Thursday, December 15, 2022

ইরান ফুটবলারের মৃত্যুদণ্ড প্রসঙ্গে


ইরান পুঁজিবাদ অনুসারী দেশ।নারী–পুরুষ–ছাত্র–যুব নির্বিশেষে সমাজের সমস্ত অংশের ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণে এই গণআন্দোলনের শক্তি এতটাই বেড়েছে যে তা ক্ষমতাসীন মৌলবাদী–ফ্যাসিবাদী শাসকের চোখে চোখ রেখে অত্যাচারী জমানা বদলের আওয়াজ তুলছে৷ রাষ্ট্রের দমনপীড়নে ইতিমধ্যেই চারশোর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে৷আজ ইরানে যা চলছে তা হলো প্রগতিশীলতার বধ্যভূমি প্রস্তুত করা। এটা কি কোন সভ্য দেশের কাজ ? ধুর। একজন কে মৃত্যু দণ্ড দিলেই কি আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে ? একসময় শাহ র আমলে হিজাব বা বোরখা পুরো নিষিদ্ধ ছিল ১৯৮৯ ধর্মীয় অন্ধকার কে পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয়।

একটা পুঁজিবাদী দেশে ধর্মীয় বিধিনিষেধ দিয়ে অন্ধকারে ঠেলে দেয়া কতটা আক্রমণাত্মক তা ইরানকে দেখলেই বুঝা যায়। কারণ ভীতি প্রদর্শন করে মালাই খাওয়া দস্তুর। আসলে এটা শুধু ইরানে না, ধর্মীয় অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে প্রগতিশীলতা পিছনে ফেলে দেয়া হয়। কাতার বিশ্বকাপে মরক্কো কে তো দেখেছিই। আশরাফ হাকিমিরা ধর্মীয় গেড়াকল থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে নতুন আঙ্গিকে সাজিয়ে তুলেছে বিশ্বদরবারে। আসলে ইরান আমেরিকাকে ফলো করেই ধর্মীয় অন্ধকার আবার ফিরিয়ে এনেছে। ধর্মের নামে রাজনীতি এটা তো আবহমান কালের প্রচলিত ধারা।

রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর 'রামরাজ্য ও মার্ক্সবাদ' বইয়ে লিখছেন 'বিবর্তন বাদ ধর্মের মূলে এমন আঘাত করে যে তার ভিত্তিই নড়ে ওঠে। নিজের নিন্দনীয় পুঁজিবাদী সমাজ বহাল রাখার জন্য ধর্ম ও ঈশ্বরের সবথেকে বড় পৃষ্ঠপোষক আমেরিকা এজন্যই তাদের বেশ কিছু --বিশ্ব বিদ্যালয় গুলোতে বিবর্তনবাদ বিষয়ক পঠন-পাঠন ও আলোচনা বন্ধ করে দিয়েছে ।' (পৃঃ ৫৭)

জার্মান সংবাদপত্র ‘আনজেরে জাইট’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘তুদে পার্টি’র আন্তর্জাতিক মুখপাত্র মহম্মদ ওমিদভার জানাচ্ছেন, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইরানে ৪০ শতাংশের বেশি জনগণ দারিদ্র সীমার নিচে৷ বেকারত্ব ভয়াবহ, কোনও কোনও প্রদেশে তা ৭০ শতাংশের বেশি৷ এর সঙ্গে জুড়ে আছে শাসকদের সীমাহীন দুর্নীতি৷ আর চলছে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের নির্মম দলন৷ সৌদি আরবের শাসকরা এবং আফগানিস্তানের তালিবানরা মহিলাদের উপর যে ধরনের ফতোয়া জারি করেছে, ইরানেও তাই৷ মানুষ হিসাবে যে বুনিয়াদি অধিকার থাকা উচিত, তার কিছুই ইরানের মহিলাদের নেই৷ এমনকী তার নিজের শরীরের উপর নিজের অধিরকারটুকুও নেই৷

ইরান ধর্মীয় মৌলবাদীদের দ্বারা শাসিত একটি পুঁজিবাদী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র৷ এ যে কী দুঃশাসন ইরানের জনগণ বিশেষ করে মহিলারা তা উপলব্ধি করছেন জীবন দিয়ে৷ মৌলবাদী শাসকরা মেয়েদের বিয়ের বয়স ধার্য করেছিল ৯ বছর৷ জনগণের প্রবল প্রতিবাদের সামনে পড়ে ২০০২ সালে পার্লামেন্ট মেয়েদের বিয়ের বয়স বাড়িয়ে করে ১৩ বছর৷ অধিকারের প্রশ্নে নারী–পুরুষের বৈষম্য ব্যাপক৷ পুরুষেরা মুখে তালাক বললেই বিবাহ–বিচ্ছেদ হয়ে যায়৷ কিন্তু নারী বিবাহ বিচ্ছেদ চাইলে তাকে যেতে হবে কোর্টে৷ একজন বিবাহিত মহিলা বিদেশে যাওয়ার পাসপোর্ট পাবে না, যদি না স্বামী লিখিত অনুমতি দেয়৷ সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক বৈষম্য৷ স্বামী মারা গেলে তার সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার নগণ্য, মাত্র সাড়ে ১২ শতাংশ৷ কিন্তু স্ত্রী মারা গেলে, তার সম্পত্তি পুরোটাই পাবে স্বামী৷ পৈত্রিক সম্পত্তিতে মেয়ের ভাগ ছেলেদের অর্ধেক৷ বিচারবিভাগে মেয়েদের চাকরির কোনও অধিকার নেই৷ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও মেয়েদের দাঁড়ানো নিষিদ্ধ৷ কোনও কোনও ধর্মীয় নেতা এমনও বাণী দিচ্ছে যে মহিলাদের মস্তিষ্কের শক্তি পুরুষের অর্ধেক৷ সব মৌলবাদের বহিরঙ্গে পার্থক্য যাই থাক, মর্মবস্তুতে এরা এক৷ এদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রগতির পথে প্রতিবন্ধক৷

ইরান আদালতের মতে, ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে শত্রুতা’। সম্পূর্ণ নির্বোধতা আর কাপুরুষতা। মূল কথা হলো আমির নাসের আজদানির মৃত্যুদণ্ড,নিন্দনীয় এবং কুপমূন্ডকতা ছাড়া কিছু নয়। সবশেষে পুঁজিবাদ ও ধর্মীয় অন্ধকার নিপাত যাক।

Tuesday, December 13, 2022

বিতর্কিত দেওয়াল লিখন জেএনইউ-তে


আবারও বিতর্ক ঘিরে দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় জেএনইউ ( Jawahar Lal Nehru University) । এবারের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে কোন অজ্ঞাত পক্ষের দ্বারা দেয়াল লিখন হয় --- ক্যাম্পাসের ভেতরে স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের দেওয়ালে কারা যেন লাল কালিতে লিখে রাখল ফতোয়ার ঢং-এ একাধিক বিতর্কিত বার্তা। কোথাও লেখা হয়েছে ‘ব্রাহ্মণরা ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাও’, কোথাও লেখা ‘বানিয়ারা (বৈশ্য) দূর হটো’, কোথাও বা ‘শাখায় (সংঘ) ফিরে যাও’, ‘আমরা বদলা নিতে আসছি’ ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে একটি বিবৃতি জারি করা হয়েছে৷ 

