‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় উনিশ’ - ১৯ শে মে। ১৯৬১ সাল। আজ প্রায় ৬২ বছর অতিক্রান্ত। আসামের বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা রক্ষার্থে এক অস্তিত্বের লড়াই। আচ্ছা সত্যিই কি আমরা ‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় উনিশ’ নিয়ে ঘুরছি। এখন চারদিকে যে আগ্রাসনের পালা – কীর্তন চলছে এতে মুটেই আশ্চার্যান্বিত হওয়ার কথা নেই। দেশজুড়ে আজব কার্নিভাল – জোর করে বিহু উৎসব গিলানো হচ্ছে, আর সঙ্গে তো আছেই চরম মিথ্যাচার, প্রতারণা আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকা। বড় দুঃখ হয় আর ক্রোধে গা জ্বলে ওঠে যখন দেখি, আমরা কোন অনুষ্ঠানে অসমিয়া আধিপত্যবাদের প্রতীক গামছা গলায় ঝুলিয়ে খুব লম্ফঝম্ফ করতে। তাইতো আমাদের অতি প্রিয় কবি দিলীপকান্তি লস্কর তাঁর কবিতায় অতি সুনিপুণভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন –
আমি কোত্থেকে এসেছি,/তার জবাবে যখন বললামঃ/করিমগঞ্জ, আসাম। / তিনি খুশিতে ডগমগ হয়ে বললেনঃ / বাঃ। বেশ সুন্দর বাংলা বলেছেন তো !/একজন শিক্ষিত তথা সাহিত্যিকের যখন/এই ধারণা,/তখন/আমি আর কি বলতে পারিঃ / ওকে ঠিক জায়গাটা ধরিয়ে দিতে গিয়ে বললাম- / বাংলাভাষার তের শহিদের/ভূমিতে আমার বাস; / তখন তিনি এক্কেবারে আক্ষরিক অর্থে-ই / আমাকে ভির্মি খাইয়ে দিয়ে বললেনঃ /ও ! বাংলাদেশ? তাই বলুন।
আজকাল প্রায় হাতেগোনা কয়েকটি ভাষা ছাড়া বাকি সব ভাষাই বিপন্নের দিকে। জার্মান ল্যাঙ্গুয়েজ সোসাইটি বিশ্ব সমীক্ষা করে যে তথ্য উল্লেখ করেছে তাতে পৃথিবীতে বর্তমানে ছয় থেকে সাত হাজার ভাষার অস্তিত্ব সংকটে। একদিকে আগ্রাসন আর অন্যদিকে বিলুপ্তির শঙ্কা। এই বিলুপ্তি আর আগ্রাসনের পেছনে নানাবিধ আর্থসামাজিক কারণ রয়েছে। (কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস বলেছেন, "Language, like consciousness, only arises from the need, the necessity of intercourse with other man." (Marx, 1964, The German Ideology Moscow, quoted by Berezin, op.cit, Footnote 1, Page-161) তাঁরা এ-ও বলেছেন যে, ভাষা হল “... the immediate reality of thought... Practical...actual consciousness.” (তদেব) মার্ক্স আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, "Ideas do not exist divorced from language." (Sondel Ben, 1958, The Humanity of Words, New York, The world Publishing Company, Page 180)" ভাষাবিজ্ঞানের এই সূত্রগুলোকে ভিত্তি করে এ-কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ভাষা-আগ্রাসন মানে মানুষের চিন্তা-চেতনা-অনুভবকে আগ্রাসন, ভাষা-বিলুপ্তি মানে এগুলোর বিলুপ্তি।
'ভাষা-সংগ্রামের বহুমুখী মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়ন করে বুঝি, বৃহত্তর গণসংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গ হল ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বরকত-সালাম-জব্বারেরা শহিদ হয়েছিলেন বলেই ধাপে ধাপে তৈরি হয়েছিল ১৯৭১ সালে বাংলা নামে দেশের জন্ম-লগ্ন। ইতিহাস ও ভূগোলের যৌথ আক্রমণে বরাক উপত্যকা (আসামের দক্ষিণ অংশে সাবেক কাছাড় জেলা) যেহেতু প্রান্তিকায়িত হয়ে পড়েছিল, তার গভীর সর্বাত্মক সংকট কখনো তেমন মনোযোগের বিষয় হয়ে ওঠেনি। বহুদিন আগে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। ঐতিহ্যগত ভাবে শ্রীহট্ট বা সিলেট বৃহত্তর বঙ্গভূমির অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া সত্ত্বেও ধূর্ত ব্রিটিশ ১৮৭৪ সালে তাকে আসামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল। এতে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা-নির্ভর রাষ্ট্রযন্ত্র রাজস্বখাতে অনেকটা লাভবান হল যদিও, ‘বাঙালির আধিপত্য’ নামক জুজুর ভয় দেখতে শুরু করল কেউ কেউ। ক্রমান্বয়ে