Sunday, December 25, 2022

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২, কাতার


'কে লইবে মোর কার্য, কহে সন্ধ্যারবি। শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।
মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল, স্বামী, আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।'

চোখে ঘুম হারিয়ে মোবাইল,টিভির পর্দায় কিবা লুসাইলের দর্শক আসনে বসে ইতিহাসে স্বাক্ষী রইল ভারত তথা পুরো বিশ্বের ফুটবল প্রেমীরা। আর্জেন্টিনা ৩-ফ্রান্স ৩। একটা গোল যদি এমবাপে বা মেসির পা স্পর্শে বক্সে ঢুকে যায় আর লিখা হবে ইতিহাসে পাতা। রুদ্ধশ্বাস খেলা। টানটান উত্তেজনার অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত ছিল রেকর্ড জয়ের স্নায়ুবিক চাপ। গোলরক্ষক এমিলিও মার্তিনের দক্ষতায় ৩৬ বছর পর আবারও শিরোপা আসলো মেসির আর্জেন্টিনায়। লিওনেল মেসিদের বিশ্বকাপ জয়ে উচ্ছ্বাসের ঢেউ দোহা থেকে বুয়েন্স এইরেস হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা ফুটবলবিশ্বে। এবারের আগে আর্জেন্টিনা সবশেষ বিশ্বকাপ জিতেছিল মারাদোনার জাদুতেই। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে তার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স তাকে শুধু আর্জেন্টিনায় নয়, গোটা বিশ্বে করে তুলেছিল রূপকথার মহানায়ক। আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার দে পল খুশিতে, খুঁজে পাচ্ছেন না অনুভূতি ব্যাখ্যা করার ভাষা।'২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে তারা শিরোপা ঘরে তুলতে পেরে ম্যাচ শেষে তিনি বললেন, যোগ্য দল হিসেবেই জিতেছে আর্জেন্টিনা।'

কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের মাসকটের নাম ছিল লা-ইব। আরবি এ শব্দের অর্থ 'অত্যন্ত দক্ষ খেলোয়াড়'। যদিও লা-ইব দেখতে অনেকটা ক্যাসপার- দ্য ফ্রেন্ডলি-র ভুতের মতো। এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেয় ৩২টি দেশ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ধারা বর্ণনায় ছিলেন হলিউডের খ্যাতিমান অভিনেতা মরগ্যান ফ্রিম্যান। তার সাথে ছিলেন ২০ বছর বয়সী ঘানেম আল মুফতাহ। এক বিরল রোগের কারণে জন্ম থেকেই তার পা নেই। তাদের দুজনেই বক্তব্যে বিশ্ব ঐক্য ও সাম্যের কথা ফুটে। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চ কাঁপিয়েছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ব্যান্ড বিটিএসের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য জং কুক। এবারের বিশ্বকাপের থিম সং 'ড্রিমার্স' গানেই পারফর্ম করেন তিনি। তবে বিশ্বকাপ মানে মনেপড়ে শাকিরার 'ওয়াকা ওয়াকা' বা কান - এর 'ওয়েব ইন ফ্লেগ'-র কথা। দর্শকরা সত্যিকার অর্থে এইধরণের কিছু থেকে খুব মিস করছিলেন। কাতার বিশ্বকাপ উদ্বোধনীতে ছিল চোখ ধাঁধানো আলোর খেলা, ড্রামস পারফর্মেন্স, বর্ণিল আতশবাজির খেলা। তবে কাতারের মত ছোট একটি দেশ, যেখানে পেশাদারী ফুটবলের তেমন কোন ঐতিহ্য নেই, তারা কীভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার পেল, তা নিয়ে বিতর্কও তো কম হয়নি! একাধিক বিষয় নিয়ে বিতর্ক চলে কাতার বিশ্বকাপ ঘিরে।

২০১৪ ও ২০১৮ সালে ব্রাজিল ও রাশিয়া বিশ্বকাপ আয়োজনে ১৫ বিলিয়ন ডলারের কম খরচ হয়েছিল৷ ২০১০ সালে কাতারকে যখন ২০২২ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হয়, তখন সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়েছিল ৬৫ বিলিয়ন ডলার৷ কিন্তু দেখা গেল বিশ্বকাপ আয়োজন করার জন্য কাতার প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করা হয়! টাকার অঙ্কে কত হতে পারে? প্রায় ১৬ লক্ষ ৩৩ হাজার কোটি টাকার মতো । বিশ্বকাপের আয়োজনকে কেন্দ্র করে বারবার বিতর্কে জড়িয়েছে কাতার। কখনও LGBTQ নাগরিকদের স্বীকৃতি না দেওয়া আবার স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজে যুক্ত পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের ঘটনা, খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে কাতার প্রশাসন।মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত ১৫,০২১। এসব শ্রমিক ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার নাগরিক। মৃত্যুর এই সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে কাতারে এসব দেশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।তবে কি মৃত্যু উপত্যকায় চলছে আনন্দযজ্ঞ? কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে এমনই প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মিডিয়া। সাতটি স্টেডিয়াম-সহ নানা নির্মাণ কাজে ২০১০-২০ সময়কালে নাকি অন্তত সাড়ে ছ’হাজার অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে কাতারে। এর মধ্যে রয়েছেন ভারতের ২৭১১ জন, নেপালের ১৬৪১ জন, বাংলাদেশের ১০১৮ জন, শ্রীলঙ্কার ৫৫৭ জন।

নতুন বিতর্কের মধ্যে ছিল টিকিটের দাম। আগের সব রেকর্ডকে ছাপিয়ে গিয়েছে কাতার বিশ্বকাপের টিকিটের দাম। রাশিয়া বিশ্বকাপের থেকে গড়ে ৪০ শতাংশ বেশি এ বারের। ফাইনালের টিকিট কিনতে ফুটবলপ্রেমীদের ঘটি-বাটি বিক্রি করার উপক্রম। ফাইনালের টিকিটের দাম গড়ে ৬৮৪ পাউন্ড বা ৬৬ হাজার টাকার বেশি। ২০১৮ সালের ফাইনালের টিকিটের গড় দামের থেকে যা ৫৯ শতাংশ বেশি। রাশিয়া বিশ্বকাপে টিকিটের গড় দাম ছিল ২১৪ পাউন্ড বা প্রায় ২১ হাজার টাকা। এ বার তা বেড়ে হয়েছে ২৮৬ পাউন্ড বা প্রায় ২৮ হাজার টাকা। গত ২০ বছরে কোনও বিশ্বকাপের টিকিটের গড় দাম এত বেশি ছিল না।প্রকৃতপক্ষে বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক দেশ হিসেবে তেলসমৃদ্ধ ছোট দেশ কাতারকে বেছে নেওয়াটা একটি বড় রাজনৈতিক ঘটনা। যাইহোক অন্যদিকে না গিয়ে চলে আসা যাক মূল ট্রেকে।

কাতার বিশ্বকাপ প্রতিবাদের মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছেন একের পর এক ফুটবলার। বিতর্কও কম হচ্ছে না এই বিশ্বকাপকে ঘিরে। জার্মান সিনিয়র ফুটবল দল অভিনব পদ্ধতিতে কার্যত বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার (FIFA) বিরুদ্ধে 'বিদ্রোহ' ঘোষণা করলেন অ্যান্টনি রুডিগাররা। নাকে হাত দিয়ে নাক চেপে ফিফার বিরুদ্ধে অভিনব প্রতিবাদ দেখালেন তাঁরা। কাতারে সমকামীতা নিষিদ্ধ। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হয়েছে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, সুইডেন, নরওয়ে, এবং ওয়েলস। প্রতিবাদের অঙ্গ হিসেবে তারা একটি বিশেষ আর্মব্যান্ড তৈরি করে। যার নাম দেওয়া হয় ‘ওয়ান লাভ’ আর্মব্যান্ড। এই রামধনু রঙা এই ব্যান্ড পরেই মাঠে খেলতে নামার কথা ছিল এই দেশগুলোর ফুটবলারদের। কিন্তু বাঁধা দেয় ফিফা। তাই নাকে হাত দিয়ে নাক চেপে এক অভিনব প্রতিবাদ করে জার্মানরা।

খলিফা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘ই’-র ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল জাপান ও চার বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল জাপান। প্রতিটা খেলায় সাধারণ গ্যালারিতে সমর্থকরা খাবার খান, পানীয় পান করে থাকেন। সমর্থিত দলের খেলা দেখে গ্যালারি ছেড়ে চলে যান সমর্থকরা। আর গ্যালারিতে যত্রতত্র পড়ে থাকে জলের বোতল, খাবারের প্যাকেট। এদিন ম্যাচের শেষে জলের বোতল, খাবারের প্যাকেট পরিষ্কার করতে দেখা গেল জাপানের সমর্থকদের। যা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিমেষের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। বড় বড় নীল রঙের ডিসপোসাল ব্যাগ নিয়ে গ্যালারিতে যত্রতত্র পড়ে থাকে জলের বোতল, খাবারের প্যাকেট পরিষ্কার করেন। জাপানের সমর্থকদের পাশাপাশি ফুটবলাররাও ম্যাচের শেষে সুন্দর করে সাজঘর সাজিয়ে দেন। তবে জাপানি সমর্থকদের অভিনব সাফাই অভিযান মন জয় করে নেয় নেটিজেনদের।

নারীদের বেলা সব সময়েই দাবিয়ে রাখা পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা। তবে বিশ্বকাপ হলেই কি ? কাতার কি আর পিছিয়ে থাকতে পারে ? পোশাক পরিধান নিয়ে কাতার বিশ্বকাপে ছিল বেশ কড়াকড়ি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ মতে, কাতারে পা রাখা ভিনদেশি নারী সমর্থকদের বলা হচ্ছে, তারা যাতে খোলামেলা পোশাক না পরেন। মূলত কাঁধ ও হাঁটু ঢেকে রাখতে হবে। দর্শকদের কোনো বিশেষ পোশাক পরতে বলা হচ্ছে না। তারা নিজেদের পছন্দের পোশাকই পরতে পারেন। তবে খোলামেলা পোশাক পরা যাবে না। শুধু স্টেডিয়াম নয়, মিউজিয়াম ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরে গেলেও শরীর ঢাকা পোশাক পরতে হবে। তবে ব্যতিক্রম দেখা যায় ক্রোয়েশিয়ার এক মডেল কে দেখে। নিজের দলকে সমর্থন জানাতে কাতার বিশ্বকাপে দর্শক হয়ে এসেছেন ক্রোয়াট মডেল ইভানা নোল। তবে সেসব সমালোচনাকে মোটেই পাত্তা দেননি ইভানা। উল্টো দোহার সৈকতে বিকিনি পরে ঘুরাফেরায় দেখা যায় তাকে।

যদিও ৬-২ ব্যবধানে হেরেছে ইরান। তবে হেরে গিয়েও জিতে গেল তাঁরা। প্রতিবাদের ভাষা তো বিভিন্ন রকম হয়। চিৎকার করলেই সব সময় প্রতিবাদ হয় এমন নয়। নীরব থেকেও জানানো যায় প্রতিবাদের আগুন। সেটাই আজ প্রমাণ করল ইরান ফুটবল দল। মাঠের লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের কাছে বড় ব্যবধানে হেরে গেলেও মানবতার লড়াইয়ে বড় অঙ্গীকার রেখে গেল আমির নাসের,হোসেনি, তারেমিরা। দু’মাস আগে প্রতিবাদী মাহশা আমিনির মৃত্যুর পর থেকে ফুঁসছে ইরান। দেশে প্রতিবাদ থেমে যায়নি। প্রচুর মানুষের প্রাণ গেছে পুলিশের কাছে। তবুও ভয় পাইনি সাধারণ মানুষ। ইরানের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার সরদার আজমুন পর্যন্ত কিছুদিন আগে বিরাট প্রতিবাদ করেছিলেন সরকারের বিপক্ষে। এমনকি গুলি খেতেও রাজি ছিলেন। তাকে শেষ মুহূর্তের দলে রেখেছিল ইরান ফুটবল ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু অত্যন্ত নিন্দনীয় যা করেছে আমির নাসের কে মৃত্যদণ্ডের আদেশ দিয়ে। বিশ্বকাপে জাতীয় সংগীত গাইল না ইরান! ফুটবলে হেরেও জিতে গেল মানবতার যুদ্ধে। তবে এক্ষেত্রে মরক্কোও পিছিয়ে নেই।দীর্ঘ ৩৬ বছর পর, ২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশ মরক্কো। ১৯৮৬ -র মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল তারা। যদিও সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হারে। নিজেদের ধরে রেখেছে চতুর্থ স্থানে। কাতার বিশ্বকাপে স্পেনকে হারিয়ে প্যালেস্টাইনের পতাকা (Palestine Flag) নিয়ে ‌সেলিব্রেশন করে হাকিমি–জিয়েচরা। এর অর্থ হল বিশ্বের সামনে ইজরায়েলের আগ্রাসন থেকে প্যালেস্টাইনের মুক্তির দাবি।

প্রগতিশীল শিক্ষা আমাদেরকে খোলামেলা চিন্তা করতে শেখায়, ব্যক্তিস্বাধীনতা সম্পর্কে শেখায় এবং মানুষের পাশাপাশি সমস্ত প্রাণীকে ভালবাসতে শেখায়। সমাজের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে ভালোবাসতে শেখায়। আশ্চর্যের বিষয় এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ। বিবাহ বহির্ভুত কাপোল নাকি বিশ্বকাপ সময়ে কাতারে যেতে পারবে না। গেলে জরিমানা বা জেল। পাশ্চাত্যে বিবাহ প্রথা কম। বিবাহ ছাড়াই দু'জন হয়তো সারা জীবন ঘর সংসার করে, সন্তান সন্ততি নিয়ে সুখে থাকে। সেসব পশ্চিমা কাপোল তাহলে কাতার যেতে পারবে না! দুজন পুরুষ বা দু'জন নারী একসাথে গিয়ে খেলা উপভোগ করলে, এক কক্ষে থাকলে সন্দেহ করা হবে তারা সমকামি কি না। সমকামি হলে শাস্তি। ২১ বছরের নীচে হোটেল বারে মদ খেলে ৩০০০ দিনার জরিমানা বা ৬ মাসের জেল। সি-বীচে বিকিনি পড়া নিষেধ। পুরুষরাও খালি গায়ে রাস্তায় বের হতে পারবে না। কাতারে ছিল LGBTQ র উপর, নারীদের পোশাকের উপর নিষেধাজ্ঞা যেমন নিয়ম কানুনের জতুগৃহে আটকে পড়েছিল এবারের বিশ্বকাপ। অনেক সময় মনে হতো বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের কি প্রয়োজন ছিল ধর্মীয় জলসার আয়োজন করলেই পারতো ! 

কাতার বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক ও বিজ্ঞাপনী চুক্তিগুলো থেকে রেকর্ড সাড়ে সাতশো কোটি ডলার আয় করেছে ফিফা। ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও ট্র্যাজিক হিরোই হয়ে রইলেন কিলিয়ান এমবাপে। চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা রানার্স আপ ফ্রান্স, তৃতীয় স্হান ক্রোয়েশিয়া,গোল্ডেন বল মেসি( আর্জেন্টিনা), গোল্ডেন বুট এমবাপে (ফ্রান্স) ,গোল্ডেন গ্লাভস মার্টিনেজ (আর্জেন্টিনা),তরুন সেরা ফুটবলার ফার্নান্দেজ (আর্জেন্টিনা)। ২০২৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসতে যাচ্ছএ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে । ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দিয়েগো ম্যারাডোনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে, দোহায় ছাদখোলা বাসে ট্রফি নিয়ে উদযাপন মেসিদের। ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে লুসাইলকে স্মরণীয় করে রাখলো আলবিসেলেস্তেরা।১৯৩০ সালে শুরু হওয়া ফিফা বিশ্বকাপের ২২তম আসরের আয়োজক দেশ কাতার। কাতারের আয়োজক হওয়া নিয়ে আলোচনা যেমন ছিল, ছিল নানামুখী সমালোচনাও।অনেকটা ইসলামী বিধিনিষেধের উর্ধ্বে গিয়ে কাজ করেছে কাতার। এটাও কম বড় কথা নয়। তবে সব কিছু ছাপিয়ে ইতিহাসের অন্যতম সফল এক বিশ্বকাপ শেষ করে মরুর এই দেশটি। সবার মনে থাকবে কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ (Qatar World Cup 2022)।

Friday, December 16, 2022

গৃহবধূ আত্মহত্যা : বিবাহ সংক্রান্ত সমস্যা


আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘সেইডেয়ার’ থেকে ।সুইসাইড বা আত্মহত্যা আজ আর কারো কাছে অপরিচিত নয়। হয়তো এমন কোনো দিন খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হবে যেদিন দেশের কোথাও না কোথাও আত্মহত্যা ঘটেনি। পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট, ফেসবুক, টিভি অন করলেই কোনো না কোনো আত্মহত্যার খবর সামনে ভেসেই আসে। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো আত্মহত্যার নৈতিকতার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করেছেন। তিনি মনে করেছেন, যখন কেউ রাষ্ট্রীয় আইনে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত হন অথবা দুর্ভাগ্যবশত জীবন ধারণে অপারগ হন অথবা অপ্রত্যাশিত অপমানে জর্জরিত হন তখন তার আত্মহত্যা করা অনৈতিক নয়। অনৈতিক হয় না। একটি সূত্রমতে, গোটা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৮ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে থাকেন। তার মানে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ১ জন করে আত্মহননের পথ বেছে নেন। এই সংখ্যার মধ্যে ভারতেই ২০২১-এ আত্মহত্যার কারণে মৃত্যু হয়েছে ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৩৩ জনের। এমনই তথ্য উঠে এসেছে ‘ন্যাশনাল ক্রাইম স্টেশন ব্যুরো’-র সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে। এনসিবি-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে প্রতি ১০ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে ১২০ জনের মৃত্যুর কারণই হল আত্মহত্যা।