অজ্ঞাতনামাদের কুকীর্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের দেওয়াল ব্রাহ্মণ তথা বৈশ্যবাদের বিরুদ্ধে স্লোগানে ভরে উঠল। রীতিমতো শাসানি দিয়ে বলা হল ‘ব্রাহ্মণরা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাও’, ‘ব্রাহ্মণ ভারত ছাড়ো’ আবার কোনওটিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখা রয়েছে, ‘এখানে রক্ত ঝরবে’, ‘ব্রাহ্মণ-বৈশ্য, আমরা তোমাদের জন্য আসছি। আমরা সংখ্যায় বেশি রয়েছি।’ ইতিমধ্যে এই ঘটনা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিনীত জিন্দাল দিল্লি পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন। এই মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনত দণ্ডবিধির ধারা ১৫৩এ/বি, ৫০৫, ৫০৬, ৩৪ এর অধীনে মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে বলে দিল্লি পুলিশের দাবি।

এমনিতেই দেশের প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জেএনইউ বা জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ডান ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের মধ্যে কথায় কথায় হরদম সংঘাত সেখানে রোজকার বিষয়। গেরুয়া শিবিরের তরফে জেএনইউ-র বামমনস্ক ছাত্র সংগঠনের পড়ুয়াদের কখনো ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’, কখনও ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে। কেন্দ্রীয় শাসক দলীয় শিবিরের কাছে আজও জেএনইউ পঠনপাঠনের পীঠস্থান নয়, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদের আঁতুরঘর’ বলে চিহ্নিত করা হয়। জেএনইউ দেয়াল লিখন কোন নতুন বিষয় নয়। সময়ে সময়ে অনেক রাজনৈতিক বিতর্কে বেশ চর্চায় রয়েছে। কিন্তু এবারের বিতর্কের ঝড় বেশ তাৎপর্য বহন করছে। বিশেষ করে দুটো সম্প্রদায়কে কোন অজ্ঞাত পক্ষ আক্রমণ করার জন্য বেছে নিয়েছে। তবে এবারের বিষয় ব্রাহ্মণ ও বানিয়া সমাজে আক্রমণ করায় এর তীব্র প্রতিক্রিয়া সংবাদ শিরোনাম দখল করেছে।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে চলা বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচন তথা আগামী লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ধরণের স্পর্শকাতর বিষয় উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে করা হয়েছে বলে বুদ্ধিজীবী মহলে সরগোল চলছে। যদিও এই ধরণের ইস্যুর বাস্তব ভিত্তি নেই, তদুপরি একটা জাতিয়তাবাদী বিষয় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এনে একে অপরের সাথে সংঘাত বাঁধানো কি কোন সংকীর্ণতার কাজ নয় ? মানে, দেয়াল লিখন দিয়ে কি বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে ?

আচ্ছা, বিশ্লেষণের সুবিধার্থে ব্রাহ্মণ-বানিয়া (বৈশ্য) বিরোধী শ্লোগান লিখা পক্ষকে যদি বামপন্থা বা দলিত সংগঠনের বিচারধারার মানুষ ধরে নেয়া হয়, তবে এই ধরণের শ্লোগান লেখার পেছনে লুকিয়ে আছে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমির সাথে বর্তমান উচ্চবর্ণের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মানসিকতা এবং বিশেষ করে সংবিধানের ১০৩ নং সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চবর্ণের আর্থিকভাবে দুর্বলদের দেয়া ১০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চিন্তা বা নির্বাচনে দলিত বামপন্থী এবং অন্য শ্রেণীর ব্যাক্তিকে বিজেপির বিরুদ্ধে একজোট করার চিন্তা। যেখানে তাদের বিচারধারা দরশায় জাত-পাত, উচ্চ - নীচের বিভাজনে ব্রাহ্মণ্যবাদের নামে ব্রাহ্মণ বানিয়া শ্রেণী শৈক্ষিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বা আরও বিভিন্ন দিকে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরও দলিত ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণী থেকে বহুগুণ অগ্রসর হয়ে আছে তা বিভিন্ন প্রতিবেদনে লক্ষিত। তবু বামপন্থী বা দলিত বিচারধারার কারোর দ্বারা যদি এইধরণের দেয়াল লিখন হয় তবে এটা জাতিগত আক্রমণ। এইধরণের সংকীর্ণ মানসিকতা এবং কাজ নিন্দনীয়।

অপরদিকে, এই দেয়াল লিখনের কাজ যদি এবিভিপি বা বিজেপি সমর্থিত কারো কাজ হয়ে থাকে, ধরে নেয়া হয়, তবে একটা অযৌক্তিক বিষয় নির্বাচনে ইস্যু বানিয়ে উচ্চবর্ণের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা বা জেএনইউ-র বামপন্থী বা দলিত গতিবিধি সাম্প্রদায়িকতা ছড়াচ্ছে দেখিয়ে দেশের জনগণকে বামপন্থী বা বিজেপি বিরোধী সমর্থন থেকে নিজেদের দিকে টেনে আনার অভিপ্রায়। অথবা দেশে জাতিবাদ বা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। যদি এবিভিপি বা এই ধরনের কারো দ্বারা এই দেয়াল লিখন হয় তবে এটাও নিন্দনীয়।

এখন কথা হলো এই দেয়াল লিখন কি কোন বামপন্থী- দলিত বা এবিভিপি ছাড়া কোন তৃতীয় পক্ষের ষড়যন্ত্র। এইধরণের বিভেদমূলক মন্তব্য কারা করেছে, নিশ্চয় রাতের অন্ধকারে লিখা দেয়াল লিখন দিনের আলোয় উদ্ভাসিত হবে। কিন্তু নীরব দর্শক গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা থেকে এই আশা করতে পারে কি একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সঠিক তথ্য সিনাক্তকরণ হবে ?

আসলে এইধরণের ঘটনা কোন রাজনৈতিক মুনাফা না দেশহীতের কাজে ঠিক কোনটা তা স্পষ্ট ফুটে উঠছে না। এইধরণের বিভেদকামী বিষয় নিয়ে ভারতবর্ষে শান্তি সম্প্রীতি বিনষ্ট করে কোনভাবেই 'জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন' নেয়া সম্ভব নয়। যেকোন উন্নয়নশীল দেশ বিকাশ ও উন্নয়নে তাদের ফোকাস সেখানে ধর্মীয় মেরুকরণ, জাতীবাদ, নারী নির্যাতন, সাম্প্রদায়িকতা বাদ দিয়ে মননশীল প্রগতির পথে। তাই বিকাশ ও উন্নয়ন হোক প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। দল - পন্থা নির্বিশেষে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংগঠন এক গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল কাজে দেশের উন্নয়নে দূরদর্শী এবং দায়িত্বশীল হওয়ার সময় এখনই।

