Monday, November 28, 2022

মূল্যবোধ : নৈতিকতার নিরিখে বিশ্লেষণ


মানুষের জীবনবোধের সঙ্গে নৈতিক মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যদিও মানুষ প্রাণী তবুও সে পশু নয়। তাইতো সমাজ বিজ্ঞানী ডেভিড পোপেনোরের মতে -- ' ভালো মন্দ, ঠিক বেঠিক, কাঙ্খিত অনাকাঙ্ক্ষিত সমাজের সদস্যদের যে ধারণা তার নামই মূল্যবোধ। মূল্যবোধের অবক্ষয় এখন চারিদিকে প্রকট হয়েছে। মূল্যবোধ বলতে সকলের মনে একটা ধারণা আসে যদিও সুস্পষ্টভাবে কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবু মূল্যবোধ সাধারণত আচার আচরণের একধরণের মান বা বোধ, কিছু আদর্শগত সমষ্টি যার দ্বারা মানুষ যেকোন কাজের ভালোমন্দ, শুদ্ধতা অশুদ্ধতা যাচাই করে অগ্রসর হতে পারে। মহাত্মা গান্ধীর মূল্যবোধের শিক্ষা বলতে সত্যবাদিতা, অহিংসা, নির্ভিকতা, সামাজিক সচেতনতা এবং দায়িত্ববোধ, সেবা প্রমুখ বিষয়ের উপর জোর দেয়া হয়। অর্থাৎ মূল্যবোধ কেবলমাত্র ব্যক্তিগত ভালোমন্দ বিচার করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় ইহার সামাজিক দিকগুলোও আছে যেগুলো খুব প্রয়োজনীয়। মূল্যবোধ হলো মানুষ তাঁর নিজের এবং সমাজের জন্য এক বিশেষ ' কোড অব কনডাক্ট' যার দ্বারা একজন মানুষ অথবা সমাজ উত্তরণের দিকে অগ্রসর হতে পারে।

মূল্যবোধ সবসময় একটা জায়গায় থেমে থাকে না। World Value Survey মূল্যবোধের ওপর বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। এই সংস্থার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বিভিন্ন শাখার বিজ্ঞানীরাও। এর এক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে যে মূল্যবোধ বা ভ্যালু বলা বস্তুটি কখনও একজায়গায় স্থির থাকে না। সমাজ পরিবর্তন, বিবর্তনের সাথে সাথে মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটে। World Value Survey (WVS) - এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী যখনই কোন দেশের ঔদ্যোগিক বিকাশ ( industrialization ) এবং তার উত্তর -ঔদ্যোগিক জ্ঞান সমাজের (post industrial knowledge society) দিকে যতই এগোচ্ছে ততই ঐ দেশের পরম্পরাগত মূল্যবোধ যেমন - পিতামাতা ও সন্তানের মধ্যে বন্ধন, পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক, ধর্মীয় গুরুত্ব, অন্যান্য এসবের প্রতি টান কমছে। তবে হ্যাঁ, ধর্মনিরপেক্ষ - যুক্তিবাদী ( Secular rational values) মূল্যবোধের মান বাড়ছে। এই পরম্পরাগত পারিবারিক সম্পর্ক বা ধর্মীয় ক্ষেত্রে যে মূল্যবোধের অবক্ষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে, এর ফলে কি মানুষের মধ্যে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য কতটা অবনতি হয়েছে? WVS এর প্রতিবেদনে বলা হয় ১৯৮১-২০০৭ সন পর্যন্ত মানুষের সুখ শান্তি এবং জীবনের সন্তুষ্টি বেড়েছে। World happiness index - এ নৈতিকতা ও মূল্যবোধের নিরিখে সুখি দেশের তালিকা প্রস্তুত করে। সেখানে আমরা দেখতে পাই সেই সুখি দেশগুলোর মধ্যে শান্তি, শৃঙ্খলা, সন্তুষ্টি, সৌজন্যতা, সহনশীলতা, প্রগতিশীলতা বিদ্যমান।তাহলে আমরা নিশ্চয় বুঝতে পারছি মূল্যবোধ কোনো অচল-অটল বস্তু নয়। সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটে।

কিন্তু এখন কথা হলো আসলে মূল্যবোধের আধার কি ? ইহা কি এমনিতেই গড়ে উঠে না এর কোন সামাজিক প্রেক্ষাপট আছে ? আমরা নিশ্চয় সেই উলঙ্গ রাজার কথা জানি। যেখানে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেছেন - 'সবাই দেখছে যে রাজা উলঙ্গ, তবুও সবাই হাততালি দিচ্ছে। সবাই চেঁচিয়ে বলছে; শাবাশ শাবাশ।' গল্পটা সবাই জানি। কিন্তু সেই গল্পের ভেতরে শুধু প্রশান্তি বাক্য উচ্চারণ কিছু আপাদমস্তক ভিতু, ফাঁকিবাজ, অথবা নির্বোধ স্তাবক ছিলনা। একটা শিশুও ছিল। সত্যবাদী, সরল, সাহসী একটা শিশু। এখন প্রশ্ন হলো রাজসভায় যারা মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের মূল্যবোধের অবস্থান কোথায়? মূল্যবোধ আসলে কোন বিমূর্ত বস্তু নয়। মূল্যবোধ সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, দ্বারা প্রভাবিত। আজকাল বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের মতবাদের প্রচার চলছে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ মতবাদ প্রচারে বিভিন্ন চিন্তা একত্রে প্রসারিত করার চেষ্টায়। এক দলতো জোরপূর্বক তার মূল্যবোধ চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টায়। বিশ্বের সমস্ত ঘটনাবলি মানুষের নখদর্পণে। বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক সফলতা আর নিত্যনতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে সবকিছু আজ মানুষের সাধ্যে। তা সত্ত্বেও পৃথিবী হয়ে পড়েছে হিংস্র, অশান্ত আর নৈরাজ্যের ঠাঁই। বর্তমান সমাজে বস্তুগত সমৃদ্ধির পরও এক বিরাট সংখ্যক মানুষের মধ্যে দেখা যায় অনৈতিকতা, সীমাহীন দুর্নীতি, ছলচাতুরী, চুড়ান্ত মিথ্যাচার । ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতার শীর্ষে থাকাটা স্থির করে নিয়েছে মানুষ।

এমন এক সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে যেখানে প্রগতিশীল, ঔদ্যোগিক ধ্যান ধারণার বিপরীতে মৌলবাদী, একাত্ববাদী ধ্যানধারণার বিকাশ। সৃষ্টি হয়েছে ভয়- শংকা - বিদ্বেষের পরিস্থিতি। ধর্মীয় মৌলবাদ এবং তজ্জনিত হিংস্রতায় সমাজ এক অস্থির সময়ে বিরাজ করছে। এটা সমগ্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমরা এখন ঔদ্যোগিক সভ্যতার দিকে এগোচ্ছি। উত্তর -ঔদ্যোগিক স্তর পেতে এখনও বাকি। এখনও আমরা অবৈজ্ঞানিক ধ্যান ধারণায় আচ্ছন্ন। তার সাথে আমাদের ঠেলা হচ্ছে ধর্ম-জাত-পাত, অসহিষ্ণুতা, নিম্নগামী যুক্তি তর্কের পরিবেশে। তাইতো এই দ্রোহকালে ভুলে গেছি সৌজন্য বিনিময়। তবে এইভাবে কি মূল্যবোধের উত্তরণ সম্ভব ? মূল্যবোধের জন্ম সমাজেই হতে হবে। বিজ্ঞানী ব্রাউনের মতে - ' যদি পৃথিবীতে নৈতিকতার মান প্রযুক্তিগত কলাকৌশলের বৈপ্লবিক অগ্রগতির সাথে অগ্রসর না হয়, তাহলে আমরা নিশ্চিন্ন হয়ে যাবে। শিক্ষার বিস্তার বিজ্ঞানের চমকপ্রদ আবিষ্কারের ফলে প্রযুক্তিগত বিরাট প্রসার ঘটছে, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে নৈতিকতার মান অগ্রসর হয় নি। মূল্যবোধের উত্তরণ ঘটছে না। তবে সংকীর্ণ চিন্তার পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভয়ানকভাবে উত্থান ঘটছে ধর্মীয় মৌলবাদের। এমন এক প্রচলিত সমাজে এর পরিবর্তনের দায়ভার কে নেবে? এরজন্য আমাদের শিক্ষক - অভিভাবক দুজনেরই সমান অংশীদারিত্বে পরিবর্তন সম্ভব। কারণ আগত ভবিষ্যত সমাজের মূল্যবোধ রক্ষার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। অর্থাৎ আজকের যেসকল স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাঁদেরই।

