Friday, July 8, 2022

ধর্মান্ধতা মানুষের অবনতির পথ


ধর্মীয় আচার ব্যাবহার বা ধর্মের প্রতি আবেগ অনুভূতি এই উপমহাদেশে খুব বেশি। আমরা যারা এই উপমহাদেশের বাসিন্দা তাই অন্যান্য দেশের মানুষ যতই তাদের জীবন ধারণের মানদণ্ড উন্নত হোক না কেন তাতে কিছুই যায় আসে না। ধর্মের মোহ মানুষের চিন্তা জগতকে কতোটা নির্মমভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তার দৃষ্টান্ত বিশ্ব ইতিহাসে বিরল নয়। মানুষের চিন্তায় ধর্মের মতো একটা কাল্পনিক এবং তাদের দৈনন্দিন জীবন জীবিকার সাথে প্রকৃতিগতভাবে সম্পর্কহীন বিষয়টা কিভাবে এতো বিপূলভাবে সম্পৃক্ত, সমৃদ্ধ ও বিকশিত হতে পারলো, সেই প্রশ্ন আমাদের অনেকেরই। অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে এই অজুহাতে উগ্র ধর্মবাদিরা নিজ ধর্মের সমালোচকদের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাইছে, শুধু তাই নয়, তাদের অস্তিত্বও নিশ্চিহ্ন করতে চাইছে। ধর্মীয় আদর্শ অন্য সকল মতাদর্শকে পিছনে ফেলেছে শুধু নয়, জ্বালাও, পোড়াও, ভাঙচুর, ফতোয়া, ফাঁসির দাবি, গ্রেফতার, খুন, কিছুই থামছে না। প্রকৃতপক্ষে প্রতিনিয়ত তাদের হত্যা করে চলেছে। 

বিজ্ঞানের এই বিপূল অগ্রগতির যুগে মানুষের চিন্তা যেখানে যুক্তিবাদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল, সেটা না হয়ে বরং তার উল্টোটাই ঘটে চলেছে অহরহ। কয়েক হাজার বছরের এই ধর্মীয় মতাদর্শ তার মৌলিক নীতির কোনো পরিবর্তন না ঘটিয়েও কিভাবে কাল্পনিক সর্বশক্তিমানের অস্তিত্ব মানুষের মনে যুগ যুগ ধরে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে এবং বতর্মান সময়েও নিজের প্রাসঙ্গিকতার বিস্তার ঘটাচ্ছে, সে আলোচনা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি অন্যান্য মতাদর্শ নিরলস চর্চা করেও সেই সাফল্য অর্জন করতে ব্যর্থ।

প্রথমে মুসলমানদের নবী বিতর্ককে সামনে রেখে কিছু কথা বলতে চাই। যেভাবে সারা ভারতবর্ষের মুসলিম সমাজ সহ তামাম মুসলিম বিশ্ব ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের প্রিয় নবীজীর অসম্মানের প্রতিবাদ করছে এবং সেই অপরাধের প্রতিবিধান চাইছে তা দেখে আমার মনে হয়েছে যদি জীবন জীবিকার সাথে সম্পর্কযুক্ত বিষয়গুলো নিয়ে মানুষ এভাবে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ সংগঠিত করতো, তবে দেশে হয়তো বিপ্লবের জমি তৈরি হয়ে যেতো। যে বিপ্লবের স্বপ্ন প্রতিটি সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ নিজেদের মনে লালন করে।

আরেক টা ঘটনা ঘটেছে। একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম কালীর পোস্টার যেটিতে হিন্দু দেবী কালীকে সিগারেট খাওয়ার চিত্র দেখানো হয়েছে । আবার এলজিবিটি ফ্ল্যাগ তার হাতে দেখা গেছে। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ক্ষোভ এটাকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্য নিন্দিত আখ্যা দিচ্ছে। যে মহাকালীকে উপহাস করা হচ্ছে এবং হেয় করা হচ্ছে। তারা চিত্রনায়িকা লীনা মণিমেকলাইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

 সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক প্রবণতা যেটা বতর্মান ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের কাছে চ্যালেঞ্জ, সেটা হোলো মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে ধর্ম নিয়ে লড়িয়ে দেওয়া। মানুষের পরিচয় ধর্ম দ্বারা নির্ধারিত হওয়া। আমি মানুষ, সেটার থেকেও বড় আমি কোন ধর্মের লোক।এই বিভাজন ধ্বংস করছে মানবিক ঐক্যকে। ধ্বংস করছে মানুষের সম্মিলিত ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদী শক্তিকে। যেটা রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য। রাষ্ট্র চায় তার সকল শ্রম শক্তির অনৈক্য। কারণ শ্রম শক্তির ঐক্যবদ্ধ রূপকে রাষ্ট্র ভয়ের চোখে দেখে। এই কারণেই পরিকল্পিতভাবে নবি বিতর্কের সৃষ্টি। নতুন একটা ইস্যু চাই। সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত ক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, সাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্নীতি প্রভূতি বিষয় এবারের লোকসভা নির্বাচনের ইস্যু ছিল। সরকারের কাছে কোনো উত্তর ছিল না। তাই মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে হবে। তারই ফল এই নবী বিতর্ক। সারা দেশ উত্তাল। সরকার তার উদ্দেশ্যে সফল। একদিকে হিন্দু সেন্টিমেন্টকে ভিত্তি করে বিজেপি হিন্দু ভোট ঐক্যবদ্ধ করতে চাইছে। অপরদিকে আমাদের রাজ্য মুসলিম সেন্টিমেন্ট কাজে লাগিয়ে মুসলমানদের পাশে দাঁড়াতে চাইছে। এই খেলা সাধারণ হিন্দু বা মুসলমানরা ধরতে পারছেন না। মেতে উঠেছে পৈশাচিকতায়। একটা চরম অব্যবস্থা। এভাবেই সব চলবে। চলছেও। মোহাম্মদ রিয়াজ আর গাউস মোহাম্মদ উদয়পুরের কানাইয়া লালের ঘটনাটি ধরে নিন।

আমরা সত্যি অবাক হই এটা ভেবে যে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানান ব্যাথা, যন্ত্রণা, হতাশা-যা আমরা প্রতিদিন প্রতি মুহুর্তে অনুভব করে চলেছি, তার জন্য কে দায়ী, কেন দায়ী কিভাবে তার সমাধান - এই সরল প্রশ্নগুলো আমাদের মনে স্থান পায়না। অথবা স্থান পেলেও তার সত্যিকারের অভিমুখ নির্বাচন করতে আমরা প্রায়শই ব্যর্থ হই। ফলে ভুল অভিমুখের কারণে আমরা দিকভ্রষ্ট হই। চক্রাকারে আবর্তিত হতে হতে পূর্বের জায়গায় ফিরে আসি। আমরা বিশ্বাস করি এইসকল যন্ত্রণার কোনো উপশম নেই। আমরা বিশ্বাস করি এ সবই আমাদের কর্মফল। আমরা বিশ্বাস করি এ সব পূর্ব নির্ধারিত। আমরা বিশ্বাস করি একমাত্র ঈশ্বরই পারেন এই যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে। আসলে বিষয়টা সাধারণভাবে দেখলে এমন সরল সমীকরণ ছাড়া অন্য কিছু আসবে না। কারণ কোনো কিছুর উপর বিশ্বাস স্থাপন তখনই সম্ভব, যখন সেই বিষয়ের যুক্তিসঙ্গত ইতিবাচক ফলাফল আমরা প্রাত্যহিক জীবন দিয়ে উপলব্ধি করতে পারি এবং সেটা জীবনের মানোন্নয়নে প্রয়োগ করতে পারি। ধর্মের ক্ষেত্রে বিশ্বাস অর্জনের এই নিয়ম খাটেনা। তবুও কেন ধর্ম মানুষের এই বিশ্বাস অর্জন করতে সমর্থ হোলো? এমনটা নয় যে শুধুমাত্র বিজ্ঞান বিরোধী মানুষরাই ধর্মে আস্থা রাখেন। অনেক বিজ্ঞানীকেও ধর্মের উপর প্রবল আস্থা রাখতে দেখা গেছে। কারন এখানে বিবিধ। কিছু মানুষ আছেন, যারা নিজের দক্ষতার উপর আস্থাহীন। আত্মবিশ্বাসের অভাবজনিত কারণে জীবনের সফলতার জন্য তারা কোনো না কোনো অবলম্বন খোঁজেন। আধ্যাত্মবাদের সাফল্য এইজন্যই যে এই মতবাদ বাস্তবের রুক্ষতা থেকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়ে মানুষকে এক স্বপ্নীল সুখময় জীবনের স্বপ্ন দেখায়। বোঝানো হয় একমাত্র নিরলস ঈশ্বর সাধনাই সেই লক্ষ্যে পৌঁছনোর একমাত্র পথ। তাই সেই ঈশ্বরের জয়গান করলেই যদি এমন জীবন পাওয়া যায়, তবে কেন মানুষ অন্য মতাদর্শ গ্রহন করবে? কী আশ্চর্য ! তাই না, দেশের জ্বলন্ত সব সমস্যাগুলিকে খুব কৌশলে এড়িয়ে, দেশ এখন ধর্মীয় ভাবাবেগ নিয়ে উত্তাল। আর আমরা নির্বাক হয়ে তা শুনছি, যাইহোক।

