Sunday, July 30, 2023

উনিশে মে'র ভাবনা ও আমাদের দায়ভার


‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় উনিশ’ - ১৯ শে মে। ১৯৬১ সাল। আজ প্রায় ৬২ বছর অতিক্রান্ত। আসামের বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা রক্ষার্থে এক অস্তিত্বের লড়াই। আচ্ছা সত্যিই কি আমরা ‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় উনিশ’ নিয়ে ঘুরছি। এখন চারদিকে যে আগ্রাসনের পালা – কীর্তন চলছে এতে মুটেই আশ্চার্যান্বিত হওয়ার কথা নেই। দেশজুড়ে আজব কার্নিভাল – জোর করে বিহু উৎসব গিলানো হচ্ছে, আর সঙ্গে তো আছেই চরম মিথ্যাচার, প্রতারণা আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকা। বড় দুঃখ হয় আর ক্রোধে গা জ্বলে ওঠে যখন দেখি, আমরা কোন অনুষ্ঠানে অসমিয়া আধিপত্যবাদের প্রতীক গামছা গলায় ঝুলিয়ে খুব লম্ফঝম্ফ করতে। তাইতো আমাদের অতি প্রিয় কবি দিলীপকান্তি লস্কর তাঁর কবিতায় অতি সুনিপুণভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন – 
আমি কোত্থেকে এসেছি,/তার জবাবে যখন বললামঃ/করিমগঞ্জ, আসাম। / তিনি খুশিতে ডগমগ হয়ে বললেনঃ / বাঃ। বেশ সুন্দর বাংলা বলেছেন তো !/একজন শিক্ষিত তথা সাহিত্যিকের যখন/এই ধারণা,/তখন/আমি আর কি বলতে পারিঃ / ওকে ঠিক জায়গাটা ধরিয়ে দিতে গিয়ে বললাম- / বাংলাভাষার তের শহিদের/ভূমিতে আমার বাস; / তখন তিনি এক্কেবারে আক্ষরিক অর্থে-ই / আমাকে ভির্মি খাইয়ে দিয়ে বললেনঃ /ও ! বাংলাদেশ? তাই বলুন।

আজকাল প্রায় হাতেগোনা কয়েকটি ভাষা ছাড়া বাকি সব ভাষাই বিপন্নের দিকে। জার্মান ল্যাঙ্গুয়েজ সোসাইটি বিশ্ব সমীক্ষা করে যে তথ্য উল্লেখ করেছে তাতে পৃথিবীতে বর্তমানে ছয় থেকে সাত হাজার ভাষার অস্তিত্ব সংকটে। একদিকে আগ্রাসন আর অন্যদিকে বিলুপ্তির শঙ্কা। এই বিলুপ্তি আর আগ্রাসনের পেছনে নানাবিধ আর্থসামাজিক কারণ রয়েছে। (কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস বলেছেন, "Language, like consciousness, only arises from the need, the necessity of intercourse with other man." (Marx, 1964, The German Ideology Moscow, quoted by Berezin, op.cit, Footnote 1, Page-161) তাঁরা এ-ও বলেছেন যে, ভাষা হল “... the immediate reality of thought... Practical...actual consciousness.” (তদেব) মার্ক্স আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, "Ideas do not exist divorced from language." (Sondel Ben, 1958, The Humanity of Words, New York, The world Publishing Company, Page 180)" ভাষাবিজ্ঞানের এই সূত্রগুলোকে ভিত্তি করে এ-কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ভাষা-আগ্রাসন মানে মানুষের চিন্তা-চেতনা-অনুভবকে আগ্রাসন, ভাষা-বিলুপ্তি মানে এগুলোর বিলুপ্তি।

'ভাষা-সংগ্রামের বহুমুখী মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়ন করে বুঝি, বৃহত্তর গণসংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গ হল ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বরকত-সালাম-জব্বারেরা শহিদ হয়েছিলেন বলেই ধাপে ধাপে তৈরি হয়েছিল ১৯৭১ সালে বাংলা নামে দেশের জন্ম-লগ্ন। ইতিহাস ও ভূগোলের যৌথ আক্রমণে বরাক উপত্যকা (আসামের দক্ষিণ অংশে সাবেক কাছাড় জেলা) যেহেতু প্রান্তিকায়িত হয়ে পড়েছিল, তার গভীর সর্বাত্মক সংকট কখনো তেমন মনোযোগের বিষয় হয়ে ওঠেনি। বহুদিন আগে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। ঐতিহ্যগত ভাবে শ্রীহট্ট বা সিলেট বৃহত্তর বঙ্গভূমির অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া সত্ত্বেও ধূর্ত ব্রিটিশ ১৮৭৪ সালে তাকে আসামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল। এতে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা-নির্ভর রাষ্ট্রযন্ত্র রাজস্বখাতে অনেকটা লাভবান হল যদিও, ‘বাঙালির আধিপত্য’ নামক জুজুর ভয় দেখতে শুরু করল কেউ কেউ। ক্রমান্বয়ে বিদ্বেষ-বুদ্ধির বিষবৃক্ষে শুধু জল সেচনই করা হল। দেশ বিভাজনের সময় গণভোটে সিলেট আসাম থেকে সরে গিয়ে যুক্ত হল পূর্ব পাকিস্তানে। শুধু সাবেক সিলেটের পূর্ব প্রান্তের কিছু অংশ যুক্ত হল দেশভাগ পরবর্তী কাছাড় জেলার সঙ্গে। এই নতুন কাছাড় ভৌগোলিক-সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিকভাবে কিন্তু বৃহত্তর বঙ্গভূমিরই অংশ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এই ভূমিও মমতা-বিহীন কালস্রোতে বাংলার রাষ্ট্রসীমা হতে নির্বাসিত। বহু শতাব্দী থেকে বাঙালিদের নিরন্তর প্রব্রজন চলেছে এখানে, বাংলাই এখানকার ভাষা—কী সাহিত্যে কী গণসংযোগের মাধ্যম হিসেবে। ইতিহাসের বিচিত্র জটিলতায় তা আসামের অঙ্গ হলেও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সঙ্গে এর কোনো আত্মিক সংযোগ কখনও ছিল না।' (তপোধীর ভট্টাচার্য, সময় অসময় নিঃসময় ২০১০ (পৃ. ৫০–৫৯) https://bn.m.wikisource.org)