সমাজে শিক্ষকের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের ব্যাক্তিগত জীবনে যদি লক্ষ্য করি তবে দেখা যায় কোন এক আদর্শ শিক্ষকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পরিচর্যায় আমরা আজ এতোটা এগিয়েছি। তাঁদের ব্যাক্তিত্ব, কথাবার্তা, চিন্তাধারা, ভাবনায় আমরা মুগ্ধ। নৈতিক শিক্ষা বা বিদ্যায়তনিক শিক্ষায় যদিও উনাদের মতো অগ্রসর হতে পারিনি তবে আমাদের ব্যাক্তিত্বের ক্ষেত্রে কতটা ফলপ্রসূ তা নিশ্চয় আমরা বুঝতে পারি। কারণ ছাত্রর জীবনে একটা ছেলে বা মেয়ে ঘরের পর সবথেকে বেশি সময় কাটায় স্কুলে। সেখানে একে অপরের সঙ্গে মেলামেশা, সহপাঠীদের সঙ্গে সহমর্মিতা, গুরুজনদের প্রতি ভক্তি, সত্যের প্রতি নিষ্ঠা, মুক্ত চিন্তার ক্ষমতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এসবের মূল্যবোধের ধারণা ও অভ্যাস সেখানেই গড়ে উঠে। আর এই অভ্যাস গড়ে তোলার মূল নায়ক হলেন শিক্ষক। শিক্ষকই হচ্ছেন Role Model । একজন শিক্ষক পুঁথিগত জ্ঞানদানের সাথে সাথে একজন পথপ্রদর্শক, সহানুভূতিশীল, বন্ধুভাবাপন্ন ব্যাক্তি। যিনি ছাত্রছাত্রীদের মূল্যবোধ ও নৈতিকতার নিঃশুল্ক জ্ঞান দিয়ে থাকেন। সেইক্ষেত্রে একজন শিক্ষক শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষক নন, সমাজেরও। তাই শিক্ষকের দায়িত্ব হলো যতটুকু জানা ততটুকুই সঠিকভাবে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করা। মূল্যবোধ ও নৈতিকতার নিরিখে জাপান বেশ এগিয়ে। জাপানের একটি কথা আছে - 'A poor teacher tells, an average teacher teaches, a good teacher explains, and a great teacher inspires.' একজন শিক্ষক ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করার জন্য, সৎ পথে চলার জন্য, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার নিরিখে সমাজ জীবনে সুস্থ মস্তিষ্কে অগ্রসর হওয়ার জন্য প্রথমে নিজেকে সেইমতে গড়তে হবে। তাহলে তিনি ছাত্রছাত্রীর আদর্শ হিসেবে পরিগণিত এবং তাঁর প্রদত্ত শিক্ষাকে ছাত্রছাত্রীরা চিরদিন স্মরণ রাখবে।

সেই একই ভাবে আমরা যারা অভিভাবক আছি তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটা শিশুর প্রথম শিক্ষা তার ঘর থেকেই শুরু। চোখ খোলার পর ঘরকেই সে আপন করে নেয়। একটি শিশু প্রথমেই তার বাবা মা -র কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে বড় হয়। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কিধরনের ভূমিকা পালন করতে হয়, সততা, তাদের বিশ্বাস, আচার ব্যাবহার সবকিছুই বাবা মায়ের কাছ থেকে শেখে। অভিভাবকের মধ্যে যদি অসদাচরণ, অযৌক্তিক চিন্তা চেতনা, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার দেখা যায় তবে সেই শিশুটিও মানসিকভাবে সেইভাবেই গড়ে উঠে। সমাজে যদি মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রয়োজন আছে, ভালোবাসা, সৎ অসৎ বিচারের প্রয়োজন আছে তবে তার বীজ ঘরেই রোপণ করতে হবে এবং এর মূল হতে হবে মা-বাবা দুজনেই। মানবসমাজ সেই প্রাচীনকাল থেকেই মূল্যবোধ কে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। আকারে ক্ষুদ্র দ্বীপ হলেও নৈতিকতার জন্য ইংরেজরা পুরো বিশ্ব জয় করেছিল। অনৈতিক কাজ দ্বারা ক্ষমতাসীন হলেও ধ্বংস অনিবার্য। পি বি শেলীর বিখ্যাত 'Ozymandias' -এ বলেছিলেন - My name is Ozymandias, King of kings, Look on my works, ye mighty and despair.'

আলোচনার পরিসমাপ্তিতে এটুকু বলা যায় যে আমরা দিন দিন যেভাবে নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে হারিয়ে ফেলছি তাতে বর্তমান সমাজ রোগাক্রান্ত। পারস্পরিক মমত্ববোধ,প্রেম, সৌজন্যতা এসব আমরা হারিয়ে ফেলেছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে, যেখানে একটা সুস্থ সমাজ উপহার দিতে পারি। নীতি - ঔচিত্যবোধ, সামাজিক ন্যায় বিচার, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহিষ্ণুতা, শ্রমের মর্যাদা, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ, রাষ্ট্রীয় আনুগত্য চর্চার মাধ্যমে উন্নত, সভ্য ও কলুষমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব। সঠিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চাই পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

তথ্যসূত্রঃ
১) আনন্দবাজার পত্রিকা নবীন প্রজন্মের অবক্ষয় এখন সর্বত্র, ২৪ আগষ্ট, ২০১৯।
২) www. Worldvaluesservey.org
৩) www. Worldhappiness.report
৪) www. Wikipedia.org

Monday, November 21, 2022

শরিয়া আইন আগ্রাসনে আফগান মহিলারা


আফগানিস্তানে পূর্ণ শরিয়া আইন প্রয়োগের নির্দেশ তালেবান নেতার। আফগানিস্তান থেকে যখন সোভিয়েত সৈন্যরা পিছু হটলো, তখন ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে উত্তর পাকিস্তানে এই তালেবান আন্দোলনের জন্ম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনীর প্রায় দুই দশকের উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে রাজধানী কাবুল দখল করার পর তালিবানরা নিজেদেরকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে। আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার পর তালিবানরা বলেছে যে তারা শরীয়া বা ইসলামী আইনের ভিত্তিতে দেশটি শাসন করবে। এই শরীয়া আইন নিয়েই উঠে এসেছে একগুচ্ছ প্রশ্ন।

তালিবান শরীয়া আইনের (Shariya Law) কঠোর প্রয়োগ, বিশেষ করে খুনী ও ব্যভিচারীদের জন্য প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মতো শাস্তির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। প্রসঙ্গত, আফগানিস্তানে সমস্ত মহিলাদের প্রকাশ্যে হিজাব পরতে হয়। কিন্তু তালিবানের দাবি, মহিলাদের প্রকাশ্যে সম্পূর্ণ শরীর এবং মুখ ঢাকা পোশাক পরতে হবে। বোরখা ছাড়া বাইরে বেরনো যাবে না। কিন্তু রাজধানী কাবুল-সহ শহুরে এলাকায় অনেক মহিলাই মুখ ঢাকছেন না বলে অভিযোগ। তার বদলে কেউ কেউ সার্জিক্যাল মাস্ক পরে ঘুরছেন। মেয়েদের হাইস্কুলে পড়া নিয়েও ইউ-টার্ন নিয়েছে তালিবান সরকার।

আফগানিস্তানে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি অপরাধের শাস্তি হিসেবে ইসলামী শরিয়া আইন মোতাবেক অঙ্গচ্ছেদ ও পাথর ছোড়ার মত সাজা দেওয়ার জন্য বিচারকদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন তালেবান নেতা হায়বাতুল্লাহ আখুন্দজাদা।তালেবান মুখপাত্র জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ গত রোববার রাতে টুইটারে এক পোস্টে এ বিষয়ে জানিয়েছেন বলে জানায় বিবিসি। জাবিহউল্লাহ তার পোস্টে লেখেন, মোল্লা আখুন্দজাদা একদল বিচারকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর ‘বাধ্যতামূলক’ এ আদেশ আসে।

তালেবানদের মতে শরিয়া আইনের আওতায়‘চোর, অপহরণকারী এবং রাষ্ট্রদ্রোহীদের মামলাগুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে। এসব মামলায় অপরাধ (হুদুদ এবং কিসাস) বিবেচনা করে ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী বিচার করতে হবে। হুদুদ সেসব অপরাধকে নির্দেশ করে, যেগুলোতে ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সাজা দেওয়া বাধ্যতামূলক। যেমন- ব্যভিচার, মদ্যপান, চুরি, অপহরণ, ডাকাতি, ধর্মত্যাগ এবং ধর্মদ্রোহিতার মতো অপরাধ। অন্যদিকে, কিসাস নির্দেশ করে বদলা নেওয়ার বিষয়টি (চোখের বদলে চোখ)। কিসাসের অন্তর্ভুক্ত হত্যা, ইচ্ছাকৃত আঘাতের মতো অপরাধগুলো। কিসাসভুক্ত অপরাধগুলোতে ভিক্টিমের পরিবার চাইলে ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে অপরাধীকে ক্ষমা করে দিতে পারবেন।

