Monday, November 14, 2022

মাদকাসক্তি : এক অনিশ্চিত জীবনের আলো


মাদকাসক্তি বর্তমান সময়ের মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদকের ছোবল আজ তার বিশাল থাবা বিস্তার করে চলেছে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। দেশের তরুণ প্রজন্ম এ নেশায় আজ আসক্ত। এ মরণনেশা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করা না গেলে এই প্রজন্মের পুনরুত্থানের স্বপ্ন অচিরেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য অংশ আজ এক সর্বনাশা মরণনেশার শিকার। যে তারুণ্যের ঐতিহ্য রয়েছে সংগ্রামের, প্রতিবাদের, যুদ্ধ জয়ের, দেশ গড়ার, আজ তারা নিঃস্ব হচ্ছে মরণনেশার করাল ছোবলে। মাদক নেশার যন্ত্রনায় ধুঁকছে শত-সহস্ৰ তরুণ প্রাণ। ঘরে ঘরে সৃষ্টি হচ্ছে হতাশা। ভাবিত হচ্ছে সমাজ।

Drug এবং Medicine দুটি সমার্থক শব্দ। কিন্তু Drug বলতে
আমাদের মনে একধরণের বিভীষিকা,ভয় বা সংশয়ের জন্ম দেয়। এর ব্যবহার তিনভাবে করা হয়। রোগ শনাক্ত করতে, রোগ নিরাময়ের জন্য, আর রোগ প্রতিষেধক হিসেবে। কিন্তু এর অপব্যবহার ভয়াবহ। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে, নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট রোগের ফলপ্রসূ হলো এই ড্রাগ, অন্যথায় এটা ঘাতক হতে পারে। তদুপরি কিছু ড্রাগ উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহার না করে অনেকেই মনোস্থিতি পরিবর্তন করার জন্য, একধরণের অবাস্তব স্বপ্নের দুনিয়ায় বিচরণের জন্য তা ব্যবহার করে থাকে। সাধারণত ইহাকে ড্রাগের অপব্যবহার বা Drug abuse বলা হয়। এই ধরণের ড্রাগ সমূহকে Narcotic Drugs বলা হয় এবং রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করা ড্রাগসমূহকে Pharmaceutical Drug বা Life saving drug বলা হয়। Narcotic drug abuse, ইহার কুফল এবং মানব সমাজের জন্য ইহা কতটুকু ভয়াবহ, বিভীষিকাময় এবং ক্ষতিকারক; নবপ্রজন্মের উপর এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা যাক।

Narcotic Drug সেবনকারীর হিতাহিত জ্ঞান প্রায় নাই বললেই চলে। কেননা, ইহা pharmaceutical drug থেকে বেশি গতিসম্পন্ন এবং অতি কম সময়ের ভিতরে রক্তের সাথে মিশে যায় ও বিভিন্ন ধরণের বিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই ড্রাগ সেবনকারী ব্যাক্তি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং তার অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। ফলে বিভিন্ন কুকর্মে এবং অপরাধ জনিত কারণে অতি কম সময়ের ভিতরে Narcotic Control Bureau বা NCB র সাথে ঘনিষ্টতা বাড়ে আর জেলে বন্দি জীবন যাপন করতে হয়। Narcotic and Psychotropic Act, 1985 এর বিভিন্ন ধারার অধীনে মাদকসেবন কারীর উপর মামলা আরম্ভ হয়। এছাড়া এই খুব দ্রুত শারীরিক দুর্বলতা এবং অসুস্থ হয়ে পড়ে।

LSD, cocaine, marijuana , brown sugar এগুলো অতি ভয়ংকর ড্রাগস। বিখ্যাত ফুটবল তারকা ডিয়েগো ম্যারাডোনার কোকেইন নামক ড্রাগসে কি দুর্গতি করেছিল তা সকলেরই জানা। বিগত দশকের মাল্টি মিলিওনিয়ার হলিউড অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোর অকাল মৃত্যু drug abuse এর জন্যই হয়েছিল। বলিউড তারকা সুশান্ত সিং রাজপুতের মতো উদীয়মান প্রতিভাশালী অভিনেতার অপমৃত্যু এবং সেই কাণ্ডের সাথে জড়িত সকল কাহিনীর কথা কেউ ভুলতে পারে ?

পৃথিবীতে প্রায় সকল দেশেই কম বেশি পরিমাণে ড্রাগ নামের ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। যৌবনের উদ্যমতা নিয়ে চলা ছেলে মেয়েদের জীবন অকালেই স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। কত যে সুখের সংসার মাদক জাতীয় বিভীষিকার কবলে ছারখার হয়েছে, কত যে প্রতিভার অপমৃত্যু হচ্ছে প্রতিনিয়ত আমাদের চোখের সামনে এর কি আর হিসেব রেখেছি !

আজ পৃথিবীতে প্রায় সকল দেশই নিজের থেকে শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে বোমা বারুদ থেকে ড্রাগের টোপ বেশি ব্যবহার করে থাকে। কারণ শত্রুপক্ষ কে বাঁধা দিতে ড্রাগের দ্বারা শত্রুর বড় শক্তিকে পঙ্গু করা সহজ। ২০১৬ সালের 'উড়তা পাঞ্জাব' মুভি, পাকিস্তান থেকে ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা প্রমুখ জায়গায় চলা চোরাই পথে ব্যবসা বাণিজ্য দ্বারা আক্রান্ত যুবসমাজের উপর নির্মিত, অভিনয় করেছেন আলিয়া ভাট ও শাহিদ কাপুর। অথবা ২০২০ সালের 'মালাঙ্গ' মুভি, গোয়াতে ড্রাগসের রমরমা ব্যবসায় দেশী-বিদেশী যুব সমাজ কীভাবে আক্রান্ত তা অভিনয়ের মাধ্যমে আদিত্য রায় কাপুর ও দীশা পাঠানি অত্যন্ত বাস্তব উপস্থাপন ফুটিয়ে তুলেছিলেন। আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশ থেকে শুরু করে মেক্সিকো, পানামা, উরুগুয়ে, প্রমুখ দেশে drug trafficking দ্বারা জর্জরিত।আমাদের আসামের পার্শ্ববর্তীতে থাকা গোল্ডেন ট্রাইএঙ্গেল নামে কুখ্যাত ম্যানমার, থাইল্যান্ড, সিংগাপুর প্রমুখ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ড্রাগ উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে আসা ড্রাগের দ্বারা আসামের সাথে উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সমূহ তথা আমাদের বরাক উপত্যকার বিভিন্ন অঞ্চল যে কতটা বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সম্মুখীন তা না বললেই হবে। আমাদের এই প্রজন্ম কতটা ড্রাগসের শিকার হয়েছে, আমরা সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে! দুঃখের বিষয় হলো রাতারাতি টাকার পাহাড় গড়ার লক্ষ্যে কিছু প্রতিষ্ঠিত 'গেস্টাপো' ব্যাক্তি পুরো সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারে।

মাদকদ্রব্যের এই সর্বনাশা ব্যবহার বর্তমান বিশ্বে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে এই পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা বাঞ্চনীয়। আমাদের পুলিশ প্রশাসন এই মাদকের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে। 
মাদকদ্রব্য উৎপাদন ও আমদানি রোধ করার জন্য প্রতিরোধ কর্মসূচি আরো জোরদার করা, মাদক চোরাচালান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, সমাজের প্রত্যেক মানুষকেই এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা, বেকারত্ব হ্রাস করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য বইয়ে মাদকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা, আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর ভূমিকা পালন করা, সরকারি উদ্যোগ বৃদ্ধি করা এবং সভা, সমিতি, সেমিনার ও আলোচনার মাধ্যমে মাদক প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা। আজ থেকে সজাগ ও সচেতনভাবে বলে দেই " NOT TO DRUGS"।

Wednesday, November 9, 2022

অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে ভারতে


গোটা ভারত জুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য মারাত্মক ভাবে বেড়েছে! ধনীরা আরও ধনী হয়েছে, আর গরিব হচ্ছে আরও গরিব। ভারতের অর্থনীতি অতিমারির প্রভাব কাটিয়ে ‘ঘুরে দাঁড়াচ্ছে’, অন্তত ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে। এমনই মনে করছে কেন্দ্রীয় সরকার। কোন ভারত? বিশ্বব্যাঙ্কের প্রাক্তন মুখ্য অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সার্বিক ভাবে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্মণ দেখা গেলেও তার সুফল আটকে রয়েছে সমাজের উঁচু তলায়। আর দেশের অর্ধেক মানুষ মন্দার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন।