বিদ্বেষ-বুদ্ধির বিষবৃক্ষে শুধু জল সেচনই করা হল। দেশ বিভাজনের সময় গণভোটে সিলেট আসাম থেকে সরে গিয়ে যুক্ত হল পূর্ব পাকিস্তানে। শুধু সাবেক সিলেটের পূর্ব প্রান্তের কিছু অংশ যুক্ত হল দেশভাগ পরবর্তী কাছাড় জেলার সঙ্গে। এই নতুন কাছাড় ভৌগোলিক-সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিকভাবে কিন্তু বৃহত্তর বঙ্গভূমিরই অংশ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এই ভূমিও মমতা-বিহীন কালস্রোতে বাংলার রাষ্ট্রসীমা হতে নির্বাসিত। বহু শতাব্দী থেকে বাঙালিদের নিরন্তর প্রব্রজন চলেছে এখানে, বাংলাই এখানকার ভাষা—কী সাহিত্যে কী গণসংযোগের মাধ্যম হিসেবে। ইতিহাসের বিচিত্র জটিলতায় তা আসামের অঙ্গ হলেও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সঙ্গে এর কোনো আত্মিক সংযোগ কখনও ছিল না।' (তপোধীর ভট্টাচার্য, সময় অসময় নিঃসময় ২০১০ (পৃ. ৫০–৫৯) https://bn.m.wikisource.org)
জাতীয় স্তরে হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থানের ধ্বজাধারীরা হিন্দি ভাষাকে যেভাবে শুশ্রূষা করছে তাতে পরিষ্কারভাবে এটা বলাই যায়, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুকান্ত-জীবনানন্দ-সুভাষচন্দ্রের মাতৃভাষাকে “নানা ভাবে শেষ করে দেবার ফেসিষ্ট সুলভ আগ্রাসন” চালানো হচ্ছে। (বাঙালির দাবিপত্র, নীতিশ বিশ্বাস, ২৯ মার্চ ২০১৯) “তার প্রমাণ কেন্দ্রীয় বাজেটে ভারতের ২য় প্রধান ভাষিক জনসংখ্যার ভাষা হওয়া সত্ত্বেও গত ৭০ বছরে তার জন্য একটি টাকাও বরাদ্দ করা হয়নি।” (তদেব) বরং 'বাংলাভাষী মানে বাংলাদেশি’ এরকম প্রচার চালানো হচ্ছে আসাম সহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। আশ্চর্যের বিষয়, “NCERT-র বইয়ে রাজ ভাষার ছদ্মবেশে
ছাত্র-ছাত্রীদের শেখানো হচ্ছে হিন্দি রাষ্ট্র ভাষা"। (তদেব) গুজরাট হাইকোর্ট ১৩ অক্টোবর ২০১০ তারিখের রায়ে জানিয়েছে," There is nothing on the record to suggest that any provision has been made or order issued declaring Hindi as a national language of the country." ( সংবিধান ও বাংলা ভাষা, তৃতীয় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৯, – তদেব)
আমাদের বাসস্থান আসামে হলেও অসমিয়া আগ্রাসনের শিকার বহু আগে থেকেই। ১৯৬১ সালের ১৯শে মে ১১ টি তরতাজা প্রাণ শহীদ হন শিলচরে। ১৯৭২ এর ১৭ই আগস্ট করিমগঞ্জে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু চক্রবর্তী)। ১৯৮৬র ২১ জুলাই করিমগঞ্জে শহীদ হন জগন্ময় ও যীশু। ১৯৯৬ এ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার রক্ষায় করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে শহীদ হন সুদেষ্ণা সিনহা। আসামে ভাষিক সংখ্যালঘুরা এভাবে বারবার ক্লান্ত হচ্ছে অসমিয়া আগ্রাসন দ্বারা। নিপীড়িত হচ্ছেন ডি–ভোটারের তকমায় ডিটেনশন ক্যাম্পে আবার কখনো বা উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির সুকৌশল ভাষিক আগ্রাসন নীতির মাধ্যমে। জাতীয়তাবোধ জাগরনের পেছনে যে উপাদানটি সার্বিক প্রয়োজন সেটি হলো এক সম্মিলিত ঐতিহ্যবোধ। বর্তমান সময়ে নব প্রজন্ম উনিশে মে শহীদের ধর্মের মাধ্যমে বিচার করে এরা হিন্দু না মুসলমান। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে এতটাই গুলিয়ে ফেলেছি, ভুলে গেছি কোন উৎসব কার। এনআরসি তে কার জয় হলো – মুসলিম খেদা না হিন্দু সুরক্ষিত। কিন্তু আমরা এসব কি করছি? মাতৃভাষা, জাতিসত্তা, সংস্কৃতি, প্রজন্ম অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে যাচ্ছি না তো! 'উইপোকা', 'ঘুসপেটিয়া' তির্যক বিশেষণে যারা ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যু শিবিরে এদের কাছে নতজানু হচ্ছি না তো! এসব বিভাজনের রাজনীতি করে যারা হিন্দু – মুসলমান বাঙালীরা একবারও কি মনে প্রশ্ন জাগে আগামীদিনে ১৯শে মে কোন অনুষ্ঠানও কি করতে পারবো?