জাতীয় স্তরে হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থানের ধ্বজাধারীরা হিন্দি ভাষাকে যেভাবে শুশ্রূষা করছে তাতে পরিষ্কারভাবে এটা বলাই যায়, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুকান্ত-জীবনানন্দ-সুভাষচন্দ্রের মাতৃভাষাকে “নানা ভাবে শেষ করে দেবার ফেসিষ্ট সুলভ আগ্রাসন” চালানো হচ্ছে। (বাঙালির দাবিপত্র, নীতিশ বিশ্বাস, ২৯ মার্চ ২০১৯) “তার প্রমাণ কেন্দ্রীয় বাজেটে ভারতের ২য় প্রধান ভাষিক জনসংখ্যার ভাষা হওয়া সত্ত্বেও গত ৭০ বছরে তার জন্য একটি টাকাও বরাদ্দ করা হয়নি।” (তদেব) বরং 'বাংলাভাষী মানে বাংলাদেশি’ এরকম প্রচার চালানো হচ্ছে আসাম সহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। আশ্চর্যের বিষয়, “NCERT-র বইয়ে রাজ ভাষার ছদ্মবেশে
ছাত্র-ছাত্রীদের শেখানো হচ্ছে হিন্দি রাষ্ট্র ভাষা"। (তদেব) গুজরাট হাইকোর্ট ১৩ অক্টোবর ২০১০ তারিখের রায়ে জানিয়েছে," There is nothing on the record to suggest that any provision has been made or order issued declaring Hindi as a national language of the country." ( সংবিধান ও বাংলা ভাষা, তৃতীয় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৯, – তদেব)

আমাদের বাসস্থান আসামে হলেও অসমিয়া আগ্রাসনের শিকার বহু আগে থেকেই। ১৯৬১ সালের ১৯শে মে ১১ টি তরতাজা প্রাণ শহীদ হন শিলচরে। ১৯৭২ এর ১৭ই আগস্ট করিমগঞ্জে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু চক্রবর্তী)। ১৯৮৬র ২১ জুলাই করিমগঞ্জে শহীদ হন জগন্ময় ও যীশু। ১৯৯৬ এ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার রক্ষায় করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে শহীদ হন সুদেষ্ণা সিনহা। আসামে ভাষিক সংখ্যালঘুরা এভাবে বারবার ক্লান্ত হচ্ছে অসমিয়া আগ্রাসন দ্বারা। নিপীড়িত হচ্ছেন ডি–ভোটারের তকমায় ডিটেনশন ক্যাম্পে আবার কখনো বা  উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির সুকৌশল ভাষিক আগ্রাসন নীতির মাধ্যমে। জাতীয়তাবোধ জাগরনের পেছনে যে উপাদানটি সার্বিক প্রয়োজন সেটি হলো এক সম্মিলিত ঐতিহ্যবোধ। বর্তমান সময়ে নব প্রজন্ম উনিশে মে শহীদের ধর্মের মাধ্যমে বিচার করে এরা হিন্দু না মুসলমান। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে এতটাই গুলিয়ে ফেলেছি, ভুলে গেছি কোন উৎসব কার। এনআরসি তে কার জয় হলো – মুসলিম খেদা না হিন্দু সুরক্ষিত। কিন্তু আমরা এসব কি করছি? মাতৃভাষা, জাতিসত্তা, সংস্কৃতি, প্রজন্ম‌ অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে যাচ্ছি না তো! 'উইপোকা', 'ঘুসপেটিয়া' তির্যক বিশেষণে যারা ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যু শিবিরে এদের কাছে নতজানু হচ্ছি না তো! এসব বিভাজনের রাজনীতি করে যারা হিন্দু – মুসলমান বাঙালীরা একবারও কি মনে প্রশ্ন জাগে আগামীদিনে ১৯শে মে কোন অনুষ্ঠানও কি করতে পারবো?

ভাষিক গোষ্ঠীর সংখ্যার বিচারে বাংলায় কথা বলতে পারেন পৃথিবীতে এর স্থান চতুর্থ। খুবই দুঃখজনক যে বাংলা সাহিত্য চর্চায় ভবিষ্যতে কতজন পাঠক পাওয়া যাবে কি না তা সন্দেহ। বরাক উপত্যকায় বাংলা মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীরা সরকার পরিচালিত বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে থাকে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন 'মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ সম'। মাতৃভাষা ছাড়া একজন মানুষের আত্মপরিচয় হয় না। সেইজন্য বাংলা ভাষা বিষয়ে পড়াশোনার প্রয়োজন। কিন্তু বাংলা ভাষাটা পড়াবার জন্য বরাকে সরকার পরিচালিত বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদগুলো প্রায় ৮০শতাংশ শূন্য। আধিপত্যের ষড়যন্ত্রে অগ্রগতির পথে অস্তিত্ব সংকটে।

