Monday, November 21, 2022

শরিয়া আইন আগ্রাসনে আফগান মহিলারা


আফগানিস্তানে পূর্ণ শরিয়া আইন প্রয়োগের নির্দেশ তালেবান নেতার। আফগানিস্তান থেকে যখন সোভিয়েত সৈন্যরা পিছু হটলো, তখন ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে উত্তর পাকিস্তানে এই তালেবান আন্দোলনের জন্ম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনীর প্রায় দুই দশকের উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে রাজধানী কাবুল দখল করার পর তালিবানরা নিজেদেরকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে। আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার পর তালিবানরা বলেছে যে তারা শরীয়া বা ইসলামী আইনের ভিত্তিতে দেশটি শাসন করবে। এই শরীয়া আইন নিয়েই উঠে এসেছে একগুচ্ছ প্রশ্ন।

তালিবান শরীয়া আইনের (Shariya Law) কঠোর প্রয়োগ, বিশেষ করে খুনী ও ব্যভিচারীদের জন্য প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মতো শাস্তির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। প্রসঙ্গত, আফগানিস্তানে সমস্ত মহিলাদের প্রকাশ্যে হিজাব পরতে হয়। কিন্তু তালিবানের দাবি, মহিলাদের প্রকাশ্যে সম্পূর্ণ শরীর এবং মুখ ঢাকা পোশাক পরতে হবে। বোরখা ছাড়া বাইরে বেরনো যাবে না। কিন্তু রাজধানী কাবুল-সহ শহুরে এলাকায় অনেক মহিলাই মুখ ঢাকছেন না বলে অভিযোগ। তার বদলে কেউ কেউ সার্জিক্যাল মাস্ক পরে ঘুরছেন। মেয়েদের হাইস্কুলে পড়া নিয়েও ইউ-টার্ন নিয়েছে তালিবান সরকার।

আফগানিস্তানে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি অপরাধের শাস্তি হিসেবে ইসলামী শরিয়া আইন মোতাবেক অঙ্গচ্ছেদ ও পাথর ছোড়ার মত সাজা দেওয়ার জন্য বিচারকদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন তালেবান নেতা হায়বাতুল্লাহ আখুন্দজাদা।তালেবান মুখপাত্র জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ গত রোববার রাতে টুইটারে এক পোস্টে এ বিষয়ে জানিয়েছেন বলে জানায় বিবিসি। জাবিহউল্লাহ তার পোস্টে লেখেন, মোল্লা আখুন্দজাদা একদল বিচারকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর ‘বাধ্যতামূলক’ এ আদেশ আসে।

তালেবানদের মতে শরিয়া আইনের আওতায়‘চোর, অপহরণকারী এবং রাষ্ট্রদ্রোহীদের মামলাগুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে। এসব মামলায় অপরাধ (হুদুদ এবং কিসাস) বিবেচনা করে ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী বিচার করতে হবে। হুদুদ সেসব অপরাধকে নির্দেশ করে, যেগুলোতে ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সাজা দেওয়া বাধ্যতামূলক। যেমন- ব্যভিচার, মদ্যপান, চুরি, অপহরণ, ডাকাতি, ধর্মত্যাগ এবং ধর্মদ্রোহিতার মতো অপরাধ। অন্যদিকে, কিসাস নির্দেশ করে বদলা নেওয়ার বিষয়টি (চোখের বদলে চোখ)। কিসাসের অন্তর্ভুক্ত হত্যা, ইচ্ছাকৃত আঘাতের মতো অপরাধগুলো। কিসাসভুক্ত অপরাধগুলোতে ভিক্টিমের পরিবার চাইলে ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে অপরাধীকে ক্ষমা করে দিতে পারবেন।

