"আসল সমস্যা বেকারত্ব, অথচ তা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তাভাবনাই নেই": রঘুরাম রাজন
বেকারত্ব একটি সামাজিক ব্যাধি অথবা সংকট। ইংরেজি আনএমপ্লোয়মেন্ট (Unemployment) শব্দটি থেকে বেকারত্ব শব্দটি এসেছে। একজন মানুষ যখন তার পেশা হিসেবে কাজ খুজে পায় না তখন যে পরিস্থিতির হয় তাকে বেকারত্ব বলে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুসারে, বিগত চার সপ্তাহ ধরে কাজ খুঁজেছে তবে কাজ পায়নি কিন্তু আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কাজ পেতে পারে বা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই বিদ্যমান মজুরিতে কাজ শুরু করবে এমন কর্মক্ষম মানুষকে বেকার বলা হয়৷ অধ্যাপক পিগুর ভাষায়, 'ঐ অবস্থাকেই বেকারত্ব বলা হয় যখন কর্মক্ষম ব্যক্তিরা প্রচলিত মজুরীতে কাজ করতে ইচ্ছুক হওয়া সত্তেও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পায় না।' এখানেও অনিচ্ছাকৃত বেকারত্বের কথাই বলা হয়েছে।
ভারতে বেকারত্ব একটি মুখ্য সামাজিক সমস্যা। এই বেকারত্বের হিসাব রাখা হয় মিনিষ্ট্রি অব লেবার এণ্ড এমপ্লয়মেন্ট এর দ্বারা। ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং কর্তব্য হলো বৈতনিক কর্মসংস্থানের সঠিকভাবে যোগান দেওয়া। কিন্তু সেপ্টেম্বর২০১৮ ভারত সরকারের মতে ৩১ মিলিয়ন মানুষ বেকার হয়। যে সংখ্যাটি অত্যন্ত দ্বন্দ্বের। গত আড়াই বছরের মধ্যে এপ্রিল মাসে শীর্ষে পৌঁছে গেল দেশের বেকারত্ব।
ভারতের অর্থনীতির এখন অন্যতম বড় সমস্যা বেকারত্ব। মানুষ চাকরি চায়। তাই তার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এটাই প্রথম কাজ। এই প্রসঙ্গে শিকাগো তে নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান বলেন, দেশের প্রবৃদ্ধির হার এমন হওয়া উচিত, যাতে তা বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরি করে। যারা স্কুল-কলেজ থেকে বেরোচ্ছেন, যারা কৃষিক্ষেত্র ছেড়ে আসছেন, তারা যেন চাকরির সুযোগ পান। গত সপ্তাহে এক টিভি সাক্ষাৎকারে আসেন আর বি আই'র প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন। এই সাক্ষাৎকারে তাঁর নতুন বই 'দ্য থার্ড পিলার' নিয়ে আলোচনা হয়। তখন সেই সাক্ষাৎকারেই তিনি সাফ জানালেন, এই মুহূর্তে যে ভয়াবহ বেকারত্বের অন্ধকারে ডুবে রয়েছে এই দেশ, তা নিয়ে যেন যথেষ্ট চিন্তাভাবনাই নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। আর সেই কারণেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে 'দুশ্চিন্তায়' রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, নোটবাতিলের মতো যে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন কেন্দ্রীয় সরকার, তার বেশ কয়েকটি পুনরায় পর্যালোচনা করা উচিত।
যে তরুণ প্রজন্ম দেশের সম্পদ হতে পারে, তা যেন ‘অভিশাপ’ না হয়ে দাঁড়ায়। ২০১৭-১৮ আর্থিক বছরে ভারতের বেকারত্ব বেড়েছে ৬.১ শতাংশ৷ গত ৪৫ বছরে যা রেকর্ড৷ দ্য ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে-র সমীক্ষা বলছে, নোটবন্দির পর ভারতে বেকারত্ব বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে৷ গত ৪৫ বছরে এত বেকার তৈরি হয়নি এ দেশে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে তা ধামাচাপা দেয়ার, যা নিয়ে বিরোধীরা ক্রমাগত আওয়াজ তুলছেন। পরিসংখ্যানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন ১০৮ জন অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী। অভিযোগ করেছেন, যে পরিসংখ্যান কেন্দ্রের মনমতো নয়, তা-ই বিভিন্ন মাপকাঠি দেখিয়ে হয় ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে বা বদলানো হচ্ছে। এখনকার কর্তব্য হল ভারতের প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার কত, তা খুঁজে বের করা। আজিম প্রেমজির মতে ভারতে বিমুদ্রীকরণের ফলে ৫০ লক্ষ মানুষ কর্মসংস্থান হারায়।
