Monday, July 4, 2022

কোরবানি


ইদ এলেই কী প্রচণ্ড টানটান উত্তেজনা কাজ করতো! কিন্তু ইদানীং প্রায়ই নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত আকিদ। হয়ত বয়স বাড়ছে। তাই ভাবতো বুশরা। 

বিয়ের বারোটা বছর পেরিয়েছে সত্য কিন্তু আকিদ তার ছোটবেলার এই উৎসবের কথা কতবার শেয়ার করেছে তা বলার ইয়াত্তা রাখে না।শৈশবের-কৈশোরের রৈ রৈ। আকাশে চাঁদ দেখা গেলেই ছুটে যাওয়া মসজিদে ইমাম সাহেবের কাছে! 

কোরবানির ইদে কতবড় গরু জবাই করা হতো!  আরও কত কী! কিন্তু বছর দুয়েক থেকে তার মধ্যে একটা আলাদা রকম একটা পরিবর্তন ঘটেছে। 

বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে থাকে বুশরা এগুলো ভেবে।

এবারও আনন্দ-উৎসবের দিব সমাগত প্রায়। কিন্তু আকিদের ভাবসাব অন্যরকম। বুশরা নিজেকে আর সামলাতে না পেরে আকিদের হাত ধরে বলেই ফেললো "কারো সাথে কোরবানিতে শরিক হয়েছো"! উত্তরটা না আসলো। নাছোড়বান্দা হয়ে যখন বুশরা "না" টার কারণ জানতে চাইলো, আকিদ আর নিজেকে সামলাতে  পারলোনা।

বলল সে--
" ইব্রাহিম তো তার আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রাণ- প্রিয় ছেলেকে কোরবানি করতে চেয়েছিলেন। এরজন্য কি আমাদের এইদিনে এতোগুলো নিষ্পাপ পশু জবাই করতে হবে? এবার যে ভয়াবহ ফ্লাড হয়েছে, আমাদের জরুরি নয় বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানো! তুমি-ই বলো। 

-- জানতাম এটাই তোমার উত্তর হবে। অামার মতে তোমার এই কোরবানি স্বার্থক।

চারচোখ এক মুহুর্তের জন্য ঝলক  দিয়ে উঠে।

Wednesday, June 29, 2022

জলভসকা


সুখ-সমৃদ্ধি-উন্নতি হারিয়ে
তিনভাগ জল মাঝে ডুবে যায় দালান-গাড়ী
খোঁজে একটুকরো শুকনো পাতা
বাঁচার অন্বেষা।
আশ্রয় হারিয়ে দূরত্ব বাড়ে ----
সবুজ নৈঃশব্দ্য তার তৈলচিত্র
জলতলা শেওলার ভেতর অস্থির প্রহর কাটায়
কর্পোরেশন নর্দমায়।

তিলোত্তমা শহর বলো আর গ্রাম বরাক
দখলে তার পার্ক,চেনা-অচেনা গলি, রাজপথ, ট্রাফিক পয়েন্ট, যত মল, বক্তৃতা মঞ্চ।
জঠরে ভরা যত শব ধ্বনিত হয়
ক্ষুধা - তৃষ্ণার আর্তনাদে 
প্রাণভিক্ষার আবেদন।

বন্যা - হয়েছ এক বিভীষিকা
চোখে ঘুম হারিয়ে।

ধর্মানুভূতি: আহত ও আঘাত এই কথা দুটিতে জড়িয়ে থাকে

"আমি হিন্দু" "আমি মুসলমান একথা শুনতে শুনতে কান ঝালা-পালা হয়ে গেলো।কিন্তু “আমি মানুষ” একথা কাহাকেও বলতে শুনি না। যারা মানুষ নয়, তারা হিন্দু হোক আর মুসলমান হোক, তাদের দিয়ে জগতের কোনো লাভ নেই।"
                                  -----রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