আমাদের সমাজে আত্মহত্যা যেকোনো ঘাতক ব্যাধি থেকে অধিক দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং ইহা সমাজ তথা দেশকেও রাখছে সর্বক্ষণ ভীতির মুখে। বর্তমানে যেকোনো বয়সের মানুষই আত্মহত্যা নামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বিয়ে নামক দাসপ্রথায় আবদ্ধ হয়ে সম্প্রতি বাড়ছে গৃহবধূ আত্মহত্যা। বিবাহিত মেয়েদের আত্মহত্যার ক্ষেত্রে পরিবার কিংবা স্বামীর ইন্ধন দেখা যায়। নারীর ক্ষেত্রে অধিকাংশই ইভ টিজিং, যৌতুকের চাপ, অভাব, হতাশা, পারিবারিক কিংবা সামাজিক নির্যাতনের মতো ঘটনায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। একজন নারী বিয়ের পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দৈনন্দিন জীবন সংসারে প্রাত্যহিকতার বেড়াজালে আটকে পড়েন। মন খুলে কথা বলার বা কথা শোনার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার যেহেতু অভাব রয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি নারীকে যে নানা ধরণের মানসিক নিগ্রহের শিকার হতে হয়, তার একটি বড় অংশ হয় নেতিবাচক নানা শব্দের মাধ্যমে। কোন ঝগড়া বিবাদে নারী বিভিন্ন ধরনের মৌখিক সহিংসতার শিকার হয়।  খেয়াল করেছি হয়তো, আমাদের আশপাশে প্রচলিত বেশিরভাগ গালিগালাজ এর সাথে স্ত্রী লিঙ্গের সম্পর্ক রয়েছে। অনেক তিরস্কারমূলক শব্দের মধ্যে পুরুষবাচক তো কোন শব্দই নেই।

নারীরা আসলে খুব সহনশীল, কিন্তু সহ্যেরও একটা সীমা রয়েছে। বেশিরভাগ মেয়েরই ১৮ বছর হবার সাথে সাথেই বিয়ে হয়ে যায়, যেটা বিয়ের আইনগত বয়স বা এর থেকে কমবয়সী মেয়েদেরকে পরিয়ে দেয়া হয় বিয়ের শিকলে। সে স্ত্রী এবং পুত্রবধূ হয়ে শ্বশুর ঘরে যায় আর তার গোটা সময়টা কাটায় ঘরের চার দেয়ালের মাঝে - রান্না, ধোয়ামোছা আর ঘর গৃহস্থালির নানা কাজে। বিয়ে প্রথায় লোভী পুরুষ মানসিকভাবে নির্যাতন করে স্ত্রী কে, তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ পর যাতে সামাজিকভাবে আবার দ্বিতীয়, তৃতীয় বা তার অধিক নারীর কাছ থেকে পেতে পারে সে চরম সুখ। তার ওপর আবার চাপিয়ে দেয়া হয় নানা ধরনের বিধিনিষেধ। ব্যক্তি স্বাধীনতা বলতে তার কিছুই প্রায় থাকে না। থাকে না আর্থিক স্বাধীনতাও - নিজস্ব অর্থ বলতে তার হাত থাকে প্রায় শূন্য। তার শিক্ষা বা ভবিষ্যতের স্বপ্ন সব কিছু তাকে বিসর্জন দিতে হয়। তার আশা আকাঙ্ক্ষার ধীরে ধীরে অপমৃত্যু শুরু হয়। ফলে হতাশা আর ব্যর্থতার গ্লানি তাকে গ্রাস করতে শুরু করে। তখন তার কাছে শুধু জীবনধারণ একটা যন্ত্রণার মত মনে হয়।

আমাদের সমাজে আত্মহত্যাকে ধর্মীয় দৃষ্টিতে পাপ হিসেবে দেখা হয়। ফলে কেউ নির্যাতন, নিপীড়ন ও অবহেলার শিকার হয়ে যদিও বা বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ, ধর্মীয় কারণে তার অন্তুষ্টিক্রিয়ায় ও দেয়া হয় নানা ধরনের ফতুয়া। আত্মহত্যার কারণ যতই সংবেদনশীল হোক না কেন এক্ষেত্রে। আত্মহত্যার পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। সহজে একজন মানুষ তার নিজ জীবনের পরিসমাপ্তি চায় না। যে কোনোভাবে বেঁচে থাকার আকাঙ্খাই প্রবল এবং বড় সত্য মানবজীবনে।

ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ভারতে গত বছর ২২ হাজার ৩৭২ জন গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ ভারতীয় গৃহবধূদের মধ্যে আত্মহত্যার হার প্রতিদিন গড়ে ৬১ আর মিনিটের হিসাাবে প্রতি ২৫ মিনিটে একজন। ২০২০ সালে মোট এক লক্ষ ৫৩ হাজার ৫২ টি আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে - তার মধ্যে ১৪.৬% ক্ষেত্রেই আত্মহত্যা করেছেন গৃহবধূরা। আর মোট আত্মহত্যার ৫০ শতাংশেরও বেশি ঘটনায় গৃহবধূরাই আত্মহননের পথে গেছেন।১৯৯৭ সালে আত্মহত্যার পরিসংখ্যান সংকলন করতে শুরু করে এবং সেটা তারা করে পেশার ভিত্তিতে। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে ভারতে প্রতিবছর বিশ হাজারের বেশি গৃহবধূ আত্মহত্যা করছেন। ২০০৯ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছিল ২৫ হাজার ৯২। বিগত ৫ বছরে ১৩৫৩০ জনের আত্মহত্যায় উত্তরপূর্বে শীর্ষে আসাম,দেশে শীর্ষে মহারাষ্ট্র (৯৬৬৫০)
-কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ দপ্তর। রিপোর্টে এধরনের আত্মহত্যার জন্য সবসময়ই দায়ী করা হয়েছে "পারিবারিক সমস্যা" অথবা "বিবাহ সংক্রান্ত সমস্যাকে"। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ ব্যাপক মাত্রার পারিবারিক সহিংসতা। সরকার পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে অংশ নেয়া নারীদের ৩০% বলেছেন, তারা স্বামীদের হাতে নিগ্রহ ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। সেইসাথে প্রতিদিন জীবনের ঘানি টানা আর সংসারের প্রাত্যহিক শ্রম তাদের দাম্পত্য জীবনকে কঠিন করে তুলছে, সংসারে তাদের জন্য দমবন্ধ করা অবস্থা তৈরি হচ্ছে।

চলমান পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে জীবন কাটানোর পরেও অনেক নারী যে তাদের মাথা ঠিক রেখে জীবন চালাতে পারছেন, তার একটা বড় কারণ হল তাদের পেছনে ব্যক্তিগত সাহায্য সমর্থনের অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ।আত্মহত্যার এই সামাজিক ব্যাধি শতভাগ নির্মূল করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। মানুষ হিসেবে নিজেকে জানতে হবে। সামাজিক দায়িত্ববোধ, পারিবারিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক অনুশাসনগুলো যথার্থভাবে মেনে চললেই অনেকাংশে এটা রোধ করা সম্ভব। মানুষ হিসেবে কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, যদি উপলব্ধি করেন সমাজ প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য, তবে তার পক্ষে আত্মহত্যা সম্ভব নয়। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা সাধারণত দুইধরনের।ইমপালসিভ (হঠাৎ আত্মহত্যা) এবং ডিসিসিভ (সিদ্ধান্ত নিয়ে বা পূর্বপরিকল্পিত)। তবে ডিসিসিভ আত্মহত্যাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য। আত্মহত্যা হুট করে হয় না। অনেক পরিকল্পনা করে এগোতে হয়। এ সময় আশপাশের মানুষ যদি একটু খেয়াল করেন তাহলে তারা সমস্যাগুলো বুঝতে পারেন। এ অবস্থায় যদি তারা উদ্যোগী হয় তাহলে বিষয়টি তখন পারিবারিকভাবে সমাধানে এগিয়ে মীমাংসা করা সম্ভব হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, গৃহবধূদের বাবা-মায়েরা তখন এই বিষয়ে বেখেয়ালে থাকেন, আবার কখনো কখনো নিজেরাই মেয়ের মনকে বিষিয়ে তোলেন। এভাবে তারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে শেষে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা নিতে ছুটে যান।

আত্মহত্যার বিষয়টি নিয়ে সমাজে খোলাখুলিভাবে কথা বলা হয় না। বিষয়টি এখনও গোপন রাখার প্রবণতা দেখা যায়, কারণ আত্মহত্যাকে পরিবারের জন্য লজ্জার বিষয় হিসাবে অনেকে দেখেন। গ্রাম এলাকায় ময়না তদন্তের প্রয়োজন থাকে না এবং অপেক্ষাকৃত ধনী পরিবারগুলো বিভিন্ন পন্থা অবলম্বনে আত্মহত্যাকে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হিসাবে নথিভুক্ত করায়। অনেক সময় প্রশাসনের নথিও যাচাই করা হয় না।এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের অনেক ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। যৌতুক, গৃহনির্যাতন, বহুবিবাহ সম্পর্কিত খবর ও এগুলোর কুফলের পাশাপাশি আত্মহত্যার পথে না গিয়ে বিকল্প পথে জীবন গঠনের উপায় নিয়ে বেশি বেশি সংবাদ প্রকাশিত হওয়া দরকার। তাহলে তা এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারবে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আত্মহত্যার প্রবণতা কমিয়ে আনতে শিশুকাল থেকেই মা-বাবার আন্তরিক আচরণ বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। আত্মহত্যার পেছনে যেসব কারণ দায়ী এসব চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে এর প্রবণতা বাড়তেই থাকবে।বিগত দিনে গৃহবধূ আত্মহত্যার কারণগুলো দর্শীয়ে, প্রত্যেক প্লেটফোর্মে, সামাজিক মাধ্যম, গণমাধ্যমের সাহায্যে মনোবিজ্ঞানী বিশেষজ্ঞ দ্বারা সচেতনতামূলক কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কলেজ, ইউনিভার্সিটি লেভেলে কোর্স কারিকুলামে এই ধরণের বিষয় ইনক্লুড করা। যাতে পরবর্তীতে একজন নারী সহজেই সংযত রাখতে পারে, মানসিক ভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে,বিয়ে নামক দাসপ্রথার বিরুদ্ধে লড়তে পারে। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবাইকে সজাগ, সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে, সকলকে সচেতন করতে হবে।

Thursday, December 15, 2022

ইরান ফুটবলারের মৃত্যুদণ্ড প্রসঙ্গে


ইরান পুঁজিবাদ অনুসারী দেশ।নারী–পুরুষ–ছাত্র–যুব নির্বিশেষে সমাজের সমস্ত অংশের ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণে এই গণআন্দোলনের শক্তি এতটাই বেড়েছে যে তা ক্ষমতাসীন মৌলবাদী–ফ্যাসিবাদী শাসকের চোখে চোখ রেখে অত্যাচারী জমানা বদলের আওয়াজ তুলছে৷ রাষ্ট্রের দমনপীড়নে ইতিমধ্যেই চারশোর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে৷আজ ইরানে যা চলছে তা হলো প্রগতিশীলতার বধ্যভূমি প্রস্তুত করা। এটা কি কোন সভ্য দেশের কাজ ? ধুর। একজন কে মৃত্যু দণ্ড দিলেই কি আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে ? একসময় শাহ র আমলে হিজাব বা বোরখা পুরো নিষিদ্ধ ছিল ১৯৮৯ ধর্মীয় অন্ধকার কে পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয়।

একটা পুঁজিবাদী দেশে ধর্মীয় বিধিনিষেধ দিয়ে অন্ধকারে ঠেলে দেয়া কতটা আক্রমণাত্মক তা ইরানকে দেখলেই বুঝা যায়। কারণ ভীতি প্রদর্শন করে মালাই খাওয়া দস্তুর। আসলে এটা শুধু ইরানে না, ধর্মীয় অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে প্রগতিশীলতা পিছনে ফেলে দেয়া হয়। কাতার বিশ্বকাপে মরক্কো কে তো দেখেছিই। আশরাফ হাকিমিরা ধর্মীয় গেড়াকল থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে নতুন আঙ্গিকে সাজিয়ে তুলেছে বিশ্বদরবারে। আসলে ইরান আমেরিকাকে ফলো করেই ধর্মীয় অন্ধকার আবার ফিরিয়ে এনেছে। ধর্মের নামে রাজনীতি এটা তো আবহমান কালের প্রচলিত ধারা।

রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর 'রামরাজ্য ও মার্ক্সবাদ' বইয়ে লিখছেন 'বিবর্তন বাদ ধর্মের মূলে এমন আঘাত করে যে তার ভিত্তিই নড়ে ওঠে। নিজের নিন্দনীয় পুঁজিবাদী সমাজ বহাল রাখার জন্য ধর্ম ও ঈশ্বরের সবথেকে বড় পৃষ্ঠপোষক আমেরিকা এজন্যই তাদের বেশ কিছু --বিশ্ব বিদ্যালয় গুলোতে বিবর্তনবাদ বিষয়ক পঠন-পাঠন ও আলোচনা বন্ধ করে দিয়েছে ।' (পৃঃ ৫৭)

জার্মান সংবাদপত্র ‘আনজেরে জাইট’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘তুদে পার্টি’র আন্তর্জাতিক মুখপাত্র মহম্মদ ওমিদভার জানাচ্ছেন, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইরানে ৪০ শতাংশের বেশি জনগণ দারিদ্র সীমার নিচে৷ বেকারত্ব ভয়াবহ, কোনও কোনও প্রদেশে তা ৭০ শতাংশের বেশি৷ এর সঙ্গে জুড়ে আছে শাসকদের সীমাহীন দুর্নীতি৷ আর চলছে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের নির্মম দলন৷ সৌদি আরবের শাসকরা এবং আফগানিস্তানের তালিবানরা মহিলাদের উপর যে ধরনের ফতোয়া জারি করেছে, ইরানেও তাই৷ মানুষ হিসাবে যে বুনিয়াদি অধিকার থাকা উচিত, তার কিছুই ইরানের মহিলাদের নেই৷ এমনকী তার নিজের শরীরের উপর নিজের অধিরকারটুকুও নেই৷

ইরান ধর্মীয় মৌলবাদীদের দ্বারা শাসিত একটি পুঁজিবাদী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র৷ এ যে কী দুঃশাসন ইরানের জনগণ বিশেষ করে মহিলারা তা উপলব্ধি করছেন জীবন দিয়ে৷ মৌলবাদী শাসকরা মেয়েদের বিয়ের বয়স ধার্য করেছিল ৯ বছর৷ জনগণের প্রবল প্রতিবাদের সামনে পড়ে ২০০২ সালে পার্লামেন্ট মেয়েদের বিয়ের বয়স বাড়িয়ে করে ১৩ বছর৷ অধিকারের প্রশ্নে নারী–পুরুষের বৈষম্য ব্যাপক৷ পুরুষেরা মুখে তালাক বললেই বিবাহ–বিচ্ছেদ হয়ে যায়৷ কিন্তু নারী বিবাহ বিচ্ছেদ চাইলে তাকে যেতে হবে কোর্টে৷ একজন বিবাহিত মহিলা বিদেশে যাওয়ার পাসপোর্ট পাবে না, যদি না স্বামী লিখিত অনুমতি দেয়৷ সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক বৈষম্য৷ স্বামী মারা গেলে তার সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার নগণ্য, মাত্র সাড়ে ১২ শতাংশ৷ কিন্তু স্ত্রী মারা গেলে, তার সম্পত্তি পুরোটাই পাবে স্বামী৷ পৈত্রিক সম্পত্তিতে মেয়ের ভাগ ছেলেদের অর্ধেক৷ বিচারবিভাগে মেয়েদের চাকরির কোনও অধিকার নেই৷ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও মেয়েদের দাঁড়ানো নিষিদ্ধ৷ কোনও কোনও ধর্মীয় নেতা এমনও বাণী দিচ্ছে যে মহিলাদের মস্তিষ্কের শক্তি পুরুষের অর্ধেক৷ সব মৌলবাদের বহিরঙ্গে পার্থক্য যাই থাক, মর্মবস্তুতে এরা এক৷ এদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রগতির পথে প্রতিবন্ধক৷

ইরান আদালতের মতে, ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে শত্রুতা’। সম্পূর্ণ নির্বোধতা আর কাপুরুষতা। মূল কথা হলো আমির নাসের আজদানির মৃত্যুদণ্ড,নিন্দনীয় এবং কুপমূন্ডকতা ছাড়া কিছু নয়। সবশেষে পুঁজিবাদ ও ধর্মীয় অন্ধকার নিপাত যাক।

Tuesday, December 13, 2022

বিতর্কিত দেওয়াল লিখন জেএনইউ-তে


আবারও বিতর্ক ঘিরে দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় জেএনইউ ( Jawahar Lal Nehru University) । এবারের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে কোন অজ্ঞাত পক্ষের দ্বারা দেয়াল লিখন হয় --- ক্যাম্পাসের ভেতরে স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের দেওয়ালে কারা যেন লাল কালিতে লিখে রাখল ফতোয়ার ঢং-এ একাধিক বিতর্কিত বার্তা। কোথাও লেখা হয়েছে ‘ব্রাহ্মণরা ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাও’, কোথাও লেখা ‘বানিয়ারা (বৈশ্য) দূর হটো’, কোথাও বা ‘শাখায় (সংঘ) ফিরে যাও’, ‘আমরা বদলা নিতে আসছি’ ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে একটি বিবৃতি জারি করা হয়েছে৷ 

অজ্ঞাতনামাদের কুকীর্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের দেওয়াল ব্রাহ্মণ তথা বৈশ্যবাদের বিরুদ্ধে স্লোগানে ভরে উঠল। রীতিমতো শাসানি দিয়ে বলা হল ‘ব্রাহ্মণরা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাও’, ‘ব্রাহ্মণ ভারত ছাড়ো’ আবার কোনওটিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখা রয়েছে, ‘এখানে রক্ত ঝরবে’, ‘ব্রাহ্মণ-বৈশ্য, আমরা তোমাদের জন্য আসছি। আমরা সংখ্যায় বেশি রয়েছি।’ ইতিমধ্যে এই ঘটনা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিনীত জিন্দাল দিল্লি পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন। এই মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনত দণ্ডবিধির ধারা ১৫৩এ/বি, ৫০৫, ৫০৬, ৩৪ এর অধীনে মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে বলে দিল্লি পুলিশের দাবি।

এমনিতেই দেশের প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জেএনইউ বা জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ডান ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের মধ্যে কথায় কথায় হরদম সংঘাত সেখানে রোজকার বিষয়। গেরুয়া শিবিরের তরফে জেএনইউ-র বামমনস্ক ছাত্র সংগঠনের পড়ুয়াদের কখনো ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’, কখনও ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে। কেন্দ্রীয় শাসক দলীয় শিবিরের কাছে আজও জেএনইউ পঠনপাঠনের পীঠস্থান নয়, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদের আঁতুরঘর’ বলে চিহ্নিত করা হয়। জেএনইউ দেয়াল লিখন কোন নতুন বিষয় নয়। সময়ে সময়ে অনেক রাজনৈতিক বিতর্কে বেশ চর্চায় রয়েছে। কিন্তু এবারের বিতর্কের ঝড় বেশ তাৎপর্য বহন করছে। বিশেষ করে দুটো সম্প্রদায়কে কোন অজ্ঞাত পক্ষ আক্রমণ করার জন্য বেছে নিয়েছে। তবে এবারের বিষয় ব্রাহ্মণ ও বানিয়া সমাজে আক্রমণ করায় এর তীব্র প্রতিক্রিয়া সংবাদ শিরোনাম দখল করেছে।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে চলা বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচন তথা আগামী লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ধরণের স্পর্শকাতর বিষয় উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে করা হয়েছে বলে বুদ্ধিজীবী মহলে সরগোল চলছে। যদিও এই ধরণের ইস্যুর বাস্তব ভিত্তি নেই, তদুপরি একটা জাতিয়তাবাদী বিষয় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এনে একে অপরের সাথে সংঘাত বাঁধানো কি কোন সংকীর্ণতার কাজ নয় ? মানে, দেয়াল লিখন দিয়ে কি বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে ?

