Wednesday, June 5, 2019

প্রসঙ্গ: বিট এয়ার পলিউশন

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘প্রাণ’ কবিতায় বলেছেন, “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই”। কিন্তু সুন্দর ভুবনকে আমরা কি সুন্দর রেখেছি? আজ যেন তা হয়ে দাঁড়িয়েছে অসুন্দরের এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি। মানবসভ্যতার শত্রু নাগিনীদের বিষাক্ত নিঃশ্বাসে, তাদের অদূরদর্শি কর্মকাণ্ডের ফলে আজ পৃথিবীকে ক্রমশ করে তুলেছে মনুষ্যবাসের অযোগ্য এক দুর্বিষহ বন্দীশালায়। দিনকে দিন বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বদলে যাচ্ছে জলবায়ু, যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।

১৯৭৩ সাল থেকে, মানব পরিবেশে সুস্থ ও সবুজ পরিবেশের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপন শুরু করা হয়। সরকার, সংগঠন ইত্যাদি দ্বারা কিছু ইতিবাচক পরিবেশগত কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবেশের সমস্যা সমাধানের জন্য এই দিন উদযাপন করা হয়। ১৯৭২ সালে মানব পরিবেশে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ৫ই থেকে ১৬ ই জুন রাষ্ট্রসংঘে শুরু হয়। বিশ্ব পরিবেশ দিবসটি প্রথম জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এবং রাষ্ট্রসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) কিছু কার্যকর প্রচারণা চালানোর মাধ্যমে প্রতি বছর উদযাপন করা হয়।

এমনিতেই তথাকথিত ‘সভ্যতা’র সাথে পরিবেশের এক বৈরিতা আছে; সভ্যতার অগ্রগমন বা বিকাশ মানেই নতুন নগর, জনপদ সৃষ্টি, যা পরিবেশের একটা মাত্রার ধ্বংসসাধন করেই গড়ে উঠেছে। কিন্তু তা একপ্রকার নিমিত্তমাত্র; পরিবেশের মূল বিপদ হচ্ছে পুঁজির অদম্য লালসা। পুঁজির মুনাফা তৈরি ও তার সংহতকরণ, শিল্পের জন্য পরিবেশ ধ্বংস যে মাত্রায় হয়ে চলেছে, তা এই পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের প্রতি এক অশনি সংকেত বয়ে এনেছে। নির্বিচার খনিজ আহরণ ও তার সাথে কারখানার অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য – প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে আমাদের পরিবেশকে খুন করে চলেছে এবং এই সবকিছুই হচ্ছে এক নির্দিষ্ট আর্থ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যা মানবসভ্যতার শত্রু হিসাবেই গণ্য হওয়া উচিৎ।

সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে, জনগণকে পদক্ষেপ নিতে এবং পরিবেশ রক্ষা করার জন্য প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয় । বিশ্ব পরিবেশ দিবসের বর্তমান থিম বায়ু দূষণ। বিশ্ব পরিবেশ দিবসটি ১৯৭৪ সাল থেকে উদযাপন করা হয়, এটি ১০০ টিরও বেশি দেশে ব্যাপকভাবে পালন করা হয়। পৃথিবী এবং পরিবেশের যত্ন নেওয়ার জন্য এটি "জনগণের দিন"। পরিবেশকে সুরক্ষার উপায়গুলি জানার জন্য এটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। চলুন আমাদের বিশ্বব্যাপী পরিবেশের উদ্দেশ্য, থিম এবং ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা যাক। ১৯৭৩ সালে "একমাত্র পৃথিবী" থিম নিয়ে প্রথমবারের মত বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়।  এবং ১৯৭৪ সাল থেকে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের উদযাপন অভিযান বিশ্বের বিভিন্ন শহরে হোস্ট করা হয়।

বনাঞ্চল ধ্বংস, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, অপচয় ও খাদ্যের ক্ষতি, দূষণ ইত্যাদি পরিবেশগত সমস্যাগুলি মোকাবেলা করা জরুরি। বিশ্বজুড়ে সারা বিশ্বকে কার্যকর করার জন্য একটি নির্দিষ্ট থিম এবং স্লোগানের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রচার সংগঠিত হয়। গ্রীনহাউস প্রভাবগুলি হ্রাস, অবনমিত জমির উপর মনোনিবেশ, সৌর উত্সের মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন, প্রবাল প্রতিপালন এবং ম্যানগ্রোভ উন্নীতকরণ, নতুন নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয় এই দিনটিকে সফলভাবে অর্জনের জন্য উদযাপন করা হয়।

২০১৫ সালে অ্যালেন ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশনের পরিচালিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে বিশ্বের প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি করা হয়েছে এবং এর মধ্যে প্রায় ৯0% কমপক্ষে ৫00 বছরের মধ্যেও বিযুক্ত হবে না।  বিজ্ঞানীদের মতে, মাইক্রো-প্লাস্টিক বা ক্ষুদ্র টুকরা মাটির মধ্যে, জলের নল, বোতলজাত পদার্থ, বিয়ার এবং এমনকি বাতাসে শ্বাসপ্রশ্বাসে পাওয়া যায়।

পরিবেশের সমস্যা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয়। এর উদ্দেশ্য--
- বিভিন্ন সমাজ ও সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষকে উদযাপন অনুষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নে সক্রিয় এজেন্ট হিসাবে উত্সাহিত করা।

- নিরাপদ, ক্লিনার এবং আরো সমৃদ্ধ ভবিষ্যত উপভোগ করার জন্য লোকেদের তাদের আশেপাশে নিরাপদ এবং পরিচ্ছন্ন রাখার উত্সাহিত করা।

স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার জন্য, পরিবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  এটি আমাদের বায়ু, খাদ্য ইত্যাদি সরবরাহ করে। এটি সঠিকভাবে বলা হয়েছে যে, প্রাণী ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য হলো প্রাণীরা পরিবেশের জন্য নিজেকে পরিবর্তন করে, কিন্তু মানুষ নিজেদের জন্য পরিবেশ পরিবর্তন করে।  পরিবেশ আমাদের আশেপাশের মতোই, এর পার্শ্ববর্তী পরিস্থিতি আমাদেরকে প্রভাবিত করে এবং উন্নতি ও উন্নয়নকে সংশোধন করে।

এই মুহুর্তে পরিবেশকে রক্ষা করার একটি সর্বাধিক প্রয়োজন রয়েছে, এবং বিশ্ব পরিবেশ দিবসটি যা ৫জুন প্রতি বছর উদযাপন করা হয়, এবং হাইলাইট হয়।  এই বছরের, থিম 'বায়ু দূষণ'। গত বছর ভারত হোস্ট দেশ ছিল, এবার চীন এই সম্মান করবে।  হেজঝো, চেচিয়াং প্রদেশে অবস্থিত, প্রধান ইভেন্ট হোস্ট করেছে। "২০১৯ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে চীন একটি মহান বিশ্বব্যাপী হোস্ট।  দেশীয়ভাবে বায়ু দূষণ মোকাবেলা করতে দেশটি অসাধারণ নেতৃত্ব প্রদর্শন করেছে। বায়ু দূষণ একটি আন্তর্জাতিক জরুরী ,প্রত্যেককে প্রভাবিত করে।রাষ্ট্রসংঘের প্রেস রিলিজে ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল জোয়েস মাসুয়া বলেছেন, "লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য চীন এখন ধাক্কা দিবে এবং বিশ্বব্যাপী পদক্ষেপকে উৎসাহিত করবে।"। 

বিশ্ব পরিবেশ দিবসটি ইকো ডে নামেও পরিচিত।  এই দিনটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পরিবেশ এবং এর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য উদযাপন করা হয়। পরিবেশ একটি পার্শ্ববর্তী বা শর্ত যেখানে একটি ব্যক্তি, প্রাণী বা উদ্ভিদ বসবাস বা সমাজ পরিচালনা করে।  পরিবেশের গুরুত্ব বোঝা আমাদের দরকার এবং মানুষের দ্বারা অন‍্যান্য এবং জীবনযাত্রার প্রকৃতি সংরক্ষণ ও সংরক্ষণের জন্য প্রচুর ক্রিয়াকলাপ করা হয়। ভবিষ্যতের পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য জনগণ আজকে আরোও অনিচ্ছুক এবং উদাসীন।

বায়ু দূষণ দিনে দিনে বাড়ছে এবং এটি নিয়ন্ত্রণে জটিল বলে মনে হচ্ছে ।কিন্তু এটি অসম্ভব নয়, আমরা এটিকে মোকাবেলা করতে একসাথে আসব।  এবং এর জন্য বিভিন্ন ধরনের দূষণ বুঝতে হবে, এটি আমাদের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশকে কীভাবে প্রভাবিত করবে আমাদের চারপাশে বায়ু উন্নত করতে পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে। আমরা শ্বাস বন্ধ করতে পারছি না কিন্তু আমরা শ্বাস প্রশ্বাসের বায়ুর মান উন্নত করতে কিছু করতে পারি।  বায়ু দূষণ থেকে পৃথিবীর প্রায় ৭ মিলিয়ন মানুষ বায়ু দূষণের কারণে মারা যায় এবং ৭মিলিয়ন, ৪মিলিয়ন এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ঘটে।

