আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘সেইডেয়ার’ থেকে ।সুইসাইড বা আত্মহত্যা আজ আর কারো কাছে অপরিচিত নয়। হয়তো এমন কোনো দিন খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হবে যেদিন দেশের কোথাও না কোথাও আত্মহত্যা ঘটেনি। পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট, ফেসবুক, টিভি অন করলেই কোনো না কোনো আত্মহত্যার খবর সামনে ভেসেই আসে। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো আত্মহত্যার নৈতিকতার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করেছেন। তিনি মনে করেছেন, যখন কেউ রাষ্ট্রীয় আইনে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত হন অথবা দুর্ভাগ্যবশত জীবন ধারণে অপারগ হন অথবা অপ্রত্যাশিত অপমানে জর্জরিত হন তখন তার আত্মহত্যা করা অনৈতিক নয়। অনৈতিক হয় না। একটি সূত্রমতে, গোটা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৮ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে থাকেন। তার মানে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ১ জন করে আত্মহননের পথ বেছে নেন। এই সংখ্যার মধ্যে ভারতেই ২০২১-এ আত্মহত্যার কারণে মৃত্যু হয়েছে ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৩৩ জনের। এমনই তথ্য উঠে এসেছে ‘ন্যাশনাল ক্রাইম স্টেশন ব্যুরো’-র সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে। এনসিবি-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে প্রতি ১০ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে ১২০ জনের মৃত্যুর কারণই হল আত্মহত্যা।
আমাদের সমাজে আত্মহত্যা যেকোনো ঘাতক ব্যাধি থেকে অধিক দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং ইহা সমাজ তথা দেশকেও রাখছে সর্বক্ষণ ভীতির মুখে। বর্তমানে যেকোনো বয়সের মানুষই আত্মহত্যা নামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বিয়ে নামক দাসপ্রথায় আবদ্ধ হয়ে সম্প্রতি বাড়ছে গৃহবধূ আত্মহত্যা। বিবাহিত মেয়েদের আত্মহত্যার ক্ষেত্রে পরিবার কিংবা স্বামীর ইন্ধন দেখা যায়। নারীর ক্ষেত্রে অধিকাংশই ইভ টিজিং, যৌতুকের চাপ, অভাব, হতাশা, পারিবারিক কিংবা সামাজিক নির্যাতনের মতো ঘটনায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। একজন নারী বিয়ের পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দৈনন্দিন জীবন সংসারে প্রাত্যহিকতার বেড়াজালে আটকে পড়েন। মন খুলে কথা বলার বা কথা শোনার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার যেহেতু অভাব রয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি নারীকে যে নানা ধরণের মানসিক নিগ্রহের শিকার হতে হয়, তার একটি বড় অংশ হয় নেতিবাচক নানা শব্দের মাধ্যমে। কোন ঝগড়া বিবাদে নারী বিভিন্ন ধরনের মৌখিক সহিংসতার শিকার হয়। খেয়াল করেছি হয়তো, আমাদের আশপাশে প্রচলিত বেশিরভাগ গালিগালাজ এর সাথে স্ত্রী লিঙ্গের সম্পর্ক রয়েছে। অনেক তিরস্কারমূলক শব্দের মধ্যে পুরুষবাচক তো কোন শব্দই নেই।
