শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড, শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতি লাভ করতে পারেনা, “যে জাতি যত বেশী শিক্ষিত সে জাতি তত বেশী উন্নত।” এসব প্রবাদগুলো যাকে ঘিরে রচিত হয়েছে তিনি হলেন “শিক্ষক”। শত শত বছর ধরে শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন। শিক্ষাগুরু হিসেবে শিক্ষকরা দেশ, সমাজ ও জাতির কাছে নমস্য ব্যক্তি। এই মহান মহান কথাগুলো বিগত কয়েকদিন আগ পর্যন্ত জানতাম শিক্ষকতায় মানানসই। জানতাম শিক্ষকদের সম্মানে 'শিক্ষক দিবস' পালন করা হয়। কিন্তু সেদিনের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর রেডিওতে দেয়া সাক্ষাৎকারে রাজ্যের শিক্ষকদের নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন তা এখন সন্দেহ হচ্ছে । মানে মাননীয় জানেন তো যে উনি শিক্ষামন্ত্রী বা শিক্ষকের দায়িত্ব ও কর্তব্য কী? আমি সন্দেহে তাই বলছি! মনের কথা হলো যদি জানতেন তবে কীভাবে তুলনা করলেন শিক্ষকদের ড্রাইভার ও টেট সার্টিফিকেট ড্রাইভিং লাইসেন্স। এখানে আমি একটুও খাটো করছিনা গাড়ি চালক ভাইদের। প্রত্যেকটা সৎ পেশাই সম্মানের। কিন্তু মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর রুচিবোধের জন্য আশ্চর্য হলাম।
গণতান্ত্ৰিক ব্যবস্থায় ন্যায্য প্ৰাপ্তির জন্য আন্দোলন এক অতি জনপ্ৰিয় মাধ্যম । আন্দোলনের ব্যাপকতা ইহার বিষয়বস্তুর সঙ্গে জড়িত । অবশ্য কিসের জন্য আর কতজন মানুষ নিয়ে এই আন্দোলন হচ্ছে এর উপরও আন্দোলনের ব্যাপকতা নিৰ্ভর করে । আর এই ধরণের বিষয়ের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সময় বিখ্যাত আন্দোলন গড়ে উঠেছিল । উদাহরণ হিসেবে বিখ্যাত চিপকো আন্দোলনও এই ধরণের এক আন্দোলন । পরিবেশ বা জীবজন্তুর সুরক্ষায় মানুষ যত আন্দোলন,মিছিল করে যদিও পরিবেশ বা জীবজন্তু বোঝতে পারে না। সেখানে মানুষ তার নিজের প্রতি হওয়া অন্যায় এবং অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা অতি স্বাভাবিক বিষয়। আমাদের অসম রাজ্যে আন্দোলন ছাড়া নিজের অধিকার আদায় হয় না। এটা প্রায় বিশ্বাস্য। অসমের রাজপথে নেতা আর আন্দোলনকারীদের ভিড় রোজনামচা। আন্দোলনের কুফল যে কতটা মর্মান্তিক তা বলার ইয়ত্তা রাখে না। আন্দোলনের ভয়াবহতা এতই মারাত্মক যে সময়মত রোগী হাসপাতালে যেতে না পারায় মাঝপথে মৃত্যু হচ্ছে। আন্দোলনের ফলে সরকারি বিভিন্ন ক্ষেত্র অনেক লোকসানের সম্মুখীন হতে হচ্ছে ।তথাপিও আন্দোলনের তীব্রতা দিন দিন বেড়েই চলছে। অধিকার আদায়ে এই ধরণের আন্দোলন বাঞ্চনীয়।