Monday, November 28, 2022

মূল্যবোধ : নৈতিকতার নিরিখে বিশ্লেষণ


মানুষের জীবনবোধের সঙ্গে নৈতিক মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যদিও মানুষ প্রাণী তবুও সে পশু নয়। তাইতো সমাজ বিজ্ঞানী ডেভিড পোপেনোরের মতে -- ' ভালো মন্দ, ঠিক বেঠিক, কাঙ্খিত অনাকাঙ্ক্ষিত সমাজের সদস্যদের যে ধারণা তার নামই মূল্যবোধ। মূল্যবোধের অবক্ষয় এখন চারিদিকে প্রকট হয়েছে। মূল্যবোধ বলতে সকলের মনে একটা ধারণা আসে যদিও সুস্পষ্টভাবে কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবু মূল্যবোধ সাধারণত আচার আচরণের একধরণের মান বা বোধ, কিছু আদর্শগত সমষ্টি যার দ্বারা মানুষ যেকোন কাজের ভালোমন্দ, শুদ্ধতা অশুদ্ধতা যাচাই করে অগ্রসর হতে পারে। মহাত্মা গান্ধীর মূল্যবোধের শিক্ষা বলতে সত্যবাদিতা, অহিংসা, নির্ভিকতা, সামাজিক সচেতনতা এবং দায়িত্ববোধ, সেবা প্রমুখ বিষয়ের উপর জোর দেয়া হয়। অর্থাৎ মূল্যবোধ কেবলমাত্র ব্যক্তিগত ভালোমন্দ বিচার করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় ইহার সামাজিক দিকগুলোও আছে যেগুলো খুব প্রয়োজনীয়। মূল্যবোধ হলো মানুষ তাঁর নিজের এবং সমাজের জন্য এক বিশেষ ' কোড অব কনডাক্ট' যার দ্বারা একজন মানুষ অথবা সমাজ উত্তরণের দিকে অগ্রসর হতে পারে।

মূল্যবোধ সবসময় একটা জায়গায় থেমে থাকে না। World Value Survey মূল্যবোধের ওপর বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। এই সংস্থার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বিভিন্ন শাখার বিজ্ঞানীরাও। এর এক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে যে মূল্যবোধ বা ভ্যালু বলা বস্তুটি কখনও একজায়গায় স্থির থাকে না। সমাজ পরিবর্তন, বিবর্তনের সাথে সাথে মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটে। World Value Survey (WVS) - এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী যখনই কোন দেশের ঔদ্যোগিক বিকাশ ( industrialization ) এবং তার উত্তর -ঔদ্যোগিক জ্ঞান সমাজের (post industrial knowledge society) দিকে যতই এগোচ্ছে ততই ঐ দেশের পরম্পরাগত মূল্যবোধ যেমন - পিতামাতা ও সন্তানের মধ্যে বন্ধন, পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক, ধর্মীয় গুরুত্ব, অন্যান্য এসবের প্রতি টান কমছে। তবে হ্যাঁ, ধর্মনিরপেক্ষ - যুক্তিবাদী ( Secular rational values) মূল্যবোধের মান বাড়ছে। এই পরম্পরাগত পারিবারিক সম্পর্ক বা ধর্মীয় ক্ষেত্রে যে মূল্যবোধের অবক্ষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে, এর ফলে কি মানুষের মধ্যে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য কতটা অবনতি হয়েছে? WVS এর প্রতিবেদনে বলা হয় ১৯৮১-২০০৭ সন পর্যন্ত মানুষের সুখ শান্তি এবং জীবনের সন্তুষ্টি বেড়েছে। World happiness index - এ নৈতিকতা ও মূল্যবোধের নিরিখে সুখি দেশের তালিকা প্রস্তুত করে। সেখানে আমরা দেখতে পাই সেই সুখি দেশগুলোর মধ্যে শান্তি, শৃঙ্খলা, সন্তুষ্টি, সৌজন্যতা, সহনশীলতা, প্রগতিশীলতা বিদ্যমান।তাহলে আমরা নিশ্চয় বুঝতে পারছি মূল্যবোধ কোনো অচল-অটল বস্তু নয়। সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটে।

কিন্তু এখন কথা হলো আসলে মূল্যবোধের আধার কি ? ইহা কি এমনিতেই গড়ে উঠে না এর কোন সামাজিক প্রেক্ষাপট আছে ? আমরা নিশ্চয় সেই উলঙ্গ রাজার কথা জানি। যেখানে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেছেন - 'সবাই দেখছে যে রাজা উলঙ্গ, তবুও সবাই হাততালি দিচ্ছে। সবাই চেঁচিয়ে বলছে; শাবাশ শাবাশ।' গল্পটা সবাই জানি। কিন্তু সেই গল্পের ভেতরে শুধু প্রশান্তি বাক্য উচ্চারণ কিছু আপাদমস্তক ভিতু, ফাঁকিবাজ, অথবা নির্বোধ স্তাবক ছিলনা। একটা শিশুও ছিল। সত্যবাদী, সরল, সাহসী একটা শিশু। এখন প্রশ্ন হলো রাজসভায় যারা মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের মূল্যবোধের অবস্থান কোথায়? মূল্যবোধ আসলে কোন বিমূর্ত বস্তু নয়। মূল্যবোধ সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, দ্বারা প্রভাবিত। আজকাল বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের মতবাদের প্রচার চলছে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ মতবাদ প্রচারে বিভিন্ন চিন্তা একত্রে প্রসারিত করার চেষ্টায়। এক দলতো জোরপূর্বক তার মূল্যবোধ চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টায়। বিশ্বের সমস্ত ঘটনাবলি মানুষের নখদর্পণে। বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক সফলতা আর নিত্যনতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে সবকিছু আজ মানুষের সাধ্যে। তা সত্ত্বেও পৃথিবী হয়ে পড়েছে হিংস্র, অশান্ত আর নৈরাজ্যের ঠাঁই। বর্তমান সমাজে বস্তুগত সমৃদ্ধির পরও এক বিরাট সংখ্যক মানুষের মধ্যে দেখা যায় অনৈতিকতা, সীমাহীন দুর্নীতি, ছলচাতুরী, চুড়ান্ত মিথ্যাচার । ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতার শীর্ষে থাকাটা স্থির করে নিয়েছে মানুষ।

এমন এক সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে যেখানে প্রগতিশীল, ঔদ্যোগিক ধ্যান ধারণার বিপরীতে মৌলবাদী, একাত্ববাদী ধ্যানধারণার বিকাশ। সৃষ্টি হয়েছে ভয়- শংকা - বিদ্বেষের পরিস্থিতি। ধর্মীয় মৌলবাদ এবং তজ্জনিত হিংস্রতায় সমাজ এক অস্থির সময়ে বিরাজ করছে। এটা সমগ্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমরা এখন ঔদ্যোগিক সভ্যতার দিকে এগোচ্ছি। উত্তর -ঔদ্যোগিক স্তর পেতে এখনও বাকি। এখনও আমরা অবৈজ্ঞানিক ধ্যান ধারণায় আচ্ছন্ন। তার সাথে আমাদের ঠেলা হচ্ছে ধর্ম-জাত-পাত, অসহিষ্ণুতা, নিম্নগামী যুক্তি তর্কের পরিবেশে। তাইতো এই দ্রোহকালে ভুলে গেছি সৌজন্য বিনিময়। তবে এইভাবে কি মূল্যবোধের উত্তরণ সম্ভব ? মূল্যবোধের জন্ম সমাজেই হতে হবে। বিজ্ঞানী ব্রাউনের মতে - ' যদি পৃথিবীতে নৈতিকতার মান প্রযুক্তিগত কলাকৌশলের বৈপ্লবিক অগ্রগতির সাথে অগ্রসর না হয়, তাহলে আমরা নিশ্চিন্ন হয়ে যাবে। শিক্ষার বিস্তার বিজ্ঞানের চমকপ্রদ আবিষ্কারের ফলে প্রযুক্তিগত বিরাট প্রসার ঘটছে, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে নৈতিকতার মান অগ্রসর হয় নি। মূল্যবোধের উত্তরণ ঘটছে না। তবে সংকীর্ণ চিন্তার পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভয়ানকভাবে উত্থান ঘটছে ধর্মীয় মৌলবাদের। এমন এক প্রচলিত সমাজে এর পরিবর্তনের দায়ভার কে নেবে? এরজন্য আমাদের শিক্ষক - অভিভাবক দুজনেরই সমান অংশীদারিত্বে পরিবর্তন সম্ভব। কারণ আগত ভবিষ্যত সমাজের মূল্যবোধ রক্ষার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। অর্থাৎ আজকের যেসকল স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাঁদেরই।