আচ্ছা, বিশ্লেষণের সুবিধার্থে ব্রাহ্মণ-বানিয়া (বৈশ্য) বিরোধী শ্লোগান লিখা পক্ষকে যদি বামপন্থা বা দলিত সংগঠনের বিচারধারার মানুষ ধরে নেয়া হয়, তবে এই ধরণের শ্লোগান লেখার পেছনে লুকিয়ে আছে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমির সাথে বর্তমান উচ্চবর্ণের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মানসিকতা এবং বিশেষ করে সংবিধানের ১০৩ নং সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চবর্ণের আর্থিকভাবে দুর্বলদের দেয়া ১০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চিন্তা বা নির্বাচনে দলিত বামপন্থী এবং অন্য শ্রেণীর ব্যাক্তিকে বিজেপির বিরুদ্ধে একজোট করার চিন্তা। যেখানে তাদের বিচারধারা দরশায় জাত-পাত, উচ্চ - নীচের বিভাজনে ব্রাহ্মণ্যবাদের নামে ব্রাহ্মণ বানিয়া শ্রেণী শৈক্ষিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বা আরও বিভিন্ন দিকে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরও দলিত ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণী থেকে বহুগুণ অগ্রসর হয়ে আছে তা বিভিন্ন প্রতিবেদনে লক্ষিত। তবু বামপন্থী বা দলিত বিচারধারার কারোর দ্বারা যদি এইধরণের দেয়াল লিখন হয় তবে এটা জাতিগত আক্রমণ। এইধরণের সংকীর্ণ মানসিকতা এবং কাজ নিন্দনীয়।

অপরদিকে, এই দেয়াল লিখনের কাজ যদি এবিভিপি বা বিজেপি সমর্থিত কারো কাজ হয়ে থাকে, ধরে নেয়া হয়, তবে একটা অযৌক্তিক বিষয় নির্বাচনে ইস্যু বানিয়ে উচ্চবর্ণের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা বা জেএনইউ-র বামপন্থী বা দলিত গতিবিধি সাম্প্রদায়িকতা ছড়াচ্ছে দেখিয়ে দেশের জনগণকে বামপন্থী বা বিজেপি বিরোধী সমর্থন থেকে নিজেদের দিকে টেনে আনার অভিপ্রায়। অথবা দেশে জাতিবাদ বা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। যদি এবিভিপি বা এই ধরনের কারো দ্বারা এই দেয়াল লিখন হয় তবে এটাও নিন্দনীয়।

এখন কথা হলো এই দেয়াল লিখন কি কোন বামপন্থী- দলিত বা এবিভিপি ছাড়া কোন তৃতীয় পক্ষের ষড়যন্ত্র। এইধরণের বিভেদমূলক মন্তব্য কারা করেছে, নিশ্চয় রাতের অন্ধকারে লিখা দেয়াল লিখন দিনের আলোয় উদ্ভাসিত হবে। কিন্তু নীরব দর্শক গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা থেকে এই আশা করতে পারে কি একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সঠিক তথ্য সিনাক্তকরণ হবে ?

আসলে এইধরণের ঘটনা কোন রাজনৈতিক মুনাফা না দেশহীতের কাজে ঠিক কোনটা তা স্পষ্ট ফুটে উঠছে না। এইধরণের বিভেদকামী বিষয় নিয়ে ভারতবর্ষে শান্তি সম্প্রীতি বিনষ্ট করে কোনভাবেই 'জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন' নেয়া সম্ভব নয়। যেকোন উন্নয়নশীল দেশ বিকাশ ও উন্নয়নে তাদের ফোকাস সেখানে ধর্মীয় মেরুকরণ, জাতীবাদ, নারী নির্যাতন, সাম্প্রদায়িকতা বাদ দিয়ে মননশীল প্রগতির পথে। তাই বিকাশ ও উন্নয়ন হোক প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। দল - পন্থা নির্বিশেষে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংগঠন এক গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল কাজে দেশের উন্নয়নে দূরদর্শী এবং দায়িত্বশীল হওয়ার সময় এখনই।

Monday, November 28, 2022

মূল্যবোধ : নৈতিকতার নিরিখে বিশ্লেষণ


মানুষের জীবনবোধের সঙ্গে নৈতিক মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যদিও মানুষ প্রাণী তবুও সে পশু নয়। তাইতো সমাজ বিজ্ঞানী ডেভিড পোপেনোরের মতে -- ' ভালো মন্দ, ঠিক বেঠিক, কাঙ্খিত অনাকাঙ্ক্ষিত সমাজের সদস্যদের যে ধারণা তার নামই মূল্যবোধ। মূল্যবোধের অবক্ষয় এখন চারিদিকে প্রকট হয়েছে। মূল্যবোধ বলতে সকলের মনে একটা ধারণা আসে যদিও সুস্পষ্টভাবে কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবু মূল্যবোধ সাধারণত আচার আচরণের একধরণের মান বা বোধ, কিছু আদর্শগত সমষ্টি যার দ্বারা মানুষ যেকোন কাজের ভালোমন্দ, শুদ্ধতা অশুদ্ধতা যাচাই করে অগ্রসর হতে পারে। মহাত্মা গান্ধীর মূল্যবোধের শিক্ষা বলতে সত্যবাদিতা, অহিংসা, নির্ভিকতা, সামাজিক সচেতনতা এবং দায়িত্ববোধ, সেবা প্রমুখ বিষয়ের উপর জোর দেয়া হয়। অর্থাৎ মূল্যবোধ কেবলমাত্র ব্যক্তিগত ভালোমন্দ বিচার করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় ইহার সামাজিক দিকগুলোও আছে যেগুলো খুব প্রয়োজনীয়। মূল্যবোধ হলো মানুষ তাঁর নিজের এবং সমাজের জন্য এক বিশেষ ' কোড অব কনডাক্ট' যার দ্বারা একজন মানুষ অথবা সমাজ উত্তরণের দিকে অগ্রসর হতে পারে।

মূল্যবোধ সবসময় একটা জায়গায় থেমে থাকে না। World Value Survey মূল্যবোধের ওপর বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। এই সংস্থার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বিভিন্ন শাখার বিজ্ঞানীরাও। এর এক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে যে মূল্যবোধ বা ভ্যালু বলা বস্তুটি কখনও একজায়গায় স্থির থাকে না। সমাজ পরিবর্তন, বিবর্তনের সাথে সাথে মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটে। World Value Survey (WVS) - এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী যখনই কোন দেশের ঔদ্যোগিক বিকাশ ( industrialization ) এবং তার উত্তর -ঔদ্যোগিক জ্ঞান সমাজের (post industrial knowledge society) দিকে যতই এগোচ্ছে ততই ঐ দেশের পরম্পরাগত মূল্যবোধ যেমন - পিতামাতা ও সন্তানের মধ্যে বন্ধন, পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক, ধর্মীয় গুরুত্ব, অন্যান্য এসবের প্রতি টান কমছে। তবে হ্যাঁ, ধর্মনিরপেক্ষ - যুক্তিবাদী ( Secular rational values) মূল্যবোধের মান বাড়ছে। এই পরম্পরাগত পারিবারিক সম্পর্ক বা ধর্মীয় ক্ষেত্রে যে মূল্যবোধের অবক্ষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে, এর ফলে কি মানুষের মধ্যে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য কতটা অবনতি হয়েছে? WVS এর প্রতিবেদনে বলা হয় ১৯৮১-২০০৭ সন পর্যন্ত মানুষের সুখ শান্তি এবং জীবনের সন্তুষ্টি বেড়েছে। World happiness index - এ নৈতিকতা ও মূল্যবোধের নিরিখে সুখি দেশের তালিকা প্রস্তুত করে। সেখানে আমরা দেখতে পাই সেই সুখি দেশগুলোর মধ্যে শান্তি, শৃঙ্খলা, সন্তুষ্টি, সৌজন্যতা, সহনশীলতা, প্রগতিশীলতা বিদ্যমান।তাহলে আমরা নিশ্চয় বুঝতে পারছি মূল্যবোধ কোনো অচল-অটল বস্তু নয়। সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটে।

কিন্তু এখন কথা হলো আসলে মূল্যবোধের আধার কি ? ইহা কি এমনিতেই গড়ে উঠে না এর কোন সামাজিক প্রেক্ষাপট আছে ? আমরা নিশ্চয় সেই উলঙ্গ রাজার কথা জানি। যেখানে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেছেন - 'সবাই দেখছে যে রাজা উলঙ্গ, তবুও সবাই হাততালি দিচ্ছে। সবাই চেঁচিয়ে বলছে; শাবাশ শাবাশ।' গল্পটা সবাই জানি। কিন্তু সেই গল্পের ভেতরে শুধু প্রশান্তি বাক্য উচ্চারণ কিছু আপাদমস্তক ভিতু, ফাঁকিবাজ, অথবা নির্বোধ স্তাবক ছিলনা। একটা শিশুও ছিল। সত্যবাদী, সরল, সাহসী একটা শিশু। এখন প্রশ্ন হলো রাজসভায় যারা মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের মূল্যবোধের অবস্থান কোথায়? মূল্যবোধ আসলে কোন বিমূর্ত বস্তু নয়। মূল্যবোধ সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, দ্বারা প্রভাবিত। আজকাল বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের মতবাদের প্রচার চলছে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ মতবাদ প্রচারে বিভিন্ন চিন্তা একত্রে প্রসারিত করার চেষ্টায়। এক দলতো জোরপূর্বক তার মূল্যবোধ চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টায়। বিশ্বের সমস্ত ঘটনাবলি মানুষের নখদর্পণে। বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক সফলতা আর নিত্যনতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে সবকিছু আজ মানুষের সাধ্যে। তা সত্ত্বেও পৃথিবী হয়ে পড়েছে হিংস্র, অশান্ত আর নৈরাজ্যের ঠাঁই। বর্তমান সমাজে বস্তুগত সমৃদ্ধির পরও এক বিরাট সংখ্যক মানুষের মধ্যে দেখা যায় অনৈতিকতা, সীমাহীন দুর্নীতি, ছলচাতুরী, চুড়ান্ত মিথ্যাচার । ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতার শীর্ষে থাকাটা স্থির করে নিয়েছে মানুষ।

এমন এক সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে যেখানে প্রগতিশীল, ঔদ্যোগিক ধ্যান ধারণার বিপরীতে মৌলবাদী, একাত্ববাদী ধ্যানধারণার বিকাশ। সৃষ্টি হয়েছে ভয়- শংকা - বিদ্বেষের পরিস্থিতি। ধর্মীয় মৌলবাদ এবং তজ্জনিত হিংস্রতায় সমাজ এক অস্থির সময়ে বিরাজ করছে। এটা সমগ্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমরা এখন ঔদ্যোগিক সভ্যতার দিকে এগোচ্ছি। উত্তর -ঔদ্যোগিক স্তর পেতে এখনও বাকি। এখনও আমরা অবৈজ্ঞানিক ধ্যান ধারণায় আচ্ছন্ন। তার সাথে আমাদের ঠেলা হচ্ছে ধর্ম-জাত-পাত, অসহিষ্ণুতা, নিম্নগামী যুক্তি তর্কের পরিবেশে। তাইতো এই দ্রোহকালে ভুলে গেছি সৌজন্য বিনিময়। তবে এইভাবে কি মূল্যবোধের উত্তরণ সম্ভব ? মূল্যবোধের জন্ম সমাজেই হতে হবে। বিজ্ঞানী ব্রাউনের মতে - ' যদি পৃথিবীতে নৈতিকতার মান প্রযুক্তিগত কলাকৌশলের বৈপ্লবিক অগ্রগতির সাথে অগ্রসর না হয়, তাহলে আমরা নিশ্চিন্ন হয়ে যাবে। শিক্ষার বিস্তার বিজ্ঞানের চমকপ্রদ আবিষ্কারের ফলে প্রযুক্তিগত বিরাট প্রসার ঘটছে, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে নৈতিকতার মান অগ্রসর হয় নি। মূল্যবোধের উত্তরণ ঘটছে না। তবে সংকীর্ণ চিন্তার পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভয়ানকভাবে উত্থান ঘটছে ধর্মীয় মৌলবাদের। এমন এক প্রচলিত সমাজে এর পরিবর্তনের দায়ভার কে নেবে? এরজন্য আমাদের শিক্ষক - অভিভাবক দুজনেরই সমান অংশীদারিত্বে পরিবর্তন সম্ভব। কারণ আগত ভবিষ্যত সমাজের মূল্যবোধ রক্ষার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। অর্থাৎ আজকের যেসকল স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাঁদেরই।

সমাজে শিক্ষকের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের ব্যাক্তিগত জীবনে যদি লক্ষ্য করি তবে দেখা যায় কোন এক আদর্শ শিক্ষকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পরিচর্যায় আমরা আজ এতোটা এগিয়েছি। তাঁদের ব্যাক্তিত্ব, কথাবার্তা, চিন্তাধারা, ভাবনায় আমরা মুগ্ধ। নৈতিক শিক্ষা বা বিদ্যায়তনিক শিক্ষায় যদিও উনাদের মতো অগ্রসর হতে পারিনি তবে আমাদের ব্যাক্তিত্বের ক্ষেত্রে কতটা ফলপ্রসূ তা নিশ্চয় আমরা বুঝতে পারি। কারণ ছাত্রর জীবনে একটা ছেলে বা মেয়ে ঘরের পর সবথেকে বেশি সময় কাটায় স্কুলে। সেখানে একে অপরের সঙ্গে মেলামেশা, সহপাঠীদের সঙ্গে সহমর্মিতা, গুরুজনদের প্রতি ভক্তি, সত্যের প্রতি নিষ্ঠা, মুক্ত চিন্তার ক্ষমতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এসবের মূল্যবোধের ধারণা ও অভ্যাস সেখানেই গড়ে উঠে। আর এই অভ্যাস গড়ে তোলার মূল নায়ক হলেন শিক্ষক। শিক্ষকই হচ্ছেন Role Model । একজন শিক্ষক পুঁথিগত জ্ঞানদানের সাথে সাথে একজন পথপ্রদর্শক, সহানুভূতিশীল, বন্ধুভাবাপন্ন ব্যাক্তি। যিনি ছাত্রছাত্রীদের মূল্যবোধ ও নৈতিকতার নিঃশুল্ক জ্ঞান দিয়ে থাকেন। সেইক্ষেত্রে একজন শিক্ষক শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষক নন, সমাজেরও। তাই শিক্ষকের দায়িত্ব হলো যতটুকু জানা ততটুকুই সঠিকভাবে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করা। মূল্যবোধ ও নৈতিকতার নিরিখে জাপান বেশ এগিয়ে। জাপানের একটি কথা আছে - 'A poor teacher tells, an average teacher teaches, a good teacher explains, and a great teacher inspires.' একজন শিক্ষক ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করার জন্য, সৎ পথে চলার জন্য, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার নিরিখে সমাজ জীবনে সুস্থ মস্তিষ্কে অগ্রসর হওয়ার জন্য প্রথমে নিজেকে সেইমতে গড়তে হবে। তাহলে তিনি ছাত্রছাত্রীর আদর্শ হিসেবে পরিগণিত এবং তাঁর প্রদত্ত শিক্ষাকে ছাত্রছাত্রীরা চিরদিন স্মরণ রাখবে।

সেই একই ভাবে আমরা যারা অভিভাবক আছি তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটা শিশুর প্রথম শিক্ষা তার ঘর থেকেই শুরু। চোখ খোলার পর ঘরকেই সে আপন করে নেয়। একটি শিশু প্রথমেই তার বাবা মা -র কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে বড় হয়। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কিধরনের ভূমিকা পালন করতে হয়, সততা, তাদের বিশ্বাস, আচার ব্যাবহার সবকিছুই বাবা মায়ের কাছ থেকে শেখে। অভিভাবকের মধ্যে যদি অসদাচরণ, অযৌক্তিক চিন্তা চেতনা, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার দেখা যায় তবে সেই শিশুটিও মানসিকভাবে সেইভাবেই গড়ে উঠে। সমাজে যদি মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রয়োজন আছে, ভালোবাসা, সৎ অসৎ বিচারের প্রয়োজন আছে তবে তার বীজ ঘরেই রোপণ করতে হবে এবং এর মূল হতে হবে মা-বাবা দুজনেই। মানবসমাজ সেই প্রাচীনকাল থেকেই মূল্যবোধ কে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। আকারে ক্ষুদ্র দ্বীপ হলেও নৈতিকতার জন্য ইংরেজরা পুরো বিশ্ব জয় করেছিল। অনৈতিক কাজ দ্বারা ক্ষমতাসীন হলেও ধ্বংস অনিবার্য। পি বি শেলীর বিখ্যাত 'Ozymandias' -এ বলেছিলেন - My name is Ozymandias, King of kings, Look on my works, ye mighty and despair.'