শুধু অপরাধ নয়, বিয়ে, বিচ্ছেদ সহ সমস্ত বিষয়েই কড়া বিধি রয়েছে শরিয়া আইনে। বর্তমানে ৫০টি দেশে এই শরিয়া আইনের কিছু কিছু অংশ মানা হয়। তার মধ্যে ৮টি দেশে কট্টর শরিয়া আইন মেনে চলা হয়। সৌদি আরব, ইরান, ব্রুনেই, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, পাকিস্তান, নাইজিরিয়া, কাতার। সৌদিতে অবশ্য সম্প্রতি মেয়েদের একা বাড়ি থেকে বেরনো এবং গাড়ি চালানোর অনুমতি দিয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ছিল তালিবান। তখন সেখানে কট্টর শরিয়া আইন পালন করা হত। রাস্তায় পাথর ছুড়ে অপরাধী সাজা তাছাড়া মেয়েদের ঘরবন্দি করা হয়েছিল। ২০০১ থেকে ক্রমে ধীরে ধীরে স্বাধীন হয়েছে আফগানিস্তান। মেয়েরা স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ফের তালিবান ক্ষমতায় আসায় স্বাভাবিকভাবেই চাপে আফগানরা। 

১৯৯০ এর দশকে তালেবান যখন প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিল তখন জনসম্মুখে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কারণে সমালোচিত হয়েছিল। গতবছর দ্বিতীয়বার আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর তারা তাদের শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে যুগের সঙ্গে তাল মেলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পালনে তাদের খুব একটা আগ্রহ নেই। বরং নারীদের বিভিন্ন অধিকার ও স্বাধীনতা খর্ব করার মধ্য দিয়ে তারা পুনরায় আগের শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে তালেবান নারীদের জন্য কাবুলের সব পার্কে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে।

একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে নোবেল জয়ী মালালা ইউসুফজাই - যিনি পাকিস্তানে মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারের পক্ষে প্রচারণার চালানোর কারণে ১৫ বছর বয়সে তালেবানের গুলিতে আহত হয়েছিলেন - সতর্ক করে বলেছেন যে শরীয়া আইনের তালেবানী দেশটির নারী ও কন্যা শিশুদের নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।"আফগানিস্তানে নারীসহ কিছু মানবাধিকার কর্মীর সাথে কথা বলার সুযোগ আমার হয়েছে। তারা তাদের উদ্বেগ জানিয়ে আমাকে বলেছেন যে তারা নিশ্চিত নন যে তাদের জীবন কেমন হতে যাচ্ছে," বিবিসিকে বলেন তিনি। তাদের অনেকেই ১৯৯৬-২০০১ সময়কালে যা ঘটেছিল তা স্মরণ করেছেন, এবং তারা তাদের নিরাপত্তা, অধিকার, সুরক্ষা এবং স্কুলে যাওয়া নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

তালিবান নেতা আকুন্দজাদার নির্দেশ কঠোর শরিয়তি আইন প্রয়োগ করতে হবে সর্বোচ্চ বিচারকদের। তালিবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর থেকে সেদেশের মহিলা ব্যাপক দমন-পীড়নের শিকার। তালিবানরা নির্দেশ দিয়েছে, মহিলা পার্কে যেতে পারবেন না। মহিলাদের জিমে যাওয়ার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এছাড়া পুরুষ আত্মীয় সঙ্গে না থাকলে মহিলাদের ভ্রমণের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ঘরের বাইরে পা রাখলে মহিলাদের হিজাব ও বোরখা পরাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সরকারি চাকরিতে কর্মরত বেশিরভাগ মহিলাকে তালিবান জমানা শুরু হওয়ার পরে ছাঁটাই করা হয়েছে। শরীয়া আইনের কঠোর প্রয়োগ যদিও হয় তবে এর অনেকগুলো ধারায় সাংঘর্ষিক এবং অসংগতিপূর্ণ। তালেবানদের এইধরণের গোঁড়ামি নিঃসন্দেহে নিজেদের দুর্বলতা জাহির করা ছাড়া আর কিছু নয়।

সমাজের এই কঠোরতা এতো সহজে ভাঙবে না, যতদিন পর্যন্ত এই পিতৃতন্ত্র কায়েম থাকবে; নারীবিদ্বেষের অস্তিত্ব,নারীবিরোধী মানসিকতা, ধর্ষণ,খুন,নির্যাতন চলতে থাকবে। নারীদের প্রথমে ইরানী মহিলাদের মতো অশুভ অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়তে হবে, লিঙ্গবৈষম্যকে বিলুপ্ত করার দায় সমাজে নারী-পুরুষ সকলের। এই বৈষম্য দূর করতে একমাত্র মানুষই পারবে। যেভাবে পারে গোটা পৃথিবী আলোকিত করতে।

Monday, November 14, 2022

মাদকাসক্তি : এক অনিশ্চিত জীবনের আলো


মাদকাসক্তি বর্তমান সময়ের মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদকের ছোবল আজ তার বিশাল থাবা বিস্তার করে চলেছে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। দেশের তরুণ প্রজন্ম এ নেশায় আজ আসক্ত। এ মরণনেশা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করা না গেলে এই প্রজন্মের পুনরুত্থানের স্বপ্ন অচিরেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য অংশ আজ এক সর্বনাশা মরণনেশার শিকার। যে তারুণ্যের ঐতিহ্য রয়েছে সংগ্রামের, প্রতিবাদের, যুদ্ধ জয়ের, দেশ গড়ার, আজ তারা নিঃস্ব হচ্ছে মরণনেশার করাল ছোবলে। মাদক নেশার যন্ত্রনায় ধুঁকছে শত-সহস্ৰ তরুণ প্রাণ। ঘরে ঘরে সৃষ্টি হচ্ছে হতাশা। ভাবিত হচ্ছে সমাজ।

Drug এবং Medicine দুটি সমার্থক শব্দ। কিন্তু Drug বলতে
আমাদের মনে একধরণের বিভীষিকা,ভয় বা সংশয়ের জন্ম দেয়। এর ব্যবহার তিনভাবে করা হয়। রোগ শনাক্ত করতে, রোগ নিরাময়ের জন্য, আর রোগ প্রতিষেধক হিসেবে। কিন্তু এর অপব্যবহার ভয়াবহ। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে, নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট রোগের ফলপ্রসূ হলো এই ড্রাগ, অন্যথায় এটা ঘাতক হতে পারে। তদুপরি কিছু ড্রাগ উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহার না করে অনেকেই মনোস্থিতি পরিবর্তন করার জন্য, একধরণের অবাস্তব স্বপ্নের দুনিয়ায় বিচরণের জন্য তা ব্যবহার করে থাকে। সাধারণত ইহাকে ড্রাগের অপব্যবহার বা Drug abuse বলা হয়। এই ধরণের ড্রাগ সমূহকে Narcotic Drugs বলা হয় এবং রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করা ড্রাগসমূহকে Pharmaceutical Drug বা Life saving drug বলা হয়। Narcotic drug abuse, ইহার কুফল এবং মানব সমাজের জন্য ইহা কতটুকু ভয়াবহ, বিভীষিকাময় এবং ক্ষতিকারক; নবপ্রজন্মের উপর এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা যাক।

Narcotic Drug সেবনকারীর হিতাহিত জ্ঞান প্রায় নাই বললেই চলে। কেননা, ইহা pharmaceutical drug থেকে বেশি গতিসম্পন্ন এবং অতি কম সময়ের ভিতরে রক্তের সাথে মিশে যায় ও বিভিন্ন ধরণের বিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই ড্রাগ সেবনকারী ব্যাক্তি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং তার অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। ফলে বিভিন্ন কুকর্মে এবং অপরাধ জনিত কারণে অতি কম সময়ের ভিতরে Narcotic Control Bureau বা NCB র সাথে ঘনিষ্টতা বাড়ে আর জেলে বন্দি জীবন যাপন করতে হয়। Narcotic and Psychotropic Act, 1985 এর বিভিন্ন ধারার অধীনে মাদকসেবন কারীর উপর মামলা আরম্ভ হয়। এছাড়া এই খুব দ্রুত শারীরিক দুর্বলতা এবং অসুস্থ হয়ে পড়ে।

LSD, cocaine, marijuana , brown sugar এগুলো অতি ভয়ংকর ড্রাগস। বিখ্যাত ফুটবল তারকা ডিয়েগো ম্যারাডোনার কোকেইন নামক ড্রাগসে কি দুর্গতি করেছিল তা সকলেরই জানা। বিগত দশকের মাল্টি মিলিওনিয়ার হলিউড অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোর অকাল মৃত্যু drug abuse এর জন্যই হয়েছিল। বলিউড তারকা সুশান্ত সিং রাজপুতের মতো উদীয়মান প্রতিভাশালী অভিনেতার অপমৃত্যু এবং সেই কাণ্ডের সাথে জড়িত সকল কাহিনীর কথা কেউ ভুলতে পারে ?