যেকোনো ভাষা আয়ত্ব করা খুবই ভালো। তবে সেটা কোন ভাবেই নিজের মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে নয়। আজ ভাষার অস্তিত্ব যে আগ্রাসিত হচ্ছে এর পেছনে কিন্তু আমরাই দায়ী। আমরা যখন নিজেদের উনিশের উত্তরাধিকার বলে দাবি করি কিন্তু আমাদের সন্তানেরাই বাংলা জানে না। সুস্থ পরিকাঠামোর মাধ্যমে মাতৃভাষা চর্চার জন্য প্রয়োজন নতুন কর্মপদ্ধতি। তাই জরুরি ফ্যাসিবাদী ভাইরাসকে উপড়ে ফেলা। নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে ১৯৬১,৭২,৮৬,৯৬র রক্তাক্ত ইতিহাস। পরিচয় করাতে হবে এনআরসি,ডিটেনশন ক্যাম্প, ডি-ভোটার দিয়ে কিভাবে আমাদের টুকরো টুকরো করার কথা। ১৯শে মে মানে প্রতিরোধ এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম। বাঙালি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়তে হবে আধিপত্যবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে। নইলে সমবেত আত্মহনন ছাড়া উপায় নেই। ভাষা আন্দোলনের চলমান সংগ্রামী চেতনায় আমাদের বিবেক জাগ্রত হোক – কাঙ্ক্ষিত আশা এখন। যেভাবে প্রখ্যাত কবি শ্রী সুরেশ চন্দ্র চক্রবর্তী তাঁর 'শহীদ তর্পন' কবিতায় বলেছেন —
আমরা নওজোয়ান আমরা নওজোয়ান/আজি গাহিব শহীদ তর্পন গান/আমরা নওজোয়ান।/ ভাষা বেদি মূলে দিল যাঁরা প্রাণ/অপূর্ব আত্ম-বলি-দান/গাহিব তাঁদের তর্পন-গান/আমরা নওজোয়ান।/ ওই দেখো কমলা, শচীন্দ্র, কানাই,/হিতেশ, সুকোমল আর চন্ডী ভাই/কুমুদ, সুনীল, বীরেন, সত্যেন,/শহীদ তরণী – করে আনচান।/দুঃখ আজি নয় নয় রে শোক/ পাষাণেতে বাঁধ বাঁধেরে বুক/ শহীদ - তর্পণ- শপথ আজি—/ 'ভাষার লাগি দিব রে জান।'/ আমরা নওজোয়ান। (ভাষা আন্দোলনের শহীদ সত্যাগ্রহী)

বার্তালিপি ১৬-০৫-২০২৩ ইং 

Sunday, July 16, 2023

আধুনিক দাসত্ব : 'স্বাধীনতাহীনতায়' সভ্য সমাজ


স্বাধীনতা এবং দাসত্ব জীবনের দু’টি অঙ্গ। কবি এক জায়গায় লিখেছেন, ‘দাসত্ব শৃঙ্খল বলো কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়?’ কবি রঙ্গলাল তাঁর কবিতায় মানব জীবনের একটি গভীর আকাঙ্ক্ষার কথা ব্যক্ত করেন। সম্ভবত স্বাধীনতার এ আকাঙ্ক্ষা মানুষের সহজাত। প্রভাবশালী দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট তাঁর বিখ্যাত 'থিওরি অব হিউম্যান নেইচার'-এ বলেন, কর্ম সম্পাদনের জন্য দরকার বাইরের সবকিছু থেকে মুক্ত হওয়া। গত কয়েক বছরে গোটা বিশ্বে 'আধুনিক দাসত্ব' ব্যবস্থা বেড়ে গিয়েছে। প্রায় প্রতিদিন বিশ্বের বহু শিশু, নারী, পুরুষ, প্রবীণ এই সভ্যযুগীয় দাসপ্রথার বলি হচ্ছেন। কখনও গোচরে, কখনও অগোচরে। গ্লোবাল স্লেভারি ইনডেক্স ২০২৩-এ আধুনিক দাসদের বসবাসকারী দেশগুলির একটি তালিকা তৈরি করা হয়। এরা এমন মানুষ, যাদের কাজের কোনও কর্মঘণ্টা নেই, নেই কোনও নির্দিষ্ট বেতনও। সূচকে বলা হয়েছে, বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ দাসের মতো জীবনযাপন করছে। আধুনিক দাসত্বের ব্যাখ্যা হলো — জোরপূর্বক শ্রম, ঋণ, জোরপূর্বক বিয়ে-দাসত্ব, মানব পাচারের মতো কয়েকটি প্রথা। দাসত্বের সংজ্ঞা এবং প্রকৃত চিত্রের সাথে এর সামঞ্জস্য নেই। কারণ, দাসত্বের শৃঙ্খল এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লুক্কায়িত। যে মানুষ নিজেকে ‘স্বাধীন’ বলে দাবি করছে, সে দিনের শেষে দেখতে পাচ্ছে এক অদৃশ্য শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রিত করছে তাকে।