সমাজে শিক্ষকের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের ব্যাক্তিগত জীবনে যদি লক্ষ্য করি তবে দেখা যায় কোন এক আদর্শ শিক্ষকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পরিচর্যায় আমরা আজ এতোটা এগিয়েছি। তাঁদের ব্যাক্তিত্ব, কথাবার্তা, চিন্তাধারা, ভাবনায় আমরা মুগ্ধ। নৈতিক শিক্ষা বা বিদ্যায়তনিক শিক্ষায় যদিও উনাদের মতো অগ্রসর হতে পারিনি তবে আমাদের ব্যাক্তিত্বের ক্ষেত্রে কতটা ফলপ্রসূ তা নিশ্চয় আমরা বুঝতে পারি। কারণ ছাত্রর জীবনে একটা ছেলে বা মেয়ে ঘরের পর সবথেকে বেশি সময় কাটায় স্কুলে। সেখানে একে অপরের সঙ্গে মেলামেশা, সহপাঠীদের সঙ্গে সহমর্মিতা, গুরুজনদের প্রতি ভক্তি, সত্যের প্রতি নিষ্ঠা, মুক্ত চিন্তার ক্ষমতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এসবের মূল্যবোধের ধারণা ও অভ্যাস সেখানেই গড়ে উঠে। আর এই অভ্যাস গড়ে তোলার মূল নায়ক হলেন শিক্ষক। শিক্ষকই হচ্ছেন Role Model । একজন শিক্ষক পুঁথিগত জ্ঞানদানের সাথে সাথে একজন পথপ্রদর্শক, সহানুভূতিশীল, বন্ধুভাবাপন্ন ব্যাক্তি। যিনি ছাত্রছাত্রীদের মূল্যবোধ ও নৈতিকতার নিঃশুল্ক জ্ঞান দিয়ে থাকেন। সেইক্ষেত্রে একজন শিক্ষক শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষক নন, সমাজেরও। তাই শিক্ষকের দায়িত্ব হলো যতটুকু জানা ততটুকুই সঠিকভাবে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করা। মূল্যবোধ ও নৈতিকতার নিরিখে জাপান বেশ এগিয়ে। জাপানের একটি কথা আছে - 'A poor teacher tells, an average teacher teaches, a good teacher explains, and a great teacher inspires.' একজন শিক্ষক ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করার জন্য, সৎ পথে চলার জন্য, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার নিরিখে সমাজ জীবনে সুস্থ মস্তিষ্কে অগ্রসর হওয়ার জন্য প্রথমে নিজেকে সেইমতে গড়তে হবে। তাহলে তিনি ছাত্রছাত্রীর আদর্শ হিসেবে পরিগণিত এবং তাঁর প্রদত্ত শিক্ষাকে ছাত্রছাত্রীরা চিরদিন স্মরণ রাখবে।

সেই একই ভাবে আমরা যারা অভিভাবক আছি তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটা শিশুর প্রথম শিক্ষা তার ঘর থেকেই শুরু। চোখ খোলার পর ঘরকেই সে আপন করে নেয়। একটি শিশু প্রথমেই তার বাবা মা -র কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে বড় হয়। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কিধরনের ভূমিকা পালন করতে হয়, সততা, তাদের বিশ্বাস, আচার ব্যাবহার সবকিছুই বাবা মায়ের কাছ থেকে শেখে। অভিভাবকের মধ্যে যদি অসদাচরণ, অযৌক্তিক চিন্তা চেতনা, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার দেখা যায় তবে সেই শিশুটিও মানসিকভাবে সেইভাবেই গড়ে উঠে। সমাজে যদি মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রয়োজন আছে, ভালোবাসা, সৎ অসৎ বিচারের প্রয়োজন আছে তবে তার বীজ ঘরেই রোপণ করতে হবে এবং এর মূল হতে হবে মা-বাবা দুজনেই। মানবসমাজ সেই প্রাচীনকাল থেকেই মূল্যবোধ কে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। আকারে ক্ষুদ্র দ্বীপ হলেও নৈতিকতার জন্য ইংরেজরা পুরো বিশ্ব জয় করেছিল। অনৈতিক কাজ দ্বারা ক্ষমতাসীন হলেও ধ্বংস অনিবার্য। পি বি শেলীর বিখ্যাত 'Ozymandias' -এ বলেছিলেন - My name is Ozymandias, King of kings, Look on my works, ye mighty and despair.'

আলোচনার পরিসমাপ্তিতে এটুকু বলা যায় যে আমরা দিন দিন যেভাবে নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে হারিয়ে ফেলছি তাতে বর্তমান সমাজ রোগাক্রান্ত। পারস্পরিক মমত্ববোধ,প্রেম, সৌজন্যতা এসব আমরা হারিয়ে ফেলেছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে, যেখানে একটা সুস্থ সমাজ উপহার দিতে পারি। নীতি - ঔচিত্যবোধ, সামাজিক ন্যায় বিচার, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহিষ্ণুতা, শ্রমের মর্যাদা, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ, রাষ্ট্রীয় আনুগত্য চর্চার মাধ্যমে উন্নত, সভ্য ও কলুষমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব। সঠিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চাই পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

তথ্যসূত্রঃ
১) আনন্দবাজার পত্রিকা নবীন প্রজন্মের অবক্ষয় এখন সর্বত্র, ২৪ আগষ্ট, ২০১৯।
২) www. Worldvaluesservey.org
৩) www. Worldhappiness.report
৪) www. Wikipedia.org

Monday, November 21, 2022

শরিয়া আইন আগ্রাসনে আফগান মহিলারা


আফগানিস্তানে পূর্ণ শরিয়া আইন প্রয়োগের নির্দেশ তালেবান নেতার। আফগানিস্তান থেকে যখন সোভিয়েত সৈন্যরা পিছু হটলো, তখন ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে উত্তর পাকিস্তানে এই তালেবান আন্দোলনের জন্ম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনীর প্রায় দুই দশকের উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে রাজধানী কাবুল দখল করার পর তালিবানরা নিজেদেরকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে। আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার পর তালিবানরা বলেছে যে তারা শরীয়া বা ইসলামী আইনের ভিত্তিতে দেশটি শাসন করবে। এই শরীয়া আইন নিয়েই উঠে এসেছে একগুচ্ছ প্রশ্ন।

তালিবান শরীয়া আইনের (Shariya Law) কঠোর প্রয়োগ, বিশেষ করে খুনী ও ব্যভিচারীদের জন্য প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মতো শাস্তির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। প্রসঙ্গত, আফগানিস্তানে সমস্ত মহিলাদের প্রকাশ্যে হিজাব পরতে হয়। কিন্তু তালিবানের দাবি, মহিলাদের প্রকাশ্যে সম্পূর্ণ শরীর এবং মুখ ঢাকা পোশাক পরতে হবে। বোরখা ছাড়া বাইরে বেরনো যাবে না। কিন্তু রাজধানী কাবুল-সহ শহুরে এলাকায় অনেক মহিলাই মুখ ঢাকছেন না বলে অভিযোগ। তার বদলে কেউ কেউ সার্জিক্যাল মাস্ক পরে ঘুরছেন। মেয়েদের হাইস্কুলে পড়া নিয়েও ইউ-টার্ন নিয়েছে তালিবান সরকার।