বায়ু দূষণ সম্পর্কিত ঘটনা--
বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯২ শতাংশ মানুষ পরিষ্কার বাতাসে শ্বাস নেয় না।
- প্রতি বছর, বায়ু দূষণ বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির ব্যয় ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের কল্যাণ খরচ করে।
- ২0৩0 সালের মধ্যে, স্থল-স্তরের ওজোন দূষণের ফলে প্রধান ফসল উৎপাদনের পরিমাণ কমে ২৬%।

প্রতি বছর, প্রায় সাত মিলিয়ন মানুষ বায়ু দূষণের কারণে অকালিকালীন মারা যায়।  প্রায় চার মিলিয়ন মৃত্যু এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ঘটে। এই বছর, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং সবুজ প্রযুক্তির বিভিন্ন উত্সগুলি আবিষ্কারের জন্য সম্প্রদায়, ব্যক্তি, সরকারি সংস্থাগুলি, শিল্পগুলিকে একত্রিত করবে, যার ফলে সারা বিশ্ব জুড়ে শহর ও অঞ্চলে বায়ুর মান উন্নতিতে সহায়তা করবে। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে টেকসই বিকল্প অন্বেষণে রাষ্ট্রসংঘ ,সরকার, শিল্প, সম্প্রদায় এবং প্লাস্টিক ও তার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলির বিরুদ্ধে একত্রিত করার চেষ্টা করছে। ।  এটি একটি বিশ্বব্যাপী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে যেখানে মানুষ একত্রিত হতে পারে এবং ইতিবাচক পরিবেশগত ব্যবস্থা নিতে পারে।  আমাদের এই অভিযানে অংশগ্রহণ করা উচিত এবং দূষণের কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলি দূর করতে এবং পরিবেশকে পরিষ্কার করতে একত্রে যোগদান করা উচিত।  একসাথে আমরা পরিবর্তন করতে পারবো।

পরিবেশ সচেতনতা প্রসারে তথা পরিবেশের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে, কিছু মানুষ আওয়াজ তোলে, রাস্তায় নামে, ক্ষুদ্র শক্তি নিয়েও লড়াই করে, এমনকি প্রাণ দিতেও পিছপা হয়না। আজকের দুনিয়ায় পরিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আসলে এক রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারণ তাকে লড়তে হয় রাষ্ট্র, সরকার, কর্পোরেট পুঁজি ও তার বাহিনীর সাথে। আজ যখন আদিবাসীরা তাদের জল-জঙ্গল-জমীনের লড়াই চালায়, যা পরিবেশের সাথে তাদের জীবনের একাত্মতার প্রশ্ন, তা ব্যাপক রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের মুখে পড়ে যায়। এই লড়াই তাই এক বিচ্ছিন্ন বিজ্ঞান ও পরিবেশের লড়াই না থেকে, সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলের লড়াইয়ের অংশ হয়ে ওঠে। দাবী উঠুক; জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে; ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচী প্রণয়ন করা দরকার; পরিবেশ দূষণের সম্ভাবনা রয়েছে এরূপ প্রতিটি শিল্প-কারখানা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে; শিল্পবর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে; প্লাস্টিকের ব্যবহার শূণ্যের পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। পরিবেশের এ ভয়ঙ্কর পরিবর্তনে বিজ্ঞানীরা চিন্তিত ও আতঙ্কিত। আজ পরিবেশ দূষণ মানব সভ্যতার জন্য ভয়ংকর বিপদের পূর্বাভাস। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে যেকোনো মূল্যে পরিবেশ দূষণ রোধ করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আসুন, আজকের দিনে, নিজেদের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নির্মল, সবুজ ও আলোকিত পৃথিবী গড়ার জন্য আমাদের এ আবাসভূমিকে দূষণ মুক্ত করে তোলার অঙ্গীকার করি।

Monday, June 3, 2019

পেডিস্টল (দুঃসময়ের কবিতা)


১) আমি জানি ওরা আর বাঁচাতে দেবেনা
কারণ, পাড়ায় পাড়ায় একটা গুজব
প্রতিটা গলির মোড়ে রক্তের কালিতে লিখা
রক্তিম সাইনবোর্ড।

২) 'দুঃখ' শব্দটার যে ঠিক কতটা অর্থ
তা এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
সরকারের মতো!

পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে রিফ‍্যুজি লতার মতো
সম্মিলিত অস্তিত্ব মৌন
বেশ‍্যাদের মৃত্যু মিছিল দেখে! !

৩) হারিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে মনে একটি বারের জন‍্যও
উঃ শব্দটা আসে না, মানে আসেই না
আজকাল এসব সহজাত
অর্থাৎ ' আপনা টাইম আয়েগা'।

৪)'রাষ্ট্র' আর 'বিপ্লব' দুটিই একে অপরের পরিপূরক
কেউবা থালা নিয়ে হাজির
কেউবা মালা নিয়ে
মূল অধ‍্যায়ের মূল‍্যায়ন নেহাত দুর্বল
আর বন্দুকের নলের আগে স্বাধীনতা
এসব আড়াল আজ শুধু চিত্রকল্প
সেই কৃষক ও নেই সেই ভার্সিটির ছাত্রও নেই
আছে কেবল কয়েকটা বলির পাঠা
তাই কবির ভাষায় খিস্তি হোক রাষ্ট্রীয় অ্যানথেম।

৫) অবশ্য মনের গন্তব্য তার গভীরতার দৈর্ঘ্য মাপে
সেন্টিমিটার বাই সেন্টিমিটার
জীবনের প্রতিটা  মূহুর্ত হিসেব কষে
মূলরোম থেকে জলস্তর পর্যন্ত।

যেখানে নিয়তির খেলা সাময়িক প্রসঙ্গ
যা আস্বাদন দুঃখবোধ আর বিলাপও।

পঞ্চভূতের পাঠশালা ফাঁটা জিন্সের পৃথিবী
নেশাতুর সালসা আর গিটারের গুঞ্জণে
লাফিং বুদ্ধের ভঙ্গিতে নিমগ্ন দ্রাক্ষাবন।

৬)
ভবিষ্যৎ বদলাচ্ছে নিঝুম রাত্তিরে
নৈশব্দিক রহস্যময় জগত টা
শব্দ বাণে স্থিতধী।

চাহিদার গুণগ্রাহী সুরক্ষার জোট আর
       সীমান্ত-নদী-পাহাড় বেয়ে
কিম্বদন্তি হ্লাফ পেন্ট মানুষগুলো
সাক্ষী এই ধুসর সময়ে।

৭) প্রেম--
আর আসে না, দুর্মুখ স্বপ্নগুলোর
ইচ্ছেমত ফরমানে, এখন
                হিউমাস দেখে।

৮) এশহর এখন ফ‍্যাকাশে
পুরোনো চোখগুলোর অভাব, শুধু আভিজাত্য আর আভিজাত্য
শর্ট স্কার্টের পরদেশী হাওয়া সওদাগরি মেজাজে।

পদবী বসছে চাঁদের হাটে
মিঠাজলে রাম আর উইস্কির ককটেল
সঙ্গে চলছে উৎসব গীত।

৯) কুশিয়ারা বেয়ে খাঁড়া ডাকবাংলা ঘাটে
দু-পার বাংলার ঘ্রাণ উদ্ধার করেছি
খানিকটা বিষ্ঠা খেয়ে।

ল.সা.গু- গ.সা.গু উৎপাদক বের করে
স্রোতের প্রবাহে দিনশেষে একটাই চিত্র তুলে
সেটা হলো মান যোগ হুশ।

রাস্তা খুঁড়লেই কী মীমাংসা হয়
এ যে নাড়ির সাথে নাড়ির টান
স্মৃতিমধুর রুমন্থন উপাখ্যান,
একটা রিফিলের মতো
সম্পর্কে যতিচিহ্ন বসে !

১০) একটি ফুল---
হাত পা ছাড়া সাবলীল গঠন
সমুদ্র মন্থনের পাশ দিয়ে
হারিয়ে যাচ্ছে নদীর দু'পারের মতো
আলগে।

ভালো থাকার কথায়
দেহতত্ব গায়,তবু নির্যাস হারিয়ে
দিতে চায় একচিলতে রুদ্দুর।

রক্তপাত শেষে বিয়োগান্তুক মূহুর্ত
ক্লেদাক্ত বাগান আর সয়না
নিয়তির নিঝুম ভাষ‍্য।

১১) 'হামসফর' চড়ে কী উপলব্ধি করার!
পিছনে ঠেলে দেয় আলোক ফোয়ারা ষ্টেশনগুলো
স্বৈরাচারী আবেগে।

যাচ্ছে তো যাচ্ছে
একটার পর একটা টপকে
পু ঝিক পু ঝিকে, সাড়ম্বরে
'এয়ার ব্রেকের' শব্দে অসুবিধে নেই বোঝাতে
থামতে হয় কোন না কোন ষ্টেশনে।

১২) চতুর্ভূজ চারটা সমান বাহু
সমান তালে জ‍্যামিতির প‍্যাঁচালো প‍্যাশন
অন্তত বিশেষ কেউ নেই এই ঢেউয়ের তালে
অর্থাৎ সমান বিভাজনে
যান্ত্রিক সভ‍্যতায় ১:২ বা ২:১ উৎপাদক বিশ্লেষণে
ত্রেতাযুগ ঘোর গ্লোবাল ওয়ার্মিং ।

