকের উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে রাজধানী কাবুল দখল করার পর তালিবানরা নিজেদেরকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে। আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার পর তালিবানরা বলেছে যে তারা শরীয়া বা ইসলামী আইনের ভিত্তিতে দেশটি শাসন করবে। এই শরীয়া আইন নিয়েই উঠে এসেছে একগুচ্ছ প্রশ্ন।

তালিবান শরীয়া আইনের (Shariya Law) কঠোর প্রয়োগ, বিশেষ করে খুনী ও ব্যভিচারীদের জন্য প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মতো শাস্তির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। প্রসঙ্গত, আফগানিস্তানে সমস্ত মহিলাদের প্রকাশ্যে হিজাব পরতে হয়। কিন্তু তালিবানের দাবি, মহিলাদের প্রকাশ্যে সম্পূর্ণ শরীর এবং মুখ ঢাকা পোশাক পরতে হবে। বোরখা ছাড়া বাইরে বেরনো যাবে না। কিন্তু রাজধানী কাবুল-সহ শহুরে এলাকায় অনেক মহিলাই মুখ ঢাকছেন না বলে অভিযোগ। তার বদলে কেউ কেউ সার্জিক্যাল মাস্ক পরে ঘুরছেন। মেয়েদের হাইস্কুলে পড়া নিয়েও ইউ-টার্ন নিয়েছে তালিবান সরকার।

আফগানিস্তানে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি অপরাধের শাস্তি হিসেবে ইসলামী শরিয়া আইন মোতাবেক অঙ্গচ্ছেদ ও পাথর ছোড়ার মত সাজা দেওয়ার জন্য বিচারকদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন তালেবান নেতা হায়বাতুল্লাহ আখুন্দজাদা।তালেবান মুখপাত্র জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ গত রোববার রাতে টুইটারে এক পোস্টে এ বিষয়ে জানিয়েছেন বলে জানায় বিবিসি। জাবিহউল্লাহ তার পোস্টে লেখেন, মোল্লা আখুন্দজাদা একদল বিচারকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর ‘বাধ্যতামূলক’ এ আদেশ আসে।

তালেবানদের মতে শরিয়া আইনের আওতায়‘চোর, অপহরণকারী এবং রাষ্ট্রদ্রোহীদের মামলাগুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে। এসব মামলায় অপরাধ (হুদুদ এবং কিসাস) বিবেচনা করে ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী বিচার করতে হবে। হুদুদ সেসব অপরাধকে নির্দেশ করে, যেগুলোতে ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সাজা দেওয়া বাধ্যতামূলক। যেমন- ব্যভিচার, মদ্যপান, চুরি, অপহরণ, ডাকাতি, ধর্মত্যাগ এবং ধর্মদ্রোহিতার মতো অপরাধ। অন্যদিকে, কিসাস নির্দেশ করে বদলা নেওয়ার বিষয়টি (চোখের বদলে চোখ)। কিসাসের অন্তর্ভুক্ত হত্যা, ইচ্ছাকৃত আঘাতের মতো অপরাধগুলো। কিসাসভুক্ত অপরাধগুলোতে ভিক্টিমের পরিবার চাইলে ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে অপরাধীকে ক্ষমা করে দিতে পারবেন।

শুধু অপরাধ নয়, বিয়ে, বিচ্ছেদ সহ সমস্ত বিষয়েই কড়া বিধি রয়েছে শরিয়া আইনে। বর্তমানে ৫০টি দেশে এই শরিয়া আইনের কিছু কিছু অংশ মানা হয়। তার মধ্যে ৮টি দেশে কট্টর শরিয়া আইন মেনে চলা হয়। সৌদি আরব, ইরান, ব্রুনেই, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, পাকিস্তান, নাইজিরিয়া, কাতার। সৌদিতে অবশ্য সম্প্রতি মেয়েদের একা বাড়ি থেকে বেরনো এবং গাড়ি চালানোর অনুমতি দিয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ছিল তালিবান। তখন সেখানে কট্টর শরিয়া আইন পালন করা হত। রাস্তায় পাথর ছুড়ে অপরাধী সাজা তাছাড়া মেয়েদের ঘরবন্দি করা হয়েছিল। ২০০১ থেকে ক্রমে ধীরে ধীরে স্বাধীন হয়েছে আফগানিস্তান। মেয়েরা স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ফের তালিবান ক্ষমতায় আসায় স্বাভাবিকভাবেই চাপে আফগানরা। 