পৃথিবীতে প্রায় সকল দেশেই কম বেশি পরিমাণে ড্রাগ নামের ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। যৌবনের উদ্যমতা নিয়ে চলা ছেলে মেয়েদের জীবন অকালেই স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। কত যে সুখের সংসার মাদক জাতীয় বিভীষিকার কবলে ছারখার হয়েছে, কত যে প্রতিভার অপমৃত্যু হচ্ছে প্রতিনিয়ত আমাদের চোখের সামনে এর কি আর হিসেব রেখেছি !

আজ পৃথিবীতে প্রায় সকল দেশই নিজের থেকে শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে বোমা বারুদ থেকে ড্রাগের টোপ বেশি ব্যবহার করে থাকে। কারণ শত্রুপক্ষ কে বাঁধা দিতে ড্রাগের দ্বারা শত্রুর বড় শক্তিকে পঙ্গু করা সহজ। ২০১৬ সালের 'উড়তা পাঞ্জাব' মুভি, পাকিস্তান থেকে ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা প্রমুখ জায়গায় চলা চোরাই পথে ব্যবসা বাণিজ্য দ্বারা আক্রান্ত যুবসমাজের উপর নির্মিত, অভিনয় করেছেন আলিয়া ভাট ও শাহিদ কাপুর। অথবা ২০২০ সালের 'মালাঙ্গ' মুভি, গোয়াতে ড্রাগসের রমরমা ব্যবসায় দেশী-বিদেশী যুব সমাজ কীভাবে আক্রান্ত তা অভিনয়ের মাধ্যমে আদিত্য রায় কাপুর ও দীশা পাঠানি অত্যন্ত বাস্তব উপস্থাপন ফুটিয়ে তুলেছিলেন। আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশ থেকে শুরু করে মেক্সিকো, পানামা, উরুগুয়ে, প্রমুখ দেশে drug trafficking দ্বারা জর্জরিত।আমাদের আসামের পার্শ্ববর্তীতে থাকা গোল্ডেন ট্রাইএঙ্গেল নামে কুখ্যাত ম্যানমার, থাইল্যান্ড, সিংগাপুর প্রমুখ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ড্রাগ উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে আসা ড্রাগের দ্বারা আসামের সাথে উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সমূহ তথা আমাদের বরাক উপত্যকার বিভিন্ন অঞ্চল যে কতটা বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সম্মুখীন তা না বললেই হবে। আমাদের এই প্রজন্ম কতটা ড্রাগসের শিকার হয়েছে, আমরা সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে! দুঃখের বিষয় হলো রাতারাতি টাকার পাহাড় গড়ার লক্ষ্যে কিছু প্রতিষ্ঠিত 'গেস্টাপো' ব্যাক্তি পুরো সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারে।

মাদকদ্রব্যের এই সর্বনাশা ব্যবহার বর্তমান বিশ্বে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে এই পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা বাঞ্চনীয়। আমাদের পুলিশ প্রশাসন এই মাদকের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে। 
মাদকদ্রব্য উৎপাদন ও আমদানি রোধ করার জন্য প্রতিরোধ কর্মসূচি আরো জোরদার করা, মাদক চোরাচালান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, সমাজের প্রত্যেক মানুষকেই এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা, বেকারত্ব হ্রাস করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য বইয়ে মাদকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা, আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর ভূমিকা পালন করা, সরকারি উদ্যোগ বৃদ্ধি করা এবং সভা, সমিতি, সেমিনার ও আলোচনার মাধ্যমে মাদক প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা। আজ থেকে সজাগ ও সচেতনভাবে বলে দেই " NOT TO DRUGS"।

Wednesday, November 9, 2022

অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে ভারতে


গোটা ভারত জুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য মারাত্মক ভাবে বেড়েছে! ধনীরা আরও ধনী হয়েছে, আর গরিব হচ্ছে আরও গরিব। ভারতের অর্থনীতি অতিমারির প্রভাব কাটিয়ে ‘ঘুরে দাঁড়াচ্ছে’, অন্তত ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে। এমনই মনে করছে কেন্দ্রীয় সরকার। কোন ভারত? বিশ্বব্যাঙ্কের প্রাক্তন মুখ্য অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সার্বিক ভাবে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্মণ দেখা গেলেও তার সুফল আটকে রয়েছে সমাজের উঁচু তলায়। আর দেশের অর্ধেক মানুষ মন্দার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন।

'ইকোনমিস্ট' পত্রিকার ২৭ অক্টোবর সংখ্যায় 'ল্যাটিটিউড ইজ এভরিথিং' (Latitude is everything) শিরোনামে ভারতের অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে এক সাবধানতা মূলক ও ভীতিকর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রতিবেদনের একেবারে শুরুতে বলা হয়েছে যে ভারতের দক্ষিণ অংশ অর্থ উৎপাদন করে এবং উত্তর অংশ শিশু উৎপাদন করে। এবং পরিণতি বিস্ফোরক হতে পারে।প্রতিবেদনে গোয়ার কথা উল্লেখ করে লেখা হয়েছে গোয়ার পশ্চিম উপকূলে একটি বহু-সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল, যা গলদা চিংড়ির আবাসস্থল এবং চমৎকার জীবনযাত্রার মান। গোয়ার গড় ব্যক্তির আয় উত্তরের গঙ্গা অঞ্চলিয় বিহারের গড় ব্যক্তির আয়ের চেয়ে দশ গুণ বেশি।'ইকনোমিস্ট' -র কথায়, গোয়া ও বিহারের মানুষের জীবনযাত্রার মানের মধ্যে যতটা তফাত রয়েছে দক্ষিণ ইউরোপ এবং সাব-সাহারান আফ্রিকান দেশগুলির মানুষের জীবনযাত্রার মানের মধ্যে ততটা ফারাক।

 চীন, বাংলাদেশ প্রভৃতি অনেক দেশের উদাহরণ দিয়ে দ্য ইকোনমিস্ট বলেছে, এই ধরনের আঞ্চলিক বৈষম্য পৃথিবীর আর কোনো দেশে তেমন দেখা যায় না। ভারতের দক্ষিণ ও পশ্চিমের রাজ্যগুলি সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেখা গেছে এবং বিহার,উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থান এবং পশ্চিমবঙ্গ, যা ভারতের মোট জনসংখ্যার চল্লিশ শতাংশ, প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মানুষ, চরম দারিদ্র্য এবং অনগ্রসরতায় বসবাস করে।'ইকোনমিস্ট'- র মতে ২০১০ সালের পরের দশকে, বিহারের জনসংখ্যা ১৬.৫ শতাংশএবং উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যা ১৪ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, কেরালা, তামিলনাড়ুর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১০ শতাংশেরও কম। ভারতে শিল্পে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা মাত্র ১৪ শতাংশ, চীনে ২৭ শতাংশ এবং বাংলাদেশে ২১ শতাংশ।

ভারতের জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ উত্তরপ্রদেশে বাস করে, শিল্পে নিয়োজিত লোকের সংখ্যা উত্তরপ্রদেশের জনগণের মাত্র ৯ শতাংশ। দেশে শিল্পে নিয়োজিত অর্ধেকেরও বেশি লোক রয়েছেন দক্ষিণের পাঁচটি রাজ্য এবং পশ্চিমে গুজরাটে। অ্যাপলের মতো একটি কোম্পানির পণ্য তৈরির ১১টি কারখানার মধ্যে উত্তরাঞ্চলে রয়েছে মাত্র একটি, শুধুমাত্র তামিলনাড়ুতেই রয়েছে ৬টি কারখানা।

ভারতই বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে বসতি স্থাপনের জন্য আভ্যন্তরীন স্থানান্তরের অনুপাতও সবচেয়ে কম। এই কারণে, একই যোগ্যতা, শিক্ষা এবং বর্ণ থাকা সত্ত্বেও, একজন ব্যক্তি একই দেশে ভয়, সংশয়ের কারণে অন্য ব্যক্তির তুলনায় অনেক গুণ কম উপার্জন করে।