'ইকোনমিস্ট' পত্রিকার ২৭ অক্টোবর সংখ্যায় 'ল্যাটিটিউড ইজ এভরিথিং' (Latitude is everything) শিরোনামে ভারতের অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে এক সাবধানতা মূলক ও ভীতিকর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রতিবেদনের একেবারে শুরুতে বলা হয়েছে যে ভারতের দক্ষিণ অংশ অর্থ উৎপাদন করে এবং উত্তর অংশ শিশু উৎপাদন করে। এবং পরিণতি বিস্ফোরক হতে পারে।প্রতিবেদনে গোয়ার কথা উল্লেখ করে লেখা হয়েছে গোয়ার পশ্চিম উপকূলে একটি বহু-সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল, যা গলদা চিংড়ির আবাসস্থল এবং চমৎকার জীবনযাত্রার মান। গোয়ার গড় ব্যক্তির আয় উত্তরের গঙ্গা অঞ্চলিয় বিহারের গড় ব্যক্তির আয়ের চেয়ে দশ গুণ বেশি।'ইকনোমিস্ট' -র কথায়, গোয়া ও বিহারের মানুষের জীবনযাত্রার মানের মধ্যে যতটা তফাত রয়েছে দক্ষিণ ইউরোপ এবং সাব-সাহারান আফ্রিকান দেশগুলির মানুষের জীবনযাত্রার মানের মধ্যে ততটা ফারাক।

 চীন, বাংলাদেশ প্রভৃতি অনেক দেশের উদাহরণ দিয়ে দ্য ইকোনমিস্ট বলেছে, এই ধরনের আঞ্চলিক বৈষম্য পৃথিবীর আর কোনো দেশে তেমন দেখা যায় না। ভারতের দক্ষিণ ও পশ্চিমের রাজ্যগুলি সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেখা গেছে এবং বিহার,উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থান এবং পশ্চিমবঙ্গ, যা ভারতের মোট জনসংখ্যার চল্লিশ শতাংশ, প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মানুষ, চরম দারিদ্র্য এবং অনগ্রসরতায় বসবাস করে।'ইকোনমিস্ট'- র মতে ২০১০ সালের পরের দশকে, বিহারের জনসংখ্যা ১৬.৫ শতাংশএবং উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যা ১৪ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, কেরালা, তামিলনাড়ুর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১০ শতাংশেরও কম। ভারতে শিল্পে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা মাত্র ১৪ শতাংশ, চীনে ২৭ শতাংশ এবং বাংলাদেশে ২১ শতাংশ।

ভারতের জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ উত্তরপ্রদেশে বাস করে, শিল্পে নিয়োজিত লোকের সংখ্যা উত্তরপ্রদেশের জনগণের মাত্র ৯ শতাংশ। দেশে শিল্পে নিয়োজিত অর্ধেকেরও বেশি লোক রয়েছেন দক্ষিণের পাঁচটি রাজ্য এবং পশ্চিমে গুজরাটে। অ্যাপলের মতো একটি কোম্পানির পণ্য তৈরির ১১টি কারখানার মধ্যে উত্তরাঞ্চলে রয়েছে মাত্র একটি, শুধুমাত্র তামিলনাড়ুতেই রয়েছে ৬টি কারখানা।

ভারতই বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে বসতি স্থাপনের জন্য আভ্যন্তরীন স্থানান্তরের অনুপাতও সবচেয়ে কম। এই কারণে, একই যোগ্যতা, শিক্ষা এবং বর্ণ থাকা সত্ত্বেও, একজন ব্যক্তি একই দেশে ভয়, সংশয়ের কারণে অন্য ব্যক্তির তুলনায় অনেক গুণ কম উপার্জন করে।

 'এক ভাষা, এক দল, এক জাতি' ধরনের নীতি ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে বিদ্বেষ বাড়ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের চলাফেরায় চরম আঘাত হানছে। একজন সাধারণ মানুষ তার বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাওয়ার আগে একশোবার চিন্তা করে। তার উপরে পরিবহন সুবিধা ব্যায়বহুল করে যেভাবে জনগণের চলাচল ব্যাহত করা হচ্ছে তাতে এই অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও দ্রুত বাড়ছে। এতে কি বোঝা যায় সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী হিংসার পরিবেশ সরাসরি কোনো শক্তিশালী নীতির ফল।

মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং কর্পোরেট পুঁজিবাদের একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থাপনা যখন বিশ্বের সম্পদকে গুটি কয়েক পরিবারের হাতে পুঞ্জিভূত করে তুলছে, তখন সম্পদের সুষম বন্টনই এ সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত অর্থনীতির সুষম বন্টন ব্যবস্থাই শান্তি, সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। আজকে আমাদের সমাজে যে বিপরীতমুখী বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করছি, একদিকে সরকার দেশে ব্যাপক উন্নয়নের দাবী করছে অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাধারণ মানুষ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে দেশ পিছিয়ে পড়ার বাস্তবতা তুলে ধরছে। কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার মধ্যে রেখে দেশের কয়েকশ পরিবার শতকোটি টাকার মালিক হয়ে যাওয়া এবং সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতাই হচ্ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে সৃষ্ট সামাজিক সঙ্কট। দেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যের অভিশাপমুক্ত করতে হলে প্রথমেই সম্পদের সুষম বন্টন ব্যবস্থার উপর নজর দিতে হবে।

Monday, October 31, 2022

শিশুর বিকাশে মানসিক ও সামাজিক পরিবেশ


 ‘যে ব্যক্তি শিশুকে স্নেহ করে না, তার বাবা-মা কিংবা শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা নেই।’ --- বার্ট্রান্ড রাসেল

আগামী দিনে শিশুরা হবে রাষ্ট্রনায়ক, সরকারপ্রধান, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সচিব, শিক্ষক, নজরুল, ঈশ্বরচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সাবিত্রী বাঈ ফুলে। এ জন্য সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে, নৈতিকতা মূল্যবোধ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। মানবসন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে শিখতে শুরু করে। তবে জন্মের পর থেকে ১০ বছর বয়সে পৌঁছা পর্যন্ত সময়ই শিশুর মস্তিস্ক বিকাশের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বয়সেই শিশুদের মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা, অনুসন্ধিৎসা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিভা বিকশিত হয়। সুতরাং এই বয়স থেকেই একজন শিশুকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চায় অভ্যস্ত করা জরুরি। এ সম্পর্কে দালাই লামার উক্তি প্রণিধানযোগ্য ‘শিশুর নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বীজ গ্রথিত হয় পরিবারে। তা বিকশিত হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর চর্চা হয় সমাজে।’ তাই সার্বিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষাপ্রক্রিয়ায় পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

একটি শিশুর মানসিক বিকাশের সাথে সামাজিক পরিবেশের একটা কগনেটিভ সম্পর্ক থাকে। বিকাশ যেভাবেই হোক না কেন, এটা সদাই একটা ক্রমবর্ধমান গতিতে অগ্রসর অর্থাৎ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি হয়। সেইজন্য মানসিক বিকাশের সাথে নিত্য পরিবৰ্তন হয়ে থাকা পরিস্থিতির একটা প্ৰভাব থাকে। উদাহরণস্বরূপ দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ে আমাদের দেশে বিশেষভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা কম বয়সী যুদ্ধরত সৈন্যদের ক্ষেত্ৰে মানসিক রোগ দেখা দিয়েছিল এবং সেই সময়ে আমাদের ভারতবৰ্ষে মানসিক রোগীর জন্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সৈনিকদের চিকিৎসার জন্য। দেশের পরিস্থিতি এবং সমাজের অস্থিরতা মানুষের মনের বিকাশ, চিন্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যে প্ৰভাব ফেলে এবং সাথে তা নিয়ন্ত্ৰণও করে। উদাহরণস্বরূপ আমাদের যখন কোভিড১৯ র জন্য বন্ধ হয়েছিল স্কুল-কলেজ এবং দেশে এক অনিশ্চিত পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। তখন একটি বিকাশরত শিশুর মানসিক বিকাশকে বৃহত্তর বা কম পরিমাণে প্রভাবিত করেছিল।