আলোচনার পরিসমাপ্তিতে এটুকু বলা যায় যে আমরা দিন দিন যেভাবে নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে হারিয়ে ফেলছি তাতে বর্তমান সমাজ রোগাক্রান্ত। পারস্পরিক মমত্ববোধ,প্রেম, সৌজন্যতা এসব আমরা হারিয়ে ফেলেছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে, যেখানে একটা সুস্থ সমাজ উপহার দিতে পারি। নীতি - ঔচিত্যবোধ, সামাজিক ন্যায় বিচার, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহিষ্ণুতা, শ্রমের মর্যাদা, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ, রাষ্ট্রীয় আনুগত্য চর্চার মাধ্যমে উন্নত, সভ্য ও কলুষমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব। সঠিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চাই পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

তথ্যসূত্রঃ
১) আনন্দবাজার পত্রিকা নবীন প্রজন্মের অবক্ষয় এখন সর্বত্র, ২৪ আগষ্ট, ২০১৯।
২) www. Worldvaluesservey.org
৩) www. Worldhappiness.report
৪) www. Wikipedia.org

Monday, November 21, 2022

শরিয়া আইন আগ্রাসনে আফগান মহিলারা


আফগানিস্তানে পূর্ণ শরিয়া আইন প্রয়োগের নির্দেশ তালেবান নেতার। আফগানিস্তান থেকে যখন সোভিয়েত সৈন্যরা পিছু হটলো, তখন ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে উত্তর পাকিস্তানে এই তালেবান আন্দোলনের জন্ম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনীর প্রায় দুই দশকের উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে রাজধানী কাবুল দখল করার পর তালিবানরা নিজেদেরকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে। আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার পর তালিবানরা বলেছে যে তারা শরীয়া বা ইসলামী আইনের ভিত্তিতে দেশটি শাসন করবে। এই শরীয়া আইন নিয়েই উঠে এসেছে একগুচ্ছ প্রশ্ন।

তালিবান শরীয়া আইনের (Shariya Law) কঠোর প্রয়োগ, বিশেষ করে খুনী ও ব্যভিচারীদের জন্য প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মতো শাস্তির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। প্রসঙ্গত, আফগানিস্তানে সমস্ত মহিলাদের প্রকাশ্যে হিজাব পরতে হয়। কিন্তু তালিবানের দাবি, মহিলাদের প্রকাশ্যে সম্পূর্ণ শরীর এবং মুখ ঢাকা পোশাক পরতে হবে। বোরখা ছাড়া বাইরে বেরনো যাবে না। কিন্তু রাজধানী কাবুল-সহ শহুরে এলাকায় অনেক মহিলাই মুখ ঢাকছেন না বলে অভিযোগ। তার বদলে কেউ কেউ সার্জিক্যাল মাস্ক পরে ঘুরছেন। মেয়েদের হাইস্কুলে পড়া নিয়েও ইউ-টার্ন নিয়েছে তালিবান সরকার।

আফগানিস্তানে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি অপরাধের শাস্তি হিসেবে ইসলামী শরিয়া আইন মোতাবেক অঙ্গচ্ছেদ ও পাথর ছোড়ার মত সাজা দেওয়ার জন্য বিচারকদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন তালেবান নেতা হায়বাতুল্লাহ আখুন্দজাদা।তালেবান মুখপাত্র জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ গত রোববার রাতে টুইটারে এক পোস্টে এ বিষয়ে জানিয়েছেন বলে জানায় বিবিসি। জাবিহউল্লাহ তার পোস্টে লেখেন, মোল্লা আখুন্দজাদা একদল বিচারকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর ‘বাধ্যতামূলক’ এ আদেশ আসে।

তালেবানদের মতে শরিয়া আইনের আওতায়‘চোর, অপহরণকারী এবং রাষ্ট্রদ্রোহীদের মামলাগুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে। এসব মামলায় অপরাধ (হুদুদ এবং কিসাস) বিবেচনা করে ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী বিচার করতে হবে। হুদুদ সেসব অপরাধকে নির্দেশ করে, যেগুলোতে ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সাজা দেওয়া বাধ্যতামূলক। যেমন- ব্যভিচার, মদ্যপান, চুরি, অপহরণ, ডাকাতি, ধর্মত্যাগ এবং ধর্মদ্রোহিতার মতো অপরাধ। অন্যদিকে, কিসাস নির্দেশ করে বদলা নেওয়ার বিষয়টি (চোখের বদলে চোখ)। কিসাসের অন্তর্ভুক্ত হত্যা, ইচ্ছাকৃত আঘাতের মতো অপরাধগুলো। কিসাসভুক্ত অপরাধগুলোতে ভিক্টিমের পরিবার চাইলে ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে অপরাধীকে ক্ষমা করে দিতে পারবেন।

শুধু অপরাধ নয়, বিয়ে, বিচ্ছেদ সহ সমস্ত বিষয়েই কড়া বিধি রয়েছে শরিয়া আইনে। বর্তমানে ৫০টি দেশে এই শরিয়া আইনের কিছু কিছু অংশ মানা হয়। তার মধ্যে ৮টি দেশে কট্টর শরিয়া আইন মেনে চলা হয়। সৌদি আরব, ইরান, ব্রুনেই, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, পাকিস্তান, নাইজিরিয়া, কাতার। সৌদিতে অবশ্য সম্প্রতি মেয়েদের একা বাড়ি থেকে বেরনো এবং গাড়ি চালানোর অনুমতি দিয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ছিল তালিবান। তখন সেখানে কট্টর শরিয়া আইন পালন করা হত। রাস্তায় পাথর ছুড়ে অপরাধী সাজা তাছাড়া মেয়েদের ঘরবন্দি করা হয়েছিল। ২০০১ থেকে ক্রমে ধীরে ধীরে স্বাধীন হয়েছে আফগানিস্তান। মেয়েরা স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ফের তালিবান ক্ষমতায় আসায় স্বাভাবিকভাবেই চাপে আফগানরা। 

১৯৯০ এর দশকে তালেবান যখন প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিল তখন জনসম্মুখে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কারণে সমালোচিত হয়েছিল। গতবছর দ্বিতীয়বার আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর তারা তাদের শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে যুগের সঙ্গে তাল মেলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পালনে তাদের খুব একটা আগ্রহ নেই। বরং নারীদের বিভিন্ন অধিকার ও স্বাধীনতা খর্ব করার মধ্য দিয়ে তারা পুনরায় আগের শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে তালেবান নারীদের জন্য কাবুলের সব পার্কে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে।

একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে নোবেল জয়ী মালালা ইউসুফজাই - যিনি পাকিস্তানে মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারের পক্ষে প্রচারণার চালানোর কারণে ১৫ বছর বয়সে তালেবানের গুলিতে আহত হয়েছিলেন - সতর্ক করে বলেছেন যে শরীয়া আইনের তালেবানী দেশটির নারী ও কন্যা শিশুদের নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।"আফগানিস্তানে নারীসহ কিছু মানবাধিকার কর্মীর সাথে কথা বলার সুযোগ আমার হয়েছে। তারা তাদের উদ্বেগ জানিয়ে আমাকে বলেছেন যে তারা নিশ্চিত নন যে তাদের জীবন কেমন হতে যাচ্ছে," বিবিসিকে বলেন তিনি। তাদের অনেকেই ১৯৯৬-২০০১ সময়কালে যা ঘটেছিল তা স্মরণ করেছেন, এবং তারা তাদের নিরাপত্তা, অধিকার, সুরক্ষা এবং স্কুলে যাওয়া নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

তালিবান নেতা আকুন্দজাদার নির্দেশ কঠোর শরিয়তি আইন প্রয়োগ করতে হবে সর্বোচ্চ বিচারকদের। তালিবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর থেকে সেদেশের মহিলা ব্যাপক দমন-পীড়নের শিকার। তালিবানরা নির্দেশ দিয়েছে, মহিলা পার্কে যেতে পারবেন না। মহিলাদের জিমে যাওয়ার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এছাড়া পুরুষ আত্মীয় সঙ্গে না থাকলে মহিলাদের ভ্রমণের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ঘরের বাইরে পা রাখলে মহিলাদের হিজাব ও বোরখা পরাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সরকারি চাকরিতে কর্মরত বেশিরভাগ মহিলাকে তালিবান জমানা শুরু হওয়ার পরে ছাঁটাই করা হয়েছে। শরীয়া আইনের কঠোর প্রয়োগ যদিও হয় তবে এর অনেকগুলো ধারায় সাংঘর্ষিক এবং অসংগতিপূর্ণ। তালেবানদের এইধরণের গোঁড়ামি নিঃসন্দেহে নিজেদের দুর্বলতা জাহির করা ছাড়া আর কিছু নয়।

সমাজের এই কঠোরতা এতো সহজে ভাঙবে না, যতদিন পর্যন্ত এই পিতৃতন্ত্র কায়েম থাকবে; নারীবিদ্বেষের অস্তিত্ব,নারীবিরোধী মানসিকতা, ধর্ষণ,খুন,নির্যাতন চলতে থাকবে। নারীদের প্রথমে ইরানী মহিলাদের মতো অশুভ অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়তে হবে, লিঙ্গবৈষম্যকে বিলুপ্ত করার দায় সমাজে নারী-পুরুষ সকলের। এই বৈষম্য দূর করতে একমাত্র মানুষই পারবে। যেভাবে পারে গোটা পৃথিবী আলোকিত করতে।

Monday, November 14, 2022

মাদকাসক্তি : এক অনিশ্চিত জীবনের আলো


মাদকাসক্তি বর্তমান সময়ের মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদকের ছোবল আজ তার বিশাল থাবা বিস্তার করে চলেছে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। দেশের তরুণ প্রজন্ম এ নেশায় আজ আসক্ত। এ মরণনেশা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করা না গেলে এই প্রজন্মের পুনরুত্থানের স্বপ্ন অচিরেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য অংশ আজ এক সর্বনাশা মরণনেশার শিকার। যে তারুণ্যের ঐতিহ্য রয়েছে সংগ্রামের, প্রতিবাদের, যুদ্ধ জয়ের, দেশ গড়ার, আজ তারা নিঃস্ব হচ্ছে মরণনেশার করাল ছোবলে। মাদক নেশার যন্ত্রনায় ধুঁকছে শত-সহস্ৰ তরুণ প্রাণ। ঘরে ঘরে সৃষ্টি হচ্ছে হতাশা। ভাবিত হচ্ছে সমাজ।

Drug এবং Medicine দুটি সমার্থক শব্দ। কিন্তু Drug বলতে
আমাদের মনে একধরণের বিভীষিকা,ভয় বা সংশয়ের জন্ম দেয়। এর ব্যবহার তিনভাবে করা হয়। রোগ শনাক্ত করতে, রোগ নিরাময়ের জন্য, আর রোগ প্রতিষেধক হিসেবে। কিন্তু এর অপব্যবহার ভয়াবহ। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে, নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট রোগের ফলপ্রসূ হলো এই ড্রাগ, অন্যথায় এটা ঘাতক হতে পারে। তদুপরি কিছু ড্রাগ উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহার না করে অনেকেই মনোস্থিতি পরিবর্তন করার জন্য, একধরণের অবাস্তব স্বপ্নের দুনিয়ায় বিচরণের জন্য তা ব্যবহার করে থাকে। সাধারণত ইহাকে ড্রাগের অপব্যবহার বা Drug abuse বলা হয়। এই ধরণের ড্রাগ সমূহকে Narcotic Drugs বলা হয় এবং রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করা ড্রাগসমূহকে Pharmaceutical Drug বা Life saving drug বলা হয়। Narcotic drug abuse, ইহার কুফল এবং মানব সমাজের জন্য ইহা কতটুকু ভয়াবহ, বিভীষিকাময় এবং ক্ষতিকারক; নবপ্রজন্মের উপর এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা যাক।

Narcotic Drug সেবনকারীর হিতাহিত জ্ঞান প্রায় নাই বললেই চলে। কেননা, ইহা pharmaceutical drug থেকে বেশি গতিসম্পন্ন এবং অতি কম সময়ের ভিতরে রক্তের সাথে মিশে যায় ও বিভিন্ন ধরণের বিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই ড্রাগ সেবনকারী ব্যাক্তি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং তার অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। ফলে বিভিন্ন কুকর্মে এবং অপরাধ জনিত কারণে অতি কম সময়ের ভিতরে Narcotic Control Bureau বা NCB র সাথে ঘনিষ্টতা বাড়ে আর জেলে বন্দি জীবন যাপন করতে হয়। Narcotic and Psychotropic Act, 1985 এর বিভিন্ন ধারার অধীনে মাদকসেবন কারীর উপর মামলা আরম্ভ হয়। এছাড়া এই খুব দ্রুত শারীরিক দুর্বলতা এবং অসুস্থ হয়ে পড়ে।

LSD, cocaine, marijuana , brown sugar এগুলো অতি ভয়ংকর ড্রাগস। বিখ্যাত ফুটবল তারকা ডিয়েগো ম্যারাডোনার কোকেইন নামক ড্রাগসে কি দুর্গতি করেছিল তা সকলেরই জানা। বিগত দশকের মাল্টি মিলিওনিয়ার হলিউড অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোর অকাল মৃত্যু drug abuse এর জন্যই হয়েছিল। বলিউড তারকা সুশান্ত সিং রাজপুতের মতো উদীয়মান প্রতিভাশালী অভিনেতার অপমৃত্যু এবং সেই কাণ্ডের সাথে জড়িত সকল কাহিনীর কথা কেউ ভুলতে পারে ?

পৃথিবীতে প্রায় সকল দেশেই কম বেশি পরিমাণে ড্রাগ নামের ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। যৌবনের উদ্যমতা নিয়ে চলা ছেলে মেয়েদের জীবন অকালেই স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। কত যে সুখের সংসার মাদক জাতীয় বিভীষিকার কবলে ছারখার হয়েছে, কত যে প্রতিভার অপমৃত্যু হচ্ছে প্রতিনিয়ত আমাদের চোখের সামনে এর কি আর হিসেব রেখেছি !

আজ পৃথিবীতে প্রায় সকল দেশই নিজের থেকে শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে বোমা বারুদ থেকে ড্রাগের টোপ বেশি ব্যবহার করে থাকে। কারণ শত্রুপক্ষ কে বাঁধা দিতে ড্রাগের দ্বারা শত্রুর বড় শক্তিকে পঙ্গু করা সহজ। ২০১৬ সালের 'উড়তা পাঞ্জাব' মুভি, পাকিস্তান থেকে ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা প্রমুখ জায়গায় চলা চোরাই পথে ব্যবসা বাণিজ্য দ্বারা আক্রান্ত যুবসমাজের উপর নির্মিত, অভিনয় করেছেন আলিয়া ভাট ও শাহিদ কাপুর। অথবা ২০২০ সালের 'মালাঙ্গ' মুভি, গোয়াতে ড্রাগসের রমরমা ব্যবসায় দেশী-বিদেশী যুব সমাজ কীভাবে আক্রান্ত তা অভিনয়ের মাধ্যমে আদিত্য রায় কাপুর ও দীশা পাঠানি অত্যন্ত বাস্তব উপস্থাপন ফুটিয়ে তুলেছিলেন। আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশ থেকে শুরু করে মেক্সিকো, পানামা, উরুগুয়ে, প্রমুখ দেশে drug trafficking দ্বারা জর্জরিত।আমাদের আসামের পার্শ্ববর্তীতে থাকা গোল্ডেন ট্রাইএঙ্গেল নামে কুখ্যাত ম্যানমার, থাইল্যান্ড, সিংগাপুর প্রমুখ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ড্রাগ উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে আসা ড্রাগের দ্বারা আসামের সাথে উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সমূহ তথা আমাদের বরাক উপত্যকার বিভিন্ন অঞ্চল যে কতটা বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সম্মুখীন তা না বললেই হবে। আমাদের এই প্রজন্ম কতটা ড্রাগসের শিকার হয়েছে, আমরা সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে! দুঃখের বিষয় হলো রাতারাতি টাকার পাহাড় গড়ার লক্ষ্যে কিছু প্রতিষ্ঠিত 'গেস্টাপো' ব্যাক্তি পুরো সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারে।

মাদকদ্রব্যের এই সর্বনাশা ব্যবহার বর্তমান বিশ্বে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে এই পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা বাঞ্চনীয়। আমাদের পুলিশ প্রশাসন এই মাদকের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে। 
মাদকদ্রব্য উৎপাদন ও আমদানি রোধ করার জন্য প্রতিরোধ কর্মসূচি আরো জোরদার করা, মাদক চোরাচালান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, সমাজের প্রত্যেক মানুষকেই এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা, বেকারত্ব হ্রাস করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য বইয়ে মাদকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা, আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর ভূমিকা পালন করা, সরকারি উদ্যোগ বৃদ্ধি করা এবং সভা, সমিতি, সেমিনার ও আলোচনার মাধ্যমে মাদক প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা। আজ থেকে সজাগ ও সচেতনভাবে বলে দেই " NOT TO DRUGS"।

Wednesday, November 9, 2022

অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে ভারতে


গোটা ভারত জুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য মারাত্মক ভাবে বেড়েছে! ধনীরা আরও ধনী হয়েছে, আর গরিব হচ্ছে আরও গরিব। ভারতের অর্থনীতি অতিমারির প্রভাব কাটিয়ে ‘ঘুরে দাঁড়াচ্ছে’, অন্তত ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে। এমনই মনে করছে কেন্দ্রীয় সরকার। কোন ভারত? বিশ্বব্যাঙ্কের প্রাক্তন মুখ্য অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সার্বিক ভাবে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্মণ দেখা গেলেও তার সুফল আটকে রয়েছে সমাজের উঁচু তলায়। আর দেশের অর্ধেক মানুষ মন্দার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন।

'ইকোনমিস্ট' পত্রিকার ২৭ অক্টোবর সংখ্যায় 'ল্যাটিটিউড ইজ এভরিথিং' (Latitude is everything) শিরোনামে ভারতের অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে এক সাবধানতা মূলক ও ভীতিকর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রতিবেদনের একেবারে শুরুতে বলা হয়েছে যে ভারতের দক্ষিণ অংশ অর্থ উৎপাদন করে এবং উত্তর অংশ শিশু উৎপাদন করে। এবং পরিণতি বিস্ফোরক হতে পারে।প্রতিবেদনে গোয়ার কথা উল্লেখ করে লেখা হয়েছে গোয়ার পশ্চিম উপকূলে একটি বহু-সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল, যা গলদা চিংড়ির আবাসস্থল এবং চমৎকার জীবনযাত্রার মান। গোয়ার গড় ব্যক্তির আয় উত্তরের গঙ্গা অঞ্চলিয় বিহারের গড় ব্যক্তির আয়ের চেয়ে দশ গুণ বেশি।'ইকনোমিস্ট' -র কথায়, গোয়া ও বিহারের মানুষের জীবনযাত্রার মানের মধ্যে যতটা তফাত রয়েছে দক্ষিণ ইউরোপ এবং সাব-সাহারান আফ্রিকান দেশগুলির মানুষের জীবনযাত্রার মানের মধ্যে ততটা ফারাক।

 চীন, বাংলাদেশ প্রভৃতি অনেক দেশের উদাহরণ দিয়ে দ্য ইকোনমিস্ট বলেছে, এই ধরনের আঞ্চলিক বৈষম্য পৃথিবীর আর কোনো দেশে তেমন দেখা যায় না। ভারতের দক্ষিণ ও পশ্চিমের রাজ্যগুলি সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেখা গেছে এবং বিহার,উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থান এবং পশ্চিমবঙ্গ, যা ভারতের মোট জনসংখ্যার চল্লিশ শতাংশ, প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মানুষ, চরম দারিদ্র্য এবং অনগ্রসরতায় বসবাস করে।'ইকোনমিস্ট'- র মতে ২০১০ সালের পরের দশকে, বিহারের জনসংখ্যা ১৬.৫ শতাংশএবং উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যা ১৪ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, কেরালা, তামিলনাড়ুর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১০ শতাংশেরও কম। ভারতে শিল্পে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা মাত্র ১৪ শতাংশ, চীনে ২৭ শতাংশ এবং বাংলাদেশে ২১ শতাংশ।