Monday, July 4, 2022

কোরবানি


ইদ এলেই কী প্রচণ্ড টানটান উত্তেজনা কাজ করতো! কিন্তু ইদানীং প্রায়ই নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত আকিদ। হয়ত বয়স বাড়ছে। তাই ভাবতো বুশরা। 

বিয়ের বারোটা বছর পেরিয়েছে সত্য কিন্তু আকিদ তার ছোটবেলার এই উৎসবের কথা কতবার শেয়ার করেছে তা বলার ইয়াত্তা রাখে না।শৈশবের-কৈশোরের রৈ রৈ। আকাশে চাঁদ দেখা গেলেই ছুটে যাওয়া মসজিদে ইমাম সাহেবের কাছে! 

কোরবানির ইদে কতবড় গরু জবাই করা হতো!  আরও কত কী! কিন্তু বছর দুয়েক থেকে তার মধ্যে একটা আলাদা রকম একটা পরিবর্তন ঘটেছে। 

বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে থাকে বুশরা এগুলো ভেবে।

এবারও আনন্দ-উৎসবের দিব সমাগত প্রায়। কিন্তু আকিদের ভাবসাব অন্যরকম। বুশরা নিজেকে আর সামলাতে না পেরে আকিদের হাত ধরে বলেই ফেললো "কারো সাথে কোরবানিতে শরিক হয়েছো"! উত্তরটা না আসলো। নাছোড়বান্দা হয়ে যখন বুশরা "না" টার কারণ জানতে চাইলো, আকিদ আর নিজেকে সামলাতে  পারলোনা।

বলল সে--
" ইব্রাহিম তো তার আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রাণ- প্রিয় ছেলেকে কোরবানি করতে চেয়েছিলেন। এরজন্য কি আমাদের এইদিনে এতোগুলো নিষ্পাপ পশু জবাই করতে হবে? এবার যে ভয়াবহ ফ্লাড হয়েছে, আমাদের জরুরি নয় বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানো! তুমি-ই বলো। 

-- জানতাম এটাই তোমার উত্তর হবে। অামার মতে তোমার এই কোরবানি স্বার্থক।

চারচোখ এক মুহুর্তের জন্য ঝলক  দিয়ে উঠে।

Wednesday, June 29, 2022

জলভসকা


সুখ-সমৃদ্ধি-উন্নতি হারিয়ে
তিনভাগ জল মাঝে ডুবে যায় দালান-গাড়ী
খোঁজে একটুকরো শুকনো পাতা
বাঁচার অন্বেষা।
আশ্রয় হারিয়ে দূরত্ব বাড়ে ----
সবুজ নৈঃশব্দ্য তার তৈলচিত্র
জলতলা শেওলার ভেতর অস্থির প্রহর কাটায়
কর্পোরেশন নর্দমায়।

তিলোত্তমা শহর বলো আর গ্রাম বরাক
দখলে তার পার্ক,চেনা-অচেনা গলি, রাজপথ, ট্রাফিক পয়েন্ট, যত মল, বক্তৃতা মঞ্চ।
জঠরে ভরা যত শব ধ্বনিত হয়
ক্ষুধা - তৃষ্ণার আর্তনাদে 
প্রাণভিক্ষার আবেদন।

বন্যা - হয়েছ এক বিভীষিকা
চোখে ঘুম হারিয়ে।

ধর্মানুভূতি: আহত ও আঘাত এই কথা দুটিতে জড়িয়ে থাকে

"আমি হিন্দু" "আমি মুসলমান একথা শুনতে শুনতে কান ঝালা-পালা হয়ে গেলো।কিন্তু “আমি মানুষ” একথা কাহাকেও বলতে শুনি না। যারা মানুষ নয়, তারা হিন্দু হোক আর মুসলমান হোক, তাদের দিয়ে জগতের কোনো লাভ নেই।"
                                  -----রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