১৩) সেই চোখ জোড়া এখন কন্টেন্ট ল‍্যান্সের কয়দখানায়
উত্তাপীত মমদেহ বিগলিত ধারায়
একপ্রান্ত থেকে অন‍্যপ্রান্ত
নির্লিপ্ত হয়ে চলছে
প্রবাহিত ঝর্ণার মত।

এই ধুসর সময়ে
অভিমানে বিষাদ আগুন ইঙ্গিত দেয়
হারাপ্পা সভ‍্যতার মত হারিয়ে যাবো
স্ফুট বিষাদে।

১৪) প্লাস্টিক পেইন্টের শহরগুলোতে
প্লাস্টিকের শ্বাস-প্রশ্বাসটাও
ব্রহ্মপুত্র থেকে ব‍রাক তার চরাই উৎরাই
খাশি পাহাড় থেকে ভুবন পর্যন্ত
হয়তো বলতে পারো ---
মানসিক অসংগতি।

মাটিতে দাঁড় করানো আর্কিটেক্ট
প্রাচুর্য অলঙ্করণে পড়ে আছে কম্পিটিশনে
নিজ থেকে দুর্বলের দলে।

১৫) আলো হারিয়ে ঋণ করে আলোকিত
এই জাগতিক সংসার,
শোষিত ভূগর্ভ রস
কনভার্টেড নিয়ন আর সোলার প্যানেলে।

প্রতিযোগিতার রেস কোর্সে
ফর্মুলা ওয়ান গেম---
ইঙ্গিত দিচ্ছে, শোষণে প্রেমও বেশরম
সুযোগ বুঝে খোপ মারে।

১৬) এবং ----
স্বপ্নরা জোৎস্নার মলিন আবহে
এখন পড়ন্ত বিকেল, দ্রোহের করমর্দন
সূর্য ওঠার আর নাম নেই,
এখন---
ট‍্যাঙ্কে মিসাইল মানুষ‍্য প্লাজমার
শ্রেণী ঘৃণায় সর্বভুক শ্লাট্
অস্তিত্ব টিকিয়ে আছে
বিলাপিত শিউলি ঝরা রাতের মতো।
আর---
রেড করিডোর সংস্কার কর্মসূচির আইন পাশ করে
--গণ-নাট‍্য সংস্থা।

১৭) বৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে হয়
কিঞ্চিৎ সুরাপানে;
ফ‍্যানের শব্দটাও
তাল দিচ্ছে ,আধ মোজা চোখগুলোর সাথে
ইজিচেয়ারে বেশ হেলিয়ে বসে
ছোট হয়ে যাওয়া জ্বলা সিগারেট টাও।

সময় হারিয়ে যায় ইতিহাসে
কমলাকান্ত ও দপ্তর থেকে মুক্তি
তাই নেপোলিয়ন
দহন উৎসব শেষে ফিরে গেছে।

১৮) কালের বহমানতায় অনেকেই মিশেছে
ইতিহাসের পাতায় প্রকাশিত লেখা
কড়ির গন্ধ শুকে বানিজ্যিক প্রচারে,
আস্তা হারিয়ে সস্তা বাজারে
পৌরুষ  রূপান্তর ভক্ত আর ভগবানে।

বিদ্রোহের বাগানে যাতে দূষণ না ছড়ায়
মহালাভজনক বিনিয়োগ বিকিনিতে,
খিদে সব একজায়গায় কেন্দ্রবিন্দু।

১৯) পাহাড়ের চূড়া আকাশ ভেদে দম্ভে
বাসর রাতে স্ত্রী জয়ের খুশির মতো
আসলে খুব সোজা ব‍্যাপার হচ্ছে
দুর্বল অতি সহজে হার মানে।

আগুনখেকো শ্রমিক উপঢৌকন খোলে
অস্ত্র হাতে একটা কথা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ
আমাদের বাঁচতে হবে।

যুদ্ধ
নির্যাতন
বাঁচতে দাও বাঁচতে চাই;
শুনো মৃতের ঘোষণা
শবগুলো পায়ে ছাপ দেবে
ভ‍্যালোটে।
ভবিষ্যৎ বদলাবে পরিশ্রমী সভ‍্যতার
দেশলাইর কাঠি জ্বেলে।

২০) চিৎকার করে বলতে গেলে কি নিশ্চিত পাওয়া যায়
চাই সাহস আর জানতে হয় অধিকার
যা কেড়ে আনতে হয়।
কনভার্ট হচ্ছে আধুনিক প্রকৌশল
অঞ্চল থেকে শুরু করে বাধ্যতামূলক সংস্করণ।

উত্তাপীত মমদেহ উত্তেজনা হারিয়ে
সময়ের খরস্রোতে
লাফিং বুদ্ধও ভাঙ্গা পেডিস্টল।

আর এ শহরে ফুটে উঠবে না
গরিবুল্লাহদের ভয়ে
শুধু অক্সিজেনে আছে বিষাক্ত কার্বন।

--- জাহিদ রুদ্র
০৪-০৬-২০১৯ ইং

Sunday, May 26, 2019

অসাম্প্রদায়িকতার এক তুঙ্গীয় নিদর্শন কাজী নজরুল



"স্বাধীনতা হারাইয়া আমরা যখন আত্মশক্তিতে অবিশ্বাসী হইয়া পড়িলাম এবং আকাশমুখো হইয়া কোন অজানা পাষাণ দেবতাকে লক্ষ্য করিয়া কেবলি কান্না জুড়িয়া দিলাম; তখন কবির কণ্ঠে আকাশবাণী দৈববাণীর মতোই দিকে দিকে বিঘোষিত হইল, ‘গেছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ।’ বাস্তুবিক আজ আমরা অধীন হইয়ছি বলিয়া চিরকালই যে অধীন হইয়া থাকিব, এরূপ কোন কথা নাই। কাহাকেও কেহ কখনও চিরদিন অধীন করিয়া রাখিতে পারে নাই ইহা প্রকৃতির নিয়ম বিরুদ্ধ” (যুগবাণী : নজরুল)।

নজরুল ইসলামকে নিয়ে পড়াশোনা শুরু হয় দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে সেই 'প্রভাতী' দিয়ে। তারপর দিন যায় আমি ও তার সাথে পরিচিত হই ধীরে ধীরে। ক্লাস এইটে 'রবীন্দ্র-নজরুল' জয়ন্তীতে 'বল বীর' কবিতা আবৃত্তি  করি। সেবার প্রথম হয়েছিলাম। যাইহোক, আমার জানা নেই কী ভূমিকাই দেবো বিদ্রোহী কবি নজরুলের? কী বৈশিষ্ট্য বা তাকে মানায়? যদি বলি কোন্ কবি একাধারে সৈনিক,কণ্ঠশিল্পী, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, গীতিকার, নাট্যকার, অভিনেতা, এবং চলচ্চিত্রকার ছিলেন? ব্যক্তিগত সামাজিক এবং কর্মজীবনে বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী বাঙালি কবির নাম কী? এরকম অনেক প্রশ্নের উত্তরে একটাই আসে নাম, কাজী নজরুল ইসলামের। তাঁর স্বভাবে ছিল বিদ্রোহী; প্রথাবিরোধী, অনেকটা বিপ্লবী। নজরুল তার গান-কবিতা-গল্পে-প্রবন্ধে এমন সব শব্দরাজি ব্যবহার করেছেন যা এক 'কাণ্ডারী'র প্রযোজ্য।অধীনতা মেনে নেয়া নজরুল জীবনে ছিল অকল্পনীয়। বাল্য থেকেই স্বাধীনচেতা মনোভাব তাঁকে সাহসী, ব্রতী, সংগ্রামী, লড়াকু, দৃঢ় মনোবলের অধিকারী করেছে। জন্মেছিলেন পরাধীন দেশে। উপনিবেশ শাসনের ভেতর দেখেছেন শোষিত, বঞ্চিত পরাধীন এক জাতিকে। কাজী নজরুল ইসলামের মানস গঠনের কালে বঙ্গসমাজ ছিল অন্ধ চিন্তায় আচ্ছন্ন। সময় ছিল বিজ্ঞানমনস্কতার বিপরীত। প্রতিকূল ছিল রাজনৈতিক পরিমণ্ডল। সামাজিক-ধর্মীয় মূল্যবোধ ছিল আলোক বর্জিত। ঠিকমতো তখনো যুক্তিবাদের গোড়াপত্তনই হয়নি। তার ওপর ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ, ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা, ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ, ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডসহ অনেক ঘটনাই নজরুল ইসলাম মানস গঠনের কালে ঘটেছে।

কাজী নজরুল ইসলামকে বলা হয় রেনেসাঁসের কবি। লিখেছেন— ‘গাহি সাম্যের গান—/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,/ যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম ক্রিশ্চান। ’ তিনি প্রচলিত প্রথার বিরোধিতা করে লিখেছেন—‘কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুথু ও—গায়ে?/ হয়তো তোমার স্তন্য দিয়েছে সীতা-সম সতী মায়ে। ’ প্রচলিত সমাজে যৌনকর্মীদের সম্মানের যে অবনমন তার থেকে তিনি বেরিয়ে এসেছেন। এমনকি যৌনকর্মীকে তিনি অবলীলায় ‘মা’ সম্বোধন করেছেন। মনুষ্যসৃষ্ট নানা বিভেদরেখায় বিভক্ত এই সমাজকে দেখে যারপরনাই বিচলিত ছিলেন কবি নজরুল। এসব থেকে কায়মনোবাক্যে মুক্তি চান তিনি। সেই কারণেই তার রচিত সাহিত্যের প্রধান উপাদান হয়েছে মানবতাবাদ, সাম্যবাদ আর অসাম্প্রদায়িক চেতনা।