এই ধরনের পরিবেশে একটি শিশুর মনে কেমন অনুভব বা ধারণ করে তা বোঝা কঠিন, তবে আমাদের উচিত শিশুদের যতটা সম্ভব দুশ্চিন্তা থেকে দূরে রাখা এবং তাদের মানসিক বিকাশে সহায়তা করার জন্য তাদের সবসময় একটি সুস্থ পরিবেশে রাখা উচিত। সমাজে চলিতমান রাজনৈতিক অস্থিরতা বা ধর্মীয় বাতাবরণ থেকে শিশুদের দূরে রাখতে হবে। এই ক্ষেত্ৰে সামাজিক মাধ্যমে কিছু সচেতন হতে হবে। সব সময় ঋণাত্মক ভাবধারা পরিহার করে কিছু ইতিবাচক চিন্তা এবং ভালো ও সুস্থ স্বপ্ন দেখাতে হবে। মহামারি কি আমরা জানি কিন্তু একটি ১২-১৪ বছরের শিশুর ক্ষেত্রে এটা খুব হতাশজনক বিষয়। ভয় পাবে এবং মনে দুঃখ ভাব আসতে পারে। দীর্ঘকালীন এই ভাবধারা হলে স্বল্প পরিমাণে হলেও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। সেইজন্য শিশুর সঙ্গে কোনো ধরনের আতংকময় পরিবেশের সূচনা আপনাকে পরিহার করতে হবে।

একটা কথা বলা হয় যে সমাজের সঙ্গে নিজেক খাপ খাইয়ে চলার জন্য শিশুর কিছু অভিজ্ঞতার আবশ্যক। কিন্তু আমি মনে করি যে সেই অভিজ্ঞতা মাতৃ স্নেহের থেকে পরিপুষ্ট পরিবেশে হতে হবে বা অভিভাবকদের উচিত আপদকালীন সময়ের আলোচনা থেকে আত্মবিশ্বাসীমূলক শব্দে শিশুকে কিছু শেখানো বা বোঝানো।

যখন আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে করোনা কালে ঘরে বসে অনলাইন পদ্ধতির মাধ্যমে পড়তে দেয়া হয়েছিল তখন তাদের মনের এমন ভাব হয়েছিল যে তারা যেন সর্বদা এইভাবে ঘরে থেকে সময় অতিবাহিত করতে হবে না কি? বা ভবিষ্যত কি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা যারা অভিভাবক এবং শিক্ষক ছেলেমেয়েদের ইতিবাচক দৃষ্টিতে পরিবেশ- পরিস্থিতি বুঝতে বা বুঝাতে চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে। এই ধরনের মহামারী ১০০ বছর আগেও হয়়েছিল এবং সমস্ত সমস্যার সমাধান আছে বা একমাত্র ধৈর্য ধারণ ও বিজ্ঞানের উপর বিশ্বাস রাখাটা খুব জরুরী। শিশুদের সৃষ্টিকৰ্তার বিপরীতে বিজ্ঞানের উপর বিশ্বাস রাখার উপদেশ দিতে হবে। শুধু বিশ্বাস না প্রমাণ সহ বুঝিয়ে দিতে হবে। যা একটি শিশুর মানসিক বিকাশে ও পরবর্তী সময়ে প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করবে।

শিশুর মানসিক বিকাশে পরিবেশের প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে শিশু যে রকম সামাজিক পরিবেশে বড় হয়, তার মানসিকতাও সেভাবে গড়ে ওঠে। শিশুর পারিবারিক পরিবেশ, তার পরিচিত গণ্ডি ও আত্মীয়-স্বজন সবার একটা প্রভাব শিশুর ওপর পড়ে। এমনকি এই বলয়ের মধ্যে তার স্কুলের শিক্ষক, প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধব সবার সম্মিলিত প্রভাবে শিশুর ভেতর একটি মনস্তত্ত্ব গড়ে ওঠে। শিশু ধীরে ধীরে তার পড়াশোনা ও বয়সের পাশাপাশি তার চারপাশের সামাজিক পরিবেশ থেকে যে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান লাভ করে, তা-ই তার মানসপটে একটি আসন তৈরি করে নেয়। একইভাবে শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য ব্যায়াম, খেলাধুলা, সঙ্গীত, সাহিত্য ও শিল্পকলায় অংশগ্রহণ করতে হবে। তাদের শেখানো উচিত, যা শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে উৎসাহিত করে। শিশুদের উপর অতিরিক্ত চাপ দেয়া উচিত নয় এবং তাদের সবকিছুতে দক্ষ করতে তাদের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। এটা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

আজকের শিশুকে আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে তার জন্য একটি উপযুক্ত সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা আবশ্যক। কিন্তু এতসব জটিল সমীকরণ সামনে রেখে শিশুদের জন্য একটি সর্বজনীন সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা সত্যি কঠিন একটি কাজ। তারপরও কাজ যত কঠিনই হোক, সেটি অসম্ভব মোটেই নয়। এ সত্যকে সামনে রেখে দেশের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে শিশুবান্ধব নীতি-কৌশল প্রণয়ন করেছে ভারত সরকার।

একইভাবে আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রে সমাজ ব্যবস্থা পরিচালিত হয় কিছু প্রতিষ্ঠিত আইনের দ্বারা; যেখানে কিছু নির্দেশনা থাকে, যদ্বারা সমাজে কল্যাণ সাধন করা হয়। এইক্ষেত্ৰে শিশুর জন্য আমাদের দেশে কয়েকটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। যেমন —

(১) শিশু শ্রম নিবারণ আইন ১৯৮৬।
(২) বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধকরণ আইন ২০০৬। 
(৩) শিশুর সুরক্ষা এবং আদর-যত্ন এবং কিশোর ন্যায় আইন ২০০০।
(৪) শিশুর অধিকার সংরক্ষণ আয়োগ আইন ২০০৫।
(৫) বিনামূল্যে শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯।
(৬) শিশুর উপর হওয়া যৌন নির্যাতন প্ৰতিরোধ আইন ২০১২।

এগুলি হল রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রয়াস যাতে শিশুদের মানসিক বিকাশ এবং তাদের সকল প্রকারের উন্নতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়। এই আইনগুলি কার্যকর করার মাধ্যমে, আমরা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী এবং সুস্থ সমাজ গঠনের চেষ্টা করছি। তাই সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের আজকের শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। সরকারের এসব উদ্যোগের পাশাপাশি দেশের সব নাগরিক নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমাদের শিশুদের জন্য একটি অনুকূল সামাজিক পরিবেশ তৈরিতে সচেষ্ট থাকলেই আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাব আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে।

Friday, October 21, 2022

মানবতার শেষ দান হোক 'মরণোত্তর দেহদান'


‘ মরণোত্তর দেহদান ' ব্যাপারটি সচেতন মানুষের কাছে এখন পরিচিত হলেও অনেকের কাছে সামগ্রিক ধারণাটি তেমনভাবে স্পষ্ট নয়। মরণোত্তর দেহদান হল মৃত্যুর পর শবদেহ ধর্মীয় প্রথাসিদ্ধ মতে সৎকার না করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বার্থে দান করা। ক্ষণস্থায়ী জীবনে আমাদের সবার উচিত ভালো কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা। তাই মরণোত্তর অঙ্গ বা দেহদান এমনই একটি কল্যাণকর কাজ। তবে অঙ্গদান নিয়ে মানুষের মাঝে একটা আবেগ কাজ করে। এখন প্রযুক্তিতে আমরা অনেক এগিয়ে যাচ্ছি। এখন মানবিকভাবে আরও এগিয়ে যেতে হবে।