ধর্মান্ধতাই ধর্মের মৌলবাদ। এই মৌলবাদই দেশে দেশে শিল্প ও সংস্কৃতির জন্য হুমকি হয়ে পড়েছে। ধর্মান্ধতা মানুষের একটি কমন ত্রুটি। এর প্রধান ভিত্তি হচ্ছে কোন নির্দিষ্ট বিধিবিধান বা প্রথার প্রতি যাচাই বাছাই না করে অন্ধ আনুগত্য করা। তাইতো অভিজিৎ রায়ের কথায় ‘ধর্মান্ধতা, মৌলবাদের মতো জিনিস নিয়ে যখন থেকে আমরা লেখা শুরু করেছি, জেনেছি জীবন হাতে নিয়েই লেখালিখি করছি।’

প্রচলিত ধর্মগুলি মানুষকে হিংসা বিদ্বেষ শিক্ষা দেয়, সুস্থ মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, কর্মবিমুখ অলস পরনির্ভরশীল করে গড়ে তোলে, মানুষের মধ্যে তৈরি করে বিভেদ বিভাজন। এখনো এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে, জ্ঞান বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের সময়েও তা থেমে যায়নি। বিশ্বের সভ্য মানুষেরা যখন ধর্মের আদলে কর্মে মনোযোগ দিয়ে যাচ্ছে এগিয়ে, তখন কতিপয় ধুরন্ধর মতলববাজ পরজীবী শ্রেণী সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে বাড়িয়ে চালাচ্ছে তাদের পুঁজিবাদী ব্যবসা! ছড়াচ্ছে উন্মাদনা! মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারে! থামিয়ে দিচ্ছে উন্নতির অগ্রযাত্রাকে! মানুষ ঠকছে, হচ্ছে প্রতারিত! তাইতো কখনো 'রামের' নামে আবার কখনো 'গোস্তাকে রসুলের' নামে মারছে-মরছে।

সাহাদাত হোসেন মান্টো ধর্মান্ধতা নিয়ে বেশ কিছু কাজ করেছেন। তার ‘ঠাণ্ডা গোস্ত’ গল্পে দেখি,দেশভাগের সময়কার দাঙ্গায় মুসলমানের রক্তে হাত রাঙানো শিখ যুবক ঈশ্বর সিংহ ঘরে ফিরে কিছুতেই প্রেমিকার সঙ্গে সঙ্গম করতে পারছে না। প্রেমিকার সন্দেহ হয়, তার পুরুষ নিশ্চয় অন্য নারীসঙ্গে মজেছে। ঈর্ষার জ্বালায় ঈশ্বরের কৃপাণ কোষমুক্ত করে সে ক্ষতবিক্ষত করে তাকে। মুমূর্ষু ঈশ্বর স্বীকার করে, সে এক অচেতন মুসলিম বালিকাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ক্রমশ বুঝতে পারে আসলে সে বালিকাটির শবের সঙ্গে... আখ্যানের তীব্র সংবেদনশীলতা বোঝেনি পাকিস্তান। ‘আমরা মুসলমানরা এতই আত্মমর্যাদারহিত যে আমাদের মৃত কন্যাদেরও শিখরা ধর্ষণ করে যায়?’—এমন প্রশ্ন তুলে লাহোর আদালতে মামলাও ঠুকে দেয় পাক আমলাতন্ত্র। যাইহোক এই কথাগুলো বলার কারণ হলো আমরা আর কত এভাবে একে অপরের রক্তস্নানে নিজেকে পবিত্র করবো ?

অনেক বড় ধরনের দূর্ঘটনা দেখেও আমরা খুব শক্ত থাকতে পারি। সেটা যতই মানবাধিকার লঙ্ঘণ হোক, সেটা যতই দেশের উন্নয়নে বাধা হোক, জনগণের স্বাধীনতা হরণ হোক আমরা মাথা ঠান্ডা রাখতে পারি। শ্রেণী সংগ্রামের পথে না গিয়ে আমরা চলছি ভোটের রাজনীতিতে, তাতে কোন ভাবেই আমাদের অনুভূতিতে আঘাত আনতে পারে না। কিন্তু যখন দেখি ধর্ম নিয়ে একে অপরের মন্তব্য বা কেটে মেরে রক্ত ঝরায়, তখন আমাদের আবেগ তীব্র উল্কাপিন্ড হয়ে যায়। হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়,শক্ত হয়ে যায়। মনে হয় নিজের শরীরে যন্ত্রনা হচ্ছে।পৃথিবীতে মনে হয় ধর্মের চেয়ে কেউ আত্মার এত কাছে থাকে না।