সততই তিনি ধর্মের বিভেদ দূরীকরণে সচেষ্ট ছিলেন। নজরুল দর্শনের অন্যতম দিকটি হচ্ছে ‘ধার্মিক’ পরিচয়ের চেয়ে ‘মানুষ’ পরিচয় বড়।   আল্লাহ এবং নারায়ণের মধ্যে কখনোই তলোয়ারের ‘ঠোকাঠুকি হবে না’ বলে তিনি মত দিয়েছেন। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—তারা দুজনই এক। শান্তি, সাম্য, অধিকার, স্বাধিকার –নজরুলের কাব্যিক চেতনার একেকটি হীরকখণ্ড। সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার আর কুপমণ্ডুকতা ছিলো তার চেতনার প্রতিপক্ষ। তিনি ছিলেন চেতনার কবি। তিনি যেমন মেনে নেন নি নারীর প্রতি অবিচার আর বৈষম্য, তেমনি মেনে নেন নি দুর্বলের প্রতি সবলের আধিপত্য। বিভিন্ন লেখায় তিনি হিন্দু-মুসলিম বিভেদের অবসান চেয়েছেন এবং দু’টি সম্প্রদায়ের মধ্যে সামঞ্জস্যকারী বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন গানে,গল্পে,প্রবন্ধে,কবিতায়। তার ‘ধূমকেতু’ আজও আমাদের চেতনাকে নাড়া দেয়। মূল উদ্দেশ্য, স্বাধিকার আন্দোলনে সসস্ত্র বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সাম্যবাদি’, ‘মানুষ’ এবং ‘নারী’ কবিতায় নজরুল ধর্মীয় উগ্রতার বিপক্ষে মানবতার বাণী তুলে ধরেছেন।

নজরুল তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘এক স্থানে দেখিলাম, ঊনপঞ্চাশ জন ভদ্র-অভদ্র হিন্দু মিলিয়া একজন শীর্ণকায় মুসলমান মজুরকে নির্মমভাবে প্রহার করিতেছে, আর এক স্থানে দেখিলাম, প্রায় ঐ সংখ্যক মুসলমান মিলিয়া একজন দুর্বল হিন্দুকে পশুর মত মারিতেছে।’ এরপরই নজরুল মন্তব্য করেন-‘দুই পশুর হাতে মার খাইতেছে দুর্বল মানুষ। ইহারা মানুষকে মারিতেছে যেমন করিয়া বুনো জঙ্গী বর্বরেরা শুকরকে খোঁচাইয়া মারে। উহাদের মুখের দিকে তাকাইয়া দেখিলাম, উহাদের প্রত্যেকের মুখ শয়তানের চেয়েও বীভৎস, শুকরের চেয়েও কুৎসিত। হিংসায়, কদর্যতায় উহাদের গাত্রে অনন্ত নরকের দুর্গন্ধ।’

নজরুল আরো মন্তব্য করেন, ‘ দেখিলাম, আল্লার মজসিদ আল্লা আসিয়া রক্ষা করিলেন না, মা-কালীর মন্দির কালী আসিয়া আগলাইলেন না। মন্দিরের চূড়া ভাঙ্গিল মসজিদের গম্বুজ টুটিল। আল্লার এবং কালীর কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। আকাশ হইতে বজ্রপাত হইল না হিন্দুদের মাথার উপর। এই গোলমালের মধ্যে কতকগুলি হিন্দু ছেলে আসিয়া গোঁফ দাড়ি কামানো দাঙ্গায় হত খায়রু মিয়াকে হিন্দু মনে করিয়া ‘বল হরি হরিবোল’ বলিয়া শ্মশানে পুড়াইতে লইয়া গেল এবং কতকগুলি মুসলমান ছেলে গুলী খাইয়া দাড়িওয়ালা সদানন্দ বাবুকে মুসলমান ভাবিয়া, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়িতে পড়িতে কবর দিতে নিয়া গেল। মন্দির ও মসজিদ চিড় খাইয়া উঠিল, মনে হইল যেন উহারা পরস্পরের দিকে চাহিয়া হাসিতেছে।’  ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন— ‘এত মারামারির মধ্যে এইটুকু ভরসার কথা যে, আল্লা ওরফে নারায়ণ হিন্দুও নন, মুসলমানও নন। তার টিকিও নেই, দাড়িও নেই। একেবারে ‘ক্লিন’। টিকি-দাড়ির ওপর আমার এত আক্রোশ এই জন্য যে, এরা সর্বদা স্মরণ করিয়ে দেয় মানুষকে যে, তুই আলাদা আমি আলাদা। মানুষকে তার চিরন্তন রক্তের সম্পর্ক ভুলিয়ে দেয় এই বাইরের চিহ্নগুলো। ’

নজরুলের সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থে যে অসাম্প্রদায়িক চিত্র পাওয়া যায়-তা অন্যত্র দুর্লভ। গদ্যেও নজরুল তাঁর বক্তব্যকে একটা অসাম্প্রদায়িক কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছেন এবং সফল হয়েছেন। 'বাঁধনহারা’ উপন্যাসের নজরুলের ধর্ম নিরপেক্ষের উদারতার  প্রতিফলন ঘটেছে। তাঁর মতে ধর্মের বাহ্যিক রূপটা একটা খোলস মাত্র। ধর্মের অন্তর্নিহিত সত্যকে ভুলে গিয়ে হিন্দু-মুসলমান বাহ্যিক আচার-আচরণকে অযথা গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তিনি দেশের যুব সমাজকে উদার মানবতায় উচ্চাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে হিন্দু মুসলমানের উর্দ্ধে ওঠার আহ্বান জানান।  তিনি যেমন অসংখ্য হামদ ও নাত লিখেছেন তেমনই হিন্দুদের কীর্তন, শ্যামাগীতি লিখেছেন। কবিতা-গান, নাটক বা গল্পে মানবতার গান গেয়েছেন তিনি। সবজায়গায় অসাম্প্রদায়িকতার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।

নজরুল জানতেন মানবধর্মই আত্মস্ফুরণের অন্তরলৌকিক চেতনার উৎস। তিনি ছিলেন মানবতাবাদী মানুষরূপে উপস্থাপক। প্রবহমান জীবন সত্যের অনুসরণে নজরুল মানস ও চিন্তা- চেতনায় অসাম্প্রদায়িকতার ভাব পরিষ্কার ফুটে ওঠে। ব্যক্তিজীবনেও সাম্প্রদায়িকতার সংকীর্ণ চিন্তার উর্দ্ধে ছিল তার চিন্তাধারা। স্ত্রী থেকে শুরু করে সন্তানদের ক্ষেত্রেও দেখা মেলে তার অসাম্প্রদায়িক মননশীলতা। ধর্মব্যবসায়ীদের ব্যাপারে নজরুল নির্বিকার দ্বিধীহীন এবং দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় নিয়ে ঘোষণা করেন-
“কাটা উঠেছি ধর্ম-আফিস নেশা
ধ্বংস করেছি ধর্ম-যাজকী পেশা
ভাঙ্গি মন্দির, ভাঙ্গি মসজিদ
ভাঙ্গিয়া গির্জন গাহি সঙ্গীত
এক মানবের একই রক্তে মেশা
কে শুনিবে আর ভজনালয়ের হ্রেষা।“

নজরুল জানতেন এবং বুঝতেন শোষকশ্রেণিই সচেতনভাবে মানুষের মাঝে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছে। শোষকের ভিত যাতে সম্মিলিত জনগোষ্ঠীর আঘাতে ভেঙে না যায় তাই তারা সর্বদাই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ জিইয়ে রাখে – ধর্মকে শোষণের মৌল শক্তিতে পরিণত করে। মার্কসবাদী চিন্তাধারার মতো ছিল তার ভাষণ। এই শোষকশ্রেণির বিরুদ্ধে, এই ভণ্ড ধার্মিকদের বিরুদ্ধে, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছিল নজরুলের আমৃত্যু সংগ্রাম। নজরুল তার অসাম্প্রদায়িক গান বা কবিতার জন্য সবসময় তিনি ছিলেন ধর্মান্ধদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। মুসলমানরা বিভ্রান্ত হয়েছেন তার সৃষ্টিতে দেব-দেবীদের আরাধনা তথা 'খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর! দেখে, আবার সনাতনীরা খেপেছেন যখন তিনি বলেছেন “আমি বিদ্রোহী ভৃত্য, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন।”

সবশেষে তাঁর কথায়--
‘‘হিন্দু না ওরা মুসলিম’’-ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন!
কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।
কাজী নজরুল ইসলাম সকল মানুষের কাছে স্মরণীয়-বরণীয় এবং অনুকরণীয়। অসাম্প্রদায়িকতারঅভিশাপমুক্ত দেশ তথা স্বৈরাচারী শোষণের বিরুদ্ধে জনতম গড়তে নজরুলের চেতনার বিকাশের ঐকান্তিক প্রয়োজন। নজরুল ইসলামের কাছে সব মানুষই ছিল যেমন পবিত্র। সকল মানুষের মিলিত শক্তিই ছিল তাঁর কাম্য। তাই গানে, সংগীতে প্রকাশ পেয়েছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা।