 'এক ভাষা, এক দল, এক জাতি' ধরনের নীতি ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে বিদ্বেষ বাড়ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের চলাফেরায় চরম আঘাত হানছে। একজন সাধারণ মানুষ তার বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাওয়ার আগে একশোবার চিন্তা করে। তার উপরে পরিবহন সুবিধা ব্যায়বহুল করে যেভাবে জনগণের চলাচল ব্যাহত করা হচ্ছে তাতে এই অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও দ্রুত বাড়ছে। এতে কি বোঝা যায় সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী হিংসার পরিবেশ সরাসরি কোনো শক্তিশালী নীতির ফল।

মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং কর্পোরেট পুঁজিবাদের একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থাপনা যখন বিশ্বের সম্পদকে গুটি কয়েক পরিবারের হাতে পুঞ্জিভূত করে তুলছে, তখন সম্পদের সুষম বন্টনই এ সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত অর্থনীতির সুষম বন্টন ব্যবস্থাই শান্তি, সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। আজকে আমাদের সমাজে যে বিপরীতমুখী বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করছি, একদিকে সরকার দেশে ব্যাপক উন্নয়নের দাবী করছে অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাধারণ মানুষ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে দেশ পিছিয়ে পড়ার বাস্তবতা তুলে ধরছে। কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার মধ্যে রেখে দেশের কয়েকশ পরিবার শতকোটি টাকার মালিক হয়ে যাওয়া এবং সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতাই হচ্ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে সৃষ্ট সামাজিক সঙ্কট। দেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যের অভিশাপমুক্ত করতে হলে প্রথমেই সম্পদের সুষম বন্টন ব্যবস্থার উপর নজর দিতে হবে।

Monday, October 31, 2022

শিশুর বিকাশে মানসিক ও সামাজিক পরিবেশ


 ‘যে ব্যক্তি শিশুকে স্নেহ করে না, তার বাবা-মা কিংবা শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা নেই।’ --- বার্ট্রান্ড রাসেল

আগামী দিনে শিশুরা হবে রাষ্ট্রনায়ক, সরকারপ্রধান, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সচিব, শিক্ষক, নজরুল, ঈশ্বরচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সাবিত্রী বাঈ ফুলে। এ জন্য সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে, নৈতিকতা মূল্যবোধ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। মানবসন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে শিখতে শুরু করে। তবে জন্মের পর থেকে ১০ বছর বয়সে পৌঁছা পর্যন্ত সময়ই শিশুর মস্তিস্ক বিকাশের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বয়সেই শিশুদের মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা, অনুসন্ধিৎসা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিভা বিকশিত হয়। সুতরাং এই বয়স থেকেই একজন শিশুকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চায় অভ্যস্ত করা জরুরি। এ সম্পর্কে দালাই লামার উক্তি প্রণিধানযোগ্য ‘শিশুর নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বীজ গ্রথিত হয় পরিবারে। তা বিকশিত হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর চর্চা হয় সমাজে।’ তাই সার্বিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষাপ্রক্রিয়ায় পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

একটি শিশুর মানসিক বিকাশের সাথে সামাজিক পরিবেশের একটা কগনেটিভ সম্পর্ক থাকে। বিকাশ যেভাবেই হোক না কেন, এটা সদাই একটা ক্রমবর্ধমান গতিতে অগ্রসর অর্থাৎ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি হয়। সেইজন্য মানসিক বিকাশের সাথে নিত্য পরিবৰ্তন হয়ে থাকা পরিস্থিতির একটা প্ৰভাব থাকে। উদাহরণস্বরূপ দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ে আমাদের দেশে বিশেষভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা কম বয়সী যুদ্ধরত সৈন্যদের ক্ষেত্ৰে মানসিক রোগ দেখা দিয়েছিল এবং সেই সময়ে আমাদের ভারতবৰ্ষে মানসিক রোগীর জন্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সৈনিকদের চিকিৎসার জন্য। দেশের পরিস্থিতি এবং সমাজের অস্থিরতা মানুষের মনের বিকাশ, চিন্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যে প্ৰভাব ফেলে এবং সাথে তা নিয়ন্ত্ৰণও করে। উদাহরণস্বরূপ আমাদের যখন কোভিড১৯ র জন্য বন্ধ হয়েছিল স্কুল-কলেজ এবং দেশে এক অনিশ্চিত পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। তখন একটি বিকাশরত শিশুর মানসিক বিকাশকে বৃহত্তর বা কম পরিমাণে প্রভাবিত করেছিল।

এই ধরনের পরিবেশে একটি শিশুর মনে কেমন অনুভব বা ধারণ করে তা বোঝা কঠিন, তবে আমাদের উচিত শিশুদের যতটা সম্ভব দুশ্চিন্তা থেকে দূরে রাখা এবং তাদের মানসিক বিকাশে সহায়তা করার জন্য তাদের সবসময় একটি সুস্থ পরিবেশে রাখা উচিত। সমাজে চলিতমান রাজনৈতিক অস্থিরতা বা ধর্মীয় বাতাবরণ থেকে শিশুদের দূরে রাখতে হবে। এই ক্ষেত্ৰে সামাজিক মাধ্যমে কিছু সচেতন হতে হবে। সব সময় ঋণাত্মক ভাবধারা পরিহার করে কিছু ইতিবাচক চিন্তা এবং ভালো ও সুস্থ স্বপ্ন দেখাতে হবে। মহামারি কি আমরা জানি কিন্তু একটি ১২-১৪ বছরের শিশুর ক্ষেত্রে এটা খুব হতাশজনক বিষয়। ভয় পাবে এবং মনে দুঃখ ভাব আসতে পারে। দীর্ঘকালীন এই ভাবধারা হলে স্বল্প পরিমাণে হলেও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। সেইজন্য শিশুর সঙ্গে কোনো ধরনের আতংকময় পরিবেশের সূচনা আপনাকে পরিহার করতে হবে।

একটা কথা বলা হয় যে সমাজের সঙ্গে নিজেক খাপ খাইয়ে চলার জন্য শিশুর কিছু অভিজ্ঞতার আবশ্যক। কিন্তু আমি মনে করি যে সেই অভিজ্ঞতা মাতৃ স্নেহের থেকে পরিপুষ্ট পরিবেশে হতে হবে বা অভিভাবকদের উচিত আপদকালীন সময়ের আলোচনা থেকে আত্মবিশ্বাসীমূলক শব্দে শিশুকে কিছু শেখানো বা বোঝানো।

যখন আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে করোনা কালে ঘরে বসে অনলাইন পদ্ধতির মাধ্যমে পড়তে দেয়া হয়েছিল তখন তাদের মনের এমন ভাব হয়েছিল যে তারা যেন সর্বদা এইভাবে ঘরে থেকে সময় অতিবাহিত করতে হবে না কি? বা ভবিষ্যত কি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা যারা অভিভাবক এবং শিক্ষক ছেলেমেয়েদের ইতিবাচক দৃষ্টিতে পরিবেশ- পরিস্থিতি বুঝতে বা বুঝাতে চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে। এই ধরনের মহামারী ১০০ বছর আগেও হয়়েছিল এবং সমস্ত সমস্যার সমাধান আছে বা একমাত্র ধৈর্য ধারণ ও বিজ্ঞানের উপর বিশ্বাস রাখাটা খুব জরুরী। শিশুদের সৃষ্টিকৰ্তার বিপরীতে বিজ্ঞানের উপর বিশ্বাস রাখার উপদেশ দিতে হবে। শুধু বিশ্বাস না প্রমাণ সহ বুঝিয়ে দিতে হবে। যা একটি শিশুর মানসিক বিকাশে ও পরবর্তী সময়ে প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করবে।

শিশুর মানসিক বিকাশে পরিবেশের প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে শিশু যে রকম সামাজিক পরিবেশে বড় হয়, তার মানসিকতাও সেভাবে গড়ে ওঠে। শিশুর পারিবারিক পরিবেশ, তার পরিচিত গণ্ডি ও আত্মীয়-স্বজন সবার একটা প্রভাব শিশুর ওপর পড়ে। এমনকি এই বলয়ের মধ্যে তার স্কুলের শিক্ষক, প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধব সবার সম্মিলিত প্রভাবে শিশুর ভেতর একটি মনস্তত্ত্ব গড়ে ওঠে। শিশু ধীরে ধীরে তার পড়াশোনা ও বয়সের পাশাপাশি তার চারপাশের সামাজিক পরিবেশ থেকে যে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান লাভ করে, তা-ই তার মানসপটে একটি আসন তৈরি করে নেয়। একইভাবে শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য ব্যায়াম, খেলাধুলা, সঙ্গীত, সাহিত্য ও শিল্পকলায় অংশগ্রহণ করতে হবে। তাদের শেখানো উচিত, যা শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে উৎসাহিত করে। শিশুদের উপর অতিরিক্ত চাপ দেয়া উচিত নয় এবং তাদের সবকিছুতে দক্ষ করতে তাদের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। এটা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