নারীরা আসলে খুব সহনশীল, কিন্তু সহ্যেরও একটা সীমা রয়েছে। বেশিরভাগ মেয়েরই ১৮ বছর হবার সাথে সাথেই বিয়ে হয়ে যায়, যেটা বিয়ের আইনগত বয়স বা এর থেকে কমবয়সী মেয়েদেরকে পরিয়ে দেয়া হয় বিয়ের শিকলে। সে স্ত্রী এবং পুত্রবধূ হয়ে শ্বশুর ঘরে যায় আর তার গোটা সময়টা কাটায় ঘরের চার দেয়ালের মাঝে - রান্না, ধোয়ামোছা আর ঘর গৃহস্থালির নানা কাজে। বিয়ে প্রথায় লোভী পুরুষ মানসিকভাবে নির্যাতন করে স্ত্রী কে, তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ পর যাতে সামাজিকভাবে আবার দ্বিতীয়, তৃতীয় বা তার অধিক নারীর কাছ থেকে পেতে পারে সে চরম সুখ। তার ওপর আবার চাপিয়ে দেয়া হয় নানা ধরনের বিধিনিষেধ। ব্যক্তি স্বাধীনতা বলতে তার কিছুই প্রায় থাকে না। থাকে না আর্থিক স্বাধীনতাও - নিজস্ব অর্থ বলতে তার হাত থাকে প্রায় শূন্য। তার শিক্ষা বা ভবিষ্যতের স্বপ্ন সব কিছু তাকে বিসর্জন দিতে হয়। তার আশা আকাঙ্ক্ষার ধীরে ধীরে অপমৃত্যু শুরু হয়। ফলে হতাশা আর ব্যর্থতার গ্লানি তাকে গ্রাস করতে শুরু করে। তখন তার কাছে শুধু জীবনধারণ একটা যন্ত্রণার মত মনে হয়।
আমাদের সমাজে আত্মহত্যাকে ধর্মীয় দৃষ্টিতে পাপ হিসেবে দেখা হয়। ফলে কেউ নির্যাতন, নিপীড়ন ও অবহেলার শিকার হয়ে যদিও বা বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ, ধর্মীয় কারণে তার অন্তুষ্টিক্রিয়ায় ও দেয়া হয় নানা ধরনের ফতুয়া। আত্মহত্যার কারণ যতই সংবেদনশীল হোক না কেন এক্ষেত্রে। আত্মহত্যার পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। সহজে একজন মানুষ তার নিজ জীবনের পরিসমাপ্তি চায় না। যে কোনোভাবে বেঁচে থাকার আকাঙ্খাই প্রবল এবং বড় সত্য মানবজীবনে।
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ভারতে গত বছর ২২ হাজার ৩৭২ জন গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ ভারতীয় গৃহবধূদের মধ্যে আত্মহত্যার হার প্রতিদিন গড়ে ৬১ আর মিনিটের হিসাাবে প্রতি ২৫ মিনিটে একজন। ২০২০ সালে মোট এক লক্ষ ৫৩ হাজার ৫২ টি আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে - তার মধ্যে ১৪.৬% ক্ষেত্রেই আত্মহত্যা করেছেন গৃহবধূরা। আর মোট আত্মহত্যার ৫০ শতাংশেরও বেশি ঘটনায় গৃহবধূরাই আত্মহননের পথে গেছেন।১৯৯৭ সালে আত্মহত্যার পরিসংখ্যান সংকলন করতে শুরু করে এবং সেটা তারা করে পেশার ভিত্তিতে। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে ভারতে প্রতিবছর বিশ হাজারের বেশি গৃহবধূ আত্মহত্যা করছেন। ২০০৯ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছিল ২৫ হাজার ৯২। বিগত ৫ বছরে ১৩৫৩০ জনের আত্মহত্যায় উত্তরপূর্বে শীর্ষে আসাম,দেশে শীর্ষে মহারাষ্ট্র (৯৬৬৫০)
-কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ দপ্তর। রিপোর্টে এধরনের আত্মহত্যার জন্য সবসময়ই দায়ী করা হয়েছে "পারিবারিক সমস্যা" অথবা "বিবাহ সংক্রান্ত সমস্যাকে"। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ ব্যাপক মাত্রার পারিবারিক সহিংসতা। সরকার পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে অংশ নেয়া নারীদের ৩০% বলেছেন, তারা স্বামীদের হাতে নিগ্রহ ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। সেইসাথে প্রতিদিন জীবনের ঘানি টানা আর সংসারের প্রাত্যহিক শ্রম তাদের দাম্পত্য জীবনকে কঠিন করে তুলছে, সংসারে তাদের জন্য দমবন্ধ করা অবস্থা তৈরি হচ্ছে।