চিকিৎসায় গবেষণা ও শিক্ষার উদ্দেশ্যে মৃত্যুর পর সমগ্র দেহ দান করা। মানবদেহ বুঝতে এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য মেডিকেল ছাত্র এবং গবেষকদের সাহায্য করার জন্য শরীর দান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে কোন ব্যক্তি তাদের দেহ দান করতে ইচ্ছুক, মৃত্যুর আগে স্থানীয় মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল বা একটি এনজিওর সাথে পূর্বে ব্যবস্থা করতে পারেন। ইচ্ছুক ব্যক্তিরা একটি মেডিকেল প্রতিষ্ঠান বা একটি এনজিও থেকে একটি সম্মতি ফর্মের জন্য অনুরোধ করতে পারেন, যারা সম্ভাব্য দাতা মারা যাওয়ার পরে অনুসরণ করা নীতি এবং পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য দেবে। যাইহোক, একটি পূর্বের সম্মতি ফর্মে স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক নয় তবে এটি বাঞ্ছনীয় যাতে আপনার পরিবার আপনার সিদ্ধান্ত এবং আপনার ইচ্ছা পূরণে তাদের যে ভূমিকা পালন করা দরকার সে সম্পর্কে সচেতন হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সহজে তা পাওয়া যায় না। এখানে ধর্মীয়, পারিবারিক, সামাজিক অনেক কিছু জড়িত। তবে ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে তো তর্ক করে লাভ নেই। এটা যার যার বিশ্বাস। অনেকই অঙ্গদানে ভয় পান। এতে অনেক সময়ে ডোনারের সঙ্কট দেখা দেয়। দেহদান করতে হয় স্বেচ্ছায়। যে কেউ চাইলেই দেহ দিতে পারেন।

কিন্তু এই দান ভারী অদ্ভুত। যাঁর মৃতদেহ তিনি কিন্তু নিজে এই দান করতে পারেন না, সেটাই স্বাভাবিক। কারন মৃত্যুর পর তিনি দান করবেন কিভাবে? কোন ব্যক্তি জীবিতকালে শুধুমাত্র তাঁর এই ইচ্ছার কথা অঙ্গীকারের মাধ্যমে জানিয়ে রাখতে পারেন শুধু। তাঁর ইচ্ছাপূরণের দায়টা কিন্তু নিকটজনের। আর এই ইচ্ছাপুরণটা যাতে হয় সেক্ষত্রে অঙ্গীকারকের একটা ভূমিকা আছে। তা হল এই অঙ্গীকারকের বিষয়টি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন। যা দিয়ে সে নিকটজনকে মোটিভেটেড করতে পারবেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন করা হবে এই দান? তাহলে আমাদের জানতে হবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে মৃতদেহের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? আধাত্মিক, আত্মা, পরলোক ইত্যাদি ধারণা থেকে আমরা যে ধর্মীয় মতে বিশ্বাসী, সেই ধর্মের বিধান অনুসারে আমাদের মৃতদেহের অন্তিম কাজ করা হয়। যা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও অবৈজ্ঞানিক। যে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিধান অনুযায়ী আমরা চলি তার বয়স খুব বেশি হলে প্রায় তিন হাজার বছর। কিন্তু বিবর্তনের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি আধুনিক মানুষ, বিজ্ঞানীরা যাকে হোমো সেপিয়েন্স বলে অভিহিত করেছেন সেই সময়ের একটা পর্যায়ের পর মানুষ মারা গেলে সেই মৃতদেহ কবর দেওয়া হত। মৃতদেহের সাথে খাবার সামগ্রী দেওয়া হত। কিন্তু এর সঙ্গে আত্মা বা ঐশ্বরিক কিংবা এই জাতীয় কোনো চিন্তার যোগ ছিল না। আমার এই মতে মৃতদেহ কবর দেওয়ার ব্যাপারটা এসেছে মৃতদেহের পচন ও সেই পচন থেকে দূর্গন্ধের জন্য। আগুনে পোড়ানো অনেক পরে এসেছে।এক সময় নদীতেও ভাসিয়ে দেওয়া হত।

আরজ আলী মাতুব্বর মৃত্যুর কিছুদিন আগে তার লেখা ‘কেন আমার মৃতদেহ মেডিকেলে দান করেছি’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বলেন – 'আমি আমার মৃতদেহটিকে বিশ্বাসীদের অবহেলার বস্তু ও কবরে গলিত পদার্থে পরিণত না করে, তা মানব কল্যাণে সোপর্দ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। আমার মরদেহটির সাহায্যে মেডিক্যাল কলেজের শল্যবিদ্যা শিক্ষার্থীগন শল্যবিদ্যা আয়ত্ত করবে, আবার তাদের সাহায্যে রুগ্ন মানুষ রোগমুক্ত হয়ে শান্তিলাভ করবে। আর এসব প্রত্যক্ষ অনুভূতিই আমাকে দিয়েছে মেডিকেলে শবদেহ দানের মাধ্যমে মানব-কল্যাণের আনন্দলাভের প্রেরণা।’

মৃত মানবদেহ (যাকে ক্যাডেভার বলা হয়) ছাত্রদের অ্যানাটমি, শরীরের গঠন অধ্যয়ন এবং এটি কীভাবে কাজ করে তা শেখানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি চিকিৎসক, সার্জন, ডেন্টিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কোর্স। নতুন জীবন-রক্ষাকারী অস্ত্রোপচার পদ্ধতির উন্নয়নে গবেষণা চিকিৎসকদের দ্বারাও মৃতদেহ ব্যবহার করা হয়, উদাহরণস্বরূপ, অন্যদের মধ্যে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গে অস্ত্রোপচার পদ্ধতি। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলি স্বেচ্ছায় অনুদানের মাধ্যমে মৃতদেহ গ্রহণ করে, সেইসাথে পুলিশ যারা দাবিহীন মৃতদেহ দান করে তাদের কাছ থেকেও। এই দানগুলি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা এবং ছাত্রদের দ্বারা অত্যন্ত মূল্যবান।

'মানুষের দেহ থেকে আত্মাটা বেরিয়ে গেলে দেহটাকে তখন বলা হয় শবদেহ বা লাশ যেটাকে আত্মীয়-স্বজন- প্রতিবেশীরা সমাহিত বা দাহকার্য সম্পন্ন করতে পারলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। পুড়িয়ে দিলে ভস্মে পরিণত হয় অথবা কবরস্থ করলে পচে গলে মাটিতে পরিণত হয় এবং এটাই বাস্তব। তো সেই অপ্রয়োজনীয় শবদেহের কিছু অংশ দিয়ে যদি কিছু জীবিত মানুষের উপকার হয়, তাহলে সৃষ্টিকর্তার রুষ্ট হওয়ার কথা নয়। এটাই হলো বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তি। কিন্তু, সমস্যা হলো ধর্মের প্রতিনিধিদের নিয়ে। এক একজন মুফতি মাওলানা মুখস্থ করা হাদিসের কিছু বিবৃতি আপনাকে শুনিয়ে দিবেন। কিন্তু তাঁদের জানা উচিত ভারতে আজ পর্যন্ত যত সংখ্যক অঙ্গ প্রতিস্থাপন হয়েছে তার প্রায় ৪৫% প্রতিস্থাপিত হয়েছে কোনো মুসলমানের দেহে। তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? মুসলমানেরা অন্যের মৃতদেহের অঙ্গ গ্রহন করতে পারবে কিন্তু নিজের মৃতদেহের অঙ্গ অন্যকে দান করতে পারবেনা -তাই তো? মুফতি মাওলানারাও আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ নেন এবং তাঁরা এটাও জানেন যে, যে ডাক্তারেরা তাঁদের চিকিৎসা করেছেন বা করছেন তাঁদের প্রত্যেককে মৃতদেহের উপর রিসার্চ করে ডাক্তার হতে হয়েছে। তারমানে, তাঁরা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুযোগ নিবেন, কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়নে সহযোগিতা করবেন না। এই দ্বিচারিতা মেনে নেওয়া যায় না। আবার কেউ কেউ তো আধুনিক চিকিৎসাটাও নিতে চান না। একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। কয়েকদিন আগে আমার একজন মাওলানা মামা আমাকে ফোন করে জানতে চাইলো রায়গঞ্জে কোনো লেডি গাইনো ডাক্তার আছেন কিনা। আমি তাঁর খোঁজ দিলাম। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা গেল মামীর জরায়ুতে একটি সিস্ট আছে। সেটা এমন পর্যায়ে আছে যে অপারেশন না করলে সেটি ওষুধে সারবেনা। শুরু হয়ে গেল কাঁচুমাচু। ধমক দিয়ে বললাম তোমার একটা অপারেশনের দরকার হলে তুমি করাতে না। শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছা সত্বেও ওটি করালো এবং এখন মামী বেশ সুস্থ আছে। বাইরের লোককে কি বুঝাব, আমার নিজের পরিবারেই এমন অনেকে রয়েছেন। বিজ্ঞানের সাথে হাদিসের একটা সংঘর্ষ আছে। আর এই হাদিস লিখিত হয়েছিল ১৫০০ বছর আগে, তখন কিন্তু বিজ্ঞানের এতো অগ্রগতি হয়নি। মুসলমানেরা অনেক বিজ্ঞান মেনেও নিয়েছেন এবং প্রয়োজনের তাগিদে মেনে নিতে হবেই। তাহলে এ বিষয়ে কয়েকটি গল্প বলি। আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগেও অনেক মুসলমান ঘড়ি ব্যবহার করতেন না। তাঁরা ইফতার কিংবা সেহেরি করতেন সূর্যের আভা দেখে অথবা নামাজ পড়তেন নিজের ছায়া দেখে। এখন ঘড়ি দেখে তা করা হয় এবং প্রায় প্রত্যেকটি মসজিদে ঘড়ি এবং নামাজের সময় সারণি দেখতে পাবেন। কয়েকবছর আগে মুয়াজ্জিনরা খালি গলায় আজান দিতেন, এখন মাইকে দেন। এভাবেই মানুষের প্রয়োজনে বিজ্ঞানকে সমর্থন করতেই হবে। 