বিশ্বজুড়ে আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকা পড়া মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী ও শিশুরা। সভ্যসমাজের আধুনিক দাসত্বের নেপথ্যে রয়েছে, দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে শ্রমিক হতে বাধ্য করা, ঋণখেলাপিকে ক্রীতদাসে পরিণত করা, জোর করে বিয়ে, সাধারণ দাসত্ব এবং দাসত্বের অনুরূপ কাজকারবার। রিপোর্টে বলা হয়েছে, আধুনিক দাসত্বের মধ্যে ২ কোটি ৭৬ লক্ষ মানুষ বাধ্যতামূলক শ্রমে যুক্ত। আর, জোরপূর্বক বিবাহের শিকার হয়েছেন ২ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ। আধুনিক যুগীয় দাসত্ব চোখে দেখা যায় না। খালি চোখে বোঝাও যায় না। এই ব্যবস্থা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও সমাজের গভীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু খণ্ডাংশে নয়, গোটা পৃথিবীতেই সূক্ষ্মভাবে গোপনে আমাদের দাসত্বে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রতিদিন মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে, বাধ্য করা হচ্ছে অথবা জোর করে শোষিত হওয়ার পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে মানুষকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, যেখান থেকে তার নিষ্কৃতি বা পরিত্রাণের কোনও উপায় নেই।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, 'আধুনিক দাসত্ব সরল দৃষ্টিতে লুকিয়ে আছে। এটি বিশ্বের প্রতিটি কোণে জীবনের সাথে গভীরভাবে জড়িত। প্রতিদিন, মানুষ প্রতারিত, জোরপূর্বক বা শোষণমূলক পরিস্থিতিতে পড়তে বাধ্য হচ্ছে।' ‘গ্লোবাল স্লেভারি ইনডেক্স’ (Global Slavery Index) প্রকাশ করে ওয়াক ফ্রি জানিয়েছে - ‘২০২১ সালে ‘আধুনিক দাসত্বের’ শিকার হয়েছেন প্রায় প্রায় ৫ কোটি মানুষ। অর্থাৎ, সারা বিশ্বে প্রতি ১৫০ জন পিছু ‘আধুনিক দাসত্বের’ শিকার হয়েছেন ১ জন মানুষ।' যার মধ্যে ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষই বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের নাগরিক। সমীক্ষা বলছে, প্রতিদিন আমরা যেসব সামগ্রী কিনি কিংবা যেসব পরিষেবা ব্যবহার করি সেগুলি আমাদের ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয় অথবা আমাদের ব্যবহারের বুদ্ধি অর্থাৎ প্রস্তাব দেওয়া হয়। আমরা টেরই পাই না, এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে গোপন মানব শ্রমের মূল্য। সমীক্ষা বলছে, সভ্যযুগীয় দাসত্বে ২ কোটি ৭৬ লক্ষ মানুষকে জোর করে শ্রমিকের কাজ করানো হয়। ২ কোটি ২০ লক্ষ বিয়ে দেওয়া হয় পাত্র বা পাত্রীর অমতে। অন্যভাবে বলা যায়, প্রতি দেড়শো জনের মধ্যে একজনের বিয়ে দেওয়া হয় জোর করে।

স্বাধীনতার ৭৫ বছরে অমৃতকাল উপস্থিত হয়েছে বলে হাঁক শোনা যায় প্রায়শই। কিন্তু আধুনিকতার যাবতীয় উপকরণ কোলে সাজিয়ে বসে থাকলেও, দাসত্বের শিকল থেকে আজও মুক্ত হতে পারল না ১৪০ কোটির দেশ (Modern Slavery)। বিশ্ব দাসত্ব সূচক অন্তত তেমনই জানান দিচ্ছে। ভারতে আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়েছে বলে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে তাতে (Global Slavery Index 2023)। প্রতিবেদন বলছে, ২০ টি ধনী দেশের মধ্যে ছটি দেশের আধুনিক দাসত্বের হার সব থেকে বেশি। এক কোটি দশ লক্ষ নিয়ে এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভারত। তারপরেই রয়েছে চিন। সেখানে আধুনিক দাসত্বের মধ্যে থাকা মানুষের সংখ্যা ৫৮ লক্ষ। রাশিয়ায় ১৯ লক্ষ, ইন্দোনেশিয়ায় ১৮ লক্ষ, তুরস্কে ১৩ লক্ষ এবং আমেরিকায় সংখ্যাটা ১১ লক্ষের মতো। এইসব দেশগুলিতে হয় জোর করে শ্রমে নিয়োগ করা হচ্ছে কিংবা জোর করে বিবাহে বাধ্য করা হচ্ছে।

আধুনিক দাসত্বের নিরিখে কোন দেশ, কোন জায়গায় রয়েছে, তার তিনটি পর্যায় তৈরি করা হয়। এর একেবারে উপরের দিকে রয়েছে উত্তর কোরিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, তাজিকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, রাশিয়া, আফগানিস্তান, কুয়েত, মৌরিতানিয়া, ইরিত্রিয়া। দাসত্ব যেখানে নেই বললেই চলে, সেই দেশগুলি হল, সুইৎজারল্যান্ড, নরওয়ে, জার্মানি, হল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, আয়ারল্যান্ড, জাপান এবং ফিনল্যান্ড। যে সমস্ত দেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ আধুনিক ক্রীতদাস হয়ে রয়েছেন, তাদের নিয়ে তৃতীয় পর্যায় তৈরি করা হয়েছে। সেই দেশগুলি হল, ভারত, চিন, উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নাইজিরিয়া, তুরস্ক, বাংলাদেশ এবং আমেরিকা। রিপোর্টে বলা হয়েছে, সামগ্রিক ভাবে ধরলে, এই সমস্ত দেশে প্রতি তিন জন নাগরিকের মধ্যে দু'জন আধুনিক ক্রীতদাস, সামগ্রিক হিসেবে যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।

১৯৭৬ সালে ভারতে অঙ্গীকারবদ্ধ শ্রম বিলোপ আইন পাস হয়। তার আওতায় জোরপূর্বক শ্রমদান এবং অঙ্গীকারবদ্ধ শ্রম নিষিদ্ধ হয়। এ নিয়ে প্রত্যেক রাজ্যের সরকারের উপর ভিজিল্য়ান্স কমিটি গড়ার দায়িত্বও বর্তায়। ১৯৮৫ সালে সংশোধন ঘটিয়ে ঠিকাশ্রমিক এবং পরিযায়ী শ্রমিকদেরও সেই আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সুপ্রিম কোর্টও জানিয়ে দেয়, ন্যূনতম মজুরি না মেটানোও জোরপূর্বক শ্রমের মধ্যে পড়ে। কিন্তু দাসত্ব বিলোপের পক্ষে এই আইন আদৌ কার্যকর করা সম্ভব কিনা, প্রশ্ন উঠতে শুরু করে গোড়া থেকেই।  আইনি ফাঁকফোকর, সরকারি উদাসীনতা, দুর্নীতি, রাজনীতিকদের মধ্যে সদিচ্ছার অভাবে এই আইন সার্বিক ভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি বলে মত সমাজকর্মীদের। অপরাধ বলে গন্য করা হলেও, জোরপূর্ব শ্রমে কোপ বসাতে গেলে দরিদ্র-নিম্নবিত্ত তথা মধ্যবিত্ত ঘরের পেটে টান পড়বে। তার সমাধান না খুঁজে, এই আইন কখনও কার্যকর করা সম্ভব নয় বলে ২০১৭ সালে কেন্দ্রের কাছে চিঠিও পাঠান সমাজ সচেতন মানুষেরা। শুধু তাই নয়, কেন্দ্র যে নয়া শ্রম আইন চালু করার দিকে এগোচ্ছে, তাতে সংগঠিত এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রে মালিক পক্ষের হাত আরও শক্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সমাজকর্মীরা। ভারতে একাধিক শ্রম আইন প্রণয়ন করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু 'আধুনিক দাসত্ব'-র বলয় ভাঙা এখনও সম্ভব হচ্ছে না।