ধর্ম যে কতটা ঠুনকো কতটা ভঙ্গুর তার বারবার প্রমাণিত।মানুষ হতে ধর্মের কোনো প্রয়োজন নেই। একুশ শতকের আগের একটা মহান শিক্ষা আজ‌ও আমরা আমাদের বাচ্চাদের দিতে পারিনি - 'ধর্মের বেশে মােহ যারে এসে ধরে অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে'।

খারাপ মানুষকে ধর্ম ভালো করতে পারছে না। মানুষের ধর্ম নিজের ও মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা, ভালোকথা ভালোবাসা দিয়ে মানুষকে খুশি করা। জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রসারে, মনুষ্যত্ব মানবতাবোধ অর্জনের মধ্য দিয়ে, নিশ্চয়ই একদিন বিভাজন দূরীভূত হবে।

ছবিঋণ : জিষ্ণু রায়চৌধুরীর ফেসবুক ওয়াল থেকে।

Saturday, June 25, 2022

অভিভাবকগণ, সাবধান! ফুবিং আপনার সন্তানকে ধ্বংস করবে!


একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে বেশিরভাগ তরুণ-তরুণীই ফুবিংয়ে ভুগছেন এবং শুধুমাত্র তাদের স্মার্টফোনের জন্য তাদের সঙ্গী, পিতামাতা এবং তাদের আশেপাশের লোকজনকে উপেক্ষা করছেন। এক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

 হায়দ্রাবাদের তরুণদের মধ্যে পরিচালিত একটি গবেষণায় উদ্বেগজনক ফলাফল এসেছে। এই অধ্যয়নের সহ-লেখক এবং হায়দ্রাবাদের ইএসআইসি হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ সুধা বালা তার গবেষণায় বলেছেন, 'হায়দ্রাবাদের যুবকদের মধ্যে মানসিক যন্ত্রণার উপর ভয় দেখানোর পরিণতি' এটি বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের সাথে তাদের সম্পর্কের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।

'ফুবিং' শব্দটি হল 'ফোন' এবং 'স্নাবিং'-এর একটি পোর্টম্যানটো— তার অর্থ দাঁড়ায় অন্যের দিকে মনোযোগ না দিয়ে নিজের ফোনে ব্যস্ত থাকা। দুটি শব্দের সংমিশ্রণ এবং এটি একটি প্রচারণার অংশ হিসাবে ২০১২ সালে একটি অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞাপন সংস্থা তৈরি করেছিল যা পরে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

 ২০১৮ সালে ICMR-এর সহযোগিতায় শহরের ডাঃ বালা, ধরনি টেককাম এবং হর্ষল পান্ডাওয়ে এই গবেষণাটি চালু করেছিলেন। তারা ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিসিন এবং কলা বিভাগের মোট ৪৩০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে গবেষণাটি পরিচালনা করেন।

 সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে যে শহুরে যুবকদের মধ্যে ফুবিংয়ের প্রবণতা বেশি, তাদের মধ্যে ৫২ শতাংশই ফুবিংয়ে নিমগ্ন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে, ২৩ শতাংশ ফুবিংয়ের ফলে গুরুতর মানসিক যন্ত্রণার সম্মুখীন হয়েছিল, যখন ৩৪ শতাংশের মাঝারি মানসিক যন্ত্রণা ছিল। এটি বলেছে, ফুবিংয়ের পরিমাণ এবং মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে একটি পরিসংখ্যানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে, ফুবিং গেমিং আসক্তিতে পরিণত হতে দেখা গেছে। শহরের একটি হাসপাতালের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৪ বছর বয়সী একটি ছেলে দশম শ্রেনীর পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি সত্ত্বেও অনলাইন গেম খেলে দিনে ১৮ ঘন্টা পর্যন্ত ব্যয় করে।

 যাইহোক, এই ফুবিং কিশোর বা তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় রেনোভা হাসপাতালের কনসালটেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট এবং সাইকোঅ্যানালাইটিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ আসফিয়া কুলসুম বলেন, কখনও কখনও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ফুবিং পাওয়া যায়।