আফগানিস্তানে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি অপরাধের শাস্তি হিসেবে ইসলামী শরিয়া আইন মোতাবেক অঙ্গচ্ছেদ ও পাথর ছোড়ার মত সাজা দেওয়ার জন্য বিচারকদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন তালেবান নেতা হায়বাতুল্লাহ আখুন্দজাদা।তালেবান মুখপাত্র জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ গত রোববার রাতে টুইটারে এক পোস্টে এ বিষয়ে জানিয়েছেন বলে জানায় বিবিসি। জাবিহউল্লাহ তার পোস্টে লেখেন, মোল্লা আখুন্দজাদা একদল বিচারকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর ‘বাধ্যতামূলক’ এ আদেশ আসে।

তালেবানদের মতে শরিয়া আইনের আওতায়‘চোর, অপহরণকারী এবং রাষ্ট্রদ্রোহীদের মামলাগুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে। এসব মামলায় অপরাধ (হুদুদ এবং কিসাস) বিবেচনা করে ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী বিচার করতে হবে। হুদুদ সেসব অপরাধকে নির্দেশ করে, যেগুলোতে ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সাজা দেওয়া বাধ্যতামূলক। যেমন- ব্যভিচার, মদ্যপান, চুরি, অপহরণ, ডাকাতি, ধর্মত্যাগ এবং ধর্মদ্রোহিতার মতো অপরাধ। অন্যদিকে, কিসাস নির্দেশ করে বদলা নেওয়ার বিষয়টি (চোখের বদলে চোখ)। কিসাসের অন্তর্ভুক্ত হত্যা, ইচ্ছাকৃত আঘাতের মতো অপরাধগুলো। কিসাসভুক্ত অপরাধগুলোতে ভিক্টিমের পরিবার চাইলে ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে অপরাধীকে ক্ষমা করে দিতে পারবেন।

শুধু অপরাধ নয়, বিয়ে, বিচ্ছেদ সহ সমস্ত বিষয়েই কড়া বিধি রয়েছে শরিয়া আইনে। বর্তমানে ৫০টি দেশে এই শরিয়া আইনের কিছু কিছু অংশ মানা হয়। তার মধ্যে ৮টি দেশে কট্টর শরিয়া আইন মেনে চলা হয়। সৌদি আরব, ইরান, ব্রুনেই, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, পাকিস্তান, নাইজিরিয়া, কাতার। সৌদিতে অবশ্য সম্প্রতি মেয়েদের একা বাড়ি থেকে বেরনো এবং গাড়ি চালানোর অনুমতি দিয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ছিল তালিবান। তখন সেখানে কট্টর শরিয়া আইন পালন করা হত। রাস্তায় পাথর ছুড়ে অপরাধী সাজা তাছাড়া মেয়েদের ঘরবন্দি করা হয়েছিল। ২০০১ থেকে ক্রমে ধীরে ধীরে স্বাধীন হয়েছে আফগানিস্তান। মেয়েরা স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ফের তালিবান ক্ষমতায় আসায় স্বাভাবিকভাবেই চাপে আফগানরা। 

১৯৯০ এর দশকে তালেবান যখন প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিল তখন জনসম্মুখে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কারণে সমালোচিত হয়েছিল। গতবছর দ্বিতীয়বার আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর তারা তাদের শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে যুগের সঙ্গে তাল মেলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পালনে তাদের খুব একটা আগ্রহ নেই। বরং নারীদের বিভিন্ন অধিকার ও স্বাধীনতা খর্ব করার মধ্য দিয়ে তারা পুনরায় আগের শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে তালেবান নারীদের জন্য কাবুলের সব পার্কে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে।

একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে নোবেল জয়ী মালালা ইউসুফজাই - যিনি পাকিস্তানে মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারের পক্ষে প্রচারণার চালানোর কারণে ১৫ বছর বয়সে তালেবানের গুলিতে আহত হয়েছিলেন - সতর্ক করে বলেছেন যে শরীয়া আইনের তালেবানী দেশটির নারী ও কন্যা শিশুদের নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।"আফগানিস্তানে নারীসহ কিছু মানবাধিকার কর্মীর সাথে কথা বলার সুযোগ আমার হয়েছে। তারা তাদের উদ্বেগ জানিয়ে আমাকে বলেছেন যে তারা নিশ্চিত নন যে তাদের জীবন কেমন হতে যাচ্ছে," বিবিসিকে বলেন তিনি। তাদের অনেকেই ১৯৯৬-২০০১ সময়কালে যা ঘটেছিল তা স্মরণ করেছেন, এবং তারা তাদের নিরাপত্তা, অধিকার, সুরক্ষা এবং স্কুলে যাওয়া নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

তালিবান নেতা আকুন্দজাদার নির্দেশ কঠোর শরিয়তি আইন প্রয়োগ করতে হবে সর্বোচ্চ বিচারকদের। তালিবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর থেকে সেদেশের মহিলা ব্যাপক দমন-পীড়নের শিকার। তালিবানরা নির্দেশ দিয়েছে, মহিলা পার্কে যেতে পারবেন না। মহিলাদের জিমে যাওয়ার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এছাড়া পুরুষ আত্মীয় সঙ্গে না থাকলে মহিলাদের ভ্রমণের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ঘরের বাইরে পা রাখলে মহিলাদের হিজাব ও বোরখা পরাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সরকারি চাকরিতে কর্মরত বেশিরভাগ মহিলাকে তালিবান জমানা শুরু হওয়ার পরে ছাঁটাই করা হয়েছে। শরীয়া আইনের কঠোর প্রয়োগ যদিও হয় তবে এর অনেকগুলো ধারায় সাংঘর্ষিক এবং অসংগতিপূর্ণ। তালেবানদের এইধরণের গোঁড়ামি নিঃসন্দেহে নিজেদের দুর্বলতা জাহির করা ছাড়া আর কিছু নয়।

সমাজের এই কঠোরতা এতো সহজে ভাঙবে না, যতদিন পর্যন্ত এই পিতৃতন্ত্র কায়েম থাকবে; নারীবিদ্বেষের অস্তিত্ব,নারীবিরোধী মানসিকতা, ধর্ষণ,খুন,নির্যাতন চলতে থাকবে। নারীদের প্রথমে ইরানী মহিলাদের মতো অশুভ অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়তে হবে, লিঙ্গবৈষম্যকে বিলুপ্ত করার দায় সমাজে নারী-পুরুষ সকলের। এই বৈষম্য দূর করতে একমাত্র মানুষই পারবে। যেভাবে পারে গোটা পৃথিবী আলোকিত করতে।

Monday, November 14, 2022

মাদকাসক্তি : এক অনিশ্চিত জীবনের আলো


মাদকাসক্তি বর্তমান সময়ের মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদকের ছোবল আজ তার বিশাল থাবা বিস্তার করে চলেছে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। দেশের তরুণ প্রজন্ম এ নেশায় আজ আসক্ত। এ মরণনেশা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করা না গেলে এই প্রজন্মের পুনরুত্থানের স্বপ্ন অচিরেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য অংশ আজ এক সর্বনাশা মরণনেশার শিকার। যে তারুণ্যের ঐতিহ্য রয়েছে সংগ্রামের, প্রতিবাদের, যুদ্ধ জয়ের, দেশ গড়ার, আজ তারা নিঃস্ব হচ্ছে মরণনেশার করাল ছোবলে। মাদক নেশার যন্ত্রনায় ধুঁকছে শত-সহস্ৰ তরুণ প্রাণ। ঘরে ঘরে সৃষ্টি হচ্ছে হতাশা। ভাবিত হচ্ছে সমাজ।