দাসত্ব নিরোধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘোষণা এবং আইনের কোনো অভাব নেই। শুধু অভাব এর বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়ন করার ইচ্ছা। এর পেছনে সব সময় কাজ করছে সংঘাত, সংঘর্ষ, দুর্নীতি, দারিদ্র্য এবং নানা সামাজিক পার্থক্য। ক্ষমতা, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশ স্থাপন এবং স্বার্থ উদ্ধারও এর সাথে সম্পৃক্ত। এর ফলে দাসত্ব প্রথা নানা ঢঙে চালু রয়েছে এবং সারা বিশ্বে বিস্তার লাভ করেছে।
এর অবস্থান এখন এমন দৃঢ় যে, শিকার ও শিকারি উভয়েই এর আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে; কিন্তু বেরিয়ে আসতে পারছে না। অথচ দাসত্ব নির্মূল হওয়া প্রয়োজন। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে দু’টি বিষয়ের দিকে প্রথমেই মনোযোগ দিতে হবে, তা হলো পক্ষপাত ও অসমান। সামাজিক জীবনে অর্থনৈতিক শোষণকে বন্ধ করে সমতা রক্ষা করা হলে দাসপ্রথা চালু রাখা সম্ভব হবে না। সমাজ এবং সরকার যদি দুর্নীতি দমনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে এবং সেই মোতাবেক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে, তবে দাসত্ব তার সব অবয়ব নিয়ে হারিয়ে যেতে বাধ্য হবে। নতুবা এই অভিশাপ সমাজে প্রবলভাবে বৃদ্ধি বা স্থান নিয়ে থাকবে এবং পরিশেষে চলমান সামাজিক অশান্তির কারণ হবে।

একটা সময় মনে করা হয়েছিল, সেটা উনিশ শতকের শেষ দিক; যে পৃথিবী থেকে দাসপ্রথা বিদায় নিয়েছে। কিন্তু সেই ধারণা সত্য নয়। এই আধুনিক যুগও সেই অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়নি। পুঁজিবাদী ও নয়া উদারবাদ বিশ্বব্যবস্থার কালেও দাসত্বের শেকলে বন্দি বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষ। প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে রাষ্ট্রসংঘ সম্মেলনে বিশ্বের মহান নেতারা আগামীকালের জন্য যে লক্ষ্যগুলি রেখেছিলেন, তার মধ্যে ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে আধুনিক দাসপ্রথা, ফোর্সড লেবার এবং মানব পাচারের মতো কলঙ্কজনক ঘটনাগুলিকে মুছে দেওয়া, কিন্তু দুঃখের বিষয় তারপরেও আধুনিক দাসদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলছে। আধুনিক দাসত্ব এখনো খুব সহজ ভাবেই মানুষের সভ্যতার মধ্যে লুকিয়ে আছে। এবং সেটা মানুষের জীবনের সঙ্গে বিশ্বের প্রতিটি কোণে গভীরভাবেই রয়েছে। সেই কারণেই প্রতিদিন, মানুষ প্রতারিত হচ্ছে, জোর করে মানুষকে দাসত্ব করতে বাধ্য করা হচ্ছে।বেঁচে থাকার জন্য কাজ করে মজুর, কিন্তু কাজই জীবনীশক্তি কেড়ে নিচ্ছে। এমনকি জীবনও। আর আমাদের প্রয়োজনে সুতা থেকে বাড়ি তৈরিতে এক একটা বালু কণা সহ সব পণ্যে লেগে থাকছে সেই পীড়নের দাগ।

Friday, July 7, 2023

সমকামিতা 'বিকৃত যৌনাচার' নয়


সমকামিতা কোথাও থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেনি, বরং সমকামিতা সভ্যতার সব সময়ই ছিল। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই সমকামীদের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাণী জগতের সহস্রাধিক প্রজাতির মধ্যে যে সমকামিতার অস্তিত্ব পাওয়া যায় তা আজ প্রমাণিত। মানব সভ্যতাও কিন্তু এই ধারার ব্যতিক্রম নয়। এই সমকামিতা একুশ শতকের কোন বিষয় বা কলি যুগের কোনও পাপ নয়। মানব সভ্যতার প্রাচীন ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় সমকামিতার অস্তিত্ব অনেক পুরনো। বিভিন্ন কালে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে কেমন ছিল সমকাম ও সমকামী সম্পর্কের বিন্যাস। গ্রীক সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে রোমান সাম্রাজ্য, 'সাইবেরিয়ান সামানদের (Shaman) মধ্যে সমকামিতা ছিল, নেটিভ আমেরিকানদের মধ্যে, আফ্রিকান ট্রাইবে, সমকামিতা ছিল চৈনিক রাজবংশে, সমকামিতা ছিল আরব কিংবা ভারতীয় সভ্যতায়। এমন কোনো সভ্যতার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, যেখানে সমকামিতা নেই, কিংবা ছিল না। সেই প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর তাবৎ সাহিত্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, শিল্পকলা, দর্শন, পুরাণ কিংবা প্রত্নতত্ত্ব বিশ্লেষণ করেই গবেষকেরা জেনেছেন, সমকামী মনোবৃত্তিসম্পন্ন মানুষেরা ইতিহাসের প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি মুহূর্তে এবং প্রতিটি স্থানেই ছিলেন।'