ধর্মান্ধতাই ধর্মের মৌলবাদ। এই মৌলবাদই দেশে দেশে শিল্প ও সংস্কৃতির জন্য হুমকি হয়ে পড়েছে। ধর্মান্ধতা মানুষের একটি কমন ত্রুটি। এর প্রধান ভিত্তি হচ্ছে কোন নির্দিষ্ট বিধিবিধান বা প্রথার প্রতি যাচাই বাছাই না করে অন্ধ আনুগত্য করা। তাইতো অভিজিৎ রায়ের কথায় ‘ধর্মান্ধতা, মৌলবাদের মতো জিনিস নিয়ে যখন থেকে আমরা লেখা শুরু করেছি, জেনেছি জীবন হাতে নিয়েই লেখালিখি করছি।’

প্রচলিত ধর্মগুলি মানুষকে হিংসা বিদ্বেষ শিক্ষা দেয়, সুস্থ মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, কর্মবিমুখ অলস পরনির্ভরশীল করে গড়ে তোলে, মানুষের মধ্যে তৈরি করে বিভেদ বিভাজন। এখনো এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে, জ্ঞান বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের সময়েও তা থেমে যায়নি। বিশ্বের সভ্য মানুষেরা যখন ধর্মের আদলে কর্মে মনোযোগ দিয়ে যাচ্ছে এগিয়ে, তখন কতিপয় ধুরন্ধর মতলববাজ পরজীবী শ্রেণী সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে বাড়িয়ে চালাচ্ছে তাদের পুঁজিবাদী ব্যবসা! ছড়াচ্ছে উন্মাদনা! মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারে! থামিয়ে দিচ্ছে উন্নতির অগ্রযাত্রাকে! মানুষ ঠকছে, হচ্ছে প্রতারিত! তাইতো কখনো 'রামের' নামে আবার কখনো 'গোস্তাকে রসুলের' নামে মারছে-মরছে।

সাহাদাত হোসেন মান্টো ধর্মান্ধতা নিয়ে বেশ কিছু কাজ করেছেন। তার ‘ঠাণ্ডা গোস্ত’ গল্পে দেখি,দেশভাগের সময়কার দাঙ্গায় মুসলমানের রক্তে হাত রাঙানো শিখ যুবক ঈশ্বর সিংহ ঘরে ফিরে কিছুতেই প্রেমিকার সঙ্গে সঙ্গম করতে পারছে না। প্রেমিকার সন্দেহ হয়, তার পুরুষ নিশ্চয় অন্য নারীসঙ্গে মজেছে। ঈর্ষার জ্বালায় ঈশ্বরের কৃপাণ কোষমুক্ত করে সে ক্ষতবিক্ষত করে তাকে। মুমূর্ষু ঈশ্বর স্বীকার করে, সে এক অচেতন মুসলিম বালিকাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ক্রমশ বুঝতে পারে আসলে সে বালিকাটির শবের সঙ্গে... আখ্যানের তীব্র সংবেদনশীলতা বোঝেনি পাকিস্তান। ‘আমরা মুসলমানরা এতই আত্মমর্যাদারহিত যে আমাদের মৃত কন্যাদেরও শিখরা ধর্ষণ করে যায়?’—এমন প্রশ্ন তুলে লাহোর আদালতে মামলাও ঠুকে দেয় পাক আমলাতন্ত্র। যাইহোক এই কথাগুলো বলার কারণ হলো আমরা আর কত এভাবে একে অপরের রক্তস্নানে নিজেকে পবিত্র করবো ?

অনেক বড় ধরনের দূর্ঘটনা দেখেও আমরা খুব শক্ত থাকতে পারি। সেটা যতই মানবাধিকার লঙ্ঘণ হোক, সেটা যতই দেশের উন্নয়নে বাধা হোক, জনগণের স্বাধীনতা হরণ হোক আমরা মাথা ঠান্ডা রাখতে পারি। শ্রেণী সংগ্রামের পথে না গিয়ে আমরা চলছি ভোটের রাজনীতিতে, তাতে কোন ভাবেই আমাদের অনুভূতিতে আঘাত আনতে পারে না। কিন্তু যখন দেখি ধর্ম নিয়ে একে অপরের মন্তব্য বা কেটে মেরে রক্ত ঝরায়, তখন আমাদের আবেগ তীব্র উল্কাপিন্ড হয়ে যায়। হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়,শক্ত হয়ে যায়। মনে হয় নিজের শরীরে যন্ত্রনা হচ্ছে।পৃথিবীতে মনে হয় ধর্মের চেয়ে কেউ আত্মার এত কাছে থাকে না।