আজকের শিশুকে আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে তার জন্য একটি উপযুক্ত সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা আবশ্যক। কিন্তু এতসব জটিল সমীকরণ সামনে রেখে শিশুদের জন্য একটি সর্বজনীন সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা সত্যি কঠিন একটি কাজ। তারপরও কাজ যত কঠিনই হোক, সেটি অসম্ভব মোটেই নয়। এ সত্যকে সামনে রেখে দেশের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে শিশুবান্ধব নীতি-কৌশল প্রণয়ন করেছে ভারত সরকার।

একইভাবে আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রে সমাজ ব্যবস্থা পরিচালিত হয় কিছু প্রতিষ্ঠিত আইনের দ্বারা; যেখানে কিছু নির্দেশনা থাকে, যদ্বারা সমাজে কল্যাণ সাধন করা হয়। এইক্ষেত্ৰে শিশুর জন্য আমাদের দেশে কয়েকটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। যেমন —

(১) শিশু শ্রম নিবারণ আইন ১৯৮৬।
(২) বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধকরণ আইন ২০০৬। 
(৩) শিশুর সুরক্ষা এবং আদর-যত্ন এবং কিশোর ন্যায় আইন ২০০০।
(৪) শিশুর অধিকার সংরক্ষণ আয়োগ আইন ২০০৫।
(৫) বিনামূল্যে শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯।
(৬) শিশুর উপর হওয়া যৌন নির্যাতন প্ৰতিরোধ আইন ২০১২।

এগুলি হল রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রয়াস যাতে শিশুদের মানসিক বিকাশ এবং তাদের সকল প্রকারের উন্নতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়। এই আইনগুলি কার্যকর করার মাধ্যমে, আমরা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী এবং সুস্থ সমাজ গঠনের চেষ্টা করছি। তাই সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের আজকের শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। সরকারের এসব উদ্যোগের পাশাপাশি দেশের সব নাগরিক নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমাদের শিশুদের জন্য একটি অনুকূল সামাজিক পরিবেশ তৈরিতে সচেষ্ট থাকলেই আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাব আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে।

Friday, October 21, 2022

মানবতার শেষ দান হোক 'মরণোত্তর দেহদান'


‘ মরণোত্তর দেহদান ' ব্যাপারটি সচেতন মানুষের কাছে এখন পরিচিত হলেও অনেকের কাছে সামগ্রিক ধারণাটি তেমনভাবে স্পষ্ট নয়। মরণোত্তর দেহদান হল মৃত্যুর পর শবদেহ ধর্মীয় প্রথাসিদ্ধ মতে সৎকার না করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বার্থে দান করা। ক্ষণস্থায়ী জীবনে আমাদের সবার উচিত ভালো কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা। তাই মরণোত্তর অঙ্গ বা দেহদান এমনই একটি কল্যাণকর কাজ। তবে অঙ্গদান নিয়ে মানুষের মাঝে একটা আবেগ কাজ করে। এখন প্রযুক্তিতে আমরা অনেক এগিয়ে যাচ্ছি। এখন মানবিকভাবে আরও এগিয়ে যেতে হবে।

চিকিৎসায় গবেষণা ও শিক্ষার উদ্দেশ্যে মৃত্যুর পর সমগ্র দেহ দান করা। মানবদেহ বুঝতে এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য মেডিকেল ছাত্র এবং গবেষকদের সাহায্য করার জন্য শরীর দান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে কোন ব্যক্তি তাদের দেহ দান করতে ইচ্ছুক, মৃত্যুর আগে স্থানীয় মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল বা একটি এনজিওর সাথে পূর্বে ব্যবস্থা করতে পারেন। ইচ্ছুক ব্যক্তিরা একটি মেডিকেল প্রতিষ্ঠান বা একটি এনজিও থেকে একটি সম্মতি ফর্মের জন্য অনুরোধ করতে পারেন, যারা সম্ভাব্য দাতা মারা যাওয়ার পরে অনুসরণ করা নীতি এবং পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য দেবে। যাইহোক, একটি পূর্বের সম্মতি ফর্মে স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক নয় তবে এটি বাঞ্ছনীয় যাতে আপনার পরিবার আপনার সিদ্ধান্ত এবং আপনার ইচ্ছা পূরণে তাদের যে ভূমিকা পালন করা দরকার সে সম্পর্কে সচেতন হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সহজে তা পাওয়া যায় না। এখানে ধর্মীয়, পারিবারিক, সামাজিক অনেক কিছু জড়িত। তবে ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে তো তর্ক করে লাভ নেই। এটা যার যার বিশ্বাস। অনেকই অঙ্গদানে ভয় পান। এতে অনেক সময়ে ডোনারের সঙ্কট দেখা দেয়। দেহদান করতে হয় স্বেচ্ছায়। যে কেউ চাইলেই দেহ দিতে পারেন।

কিন্তু এই দান ভারী অদ্ভুত। যাঁর মৃতদেহ তিনি কিন্তু নিজে এই দান করতে পারেন না, সেটাই স্বাভাবিক। কারন মৃত্যুর পর তিনি দান করবেন কিভাবে? কোন ব্যক্তি জীবিতকালে শুধুমাত্র তাঁর এই ইচ্ছার কথা অঙ্গীকারের মাধ্যমে জানিয়ে রাখতে পারেন শুধু। তাঁর ইচ্ছাপূরণের দায়টা কিন্তু নিকটজনের। আর এই ইচ্ছাপুরণটা যাতে হয় সেক্ষত্রে অঙ্গীকারকের একটা ভূমিকা আছে। তা হল এই অঙ্গীকারকের বিষয়টি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন। যা দিয়ে সে নিকটজনকে মোটিভেটেড করতে পারবেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন করা হবে এই দান? তাহলে আমাদের জানতে হবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে মৃতদেহের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? আধাত্মিক, আত্মা, পরলোক ইত্যাদি ধারণা থেকে আমরা যে ধর্মীয় মতে বিশ্বাসী, সেই ধর্মের বিধান অনুসারে আমাদের মৃতদেহের অন্তিম কাজ করা হয়। যা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও অবৈজ্ঞানিক। যে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিধান অনুযায়ী আমরা চলি তার বয়স খুব বেশি হলে প্রায় তিন হাজার বছর। কিন্তু বিবর্তনের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি আধুনিক মানুষ, বিজ্ঞানীরা যাকে হোমো সেপিয়েন্স বলে অভিহিত করেছেন সেই সময়ের একটা পর্যায়ের পর মানুষ মারা গেলে সেই মৃতদেহ কবর দেওয়া হত। মৃতদেহের সাথে খাবার সামগ্রী দেওয়া হত। কিন্তু এর সঙ্গে আত্মা বা ঐশ্বরিক কিংবা এই জাতীয় কোনো চিন্তার যোগ ছিল না। আমার এই মতে মৃতদেহ কবর দেওয়ার ব্যাপারটা এসেছে মৃতদেহের পচন ও সেই পচন থেকে দূর্গন্ধের জন্য। আগুনে পোড়ানো অনেক পরে এসেছে।এক সময় নদীতেও ভাসিয়ে দেওয়া হত।

আরজ আলী মাতুব্বর মৃত্যুর কিছুদিন আগে তার লেখা ‘কেন আমার মৃতদেহ মেডিকেলে দান করেছি’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বলেন – 'আমি আমার মৃতদেহটিকে বিশ্বাসীদের অবহেলার বস্তু ও কবরে গলিত পদার্থে পরিণত না করে, তা মানব কল্যাণে সোপর্দ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। আমার মরদেহটির সাহায্যে মেডিক্যাল কলেজের শল্যবিদ্যা শিক্ষার্থীগন শল্যবিদ্যা আয়ত্ত করবে, আবার তাদের সাহায্যে রুগ্ন মানুষ রোগমুক্ত হয়ে শান্তিলাভ করবে। আর এসব প্রত্যক্ষ অনুভূতিই আমাকে দিয়েছে মেডিকেলে শবদেহ দানের মাধ্যমে মানব-কল্যাণের আনন্দলাভের প্রেরণা।’

মৃত মানবদেহ (যাকে ক্যাডেভার বলা হয়) ছাত্রদের অ্যানাটমি, শরীরের গঠন অধ্যয়ন এবং এটি কীভাবে কাজ করে তা শেখানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি চিকিৎসক, সার্জন, ডেন্টিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কোর্স। নতুন জীবন-রক্ষাকারী অস্ত্রোপচার পদ্ধতির উন্নয়নে গবেষণা চিকিৎসকদের দ্বারাও মৃতদেহ ব্যবহার করা হয়, উদাহরণস্বরূপ, অন্যদের মধ্যে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গে অস্ত্রোপচার পদ্ধতি। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলি স্বেচ্ছায় অনুদানের মাধ্যমে মৃতদেহ গ্রহণ করে, সেইসাথে পুলিশ যারা দাবিহীন মৃতদেহ দান করে তাদের কাছ থেকেও। এই দানগুলি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা এবং ছাত্রদের দ্বারা অত্যন্ত মূল্যবান।