‘সমকাম’- শব্দটি বিশ্লেষণ করলে দুটি পদ পাওয়া যায়, সম এবং কাম। সম মানে হচ্ছে একই এবং কামী মানে হল বাসনাকারী। অতএব সমকামী কথাটির মানে একই রকম বাসনাকারী। সমকামী শব্দটির উৎস সংস্কৃত ‘সমকামীন্’ থেকে। যার অর্থ সম লিঙ্গের ব্যক্তির প্রতি আকর্ষণবোধকারী ব্যক্তি। প্রাচীনকালে সমকামীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হত ‘ঔপরিষ্টক’ -শব্দটি। বাৎস্যায়ন তাঁর কামসূত্র- এর ষষ্ঠ অধিকরণের নবম অধ্যায়ে ঔপরিষ্টক শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সমকামিতার ইংরেজি প্রতিশব্দ Homosexuality; ১৮৬৯ সালে Karl Maria Cutberry তাঁর লেখা একটি আইনের পুস্তিকায় এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। গ্রিক 'হোমো' এবং ল্যাটিন 'সেক্সাস'- এই দুই শব্দের সমন্বয়ে Homosexual শব্দটি গঠিত হয়।

প্রকৃতিতে মানুষ সহ নূন্যতম প্রায় ১৫০০ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে সমকামী আচরণ দেখা যায়। কারণ প্রতিটা সিস্টেম নিজেকে টিকায়ে রাখার স্বার্থেই ‘সিস্টেম ব্যাগ’ ব্যবহার করে, যে কারণে পৃথিবীর জনসংখ্যা স্বাভাবিক রাখতে বা ন্যাচারাল ব্যালেন্স ধরে রাখতে বন্যা, ভূমিকম্প, বনে আগুন লাগা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা যায় এবং শিশু উৎপাদনকারী প্রজাতির পাশাপাশি প্রকৃতিতে শিশু জন্মদানে ‘অক্ষম’ প্রজাতির অস্তিত্ব থাকে। তবে এইক্ষেত্রে আপনি বলতে পারেন, ধর্ষণও প্রাকৃতিক বিষয়। শিশুকাম বা অযাচারও প্রাকৃতিক বিষয়। প্রকৃতিতে আছে বলেই সমকামিতার মত ‘বিকৃত যৌনাচার’ মেনে নিতে হলে ধর্ষণও মেনে নেওয়া উচিত, শিশুকামও মেনে নেওয়া উচিত। মজার বিষয় হচ্ছে এইসব কুযুক্তিদাতারা খেয়াল করেন না, সমকামিতার সাথে ধর্ষণ বা শিশুকামের অন্যতম প্রধান পার্থক্যের জায়গা হচ্ছে, ধর্ষণ এক ধরণের নির্যাতন; এক পক্ষকে নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করার নাম ধর্ষণ। শিশুকামও ধর্ষণের মতই নির্যাতন, কারণ আধুনিক পৃথিবীর বেশিরভাগ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী ১৬ বা ১৮ বছরের নিচে কোনো মানুষকে আমরা মতামত দেয়ার যোগ্য বা সমর্থ মানুষ বলে বিবেচনা করি না। যে কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১৮ বছরের নিচের মানুষদের রাষ্ট্রীয় আইনে ভোট দেওয়ার বা গাড়ি চালানোর বা বিয়ে করার অনুমতি নাই। অপরপক্ষে নিজ ইচ্ছায় দ্বিপাক্ষিকভাবে দুইজন সমকামি মানুষ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা কোনোভাবেই নির্যাতনের সংজ্ঞায় পড়ে না। ৭০ এর শেষ দিকে দার্শনিক মিশেল ফুকো উনার বিখ্যাত ‘দ্যা হিস্ট্রি অভ সেক্সুয়ালিটি’ (১৯৭৮) বইতে যখন বললেন, মানুষের যৌনতা অনেকাংশেই সমাজের নির্মাণ, একমাত্র তখনই সমকামিতাকে সমাজের ‘তৈরি করা’ অপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে চালানোর চল শুরু হয়।

সমকামকে অপ্রাকৃতিক বলে এর বিরুদ্ধে ‘কু’যুক্তি দেয়া মানুষরা আরও বলে থাকেন, মানুষের পায়ুপথ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের উপযুক্ত না। যদি সমকাম প্রাকৃতিক বিষয় হত, তাহলে নারীদেহের যোনির মতই পায়ুপথ সঙ্গমের জন্য তৈরি হত, পায়ুপথে যোনির মত লুব্রিকেন্ট থাকতো, পুরুষের লিঙ্গ ধারণ করার আকার থাকতো ইত্যাদি ইত্যাদি। যারা সমকামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেছেন, তারা ধরেই নিয়েছেন, পৃথিবীর সকল সমকামী মানুষ শুধুমাত্র পায়ুপথেই যৌন সঙ্গম করতেই জন্মগ্রহণ করেছেন।প্রথমতঃ, পায়ুপথে যৌন সঙ্গমের উপর শুধুমাত্র সমকামী পুরুষদের একচ্ছত্র দাবী নাই, পায়ুপথে বিষমকামী নারী-পুরুষও যৌন সঙ্গম করেন। দ্বিতীয়তঃ, পৃথিবীতে শুধু সমকামী পুরুষ না, সমকামী নারীও আছেন, একই শরীরে নারী ও পুরুষ উভয় লিঙ্গ ধারণ করা মানুষ আছেন, নারী শরীরে পুরুষের মন এবং পুরুষ শরীরে নারীর মন নিয়ে বাস করা মানুষ আছেন- যাদের বেশিরভাগই পায়ুপথে সঙ্গম করেন না।