ধর্ম যে কতটা ঠুনকো কতটা ভঙ্গুর তার বারবার প্রমাণিত।মানুষ হতে ধর্মের কোনো প্রয়োজন নেই। একুশ শতকের আগের একটা মহান শিক্ষা আজ‌ও আমরা আমাদের বাচ্চাদের দিতে পারিনি - 'ধর্মের বেশে মােহ যারে এসে ধরে অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে'।

খারাপ মানুষকে ধর্ম ভালো করতে পারছে না। মানুষের ধর্ম নিজের ও মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা, ভালোকথা ভালোবাসা দিয়ে মানুষকে খুশি করা। জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রসারে, মনুষ্যত্ব মানবতাবোধ অর্জনের মধ্য দিয়ে, নিশ্চয়ই একদিন বিভাজন দূরীভূত হবে।

ছবিঋণ : জিষ্ণু রায়চৌধুরীর ফেসবুক ওয়াল থেকে।

Saturday, June 25, 2022

অভিভাবকগণ, সাবধান! ফুবিং আপনার সন্তানকে ধ্বংস করবে!


একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে বেশিরভাগ তরুণ-তরুণীই ফুবিংয়ে ভুগছেন এবং শুধুমাত্র তাদের স্মার্টফোনের জন্য তাদের সঙ্গী, পিতামাতা এবং তাদের আশেপাশের লোকজনকে উপেক্ষা করছেন। এক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

 হায়দ্রাবাদের তরুণদের মধ্যে পরিচালিত একটি গবেষণায় উদ্বেগজনক ফলাফল এসেছে। এই অধ্যয়নের সহ-লেখক এবং হায়দ্রাবাদের ইএসআইসি হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ সুধা বালা তার গবেষণায় বলেছেন, 'হায়দ্রাবাদের যুবকদের মধ্যে মানসিক যন্ত্রণার উপর ভয় দেখানোর পরিণতি' এটি বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের সাথে তাদের সম্পর্কের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।

'ফুবিং' শব্দটি হল 'ফোন' এবং 'স্নাবিং'-এর একটি পোর্টম্যানটো— তার অর্থ দাঁড়ায় অন্যের দিকে মনোযোগ না দিয়ে নিজের ফোনে ব্যস্ত থাকা। দুটি শব্দের সংমিশ্রণ এবং এটি একটি প্রচারণার অংশ হিসাবে ২০১২ সালে একটি অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞাপন সংস্থা তৈরি করেছিল যা পরে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

 ২০১৮ সালে ICMR-এর সহযোগিতায় শহরের ডাঃ বালা, ধরনি টেককাম এবং হর্ষল পান্ডাওয়ে এই গবেষণাটি চালু করেছিলেন। তারা ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিসিন এবং কলা বিভাগের মোট ৪৩০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে গবেষণাটি পরিচালনা করেন।

 সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে যে শহুরে যুবকদের মধ্যে ফুবিংয়ের প্রবণতা বেশি, তাদের মধ্যে ৫২ শতাংশই ফুবিংয়ে নিমগ্ন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে, ২৩ শতাংশ ফুবিংয়ের ফলে গুরুতর মানসিক যন্ত্রণার সম্মুখীন হয়েছিল, যখন ৩৪ শতাংশের মাঝারি মানসিক যন্ত্রণা ছিল। এটি বলেছে, ফুবিংয়ের পরিমাণ এবং মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে একটি পরিসংখ্যানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে, ফুবিং গেমিং আসক্তিতে পরিণত হতে দেখা গেছে। শহরের একটি হাসপাতালের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৪ বছর বয়সী একটি ছেলে দশম শ্রেনীর পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি সত্ত্বেও অনলাইন গেম খেলে দিনে ১৮ ঘন্টা পর্যন্ত ব্যয় করে।