এপ্রিলের প্রথম তিন সপ্তাহে ভারতে গড় বেকারত্বের হার ৮.১ শতাংশ। থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক সিএমইআই অথবা সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমির পক্ষ থেকে জানানো হল এই কথা। দেশে বেকারত্বের হার এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ছিল ৭.৯ শতাংশ, দ্বিতীয় সপ্তাহে ছিল ৮.১ শতাংশ এবং তৃতীয় সপ্তাহে হয় ৮.৪ শতাংশ। একটি বিবৃতি পেশ করে গত ২৩ এপ্রিল এই তথ্য জানায় সিএমইআই। এই কথাও জানানো হয় যে, “মার্চের প্রতিটি সপ্তাহে দেশে বেকারত্বের হারের থেকে এপ্রিলের সপ্তাহগুলিতে বেকারত্বের হার বেশি। যার ফলে ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে গড় বেকারত্বের যে হার ছিল ৬.৭ শতাংশ, তার পরিমাণ এপ্রিলের শেষে গিয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে”।
গত জানুয়ারি মাসে কর্মসংস্থান নিয়ে সরকার ডেটা প্রকাশ করতে পারেনি৷ যার নির্যাস, ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল কমিশনের দু জন স্বাধীন সদস্য পদত্যাগ করেছেন৷ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নোটবন্দি ঘোষণা করার পর এই প্রথম কোনও সরকারি সংস্থা কর্মসংস্থান নিয়ে সমীক্ষা চালাল৷ ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের জুনের মধ্যবর্তী সময়ে তথ্য সংগ্রহ করে পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে করা হয়েছে৷ তাতে দেখা গিয়েছে, ১৯৭২-৭৩ সালের পর থেকে বেকারত্ব এই হারে বাড়েনি৷ ২০১১-১২ সালে ইউপিএ সরকারের শেষ দফায় বেকারত্বের হার ২.২ শতাংশ৷ রিপোর্ট বলছে, দেশের মোট জনসংখ্যার নিরিখে যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি৷ দেশের গ্রামীণ এলাকায় ২০১১-১২ সালে যেখানে বেকারত্বের হার ছিল ৫ শতাংশ, ২০১৭-১৮ সালে তা বেড়েছে ১৭.৪ শতাংশ৷ গ্রামীণ এলাকায় মহিলাদের মধ্যে বেকারত্ব বেড়েছে ১৩.৬ শতাংশ৷ ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) তাদের বার্ষিক ‘ওয়ার্ল্ড এমপ্লয়মেন্ট সোশ্যাল আউটলুক -ট্রেন্ডস ২০১৮’ রিপোর্ট প্রকাশ করে জানিয়েছে, এ বছর ভারতে বেকার যুবক -যুবতীর সংখ্যা দাঁড়াবে ১.৮৬ কোটি এবং ২০১৯ সালে ওই সংখ্যা হবে ১.৮৯ কোটি৷ গত বছর (২০১৭) শেষে দেশে মোট ১.৮৩ কোটি বেকার ছিল৷ কিন্ত্ত , ২০১৬ -এর রিপোর্টে প্রাথমিকভাবে ওই সংখ্যা ২০১৭ সালে ১.৭৭ কোটি এবং ২০১৮ সালে ১.৭৮ কোটি হবে বলে অনুমান করা হয়েছিল৷ অর্থাত্, ২০১৭ সালে দেশে অতিরিক্ত ৬ লক্ষ (= ১.৮৩ কোটি- ১.৭৭ কোটি) মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন৷ এছাড়া, সিএমইআই এই তথ্যও দিল যে, ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত গোটা দেশে বেকারত্বের হার ৭.৫ শতাংশ। দেশের শহরগুলোতে এই হার ৭.৬ শতাংশ এবং দেশের গ্রামাঞ্চলে এই হারের পরিমাণ ৭.৫ শতাংশ। গত আড়াই বছরের মধ্যে যা পৌঁছাল শীর্ষস্থানে।