জার্নাল অভ সেক্সুয়াল মেডিসিনে প্রকাশিত ইন্ডিয়ানা এবং জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ১৮ থেকে ৮৭ বছরের প্রায় ২৫ হাজার সমকামি পুরুষ নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখান, উনাদের মধ্যে মাত্র ৩৬ শতাংশ পুরুষ পায়ুকামের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। বাকি সবার যৌন আচরণের মধ্যে শুধুমাত্র নিজেদের সঙ্গীদের চুমু খাওয়া বা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরা বা একে অন্যকে মাস্টারবেশান করিয়ে দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। একইসাথে ২০১৭ সালে সেইজ জার্নালসে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে ওহায়ো স্টেট ইউনিভার্সিটি, ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অভ উইনচেস্টারের গবেষকরা দেখান, পায়ুকাম শুধুমাত্র সমকামী পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। গবেষণায় অংশ নেওয়া বিষমকামী পুরুষদের মধ্যে ২৪ শতাংশই তাদের নারী সঙ্গীদের সাথে বিভিন্ন সময় পায়ুপথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন।  

পায়ুকামের সাথে যৌনবাহিত রোগ, বিশেষতঃ এইচ-আই-ভি এইডসের প্রথম সম্পর্ক পাওয়া যায় ৮০র দশকে। কিন্তু আগেই বলেছি, পায়ুকাম শুধুমাত্রই সমকামীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি না। আজ থেকে ১৭০০ বছর আগের পেরুভিয়ান মৃৎশিল্প থেকে শুরু করে, ১৩শতকের ভারতীয় খাজুরাহো মন্দিরের ভাস্কর্য ও স্থাপত্য, ১৬ শতকের চীনা এবং জাপানিজ কারুশিল্পে বা ৫০০ বি-সির গ্রীক ভাস্কর্যে বিষমকামী নারী-পুরুষের পায়ুপথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের প্রমাণ পাওয়া যায়। সুতরাং পায়ুকামের জন্য সমকামীদের একপাক্ষিকভাবে দায়ী করা হাস্যকর। পরবর্তীতে, অর্থাৎ ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের শুরুর দিকে বিভিন্ন গবেষণায় এইচ-আই-ভি এইডসের সাথে পায়ুকামের সম্পর্ক থাকার ‘মিথ’ও ভেঙ্গে যায়। পাবমেড এবং আমেরিকান সাইকোলজিকাল এ্যাসোসিয়েশানের জার্নালে প্রকাশিত ২০০০ সালের গবেষণায় দেখা যায় এইচ-আই-ভি নেগেটিভ ১২৬৮ জন বিষমকামী নারীর ৩২ শতাংশই তাদের পুরুষ সঙ্গীর (বা সঙ্গীদের) সাথে নিয়মিতভাবে পায়ুপথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন।

এছাড়াও আরেকটা বিষয় উল্লেখযোগ্য, পায়ুকামই যৌন রোগ ছড়ানোর একমাত্র মাধ্যম না। বেশ্যালয়ের মারফত বিষমকামী বহুগামী নারী ও পুরুষের মাধ্যমেই সমাজে সর্বোচ্চ হারে যৌন রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে। ‘সমকামীরা যৌন রোগ ছড়ান’ এমন মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে নাহয় সমকামিতাকে রাষ্ট্রীয় আইন আর ধর্মীয় চোখ রাঙানি দিয়ে বন্ধ করতে পারলেন, সকল সমকামীকে আগুনে পুড়িয়ে, শূলে চড়িয়ে, বরাকের জলে ডুবিয়ে মেরে ফেলতেও সমর্থ হলেন, কিন্তু আমাদের অতি স্বাস্থ্যসচেতন পবিত্রতার ধ্বজাধারী কুলীন বংশীয় সমাজপতিরা কি বেশ্যালয় বন্ধ করার সাহস রাখেন? বিষমকামী পুরুষের বহুগামিতা আর পায়ুকাম কি পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র আজকের দিন পর্যন্ত আইন করে বন্ধ করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে? দেখায় নাই। কারণ পৃথিবী এবং পৃথিবীর রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় আইন শুধুমাত্র পুঁজিবাদী অর্থনীতি কেন্দ্রিক, শুধুমাত্রই সংখ্যাগুরু বিষমকামী শ্রমিক পুরুষের পক্ষে, সংখ্যালঘু এবং সন্তান উৎপাদনে অক্ষম নারী ও সমকামী সম্প্রদায়ের প্রতি এই অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার কোনো মমতা, কোনো ন্যায় বিচার কাজ করে না।

যদিও আগেই বলেছি, সমকামিতা প্রাকৃতিক বিষয়। কিন্তু সমকামিতা শুধুমাত্রই বা একচ্ছত্রভাবে প্রাকৃতিক বিষয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমকামিতা সামাজিকও বটে। মিশেল ফুকোর কথা আগেই উল্লেখ করেছি। ফুকো ছাড়াও ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ হোমোসেক্সুয়ালিটি’ (১৯৯০) বইয়ে ডেভিড হ্যালপেরিন দাবী করেন সমকামিতা মূলতঃ সমাজের তৈরি করা মানসিক বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও সোশাল কনস্ট্রাকশনালিজম স্কুল অভ থটের অধীনে থাকা জন উইংকলার ‘কনস্ট্রেইন্ট অভ ডিজায়ার’ (১৯৯০) বইতে দেখান সমকামিতা কোনো প্রাকৃতিক বিষয় না, বরং সমকামিতা মানুষের সামাজিক চরিত্র। ফুকো বা হ্যালপেরিন বা উইংকলারের এই দাবীর পিছনে এ্যারিস্টোটোলের বক্তব্য ‘প্রকৃতি উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো কিছু সৃষ্টি করে না’- এই যুক্তির ভূমিকা আছে অবশ্যই। এই স্কুল অভ থটের দার্শণিকরা বিশ্বাস করেন সমকামী বা বিষমকামী হওয়া মানুষের নিজের সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ চাইলেই একজন সমকামী মানুষকে বিষমকামী এবং বিষমকামী মানুষকে সমকামী বানানো যায়।  