বিগত কয়েকদিন থেকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে অসমের সংবাদ মাধ্যম গুলোর শিরোনাম। টেটের মাধ্যমে ঠিকাভিত্তিক শিক্ষকদের আন্দোলন। অনলাইন, অফলাইন তথা বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যম সমস্ত রাজ্যবাসীর দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য সুস্থ সংবাদ পরিবেশন করছে, তাদের প্রয়াস শুদ্ধ এবং যথাযোগ্য ভাবে বিষয়টি সরকার এবং জনগণের মধ্যে তোলে ধরা। প্রশ্ন উঠছে- শিক্ষকদের দাবি যথাযোগ্য কী? ঠিকাভিত্তিক নিয়োজিত হয়ে কীভাবে নিয়মিত হওয়া যায়? দুর্বল প্ৰমানপত্ৰ দিয়ে প্ৰচলিত আইনের আওতায় কিভাবে চাকরি নিয়মিত হবে? যদি এটাই সত্য হয় তবে শিক্ষকরা সরকার ও জনগণের অযথা সময় নষ্ট করছেন না তো? উত্তর - নিশ্চয়ই না । যুক্তিহীন, ভিত্তিহীন কথায় প্ৰায় ৪১০০০ শিক্ষক রাজপথে আসে নাই। মনের স্বাদে আষাঢ়ের তপ্ত গরমে ডিসি অফিসের সম্মুখে ধর্ণায় আসে না। এর পেছনে ন্যায্যের দাবী। সকল শিক্ষকের দাবী যুক্তিসংগত, ন্যায়সংগত এবং মানবীয় দৃষ্টিতে শুদ্ধ ।
অসমে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষক নিযুক্তি দেওয়ার দায়িত্ব প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের। ২০০৯ সনের শিক্ষার অধিকার আইন গ্রহণ করার পর ভারতের প্রায় সব রাজ্যেই তা পালন করা হয় অৰ্থাৎ ২০১১ সনের পর এই আইন বলবৎ হয়। কাজেই এই আইনের আওতায় প্রয়োজন হয়ে পড়ল যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক (টেট উত্তীর্ণ) এবং প্রফেশনাল ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা থাকা লোকের। ২০১২ সনের জানুয়ারি মাসে প্রথমবারের মতো টেট পরীক্ষায় প্রায় ৫২,০০০ এর অধিক প্রার্থী যদিও বেশিরভাগের শিক্ষার পেশাদারি ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা ছিল না। অথচ সেই সময় রাজ্যের প্রাথমিক বিদ্যালয় সমুহে PTR মতে এবং আইনের মতেও চালানোর জন্য এক বিপুল সংখ্যক শিক্ষকের প্রয়োজন ছিল। এখানে উল্লেখ্য যে NCTE এর মতানুসারে টেট পরীক্ষা দেওয়া প্রার্থীর অভাবের প্রতি লক্ষ্য রেখে তিনবার শিক্ষাগত যোগ্যতার শিথিলকরণ(relaxation) করা হয়েছিল। অৰ্থাৎ রাজ্য সরকার তার প্রয়োজনে আইনের হাত থেকে বাঁচতে এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করে ভারত সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে। আমাদের বোঝাতে অসুবিধা হচ্ছে বর্তমান অবস্থা নিয়ে। RTE এবং NCTE র গাইড লাইন অনুসারে রাজ্যের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিযুক্তির কাজ শুরু হয় কিন্তু এই প্রক্রিয়া প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের দ্বারা নয় সর্বশিক্ষা মিশনের মাধ্যমে ঠিকাভিত্তিক এক নিদৃষ্ট মাইনেতে। আর তার সঙ্গে এমন এক চুক্তিপত্ৰ করা হয় বিদ্যালয় পরিচালনা সমিতি এবং নব্য নিযুক্ত শিক্ষকের মধ্যে। যেখানে প্ৰাথমিক শিক্ষা বিভাগ বা সৰ্বশিক্ষা মিশনের কারোর স্বাক্ষর নেই।