অনিচ্ছাকৃত বেকারত্ব সংঘটনের কারণ বহুবিধ। কিন্তু সেগুলিকে সহজেই বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করা যায়, যেমন মৌসুমি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, শ্রম বাজারের ভারসাম্যহীনতা, ব্যবসায় চক্র এবং সম্পূরক সম্পদের অভাবজনিত বেকারত্ব। চড়া মৌসুমে কৃষি শ্রমিকের ব্যাপক চাহিদার সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মৌসুমে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক কাজ পায় না। জুন এবং জুলাই মাসে কৃষি শ্রমিকরা সবচেয়ে ব্যস্ত থাকে। এ সময় গড়ে দিনের দশ ঘণ্টা কাজ চলে। মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে কৃষি শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ পরিমিত এবং সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে তা দুর্লভ। কৃষি ছাড়াও শিল্প এবং নির্মাণ খাতেও মৌসুমি বেকারত্ব বা আংশিক বেকারত্ব বিদ্যমান। খুচরা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে উৎসব-অনুষ্ঠানাদিতে কর্মসংস্থানের হঠাৎ ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটে এবং তার অব্যবহিত পরেই বড় ধরনের বেকারত্ব দেখা যায়।
বেকারত্বের উর্দ্ধগতির বিভিন্ন কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।প্রথমতঃ কৃষিক্ষেত্রে অমনোযোগীতা। মৌসুমী বায়ুর উপর নির্ভরশীলতা এবং সরকারি নীতি। একটা খারাপ মৌসুমী বায়ুর প্রভাব মানে ফলনে নিম্নগামী এবং কৃষকের আয়ের ক্ষেত্রে ঋণের বাধ্যবাধকতা যা অত্যন্ত চূড়ান্ত যার ফলস্বরূপ কৃষকের আত্মহত্যা। আর যদিও ফলন ভালো হয় তবুও ফসলের নিম্ন দাম যা অফলপ্রসূ নূন্যতম ন্যায্য মূল্য(MSP)। এই নিম্ন আয়ের জন্য কৃষককে বিভিন্ন ধরনের অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। ফলে কৃষক সন্তান রা চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং শহরমুখী কর্মসংস্থানের খোঁজে কৃষিক্ষেত্র ত্যাগ করে। যার ফলস্বরূপ ছদ্মবেশী বেকারের সৃষ্টি হয়।
দ্বিতীয়ত, জি এস টি (GST)র ফলে, গ্রামীণ এলাকায় ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ(SME) গুলোতে শ্রমিকের উত্থান অর্থাৎ কর্মসংস্থানের জায়গা দিতে অক্ষম পুরো বছর ধরে। যথোপযুক্ত শিক্ষার অভাবে প্রচুর পরিমাণে অব্যবস্থিত স্বনির্ভরতা চরম দুর্দশায়। আর বিমুদ্রীকরণ যার ফলে ব্যবসায় এক নজিরবিহীন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যাহা বেকারত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
তৃতীয়, প্রব্রজনের ফলে শহরাঞ্চলে রিয়াল ইস্টেট সেক্টরে প্রচুর লোক নেওয়া হয় যেখানে কর্মকুশলতার অভাব দেখা যায়। এই প্রবণতা অতিত থেকে একইভাবে চলে আসছে। বিমুদ্রীকরণের পর অর্থাৎ ২০১৭-১৮ সালে রিয়েল ইস্টেট আইন ২০১৬ (RERA) আওতাভুক্ত করা হয়। কিন্তু এই বিমুদ্রীকরণের ফলে প্রত্যক্ষ মন্দীভূত হয় রিয়েল ইস্টেট বিভাগ-- বিশেষ ভাবে ব্যবসায়ীক এবং ব্যয়বহুল গৃহ প্রকল্প সমূহ। নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদাসীনতা দেখা যায়। এই ধরণের মিথস্ক্রিয়ার ফলে কর্মসংস্থানের দুষ্প্রাপ্যতা বৃদ্ধি হয় এবং কর্মক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতা তার গণ্ডির ভেতরে থাকে।
চতুর্থ, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বেকারত্বের তা হলো, কল্পিত আত্মসম্মান। অর্থাৎ, আজকাল ডিগ্রীধারি যুবকরা নিম্ন-দক্ষতা পূর্ণ কাজে অগ্রাহ্যতা দেখায়। কিন্তু কথা হলো বিগত কয়েক বছর ধরে ভারতের অর্থনীতির গতি ৮% এর উপরে নয়। শ্রমিক চাহিদা সীমাবদ্ধ প্রচুর পরিমাণে-- ইঞ্জিনিয়ার, মেনেজমেন্ট গ্রেজুয়েট,এবং অন্যান্য পেশাদারিযোগ্যতাসম্পন্ন কার্যনিরত ব্যক্তিগন বেকার। সেইজন্য চাকুরীর লড়াইয়ে যেমন সুপারমার্কেট,কলকারখানাতে উচ্চ ডিগ্রিধারীরা মাথাগুজে আছে। আর প্রচরণশীল শ্রমিকরা এই পেরামিটারে আসতে পারছে না।