Friday, May 17, 2019

প্রসঙ্গ বিদ‍্যাসাগরের মূর্তি ভাঙ্গা নিয়ে

টুইটে সেদিন দেখি "ইয়ে ভোঁসরিকে বিদ্যাসাগর কাঁহাসে পয়দা হো গয়া"। এই লাইনটা সত্যিই এক অশনিসংকেত। ভারতের আকাশে বাতাসে এখন হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থান চেতনার ধ্বজা। গত ১৪ মে অমিত শাহের রোড শো দেখে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেছি! উচ্ছ্বাস-উল্লাসে মানুষ বেলুন,ফুল, দুপাশের উঁচু বাড়ির বারান্দা থেকে মিছিলে শ্লোগান উঠছে ‘জয় শ্রীরাম’। আর এর ঠিক পরেই উত্তর কলকাতায় বিদ‍্যাসাগর কলেজে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগরের মূর্তি ভাঙ্গা হয়। গত পাঁচটা বছরে যেভাবে বি জে পি'র উগ্রজাতিয়তাবাদী আগ্রাসনে ভারতের বিভিন্ন স্থানে মূর্তি ভাঙার রেওয়াজ শুরু হয়েছে তা এর আগে ভারত এতটা দেখে নাই।

আমরা এর আগেও দেখেছি ত্রিপুরার মূর্তি ভাঙার ঘটনা। যেখানে বর্তমান শাসকদল লেনিন,রবীন্দ্রনাথ,সুকান্ত, নজরুল এদের মূর্তি ভাঙতে এতটুকুও হিমসিম খায় নাই। একটি কথা এখানে স্পষ্ট যে বি জে পি হলো আর এস এস এর বাহিরের খোলস। এই ফ‍্যাসীবাদী শক্তি বি জে পি যেভাবে ত্রিপুরাতে নিজের ভয়ংকর রূপে ঠিক তদ্রূপ দেখা গেলো সেদিন মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গে। এরা অসমে এএন আর সি , ডি ভোটারদের নিয়ে খেলছে ছেলে খেলা আর অন‍্যদিকে বাঙালি যুবকদের মধ‍্যে ঢুকাচ্ছে আগ্রাসনের বিষবাষ্প।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন বাঙালিরা। বাঙালির প্রায় সব গিয়েও যা পড়ে আছে তা হল বাঙালিয়ানা। যে বাঙালিয়ানায় পয়লা বৈশাখের আমেজ, রোববার দুপুরে গোল করে কাটা আলুর সঙ্গে পাঁঠার মাংসের ঝোল, পঁচিশে বৈশাখে রবীন্দ্রগানের আসর, চব্বিশ মে নজরুল বন্দনা,তেইশ জানুয়ারিতে প্রভাতফেরি, ছাব্বিশ জানুয়ারিতে স্কুল-ক্লাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন। চৈতন্য থেকে লালন আমাদের। নজরুল থেকে রবীন্দ্রনাথ আমাদের। বিবেকানন্দ থেকে বিদ্যাসাগর আমাদের। বীরবিক্রম নেতাজি আমাদের, হারিয়ে-যাওয়া নেতাজিও আমাদের। তাঁদের পুজো করলেও আমরাই করি, সমালোচনা করলেও আমরা। তাঁরা বাংলা ও বাঙালির নিজস্ব সম্পদ। আমাদের প্রাণের আরাম মনের আনন্দ আত্মার শান্তি।

খুব পরিষ্কারভাবে এবং স্পষ্ট করে বলার সময় এসেছে যে আপনারা যাঁরা বলছেন ‘আগে রাম পরে বাম’ কিংবা ‘একুশে ওরা ছাব্বিশে আমরা’, পাপ করছেন। ভুল নয়, অন্যায় নয়, সরাসরি পাপ করছেন। অপরাধ করছেনও বলা যায় একে। এবং হ্যাঁ, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হল একটা সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট শক্তিকে সরকার থেকে হটানো। যে যেভাবে সেই কাজে পদক্ষেপ করবেন, সেটাই প্রকৃত মানবতা, প্রকৃত দেশপ্রেম। যে কোনো স্তরে বিজেপি বিরোধিতাই এখন পবিত্র কাজ। মহাশয় আপনি ও আপনারা টেররিস্ট, সাদা বাংলায় সন্ত্রাসবাদী। নাথুরাম গডসের মতো সন্ত্রাসবাদী। প্রজ্ঞা সিং ঠাকুরের মতো সন্ত্রাসবাদী। মাসুদ আজহারের মতো সন্ত্রাসবাদী। সন্ত্রাস ছাড়া, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সন্ত্রাস ছাড়া আপনাদের আর কোনও ধর্ম নেই। কেবল ভেক ধরে হিন্দুত্বকে ব্যবহার করছেন। যেভাবে মাসুদ আজহাররা ভেক ধরে ইসলামকে ব্যবহার করে, সেইরকম। মহাশয় আপনি ও আপনার ভক্তরা সবাই সন্ত্রাসবাদী।

যে প্রবণতাটি ভারতের বিবিধতা বা বৈচিত্র বা ডাইভার্সিটিকে আক্রমন করে, ধ্বংস করছে। আর তাই এটি প্রবল বিষাক্ত। এক দেশ, এক ভাবনা, এক আদর্শ, এক ধর্ম, এক বিশ্বাস, এক সংস্কৃতির ছাঁচে বা ফর্মূলায় ফেলার এক সুনিপুণ চক্রান্ত। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় 'সীতার বনবাস' গল্পে রামের সাথে বেশ ভালো করে পরিচয় হয়। যে কি না স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে বারবার সংশয় প্রকাশ করতেন। উনার স্ত্রীর সতীত্ব পরীক্ষা করেন প্রজাদের সংশয়ের জবাবে। কিন্তু এর আগে টিভিতে রামায়ণ দেখেছি। সেখানে রামের চরিত্র দেখে অনেক সময় নিজেও যাতে রামের মতো হই এই ভাব ছিল। তখন বেশ ছোট ছিলাম।তো সেই থেকে অ্যাভারেজ বাঙালির কাছে রাম রামায়ণের একটি চরিত্র, যে কি না নিজেরই বউকেই ঠিকঠাক মর্যাদা দেয় না, যার কাছে ভালোবাসার চেয়ে রাজদণ্ড বড়। তো সে যাই হোক, সেই রাম যে কী করে বাঙালির ভগবান হয়ে যায়, শ্রীরাম হয়ে যায়, আমি কেন, আমার উত্তর-পূর্ব চোদ্দগুষ্টিও জানে না। আর বাঙালির ভগবান হল, তাও জানি না। যখন কলেজে উঠি তখন থেকে এই 'জয় শ্রীরাম', ‘জয় বজরঙ্গবলী’ এসব শুনি।  ইন ফ্যাক, হনুমানের বুকচেরা ফোটো যেখানে উঁকি দিচ্ছে রাম-সীতা। এসবের সাথে পরিচিত হই।

তো সেকথা থাক, কয়েকদিন আগে যে লোকটা ‘কাঙাল বাঙ্গাল’ বলে গেলেন, তাঁর মিছিলেই এত মানুষ! এই কয়েক বছর আগেও যাঁর গায়ে ছিল গুজরাট গণহত্যার রক্ত, সোহরাবউদ্দিন হত্যার দাগ (এখন অভিযোগমুক্ত), তাঁর মিছিলেই এত মানুষ! যাঁরা রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতার বোধকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়, বিবেকানন্দের দর্শনকে অবজ্ঞা করে যারা , জ্ঞান-প্রতর্ককে ঘৃণা করে, যাদের ভাববিশ্বে শুধুই হিন্দুচেতনা, যারা দেশ বলতে বলে মানুষ নয় বোঝে কাঁটাতার, যারা মানুষের পাশে মানুষ হয়ে দাঁড়াতে শেখেনি... সেই তাদের মিছিলেই এত মানুষ! তাও আবার কলকাতার বুকে!