এখন মুসলমান পরিবারের প্রচুর ছেলেমেয়ে ডাক্তার হচ্ছে। তাঁদেরকেও অন্যের মৃতদেহ কাঁটাছেঁড়া করে ডাক্তারী দক্ষতা অর্জন করতে হয়। হাদিস অনুসারে তাঁরা একাজ করতে পারেন না। তাহলে মেনে নিচ্ছেন কেন? মনে রাখতে হবে মানুষের প্রয়োজনে হাদিস, হাদিসের প্রয়োজনে মানুষ নয়। অর্থাৎ যে হাদিস মুসলমানদের কল্যাণের অন্তরায় তাকে এড়িয়ে চলুন। তাছাড়া, যে হাদিসগুলো নিয়ে মুসলমানেরা বিভ্রান্ত ছিল, ইসলামিক স্কলারেরা মানুষের কল্যাণে সেগুলির অনেকটাই স্পষ্টীকরণ ঘটিয়েছেন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মানুষের কল্যাণে মুসলমানদের আরো যুক্তিবাদী হয়ে উঠতে হবে। হাদিস অনুসারে মুসলমানদের বিশ্বাস মৃতদেহকে কবরস্থ করার পর কবরের মধ্যেই তার পাপপুণ্যের হিসাব শুরু হয়। ঠিকই আছে বিশ্বাসের খাতিরে তা বিশ্বাস করলাম। কিন্তু যে সব মুসলমানের মৃতদেহ দুর্ঘটনার কারণে বা যুদ্ধের কারণে বা অন্য কোনো কারণে পাওয়া যায় না বা কবরস্থ করা সম্ভব হয়না, তাদের পাপপুণ্যের হিসাব কোথায় শুরু হবে এবং কিভাবে শুরু হবে? আমি বিশ্বাস করি ইসলাম একটি আধুনিক এবং বস্তুনিষ্ঠ ধর্ম। সমাজ গঠনে এই ধর্মের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সেই ধর্ম যদি একপেশে আলেমের বগলদাবা হয়ে থাকে, তাহলে মুসলিমরা মুক্ত হবে কিভাবে? আলোচনা হোক। আমি যে প্রশ্নগুলি উত্থাপন করেছি, কোনো সহৃদয় আলেম যদি তার যুক্তিনির্ভর উত্তর গুলি দেন তাহলে আমি বাধিত হবো।' (লিখেছেন শাহীদুর রহমান, ফেসবুক পোস্ট)

দুঃখের বিষয় হলো একবিংশ শতাব্দীতেও আমাদের দেশে সাধারণ মানুষদের মধ্যে এই প্রক্রিয়াটি এখনো জনপ্রিয় করা যায়নি। বেহেস্তের বা স্বর্গের অলীক হুর-পরীর লোভ, নরক কিংবা দোজখের ভয়, কুসংস্কার আর অপবিশ্বাসের পাশাপাশি অশিক্ষিত এবং অর্ধশিক্ষিত মোল্লা -- পুরোহিত ছড়ি ঘোরানো যে সমাজে প্রবল সে সমাজে এই ধরণের ব্রাত্য ধারণাকে জনপ্রিয় করাটা কষ্টকরই বটে। কিন্তু উদ্যোগ তো নিতে হবে কাউকে না কাউকে একটা সময়। আসলে সেই ভাবনা থেকেই লেখাটির শুরু। আমি নিজেও এ ধারনায় নতুন সৈনিক। অনেক কিছু জানার চেষ্টা করছি। যতটুকু জেনেছি বুঝেছি এর নিরিখেই প্রবন্ধটি লেখা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস পাঠক মহলে নিশ্চিত আগ্রহ বাড়বে। আমাদের দেশে যদিও ইতিমধ্যে বিরাট প্রসার ঘটছে তৎসংগে বরাক উপত্যকায়ও এর সাড়া মিলছে বিশেষ ভাবে। ধন্যবাদ জানাতে হয় সেই সকল ব্যক্তিদের যারা বিভিন্ন এনজিও বা সংগঠনের হয়ে এর প্রচার ও প্রসারে নিরলসভাবে কাজ করে আসছেন। আমরা বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকায় তা দেখি। এই আগ্রহ এবং সাড়া শুভবুদ্ধিধারী মুক্তমনা মানুষদের আগ্রহের চারাগাছ। এই চারাগাছ ধীরে ধীরে বড় হবে, কালের মহীরুহ হয়ে ছড়িয়ে পড়বে আনাচে কানাচে।

ক্লাইমেট চেঞ্জ: গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও আমাদের দায়ভার


দিন যত গড়াচ্ছে, ততই চরম হচ্ছে জলবায়ু। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনাও বাড়ছে খুব তীব্র ভাবে। সংকটময় এমন পরিস্থিতির মধ্যে শঙ্কা জাগা তথ্য দিয়েছে রাষ্ট্রসংঘ। বিশ্ব সংস্থাটি বলছে, দুর্যোগের পূর্বাভাস বা আগাম সতর্কতা পেতে আধুনিক সরঞ্জাম নেই বিশ্বের অর্ধেক দেশের কাছেই। পৃথিবীর তাপমাত্রা,দশ বছরে সমুদ্রের জলস্তর প্রায় দুগুন বাড়ছে, গ্লেসিয়া গলছে, বড় বড় আইসবার্গগুলো ভেঙে পড়ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ দ্রুত হারে বাড়ছে।সামগ্রিকভাবে, আমরা আমাদের নিজেদের প্রজন্মকে আমাদের চেয়েও খারাপ জীবন দিতে চলেছি। নাসার ওয়েবসাইট থেকে ক্লাইমেট চেঞ্জ সেকশনে যদি নজর দেয়া হয় তবে আমরা নিশ্চয় বুঝতে পারবো যে  জীবন সহজ করতে আমাদের সকল কৌশল, আবিষ্কার, উদ্ভাবন সমগ্র মানবজাতিকে মারাত্মক বিপদে ফেলেছে। এই খারাপ পর্যায়টি ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং এই পর্যায়টি আগামী অন্তত এক শতাব্দী ধরে চলতে থাকলে, যা সময়ের সাথে সাথে আরও খারাপ হতে পারে। এর পরিণাম এতোটাই খারাপ হতে পারে যে আমাদের প্রজন্ম কখনো অতি খরা, কখনো বন্যা, কখনো ঘূর্ণিঝড়, আবার কখনও সুনামীর মতো ভয়ঙ্কর প্রলয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে শুধু নিজেকে বাঁচানোর প্রচেষ্টায় থাকবে।