ভারতের জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ উত্তরপ্রদেশে বাস করে, শিল্পে নিয়োজিত লোকের সংখ্যা উত্তরপ্রদেশের জনগণের মাত্র ৯ শতাংশ। দেশে শিল্পে নিয়োজিত অর্ধেকেরও বেশি লোক রয়েছেন দক্ষিণের পাঁচটি রাজ্য এবং পশ্চিমে গুজরাটে। অ্যাপলের মতো একটি কোম্পানির পণ্য তৈরির ১১টি কারখানার মধ্যে উত্তরাঞ্চলে রয়েছে মাত্র একটি, শুধুমাত্র তামিলনাড়ুতেই রয়েছে ৬টি কারখানা।

ভারতই বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে বসতি স্থাপনের জন্য আভ্যন্তরীন স্থানান্তরের অনুপাতও সবচেয়ে কম। এই কারণে, একই যোগ্যতা, শিক্ষা এবং বর্ণ থাকা সত্ত্বেও, একজন ব্যক্তি একই দেশে ভয়, সংশয়ের কারণে অন্য ব্যক্তির তুলনায় অনেক গুণ কম উপার্জন করে।

 'এক ভাষা, এক দল, এক জাতি' ধরনের নীতি ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে বিদ্বেষ বাড়ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের চলাফেরায় চরম আঘাত হানছে। একজন সাধারণ মানুষ তার বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাওয়ার আগে একশোবার চিন্তা করে। তার উপরে পরিবহন সুবিধা ব্যায়বহুল করে যেভাবে জনগণের চলাচল ব্যাহত করা হচ্ছে তাতে এই অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও দ্রুত বাড়ছে। এতে কি বোঝা যায় সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী হিংসার পরিবেশ সরাসরি কোনো শক্তিশালী নীতির ফল।

মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং কর্পোরেট পুঁজিবাদের একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থাপনা যখন বিশ্বের সম্পদকে গুটি কয়েক পরিবারের হাতে পুঞ্জিভূত করে তুলছে, তখন সম্পদের সুষম বন্টনই এ সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত অর্থনীতির সুষম বন্টন ব্যবস্থাই শান্তি, সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। আজকে আমাদের সমাজে যে বিপরীতমুখী বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করছি, একদিকে সরকার দেশে ব্যাপক উন্নয়নের দাবী করছে অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাধারণ মানুষ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে দেশ পিছিয়ে পড়ার বাস্তবতা তুলে ধরছে। কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার মধ্যে রেখে দেশের কয়েকশ পরিবার শতকোটি টাকার মালিক হয়ে যাওয়া এবং সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতাই হচ্ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে সৃষ্ট সামাজিক সঙ্কট। দেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যের অভিশাপমুক্ত করতে হলে প্রথমেই সম্পদের সুষম বন্টন ব্যবস্থার উপর নজর দিতে হবে।

Monday, October 31, 2022

শিশুর বিকাশে মানসিক ও সামাজিক পরিবেশ


 ‘যে ব্যক্তি শিশুকে স্নেহ করে না, তার বাবা-মা কিংবা শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা নেই।’ --- বার্ট্রান্ড রাসেল

আগামী দিনে শিশুরা হবে রাষ্ট্রনায়ক, সরকারপ্রধান, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সচিব, শিক্ষক, নজরুল, ঈশ্বরচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সাবিত্রী বাঈ ফুলে। এ জন্য সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে, নৈতিকতা মূল্যবোধ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। মানবসন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে শিখতে শুরু করে। তবে জন্মের পর থেকে ১০ বছর বয়সে পৌঁছা পর্যন্ত সময়ই শিশুর মস্তিস্ক বিকাশের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বয়সেই শিশুদের মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা, অনুসন্ধিৎসা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিভা বিকশিত হয়। সুতরাং এই বয়স থেকেই একজন শিশুকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চায় অভ্যস্ত করা জরুরি। এ সম্পর্কে দালাই লামার উক্তি প্রণিধানযোগ্য ‘শিশুর নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বীজ গ্রথিত হয় পরিবারে। তা বিকশিত হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর চর্চা হয় সমাজে।’ তাই সার্বিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষাপ্রক্রিয়ায় পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

একটি শিশুর মানসিক বিকাশের সাথে সামাজিক পরিবেশের একটা কগনেটিভ সম্পর্ক থাকে। বিকাশ যেভাবেই হোক না কেন, এটা সদাই একটা ক্রমবর্ধমান গতিতে অগ্রসর অর্থাৎ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি হয়। সেইজন্য মানসিক বিকাশের সাথে নিত্য পরিবৰ্তন হয়ে থাকা পরিস্থিতির একটা প্ৰভাব থাকে। উদাহরণস্বরূপ দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ে আমাদের দেশে বিশেষভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা কম বয়সী যুদ্ধরত সৈন্যদের ক্ষেত্ৰে মানসিক রোগ দেখা দিয়েছিল এবং সেই সময়ে আমাদের ভারতবৰ্ষে মানসিক রোগীর জন্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সৈনিকদের চিকিৎসার জন্য। দেশের পরিস্থিতি এবং সমাজের অস্থিরতা মানুষের মনের বিকাশ, চিন্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যে প্ৰভাব ফেলে এবং সাথে তা নিয়ন্ত্ৰণও করে। উদাহরণস্বরূপ আমাদের যখন কোভিড১৯ র জন্য বন্ধ হয়েছিল স্কুল-কলেজ এবং দেশে এক অনিশ্চিত পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। তখন একটি বিকাশরত শিশুর মানসিক বিকাশকে বৃহত্তর বা কম পরিমাণে প্রভাবিত করেছিল।

এই ধরনের পরিবেশে একটি শিশুর মনে কেমন অনুভব বা ধারণ করে তা বোঝা কঠিন, তবে আমাদের উচিত শিশুদের যতটা সম্ভব দুশ্চিন্তা থেকে দূরে রাখা এবং তাদের মানসিক বিকাশে সহায়তা করার জন্য তাদের সবসময় একটি সুস্থ পরিবেশে রাখা উচিত। সমাজে চলিতমান রাজনৈতিক অস্থিরতা বা ধর্মীয় বাতাবরণ থেকে শিশুদের দূরে রাখতে হবে। এই ক্ষেত্ৰে সামাজিক মাধ্যমে কিছু সচেতন হতে হবে। সব সময় ঋণাত্মক ভাবধারা পরিহার করে কিছু ইতিবাচক চিন্তা এবং ভালো ও সুস্থ স্বপ্ন দেখাতে হবে। মহামারি কি আমরা জানি কিন্তু একটি ১২-১৪ বছরের শিশুর ক্ষেত্রে এটা খুব হতাশজনক বিষয়। ভয় পাবে এবং মনে দুঃখ ভাব আসতে পারে। দীর্ঘকালীন এই ভাবধারা হলে স্বল্প পরিমাণে হলেও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। সেইজন্য শিশুর সঙ্গে কোনো ধরনের আতংকময় পরিবেশের সূচনা আপনাকে পরিহার করতে হবে।

একটা কথা বলা হয় যে সমাজের সঙ্গে নিজেক খাপ খাইয়ে চলার জন্য শিশুর কিছু অভিজ্ঞতার আবশ্যক। কিন্তু আমি মনে করি যে সেই অভিজ্ঞতা মাতৃ স্নেহের থেকে পরিপুষ্ট পরিবেশে হতে হবে বা অভিভাবকদের উচিত আপদকালীন সময়ের আলোচনা থেকে আত্মবিশ্বাসীমূলক শব্দে শিশুকে কিছু শেখানো বা বোঝানো।

যখন আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে করোনা কালে ঘরে বসে অনলাইন পদ্ধতির মাধ্যমে পড়তে দেয়া হয়েছিল তখন তাদের মনের এমন ভাব হয়েছিল যে তারা যেন সর্বদা এইভাবে ঘরে থেকে সময় অতিবাহিত করতে হবে না কি? বা ভবিষ্যত কি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা যারা অভিভাবক এবং শিক্ষক ছেলেমেয়েদের ইতিবাচক দৃষ্টিতে পরিবেশ- পরিস্থিতি বুঝতে বা বুঝাতে চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে। এই ধরনের মহামারী ১০০ বছর আগেও হয়়েছিল এবং সমস্ত সমস্যার সমাধান আছে বা একমাত্র ধৈর্য ধারণ ও বিজ্ঞানের উপর বিশ্বাস রাখাটা খুব জরুরী। শিশুদের সৃষ্টিকৰ্তার বিপরীতে বিজ্ঞানের উপর বিশ্বাস রাখার উপদেশ দিতে হবে। শুধু বিশ্বাস না প্রমাণ সহ বুঝিয়ে দিতে হবে। যা একটি শিশুর মানসিক বিকাশে ও পরবর্তী সময়ে প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করবে।

শিশুর মানসিক বিকাশে পরিবেশের প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে শিশু যে রকম সামাজিক পরিবেশে বড় হয়, তার মানসিকতাও সেভাবে গড়ে ওঠে। শিশুর পারিবারিক পরিবেশ, তার পরিচিত গণ্ডি ও আত্মীয়-স্বজন সবার একটা প্রভাব শিশুর ওপর পড়ে। এমনকি এই বলয়ের মধ্যে তার স্কুলের শিক্ষক, প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধব সবার সম্মিলিত প্রভাবে শিশুর ভেতর একটি মনস্তত্ত্ব গড়ে ওঠে। শিশু ধীরে ধীরে তার পড়াশোনা ও বয়সের পাশাপাশি তার চারপাশের সামাজিক পরিবেশ থেকে যে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান লাভ করে, তা-ই তার মানসপটে একটি আসন তৈরি করে নেয়। একইভাবে শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য ব্যায়াম, খেলাধুলা, সঙ্গীত, সাহিত্য ও শিল্পকলায় অংশগ্রহণ করতে হবে। তাদের শেখানো উচিত, যা শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে উৎসাহিত করে। শিশুদের উপর অতিরিক্ত চাপ দেয়া উচিত নয় এবং তাদের সবকিছুতে দক্ষ করতে তাদের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। এটা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

আজকের শিশুকে আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে তার জন্য একটি উপযুক্ত সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা আবশ্যক। কিন্তু এতসব জটিল সমীকরণ সামনে রেখে শিশুদের জন্য একটি সর্বজনীন সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা সত্যি কঠিন একটি কাজ। তারপরও কাজ যত কঠিনই হোক, সেটি অসম্ভব মোটেই নয়। এ সত্যকে সামনে রেখে দেশের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে শিশুবান্ধব নীতি-কৌশল প্রণয়ন করেছে ভারত সরকার।

একইভাবে আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রে সমাজ ব্যবস্থা পরিচালিত হয় কিছু প্রতিষ্ঠিত আইনের দ্বারা; যেখানে কিছু নির্দেশনা থাকে, যদ্বারা সমাজে কল্যাণ সাধন করা হয়। এইক্ষেত্ৰে শিশুর জন্য আমাদের দেশে কয়েকটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। যেমন —

(১) শিশু শ্রম নিবারণ আইন ১৯৮৬।
(২) বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধকরণ আইন ২০০৬। 
(৩) শিশুর সুরক্ষা এবং আদর-যত্ন এবং কিশোর ন্যায় আইন ২০০০।
(৪) শিশুর অধিকার সংরক্ষণ আয়োগ আইন ২০০৫।
(৫) বিনামূল্যে শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯।
(৬) শিশুর উপর হওয়া যৌন নির্যাতন প্ৰতিরোধ আইন ২০১২।

এগুলি হল রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রয়াস যাতে শিশুদের মানসিক বিকাশ এবং তাদের সকল প্রকারের উন্নতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়। এই আইনগুলি কার্যকর করার মাধ্যমে, আমরা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী এবং সুস্থ সমাজ গঠনের চেষ্টা করছি। তাই সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের আজকের শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। সরকারের এসব উদ্যোগের পাশাপাশি দেশের সব নাগরিক নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমাদের শিশুদের জন্য একটি অনুকূল সামাজিক পরিবেশ তৈরিতে সচেষ্ট থাকলেই আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাব আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে।

Friday, October 21, 2022

মানবতার শেষ দান হোক 'মরণোত্তর দেহদান'


‘ মরণোত্তর দেহদান ' ব্যাপারটি সচেতন মানুষের কাছে এখন পরিচিত হলেও অনেকের কাছে সামগ্রিক ধারণাটি তেমনভাবে স্পষ্ট নয়। মরণোত্তর দেহদান হল মৃত্যুর পর শবদেহ ধর্মীয় প্রথাসিদ্ধ মতে সৎকার না করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বার্থে দান করা। ক্ষণস্থায়ী জীবনে আমাদের সবার উচিত ভালো কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা। তাই মরণোত্তর অঙ্গ বা দেহদান এমনই একটি কল্যাণকর কাজ। তবে অঙ্গদান নিয়ে মানুষের মাঝে একটা আবেগ কাজ করে। এখন প্রযুক্তিতে আমরা অনেক এগিয়ে যাচ্ছি। এখন মানবিকভাবে আরও এগিয়ে যেতে হবে।

চিকিৎসায় গবেষণা ও শিক্ষার উদ্দেশ্যে মৃত্যুর পর সমগ্র দেহ দান করা। মানবদেহ বুঝতে এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য মেডিকেল ছাত্র এবং গবেষকদের সাহায্য করার জন্য শরীর দান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে কোন ব্যক্তি তাদের দেহ দান করতে ইচ্ছুক, মৃত্যুর আগে স্থানীয় মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল বা একটি এনজিওর সাথে পূর্বে ব্যবস্থা করতে পারেন। ইচ্ছুক ব্যক্তিরা একটি মেডিকেল প্রতিষ্ঠান বা একটি এনজিও থেকে একটি সম্মতি ফর্মের জন্য অনুরোধ করতে পারেন, যারা সম্ভাব্য দাতা মারা যাওয়ার পরে অনুসরণ করা নীতি এবং পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য দেবে। যাইহোক, একটি পূর্বের সম্মতি ফর্মে স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক নয় তবে এটি বাঞ্ছনীয় যাতে আপনার পরিবার আপনার সিদ্ধান্ত এবং আপনার ইচ্ছা পূরণে তাদের যে ভূমিকা পালন করা দরকার সে সম্পর্কে সচেতন হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সহজে তা পাওয়া যায় না। এখানে ধর্মীয়, পারিবারিক, সামাজিক অনেক কিছু জড়িত। তবে ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে তো তর্ক করে লাভ নেই। এটা যার যার বিশ্বাস। অনেকই অঙ্গদানে ভয় পান। এতে অনেক সময়ে ডোনারের সঙ্কট দেখা দেয়। দেহদান করতে হয় স্বেচ্ছায়। যে কেউ চাইলেই দেহ দিতে পারেন।

কিন্তু এই দান ভারী অদ্ভুত। যাঁর মৃতদেহ তিনি কিন্তু নিজে এই দান করতে পারেন না, সেটাই স্বাভাবিক। কারন মৃত্যুর পর তিনি দান করবেন কিভাবে? কোন ব্যক্তি জীবিতকালে শুধুমাত্র তাঁর এই ইচ্ছার কথা অঙ্গীকারের মাধ্যমে জানিয়ে রাখতে পারেন শুধু। তাঁর ইচ্ছাপূরণের দায়টা কিন্তু নিকটজনের। আর এই ইচ্ছাপুরণটা যাতে হয় সেক্ষত্রে অঙ্গীকারকের একটা ভূমিকা আছে। তা হল এই অঙ্গীকারকের বিষয়টি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন। যা দিয়ে সে নিকটজনকে মোটিভেটেড করতে পারবেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন করা হবে এই দান? তাহলে আমাদের জানতে হবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে মৃতদেহের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? আধাত্মিক, আত্মা, পরলোক ইত্যাদি ধারণা থেকে আমরা যে ধর্মীয় মতে বিশ্বাসী, সেই ধর্মের বিধান অনুসারে আমাদের মৃতদেহের অন্তিম কাজ করা হয়। যা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও অবৈজ্ঞানিক। যে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিধান অনুযায়ী আমরা চলি তার বয়স খুব বেশি হলে প্রায় তিন হাজার বছর। কিন্তু বিবর্তনের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি আধুনিক মানুষ, বিজ্ঞানীরা যাকে হোমো সেপিয়েন্স বলে অভিহিত করেছেন সেই সময়ের একটা পর্যায়ের পর মানুষ মারা গেলে সেই মৃতদেহ কবর দেওয়া হত। মৃতদেহের সাথে খাবার সামগ্রী দেওয়া হত। কিন্তু এর সঙ্গে আত্মা বা ঐশ্বরিক কিংবা এই জাতীয় কোনো চিন্তার যোগ ছিল না। আমার এই মতে মৃতদেহ কবর দেওয়ার ব্যাপারটা এসেছে মৃতদেহের পচন ও সেই পচন থেকে দূর্গন্ধের জন্য। আগুনে পোড়ানো অনেক পরে এসেছে।এক সময় নদীতেও ভাসিয়ে দেওয়া হত।

আরজ আলী মাতুব্বর মৃত্যুর কিছুদিন আগে তার লেখা ‘কেন আমার মৃতদেহ মেডিকেলে দান করেছি’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বলেন – 'আমি আমার মৃতদেহটিকে বিশ্বাসীদের অবহেলার বস্তু ও কবরে গলিত পদার্থে পরিণত না করে, তা মানব কল্যাণে সোপর্দ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। আমার মরদেহটির সাহায্যে মেডিক্যাল কলেজের শল্যবিদ্যা শিক্ষার্থীগন শল্যবিদ্যা আয়ত্ত করবে, আবার তাদের সাহায্যে রুগ্ন মানুষ রোগমুক্ত হয়ে শান্তিলাভ করবে। আর এসব প্রত্যক্ষ অনুভূতিই আমাকে দিয়েছে মেডিকেলে শবদেহ দানের মাধ্যমে মানব-কল্যাণের আনন্দলাভের প্রেরণা।’

মৃত মানবদেহ (যাকে ক্যাডেভার বলা হয়) ছাত্রদের অ্যানাটমি, শরীরের গঠন অধ্যয়ন এবং এটি কীভাবে কাজ করে তা শেখানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি চিকিৎসক, সার্জন, ডেন্টিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কোর্স। নতুন জীবন-রক্ষাকারী অস্ত্রোপচার পদ্ধতির উন্নয়নে গবেষণা চিকিৎসকদের দ্বারাও মৃতদেহ ব্যবহার করা হয়, উদাহরণস্বরূপ, অন্যদের মধ্যে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গে অস্ত্রোপচার পদ্ধতি। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলি স্বেচ্ছায় অনুদানের মাধ্যমে মৃতদেহ গ্রহণ করে, সেইসাথে পুলিশ যারা দাবিহীন মৃতদেহ দান করে তাদের কাছ থেকেও। এই দানগুলি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা এবং ছাত্রদের দ্বারা অত্যন্ত মূল্যবান।