Drug এবং Medicine দুটি সমার্থক শব্দ। কিন্তু Drug বলতে
আমাদের মনে একধরণের বিভীষিকা,ভয় বা সংশয়ের জন্ম দেয়। এর ব্যবহার তিনভাবে করা হয়। রোগ শনাক্ত করতে, রোগ নিরাময়ের জন্য, আর রোগ প্রতিষেধক হিসেবে। কিন্তু এর অপব্যবহার ভয়াবহ। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে, নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট রোগের ফলপ্রসূ হলো এই ড্রাগ, অন্যথায় এটা ঘাতক হতে পারে। তদুপরি কিছু ড্রাগ উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহার না করে অনেকেই মনোস্থিতি পরিবর্তন করার জন্য, একধরণের অবাস্তব স্বপ্নের দুনিয়ায় বিচরণের জন্য তা ব্যবহার করে থাকে। সাধারণত ইহাকে ড্রাগের অপব্যবহার বা Drug abuse বলা হয়। এই ধরণের ড্রাগ সমূহকে Narcotic Drugs বলা হয় এবং রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করা ড্রাগসমূহকে Pharmaceutical Drug বা Life saving drug বলা হয়। Narcotic drug abuse, ইহার কুফল এবং মানব সমাজের জন্য ইহা কতটুকু ভয়াবহ, বিভীষিকাময় এবং ক্ষতিকারক; নবপ্রজন্মের উপর এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা যাক।

Narcotic Drug সেবনকারীর হিতাহিত জ্ঞান প্রায় নাই বললেই চলে। কেননা, ইহা pharmaceutical drug থেকে বেশি গতিসম্পন্ন এবং অতি কম সময়ের ভিতরে রক্তের সাথে মিশে যায় ও বিভিন্ন ধরণের বিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই ড্রাগ সেবনকারী ব্যাক্তি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং তার অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। ফলে বিভিন্ন কুকর্মে এবং অপরাধ জনিত কারণে অতি কম সময়ের ভিতরে Narcotic Control Bureau বা NCB র সাথে ঘনিষ্টতা বাড়ে আর জেলে বন্দি জীবন যাপন করতে হয়। Narcotic and Psychotropic Act, 1985 এর বিভিন্ন ধারার অধীনে মাদকসেবন কারীর উপর মামলা আরম্ভ হয়। এছাড়া এই খুব দ্রুত শারীরিক দুর্বলতা এবং অসুস্থ হয়ে পড়ে।

LSD, cocaine, marijuana , brown sugar এগুলো অতি ভয়ংকর ড্রাগস। বিখ্যাত ফুটবল তারকা ডিয়েগো ম্যারাডোনার কোকেইন নামক ড্রাগসে কি দুর্গতি করেছিল তা সকলেরই জানা। বিগত দশকের মাল্টি মিলিওনিয়ার হলিউড অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোর অকাল মৃত্যু drug abuse এর জন্যই হয়েছিল। বলিউড তারকা সুশান্ত সিং রাজপুতের মতো উদীয়মান প্রতিভাশালী অভিনেতার অপমৃত্যু এবং সেই কাণ্ডের সাথে জড়িত সকল কাহিনীর কথা কেউ ভুলতে পারে ?

পৃথিবীতে প্রায় সকল দেশেই কম বেশি পরিমাণে ড্রাগ নামের ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। যৌবনের উদ্যমতা নিয়ে চলা ছেলে মেয়েদের জীবন অকালেই স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। কত যে সুখের সংসার মাদক জাতীয় বিভীষিকার কবলে ছারখার হয়েছে, কত যে প্রতিভার অপমৃত্যু হচ্ছে প্রতিনিয়ত আমাদের চোখের সামনে এর কি আর হিসেব রেখেছি !

আজ পৃথিবীতে প্রায় সকল দেশই নিজের থেকে শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে বোমা বারুদ থেকে ড্রাগের টোপ বেশি ব্যবহার করে থাকে। কারণ শত্রুপক্ষ কে বাঁধা দিতে ড্রাগের দ্বারা শত্রুর বড় শক্তিকে পঙ্গু করা সহজ। ২০১৬ সালের 'উড়তা পাঞ্জাব' মুভি, পাকিস্তান থেকে ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা প্রমুখ জায়গায় চলা চোরাই পথে ব্যবসা বাণিজ্য দ্বারা আক্রান্ত যুবসমাজের উপর নির্মিত, অভিনয় করেছেন আলিয়া ভাট ও শাহিদ কাপুর। অথবা ২০২০ সালের 'মালাঙ্গ' মুভি, গোয়াতে ড্রাগসের রমরমা ব্যবসায় দেশী-বিদেশী যুব সমাজ কীভাবে আক্রান্ত তা অভিনয়ের মাধ্যমে আদিত্য রায় কাপুর ও দীশা পাঠানি অত্যন্ত বাস্তব উপস্থাপন ফুটিয়ে তুলেছিলেন। আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশ থেকে শুরু করে মেক্সিকো, পানামা, উরুগুয়ে, প্রমুখ দেশে drug trafficking দ্বারা জর্জরিত।আমাদের আসামের পার্শ্ববর্তীতে থাকা গোল্ডেন ট্রাইএঙ্গেল নামে কুখ্যাত ম্যানমার, থাইল্যান্ড, সিংগাপুর প্রমুখ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ড্রাগ উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে আসা ড্রাগের দ্বারা আসামের সাথে উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সমূহ তথা আমাদের বরাক উপত্যকার বিভিন্ন অঞ্চল যে কতটা বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সম্মুখীন তা না বললেই হবে। আমাদের এই প্রজন্ম কতটা ড্রাগসের শিকার হয়েছে, আমরা সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে! দুঃখের বিষয় হলো রাতারাতি টাকার পাহাড় গড়ার লক্ষ্যে কিছু প্রতিষ্ঠিত 'গেস্টাপো' ব্যাক্তি পুরো সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারে।

মাদকদ্রব্যের এই সর্বনাশা ব্যবহার বর্তমান বিশ্বে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে এই পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা বাঞ্চনীয়। আমাদের পুলিশ প্রশাসন এই মাদকের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে। 
মাদকদ্রব্য উৎপাদন ও আমদানি রোধ করার জন্য প্রতিরোধ কর্মসূচি আরো জোরদার করা, মাদক চোরাচালান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, সমাজের প্রত্যেক মানুষকেই এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা, বেকারত্ব হ্রাস করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য বইয়ে মাদকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা, আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর ভূমিকা পালন করা, সরকারি উদ্যোগ বৃদ্ধি করা এবং সভা, সমিতি, সেমিনার ও আলোচনার মাধ্যমে মাদক প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা। আজ থেকে সজাগ ও সচেতনভাবে বলে দেই " NOT TO DRUGS"।

Wednesday, November 9, 2022

অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে ভারতে


গোটা ভারত জুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য মারাত্মক ভাবে বেড়েছে! ধনীরা আরও ধনী হয়েছে, আর গরিব হচ্ছে আরও গরিব। ভারতের অর্থনীতি অতিমারির প্রভাব কাটিয়ে ‘ঘুরে দাঁড়াচ্ছে’, অন্তত ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে। এমনই মনে করছে কেন্দ্রীয় সরকার। কোন ভারত? বিশ্বব্যাঙ্কের প্রাক্তন মুখ্য অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সার্বিক ভাবে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্মণ দেখা গেলেও তার সুফল আটকে রয়েছে সমাজের উঁচু তলায়। আর দেশের অর্ধেক মানুষ মন্দার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন।