শুধু অপরাধ নয়, বিয়ে, বিচ্ছেদ সহ সমস্ত বিষয়েই কড়া বিধি রয়েছে শরিয়া আইনে। বর্তমানে ৫০টি দেশে এই শরিয়া আইনের কিছু কিছু অংশ মানা হয়। তার মধ্যে ৮টি দেশে কট্টর শরিয়া আইন মেনে চলা হয়। সৌদি আরব, ইরান, ব্রুনেই, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, পাকিস্তান, নাইজিরিয়া, কাতার। সৌদিতে অবশ্য সম্প্রতি মেয়েদের একা বাড়ি থেকে বেরনো এবং গাড়ি চালানোর অনুমতি দিয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ছিল তালিবান। তখন সেখানে কট্টর শরিয়া আইন পালন করা হত। রাস্তায় পাথর ছুড়ে অপরাধী সাজা তাছাড়া মেয়েদের ঘরবন্দি করা হয়েছিল। ২০০১ থেকে ক্রমে ধীরে ধীরে স্বাধীন হয়েছে আফগানিস্তান। মেয়েরা স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ফের তালিবান ক্ষমতায় আসায় স্বাভাবিকভাবেই চাপে আফগানরা। 

১৯৯০ এর দশকে তালেবান যখন প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিল তখন জনসম্মুখে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কারণে সমালোচিত হয়েছিল। গতবছর দ্বিতীয়বার আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর তারা তাদের শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে যুগের সঙ্গে তাল মেলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পালনে তাদের খুব একটা আগ্রহ নেই। বরং নারীদের বিভিন্ন অধিকার ও স্বাধীনতা খর্ব করার মধ্য দিয়ে তারা পুনরায় আগের শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে তালেবান নারীদের জন্য কাবুলের সব পার্কে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে।

একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে নোবেল জয়ী মালালা ইউসুফজাই - যিনি পাকিস্তানে মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারের পক্ষে প্রচারণার চালানোর কারণে ১৫ বছর বয়সে তালেবানের গুলিতে আহত হয়েছিলেন - সতর্ক করে বলেছেন যে শরীয়া আইনের তালেবানী দেশটির নারী ও কন্যা শিশুদের নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।"আফগানিস্তানে নারীসহ কিছু মানবাধিকার কর্মীর সাথে কথা বলার সুযোগ আমার হয়েছে। তারা তাদের উদ্বেগ জানিয়ে আমাকে বলেছেন যে তারা নিশ্চিত নন যে তাদের জীবন কেমন হতে যাচ্ছে," বিবিসিকে বলেন তিনি। তাদের অনেকেই ১৯৯৬-২০০১ সময়কালে যা ঘটেছিল তা স্মরণ করেছেন, এবং তারা তাদের নিরাপত্তা, অধিকার, সুরক্ষা এবং স্কুলে যাওয়া নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

তালিবান নেতা আকুন্দজাদার নির্দেশ কঠোর শরিয়তি আইন প্রয়োগ করতে হবে সর্বোচ্চ বিচারকদের। তালিবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর থেকে সেদেশের মহিলা ব্যাপক দমন-পীড়নের শিকার। তালিবানরা নির্দেশ দিয়েছে, মহিলা পার্কে যেতে পারবেন না। মহিলাদের জিমে যাওয়ার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এছাড়া পুরুষ আত্মীয় সঙ্গে না থাকলে মহিলাদের ভ্রমণের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ঘরের বাইরে পা রাখলে মহিলাদের হিজাব ও বোরখা পরাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সরকারি চাকরিতে কর্মরত বেশিরভাগ মহিলাকে তালিবান জমানা শুরু হওয়ার পরে ছাঁটাই করা হয়েছে। শরীয়া আইনের কঠোর প্রয়োগ যদিও হয় তবে এর অনেকগুলো ধারায় সাংঘর্ষিক এবং অসংগতিপূর্ণ। তালেবানদের এইধরণের গোঁড়ামি নিঃসন্দেহে নিজেদের দুর্বলতা জাহির করা ছাড়া আর কিছু নয়।

সমাজের এই কঠোরতা এতো সহজে ভাঙবে না, যতদিন পর্যন্ত এই পিতৃতন্ত্র কায়েম থাকবে; নারীবিদ্বেষের অস্তিত্ব,নারীবিরোধী মানসিকতা, ধর্ষণ,খুন,নির্যাতন চলতে থাকবে। নারীদের প্রথমে ইরানী মহিলাদের মতো অশুভ অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়তে হবে, লিঙ্গবৈষম্যকে বিলুপ্ত করার দায় সমাজে নারী-পুরুষ সকলের। এই বৈষম্য দূর করতে একমাত্র মানুষই পারবে। যেভাবে পারে গোটা পৃথিবী আলোকিত করতে।

No comments:

Post a Comment

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...