'মানুষের দেহ থেকে আত্মাটা বেরিয়ে গেলে দেহটাকে তখন বলা হয় শবদেহ বা লাশ যেটাকে আত্মীয়-স্বজন- প্রতিবেশীরা সমাহিত বা দাহকার্য সম্পন্ন করতে পারলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। পুড়িয়ে দিলে ভস্মে পরিণত হয় অথবা কবরস্থ করলে পচে গলে মাটিতে পরিণত হয় এবং এটাই বাস্তব। তো সেই অপ্রয়োজনীয় শবদেহের কিছু অংশ দিয়ে যদি কিছু জীবিত মানুষের উপকার হয়, তাহলে সৃষ্টিকর্তার রুষ্ট হওয়ার কথা নয়। এটাই হলো বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তি। কিন্তু, সমস্যা হলো ধর্মের প্রতিনিধিদের নিয়ে। এক একজন মুফতি মাওলানা মুখস্থ করা হাদিসের কিছু বিবৃতি আপনাকে শুনিয়ে দিবেন। কিন্তু তাঁদের জানা উচিত ভারতে আজ পর্যন্ত যত সংখ্যক অঙ্গ প্রতিস্থাপন হয়েছে তার প্রায় ৪৫% প্রতিস্থাপিত হয়েছে কোনো মুসলমানের দেহে। তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? মুসলমানেরা অন্যের মৃতদেহের অঙ্গ গ্রহন করতে পারবে কিন্তু নিজের মৃতদেহের অঙ্গ অন্যকে দান করতে পারবেনা -তাই তো? মুফতি মাওলানারাও আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ নেন এবং তাঁরা এটাও জানেন যে, যে ডাক্তারেরা তাঁদের চিকিৎসা করেছেন বা করছেন তাঁদের প্রত্যেককে মৃতদেহের উপর রিসার্চ করে ডাক্তার হতে হয়েছে। তারমানে, তাঁরা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুযোগ নিবেন, কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়নে সহযোগিতা করবেন না। এই দ্বিচারিতা মেনে নেওয়া যায় না। আবার কেউ কেউ তো আধুনিক চিকিৎসাটাও নিতে চান না। একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। কয়েকদিন আগে আমার একজন মাওলানা মামা আমাকে ফোন করে জানতে চাইলো রায়গঞ্জে কোনো লেডি গাইনো ডাক্তার আছেন কিনা। আমি তাঁর খোঁজ দিলাম। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা গেল মামীর জরায়ুতে একটি সিস্ট আছে। সেটা এমন পর্যায়ে আছে যে অপারেশন না করলে সেটি ওষুধে সারবেনা। শুরু হয়ে গেল কাঁচুমাচু। ধমক দিয়ে বললাম তোমার একটা অপারেশনের দরকার হলে তুমি করাতে না। শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছা সত্বেও ওটি করালো এবং এখন মামী বেশ সুস্থ আছে। বাইরের লোককে কি বুঝাব, আমার নিজের পরিবারেই এমন অনেকে রয়েছেন। বিজ্ঞানের সাথে হাদিসের একটা সংঘর্ষ আছে। আর এই হাদিস লিখিত হয়েছিল ১৫০০ বছর আগে, তখন কিন্তু বিজ্ঞানের এতো অগ্রগতি হয়নি। মুসলমানেরা অনেক বিজ্ঞান মেনেও নিয়েছেন এবং প্রয়োজনের তাগিদে মেনে নিতে হবেই। তাহলে এ বিষয়ে কয়েকটি গল্প বলি। আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগেও অনেক মুসলমান ঘড়ি ব্যবহার করতেন না। তাঁরা ইফতার কিংবা সেহেরি করতেন সূর্যের আভা দেখে অথবা নামাজ পড়তেন নিজের ছায়া দেখে। এখন ঘড়ি দেখে তা করা হয় এবং প্রায় প্রত্যেকটি মসজিদে ঘড়ি এবং নামাজের সময় সারণি দেখতে পাবেন। কয়েকবছর আগে মুয়াজ্জিনরা খালি গলায় আজান দিতেন, এখন মাইকে দেন। এভাবেই মানুষের প্রয়োজনে বিজ্ঞানকে সমর্থন করতেই হবে। 

এখন মুসলমান পরিবারের প্রচুর ছেলেমেয়ে ডাক্তার হচ্ছে। তাঁদেরকেও অন্যের মৃতদেহ কাঁটাছেঁড়া করে ডাক্তারী দক্ষতা অর্জন করতে হয়। হাদিস অনুসারে তাঁরা একাজ করতে পারেন না। তাহলে মেনে নিচ্ছেন কেন? মনে রাখতে হবে মানুষের প্রয়োজনে হাদিস, হাদিসের প্রয়োজনে মানুষ নয়। অর্থাৎ যে হাদিস মুসলমানদের কল্যাণের অন্তরায় তাকে এড়িয়ে চলুন। তাছাড়া, যে হাদিসগুলো নিয়ে মুসলমানেরা বিভ্রান্ত ছিল, ইসলামিক স্কলারেরা মানুষের কল্যাণে সেগুলির অনেকটাই স্পষ্টীকরণ ঘটিয়েছেন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মানুষের কল্যাণে মুসলমানদের আরো যুক্তিবাদী হয়ে উঠতে হবে। হাদিস অনুসারে মুসলমানদের বিশ্বাস মৃতদেহকে কবরস্থ করার পর কবরের মধ্যেই তার পাপপুণ্যের হিসাব শুরু হয়। ঠিকই আছে বিশ্বাসের খাতিরে তা বিশ্বাস করলাম। কিন্তু যে সব মুসলমানের মৃতদেহ দুর্ঘটনার কারণে বা যুদ্ধের কারণে বা অন্য কোনো কারণে পাওয়া যায় না বা কবরস্থ করা সম্ভব হয়না, তাদের পাপপুণ্যের হিসাব কোথায় শুরু হবে এবং কিভাবে শুরু হবে? আমি বিশ্বাস করি ইসলাম একটি আধুনিক এবং বস্তুনিষ্ঠ ধর্ম। সমাজ গঠনে এই ধর্মের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সেই ধর্ম যদি একপেশে আলেমের বগলদাবা হয়ে থাকে, তাহলে মুসলিমরা মুক্ত হবে কিভাবে? আলোচনা হোক। আমি যে প্রশ্নগুলি উত্থাপন করেছি, কোনো সহৃদয় আলেম যদি তার যুক্তিনির্ভর উত্তর গুলি দেন তাহলে আমি বাধিত হবো।' (লিখেছেন শাহীদুর রহমান, ফেসবুক পোস্ট)

দুঃখের বিষয় হলো একবিংশ শতাব্দীতেও আমাদের দেশে সাধারণ মানুষদের মধ্যে এই প্রক্রিয়াটি এখনো জনপ্রিয় করা যায়নি। বেহেস্তের বা স্বর্গের অলীক হুর-পরীর লোভ, নরক কিংবা দোজখের ভয়, কুসংস্কার আর অপবিশ্বাসের পাশাপাশি অশিক্ষিত এবং অর্ধশিক্ষিত মোল্লা -- পুরোহিত ছড়ি ঘোরানো যে সমাজে প্রবল সে সমাজে এই ধরণের ব্রাত্য ধারণাকে জনপ্রিয় করাটা কষ্টকরই বটে। কিন্তু উদ্যোগ তো নিতে হবে কাউকে না কাউকে একটা সময়। আসলে সেই ভাবনা থেকেই লেখাটির শুরু। আমি নিজেও এ ধারনায় নতুন সৈনিক। অনেক কিছু জানার চেষ্টা করছি। যতটুকু জেনেছি বুঝেছি এর নিরিখেই প্রবন্ধটি লেখা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস পাঠক মহলে নিশ্চিত আগ্রহ বাড়বে। আমাদের দেশে যদিও ইতিমধ্যে বিরাট প্রসার ঘটছে তৎসংগে বরাক উপত্যকায়ও এর সাড়া মিলছে বিশেষ ভাবে। ধন্যবাদ জানাতে হয় সেই সকল ব্যক্তিদের যারা বিভিন্ন এনজিও বা সংগঠনের হয়ে এর প্রচার ও প্রসারে নিরলসভাবে কাজ করে আসছেন। আমরা বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকায় তা দেখি। এই আগ্রহ এবং সাড়া শুভবুদ্ধিধারী মুক্তমনা মানুষদের আগ্রহের চারাগাছ। এই চারাগাছ ধীরে ধীরে বড় হবে, কালের মহীরুহ হয়ে ছড়িয়ে পড়বে আনাচে কানাচে।