 যাইহোক, এই ফুবিং কিশোর বা তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় রেনোভা হাসপাতালের কনসালটেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট এবং সাইকোঅ্যানালাইটিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ আসফিয়া কুলসুম বলেন, কখনও কখনও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ফুবিং পাওয়া যায়।

 তিনি বলেন, অনেক উদাহরণ রয়েছে যে স্ত্রীরা তাদের ফোনে বেশি সময় ব্যয় করে তাদের স্বামীদের সাথে দাম্পত্য কলহের দিকে নিয়ে যায়। সংক্ষেপে শুধু এটাই বলা যায় যে, ফুবিং আধুনিক মানুষকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। এর আগে থেকে এর প্রিকিউশন অবলম্বন না করলে অদূরে মানসিক বিকারগ্রস্থতার স্বীকার অনিবার্য।

(নীচের এই লিংকে ক্লিক করে আরও পড়তে পারেন)

https://www.deccanchronicle.com/lifestyle/culture-and-society/170622/half-of-city-youth-in-grip-of-phubbing-study.html

https://www.newportacademy.com/resources/mental-health/phubbing-why-its-bad-for-us/

Friday, June 24, 2022

সমতুল্য


তখন রোদ্দুর সীমার গাইনোকলজিস্ট এর সাথে ফোনে কথা বলছিল। চারিদিকে জল এমনকি রোদ্দুররার গ্রাউন্ড ফ্লোরটা পর্যন্ত। তাই চেকাপেরর জন্য মেডিকেল এ নেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। উপরের তলায় খুব কষ্ট হচ্ছে সীমার। আর চার পাঁচ দিন সময় হাতে। জল নিয়ে রোদ্দুর খুব চিন্তায়। ফ্লাডে একতো খাবার শেষ হওয়ার পথে আর পান করার জলটাও প্রায় শেষ। মিনারেল ও পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু সীমার দিকে তাকিয়ে সব ম্যানেজ করতে জানে রোদ্দুর। খুব ভালোবাসে।

গর্ভবতী স্ত্রী কথোপকথন শেষে সত্যিই নিজে মেয়ে জাতি হওয়ার এবং নিজের পেটে নিজের বাচ্চা সৃষ্টির, লালন পালনের আনন্দে আনন্দিত হয়ে এই বাস্তবতার জ্ঞানে সমৃদ্ধ স্বামীকে গর্বে জড়িয়ে ধরে সীমা। রোদ্দুর চোখ মুছে বলে তোমাদের ঋণ শোধ করতে নেই মনে রাখতে হয়। পুরুষ কখনোই নারীর সমতুল্য হতে পারে না।

Sunday, June 19, 2022

নৌকা বাইচ বরাকের ঐতিহ্যবাহী দৌড় প্রতিযোগিতা


আবহমানকাল থেকে নৌকা দৌড় বাইচ বাংলার লোকসংস্কৃতির নদী কেন্দ্রীক পরিচায়ক। কালের পরিক্রমায় হারিয়ে গেলেও সাম্প্রতিক কয়েক বছরে তা আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এক সময় এ দেশে যোগাযোগ ছিল নদী কেন্দ্রিক আর বাহন ছিল নৌকা। এখানে নৌ শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে বিভিন্ন শিল্পকেন্দ্র। এসব শিল্পে যুগ যুগ ধরে তৈরি হয় দক্ষ ও অভিজ্ঞ কারিগর। এভাবে একসময় বিভিন্ন নৌযানের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কালের পরিক্রমায় `মেসোপটেমিয়ার` মানুষদের শুরু করা খেলাটি বাংলাদেশের জনপ্রিয়তার সাথে সাথে আমাদের দেশেও চলে আসে।