 তিনি বলেন, অনেক উদাহরণ রয়েছে যে স্ত্রীরা তাদের ফোনে বেশি সময় ব্যয় করে তাদের স্বামীদের সাথে দাম্পত্য কলহের দিকে নিয়ে যায়। সংক্ষেপে শুধু এটাই বলা যায় যে, ফুবিং আধুনিক মানুষকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। এর আগে থেকে এর প্রিকিউশন অবলম্বন না করলে অদূরে মানসিক বিকারগ্রস্থতার স্বীকার অনিবার্য।

(নীচের এই লিংকে ক্লিক করে আরও পড়তে পারেন)

https://www.deccanchronicle.com/lifestyle/culture-and-society/170622/half-of-city-youth-in-grip-of-phubbing-study.html

https://www.newportacademy.com/resources/mental-health/phubbing-why-its-bad-for-us/

Friday, June 24, 2022

সমতুল্য


তখন রোদ্দুর সীমার গাইনোকলজিস্ট এর সাথে ফোনে কথা বলছিল। চারিদিকে জল এমনকি রোদ্দুররার গ্রাউন্ড ফ্লোরটা পর্যন্ত। তাই চেকাপেরর জন্য মেডিকেল এ নেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। উপরের তলায় খুব কষ্ট হচ্ছে সীমার। আর চার পাঁচ দিন সময় হাতে। জল নিয়ে রোদ্দুর খুব চিন্তায়। ফ্লাডে একতো খাবার শেষ হওয়ার পথে আর পান করার জলটাও প্রায় শেষ। মিনারেল ও পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু সীমার দিকে তাকিয়ে সব ম্যানেজ করতে জানে রোদ্দুর। খুব ভালোবাসে।

গর্ভবতী স্ত্রী কথোপকথন শেষে সত্যিই নিজে মেয়ে জাতি হওয়ার এবং নিজের পেটে নিজের বাচ্চা সৃষ্টির, লালন পালনের আনন্দে আনন্দিত হয়ে এই বাস্তবতার জ্ঞানে সমৃদ্ধ স্বামীকে গর্বে জড়িয়ে ধরে সীমা। রোদ্দুর চোখ মুছে বলে তোমাদের ঋণ শোধ করতে নেই মনে রাখতে হয়। পুরুষ কখনোই নারীর সমতুল্য হতে পারে না।

Sunday, June 19, 2022

নৌকা বাইচ বরাকের ঐতিহ্যবাহী দৌড় প্রতিযোগিতা


আবহমানকাল থেকে নৌকা দৌড় বাইচ বাংলার লোকসংস্কৃতির নদী কেন্দ্রীক পরিচায়ক। কালের পরিক্রমায় হারিয়ে গেলেও সাম্প্রতিক কয়েক বছরে তা আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এক সময় এ দেশে যোগাযোগ ছিল নদী কেন্দ্রিক আর বাহন ছিল নৌকা। এখানে নৌ শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে বিভিন্ন শিল্পকেন্দ্র। এসব শিল্পে যুগ যুগ ধরে তৈরি হয় দক্ষ ও অভিজ্ঞ কারিগর। এভাবে একসময় বিভিন্ন নৌযানের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কালের পরিক্রমায় `মেসোপটেমিয়ার` মানুষদের শুরু করা খেলাটি বাংলাদেশের জনপ্রিয়তার সাথে সাথে আমাদের দেশেও চলে আসে।

নৌকা দৌড় বরাক উপত্যকার ঐতিহ্য বহন করে। বিশেষ করে আমাদের করিমগঞ্জ জেলায় এই নৌকা দৌড় প্রতিযোগিতা এই অঞ্চলের মানুষের আনন্দের সঞ্চার জোগায়। কালের পরিক্রমায় হারিয়ে গেলেও জনপ্রিয়তা ও সমাদর লোক হৃদয়ে আজও আছে এক বিশেষ স্থান দখল করে।

এক সময় এ দেশে যোগাযোগ ছিল নদী কেন্দ্রিক আর বাহন ছিল নৌকা। নৌ শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন শিল্পকেন্দ্র। এসব শিল্পে যুগ যুগ ধরে তৈরি হয় দক্ষ ও অভিজ্ঞ কারিগর।কালের বিবর্তনে পাশ্চাত্যের ভাবধারায় আধুনিক সুযোগসুবিধার সম্মিলনে কতক শহর গড়ে উঠলেও গ্রামবাংলায় নৌকা দৌড়ের কদর এখনও ব্যাপক। নৌকা বাইচে আমজনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই তার প্রমাণ।