১৮৫০ এর উদ্যোগিক কালের শুরুর সাথে সাথেই পৃথিবীর দূর্ভাগ্য লেখার কাজ আধুনিক মানুষেরা নিজের হাতে সংকল্পবদ্ধ হয়ে নিয়েছে। আমাদের নিশ্চয় মহান বৈজ্ঞানিক আর্লবার্ট আইনস্টাইন এর নাম মনে আছে। যিনি তাঁর সময়ে দাবি করেছিলেন যে আগামী একশ বছরে পৃথিবীর জনসংখ্যা এত বেশি হয়ে যাবে যে, কোথাও জমায়েত বা ভিড় করার প্রয়োজন হবে না। কারণ আপনি যেখানে দাঁড়াবেন সেখানেই ভীড় পরিলক্ষিত হবে ! তার এই বক্তব্য নিশ্চয় এখন প্রশ্নবোধক চিহ্নের নির্দেশ দেয়। কারণ আইনস্টাইন, যিনি ১৯৫৫ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন, তিনি কখনোই চাননি যে পুরো সত্য ঘটনা বলতে এবং সেই যুগের ধর্মান্ধ চিন্তা জগতের সাথে শত্রুতা করতে। আইনস্টাইনের মৃত্যুর পর থেকে পৃথিবীতে কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন ইত্যাদি গ্যাসের মাত্রা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।এগুলি এমন গ্যাস যা একটি নির্দিষ্ট আনুপাতিক স্তরে জীবনের জন্য সামঞ্জস্য তৈরি করে, কিন্তু গত পঞ্চাশ বছরে তাদের অনুপাত আশ্চর্যজনকভাবে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, যারফলে এক প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

 এই গ্যাসগুলির বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলি হল মোটর গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়া, কারখানার ধোঁয়া, ক্রমাগত বন কাটা ইত্যাদি।পাহাড়ে আমরা অনেক অন্যায় করেছি, অপরাধ করছি, অমানবিক কাজ করছি। এই কাজগুলি আমাদের সকলের জন্যে গ্লানির। ইতিহাস আমাদেরকে ক্ষমা করবে না। আমি একদিন মরে যাবো, আজকের যে তরুণ তিনিও একদিন বুড়ো হবেন, তার একদিন মৃত্যু হবে- কিন্তু ইতিহাসে এই কথাটা থেকে যাবে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাহাড়ের সাথে অন্যায় করেছি এবং সেই অন্যায়ের দায় আমার নামে আপনার নামে সকলের খাতায়ই যুক্ত হবে। এই ধরনের মানবিক কার্যকলাপ, যাকে আমরা বিজ্ঞানের আবিষ্কার বলে মনে করি, আধুনিক মানুষ অর্থাৎ আমরা আমাদের জীবনকে সহজ করে তুলেছি। এই গ্যাসগুলোর আপনি যদি গ্রাফ আকারে ক্রমবর্ধমান স্তরের দিকে তাকান তবে আগামী ২৫ বছরে যদিও কোন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ (যদিও আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব) না আসে তবুও আমরা আমাদের প্রজন্মের অক্সিজেন ক্রয় করে জীবন বাঁচাতে হবে যেভাবে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোগীকে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে দেয়া হয়।এমতাবস্থায় তো অক্সিজেন উৎপাদনকারী বড় কারখানা থেকে অতিরিক্ত গ্যাস হিসেবে হাইড্রোজেনও নির্গত হবে।

গত চল্লিশ বছরে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতা সমগ্র পৃথিবীর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা মাত্র এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে, মহাসাগরের গড় তাপমাত্রাও বেড়েছে মাত্র অর্ধ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের ১০০ মিটার উপরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার সাথে বরফ গলে যাওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আট ইঞ্চি বেড়েছে। যেখানে চল্লিশ বছরের এই পরিসংখ্যান পৃথিবীর তাপমাত্রার উপর এত বড় প্রভাব ফেলেছে, যেখানে ২০১৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত খুব স্বল্প সময়, অর্থাৎ মাত্র ছয় বছর। সেখানে পৃথিবীর দশ হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ তাপমাত্রার সময় রেকর্ড করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বড় প্রমাণ আমাদের চারপাশে তা দৃশ্যমান, অকালীন বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যা যা বর্তমান সময়ের আলোচিত সমস্যা, নাসার প্রতিবেদনে সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ দেখানো হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মৌমাছির উপর তীব্র প্রভাব ফেলছে , তাদের পরাগায়নের ক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে বলে জানা গেছে।  অনেক জায়গায় মৌমাছির অস্বস্তিকর মৃত্যু হচ্ছে।  মৌমাছির উপর যে হুমকির সৃষ্টি হয় তা আমাদের ফ্লোরার উপর সরাসরি প্রভাব পড়ে।  মৌমাছির অবসানের সাথে সাথে, পৃথিবী সেই সমস্ত উদ্ভিদের খারাপ প্রভাবও দেখতে পাবে যা পরাগায়ন করছে, যার প্রভাব সরাসরি মানব জাতিকে একটি সংকটজনক পরিস্থিতিতে নিয়ে যাবে।

পরিস্থিতিতন্ত্রের অবনতির সাথে সাথে, জীবনের সম্ভাবনা সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, যার পর আমাদের প্রজন্ম আমাদের সরাসরি প্রশ্ন করতে পারে যে জীবন মিশ্রিত ছিল, তাহলে কেন আমরা পৃথিবীতে জীবন শেষ করেছি এবং মঙ্গল গ্রহে প্রাণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি? বিশ্বজুড়ে সরকার এই বর্তমান সৃষ্ট সমস্যাটি মোকাবেলা করার জন্য দৃঢ় এবং উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি গুরুতর প্রয়োজন দেখছে, তবে এটি দুঃখের বিষয় যে বৈশ্বিক রাজনীতি এখনও কেন্দ্রীভূত শক্তি, পুঁজিবাদ এবং কর্মক্ষমতার উপর আড়ষ্ট রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যখন মানবজাতির ওপর সংকটের মেঘ ঘনীভূত , তখন বিশ্বের সরকারগুলোকে সম্পূর্ণভাবে দায়ী না করে ভোগবাদের জগৎ সরকার নয়, সাধারণ মানুষের তৈরি।  এই সময়ে, যখন মানবজাতির ভবিষ্যত সম্পূর্ণরূপে মানুষের হাতে, তখন সমস্ত মানুষের একত্রিত হয়ে সরকারকে সতর্ক করার একটি বড় প্রয়োজন,  এবং এটিই একটি সমাধানের পথ প্রশস্ত করে।

Wednesday, September 21, 2022

আইএনএস বিক্রান্ত, 'সাগরের সিকান্দার'

দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা অটুট রাখতে আরও এক ধাপ এগোল ভারত। গত ২ সেপ্টেম্বর কোচিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে আইএনএস বিক্রান্ত তুলে দেওয়ার ফলে শুধুমাত্র যে ভারতের হাতে দ্বিতীয় এক বিমানবাহী রণতরী এল তা-ই নয়, সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বিক্রান্ত ভারতকে সেই আন্তর্জাতিক কুলীন গোষ্ঠীতে স্থান দিল, যারা একক প্রচেষ্টায় এ-হেন বৃহৎ মাপের রণতরী বানাতে সক্ষম।

 প্রথমত লক্ষণীয় বিষয় যে ভারতে নির্মিত আইএনএস বিক্রান্তে ব্যবহৃত সমস্ত কিছুই স্বদেশীয় নয়। অর্থাৎ কিছু যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকেও আমদানি করা হয়েছে। যাইহোক, সমগ্র প্রকল্পের ৭৬ শতাংশ দেশে উপলব্ধ সংস্থান দ্বারা গঠিত। এটি অবশ্যই একটি বিরাট অর্জন। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের আমলে আইএনএস বিক্রান্তের নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। ২০১৩ সালের ১২ অগস্ট কোচিতে সেই কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী একে অ্যান্টনি।

যুদ্ধজাহাজ বিক্রান্ত নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় স্তরের ইস্পাত প্রস্তুত করেছিল স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (SAIL)। এই স্টিল তৈরিতে ভারতীয় নৌবাহিনী এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন গবেষণাগারের (ডিআরডিএল) সহায়তাও নেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছে যে SAIL-এর এই ইস্পাত তৈরি করার ক্ষমতা ভবিষ্যতেও দেশকে অনেক এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। নৌবাহিনীর মতে, এই যুদ্ধজাহাজের জিনিসপত্র দেশীয়, যার মধ্যে রয়েছে ২৩ হাজার টন ইস্পাত, আড়াই হাজার টন ইস্পাত, ২৫০০ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক তার, ১৫০ কিলোমিটার পাইপ এবং ২০০০টি বাল্ব। এ ছাড়া এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ারের অন্তর্ভুক্ত হুল বোট, এয়ারকন্ডিশন থেকে শুরু করে রেফ্রিজারেশন প্ল্যান্ট এবং স্টিয়ারিং যন্ত্রাংশও দেশেই তৈরি হয়েছে।