একটি কথা কী জানেন, বিষয়টা অন্য জায়গায়... একটা মূর্তি ভাঙলে বিদ্যাসাগরের একবিন্দু খাটো হয় না... এটা মূর্তি ভাঙা নয়... এটা এক ব্যাপক আগ্রাসনের অশনি সংকেত। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, ভাবনা আদর্শকে আগ্রাসন.. এই হিন্দুত্ব র প্রসার ও প্রচার এর নামে যা চলছে তা এক প্যান ইন্ডিয়ান জাতীয়তাবাদী মডেলে সবাইকে ফেলার চক্রান্ত। এক জেনারালাইজেশান। একটা  উত্তর ভারতীয় মডেলের প্ল্যান।
আর এটি মূর্তি ভাঙা নয়, এক বেলাগাম ঔদ্ধত্য। আমরা দিন দিন সহ্য করতে করতে, সর্বংসহা হতে হতে, এমন ক্লীব পোকামাকড়ের স্তরে পৌঁছেছি যে এরা যা নয় তাই করার ঔদ্ধত্য নিয়ে ঘুরছে। এখনো সহ্য করে যাবো তো এর পরে একদিন আপনার ছেলে হিন্দি বলছেনা বলে তার হাত ভেঙে দেবে। আপনার মা কড়োয়া চৌথ রাখেনা বলে তাকে রাস্তায় থাপ্পড় মেরে যাবে। আপনার বৃদ্ধ বাবা হনুমান মন্দিরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মাথায় হাত ঠেকাননি বলে তাকে দুটো লাথি মারবে। আপনি ভারত পাকিস্তান ম্যাচে কোনো পাকিস্তানি বোলারের সুইং দেখে মুগ্ধ হয়ে বললে আপনার মুখ ফাটিয়ে দেবে ঘুঁষি মেরে। আপনার ছেলে বাধ্যতামূলক ভাবে পড়বে এস এস টি তে মহান দামোদরদাস মোদীর জীবনী, মুখস্ত করবে "বীর" সাভারকারের গাথা। ভুলিয়ে দেওয়া হবে তাকে সূর্য সেন, এম এন রয়, বাঘা যতীন, প্রীতিলতা ওয়েদ্দেদার। এবং এর পরবর্তী স্তরে আপনি পুজোর চাঁদার মতো বাধ্যতামূলক ভাবে নানান "দেশপ্রেমী" চাঁদা দেবেন। মানে দিতে বাধ্য থাকবেন। আপনার টাকায় হনুমান মন্দির হবে, গণেশ পুজো হবে।

কমিউনিস্ট মেনিফেস্টতে লেখা আছে " ইউরোপ ভূত দেখেছো, কমিউনিজমের ভূত''। আর আমাদের ভারত বলবে, বি জে পি ভূত দেখেছ, ফ‍্যাসীবাদের ভূত। কার্ল মাক্স যেখানে সমাজকে পালটে দেওয়ার কথা বলেছেন। আর জারতন্ত্র কে পালটে দিয়ে মহামতি লেনিন রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র কায়েম করে ছিলেন। যেমন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথায়, 'বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন'। আজ সমস্ত ভারত জুড়ে ফ‍্যাসীবাদের আগ্রাসন। যেখানে মানুষ স্বার্থের করতালিতে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারছে। সংঘ পরিবারের উদ্দেশ্যই হলো মানুষের সভ‍্যতার ইতিহাসে যে প্রগতিশীলতা ও শ্রেণী সংগ্রাম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে সেখানে মধ‍্যযুগীয় বর্বরতা প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

বিদ্যাসাগর কলেজের বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার প্রেক্ষিতে এসব বলছি না। যারা ভেঙেছে, হয়তো জানতই না, ওটা কার মূর্তি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জ্যাঠামশাই ভাবতে পারে আবার বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বাবাও ভাবতে পারে, কিংবা হয়তো জ্যোতি বসুর মূর্তি ভেবেই ভেঙেছে। কিন্তু যে আক্রোশে ওই বিখ্যাত রোড শো চলছিল, অবাঙালি মানুষে ভরপুর রোড শো, কলকাতার গর্ব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে মিছিলের লোকজন ঢুকতে চাইছিল, কলাবাগান বস্তির দিকে যেভাবে মুসলমান-বিরোধী গালিগালাজ চলছিল, একটা কলেজে ঢুকে যেভাবে মারধোর-মূর্তি-আসবাবপত্র ভাঙা হয়েছে তাতে পরিষ্কার এটা বাঙালির সংস্কৃতি নয়। বাঙালির

বাঙালিত্ব বাঁচাতেই বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাস্ত করতেই হবে।  বিজেপিকে ডেকে আনলে পরবর্তী প্রজন্মও আপনাকে সেই একই প্রশ্ন করবে যে তখন তুমি কী করছিলে। এই ফ‍্যাসীবাদী শক্তি ভয় পাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ, সুকান্ত, নজরুল কে ইংরেজদের মতো। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগর যেভাবে বিধবা বিবাহ- স্ত্রী শিক্ষার ক্ষেত্রে বাঙ্গালী সমাজ সংস্কারে বাংলা রেনেসাঁয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। 'বর্ণবোধ' প্রকাশের মাধ্যমে তথা তাঁর লেখনী বাংলা সংস্কারের এক জলন্ত উদাহরণ। কিন্তু এরা শ‍্যামাপ্রসাদ, দীনদয়ালের ভূমিকা যুব সমাজের চেতনায় জায়গা দিচ্ছে ক্ষুদিরাম, রামমোহন,রবীন্দ্রনাথ সুকান্তের চেতনাকে ধ্বংস করে।

মূর্তি ভাঙা হয়েছে এটা বড় কথা নয় আসল কথা হলো আমরা বাঙালি জাতির কতটা আবেগের ক্ষতি হয়েছে। মূর্তি ভাঙলেই ভাবাদর্শের ধ্বংস হয়না। এইধরণের ন‍্যাক্কারজনক ঘটনা নিতান্তই ভীরুতার কাজ। এখন প্রশ্ন জাগে, বাঙালি জাতি ঐতিহাসিক ভাবে বিকশিত। এখন এই জাতির ইতিহাস বিকৃত করার লক্ষ্যে বি জে পি'র এজেন্ডা কী সমূলে ধ্বংস করা?

Thursday, May 16, 2019

বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক : প্রসঙ্গে চারু মজুমদার

'বিপ্লবীকে হত্যা করা যায়, বিপ্লবের আদর্শকে নয়’- এই কথাটি এই মানুষটার সারা জীবনের কাজের সাথে মিলে যায়; যিনি আদর্শের জন্য, স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার স্বার্থে, সমাজতন্ত্রের মতাদর্শ থেকে জীবনের অন্তিম পর্যায়েও সরে আসেননি। তাঁর নামটা নিষিদ্ধ মুখে নেয়া। জানি না আজকের প্রজন্মের স্মার্ট ফোন ব্যবহারকারী কিশোর বা তরুণদের মধ্যে কতজন তাঁর সম্পর্কে কতটুকু আলোচনা করেন বা জানেন। কারণ ভারতবর্ষে তাকে নিয়ে চর্চা করা মানে এক অশনিসংকেত। পুলিশের হয়রানি, আর জন সমক্ষে তাঁর নাম উঠলেই মধ্যবিত্তরা হা হা করে তেড়ে আসে। যে দেখিয়েছিলেন দিন বদলের স্বপ্ন ।হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার সেই মহুয়া মাতাল সুরে   চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ছাত্রসহ হাজার হাজার মানুষ নিশ্চিত জীবন ছেড়ে নকশাল বাড়ির রক্তমাখা পথ ধরেছিলেন।মত ও পথের ব্যপক ভিন্নতা থাকলেও বাংলার রাজনীতিতে তিনি এক অবিচ্ছেদ্য নাম।  তিনিই বুঝেছিলেন যে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে এক নয়া গণতান্ত্রিক সমাজ গড়া, এবং শুধু বুঝেই ক্ষান্ত থাকেননি, বরং নিজের হাতে ভারতবর্ষের সর্ববৃহত কৃষি বিপ্লবের আগুন জ্বালালেন তিনি। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে লক্ষ লক্ষ ছেলে মেয়েরা নেমে এলেন দেশের জন্যে জীবন দিতে, কৃষকের মুক্তির জন্যে সংগ্রাম করতে, এবং তাঁরা হাসি মুখে দেশের মুক্তির স্বার্থে প্রাণ বিসর্জন দিলেন। গড়ে তুললেন এক নয়া ইতিহাস যা প্রতিনিয়ত দেশের শাসক শ্রেণীকে আজও আতঙ্কিত করে তোলে।

তাঁর  নাম, চারু মজুমদার, এবং তাঁর নাম আজও মুখে আনা মানা।  কারণ তাঁর হাত ধরেই তো জন্ম নিল এই দেশের কৃষক বিদ্রোহ, তাঁর চোখ দিয়েই তো জনগণ চিনলেন যে সমস্ত ভোট পার্টিগুলি জোতদার - জমিদার আর পুঁজিপতিদের দালাল, তাদের রং আলাদা, ঢং আলাদা, কিন্তু ভিতরে সব ভোট পার্টিই এক। কারণ তিনি যে বিদ্রোহী, তাঁর কথা জানলে মানুষ যে বিদ্রোহ করতে চায়, ভেঙ্গে ফেলতে চায় পঁচা সমাজ ব্যবস্থা কে এবং প্রতিষ্ঠা করতে চায় এক নতুন সমাজ।  তাই চারু মজুমদার এক নিষিদ্ধ নাম, কারণ তার নামে যুক্ত আছে বিদ্রোহ আর বিপ্লব। জমিদার-তনয়ের পোশাকটা অনায়াসে ছুঁড়ে ফেলে যিনি কৈশোর জীবনেই সাম্যবাদী ভাবধারায় দীক্ষিত হন, মানুষের মধ্যে কাজ করাটাই নিজের লক্ষ্য হিসাবে স্থির করেন এবং আজীবন সেই সঙ্কল্প থেকে চ্যুত হন না, তিনিই তো অগণিত নিপীড়িত মানুষের মনে এই ব্যবস্থা বদলের স্বপ্নকে প্রোথিত করবেন।