'ইকোনমিস্ট' পত্রিকার ২৭ অক্টোবর সংখ্যায় 'ল্যাটিটিউড ইজ এভরিথিং' (Latitude is everything) শিরোনামে ভারতের অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে এক সাবধানতা মূলক ও ভীতিকর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রতিবেদনের একেবারে শুরুতে বলা হয়েছে যে ভারতের দক্ষিণ অংশ অর্থ উৎপাদন করে এবং উত্তর অংশ শিশু উৎপাদন করে। এবং পরিণতি বিস্ফোরক হতে পারে।প্রতিবেদনে গোয়ার কথা উল্লেখ করে লেখা হয়েছে গোয়ার পশ্চিম উপকূলে একটি বহু-সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল, যা গলদা চিংড়ির আবাসস্থল এবং চমৎকার জীবনযাত্রার মান। গোয়ার গড় ব্যক্তির আয় উত্তরের গঙ্গা অঞ্চলিয় বিহারের গড় ব্যক্তির আয়ের চেয়ে দশ গুণ বেশি।'ইকনোমিস্ট' -র কথায়, গোয়া ও বিহারের মানুষের জীবনযাত্রার মানের মধ্যে যতটা তফাত রয়েছে দক্ষিণ ইউরোপ এবং সাব-সাহারান আফ্রিকান দেশগুলির মানুষের জীবনযাত্রার মানের মধ্যে ততটা ফারাক।

 চীন, বাংলাদেশ প্রভৃতি অনেক দেশের উদাহরণ দিয়ে দ্য ইকোনমিস্ট বলেছে, এই ধরনের আঞ্চলিক বৈষম্য পৃথিবীর আর কোনো দেশে তেমন দেখা যায় না। ভারতের দক্ষিণ ও পশ্চিমের রাজ্যগুলি সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেখা গেছে এবং বিহার,উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থান এবং পশ্চিমবঙ্গ, যা ভারতের মোট জনসংখ্যার চল্লিশ শতাংশ, প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মানুষ, চরম দারিদ্র্য এবং অনগ্রসরতায় বসবাস করে।'ইকোনমিস্ট'- র মতে ২০১০ সালের পরের দশকে, বিহারের জনসংখ্যা ১৬.৫ শতাংশএবং উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যা ১৪ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, কেরালা, তামিলনাড়ুর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১০ শতাংশেরও কম। ভারতে শিল্পে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা মাত্র ১৪ শতাংশ, চীনে ২৭ শতাংশ এবং বাংলাদেশে ২১ শতাংশ।

ভারতের জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ উত্তরপ্রদেশে বাস করে, শিল্পে নিয়োজিত লোকের সংখ্যা উত্তরপ্রদেশের জনগণের মাত্র ৯ শতাংশ। দেশে শিল্পে নিয়োজিত অর্ধেকেরও বেশি লোক রয়েছেন দক্ষিণের পাঁচটি রাজ্য এবং পশ্চিমে গুজরাটে। অ্যাপলের মতো একটি কোম্পানির পণ্য তৈরির ১১টি কারখানার মধ্যে উত্তরাঞ্চলে রয়েছে মাত্র একটি, শুধুমাত্র তামিলনাড়ুতেই রয়েছে ৬টি কারখানা।

ভারতই বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে বসতি স্থাপনের জন্য আভ্যন্তরীন স্থানান্তরের অনুপাতও সবচেয়ে কম। এই কারণে, একই যোগ্যতা, শিক্ষা এবং বর্ণ থাকা সত্ত্বেও, একজন ব্যক্তি একই দেশে ভয়, সংশয়ের কারণে অন্য ব্যক্তির তুলনায় অনেক গুণ কম উপার্জন করে।

 'এক ভাষা, এক দল, এক জাতি' ধরনের নীতি ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে বিদ্বেষ বাড়ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের চলাফেরায় চরম আঘাত হানছে। একজন সাধারণ মানুষ তার বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাওয়ার আগে একশোবার চিন্তা করে। তার উপরে পরিবহন সুবিধা ব্যায়বহুল করে যেভাবে জনগণের চলাচল ব্যাহত করা হচ্ছে তাতে এই অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও দ্রুত বাড়ছে। এতে কি বোঝা যায় সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী হিংসার পরিবেশ সরাসরি কোনো শক্তিশালী নীতির ফল।

মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং কর্পোরেট পুঁজিবাদের একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থাপনা যখন বিশ্বের সম্পদকে গুটি কয়েক পরিবারের হাতে পুঞ্জিভূত করে তুলছে, তখন সম্পদের সুষম বন্টনই এ সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত অর্থনীতির সুষম বন্টন ব্যবস্থাই শান্তি, সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। আজকে আমাদের সমাজে যে বিপরীতমুখী বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করছি, একদিকে সরকার দেশে ব্যাপক উন্নয়নের দাবী করছে অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাধারণ মানুষ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে দেশ পিছিয়ে পড়ার বাস্তবতা তুলে ধরছে। কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার মধ্যে রেখে দেশের কয়েকশ পরিবার শতকোটি টাকার মালিক হয়ে যাওয়া এবং সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতাই হচ্ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে সৃষ্ট সামাজিক সঙ্কট। দেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যের অভিশাপমুক্ত করতে হলে প্রথমেই সম্পদের সুষম বন্টন ব্যবস্থার উপর নজর দিতে হবে।

Monday, October 31, 2022

শিশুর বিকাশে মানসিক ও সামাজিক পরিবেশ


 ‘যে ব্যক্তি শিশুকে স্নেহ করে না, তার বাবা-মা কিংবা শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা নেই।’ --- বার্ট্রান্ড রাসেল

আগামী দিনে শিশুরা হবে রাষ্ট্রনায়ক, সরকারপ্রধান, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সচিব, শিক্ষক, নজরুল, ঈশ্বরচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সাবিত্রী বাঈ ফুলে। এ জন্য সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে, নৈতিকতা মূল্যবোধ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। মানবসন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে শিখতে শুরু করে। তবে জন্মের পর থেকে ১০ বছর বয়সে পৌঁছা পর্যন্ত সময়ই শিশুর মস্তিস্ক বিকাশের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বয়সেই শিশুদের মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা, অনুসন্ধিৎসা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিভা বিকশিত হয়। সুতরাং এই বয়স থেকেই একজন শিশুকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চায় অভ্যস্ত করা জরুরি। এ সম্পর্কে দালাই লামার উক্তি প্রণিধানযোগ্য ‘শিশুর নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বীজ গ্রথিত হয় পরিবারে। তা বিকশিত হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর চর্চা হয় সমাজে।’ তাই সার্বিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষাপ্রক্রিয়ায় পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