বেকারের আত্মপরিচয় সংকট: একজন বেকারকে যখন কেউ প্রশ্ন করে, তুমি কী কর?- প্রশ্নের উত্তর দিতে তার বিব্রতবোধ হয়। কারণ সার্টিফিকেট ফাইলবন্দী করা, পে-অর্ডার আর ব্যাংক ড্রাফট করা, সার্টিফিকেট ও সিভি ফটোকপি করা, সাপ্তাহিক চাকরির পত্রিকা কেনা, মাসিক কারেন্ট এ্যাফেয়ার্স কেনা, দৈনিক পত্রিকাগুলোতে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখা, প্রতিদিন মোবাইলে জবস্ এলার্ট কিংবা জবস্ ওয়েবসাইট দেখা, প্রতিদিন নিজের ইমেইল আইডির ইনবক্স দেখা ও সিভি সেন্ড করা, কখনো সাইব্যার ক্যাফেতে বসে অনলাইনে ফরম পূরণ করা আর এডমিট কার্ড ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি প্রিন্ট করা, ফেসবুকে বিভিন্ন জব সংক্রান্ত গ্রুপ গুলোর পোস্ট দেখা-এসব নানান কাজ। এর বাইরেও অনেকে খেয়ে না খেয়ে গ্রুপ স্টাডি করেন, পড়ার জন্যে পাবলিক লাইব্রেরী পর্যন্ত যান, কিংবা ফটোকপি দোকানদারদের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে, ফোন করে হলেও কোচিং সেন্টার গুলোতে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তির আশায় ভিড় করেন- তারপরও চাকরি নামের সোনার হরিণ কপালে জুটেনা।
সরকার যদিও দাবি করে যে আর্থিক অবস্থা যদিও উন্নতি হয়েছে ৭ থেকে ৮%। যেখানে বিনিয়োগ নিম্নগামী,অচলাবস্থায় রপ্তানি, কর্মসংস্থানের সুযোগ না করে উৎপাদন বিস্ফোরণ ঘটছে। কিন্তু পোক্ত ভাবে বলা হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। অর্থমন্ত্রী পিযুষ গোয়েল বলেন ২ কোটি প্রভিডেন্ট ফাণ্ড (EPFO) বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার দাবি করে বলছে যে কর্মসংস্থানের ধরণ পাল্টে দিয়েছে। 'ওলা','উবের' এগুলো হলো নতুন একটা কর্মসংস্থান। তার সাথে আছে আমাজন বা ফ্লিপকার্ট এর ডেলিভারি বয়।
বেকার সমস্যা সমাধানে কিছু পরামর্শ নিম্নরূপ--
১) শৈল্পিক প্রয়োগ-কৌশলের পরিবর্তন--
উৎপাদন কৌশলের সঠিক প্রয়োগ জানতে হবে যা বর্তমানে প্রয়োজনীয় দেশে। ইহা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে প্রয়োগ-কৌশলে শ্রমিকদের গুরুত্ব দেয়া পুঁজিবাদী প্রয়োগ-কৌশলের বিপরীতে।
২) মৌসুমী বেকারদের প্রতি নীতিমালা প্রণয়ন--
মৌসুমী বেকারত্ব বিশেষ করে পাওয়া যায় কৃষি ক্ষেত্রে ও কৃষি সংক্রান্ত উদ্যোগে। এই সমস্যা সমাধানে--
ক) কৃষিক্ষেত্রে বহুবিধ ফসল উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে।
খ) বাগান, হর্টিকালচার,পশু পালন,খামার প্রকল্পের উৎসাহ প্রদান করা।
গ) কুঠির শিল্পের বিকাশ করা।
৩) শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন---
শৈক্ষিক প্রণালীর পরিবর্তন করতে হবে। উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করার জন্য ছাত্রদের উৎসাহ করতে হবে। ভোকেশনাল শিক্ষার প্রসার তথা যোগ্যতা সম্পন্ন ইঞ্জিনিয়াররা যাতে নিজস্ব ছোট ইন্ডাস্ট্রি করতে পারে সেইদিকে আগ্রহ প্রদান তার সাথে সরকার কর্তৃক সকল ধরনের সাহায্য করা।
৪) স্বনির্ভর ব্যক্তিদের উৎসাহ প্রদান--
ভারতে প্রচুর ছেলেমেয়েরা স্বনির্ভর। তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে-- কৃষি, ছোট উদ্যোগ, ব্যবসা ইত্যাদি নিজের পায়ে খাড়া করেছে। এখানে সরকারের দায়িত্ব হলো এই ছেলেমেয়েদের আর্থিকভাবে সাহায্য করা,কাঁচামাল সরবরাহ করা,প্রয়োগ-কৌশলে ট্রেনিং দেয়া।
৫) উৎপাদনশীল নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা--