চারু মজুমদার দেখান যে একমাত্র সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের পথে চলেই ভারতের কৃষক জনসাধারণ মুক্তি লাভ করতে পারেন সমস্ত শোষণ অত্যাচার থেকে এবং ভারতবর্ষকে প্রকৃত ভাবে স্বাধীন করা সম্ভব শুধুমাত্র গণ বিপ্লবের মাধ্যমে। মাও সে তুং এর নীতির ভিত্তিতে তিনি তুলে ধরেন গ্রামে গ্রামে জোতদার -জমিদার ও তাদের পেটোয়া রাষ্ট্র শক্তির বিরুদ্ধে কৃষক যুদ্ধের লাইন, যা ষাটের দশকে লিন বিয়াও এর দ্বারা "জনযুদ্ধের জয় দীর্ঘজীবি হউক" পুস্তিকায় প্রকাশিত হয়। এই লাইনের ভিত্তিতে তিনি রচনা করেন আটটি ঐতিহাসিক দলিলের যা সিপিএমের নির্লজ্জ রাজনীতির স্বরূপ সেই সময় কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে প্রকাশ করে, এবং এই আটটি দলিলের ভিত্তিতেই তিনি নিজে লেগে থেকে গড়ে তোলেন দার্জিলিং জেলার তিনটি থানা অঞ্চলে কৃষকের সশস্ত্র সংগ্রাম।

এই সংগ্রামের স্ফুলিং পরে সারা ভারতে দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পরে যখন যুক্ত ফ্রন্টের গৃহ মন্ত্রী জ্যোতি বসুর পুলিশ ২৫ শে মে ১৯৬৭ তে গুলি চালায় নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষক রমণীদের উপর। ১১ জন কৃষক রমনী, কৃষক ও শিশুর রক্তে সিক্ত নকশালবাড়ির মাটি সারা ভারতবর্ষে নকশালবাড়ির পথে কৃষি বিদ্রোহের আগুন জ্বেলে দেয়, যাকে মাও জেদং এর নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি - ভারতে বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ বলে অবিহিত করে।

ভারতবর্ষ ব্যাপী সশস্ত্র কৃষক সংগ্রামের মধ্যেই মার্কসবাদ -লেনিনবাদ মাও সে তুং এর চিন্তাধারার ভিত্তিতে গড়ে তোলেন এক বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি - সিপিআই (এম-এল) এবং সমগ্র ভারতবর্ষের শাসকশ্রেণীর কাছে এক আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠেন চারু মজুমদার, অন্যদিকে দেশের গরীব খেটে খাওয়া মানুষের জন্যে তিনি হয়ে ওঠেন মুক্তির অগ্রদূত। পশ্চিমবঙ্গের পথে পথে আওয়াজ ওঠে—‘লাঙল যার, জমি তার’, ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’, ‘নকশালবাড়ির পথ বিপ্লবের পথ’, ‘একটি স্ফুলিঙ্গই দাবানল সৃষ্টি করে’- ইত্যাদি। সিপিআই (এম - এল) এর নেতৃত্বে সারা ভারতে গড়ে ওঠে তীব্র সশস্ত্র সংগ্রাম, এবং এই সংগ্রামকে সঠিক ভাবে সার সংকলন করে চারু মজুমদার অতি বাম ও ডান দুই বিচ্যুতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামেন।  কিন্তু অত্যাধিক ভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেনীর প্রতিনিধিরা নানা জায়গায় পার্টির নেতৃত্ব দখল করে বসে এবং সৃজনশীল ভাবে মার্কসবাদী রাজনীতি প্রয়োগ করে জনগণকে বিপ্লবী সংগ্রামে যুক্ত করার জায়গায় গড়ে ওঠে হঠকারী সামরিকবাদী রাজনীতি, যার এক প্রমুখ নেতা ছিল বর্তমানের গণতান্ত্রিক বাম মার্কা অসীম চাটুজ্যে।  এই লাইনের ফলে তীব্র বিচ্যুতির শিকার হয় নকশালবাড়ির পথে গড়ে ওঠা সংগ্রাম।  গরীব - ভূমিহীন কৃষকদের রাজনীতির মাধ্যমে জাগ্রত করার জায়গায় বেশি প্রাধান্য পায় অ্যাকশন এবং চারু মজুমদারের কথা কে বিকৃত করে পরিবেশন করে সিপিআই (এম-এল) এর এক বড় অংশ।

চারু মজুমদার এত সত্বেও সঠিক পথে বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ার লাইনের পক্ষে সংগ্রাম করে গেছেন।তিনি সমরবাদী হঠকারী লাইনের সমালোচনা করে লিখেছিলেন রাজনীতি কে প্রাধান্য দেওয়ার কথা, বলেছিলেন অ্যাকশন বন্ধ থাকলেও ক্ষতি হবে না কিন্তু কৃষকদের রাজনৈতিক ভাবে শিক্ষিত করে জাগিয়ে তোলার কাজ বহু বেশি জরুরি। তাঁর কথার বিরুদ্ধে চলে সিপিআই (এম-এল) ৭১ সালের মাঝে এক বড়সর ধাক্কা খায়। বহু বিপ্লবীর প্রাণ যায় এবং শহীদের মৃত্যু বরণ করেন চারু মজুমদারের ঘনিষ্ঠ সহ যোদ্ধা সরোজ দত্ত।  এই সরোজ দত্তের মৃত্যুর পর চারু মজুমদারের বিরুদ্ধে আক্রমণ তীব্র করে ডান ও বাম দুই বিচ্যুতির উকিলরা, কিন্তু তার মধ্যেই চারু মজুমদার একাই সংগ্রাম চালান সমস্ত রকম সুবিধাবাদীদের বিরুদ্ধে, গড়ে তোলা শুরু করেন পার্টিকে কৃষকের মাঝে, সবার উপরে স্থান দিতে বলেন রাজনীতিকে, এবং সেই রাজনীতির ভিত্তিতে গরীব - ভূমিহীন কৃষকের মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলার শিক্ষা দেন বিপ্লবীদের। চারু মজুমদারের শেষ প্রবন্ধ - "জনগণের স্বার্থই পার্টির স্বার্থ" ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক অনবদ্য রচনা, যা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে কমিউনিস্ট কর্মীদের প্রচন্ড ভাবে সাহায্য করবে নীতি ও কৌশল বোঝার জন্যে। 