এই নৌকা দৌড় প্রতিযোগিতা বিশেষ করে বর্ষাকালে হয়ে থাকে। নদীতে বা বিলে যখন জল ভর্তি হয় কানায় কানায়, প্রায় কিছু জায়গায় বন্যার আকার ধারন করে। ঠিক সেই সময় আনন্দ উপভোগ জোগাতে এই প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। তবে একসাথে সব জায়গায় এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়না। এক এক জায়গায় এক এক সময়ে হয়ে থাকে।করিমগঞ্জে বিশেষ করে শণবিল,বদরপুর ঘাট, শনিবাড়ি,সুতারকান্দী (কৈয়া বিল) এইসব অঞ্চলে হয়ে থাকে। নৌকা বাইচের নৌকা হয় সরু ও লম্বাটে। কারণ, সরু ও লম্বাটে নৌকা নদীর পানি কেটে দ্রুত গতিতে চলতে সক্ষম। নৌকার সামনে সুন্দর করে সাজানো হয় এবং ময়ুরের মুখ, রাজ হাসের মুখ বা অন্য পাখির মুখের অবয়ব তৈরি করা হয়। দর্শকদের সামনে দৃষ্টিগোচর করতে নৌকাটিকে উজ্জ্বল রংয়ের কারুকাজ করা হয়।

নৌকাবাইচের সময় মাঝি-মাল্লারা সমবেত কণ্ঠে গান গায়। এতে তাদের যেভাবে উৎসাহ বাড়ে ঠিক দর্শকদেরও বাড়ে আগ্রহ। তৈরি হয় এক মনোরঞ্জক পরিবেশ। প্রতিযোগিতায় আরও রয়েছে বিজয়ীদের পুরস্কারের ব্যবস্থা। পুরষ্কার হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে মোটা অংকের টাকা,টিভি, নৌকা ইত্যাদি। আমাদের এলাকায় এই দৌড় প্রতিযোগিতা হয় কৈয়া বিলে বা শনিবাড়ি লঙ্গাই এ। দৌড়ের নৌকাগুলোর নাম ও আছে যেমন সোনার তরী, অগ্রদূত, পঙ্খিরাজ, ময়ুরপঙ্খী ইত্যাদি। 

এই জনপ্রিয় নৌকা দৌড়ে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বস্তু হলো জনপ্রিয় সারিগান। তাল, করতাল বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সারিবদ্ধভাবে চলে গান। শাহ আবদুল করিমের --

চন্দ্র-সূর্য বান্ধা আছে নাওয়েরই আগায়
দূরবীনে দেখিয়া পথ মাঝি-মাল্লায় বায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায় ।।

রঙ-বেরঙের যতো নৌকা ভবের তলায় আয়
রঙ-বেরঙের সারি গাইয়া ভাটি বাইয়া যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায় ।।

একটার পর একটা চলে

আল্লায় বলিয়া নাও খোল রে
ভাই সক্কলি।
আল্লাহ বলিয়া খোল।।
ওরে আল্লা বল নাও খোল
শয়তান যাবে দূরে।।
ওরে যে কলমা পইড়া দেছে
মোহাম্মদ রাসূলরে
ভাই সক্কল।...

বা এটাও

যাত্রাকালে বাধা দিওনা বিদায় দেওগো সকালে
আমার নীলগো রতন কাল রতন সাজাইয়া দে…
রাধিকা সুন্দরী জল ভরিতে যায় সোনার নুপুর বাজে রাঙা পায়।
দেখরে কার রমনী জলে যায়।

(এই গানগুলো এক প্রতিযোগির কাছ থেকে সংগ্রহ করা, নাম - গফুর চাচা)।

নৌকা দৌড় শ্রাবণ মাস থেকে শুরু করে ভাদ্র-আশ্বিন মাস পর্যন্ত হলেও মূল আকর্ষণ শ্রাবণ সংক্রান্তির নৌকা দৌড়। কালের বিবর্তনে যদিও আমরা বিশ্বায়নের যুগে তবু নিজের লোকসংস্কৃতির ইতিহাস মিটিয়ে দেয়া কোন ভাবেই সম্ভব নয়। তাইতো এর মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব আজ পর্যন্ত বহাল রেখেছে এতদাঞ্চলের মানুষ।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...