নৌকা দৌড় বরাক উপত্যকার ঐতিহ্য বহন করে। বিশেষ করে আমাদের করিমগঞ্জ জেলায় এই নৌকা দৌড় প্রতিযোগিতা এই অঞ্চলের মানুষের আনন্দের সঞ্চার জোগায়। কালের পরিক্রমায় হারিয়ে গেলেও জনপ্রিয়তা ও সমাদর লোক হৃদয়ে আজও আছে এক বিশেষ স্থান দখল করে।

এক সময় এ দেশে যোগাযোগ ছিল নদী কেন্দ্রিক আর বাহন ছিল নৌকা। নৌ শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন শিল্পকেন্দ্র। এসব শিল্পে যুগ যুগ ধরে তৈরি হয় দক্ষ ও অভিজ্ঞ কারিগর।কালের বিবর্তনে পাশ্চাত্যের ভাবধারায় আধুনিক সুযোগসুবিধার সম্মিলনে কতক শহর গড়ে উঠলেও গ্রামবাংলায় নৌকা দৌড়ের কদর এখনও ব্যাপক। নৌকা বাইচে আমজনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই তার প্রমাণ।

এই নৌকা দৌড় প্রতিযোগিতা বিশেষ করে বর্ষাকালে হয়ে থাকে। নদীতে বা বিলে যখন জল ভর্তি হয় কানায় কানায়, প্রায় কিছু জায়গায় বন্যার আকার ধারন করে। ঠিক সেই সময় আনন্দ উপভোগ জোগাতে এই প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। তবে একসাথে সব জায়গায় এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়না। এক এক জায়গায় এক এক সময়ে হয়ে থাকে।করিমগঞ্জে বিশেষ করে শণবিল,বদরপুর ঘাট, শনিবাড়ি,সুতারকান্দী (কৈয়া বিল) এইসব অঞ্চলে হয়ে থাকে। নৌকা বাইচের নৌকা হয় সরু ও লম্বাটে। কারণ, সরু ও লম্বাটে নৌকা নদীর পানি কেটে দ্রুত গতিতে চলতে সক্ষম। নৌকার সামনে সুন্দর করে সাজানো হয় এবং ময়ুরের মুখ, রাজ হাসের মুখ বা অন্য পাখির মুখের অবয়ব তৈরি করা হয়। দর্শকদের সামনে দৃষ্টিগোচর করতে নৌকাটিকে উজ্জ্বল রংয়ের কারুকাজ করা হয়।

নৌকাবাইচের সময় মাঝি-মাল্লারা সমবেত কণ্ঠে গান গায়। এতে তাদের যেভাবে উৎসাহ বাড়ে ঠিক দর্শকদেরও বাড়ে আগ্রহ। তৈরি হয় এক মনোরঞ্জক পরিবেশ। প্রতিযোগিতায় আরও রয়েছে বিজয়ীদের পুরস্কারের ব্যবস্থা। পুরষ্কার হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে মোটা অংকের টাকা,টিভি, নৌকা ইত্যাদি। আমাদের এলাকায় এই দৌড় প্রতিযোগিতা হয় কৈয়া বিলে বা শনিবাড়ি লঙ্গাই এ। দৌড়ের নৌকাগুলোর নাম ও আছে যেমন সোনার তরী, অগ্রদূত, পঙ্খিরাজ, ময়ুরপঙ্খী ইত্যাদি। 

এই জনপ্রিয় নৌকা দৌড়ে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বস্তু হলো জনপ্রিয় সারিগান। তাল, করতাল বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সারিবদ্ধভাবে চলে গান। শাহ আবদুল করিমের --

চন্দ্র-সূর্য বান্ধা আছে নাওয়েরই আগায়
দূরবীনে দেখিয়া পথ মাঝি-মাল্লায় বায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায় ।।

রঙ-বেরঙের যতো নৌকা ভবের তলায় আয়
রঙ-বেরঙের সারি গাইয়া ভাটি বাইয়া যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায় ।।

একটার পর একটা চলে

আল্লায় বলিয়া নাও খোল রে
ভাই সক্কলি।
আল্লাহ বলিয়া খোল।।
ওরে আল্লা বল নাও খোল
শয়তান যাবে দূরে।।
ওরে যে কলমা পইড়া দেছে
মোহাম্মদ রাসূলরে
ভাই সক্কল।...