ক্লাইমেট চেঞ্জ: গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও আমাদের দায়ভার


দিন যত গড়াচ্ছে, ততই চরম হচ্ছে জলবায়ু। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনাও বাড়ছে খুব তীব্র ভাবে। সংকটময় এমন পরিস্থিতির মধ্যে শঙ্কা জাগা তথ্য দিয়েছে রাষ্ট্রসংঘ। বিশ্ব সংস্থাটি বলছে, দুর্যোগের পূর্বাভাস বা আগাম সতর্কতা পেতে আধুনিক সরঞ্জাম নেই বিশ্বের অর্ধেক দেশের কাছেই। পৃথিবীর তাপমাত্রা,দশ বছরে সমুদ্রের জলস্তর প্রায় দুগুন বাড়ছে, গ্লেসিয়া গলছে, বড় বড় আইসবার্গগুলো ভেঙে পড়ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ দ্রুত হারে বাড়ছে।সামগ্রিকভাবে, আমরা আমাদের নিজেদের প্রজন্মকে আমাদের চেয়েও খারাপ জীবন দিতে চলেছি। নাসার ওয়েবসাইট থেকে ক্লাইমেট চেঞ্জ সেকশনে যদি নজর দেয়া হয় তবে আমরা নিশ্চয় বুঝতে পারবো যে  জীবন সহজ করতে আমাদের সকল কৌশল, আবিষ্কার, উদ্ভাবন সমগ্র মানবজাতিকে মারাত্মক বিপদে ফেলেছে। এই খারাপ পর্যায়টি ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং এই পর্যায়টি আগামী অন্তত এক শতাব্দী ধরে চলতে থাকলে, যা সময়ের সাথে সাথে আরও খারাপ হতে পারে। এর পরিণাম এতোটাই খারাপ হতে পারে যে আমাদের প্রজন্ম কখনো অতি খরা, কখনো বন্যা, কখনো ঘূর্ণিঝড়, আবার কখনও সুনামীর মতো ভয়ঙ্কর প্রলয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে শুধু নিজেকে বাঁচানোর প্রচেষ্টায় থাকবে।

১৮৫০ এর উদ্যোগিক কালের শুরুর সাথে সাথেই পৃথিবীর দূর্ভাগ্য লেখার কাজ আধুনিক মানুষেরা নিজের হাতে সংকল্পবদ্ধ হয়ে নিয়েছে। আমাদের নিশ্চয় মহান বৈজ্ঞানিক আর্লবার্ট আইনস্টাইন এর নাম মনে আছে। যিনি তাঁর সময়ে দাবি করেছিলেন যে আগামী একশ বছরে পৃথিবীর জনসংখ্যা এত বেশি হয়ে যাবে যে, কোথাও জমায়েত বা ভিড় করার প্রয়োজন হবে না। কারণ আপনি যেখানে দাঁড়াবেন সেখানেই ভীড় পরিলক্ষিত হবে ! তার এই বক্তব্য নিশ্চয় এখন প্রশ্নবোধক চিহ্নের নির্দেশ দেয়। কারণ আইনস্টাইন, যিনি ১৯৫৫ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন, তিনি কখনোই চাননি যে পুরো সত্য ঘটনা বলতে এবং সেই যুগের ধর্মান্ধ চিন্তা জগতের সাথে শত্রুতা করতে। আইনস্টাইনের মৃত্যুর পর থেকে পৃথিবীতে কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন ইত্যাদি গ্যাসের মাত্রা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।এগুলি এমন গ্যাস যা একটি নির্দিষ্ট আনুপাতিক স্তরে জীবনের জন্য সামঞ্জস্য তৈরি করে, কিন্তু গত পঞ্চাশ বছরে তাদের অনুপাত আশ্চর্যজনকভাবে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, যারফলে এক প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

 এই গ্যাসগুলির বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলি হল মোটর গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়া, কারখানার ধোঁয়া, ক্রমাগত বন কাটা ইত্যাদি।পাহাড়ে আমরা অনেক অন্যায় করেছি, অপরাধ করছি, অমানবিক কাজ করছি। এই কাজগুলি আমাদের সকলের জন্যে গ্লানির। ইতিহাস আমাদেরকে ক্ষমা করবে না। আমি একদিন মরে যাবো, আজকের যে তরুণ তিনিও একদিন বুড়ো হবেন, তার একদিন মৃত্যু হবে- কিন্তু ইতিহাসে এই কথাটা থেকে যাবে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাহাড়ের সাথে অন্যায় করেছি এবং সেই অন্যায়ের দায় আমার নামে আপনার নামে সকলের খাতায়ই যুক্ত হবে। এই ধরনের মানবিক কার্যকলাপ, যাকে আমরা বিজ্ঞানের আবিষ্কার বলে মনে করি, আধুনিক মানুষ অর্থাৎ আমরা আমাদের জীবনকে সহজ করে তুলেছি। এই গ্যাসগুলোর আপনি যদি গ্রাফ আকারে ক্রমবর্ধমান স্তরের দিকে তাকান তবে আগামী ২৫ বছরে যদিও কোন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ (যদিও আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব) না আসে তবুও আমরা আমাদের প্রজন্মের অক্সিজেন ক্রয় করে জীবন বাঁচাতে হবে যেভাবে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোগীকে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে দেয়া হয়।এমতাবস্থায় তো অক্সিজেন উৎপাদনকারী বড় কারখানা থেকে অতিরিক্ত গ্যাস হিসেবে হাইড্রোজেনও নির্গত হবে।

গত চল্লিশ বছরে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতা সমগ্র পৃথিবীর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা মাত্র এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে, মহাসাগরের গড় তাপমাত্রাও বেড়েছে মাত্র অর্ধ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের ১০০ মিটার উপরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার সাথে বরফ গলে যাওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আট ইঞ্চি বেড়েছে। যেখানে চল্লিশ বছরের এই পরিসংখ্যান পৃথিবীর তাপমাত্রার উপর এত বড় প্রভাব ফেলেছে, যেখানে ২০১৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত খুব স্বল্প সময়, অর্থাৎ মাত্র ছয় বছর। সেখানে পৃথিবীর দশ হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ তাপমাত্রার সময় রেকর্ড করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বড় প্রমাণ আমাদের চারপাশে তা দৃশ্যমান, অকালীন বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যা যা বর্তমান সময়ের আলোচিত সমস্যা, নাসার প্রতিবেদনে সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ দেখানো হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মৌমাছির উপর তীব্র প্রভাব ফেলছে , তাদের পরাগায়নের ক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে বলে জানা গেছে।  অনেক জায়গায় মৌমাছির অস্বস্তিকর মৃত্যু হচ্ছে।  মৌমাছির উপর যে হুমকির সৃষ্টি হয় তা আমাদের ফ্লোরার উপর সরাসরি প্রভাব পড়ে।  মৌমাছির অবসানের সাথে সাথে, পৃথিবী সেই সমস্ত উদ্ভিদের খারাপ প্রভাবও দেখতে পাবে যা পরাগায়ন করছে, যার প্রভাব সরাসরি মানব জাতিকে একটি সংকটজনক পরিস্থিতিতে নিয়ে যাবে।

পরিস্থিতিতন্ত্রের অবনতির সাথে সাথে, জীবনের সম্ভাবনা সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, যার পর আমাদের প্রজন্ম আমাদের সরাসরি প্রশ্ন করতে পারে যে জীবন মিশ্রিত ছিল, তাহলে কেন আমরা পৃথিবীতে জীবন শেষ করেছি এবং মঙ্গল গ্রহে প্রাণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি? বিশ্বজুড়ে সরকার এই বর্তমান সৃষ্ট সমস্যাটি মোকাবেলা করার জন্য দৃঢ় এবং উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি গুরুতর প্রয়োজন দেখছে, তবে এটি দুঃখের বিষয় যে বৈশ্বিক রাজনীতি এখনও কেন্দ্রীভূত শক্তি, পুঁজিবাদ এবং কর্মক্ষমতার উপর আড়ষ্ট রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যখন মানবজাতির ওপর সংকটের মেঘ ঘনীভূত , তখন বিশ্বের সরকারগুলোকে সম্পূর্ণভাবে দায়ী না করে ভোগবাদের জগৎ সরকার নয়, সাধারণ মানুষের তৈরি।  এই সময়ে, যখন মানবজাতির ভবিষ্যত সম্পূর্ণরূপে মানুষের হাতে, তখন সমস্ত মানুষের একত্রিত হয়ে সরকারকে সতর্ক করার একটি বড় প্রয়োজন,  এবং এটিই একটি সমাধানের পথ প্রশস্ত করে।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...