'মানুষের দেহ থেকে আত্মাটা বেরিয়ে গেলে দেহটাকে তখন বলা হয় শবদেহ বা লাশ যেটাকে আত্মীয়-স্বজন- প্রতিবেশীরা সমাহিত বা দাহকার্য সম্পন্ন করতে পারলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। পুড়িয়ে দিলে ভস্মে পরিণত হয় অথবা কবরস্থ করলে পচে গলে মাটিতে পরিণত হয় এবং এটাই বাস্তব। তো সেই অপ্রয়োজনীয় শবদেহের কিছু অংশ দিয়ে যদি কিছু জীবিত মানুষের উপকার হয়, তাহলে সৃষ্টিকর্তার রুষ্ট হওয়ার কথা নয়। এটাই হলো বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তি। কিন্তু, সমস্যা হলো ধর্মের প্রতিনিধিদের নিয়ে। এক একজন মুফতি মাওলানা মুখস্থ করা হাদিসের কিছু বিবৃতি আপনাকে শুনিয়ে দিবেন। কিন্তু তাঁদের জানা উচিত ভারতে আজ পর্যন্ত যত সংখ্যক অঙ্গ প্রতিস্থাপন হয়েছে তার প্রায় ৪৫% প্রতিস্থাপিত হয়েছে কোনো মুসলমানের দেহে। তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? মুসলমানেরা অন্যের মৃতদেহের অঙ্গ গ্রহন করতে পারবে কিন্তু নিজের মৃতদেহের অঙ্গ অন্যকে দান করতে পারবেনা -তাই তো? মুফতি মাওলানারাও আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ নেন এবং তাঁরা এটাও জানেন যে, যে ডাক্তারেরা তাঁদের চিকিৎসা করেছেন বা করছেন তাঁদের প্রত্যেককে মৃতদেহের উপর রিসার্চ করে ডাক্তার হতে হয়েছে। তারমানে, তাঁরা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুযোগ নিবেন, কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়নে সহযোগিতা করবেন না। এই দ্বিচারিতা মেনে নেওয়া যায় না। আবার কেউ কেউ তো আধুনিক চিকিৎসাটাও নিতে চান না। একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। কয়েকদিন আগে আমার একজন মাওলানা মামা আমাকে ফোন করে জানতে চাইলো রায়গঞ্জে কোনো লেডি গাইনো ডাক্তার আছেন কিনা। আমি তাঁর খোঁজ দিলাম। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা গেল মামীর জরায়ুতে একটি সিস্ট আছে। সেটা এমন পর্যায়ে আছে যে অপারেশন না করলে সেটি ওষুধে সারবেনা। শুরু হয়ে গেল কাঁচুমাচু। ধমক দিয়ে বললাম তোমার একটা অপারেশনের দরকার হলে তুমি করাতে না। শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছা সত্বেও ওটি করালো এবং এখন মামী বেশ সুস্থ আছে। বাইরের লোককে কি বুঝাব, আমার নিজের পরিবারেই এমন অনেকে রয়েছেন। বিজ্ঞানের সাথে হাদিসের একটা সংঘর্ষ আছে। আর এই হাদিস লিখিত হয়েছিল ১৫০০ বছর আগে, তখন কিন্তু বিজ্ঞানের এতো অগ্রগতি হয়নি। মুসলমানেরা অনেক বিজ্ঞান মেনেও নিয়েছেন এবং প্রয়োজনের তাগিদে মেনে নিতে হবেই। তাহলে এ বিষয়ে কয়েকটি গল্প বলি। আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগেও অনেক মুসলমান ঘড়ি ব্যবহার করতেন না। তাঁরা ইফতার কিংবা সেহেরি করতেন সূর্যের আভা দেখে অথবা নামাজ পড়তেন নিজের ছায়া দেখে। এখন ঘড়ি দেখে তা করা হয় এবং প্রায় প্রত্যেকটি মসজিদে ঘড়ি এবং নামাজের সময় সারণি দেখতে পাবেন। কয়েকবছর আগে মুয়াজ্জিনরা খালি গলায় আজান দিতেন, এখন মাইকে দেন। এভাবেই মানুষের প্রয়োজনে বিজ্ঞানকে সমর্থন করতেই হবে। 

এখন মুসলমান পরিবারের প্রচুর ছেলেমেয়ে ডাক্তার হচ্ছে। তাঁদেরকেও অন্যের মৃতদেহ কাঁটাছেঁড়া করে ডাক্তারী দক্ষতা অর্জন করতে হয়। হাদিস অনুসারে তাঁরা একাজ করতে পারেন না। তাহলে মেনে নিচ্ছেন কেন? মনে রাখতে হবে মানুষের প্রয়োজনে হাদিস, হাদিসের প্রয়োজনে মানুষ নয়। অর্থাৎ যে হাদিস মুসলমানদের কল্যাণের অন্তরায় তাকে এড়িয়ে চলুন। তাছাড়া, যে হাদিসগুলো নিয়ে মুসলমানেরা বিভ্রান্ত ছিল, ইসলামিক স্কলারেরা মানুষের কল্যাণে সেগুলির অনেকটাই স্পষ্টীকরণ ঘটিয়েছেন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মানুষের কল্যাণে মুসলমানদের আরো যুক্তিবাদী হয়ে উঠতে হবে। হাদিস অনুসারে মুসলমানদের বিশ্বাস মৃতদেহকে কবরস্থ করার পর কবরের মধ্যেই তার পাপপুণ্যের হিসাব শুরু হয়। ঠিকই আছে বিশ্বাসের খাতিরে তা বিশ্বাস করলাম। কিন্তু যে সব মুসলমানের মৃতদেহ দুর্ঘটনার কারণে বা যুদ্ধের কারণে বা অন্য কোনো কারণে পাওয়া যায় না বা কবরস্থ করা সম্ভব হয়না, তাদের পাপপুণ্যের হিসাব কোথায় শুরু হবে এবং কিভাবে শুরু হবে? আমি বিশ্বাস করি ইসলাম একটি আধুনিক এবং বস্তুনিষ্ঠ ধর্ম। সমাজ গঠনে এই ধর্মের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সেই ধর্ম যদি একপেশে আলেমের বগলদাবা হয়ে থাকে, তাহলে মুসলিমরা মুক্ত হবে কিভাবে? আলোচনা হোক। আমি যে প্রশ্নগুলি উত্থাপন করেছি, কোনো সহৃদয় আলেম যদি তার যুক্তিনির্ভর উত্তর গুলি দেন তাহলে আমি বাধিত হবো।' (লিখেছেন শাহীদুর রহমান, ফেসবুক পোস্ট)

দুঃখের বিষয় হলো একবিংশ শতাব্দীতেও আমাদের দেশে সাধারণ মানুষদের মধ্যে এই প্রক্রিয়াটি এখনো জনপ্রিয় করা যায়নি। বেহেস্তের বা স্বর্গের অলীক হুর-পরীর লোভ, নরক কিংবা দোজখের ভয়, কুসংস্কার আর অপবিশ্বাসের পাশাপাশি অশিক্ষিত এবং অর্ধশিক্ষিত মোল্লা -- পুরোহিত ছড়ি ঘোরানো যে সমাজে প্রবল সে সমাজে এই ধরণের ব্রাত্য ধারণাকে জনপ্রিয় করাটা কষ্টকরই বটে। কিন্তু উদ্যোগ তো নিতে হবে কাউকে না কাউকে একটা সময়। আসলে সেই ভাবনা থেকেই লেখাটির শুরু। আমি নিজেও এ ধারনায় নতুন সৈনিক। অনেক কিছু জানার চেষ্টা করছি। যতটুকু জেনেছি বুঝেছি এর নিরিখেই প্রবন্ধটি লেখা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস পাঠক মহলে নিশ্চিত আগ্রহ বাড়বে। আমাদের দেশে যদিও ইতিমধ্যে বিরাট প্রসার ঘটছে তৎসংগে বরাক উপত্যকায়ও এর সাড়া মিলছে বিশেষ ভাবে। ধন্যবাদ জানাতে হয় সেই সকল ব্যক্তিদের যারা বিভিন্ন এনজিও বা সংগঠনের হয়ে এর প্রচার ও প্রসারে নিরলসভাবে কাজ করে আসছেন। আমরা বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকায় তা দেখি। এই আগ্রহ এবং সাড়া শুভবুদ্ধিধারী মুক্তমনা মানুষদের আগ্রহের চারাগাছ। এই চারাগাছ ধীরে ধীরে বড় হবে, কালের মহীরুহ হয়ে ছড়িয়ে পড়বে আনাচে কানাচে।

ক্লাইমেট চেঞ্জ: গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও আমাদের দায়ভার


দিন যত গড়াচ্ছে, ততই চরম হচ্ছে জলবায়ু। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনাও বাড়ছে খুব তীব্র ভাবে। সংকটময় এমন পরিস্থিতির মধ্যে শঙ্কা জাগা তথ্য দিয়েছে রাষ্ট্রসংঘ। বিশ্ব সংস্থাটি বলছে, দুর্যোগের পূর্বাভাস বা আগাম সতর্কতা পেতে আধুনিক সরঞ্জাম নেই বিশ্বের অর্ধেক দেশের কাছেই। পৃথিবীর তাপমাত্রা,দশ বছরে সমুদ্রের জলস্তর প্রায় দুগুন বাড়ছে, গ্লেসিয়া গলছে, বড় বড় আইসবার্গগুলো ভেঙে পড়ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ দ্রুত হারে বাড়ছে।সামগ্রিকভাবে, আমরা আমাদের নিজেদের প্রজন্মকে আমাদের চেয়েও খারাপ জীবন দিতে চলেছি। নাসার ওয়েবসাইট থেকে ক্লাইমেট চেঞ্জ সেকশনে যদি নজর দেয়া হয় তবে আমরা নিশ্চয় বুঝতে পারবো যে  জীবন সহজ করতে আমাদের সকল কৌশল, আবিষ্কার, উদ্ভাবন সমগ্র মানবজাতিকে মারাত্মক বিপদে ফেলেছে। এই খারাপ পর্যায়টি ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং এই পর্যায়টি আগামী অন্তত এক শতাব্দী ধরে চলতে থাকলে, যা সময়ের সাথে সাথে আরও খারাপ হতে পারে। এর পরিণাম এতোটাই খারাপ হতে পারে যে আমাদের প্রজন্ম কখনো অতি খরা, কখনো বন্যা, কখনো ঘূর্ণিঝড়, আবার কখনও সুনামীর মতো ভয়ঙ্কর প্রলয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে শুধু নিজেকে বাঁচানোর প্রচেষ্টায় থাকবে।

১৮৫০ এর উদ্যোগিক কালের শুরুর সাথে সাথেই পৃথিবীর দূর্ভাগ্য লেখার কাজ আধুনিক মানুষেরা নিজের হাতে সংকল্পবদ্ধ হয়ে নিয়েছে। আমাদের নিশ্চয় মহান বৈজ্ঞানিক আর্লবার্ট আইনস্টাইন এর নাম মনে আছে। যিনি তাঁর সময়ে দাবি করেছিলেন যে আগামী একশ বছরে পৃথিবীর জনসংখ্যা এত বেশি হয়ে যাবে যে, কোথাও জমায়েত বা ভিড় করার প্রয়োজন হবে না। কারণ আপনি যেখানে দাঁড়াবেন সেখানেই ভীড় পরিলক্ষিত হবে ! তার এই বক্তব্য নিশ্চয় এখন প্রশ্নবোধক চিহ্নের নির্দেশ দেয়। কারণ আইনস্টাইন, যিনি ১৯৫৫ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন, তিনি কখনোই চাননি যে পুরো সত্য ঘটনা বলতে এবং সেই যুগের ধর্মান্ধ চিন্তা জগতের সাথে শত্রুতা করতে। আইনস্টাইনের মৃত্যুর পর থেকে পৃথিবীতে কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন ইত্যাদি গ্যাসের মাত্রা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।এগুলি এমন গ্যাস যা একটি নির্দিষ্ট আনুপাতিক স্তরে জীবনের জন্য সামঞ্জস্য তৈরি করে, কিন্তু গত পঞ্চাশ বছরে তাদের অনুপাত আশ্চর্যজনকভাবে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, যারফলে এক প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

 এই গ্যাসগুলির বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলি হল মোটর গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়া, কারখানার ধোঁয়া, ক্রমাগত বন কাটা ইত্যাদি।পাহাড়ে আমরা অনেক অন্যায় করেছি, অপরাধ করছি, অমানবিক কাজ করছি। এই কাজগুলি আমাদের সকলের জন্যে গ্লানির। ইতিহাস আমাদেরকে ক্ষমা করবে না। আমি একদিন মরে যাবো, আজকের যে তরুণ তিনিও একদিন বুড়ো হবেন, তার একদিন মৃত্যু হবে- কিন্তু ইতিহাসে এই কথাটা থেকে যাবে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাহাড়ের সাথে অন্যায় করেছি এবং সেই অন্যায়ের দায় আমার নামে আপনার নামে সকলের খাতায়ই যুক্ত হবে। এই ধরনের মানবিক কার্যকলাপ, যাকে আমরা বিজ্ঞানের আবিষ্কার বলে মনে করি, আধুনিক মানুষ অর্থাৎ আমরা আমাদের জীবনকে সহজ করে তুলেছি। এই গ্যাসগুলোর আপনি যদি গ্রাফ আকারে ক্রমবর্ধমান স্তরের দিকে তাকান তবে আগামী ২৫ বছরে যদিও কোন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ (যদিও আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব) না আসে তবুও আমরা আমাদের প্রজন্মের অক্সিজেন ক্রয় করে জীবন বাঁচাতে হবে যেভাবে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোগীকে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে দেয়া হয়।এমতাবস্থায় তো অক্সিজেন উৎপাদনকারী বড় কারখানা থেকে অতিরিক্ত গ্যাস হিসেবে হাইড্রোজেনও নির্গত হবে।

গত চল্লিশ বছরে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতা সমগ্র পৃথিবীর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা মাত্র এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে, মহাসাগরের গড় তাপমাত্রাও বেড়েছে মাত্র অর্ধ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের ১০০ মিটার উপরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার সাথে বরফ গলে যাওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আট ইঞ্চি বেড়েছে। যেখানে চল্লিশ বছরের এই পরিসংখ্যান পৃথিবীর তাপমাত্রার উপর এত বড় প্রভাব ফেলেছে, যেখানে ২০১৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত খুব স্বল্প সময়, অর্থাৎ মাত্র ছয় বছর। সেখানে পৃথিবীর দশ হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ তাপমাত্রার সময় রেকর্ড করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বড় প্রমাণ আমাদের চারপাশে তা দৃশ্যমান, অকালীন বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যা যা বর্তমান সময়ের আলোচিত সমস্যা, নাসার প্রতিবেদনে সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ দেখানো হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মৌমাছির উপর তীব্র প্রভাব ফেলছে , তাদের পরাগায়নের ক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে বলে জানা গেছে।  অনেক জায়গায় মৌমাছির অস্বস্তিকর মৃত্যু হচ্ছে।  মৌমাছির উপর যে হুমকির সৃষ্টি হয় তা আমাদের ফ্লোরার উপর সরাসরি প্রভাব পড়ে।  মৌমাছির অবসানের সাথে সাথে, পৃথিবী সেই সমস্ত উদ্ভিদের খারাপ প্রভাবও দেখতে পাবে যা পরাগায়ন করছে, যার প্রভাব সরাসরি মানব জাতিকে একটি সংকটজনক পরিস্থিতিতে নিয়ে যাবে।

পরিস্থিতিতন্ত্রের অবনতির সাথে সাথে, জীবনের সম্ভাবনা সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, যার পর আমাদের প্রজন্ম আমাদের সরাসরি প্রশ্ন করতে পারে যে জীবন মিশ্রিত ছিল, তাহলে কেন আমরা পৃথিবীতে জীবন শেষ করেছি এবং মঙ্গল গ্রহে প্রাণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি? বিশ্বজুড়ে সরকার এই বর্তমান সৃষ্ট সমস্যাটি মোকাবেলা করার জন্য দৃঢ় এবং উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি গুরুতর প্রয়োজন দেখছে, তবে এটি দুঃখের বিষয় যে বৈশ্বিক রাজনীতি এখনও কেন্দ্রীভূত শক্তি, পুঁজিবাদ এবং কর্মক্ষমতার উপর আড়ষ্ট রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যখন মানবজাতির ওপর সংকটের মেঘ ঘনীভূত , তখন বিশ্বের সরকারগুলোকে সম্পূর্ণভাবে দায়ী না করে ভোগবাদের জগৎ সরকার নয়, সাধারণ মানুষের তৈরি।  এই সময়ে, যখন মানবজাতির ভবিষ্যত সম্পূর্ণরূপে মানুষের হাতে, তখন সমস্ত মানুষের একত্রিত হয়ে সরকারকে সতর্ক করার একটি বড় প্রয়োজন,  এবং এটিই একটি সমাধানের পথ প্রশস্ত করে।

Wednesday, September 21, 2022

আইএনএস বিক্রান্ত, 'সাগরের সিকান্দার'

দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা অটুট রাখতে আরও এক ধাপ এগোল ভারত। গত ২ সেপ্টেম্বর কোচিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে আইএনএস বিক্রান্ত তুলে দেওয়ার ফলে শুধুমাত্র যে ভারতের হাতে দ্বিতীয় এক বিমানবাহী রণতরী এল তা-ই নয়, সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বিক্রান্ত ভারতকে সেই আন্তর্জাতিক কুলীন গোষ্ঠীতে স্থান দিল, যারা একক প্রচেষ্টায় এ-হেন বৃহৎ মাপের রণতরী বানাতে সক্ষম।

 প্রথমত লক্ষণীয় বিষয় যে ভারতে নির্মিত আইএনএস বিক্রান্তে ব্যবহৃত সমস্ত কিছুই স্বদেশীয় নয়। অর্থাৎ কিছু যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকেও আমদানি করা হয়েছে। যাইহোক, সমগ্র প্রকল্পের ৭৬ শতাংশ দেশে উপলব্ধ সংস্থান দ্বারা গঠিত। এটি অবশ্যই একটি বিরাট অর্জন। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের আমলে আইএনএস বিক্রান্তের নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। ২০১৩ সালের ১২ অগস্ট কোচিতে সেই কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী একে অ্যান্টনি।