কমরেড চারু মজুমদারের রচনাসমগ্র আজ প্রায় দুর্লভ বস্তু। চারু মজুমদারের বিভিন্ন লেখা থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি এখানে তুলে দিলাম---
১। বিপ্লবী কে? বিপ্লবী হচ্ছে সে, যে সমস্যা দেখে অন্যের কাছে ছুটে যায় না, নিজেই সমস্যার সমাধান করে এবং নেতৃত্ব দিতে পারে।
২। আমরা কাজ করতে গিয়ে ভুল করি এবং তা থেকে শিক্ষা নিই, কিন্তু ভুলের ভয়ে কখনোই কাজকে ভয় করি না।
৩। যে স্বপ্ন দেখে না এবং অন্যকে স্বপ্ন দেখাতে পারে না সে বিপ্লবী হতে পারে না।
৪। আমাদের কাজই হলো মানুষকে নিয়ে যন্ত্র নিয়ে নয়। তাই সেই মানুষকে নিয়ে  থাকবে ভয়, দ্বিধা, স্বার্থপরতা, তবু সেই মানুষই লড়াই করবে এবং এই সব কিছুর  বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তাঁকে জয় করে হয়ে উঠবে নতুন মানুষ, যে মানুষ  হবে নিঃস্বার্থপর, আত্মদানের চেতনায় উদ্বুদ্ধ। বিপ্লবীরাও হচ্ছেন মানুষ,  তাঁরা যন্ত্র নন, তাই তাঁরা মানুষের দুঃখ দেখে কাঁদেন, আর কাঁদেন বলেই  তাঁরা পারেন মানুষের দুষমনকে শেষ করতে। বিপ্লবীদের মধ্যেও থাকে দ্বিধা, ভয়,  দ্বন্দ্ব, ভয় এবং স্বার্থপরতা। কিন্তু লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তাঁরা এগুলো  কাটিয়ে ওঠেন; যারা পারে না তারা হয় বসে যায়, না হয় প্রতিক্রিয়াশীল শিবিরে  যোগদান করে। এই সমস্ত কথা মনে রেখেই আমাদের কাজে হাত দিতে হবে। হচ্ছে না  বলে হতাশ হলে চলবে না। মানুষ ছোট ছোট লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে দুর্বলতা কাটিয়ে  উঠেই কেবলমাত্র বৃহত্তর লড়াইয়ের দিকে পা বাড়াতে পারে। তাই লেগে থাকার অর্থই  বিজয়।
৫। এই দুনিয়ায় দুই জাতের মানুষ আছে। এক জাত বাধা দেখলে ছুটে আসে অন্যের  কাছে সাহায্যের জন্য; এরা জীর্ন, এরা পুরাতন, এরা মৃত। অন্য আর এক জাতের  মানুষ আছেন যারা বাধা দেখলে অন্যের কাছে সাহায্যের জন্য ছুটে যান না,  সাহসভরে রুখে দাঁড়ান তার মোকাবিলার জন্য। এরা জীবন্ত, এরা প্রকৃত।
৬। কোন কথার মৃত্যু হয় না। আজ আমরা যা বলছি হয়তো মানুষ আজই তা গ্রহণ  করছে না; তাই বলে আমাদের সে প্রচার ব্যার্থ হচ্ছে না, কথাগুলো মানুষের  মধ্যে থেকে যাচ্ছে।
৭। অন্ধকার দেখে ভয় পেয়ো না, বিচ্ছিন্নতা দেখে সাহস হারিয়ো না, কান পেতে  শোনো মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মহান নেতা চেয়ারম্যানের অভয় বাণী- ‘সত্য  প্রায়শই অল্প সংখ্যক লোকের মধ্যে নিহিত থাকে।‘ বুঝতে চেষ্টা কর  চেয়ারম্যানের মহান উপলব্ধি- ‘জনগন বিপ্লব চান।‘ তোমাদের কোন প্রচেষ্টাই  ব্যর্থ হবে না। পাহাড়ের গায়ে বরফের টুকরোটাকে সরাতে গেলে অনেক ব্যর্থ  আঘাতের পরই সে হঠাৎ এক আঘাতে সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ে; কঠিন ও কঠোর প্রচেষ্টা  ছাড়া কোন কাজ সফল হয় না।
৮) শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারাটাই কমিউনিস্ট হবার একমাত্র  মাপকাঠি নয়। কে প্রকৃত কমিউনিস্ট? যিনি জনগনের জন্য আত্মত্যাগ করতে পারেন  এবং এই আত্মত্যাগ কোন বিনিময়ের প্রত্যাশা করে নয়। দুটো পথ- হয় আত্মত্যাগ,  নয় আত্মস্বার্থ। মাঝামাঝি কোন রাস্তা নেই। চেয়ারম্যান মাওয়ের ‘জনগণের সেবা  কর’- স্লোগানের তাৎপর্য এখানেই। জনগণের সেবা করা ছাড়া জনগণকে ভালবাসা যায়  না। জনগণকে সেবা করা যায় একমাত্র আত্মত্যাগ করেই। প্রকৃত কমিউনিস্ট হতে  গেলে এই আত্মত্যাগ আয়ত্ব  করতে হবে। জনগণকে সেবা করার মানে জনগণের স্বার্থে  বিপ্লবের স্বার্থে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম(unpaid labour) দেওয়া। এই বিনা  পারিশ্রমিকে শ্রম দেওয়ার মধ্য দিয়েই জনগণের সাথে মিশে যাওয়া ঘটবে।  কেবলমাত্র এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই জনগণকে ভালবাসা যায়, জনগণকে সেবা করা  যায়। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিপ্লবীর রুপান্তর(transformation) সাধিত  হয়। তাই বিপ্লব মানে শুধু বৈষয়িক লাভ নয়। বিপ্লব মানে এই রুপান্তর-  উপলব্ধির, আদর্শের, চিন্তাধারার রুপান্তর। বিপ্লব মানে চেতনার আমূল  রুপান্তর। কী সেই চেতনা? জনগণকে সেবা করার চেতনা, আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ  হওয়ার চেতনা, জনগণকে ভালবাসার চেতনা। বিপ্লব মানেই এই রুপান্তর- কি সমাজের,  কি ব্যাক্তির।
৯) বিপ্লব করতে হলে বিপ্লবী কর্মীকে ত্যাগ স্বীকার করতে শিখতে হবে,  ত্যাগ করতে হবে সম্পত্তি ও স্বাচ্ছন্দ, ত্যাগ করতে হবে পুরোনো অভ্যাস এবং  নামের আকাঙ্ক্ষা, ত্যাগ করতে হবে মৃত্যুভয় এবং সহজ পথে চলার চিন্তা; তবেই  আমরা বিপ্লবীদের শ্রমসাধ্য দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করতে  পারবো; তবেই আমরা জনতাকে উদ্বুদ্ধ করতে পারবো মহত্তর ত্যাগে, যার আঘাতে  সাম্রাজ্যবাদ, সংশোধনবাদ এবং ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ধ্বংস হবে এবং  বিপ্লব সফল হবে।
১০) সবসময় মনে রেখো চেয়ারম্যানের শিক্ষা: ভুল রাজনৈতিক লাইন ও ভুল  মিলিটারি লাইনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই একমাত্র সঠিক লাইন প্রতিষ্ঠিত হতে  পারে। অর্থাৎ এই  দুই লাইনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই ক্যাডাররা কোনটা সঠিক  কোনটা বেঠিক তা বুঝতে শিখবে। দ্বান্দ্বিক নিয়মেই এক সবসময় দুইয়ে বিভক্ত হবে  এবং দ্বন্দ্ব স্থায়ী থাকবে। তাই আমাদের ঐক্য, সংগ্রাম ও উন্নত পর্যায়ের  ঐক্য এই পদ্ধতি নিয়েই চলতে হবে। যত উচু থেকেই ভুল লাইন আসুক না কেন তার  বিরোধিতা করতে ইতস্তত করো না। তবে সন্নগ্রামের উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যাপকতর  ঐক্য, এ কথাটিও ভুলো না। আজকের ঐক্য কাল ভেঙ্গে যাবে এটা ঐতিহাসিক নিয়ম।  তাই নতুন শক্তির সমাবেশ ও তার সাথে ঐক্য আমাদের সব সময় লক্ষ্য হবে।  .........নতুন ও পুরাতনের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে নতুনকে সমর্থন করতে  ইতস্তত করো না। অবশ্য নতুনকে তার চিন্তা জগতকে পরিবর্তন করতে হবে।এবং  দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আয়ত্ব করতে হবে। এবং চিন্তাজগতের  বিপ্লবীকরণের কাজে নতুনরা সফল হতে পারে।
চারু মজুমদারের নাম নেওয়া এই দেশে নিষিদ্ধ।  চারু মজুমদার কে স্মরণ করা এই দেশের আইন মোতাবিক বিপদজনক। চারু মজুমদারের নীতিতে বিশ্বাস করা এই দেশের শাসকশ্রেনীর সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া।  তবুও প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ চারু মজুমদারের নাম প্রতিদিন নেন, তাঁর জীবন উত্সর্গ করা কে স্মরণ করেন এবং প্রতিবছর প্রচুর নতুন নতুন মানুষ চারু মজুমদারের নীতিকে সঠিক মেনে ক্ষেতে খামারে খেটে খাওয়া মানুষদের সংগ্রামের সাথে যুক্ত হচ্ছেন রাষ্ট্র ও তার প্রভুদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে। আজ তাঁরা আর বিচার চান না চারু মজুমদারের হত্যার, কারণ হত্যাকারীর কাছে কখনোই হত্যার বিচার আশা করা যায় না। এই নতুন সংগ্রামীরা বুঝেছেন যে শুধু মাত্র চারু মজুমদারের স্বপ্নের ভারত গড়েই তাঁর হত্যার সঠিক বিচার সম্ভব, কারণ চারু মজুমদার এই শাসক শ্রেনীর করুণা চাননি, তিনি চেয়েছিলেন তাদের উত্খাত করতে।

চারু মজুমদার মধ্যবিত্তদের নায়ক হতে চাননি, তিনি কৃষককে - শ্রমিককে নায়ক তৈরী করার লড়াই করে গেছেন। তিনি ছিঁড়ে দিয়ে গেছেন সুবিধাবাদী সংসদীয় রাজনীতির মুখোস, যার ফলে আজ আর ভোট বাদী বাম ও ডান কেউই জনগণকে নির্বাচনী টোপ দিয়ে বেশিদিন ভাঁওতা দিতে পারছে না।  চারু মজুমদারের ফলেই পশ্চিমবঙ্গের তথাকথিত 'বাম' সরকার ঠেলায় পরে নম: নম: করে ভূমিসংস্কারের কাজ সারে এবং কৃষকদের বিদ্রোহ ঠেকাতে তিন স্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা বানায়।  এই সব করা হয় জোতদার ও জমিদারদের কৃষকের বর্ষা মুখ থেকে বাঁচাতে।

অন্যদিকে চারু মজুমদারের নামেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে আজ কৃষক, শ্রমিক,ছাত্র, বিভিন্ন কর্মজীবী মানুষ উঠে দাঁড়াচ্ছেন মার্কিন একচেটিয়া পুঁজির বিরুদ্ধে, বহুজাতিক কর্পোরেটগুলির শোষণের বিরুদ্ধে, জোতদার জমিদারদের বিরুদ্ধে।  রুখে দাঁড়াতে শিখছেন মহিলারা, আদিবাসীরা এবং দলিত জাতির মানুষেরা। তাই আজও চারু মজুমদার শাসক শ্রেনীর কাছে 'আতঙ্কের বস্তু'।

আজ ১৪ মে চারু মজুমদারের জন্ম দিবস উপলক্ষে, এই মহান বিপ্লবীকে  জানাই লাল সেলাম। সবশেষে তাঁর কথায়--
কাদের সাথে আমরা ঐক্যবদ্ধ হবো--
      ১. যারা চেয়ারম্যান মাওকে বিশ্ববিপ্লবের নেতা হিসেবে মানেন এবং তাঁর  চিন্তাধারাকে বর্তমান যুগের সর্বোচ্চ মার্কসবাদ- লেনিনবাদ হিসাবে স্বীকার  করেন।
      ২. যারা বিশ্বাস করেন ভারতবর্ষের সর্বত্রই বৈপ্লবিক অবস্থা বিদ্যমান।
      ৩. যারা বিশ্বাস করেন যে এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এই বিপ্লবের বিকাশ ও অগ্রগতি সম্ভব।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...