১৯৯০ এর দশকে তালেবান যখন প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিল তখন জনসম্মুখে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কারণে সমালোচিত হয়েছিল। গতবছর দ্বিতীয়বার আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর তারা তাদের শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে যুগের সঙ্গে তাল মেলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পালনে তাদের খুব একটা আগ্রহ নেই। বরং নারীদের বিভিন্ন অধিকার ও স্বাধীনতা খর্ব করার মধ্য দিয়ে তারা পুনরায় আগের শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে তালেবান নারীদের জন্য কাবুলের সব পার্কে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে।

একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে নোবেল জয়ী মালালা ইউসুফজাই - যিনি পাকিস্তানে মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারের পক্ষে প্রচারণার চালানোর কারণে ১৫ বছর বয়সে তালেবানের গুলিতে আহত হয়েছিলেন - সতর্ক করে বলেছেন যে শরীয়া আইনের তালেবানী দেশটির নারী ও কন্যা শিশুদের নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।"আফগানিস্তানে নারীসহ কিছু মানবাধিকার কর্মীর সাথে কথা বলার সুযোগ আমার হয়েছে। তারা তাদের উদ্বেগ জানিয়ে আমাকে বলেছেন যে তারা নিশ্চিত নন যে তাদের জীবন কেমন হতে যাচ্ছে," বিবিসিকে বলেন তিনি। তাদের অনেকেই ১৯৯৬-২০০১ সময়কালে যা ঘটেছিল তা স্মরণ করেছেন, এবং তারা তাদের নিরাপত্তা, অধিকার, সুরক্ষা এবং স্কুলে যাওয়া নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

তালিবান নেতা আকুন্দজাদার নির্দেশ কঠোর শরিয়তি আইন প্রয়োগ করতে হবে সর্বোচ্চ বিচারকদের। তালিবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর থেকে সেদেশের মহিলা ব্যাপক দমন-পীড়নের শিকার। তালিবানরা নির্দেশ দিয়েছে, মহিলা পার্কে যেতে পারবেন না। মহিলাদের জিমে যাওয়ার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এছাড়া পুরুষ আত্মীয় সঙ্গে না থাকলে মহিলাদের ভ্রমণের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ঘরের বাইরে পা রাখলে মহিলাদের হিজাব ও বোরখা পরাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সরকারি চাকরিতে কর্মরত বেশিরভাগ মহিলাকে তালিবান জমানা শুরু হওয়ার পরে ছাঁটাই করা হয়েছে। শরীয়া আইনের কঠোর প্রয়োগ যদিও হয় তবে এর অনেকগুলো ধারায় সাংঘর্ষিক এবং অসংগতিপূর্ণ। তালেবানদের এইধরণের গোঁড়ামি নিঃসন্দেহে নিজেদের দুর্বলতা জাহির করা ছাড়া আর কিছু নয়।

সমাজের এই কঠোরতা এতো সহজে ভাঙবে না, যতদিন পর্যন্ত এই পিতৃতন্ত্র কায়েম থাকবে; নারীবিদ্বেষের অস্তিত্ব,নারীবিরোধী মানসিকতা, ধর্ষণ,খুন,নির্যাতন চলতে থাকবে। নারীদের প্রথমে ইরানী মহিলাদের মতো অশুভ অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়তে হবে, লিঙ্গবৈষম্যকে বিলুপ্ত করার দায় সমাজে নারী-পুরুষ সকলের। এই বৈষম্য দূর করতে একমাত্র মানুষই পারবে। যেভাবে পারে গোটা পৃথিবী আলোকিত করতে।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...