ভাষিক গোষ্ঠীর সংখ্যার বিচারে বাংলায় কথা বলতে পারেন পৃথিবীতে এর স্থান চতুর্থ। খুবই দুঃখজনক যে বাংলা সাহিত্য চর্চায় ভবিষ্যতে কতজন পাঠক পাওয়া যাবে কি না তা সন্দেহ। বরাক উপত্যকায় বাংলা মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীরা সরকার পরিচালিত বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে থাকে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন 'মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ সম'। মাতৃভাষা ছাড়া একজন মানুষের আত্মপরিচয় হয় না। সেইজন্য বাংলা ভাষা বিষয়ে পড়াশোনার প্রয়োজন। কিন্তু বাংলা ভাষাটা পড়াবার জন্য বরাকে সরকার পরিচালিত বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদগুলো প্রায় ৮০শতাংশ শূন্য। আধিপত্যের ষড়যন্ত্রে অগ্রগতির পথে অস্তিত্ব সংকটে।
যেকোনো ভাষা আয়ত্ব করা খুবই ভালো। তবে সেটা কোন ভাবেই নিজের মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে নয়। আজ ভাষার অস্তিত্ব যে আগ্রাসিত হচ্ছে এর পেছনে কিন্তু আমরাই দায়ী। আমরা যখন নিজেদের উনিশের উত্তরাধিকার বলে দাবি করি কিন্তু আমাদের সন্তানেরাই বাংলা জানে না। সুস্থ পরিকাঠামোর মাধ্যমে মাতৃভাষা চর্চার জন্য প্রয়োজন নতুন কর্মপদ্ধতি। তাই জরুরি ফ্যাসিবাদী ভাইরাসকে উপড়ে ফেলা। নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে ১৯৬১,৭২,৮৬,৯৬র রক্তাক্ত ইতিহাস। পরিচয় করাতে হবে এনআরসি,ডিটেনশন ক্যাম্প, ডি-ভোটার দিয়ে কিভাবে আমাদের টুকরো টুকরো করার কথা। ১৯শে মে মানে প্রতিরোধ এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম। বাঙালি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়তে হবে আধিপত্যবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে। নইলে সমবেত আত্মহনন ছাড়া উপায় নেই। ভাষা আন্দোলনের চলমান সংগ্রামী চেতনায় আমাদের বিবেক জাগ্রত হোক – কাঙ্ক্ষিত আশা এখন। যেভাবে প্রখ্যাত কবি শ্রী সুরেশ চন্দ্র চক্রবর্তী তাঁর 'শহীদ তর্পন' কবিতায় বলেছেন —
আমরা নওজোয়ান আমরা নওজোয়ান/আজি গাহিব শহীদ তর্পন গান/আমরা নওজোয়ান।/ ভাষা বেদি মূলে দিল যাঁরা প্রাণ/অপূর্ব আত্ম-বলি-দান/গাহিব তাঁদের তর্পন-গান/আমরা নওজোয়ান।/ ওই দেখো কমলা, শচীন্দ্র, কানাই,/হিতেশ, সুকোমল আর চন্ডী ভাই/কুমুদ, সুনীল, বীরেন, সত্যেন,/শহীদ তরণী – করে আনচান।/দুঃখ আজি নয় নয় রে শোক/ পাষাণেতে বাঁধ বাঁধেরে বুক/ শহীদ - তর্পণ- শপথ আজি—/ 'ভাষার লাগি দিব রে জান।'/ আমরা নওজোয়ান। (ভাষা আন্দোলনের শহীদ সত্যাগ্রহী)
বার্তালিপি ১৬-০৫-২০২৩ ইং