একটি শিশুর মানসিক বিকাশের সাথে সামাজিক পরিবেশের একটা কগনেটিভ সম্পর্ক থাকে। বিকাশ যেভাবেই হোক না কেন, এটা সদাই একটা ক্রমবর্ধমান গতিতে অগ্রসর অর্থাৎ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি হয়। সেইজন্য মানসিক বিকাশের সাথে নিত্য পরিবৰ্তন হয়ে থাকা পরিস্থিতির একটা প্ৰভাব থাকে। উদাহরণস্বরূপ দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ে আমাদের দেশে বিশেষভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা কম বয়সী যুদ্ধরত সৈন্যদের ক্ষেত্ৰে মানসিক রোগ দেখা দিয়েছিল এবং সেই সময়ে আমাদের ভারতবৰ্ষে মানসিক রোগীর জন্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সৈনিকদের চিকিৎসার জন্য। দেশের পরিস্থিতি এবং সমাজের অস্থিরতা মানুষের মনের বিকাশ, চিন্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যে প্ৰভাব ফেলে এবং সাথে তা নিয়ন্ত্ৰণও করে। উদাহরণস্বরূপ আমাদের যখন কোভিড১৯ র জন্য বন্ধ হয়েছিল স্কুল-কলেজ এবং দেশে এক অনিশ্চিত পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। তখন একটি বিকাশরত শিশুর মানসিক বিকাশকে বৃহত্তর বা কম পরিমাণে প্রভাবিত করেছিল।

এই ধরনের পরিবেশে একটি শিশুর মনে কেমন অনুভব বা ধারণ করে তা বোঝা কঠিন, তবে আমাদের উচিত শিশুদের যতটা সম্ভব দুশ্চিন্তা থেকে দূরে রাখা এবং তাদের মানসিক বিকাশে সহায়তা করার জন্য তাদের সবসময় একটি সুস্থ পরিবেশে রাখা উচিত। সমাজে চলিতমান রাজনৈতিক অস্থিরতা বা ধর্মীয় বাতাবরণ থেকে শিশুদের দূরে রাখতে হবে। এই ক্ষেত্ৰে সামাজিক মাধ্যমে কিছু সচেতন হতে হবে। সব সময় ঋণাত্মক ভাবধারা পরিহার করে কিছু ইতিবাচক চিন্তা এবং ভালো ও সুস্থ স্বপ্ন দেখাতে হবে। মহামারি কি আমরা জানি কিন্তু একটি ১২-১৪ বছরের শিশুর ক্ষেত্রে এটা খুব হতাশজনক বিষয়। ভয় পাবে এবং মনে দুঃখ ভাব আসতে পারে। দীর্ঘকালীন এই ভাবধারা হলে স্বল্প পরিমাণে হলেও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। সেইজন্য শিশুর সঙ্গে কোনো ধরনের আতংকময় পরিবেশের সূচনা আপনাকে পরিহার করতে হবে।

একটা কথা বলা হয় যে সমাজের সঙ্গে নিজেক খাপ খাইয়ে চলার জন্য শিশুর কিছু অভিজ্ঞতার আবশ্যক। কিন্তু আমি মনে করি যে সেই অভিজ্ঞতা মাতৃ স্নেহের থেকে পরিপুষ্ট পরিবেশে হতে হবে বা অভিভাবকদের উচিত আপদকালীন সময়ের আলোচনা থেকে আত্মবিশ্বাসীমূলক শব্দে শিশুকে কিছু শেখানো বা বোঝানো।

যখন আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে করোনা কালে ঘরে বসে অনলাইন পদ্ধতির মাধ্যমে পড়তে দেয়া হয়েছিল তখন তাদের মনের এমন ভাব হয়েছিল যে তারা যেন সর্বদা এইভাবে ঘরে থেকে সময় অতিবাহিত করতে হবে না কি? বা ভবিষ্যত কি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা যারা অভিভাবক এবং শিক্ষক ছেলেমেয়েদের ইতিবাচক দৃষ্টিতে পরিবেশ- পরিস্থিতি বুঝতে বা বুঝাতে চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে। এই ধরনের মহামারী ১০০ বছর আগেও হয়়েছিল এবং সমস্ত সমস্যার সমাধান আছে বা একমাত্র ধৈর্য ধারণ ও বিজ্ঞানের উপর বিশ্বাস রাখাটা খুব জরুরী। শিশুদের সৃষ্টিকৰ্তার বিপরীতে বিজ্ঞানের উপর বিশ্বাস রাখার উপদেশ দিতে হবে। শুধু বিশ্বাস না প্রমাণ সহ বুঝিয়ে দিতে হবে। যা একটি শিশুর মানসিক বিকাশে ও পরবর্তী সময়ে প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করবে।

শিশুর মানসিক বিকাশে পরিবেশের প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে শিশু যে রকম সামাজিক পরিবেশে বড় হয়, তার মানসিকতাও সেভাবে গড়ে ওঠে। শিশুর পারিবারিক পরিবেশ, তার পরিচিত গণ্ডি ও আত্মীয়-স্বজন সবার একটা প্রভাব শিশুর ওপর পড়ে। এমনকি এই বলয়ের মধ্যে তার স্কুলের শিক্ষক, প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধব সবার সম্মিলিত প্রভাবে শিশুর ভেতর একটি মনস্তত্ত্ব গড়ে ওঠে। শিশু ধীরে ধীরে তার পড়াশোনা ও বয়সের পাশাপাশি তার চারপাশের সামাজিক পরিবেশ থেকে যে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান লাভ করে, তা-ই তার মানসপটে একটি আসন তৈরি করে নেয়। একইভাবে শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য ব্যায়াম, খেলাধুলা, সঙ্গীত, সাহিত্য ও শিল্পকলায় অংশগ্রহণ করতে হবে। তাদের শেখানো উচিত, যা শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে উৎসাহিত করে। শিশুদের উপর অতিরিক্ত চাপ দেয়া উচিত নয় এবং তাদের সবকিছুতে দক্ষ করতে তাদের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। এটা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

আজকের শিশুকে আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে তার জন্য একটি উপযুক্ত সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা আবশ্যক। কিন্তু এতসব জটিল সমীকরণ সামনে রেখে শিশুদের জন্য একটি সর্বজনীন সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা সত্যি কঠিন একটি কাজ। তারপরও কাজ যত কঠিনই হোক, সেটি অসম্ভব মোটেই নয়। এ সত্যকে সামনে রেখে দেশের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে শিশুবান্ধব নীতি-কৌশল প্রণয়ন করেছে ভারত সরকার।

একইভাবে আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রে সমাজ ব্যবস্থা পরিচালিত হয় কিছু প্রতিষ্ঠিত আইনের দ্বারা; যেখানে কিছু নির্দেশনা থাকে, যদ্বারা সমাজে কল্যাণ সাধন করা হয়। এইক্ষেত্ৰে শিশুর জন্য আমাদের দেশে কয়েকটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। যেমন —

(১) শিশু শ্রম নিবারণ আইন ১৯৮৬।
(২) বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধকরণ আইন ২০০৬। 
(৩) শিশুর সুরক্ষা এবং আদর-যত্ন এবং কিশোর ন্যায় আইন ২০০০।
(৪) শিশুর অধিকার সংরক্ষণ আয়োগ আইন ২০০৫।
(৫) বিনামূল্যে শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯।
(৬) শিশুর উপর হওয়া যৌন নির্যাতন প্ৰতিরোধ আইন ২০১২।

এগুলি হল রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রয়াস যাতে শিশুদের মানসিক বিকাশ এবং তাদের সকল প্রকারের উন্নতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়। এই আইনগুলি কার্যকর করার মাধ্যমে, আমরা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী এবং সুস্থ সমাজ গঠনের চেষ্টা করছি। তাই সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের আজকের শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। সরকারের এসব উদ্যোগের পাশাপাশি দেশের সব নাগরিক নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমাদের শিশুদের জন্য একটি অনুকূল সামাজিক পরিবেশ তৈরিতে সচেষ্ট থাকলেই আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাব আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...