সরকারী তথ্য অনুসারে, ভারতের অনেক বড় উদ্যোগীক নির্মাতারা এই বিমানবাহী রণতরী নির্মাণে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে ভারত ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড (BEL), ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড (BHEL), কির্লোস্কর, এলএন্ডটি (L&T), কেলট্রন, জিআরএসই, ওয়ার্টসিলা ইন্ডিয়া এবং অন্যান্য। এছাড়া জাহাজে দেশীয় যন্ত্রপাতি তৈরিতেও সহায়তা করেছে শতাধিক মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প।
বর্তমানে মাত্র পাঁচ থেকে ছয়টি দেশের বিমানবাহী রণতরী তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। এখন ভারতও এই ক্যাটাগরিতে যোগ দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ভারতের একটি বিমানবাহী রণতরী নির্মাণ নৌক্ষেত্রে তার সক্ষমতা দেখিয়েছেন বিশ্বদরবারে।

আসলে, অতীতেও ভারতের বিমানবাহী রণতরী ছিল। তবে ছিল ব্রিটিশ বা রাশিয়ান। যেখানে আগে ভারতের দুটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার - আইএনএস বিক্রান্ত-1 এবং আইএনএস বিরাট ছিল ব্রিটেন থেকে কেনা 'এইচএমএস হারকিউলিস' এবং 'এইচএমএস হার্মিস'। একই সময়ে, ভারতীয় নৌবাহিনীর একমাত্র বিমানবাহী জাহাজ - আইএনএস বিক্রমাদিত্য, সোভিয়েত যুগের যুদ্ধজাহাজ - 'অ্যাডমিরাল গোর্শকভ', যা ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে কিনেছিলো। অর্থাৎ আইএনএস বিক্রান্তকে নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করায় ভারত এখন বিমানবাহী রণতরী নির্মাণে সক্ষম দেশ হয়ে উঠেছে।

 মজার ব্যাপার হল ভারতে নির্মিত প্রথম এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ারের নাম আইএনএস বিক্রান্ত। যেখানে এর আগে ভারতের প্রথম এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার - এইচএমএস হারকিউলিস যা ব্রিটেন থেকে কেনা হয়েছিল এর নামও আইএনএস বিক্রান্ত ছিল। বলা হয়, এর পেছনে রয়েছে ভারতের প্রথম বিমানবাহী রণতরীটির প্রতি ভালোবাসা ও গর্বের অনুভূতি। 1997 সালে ডিকমিশন হওয়ার আগে, আইএনএস বিক্রান্ত সময়ে সময়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় নৌবাহিনীকে শক্তিশালী রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

এই দিনে প্রধানমন্ত্রী নতুন প্রতীক-যুক্ত নৌবাহিনীর পতাকারও উন্মোচন করলেন। নৌবাহিনীর পতাকায় প্রতীক পরিবর্তন নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু এই বার ঔপনিবেশিক আমলের স্মৃতিবাহী সেন্ট জর্জ’স ক্রস সরিয়ে সেখানে জাতীয় পতাকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছত্রপতি শিবাজির সময়ের মুদ্রার প্রতীক। বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য "নৌবাহিনীর প্রতীকে তাঁকে স্থান দেওয়ার অর্থ সেনাবাহিনীর ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিটি নষ্ট করার সচেতন প্রয়াস। তাঁর ভাষণের মধ্য দিয়েও যেন প্রধানমন্ত্রী প্রকারান্তরে বোঝাতে চেয়েছেন, ঔপনিবেশিক গোলামি থেকে মুক্ত হয়ে নৌসেনা অতঃপর হিন্দু জাতীয়তাবাদের দিকে পা বাড়াল। স্মরণে রাখা ভাল, একটি গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী কোনও দলীয় মতাদর্শ প্রচারের স্থান নয়। নৌবাহিনীর এক উজ্জ্বল দিনে ঠিক সেই কাজটিই করে নরেন্দ্র মোদী দেশের গৌরবকেই খাটো করলেন।" তবে বিক্রান্তের মোতায়েন, প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের স্বনির্ভরতার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আইএনএস বিক্রান্ত ভারত-প্যাসিফিক এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলে আগামী দিনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে অবদান রাখবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

Saturday, September 10, 2022

বিদ্যালয় একত্রিকরণ ও কিছু কথা


সাক্ষরতা একটি মানবাধিকার। দারিদ্র দূর করে সকলের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ৫০ বছরের বেশি হল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয় প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে। ৮ সেপ্টেম্বর সারা বিশ্বে জুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস (International Literacy Day)। বিশ্ব জুড়ে নিরক্ষরতা দূর করে স্বাক্ষরতা এবং শিক্ষার হার বাড়ানোর লক্ষ্যে ইউনেস্কোর তরফে এই দিনটির প্রচার করা হয়। সকলকে এই দিনটির মাধ্যমে বোঝানো হয় শিক্ষা এবং স্বাক্ষরতার গুরুত্ব, এবং এটা কীভাবে মানুষকে তাঁর সামাজিক অধিকার এবং মানবাধিকার পেতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধি মানেই দারিদ্র, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার দিকে এগোনো। শিক্ষাকে সব স্তরে পোঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ১৯৬৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দিনটিকে প্রথম আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস বা ‘ইন্টারন্যাশনাল লিটারেসি ডে’ হিসাবে ঘোষণা করেছিল। সেদিন থেকে প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্তে, নানা দেশে এই দিনটি নানা ভাবে আন্তর্জাতিক সক্ষরতা দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে।

আচ্ছা এখন সাক্ষরতা প্রসঙ্গের সাথে মিল রেখে অন্য কথায় যাওয়া যাক। রাজ্যের কিছু সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকার কর্তৃক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো চলছে একত্রিকরণ। ২০টি জেলার ১৭১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ করে কাছাকাছি বিদ্যালয়ের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। আগের সরকারের আমলে রাজ্যে প্রায় ৭,০০০ প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে আশেপাশের স্কুলের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছিল। 2022 সালের ম্যাট্রিক পরীক্ষায় শূন্য ফলাফল দেখায় সরকার ১৫টি জেলার ৩৪টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং হাই মাদ্রাসা বন্ধ করার কাজ সম্পন্ন করেছে । সরকার নিশ্চিত যে সেই বিদ্যালয়সমূহে শিক্ষক ভালভাবে পড়ান নাই, সেই বিদ্যালয়গুলোতে থাকা সেই অঞ্চলের জনগণ পঢ়াশোনার প্ৰতি আগ্রহী নয়, সেই অঞ্চলের শিক্ষাৰ্থীদের সরকারের হয়ে চিন্তা করা সকলের একই ধারণা যে এরা ‘গাধা’। সেইজন্য ‘গাধা’র নামে সরকারি ধন খরচ হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। এবার স্পষ্টভাবে বলি তাদেরকে ‘গাধা’ বলে সম্বোধন আমি করছি না বা এই স্পর্ধা আমার নেই। সরকারের হয়ে চিন্তা করা সকল, মন্ত্ৰী-বিধায়ক, পরামৰ্শদাতা একাংশ বুদ্ধি দিয়ে চলা লোক, স্ব-স্বাৰ্থসিদ্ধির জন্য সরকারের কথায় তাল মিলিয়ে গান গাওয়া সকলের চিন্তাতেই সেই অঞ্চলের শিক্ষাৰ্থীরা ‘শিক্ষার প্ৰতি আগ্রহহীন’, ‘গাধা’। সরকার পক্ষের কাউকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তারা সঙ্গে সঙ্গে বলে দেবে না। কিন্তু স্কুল বন্ধের কারণ ব্যাখ্যা করা গেলে সবাই বুঝতে পারবে এটাই চূড়ান্ত সত্য।

বন্ধ স্কুলগুলোর শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সরকার। সরকার কি তথ্য প্রমাণ করাতে পারবে যে একজন শিক্ষকের অবহেলার কারণে একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান খারাপ হয়েছে? যে সরকার স্কুলটি বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে তারা কি প্রমাণ দিয়ে জনগণকে বোঝাতে পারবে যে স্কুলটি এলাকায় অবস্থিত সেখানে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার কোন প্রভাব নেই?