আমাদের দেশে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চাকরির সুযোগ সুবিধা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা। সেইজন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রগতিশীল নীতি গ্রহণ করতে হবে।
৬) উৎপাদনে বৃদ্ধিকরণ--
নিয়োগের সাথে সাথে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে কৃষি ও উদ্যোগিক ক্ষেত্রে। ছোট এবং কুঠির শিল্পের উৎসাহ প্রদান করতে হবে।
৭) পুঁজির গঠন--
খুব দ্রুত উচ্চ হারে মূলধন গঠন করা। খেয়াল রাখা যাতে উৎপাদন মূলধন অনুপাত মিল থাকে।
৮) কো-ওপারেটিভ শাখায় উদ্যোগিক ব্যবস্থা--
কো-ওপারেটিভ শাখায় উদ্যোগিক প্রণালী খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমরা যদি কেরালার দিকে নজর দেই তবে দেখা যায় কেরালা সরকার ৬০০'র বেশি কর্মী নিয়োগ দিয়েছে কো-ওপারেটিভ ভিত্তিতে। ইহা একটি অভূতপূর্ব উপাগম যা বেকারত্ব নির্মূলে সাহায্য করবে। সেইভাবে আরও বিভিন্ন ধরনের উপায় অবলম্বনে অন্যান্য রাজ্য সরকার গ্রহণ করতে পারেন।
৯) উদ্যোগিক কার্যকলাপে বিকেন্দ্রীকরণ--
উদ্যোগিক কার্যকলাপে বিকেন্দ্রীকরণ বেকার সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে।যদি উদ্যোগিক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত থাকে তবে নিয়োগের ক্ষেত্র সংঙ্কূচিত থাকে। উন্নতশীল দেশে এইধরণের ব্যবস্থা অনুকূল পরিবেশ নয়। তাই সরকারকে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে বিকেন্দ্রীকরণের জন্য।
১০) জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ--
বেকার সমস্যা সমাধানে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সর্বক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা একান্ত প্রয়োজন।
ভারত সরকার এই বেকারত্ব নির্মূলের জন্য যদিও বিভিন্ন ধরণের পদক্ষেপ হতে নিয়েছে। 'মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ রোজগার যোজনা, ন্যাশনেল কেরিয়ার সার্ভিস স্কীম, কৃষিক্ষেত্রে অত্যাধুনিক প্রকল্প, ছদ্মবেশী বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান ইত্যাদি যদিও ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এর কতটুকু যথোপযুক্ত যায়গায় কাজে লেগেছে!
বেকারত্বের এই সমস্যা-সংকট দেশে একদিনে তৈরি হয়নি। এই মূহূর্তে বেকারত্ব নিরসন যেমন অপরিহার্য, তেমনি ভবিষ্যতে বেকারত্ব কোন পর্যায়ে পৌছতে পারে, তার নিরিখে আগাম ব্যবস্থা গ্রহণও সমভাবে প্রয়োজনীয়। বেকারত্বের হার বেড়ে ভারতের স্থান এখন ৯৬ (৮.৮%)। বর্তমানে দেশে জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই যুবা এবং তাদের মধ্যে ৪০ থেকে ৪২ ভাগই বেকার। বেকারত্বের হার নিরশনের জন্য যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের দিতে হবে। আমাদের অর্থনীতি, বেকারত্ব এবং আই এমএফ ও দাতাদের দ্বারা আমাদের “মুরগী” বানানোর প্রক্রিয়া যদি আমরা বুঝি এবং আমরা যদি জেগে না ঘুমাই- তাহলে আমাদেরও উচিৎ কর্মসংস্থান ও সামাজিক খাতে সর্বোচ্চ বিনিয়াগ নিশ্চিত করে অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী করা। এর জন্য প্রয়োজনে ঘাটতি বাজেট অনুসরণ করা এবং উদার আমদান নীতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা। বেকারত্ব শুধু একটি সরকারকে নয়, একটি দেশকেও বিপদে ফেলতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ইন্ধনদাতার অভাব হবে না। তাই আসুন আমরা সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে গুরুত্ব দেই, সামাজিক ব্যবসায় উৎসাহী হই এবং বেকারত্বের অসহায়ত্বমুক্ত সমৃদ্ধ এই ভারত গড়ে তুলি।