বা এটাও

যাত্রাকালে বাধা দিওনা বিদায় দেওগো সকালে
আমার নীলগো রতন কাল রতন সাজাইয়া দে…
রাধিকা সুন্দরী জল ভরিতে যায় সোনার নুপুর বাজে রাঙা পায়।
দেখরে কার রমনী জলে যায়।

(এই গানগুলো এক প্রতিযোগির কাছ থেকে সংগ্রহ করা, নাম - গফুর চাচা)।

নৌকা দৌড় শ্রাবণ মাস থেকে শুরু করে ভাদ্র-আশ্বিন মাস পর্যন্ত হলেও মূল আকর্ষণ শ্রাবণ সংক্রান্তির নৌকা দৌড়। কালের বিবর্তনে যদিও আমরা বিশ্বায়নের যুগে তবু নিজের লোকসংস্কৃতির ইতিহাস মিটিয়ে দেয়া কোন ভাবেই সম্ভব নয়। তাইতো এর মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব আজ পর্যন্ত বহাল রেখেছে এতদাঞ্চলের মানুষ।

Sunday, June 12, 2022

মাই গড ইজ আ ওম্যান

মূল লেখিকা - নূর জহির

মাই গড ইজ আ ওম্যান! বইটি সম্পর্কে যেদিন প্রথম জানতে পারি তখন থেকেই টানটান উত্তেজনা। হওয়ারই কথা, কারণ টাইটেলটাই আমার পক্ষে যথেষ্ট ছিল, উৎসাহের কারণও বটে।এই বইটিতে আসল মশলা যোগ করা হয়েছে সে কারণে বিরক্তিকর টাইপের কোথাও অবকাশ নেই। আমি শুধু চেয়েছিলাম বইটি আরও বড় কিছু ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু চরিত্রগুলির অসামান্য আকর্ষণ, এবং শেষে আপনি আপনার পছন্দের তুলনা থেকে অতুলনীয় হয়ে ওঠে। এই বই পছন্দের বিষয় হল সঠিক বিজ্ঞানমনস্কে মূল্যায়ণ হয়েছে, যখন কেউ জানে না ঈশ্বরের মনে কী আছে!

নয় বছর বয়সী সাফিয়া মেহেদীকে একটি ম্যাগাজিনের অহানিকর নিবন্ধে পর্দার জগতে পৌঁছে দেয়। তার বাবা তাকে বিয়ে দেন লখনৌয়ের বিখ্যাত জাফরি ​​পরিবারের ছেলে আব্বাস জাফরির সাথে। আব্বাস একজন ব্যারিস্টার এবং একটি বিতর্কিত বইয়ের লেখক। সাফিয়ার বাবা আশা করেছিলেন যে তিনি তার বিচ্যুত স্বামীকে 'আল্লাহর সত্য বিশ্বাসে' ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন। হাস্যকরভাবে, আব্বাস যিনি একটি স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখেন যেখানে নারীরা পুরুষের মতো সমান অধিকার ভোগ করবে, সাফিয়াকে একজন ঐতিহ্যবাহী মুসলিম নারীর স্টেরিওটাইপ থেকে মুক্ত হতে পরিচালিত করবে। স্বাধীনতা-পূর্বের উত্তাল সময়ের বিপরীতে, স্বামী-স্ত্রী জুটি একটি প্রগতিশীল জাতির পথকে ব্যাখ্যা করে একটি যাত্রা শুরু করে।