অৰ্থাৎ আরম্ভনীতেই কোণঠাসা করে রাখা হয়। অবশ্য নিয়োগের আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে বলা হয়েছিল যখন শিক্ষকতার বৃত্তিগত ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা শিক্ষকরা লাভ করবেন তখন নিয়মিত পদে রাখা হবে। সমান্তরালভাবে রাজ্যের বিভিন্ন মহাবিদ্যালয় সমুহে 'কৃষ্ণকান্ত সন্দিকৈ রাজ্যিক মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শিক্ষকতার বৃত্তিগত ডিপ্লোমার ব্যবস্থা করা হল । কিন্তু শিক্ষকের অনুপাতে সীমিত আসনের জন্য সকলের একসাথে সুবিধা হয় নাই। পৰ্যায়ক্ৰমে দুই-তিনবারে তা করতে হয় । একসাথে নিযুক্তি মিললেও ডিপ্লোমা অর্জন করে নিয়মিতকরণে যে পর্যায়ক্রম তা বিশেষ ভাবে অন্যায় হয়েছে।
২০১২ সালের সাধারণ টেটের পর Medium TET, Caste TET, Madrassa টেট, শিক্ষা মিত্ৰ টেট নামে কয়েকটা টেট পরীক্ষাও পাতা হল এবং মাদ্রাসা টেটকে বাদ দিয়ে প্রায় সকলেই ঠিকাভিত্তিক বা নিয়মিত চাকরির সুবিধা লাভ করেছিলেন। এখানে মনে রাখা দরকার সবগুলো টেটে কিন্তু পরীক্ষার মুঠ নম্বরের মধ্যে তারতম্য ধরানো হল। অৰ্থাৎ এখানেও এক বৈষম্য রেখে অন্যায়ের বীজ রোপন করা হল সময়ে অঙ্কুরিত হওয়ার জন্য। প্রতিবারই ঠিকাভীত্তিক শিক্ষকদের এই আশ্বাসের ললিপপ দিয়ে এই কথা বলা হয় যে RTE আইনের অধীনে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কোনদিনই বাদ দেয়া যাবে না ,ঠিকাভীত্তিক হলেও ৬০ বছর পর্যন্ত চাকরি নিশ্চিত। পুরটাই এক নাটকীয় চাল।। খুব সংখ্যক বাদ দিয়ে "অন্ধের জষ্টি" -- পেটের দায়ে চাকরি জুটলো কারো ২০০ কি.মি. দূরে, বৃদ্ধ মাতা-পিতার সেবা ছেড়ে চাকরি মিলল শদিয়া থেকে বরপেটা, স্ত্রী আর ছোট্ট কন্যা সন্তান টি রেখে আসতে হল ডিব্রুগড় থেকে করিমগঞ্জে। এখানে আমি সময়ের স্বল্পতার জন্য কমিয়ে বলেছি। এভাবে আরও দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে টেট শিক্ষকদের সাথে তা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী।
একটা দুটা করে সাতটা বসন্ত পেরিয়ে গেলো। সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়। দেশের রাজনীতির পরিবর্তন, রাজ্য রাজনীতির পরিবর্তন, নেতাদের দল পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের হাওয়া যখন বইছে তখন কী আর শিক্ষকরা বাকি থাকবে! প্ৰতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও টু শব্দ করতে পারবেনা শিক্ষকরা বলা হলো। সোনার হরিণের আশায় পরিবর্তনে গদি বদলে চাকরি নিয়মিত হবে এই আশায় মরিয়া আনন্দে শিক্ষকরা। সত্যিই সরকারের পরিবর্তন হল। কিন্তু এই আশায় বন্দী হয়ে expiry হয়ে গেল চাকরি। জং ধরলো নিয়মিত করণের ঠ্যাং এ।
সন্দেহ এবং শংকার বীজ যেহেতু প্রথম থেকেই গাড়া ছিল তাই এই পরিবর্তনের বাতাসে এই ভাগ্যবান শিক্ষকদের দুঃশ্চিন্তা ক্রমাগত বাড়তে লাগল। উচ্চতম ন্যায়ালয়ের "সম কাজের সমান মর্যাদা" এই সকল ঠিকাভিত্তিক শিক্ষকদের দেয়া হলনা । পুরানো বা অন্যান্য শিক্ষকদের যদি বাদ দেওয়া হয়, তবে মাসিক বেতনের ক্ষেত্রে টেট পাশ করা নিয়মিত ও ঠিকাভিত্তিক শিক্ষকদের মধ্যে আগ পিছ কোন মিল নেই। কারণ এরা যে ঠিকাভিত্তিতে নিয়োজিত। শুরু হল অফিসে অফিসে দৌড় পর্ব। প্রয়োজন হল সংগঠনের, সংগঠিত