সরকার কি নিশ্চিত যে, এবার যারা ব্যর্থ হয়েছে তাদের ছাড়া যেসব এলাকায় শিক্ষার মান খারাপের অভিযোগে স্কুল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেখানে আর কোনো শিক্ষার্থীর জন্ম হবে না? সেসব স্কুলের আওতাভুক্ত এলাকায় যদি আর কোনো মানুষ না জন্মায়, সরকার নিশ্চিত যে এটাই শেষ প্রজন্ম, তাহলে বেশি কিছু বলার দরকার নেই। সরকারের চোখে 'গাধা' প্রমাণিত শিশুরা যখন সই করতে জানে তখন তারা পড়া বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু সরকার যদি নিশ্চিত না হয় যে ওইসব এলাকায় আর কোনো শিশুর জন্ম হবে না, তাহলে উঠতি শিশুরা স্কুলে যাবে কোথায়? নাকি সরকার ওইসব এলাকায় ‘গাধার’ জন্ম দেওয়া বন্ধ করার জন্য বাধ্যতামূলক বন্ধ্যাকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে, যাতে সেখানে আর স্কুলের প্রয়োজন না হয়!

ফলাফলের উপর ভিত্তি করে একটি বিদ্যালয় বন্ধ করা হলে এলাকায় শিক্ষার মারাত্মক ক্ষতি হয়। এলাকায় এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে দেওয়া হয় না। দরুন মাজুলির একটি গ্রামের একমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি পরীক্ষায় ফেল করার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কারণে বন্ধ করা শিশুদের কথা না বললেও স্কুলের বাকি শিক্ষার্থীদের কী হবে? যদি তারা পড়াশোনা করতে চায় তবে তাদের একটি বা দুই নদী পার হতে হবে বা বালির মধ্যে দিয়ে দুই তিন কিলোমিটার দূরে অন্য স্কুলে হেঁটে যেতে হবে। বর্ষায় তো সেভাবে যাওয়াই যায় না।

এভাবে এক স্কুলের শিক্ষার্থীরা যখন অন্য স্কুলে চলে যায়, তখন কি ওই স্কুলে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য জায়গা থাকবে? যেসব স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের ওপর এভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে সরকার পক্ষ থেকে কি বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেয়া হবে ?

বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের কী হবে? তাদের তো ঐ স্কুলের প্রয়োজনে রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের পড়াতে ও পাস করতে না পারায় 'অদক্ষ' শিক্ষক-কর্মচারীরা বিলম্বে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে বিরত রাখা হবে ?না, চাকরি পরিবর্তন হয়ে যাবে! বন্ধ স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কী হবে? তিনি কি আবার সহকারী শিক্ষক হবেন? পদের অবনতি হলে ওই প্রধান শিক্ষকরা কি আইনি ব্যবস্থা নেবেন না? নাকি অন্য শিক্ষকদেরও জ্যেষ্ঠতা হ্রাস পেলে তারা চুপ থাকবে? কারণ সরকারি চাকরিতে জ্যেষ্ঠতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেহেতু এখন পর্যন্ত চাকরি সংক্রান্ত কোনো আপত্তি লক্ষ্য করা যায়নি, তাই বোঝা যায় তাদের জ্যেষ্ঠতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বন্ধ স্কুলের নামে রয়েছে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী। তাহলে স্কুল বন্ধের শাস্তি কার? শাস্তি শুধু স্কুলের আওতাভুক্ত এলাকার মানুষ ও ছাত্র ছাত্রীদের। অর্থাৎ হয়রানির শিকার শুধু এরাই।

বন্ধ স্কুলের ঘর ও অন্যান্য সম্পত্তির কী হবে? সংক্ষেপে, ঘরটি মর্গে পরিণত হবে, দুষ্টচক্রের জন্য মদ এবং জুয়ার আসর হবে। আর কিছু হোক আর না হোক ! সরকার নির্দেশ দিতে পারে যে অন্যান্য সম্পত্তি প্রতিবেশী স্কুলগুলিতে হস্তান্তর করা হবে কিন্তু তা কি হস্তান্তর করতে রাজি হবে স্কুল কমিটির সদস্য বা এলাকার মানুষ ? দেশে অনেক স্কুল আছে যেগুলো জনগণের অনুদানে কেনা হয়েছে জনগণ কি সহজে তাদের নির্মাণ ও অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি ছেড়ে দেবে? ফলস্বরূপ, অনেক সম্পত্তি ধ্বংস হবে, বা হারিয়ে যাবে। তবে স্বাধীনতা দিবস ও প্রজাতন্ত্র দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে হবে শিক্ষক-কর্মচারীদের। স্কুল বন্ধ করার ক্ষেত্রে সরকারের মূল উদ্দেশ্য ব্যয় কমানো। এমন বিভ্রান্তির কারণে যদি স্কুল বন্ধ থাকে, তাহলে খরচ কমবে কোথায়? বিদ্যালয় বন্ধ করে একটি এলাকার শিশু ও জনগণের অসুবিধা সৃষ্টি করা ছাড়া আর কিছুই হবে না।

"সরকার স্কুল বন্ধ করার আরেকটি গোপন কারণ হল শিক্ষার সম্পূর্ণ বেসরকারীকরণ। একের পর এক সরকারি সম্পদ বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দেওয়ার পর কোনো দপ্তরকে দক্ষতার সঙ্গে চালাতে অযোগ্য মন্ত্রীদের ভরপুর সরকার শিক্ষা সম্পূর্ণভাবে কোনো না কোনো মালিকের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে নানা অজুহাতে স্কুল বন্ধ করে দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুল ইন্টিগ্রেশন। বিভিন্ন কারণে সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বেসরকারি খাতে পাঠাতে বাধ্য হবেন।"

ইতিমধ্যে, বেশিরভাগ উচ্চ ও মধ্যবিত্ত এবং কিছু নিম্ন মধ্যবিত্তরা বেসরকারি স্কুলগুলির প্রতি মুগ্ধ। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। বিভিন্ন কারণে, আমিও আমার সন্তানদের বেসরকারি স্কুলে পাঠাই। তবে সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে কিছু নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র অভিভাবকদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা গ্রহণে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হবে হয়তো এটি সরকার কর্তৃক বুঝতে বোধহয় অসুবিধা হচ্ছে।

এর ফলে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখা সুবিধাভোগীদের সরকার পক্ষে রাজনৈতিক লাভ হবে। তাহলে যে রাজনীতিবিদরা একদল অশিক্ষিত মানুষকে দেশের নাগরিক বানিয়েছেন এবং রাজনীতিবিদরা তাদের সন্তানদের ইংল্যান্ড বা দেশের স্টার স্কুলে পড়ান, তাদের পক্ষে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিকল্পিত ভাবে রাজনীতি পরিচালনা করা সহজ হবে। কারণ সেই অশিক্ষিত নাগরিকরা সরকারের উপকারভোগী এবং শক্তিশালী সমর্থক হয়ে উঠবে। সেই ক্যাটাগরিতে সংখ্যা বাড়বে। কারণ দেশে দারিদ্র্যসীমার ওপারে ভোটারের সংখ্যা এখনো কম নয়। এই দরিদ্রদের অবস্থার কোন উন্নতি হবে না, শিক্ষার অভাব তাদেরকে আরও দরিদ্র করে তুলবে। স্কুল বন্ধ করে সরকার এমন দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্র করবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

সরকার বিভিন্ন জায়গায় মডেল স্কুল খুলেছে। সরকার কি স্কুল খোলায় শতভাগ পাসের নিশ্চয়তা দিতে পারে? সরকার কি বন্ধ স্কুলের সব শিক্ষার্থীকে এসব স্কুলে ভর্তি করা নিশ্চিত করবে? আমরা আশা করি যে জনপ্রতিনিধিরা জনগণের উদ্বেগের মধ্যে দিনরাত কাটান তারা যে সমস্ত এলাকায় বিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সেখানে সকল শিক্ষার্থীর জন্য সহজলভ্য শিক্ষা নিশ্চিত করবেন। এটাও উল্লেখ করা দরকার যে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। এর সঙ্গে সরকারের গুণগত ও উন্নত পরিকাঠামো দেয়ার পরিবর্তে শিক্ষানুষ্ঠান সমুহকে চিরতরে বন্ধ করে দেয়া রাজ্যজুড়ে এক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন দল, সংগঠন, ব্যাক্তি বিশেষ সরকারের এই সিদ্ধান্তকে পুনঃ বিবেচনা করার জন্য দাবি জানিয়েছে।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...