যাইহোক, যখন সবকিছু ঠিকঠাক ভাবে চলছিল, তখন আব্বাসকে ইমামের মুখোমুখি হওয়ার জন্য একটি ফতোয়া জারি করা হয়, নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য প্রচার করা হয়। তার মার্কসবাদী পার্টিও তাকে দেশের মুসলিম মহিলাদের দুঃখজনক অবস্থার জন্য শরিয়তের সমালোচনা করার জন্য তাকে বঞ্চিত করে। ফলস্বরূপ, আব্বাসকে মুসলিম ধর্মান্ধদের দ্বারা হত্যা করা হয় এবং সাফিয়াকে নিজের এবং তার মেয়ের জন্য একাকী রেখে দেওয়া হয়। সময়ের সাথে সাথে, সাফিয়া দৃঢ়তা এবং সাধারণ জ্ঞান অর্জন করে। একজন নারী হওয়ার তার 'শক্তিতে' তার প্রকাশ্য ধার্মিকতা এবং নিখুঁত বিশ্বাসে সজ্জিত, সাফিয়া নারীর ক্ষমতায়নের কারণকে এগিয়ে নিয়ে চলে। কিন্তু সে কি সেই বহুল প্রতীক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারে নাকি সমাজের দমনমূলক গোঁড়ামির শিকার হয়? 

তিনি কি মুসলিম নারীদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারেন, তাদের শক্তভাবে বন্ধ আঙ্গুলগুলো খুলে দিতে এবং তাদের ভাগ্যের উপযোগী একটি পৃথিবী গড়তে বের হতে পারেন? নারীরা কি সেই ঈশ্বর হতে পারে যেটা তারা সবসময় হতে চেয়েছিল?  

মাই গড ইজ আ ওম্যান বইটিতে চলুন কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। একটি অত্যন্ত চিন্তাশীল বই, যা সংস্কারের বিবরণ উন্মোচন করে বা বরং মুসলিম নারীদের উন্নত অবস্থার জন্য মুসলিম পুরুষদের দ্বারা আনার চেষ্টা করে, যাকে তার নিজের লোকেরা হত্যা করেছিল। এটা আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে কেন মুসলিম নারীদের অবস্থা বর্তমানে এমন হচ্ছে। শরিয়ত কি মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে? আমি তাই মনে করি না. যেমন দাবি করা হয়, যদি এটি ঈশ্বরের একটি শব্দ হয়, তাহলে ঈশ্বর কেন পরামর্শ দেবেন বা এমনকি তার একটি জাতিকে অন্যের দ্বারা আধিপত্য করতে চান যে এটি মানবতার কাছে একটি প্রশ্নচিহ্ন হয়ে ওঠে। “শরীয়ত” কেন দেশের আইনের ঊর্ধ্বে বিবেচিত হতে পারে? আমি উত্তর খুঁজে পাওয়ার আশা করি, এবং অনুসন্ধানে আমি আমার অনেক মুসলিম (পুরুষ) বন্ধুদের চেক করেছি যারা ভেড়ার মত হয়ে গেছে। কেন এত বড় ধর্ম এই অবস্থায় এসেছে যে তার বিরুদ্ধে এত প্রশ্ন উঠেছে? মহান ধর্মের বাহক কি “ইসলাম” সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম নয়। শরিয়তের পরিবর্তন না হলে, শরিয়তের ব্যাখ্যা করতে চাওয়া লোকেদের কি পরিবর্তন দরকার নয়?

মাই গড ইজ আ ওম্যান এর লেখিকা নূর জহিরের ২০ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে রচিত উপন্যাস। এটি ধর্মীয় আইনের ব্যবধানে মুসলিম মহিলাদের দমনের সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে কাজ করে। বইটি প্রতিফলিত করে কিভাবে একদিকে নারীরা বাধ্য হয়ে পর্দা পালন করতে বাধ্য হয়েছিল, শিক্ষা লাভের সুযোগ দেওয়া হয়নি, যার ফলে তারা অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে আছে। অন্যদিকে, 'তিন তালাক' অভ্যাস তাদের অসহায় ও নিঃস্ব জীবনযাপনের জন্য আরও দুর্বল করে তুলেছে।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...