খাজুরাহো থেকে গ্রিসের লেসবস- পূর্ব থেকে পশ্চিম- কোথায়, পৃথিবীর কোন্‌ অঞ্চলে, কোন্‌ ধর্মে, কোন্‌ রঙের মানুষের মধ্যে সমকামিতা নাই? কোথায় উভলিঙ্গের মানুষ নাই? কোথায় কোন্‌ সংস্কৃতিতে রক্ষণশীল পুঁজিপতিদের চোখ রাঙানো অতিক্রম করে সমাজে নারী পুরুষের বাইনারি লিঙ্গ পরিচয়ের বাইরেও কোনো সংজ্ঞার অধীনে না থাকা মানুষদের গল্প শোনা যায় নাই? ব্যক্তিগতভাবে আমি একই সাথে এই বাক্য বিশ্বাস এবং অবিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি, সমকামিতা একই সাথে প্রাকৃতিক এবং সামাজিক। অর্থাৎ সমকামিতা যেভাবে প্রকৃতির মাধ্যমে জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়, ঠিক একইভাবে সমকামিতা সমাজের মাধ্যমেও তৈরি হতে পারে।

সমকামিতা সম্পর্কে আমাদের সমাজ হাজারো কুসংস্কারে আবদ্ধ। এমনকি যার কিছু বইপত্র পড়ে রাতারাতি প্রগতিশীল বনে গেছেন, তারাও সমকামিদের সম্পর্কে ঘৃণাত্মক মনোভাব পোষন করেন। সমকামিরা সামাজিক অবদমনের কারণে বিভিন্ন প্রকার অপরাধপ্রবনতা এবং একই সাথে আত্মহত্যাপ্রবনতা এবং বিভিন্ন মনোবৈকল্যের শিকার হতে পারেন। এর ভেতরে থাকতে পারে ড্রাগসে আসক্তি, অবদমনের কারনে যৌনতা বিকৃতির দিকে মোড় নেয়া ইত্যাদি। এর পেছনে সমকামিতাকে দায়ী করা যাবে না, সামাজিক অবদমন এবং ধর্মীয় দৃষ্টিতে পাপবোধের সৃষ্টিই এর কারণ। আমাদের সমাজে এলজিবিটি সম্প্রদায়কে মেনে নেয়ার প্রবণতা একেবারে নেই বলেই তাদের মানসিক ক্ষরণের মাত্রা বেশি। হোমোফোবিয়ার যে নেতিবাচক প্রভাব এলজিবিটি সম্প্রদায়ের উপর পড়ে, তা থেকে তাদের বাঁচাতে সবচেয়ে কার্যকর হলো তাদের বন্ধু ও পরিবারের সহায়তা। একজন সমকামি ব্যক্তির পরিবার যদি তাকে মানসিক সাপোর্ট দেয়, তার পাশে থাকে তাহলে হোমোফোবিয়ার প্রভাব অনেকটাই দূর হতে পারে।

এক্ষেত্রে সমকামী ব্যক্তির বাবা-মায়ের ভূমিকা অপরিসীম। বাবা-মা একজন সন্তানের জীবনে প্রথম শিক্ষক। সন্তানের সাথে সমকাম বিষয়ে খোলাখুলি আলাপ এখন সময়ের দাবি। আপনি যদি জানেন আপনার সন্তান সমকামী তবে তাকে সেই মানসিক সাপোর্ট দেয়াটা আপনার দায়িত্ব। আপনার সন্তান কোনোভাবে বুলিয়িং-এর শিকার হচ্ছে কি না, কোনোরকম মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে কি না, তার কাউন্সেলিং প্রয়োজন কি না এসব বিষয়ই খেয়াল রাখতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে সমকামিতা প্রাণী চরিত্রের স্বাভাবিক একটি বৈশিষ্ট্য। আমাদের সকলের মনে রাখতে হবে একটা স্বাধীন সভ্য দেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা প্রত্যেক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সমকামিদের সামাজিক ভাবে স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন এটা যেকোন সভ্য সমাজের দায়িত্ব। সমকামিতা সমকামিরা নিজে নির্ধারন করে না। প্রকৃতি তথা সমাজ তাদের ভেতরে সমকামিতার বীজ বপন করে। একজন সমকামি পুরুষের নারীর প্রতি প্রাকৃতিকভাবে আকর্ষন নাই, যৌন আকাংখা নাই। এই দোষে নিশ্চয়ই একজন মানুষকে এক ঘরে করে রাখা বা বয়কট করা কোন মতেই মানবিক আচরন হতে পারে না। সমকামীদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে আত্মহননের পথে। আর এগুলোতে পুরোমাত্রায় ইন্ধন যুগিয়ে চলেছে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় সংগঠন ও রক্ষণশীল সমাজ। দুইজন সমকামী মানুষ এক হতে চাইলে আমাদের এতো গাজ্বালা কেন ? মানুষ সামাজিক জীব। এই সামাজিক জীব হিসেবে সমাজ ও প্রকৃতিগত বিষয়কে 'নাক সিটকানো' কোন সুস্থ মগজসম্পন্নের কাজ হতে পারে না।
দৈনিক বার্তালিপি ০৭/০৭/২০২৩

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...