যুদ্ধজাহাজ বিক্রান্ত নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় স্তরের ইস্পাত প্রস্তুত করেছিল স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (SAIL)। এই স্টিল তৈরিতে ভারতীয় নৌবাহিনী এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন গবেষণাগারের (ডিআরডিএল) সহায়তাও নেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছে যে SAIL-এর এই ইস্পাত তৈরি করার ক্ষমতা ভবিষ্যতেও দেশকে অনেক এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। নৌবাহিনীর মতে, এই যুদ্ধজাহাজের জিনিসপত্র দেশীয়, যার মধ্যে রয়েছে ২৩ হাজার টন ইস্পাত, আড়াই হাজার টন ইস্পাত, ২৫০০ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক তার, ১৫০ কিলোমিটার পাইপ এবং ২০০০টি বাল্ব। এ ছাড়া এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ারের অন্তর্ভুক্ত হুল বোট, এয়ারকন্ডিশন থেকে শুরু করে রেফ্রিজারেশন প্ল্যান্ট এবং স্টিয়ারিং যন্ত্রাংশও দেশেই তৈরি হয়েছে।

সরকারী তথ্য অনুসারে, ভারতের অনেক বড় উদ্যোগীক নির্মাতারা এই বিমানবাহী রণতরী নির্মাণে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে ভারত ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড (BEL), ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড (BHEL), কির্লোস্কর, এলএন্ডটি (L&T), কেলট্রন, জিআরএসই, ওয়ার্টসিলা ইন্ডিয়া এবং অন্যান্য। এছাড়া জাহাজে দেশীয় যন্ত্রপাতি তৈরিতেও সহায়তা করেছে শতাধিক মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প।
বর্তমানে মাত্র পাঁচ থেকে ছয়টি দেশের বিমানবাহী রণতরী তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। এখন ভারতও এই ক্যাটাগরিতে যোগ দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ভারতের একটি বিমানবাহী রণতরী নির্মাণ নৌক্ষেত্রে তার সক্ষমতা দেখিয়েছেন বিশ্বদরবারে।

আসলে, অতীতেও ভারতের বিমানবাহী রণতরী ছিল। তবে ছিল ব্রিটিশ বা রাশিয়ান। যেখানে আগে ভারতের দুটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার - আইএনএস বিক্রান্ত-1 এবং আইএনএস বিরাট ছিল ব্রিটেন থেকে কেনা 'এইচএমএস হারকিউলিস' এবং 'এইচএমএস হার্মিস'। একই সময়ে, ভারতীয় নৌবাহিনীর একমাত্র বিমানবাহী জাহাজ - আইএনএস বিক্রমাদিত্য, সোভিয়েত যুগের যুদ্ধজাহাজ - 'অ্যাডমিরাল গোর্শকভ', যা ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে কিনেছিলো। অর্থাৎ আইএনএস বিক্রান্তকে নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করায় ভারত এখন বিমানবাহী রণতরী নির্মাণে সক্ষম দেশ হয়ে উঠেছে।

 মজার ব্যাপার হল ভারতে নির্মিত প্রথম এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ারের নাম আইএনএস বিক্রান্ত। যেখানে এর আগে ভারতের প্রথম এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার - এইচএমএস হারকিউলিস যা ব্রিটেন থেকে কেনা হয়েছিল এর নামও আইএনএস বিক্রান্ত ছিল। বলা হয়, এর পেছনে রয়েছে ভারতের প্রথম বিমানবাহী রণতরীটির প্রতি ভালোবাসা ও গর্বের অনুভূতি। 1997 সালে ডিকমিশন হওয়ার আগে, আইএনএস বিক্রান্ত সময়ে সময়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় নৌবাহিনীকে শক্তিশালী রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

এই দিনে প্রধানমন্ত্রী নতুন প্রতীক-যুক্ত নৌবাহিনীর পতাকারও উন্মোচন করলেন। নৌবাহিনীর পতাকায় প্রতীক পরিবর্তন নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু এই বার ঔপনিবেশিক আমলের স্মৃতিবাহী সেন্ট জর্জ’স ক্রস সরিয়ে সেখানে জাতীয় পতাকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছত্রপতি শিবাজির সময়ের মুদ্রার প্রতীক। বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য "নৌবাহিনীর প্রতীকে তাঁকে স্থান দেওয়ার অর্থ সেনাবাহিনীর ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিটি নষ্ট করার সচেতন প্রয়াস। তাঁর ভাষণের মধ্য দিয়েও যেন প্রধানমন্ত্রী প্রকারান্তরে বোঝাতে চেয়েছেন, ঔপনিবেশিক গোলামি থেকে মুক্ত হয়ে নৌসেনা অতঃপর হিন্দু জাতীয়তাবাদের দিকে পা বাড়াল। স্মরণে রাখা ভাল, একটি গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী কোনও দলীয় মতাদর্শ প্রচারের স্থান নয়। নৌবাহিনীর এক উজ্জ্বল দিনে ঠিক সেই কাজটিই করে নরেন্দ্র মোদী দেশের গৌরবকেই খাটো করলেন।" তবে বিক্রান্তের মোতায়েন, প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের স্বনির্ভরতার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আইএনএস বিক্রান্ত ভারত-প্যাসিফিক এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলে আগামী দিনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে অবদান রাখবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

Saturday, September 10, 2022

বিদ্যালয় একত্রিকরণ ও কিছু কথা


সাক্ষরতা একটি মানবাধিকার। দারিদ্র দূর করে সকলের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ৫০ বছরের বেশি হল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয় প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে। ৮ সেপ্টেম্বর সারা বিশ্বে জুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস (International Literacy Day)। বিশ্ব জুড়ে নিরক্ষরতা দূর করে স্বাক্ষরতা এবং শিক্ষার হার বাড়ানোর লক্ষ্যে ইউনেস্কোর তরফে এই দিনটির প্রচার করা হয়। সকলকে এই দিনটির মাধ্যমে বোঝানো হয় শিক্ষা এবং স্বাক্ষরতার গুরুত্ব, এবং এটা কীভাবে মানুষকে তাঁর সামাজিক অধিকার এবং মানবাধিকার পেতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধি মানেই দারিদ্র, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার দিকে এগোনো। শিক্ষাকে সব স্তরে পোঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ১৯৬৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দিনটিকে প্রথম আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস বা ‘ইন্টারন্যাশনাল লিটারেসি ডে’ হিসাবে ঘোষণা করেছিল। সেদিন থেকে প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্তে, নানা দেশে এই দিনটি নানা ভাবে আন্তর্জাতিক সক্ষরতা দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে।

আচ্ছা এখন সাক্ষরতা প্রসঙ্গের সাথে মিল রেখে অন্য কথায় যাওয়া যাক। রাজ্যের কিছু সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকার কর্তৃক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো চলছে একত্রিকরণ। ২০টি জেলার ১৭১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ করে কাছাকাছি বিদ্যালয়ের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। আগের সরকারের আমলে রাজ্যে প্রায় ৭,০০০ প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে আশেপাশের স্কুলের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছিল। 2022 সালের ম্যাট্রিক পরীক্ষায় শূন্য ফলাফল দেখায় সরকার ১৫টি জেলার ৩৪টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং হাই মাদ্রাসা বন্ধ করার কাজ সম্পন্ন করেছে । সরকার নিশ্চিত যে সেই বিদ্যালয়সমূহে শিক্ষক ভালভাবে পড়ান নাই, সেই বিদ্যালয়গুলোতে থাকা সেই অঞ্চলের জনগণ পঢ়াশোনার প্ৰতি আগ্রহী নয়, সেই অঞ্চলের শিক্ষাৰ্থীদের সরকারের হয়ে চিন্তা করা সকলের একই ধারণা যে এরা ‘গাধা’। সেইজন্য ‘গাধা’র নামে সরকারি ধন খরচ হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। এবার স্পষ্টভাবে বলি তাদেরকে ‘গাধা’ বলে সম্বোধন আমি করছি না বা এই স্পর্ধা আমার নেই। সরকারের হয়ে চিন্তা করা সকল, মন্ত্ৰী-বিধায়ক, পরামৰ্শদাতা একাংশ বুদ্ধি দিয়ে চলা লোক, স্ব-স্বাৰ্থসিদ্ধির জন্য সরকারের কথায় তাল মিলিয়ে গান গাওয়া সকলের চিন্তাতেই সেই অঞ্চলের শিক্ষাৰ্থীরা ‘শিক্ষার প্ৰতি আগ্রহহীন’, ‘গাধা’। সরকার পক্ষের কাউকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তারা সঙ্গে সঙ্গে বলে দেবে না। কিন্তু স্কুল বন্ধের কারণ ব্যাখ্যা করা গেলে সবাই বুঝতে পারবে এটাই চূড়ান্ত সত্য।

বন্ধ স্কুলগুলোর শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সরকার। সরকার কি তথ্য প্রমাণ করাতে পারবে যে একজন শিক্ষকের অবহেলার কারণে একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান খারাপ হয়েছে? যে সরকার স্কুলটি বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে তারা কি প্রমাণ দিয়ে জনগণকে বোঝাতে পারবে যে স্কুলটি এলাকায় অবস্থিত সেখানে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার কোন প্রভাব নেই?

সরকার কি নিশ্চিত যে, এবার যারা ব্যর্থ হয়েছে তাদের ছাড়া যেসব এলাকায় শিক্ষার মান খারাপের অভিযোগে স্কুল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেখানে আর কোনো শিক্ষার্থীর জন্ম হবে না? সেসব স্কুলের আওতাভুক্ত এলাকায় যদি আর কোনো মানুষ না জন্মায়, সরকার নিশ্চিত যে এটাই শেষ প্রজন্ম, তাহলে বেশি কিছু বলার দরকার নেই। সরকারের চোখে 'গাধা' প্রমাণিত শিশুরা যখন সই করতে জানে তখন তারা পড়া বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু সরকার যদি নিশ্চিত না হয় যে ওইসব এলাকায় আর কোনো শিশুর জন্ম হবে না, তাহলে উঠতি শিশুরা স্কুলে যাবে কোথায়? নাকি সরকার ওইসব এলাকায় ‘গাধার’ জন্ম দেওয়া বন্ধ করার জন্য বাধ্যতামূলক বন্ধ্যাকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে, যাতে সেখানে আর স্কুলের প্রয়োজন না হয়!

ফলাফলের উপর ভিত্তি করে একটি বিদ্যালয় বন্ধ করা হলে এলাকায় শিক্ষার মারাত্মক ক্ষতি হয়। এলাকায় এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে দেওয়া হয় না। দরুন মাজুলির একটি গ্রামের একমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি পরীক্ষায় ফেল করার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কারণে বন্ধ করা শিশুদের কথা না বললেও স্কুলের বাকি শিক্ষার্থীদের কী হবে? যদি তারা পড়াশোনা করতে চায় তবে তাদের একটি বা দুই নদী পার হতে হবে বা বালির মধ্যে দিয়ে দুই তিন কিলোমিটার দূরে অন্য স্কুলে হেঁটে যেতে হবে। বর্ষায় তো সেভাবে যাওয়াই যায় না।

এভাবে এক স্কুলের শিক্ষার্থীরা যখন অন্য স্কুলে চলে যায়, তখন কি ওই স্কুলে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য জায়গা থাকবে? যেসব স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের ওপর এভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে সরকার পক্ষ থেকে কি বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেয়া হবে ?

বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের কী হবে? তাদের তো ঐ স্কুলের প্রয়োজনে রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের পড়াতে ও পাস করতে না পারায় 'অদক্ষ' শিক্ষক-কর্মচারীরা বিলম্বে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে বিরত রাখা হবে ?না, চাকরি পরিবর্তন হয়ে যাবে! বন্ধ স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কী হবে? তিনি কি আবার সহকারী শিক্ষক হবেন? পদের অবনতি হলে ওই প্রধান শিক্ষকরা কি আইনি ব্যবস্থা নেবেন না? নাকি অন্য শিক্ষকদেরও জ্যেষ্ঠতা হ্রাস পেলে তারা চুপ থাকবে? কারণ সরকারি চাকরিতে জ্যেষ্ঠতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেহেতু এখন পর্যন্ত চাকরি সংক্রান্ত কোনো আপত্তি লক্ষ্য করা যায়নি, তাই বোঝা যায় তাদের জ্যেষ্ঠতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বন্ধ স্কুলের নামে রয়েছে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী। তাহলে স্কুল বন্ধের শাস্তি কার? শাস্তি শুধু স্কুলের আওতাভুক্ত এলাকার মানুষ ও ছাত্র ছাত্রীদের। অর্থাৎ হয়রানির শিকার শুধু এরাই।

বন্ধ স্কুলের ঘর ও অন্যান্য সম্পত্তির কী হবে? সংক্ষেপে, ঘরটি মর্গে পরিণত হবে, দুষ্টচক্রের জন্য মদ এবং জুয়ার আসর হবে। আর কিছু হোক আর না হোক ! সরকার নির্দেশ দিতে পারে যে অন্যান্য সম্পত্তি প্রতিবেশী স্কুলগুলিতে হস্তান্তর করা হবে কিন্তু তা কি হস্তান্তর করতে রাজি হবে স্কুল কমিটির সদস্য বা এলাকার মানুষ ? দেশে অনেক স্কুল আছে যেগুলো জনগণের অনুদানে কেনা হয়েছে জনগণ কি সহজে তাদের নির্মাণ ও অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি ছেড়ে দেবে? ফলস্বরূপ, অনেক সম্পত্তি ধ্বংস হবে, বা হারিয়ে যাবে। তবে স্বাধীনতা দিবস ও প্রজাতন্ত্র দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে হবে শিক্ষক-কর্মচারীদের। স্কুল বন্ধ করার ক্ষেত্রে সরকারের মূল উদ্দেশ্য ব্যয় কমানো। এমন বিভ্রান্তির কারণে যদি স্কুল বন্ধ থাকে, তাহলে খরচ কমবে কোথায়? বিদ্যালয় বন্ধ করে একটি এলাকার শিশু ও জনগণের অসুবিধা সৃষ্টি করা ছাড়া আর কিছুই হবে না।

"সরকার স্কুল বন্ধ করার আরেকটি গোপন কারণ হল শিক্ষার সম্পূর্ণ বেসরকারীকরণ। একের পর এক সরকারি সম্পদ বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দেওয়ার পর কোনো দপ্তরকে দক্ষতার সঙ্গে চালাতে অযোগ্য মন্ত্রীদের ভরপুর সরকার শিক্ষা সম্পূর্ণভাবে কোনো না কোনো মালিকের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে নানা অজুহাতে স্কুল বন্ধ করে দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুল ইন্টিগ্রেশন। বিভিন্ন কারণে সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বেসরকারি খাতে পাঠাতে বাধ্য হবেন।"

ইতিমধ্যে, বেশিরভাগ উচ্চ ও মধ্যবিত্ত এবং কিছু নিম্ন মধ্যবিত্তরা বেসরকারি স্কুলগুলির প্রতি মুগ্ধ। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। বিভিন্ন কারণে, আমিও আমার সন্তানদের বেসরকারি স্কুলে পাঠাই। তবে সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে কিছু নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র অভিভাবকদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা গ্রহণে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হবে হয়তো এটি সরকার কর্তৃক বুঝতে বোধহয় অসুবিধা হচ্ছে।

এর ফলে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখা সুবিধাভোগীদের সরকার পক্ষে রাজনৈতিক লাভ হবে। তাহলে যে রাজনীতিবিদরা একদল অশিক্ষিত মানুষকে দেশের নাগরিক বানিয়েছেন এবং রাজনীতিবিদরা তাদের সন্তানদের ইংল্যান্ড বা দেশের স্টার স্কুলে পড়ান, তাদের পক্ষে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিকল্পিত ভাবে রাজনীতি পরিচালনা করা সহজ হবে। কারণ সেই অশিক্ষিত নাগরিকরা সরকারের উপকারভোগী এবং শক্তিশালী সমর্থক হয়ে উঠবে। সেই ক্যাটাগরিতে সংখ্যা বাড়বে। কারণ দেশে দারিদ্র্যসীমার ওপারে ভোটারের সংখ্যা এখনো কম নয়। এই দরিদ্রদের অবস্থার কোন উন্নতি হবে না, শিক্ষার অভাব তাদেরকে আরও দরিদ্র করে তুলবে। স্কুল বন্ধ করে সরকার এমন দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্র করবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

সরকার বিভিন্ন জায়গায় মডেল স্কুল খুলেছে। সরকার কি স্কুল খোলায় শতভাগ পাসের নিশ্চয়তা দিতে পারে? সরকার কি বন্ধ স্কুলের সব শিক্ষার্থীকে এসব স্কুলে ভর্তি করা নিশ্চিত করবে? আমরা আশা করি যে জনপ্রতিনিধিরা জনগণের উদ্বেগের মধ্যে দিনরাত কাটান তারা যে সমস্ত এলাকায় বিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সেখানে সকল শিক্ষার্থীর জন্য সহজলভ্য শিক্ষা নিশ্চিত করবেন। এটাও উল্লেখ করা দরকার যে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। এর সঙ্গে সরকারের গুণগত ও উন্নত পরিকাঠামো দেয়ার পরিবর্তে শিক্ষানুষ্ঠান সমুহকে চিরতরে বন্ধ করে দেয়া রাজ্যজুড়ে এক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন দল, সংগঠন, ব্যাক্তি বিশেষ সরকারের এই সিদ্ধান্তকে পুনঃ বিবেচনা করার জন্য দাবি জানিয়েছে।

Friday, September 9, 2022

ইজরায়েল অধিকৃত গোলান হাইটস





বর্তমান বিশ্বের বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ভূখণ্ড হচ্ছে গোলান হাইটস। যাকে নিয়ে ১৯৬৭ সাল থেকে ইজরায়েল এবং সিরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ, সংঘাত এবং বিবাধ চলে আসছে। আরব এবং ইজরায়েলের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ১৯৪৮-৪৯ সালে। এবং এর পরবর্তীতে প্রধানত ১৯৫৬ সালে দ্বিতীয় যুদ্ধ, ১৯৬৭ সালে তৃতীয় যুদ্ধ,১৯৭৩ সালে চতুর্থ যুদ্ধ, এবং ১৯৮২ সালে পঞ্চমতম যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটেছিল।পেলেস্টাইন কে কেন্দ্র করে ১৯৬৭ সালে ইজরায়েলের সাথে ইজিপ্ট, সিরিয়া এবং জর্ডানের মধ্যে তৃতীয় বৃহৎ যুদ্ধের সূচনা হয়। ইতিহাসে 'সিক্স ডে ওয়ার' হিসেবে চিহ্নিত এই যুদ্ধে ইজরায়েল গাজা স্ট্রীপ এবং সিনাই উপদ্বীপ ইজিপ্টের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছিল। জর্ডানের কাছ থেকে ইজরায়েল পূর্ব জেরুজালেম এবং ওয়েষ্ট বেংক অধিকার করে। এবং এর সঙ্গে সিরিয়ার 'গোলান হাইটস' অবৈধভাবে দখল করে নেয় ইজরায়েল।