চলমান পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে জীবন কাটানোর পরেও অনেক নারী যে তাদের মাথা ঠিক রেখে জীবন চালাতে পারছেন, তার একটা বড় কারণ হল তাদের পেছনে ব্যক্তিগত সাহায্য সমর্থনের অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ।আত্মহত্যার এই সামাজিক ব্যাধি শতভাগ নির্মূল করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। মানুষ হিসেবে নিজেকে জানতে হবে। সামাজিক দায়িত্ববোধ, পারিবারিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক অনুশাসনগুলো যথার্থভাবে মেনে চললেই অনেকাংশে এটা রোধ করা সম্ভব। মানুষ হিসেবে কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, যদি উপলব্ধি করেন সমাজ প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য, তবে তার পক্ষে আত্মহত্যা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা সাধারণত দুইধরনের।ইমপালসিভ (হঠাৎ আত্মহত্যা) এবং ডিসিসিভ (সিদ্ধান্ত নিয়ে বা পূর্বপরিকল্পিত)। তবে ডিসিসিভ আত্মহত্যাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য। আত্মহত্যা হুট করে হয় না। অনেক পরিকল্পনা করে এগোতে হয়। এ সময় আশপাশের মানুষ যদি একটু খেয়াল করেন তাহলে তারা সমস্যাগুলো বুঝতে পারেন। এ অবস্থায় যদি তারা উদ্যোগী হয় তাহলে বিষয়টি তখন পারিবারিকভাবে সমাধানে এগিয়ে মীমাংসা করা সম্ভব হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, গৃহবধূদের বাবা-মায়েরা তখন এই বিষয়ে বেখেয়ালে থাকেন, আবার কখনো কখনো নিজেরাই মেয়ের মনকে বিষিয়ে তোলেন। এভাবে তারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে শেষে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা নিতে ছুটে যান।
আত্মহত্যার বিষয়টি নিয়ে সমাজে খোলাখুলিভাবে কথা বলা হয় না। বিষয়টি এখনও গোপন রাখার প্রবণতা দেখা যায়, কারণ আত্মহত্যাকে পরিবারের জন্য লজ্জার বিষয় হিসাবে অনেকে দেখেন। গ্রাম এলাকায় ময়না তদন্তের প্রয়োজন থাকে না এবং অপেক্ষাকৃত ধনী পরিবারগুলো বিভিন্ন পন্থা অবলম্বনে আত্মহত্যাকে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হিসাবে নথিভুক্ত করায়। অনেক সময় প্রশাসনের নথিও যাচাই করা হয় না।এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের অনেক ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। যৌতুক, গৃহনির্যাতন, বহুবিবাহ সম্পর্কিত খবর ও এগুলোর কুফলের পাশাপাশি আত্মহত্যার পথে না গিয়ে বিকল্প পথে জীবন গঠনের উপায় নিয়ে বেশি বেশি সংবাদ প্রকাশিত হওয়া দরকার। তাহলে তা এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারবে।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আত্মহত্যার প্রবণতা কমিয়ে আনতে শিশুকাল থেকেই মা-বাবার আন্তরিক আচরণ বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। আত্মহত্যার পেছনে যেসব কারণ দায়ী এসব চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে এর প্রবণতা বাড়তেই থাকবে।বিগত দিনে গৃহবধূ আত্মহত্যার কারণগুলো দর্শীয়ে, প্রত্যেক প্লেটফোর্মে, সামাজিক মাধ্যম, গণমাধ্যমের সাহায্যে মনোবিজ্ঞানী বিশেষজ্ঞ দ্বারা সচেতনতামূলক কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কলেজ, ইউনিভার্সিটি লেভেলে কোর্স কারিকুলামে এই ধরণের বিষয় ইনক্লুড করা। যাতে পরবর্তীতে একজন নারী সহজেই সংযত রাখতে পারে, মানসিক ভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে,বিয়ে নামক দাসপ্রথার বিরুদ্ধে লড়তে পারে। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবাইকে সজাগ, সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে, সকলকে সচেতন করতে হবে।