ভাবে কাজ করার। রাজপথে নামা হল অন্যায়ের প্রতিবাদে। চিরাচরিত ভাবে যেভাবে আশ্বস দেয় সেটাই হল। কারণ এখানে প্রতিবারই নিধিরাম সর্দারই হয়। যদিও দু-চারটা সুবিধা দেয়া হল। । কিন্তু বৈষম্যটা রয়ে গেল। মধ্যে আবার ২০১৭ সনে কিছু নিয়মিত পদের জন্য বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়। যদিও আগের মতই নিয়ম মেনে, আবেদন নতুন করে জমা দেয়া, কোন অগ্রাধিকার নেই, নেই কোনোঅভিজ্ঞতার নম্বর,নেই কোন রেহাই, অৰ্থাৎ ৫ বছর অতিক্ৰম করার পরও পুনরায় নতুন করে সব, এমনকি মাইনেটাও। লোকসানের কথা জেনেও নিয়মিত করণের দৌড়ে সামিল হয় সবাই। একদিকে বয়সের ছাপ আর অন্যদিকে নিয়মিত করণের চিন্তা, এটা যেন সীতার অগ্নি পরীক্ষা।
খুব সুন্দর গাইড লাইন বানিয়ে দেওয়া হয়েছে শিক্ষকদের কে। কি বলবে, কি পরবে, কিভাবে চলবে। বেশতো, মানলাম শিক্ষার মান উন্নয়নে এসব হচ্ছে। কিন্তু এই ধরণের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, এতে তো আর চুপ থাকা যায় না। পেটের তাগিদে ভয়ে অনেকেই বিষ খেয়ে বিষ হজম করে আছেন। কিন্তু আর কত! যেদিন যা মুখে এলো বলে দিলেন। এটা কি ধরণের সিস্টেম। এর আগেও বহুবার এই শিক্ষক সমাজ অনেক ধরণের আপত্তিকর মন্তব্যের শিকার হয়েছে। এভাবেই কী চলবে শিক্ষকদের নিয়ে ছেলেখেলা? এটা কখনই সহ্য করা যাবেনা।
এরাজ্যে ৪১০০০ ঠিকাভীত্তিক শিক্ষক রয়েছেন। আবার টেট হবে,রাজ্যের ঠিকাভীত্তিক শিক্ষকদের পুণরায় টেট উত্তীর্ণ হতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, এতো দিন থেকে চাকরি স্থায়ীকরণ কেন করা হলো না ? এটা কি কোন বিভাগীয় দুর্বলতা, না পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বোঝতে পারছি না। কিন্তু এটা বোঝতে পারছি আমাদের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী টেট সার্টিফিকেট আর ড্রাইভিং লাইসেন্সের মধ্যে হয়তো কোন ফারাক বোঝেন না।
বিগত কয়েক দিন থেকে আমাদের সহযোদ্ধারা নেতৃত্ব দিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের জানাই ধন্যবাদ ও সেলাম। সঙ্গে ধন্যবাদ জানাই সকল অংশগ্রহণকারী সতীর্থ শিক্ষকদের, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের কর্মীবৃন্দ,নেতা,সাংবাদিক বন্ধু, এবং সমস্ত রাজ্যবাসীকে। কিন্তু আমাদের এই সংগ্রামে নানা ধরণের ভয়, প্রলোভন দেখানো হবে, আমাদের সংযত এবং ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের সংকল্প হোক কোন অপশক্তির কাছে হার নামানা। সংগ্রাম যত দীর্ঘ হয় হোক আমাদের অধিকার আদায় করতেই হবে। আমাদের দাবি-- "বিনা শর্তে বেতনসুরক্ষা সহ নিয়মিত করণ"। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ৪১০০০ শিক্ষকদের অভিভাবক নন। যদিও উনার হাতে আইন আছে তথাপি অগণতান্ত্রিক কাজ হলে আমরা এর প্রতিবাদ করবই। সবশেষে একটাই কথা আমাদের সংযত হয়েই সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। যত বাধাই আসুক না কেনো।