ইজরায়েল এবং আরও তিনটি রাষ্ট্র ক্রমে ইজিপ্ট, সিরিয়া এবং জর্ডানের মাঝে চলা ছয়দিনের যুদ্ধ ১৯৬৯ সনের ৫জুন থেকে ১০ জুন পর্যন্ত চলছিল। এই যুদ্ধে আরবের এই কয়টি রাষ্ট্র ইজরায়েলের হাতে পরাস্ত হয়। ইজরায়েল এই যুদ্ধে সিরিয়ার অতি মূল্যবান ভূখণ্ড 'গোলান হাইটস' দখল করে ইহাতে আজও কব্জা করে রেখেছে। ইজরায়েল সিরিয়ার কাছ থেকে 'গোলান হাইটস' বলপূর্বক ভাবে কেড়ে নেয়ার ঘটনাটা ইতিমধ্যে (১৯৬৭-২০২২) পঁচপান্ন বছর সম্পূর্ণ হল। ১৯৭৩ সনে পুণ: 'গোলান হাইটস' কে কেন্দ্র করে ইজরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে চতুর্থতম যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ঠিকই। তবে এই যুদ্ধে আবারও ইজরায়েলের হাতে সিরিয়া পরাজয় বরণ করে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বিগত ৭৫ বছরে পেলেস্টাইন এবং 'গোলান হাইটস' - র বিষয় দুটি সর্বাধিক চর্চিত।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে অস্থিরতার প্রধান কারণ হচ্ছে ইজরায়েলের কর্তৃত্বশীল সম্প্রসারণ। 'গোলান হাইটস' কে কেন্দ্র করে সুদীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে ইজরায়েল এবং সিরিয়ার মধ্যে চলে থাকা হিংসাত্মক ঘটনা প্রবাহের বিষয়ে জানার জন্য আমাদের কুড়ি শতকের ভূ-রাজনৈতিকের ইতিহাস অধ্যয়ণের প্রয়োজন। গ্রেটব্রিটেনের ভূতপূর্ব বৈদেশিক সচিব আর্থোর জেমস্ বালফে- র ১৯১৭ সনের ৭ নভেম্বর জারি করা 'Balffur Declaration ' অনুসারে আরব পেলেস্টাইনের ভূখণ্ডে ইহুদীদের জন্য একটি পৃথক দেশ গঠনের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৮) প্রবল প্রতাপশালী অটোমান তুর্কী,অষ্ট্রিয়া,হাংগেরী, জার্মানি, এবং বুলগেরিয়া বিধ্বস্ত হওয়ার পর সমগ্র পৃথিবীর সমীকরণ পাল্টে যেতে থাকে। বিশ্বে প্রথমবারের মতো ১৯২০ সনে গঠন হয় 'জাতিসংঘ' নামক এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা। আধুনিক যুগের পেলেষ্টাইন এবং সিরিয়া এই সময়ে অটোমান তুর্কীর অধীনে ছিল। অটোমান তুর্কীরা ১৫১৬ সন থেকে ১৯১৭ সন পর্যন্ত সেলেস্টাইন এবং সিরিয়া সম্পূর্ণ ৪০১ বছর রাজত্ব করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের অনুমোদন অনুসারে পূর্বের অটোমান সাম্রাজ্যের অংশস্বরূপ সেলেস্টাইন বিট্রিশের অধীনে আসে এবং ফ্রান্স দখল করে সিরিয়া। কিন্তু ১৯৩৯ সন থেকে ১৯৪৫ সন পর্যন্ত আবার পৃথিবীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হওয়ায় জাতিসংঘের প্রাসংগিকতা শেষ হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিরা জার্মানির সঙ্গে জাপান ও ইতালিতে পতন হওয়ার পর বিশ্ব শান্তি এবং নিরাপত্তার জন্য ১৯৪৫ সনে রাষ্ট্রসঙ্ঘ (UN) এর জন্ম হয়। রাষ্ট্রসঙ্ঘ গঠনের সাথে সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসি জার্মানিতে ইহুদীদের ওপরে করা অমানুষিক নির্যাতন ও নৃশংস গণহত্যার কথাগুলো অধিক রাজনৈতিক চর্চা লাভ করে।

সেই অনুসারে রাষ্ট্রসঙ্ঘ ১৯৪৭ সনের ২৭ নভেম্বরে গৃহীত ১৮১ নং প্রস্তাব মর্মে ব্রিটেনের অধীনে থাকা পেলেস্টাইন ভূখণ্ডকে ইহুদী এবং আরবদের মধ্যে বিভক্ত করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। উক্ত প্রস্তাব অনুসারে ঐতিহাসিক জেরুজালেম কে 'বিশেষ আন্তঃরাষ্ট্রীয় অঞ্চল' হিসেবে স্বয়ং রাষ্ট্রসঙ্ঘই নিরীক্ষণ করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রসংগক্রমে অধুনালুপ্ত জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুসারে ১৯২২ সন থেকে ১৯৪৮ সন পর্যন্ত ব্রিটেনের অধীনে ছিল। রাষ্ট্রসঙ্ঘই আরব রাষ্ট্রগুলোর আপত্তি এবং আশংকাসমূহকে নিষ্পত্তি না করে পেলেস্টাইনে গৃহহীন ইহুদীদের জন্য ইজরায়েল নামের একটি রাষ্ট্র গঠন করে নেওয়া পদক্ষেপের জন্যই আজও মধ্যপ্রাচ্যে দৈনিক কাঁচা রক্ত এবং বারুদের ধোঁয়া নির্গত হয়ে আসছে। গ্রেটব্রিটেন ১৯৪৮ সনের ১৪ মে পেলেস্টাইন থেকে সেনা প্রত্যাহার করার পরদিনই ইজরায়েল নামক একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয় মধ্যপ্রাচ্যে। আর তদানীন্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি হেরী এস ক্রুমেন ইজরায়েল কে একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। ইহার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া স্বরূপ ১৯৪৮ সনের ১৫ মে ইজিপ্ট, সিরিয়া,জর্ডান, লেবানন এবং ইরাক নবগঠিত ইজরায়েলের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধ ১৯৪৯ সনের মার্চ মাস পর্যন্ত চলতে থাকে। আরব-ইজরায়েলের এই প্রথম যুদ্ধে আরব রাষ্ট্রগুলো পরাজিত হয় যদিও ইজিপ্ট ইজরায়েলের গাজা দখল করতে সক্ষম হয়। কিন্তু আরব এই পরাজয় কে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে নাই। আরব ইজরায়েলের পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকার সময়েও ১৯৫৬ সনে 'সুয়েজ সংকট ' আরম্ভ হয়। ইজিপ্টের মধ্যে অবস্থিত সুয়েজ খাল মানবনির্মিত এক কৃত্রিম জলপথ। বলাবাহুল্য সুয়েজ খাল এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে সংযোগ করার সঙ্গে লোহিত সাগর এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যে সমন্বয় স্থাপন করেছে।

ইজিপ্টের রাষ্ট্রপতি গ'মেল আবদেল নাছের ১৯৫৬ সনে সুয়েজ খালকে রাষ্ট্রীয়করণ করে ইহাতে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। ইজিপ্টের এই কার্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। রাষ্ট্রপতি নাছের সিনাই উপদ্বীপে সামরিক বাহিনী মোতায়ন করে ইজরায়েলের এইলেট বন্দর এবং ষ্টেইন অব টাইরান অবরোধ করে ইজরায়েল জাহাজ সমূহের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং এর সঙ্গে সঙ্গে আরম্ভ হয় দ্বিতীয় আরব ইজরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ।এই যুদ্ধে ইজিপ্টের বিরুদ্ধে ইজরায়েলের সঙ্গ দেয় ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। ইজরায়েল এই সুবাদে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সহযোগিতায় ইজিপ্টের সিনাই উপদ্বীপ তার দখলে আনে। কিন্তু রাষ্ট্রসঙ্ঘের হস্তক্ষেপে যদিও ১৯৫৬ সনের ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ থামে। তবে ইজিপ্টের ষ্টেইট অব টাইরান এবং এইলেট বন্দর মুক্ত করে দেয় এবং ইজরায়েল সিনাই উপদ্বীপ থেকে নিজের সেনা প্রত্যাহার করে। রাষ্ট্রসঙ্ঘও সিনাই উপদ্বীপে শান্তিরক্ষা বাহিনী নিয়োগ করে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের হস্তক্ষেপের ফলে দীর্ঘ দশ বছর আরব দেশ এবং ইজরায়েলের মধ্যে বিশেষ উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় নাই। কিন্তু ১৯৬৬ সনের নভেম্বর মাসে ইজরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনী জর্ডানের ওয়েষ্ট বেংকে ১৮ জন মানুষকে গুলি করে নিহত করে এবং ১৯৬৭ সনের এপ্রিল মাসে সিরিয়ায় ৬টি মিগ বিমান দ্বারা বিদ্ধস্ত করার ফলে আবার মধ্যপ্রাচ্য উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যার ফলে তৃতীয় আরব-ইজরায়েলের মধ্যে যুদ্ধের পথ প্রশস্ত হয়ে যায়। ইজিপ্ট এই প্রতিবাদে আবার ২২মে ইজরায়েলের এইলেট বন্দর অবরোধ করে এবং জর্ডান একত্রে ইজরায়েলের উপর আক্রমণ শুরু করে। ১৯৬৭ সনের ৫জুন ইজিপ্ট, সিরিয়া ও জর্ডান মিলে ইজরায়েলের উপর আক্রমণ চালায়। ১০ জুন পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলতে থাকে। তৃতীয় বারের এই যুদ্ধে ইজরায়েলের ৭৭৯ এবং আরব রাষ্ট্রসমূহের ২১০০০ সৈন্য নিহত হয়।

১৯৬৭ সনের ছয় দিনের আরব - ইজরায়েলের এই তৃতীয় যুদ্ধে ইজরায়েল সিরিয়ার ভূখণ্ডের 'গোলান হাইটস' অবৈধভাবে দখল করে নেয়। রাষ্ট্রসঙ্ঘ ১৯৬৭ সনের গ্রহণ করা ২৪২ নং প্রস্তাব অনুসারে ইজরায়েল কে সিরিয়ার 'গোলান হাইটস ' ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু আমেরিকা,ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মদদপুষ্ট ইজরায়েল রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই আদেশ প্রত্যাখান করে। যার ফলে সিরিয়া নিজের 'গোলান হাইটস' উদ্ধার করার জন্য ইজিপ্টের সাথে সংযুক্ত হয়ে চতুর্থবারের জন্য ১৯৭৩ সনের ৬ অক্টোবরে ইজরায়েল আক্রমণ করে যদিও ইজরায়েল এই যুদ্ধে আরব জয়ী হয়।এই যুদ্ধে ইজরায়েলের ২৮০০ জন সৈন্য এবং সিরিয়ার ৩০০০ এর অধিক সেনা শহিদ হয়।১৯৭৪ সনের ৩১ মে রাষ্ট্রসঙ্ঘ 'গোলান হাইটস'কে বাফার জোন (Buffer Zone) হিসেবে ঘোষণা করে তাতে রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে। ইজরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে আমেরিকার মধ্যস্থতায় ১৯৯১ সনে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে শান্তি আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু ইজরায়েলের আগ্রাসন মানসিকতায় ২০০০ সালে এই আলোচনা ইতি টানে। ইহার পরবর্তী সময়ে তুর্কির মধ্যস্থতায় আবার ২০০৮ সনে ইজরায়েল এবং সিরিয়ার মধ্যে 'গোলান হাইটস'নিয়ে আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু ২০০৯ সনে ইজরায়েলের কট্টর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত বেঞ্জামিন নেটান্যাহু নির্বাচিত হওয়ার পর সিরিয়ার সাথে আলোচনার দুয়ার বন্ধ হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক ভাবেই 'গোলান হাইটস'হচ্ছে সিরিয়ার নিজস্ব ভূখণ্ড। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুসারে সিরিয়া ফ্রান্সের অধীনে যায় এবং সেইসময় হতে 'গোলান হাইটস' সিরিয়ার অংশ হয়ে ছিল। সিরিয়াই ১৯৪৬ সালে ফ্রান্সের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদস্যপদ গ্রহণ করে। কিন্তু ইজরায়েল ১৯৬৭ সনের যুদ্ধতে সিরিয়া আক্রমণ করে 'গোলান হাইটস'-র উপর অবৈধ দখল করে। কেবল এখানেই শেষ নয়, ইজরায়েল রাষ্ট্রসঙ্ঘ কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১৯৮১ সনে 'গোলান হাইটস'কে ইজরায়েলের ভৌগলিক মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করে।

'গোলান হাইটস' হচ্ছে সিরিয়ার একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ মালভূমি। সিরিয়ার 'গোলান হাইটস'-র ১৮৬০ বর্গ কিলোমিটার ভূখণ্ডের ভিতরে বর্তমান ১১৫০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল ইজরায়েলের অবৈধ দখলে ১৯৬৭ সন থেকে। জর্ডান, লেবানন, ইজরায়েল এবং সিরিয়ার মধ্যে 'গোলান হাইটস'অবস্থিত। রাজনৈতিক এবং তাৎপর্যের সঙ্গে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ, উর্বর কৃষিভূমি এবং জলসম্পদের জন্য 'গোলান হাইটস'-র গুরুত্ব অপরিসীম। বরাফাবৃত গোলান মালভূমি ওখ পাহাড়িয়া অঞ্চলসমূহ পানীয় জলের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস। 'গোলান হাইটস' থেকেই জর্ডান নদী বয়ে এসে গেলিলি সাগরে মিলিত হয়েছে। ইজরায়েলের এক তৃতীয়াংশ জল 'গোলান হাইটস'যোগান দেয়। সিরিয়ার থেকে বলপূর্বক ভাবে 'গোলান হাইটস' দখল করে বর্তমানে ইজরায়েল তাতে লক্ষাধিক ইহুদীদের বাসস্থান ও কর্মসংস্থান দেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ইজরায়েলের দুষ্কার্যে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে আমেরিকাই। রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৮১ সনের ১৭ ডিসেম্বর গৃহীত করা ৪৯৭ নং প্রস্তাব অনুসারে ইজরায়েল 'গোলান হাইটস' কে নিজের ভূখণ্ডে মিলিয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে অবৈধ ও বেআইনি বলে অভিহিত করেছে। কিন্তু রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই ঐতিহাসিক প্রস্তাব নাকোচ করে প্রাক্তন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৯ সনের ২৫ মার্চ রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই প্রস্তাব কে ঘোর আপত্তি জানিয়ে 'গোলান হাইটস'কে ইজরায়েলের ভূখণ্ড বলে স্বীকৃতি প্রদান করা ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সমগ্র বিশ্বতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। আমেরিকা ছাড়া পৃথিবীর আর কোন দেশই গোলান হাইটস কে ইজরায়েলের ভূখণ্ড বলে স্বীকৃতি দেওয়ার ধৃষ্টতা বা ভণ্ডামি করে নাই। আমেরিকার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে ইজরায়েলের মধ্য দিয়ে ইরান, সিরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যতে অশান্তি এবং অস্থিরতা বৃদ্ধি করে আরবের রাষ্ট্রগুলোর থেকে কাঁচা তেল আহরণ করে সেই দেশসমূহে বিক্রি করা।

ইজরায়েলের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নাফতালী বেনেটে গত ২০২১ সনের ২৬ ডিসেম্বর এই কথা ঘোষণা করেন যে ইজরায়েল আগামী পাঁচ বছরের ভিতরে 'গোলান হাইটসে' ইহুদী লোকের জন্য ৭৩০০ টি নতুন আবাস নির্মাণ করবে। উল্লেখযোগ্য যে ইজরায়েল ইতিমধ্যে আমেরিকার আশির্বাদে 'গোলান হাইটস'এ নিজস্ব আইন, প্রশাসন এবং বিচার প্রক্রিয়া বিধিবদ্ধ করেছে। 'গোলান হাইটস'এ ইজরায়েল আগামী পাঁচ বছরে সর্বমোট ৩১৭ নিযুত মার্কিন ডলার খরচ করবে যাতে সেখানে পর্যটন, উদ্যোগ, চিকিৎসা, বাণিজ্য, পরিবহন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়। ১৯৬৭ সালের পূর্ব পর্যন্ত সিরিয়ার 'গোলান হাইটস এ আরবীয়দের বসবাস ছিল। ইজরায়েল সেখানে দখল করে ২০০ এর অধিক আরবীয় গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় এবং পর্যায়ক্রমে একলক্ষের ও অধিক বাসিন্দাদের বিতাড়িত করে। বর্তমানে 'গোলান হাইটস'এ প্রায় ৫৩০০০ হাজার মানুষ বসবাস করছে। এরমধ্যে ২৭০০০ ইহুদী, ২৪০০০ দ্রুজ আরবী এবং প্রায় ২০০০ আলাবিট মুসলিম আছে। দ্বিতীয়ত, ইজরায়েল ২০১৫ সন থেকে সিরিয়ার 'গোলান হাইটস' এ অবৈধভাবে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানে আছে। আমেরিকার AFEK oil and Gas নামের কোম্পানী ইতিমধ্যে কম্পন জরীপ সম্পন্ন করে প্রায় এক বিলিয়ন বেরেল পরিমাণ খনিজ তেলের সন্ধান পেয়েছে। একমাত্র ইজরায়েলের পরিবেশ কর্মী এবং প্রতিবাদী সংগঠনগুলোর বাঁধা দেওয়ায় ইজরায়েল সরকার 'গোলান হাইটস'এ তেল উৎপাদন করতে অগ্রসর হতে পারছে না। ইজরায়েল তার দেশের ইন্ধন চাহিদা পূরণ করার জন্য আংগোলা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ইজিপ্ট, নরওয়ে, রাশিয়া, আজারবাইজান এবং কাজাখস্তান থেকে পেট্রোলিয়ামজাত সামগ্রী আমদানি করে আসছে।

রাশিয়া তার নিজস্ব ভৌগলিক নিরাপত্তা অক্ষুন্ন রাখার জন্য ইউক্রেনের বিরুদ্ধে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে আরম্ভ করা বিশেষ সামরিক অভিযান কে অবৈধ আগ্রাসন বলে আমেরিকা এবং ইজরায়েল অভিহিত করেছে এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রস্তাবকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ২৪২ এবং ৪৯৭ নং দুইটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নাকচ করে 'গোলান হাইটস' র উপর বলপূর্বক আগ্রাসন আমেরিকার কূট কৌশল অনুসারী ইজরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার কাজ এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ। আমেরিকার কাছে ইজরায়েলের এই প্রভুত্ববাদ সমগ্র বিশ্বের জন্যই এক চিন্তার বিষয়।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...