" সভ্যতা তো সইতে শেখায়।
বইতে শেখায় নদীর তীরে।
মনকে আবার পারলে ফেরাও
জীবন বিমুখ এই শরীরে।---- শ্রীজাত
সাহিত্য-সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগাজিন দীর্ঘদিন থেকে এক অসাধারণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শিল্প-সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিষয়ে চলমান ধারাকে আপত্তি জানিয়ে মুক্ত চিন্তা ও মতামত ব্যক্ত করার বাহক হলো লিটল ম্যাগাজিন। সৃজনশীল ও সৃষ্টিশীল তথা কমার্শিয়াল দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে সাহিত্যের বিবর্তন ও বিনির্মাণে দলিল হয়ে উঠেছে। যে বোধের তাড়িত হয়ে প্রতিটা লিটল ম্যাগাজিন, তার নেপথ্যের মূলে জীবনের গল্প। নব আশার কিশলয় কবে রূপ নেবে মহীরুহে তা জানা নেই। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি বোধের এই চিন্তন ভূমিতে কালে কালে হরেক বৈচিত্রের জন্ম হবে আবহমানতার ভেতরেই ফলবতী থাকে বীজ মাহাত্ম। তাই র্যশানাল জীবনের শরীরী উদভাস প্রবল হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। আর যারা কিছু নতুন নির্মাণের কারিগর তাদের পায়ের নীচে থাকা চাই সহযোগের শক্ত পাটাতন। আর অবশ্য এই পাটাতনের নাম 'লিটল ম্যাগ'।উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগাজিনগুলো মাতৃতুল্য। আমাদের অঞ্চলে যেসব লেখক- প্রায়ই উঠে এসেছেন লিটল ম্যাগ থেকে। তাই নবীন প্রবীণ সাহিত্যিকদের মধ্যে যে মেল বন্ধন ধরে তার একমাত্র বাহক লিটল ম্যাগাজিন।
আজকের এই বিশ্বায়নের গগনচুম্বী আপ-টু-ডেট ভার্শনে, সাহিত্য-সংস্কৃতি-সভ্যতায় পুঁজিবাদী গন্ধ, আর ঠিক সেই সময়ে গুয়াহাটির মতো 'ডিজিটালাইজেশনের' পথে ধাবিত হওয়া শহরে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজ আয়োজিত "৭ম উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলন'। এই অভাবনীয় অনুষ্ঠান আমাদের ভাবনায় এক উৎসাহের প্রজ্জ্বলিত শিখার জন্ম দেয়। এক আলাদা সত্তা হিসেবে কাজ করে যখন সময় সংকটে। ২০১৮ সনের ২২,২৩ ও ২৪ ডিসেম্বর গুয়াহাটির সাউথ পয়েন্ট স্কুল প্রাঙ্গণে ৭ম উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লি'ম্যাগ সম্মেলনে বিশিষ্ট গুণীজনের সান্নিধ্য ও নতুন কিছু অভিজ্ঞতার কাছে পরিচয় সে এক অভাবনীয় বিষয়। যা আমার সৌভাগ্য। উত্তর পূর্বাঞ্চলের ছোট কাগজ মিলন মেলায় মেলবন্ধন ও মতবিনিময় সুযোগ করে দিয়েছে এই মঞ্চ। লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলন যে বিষয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠে-- ১। কবি- সাহিত্যিক মিলনায়তন,২। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,৩। আলোচনা সভা,৪। মতবিনিময়,৫। প্রদর্শনী।
৭ম লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনটি ছিল এক চমকপ্রদ। আর আমার জন্য অনেক শিক্ষনীয় দিকের উন্মেষ হওয়া। অসংখ্য পত্র পত্রিকা, ছোট কাগজ তথা যে কবি, সাহিত্যিক, কথাকারদের লেখা পড়েছিলাম এবং যাদের সাথে ফেবুতে পরিচয় ছিল, সশরীরে অনেক কে দেখে ধন্যবাদ জানাই এই বৌদ্ধিক চিন্তার সঙ্গমস্থলকে। বাসব দা, সুশান্ত কর স্যার, গৌতম দা, প্রসূন দা-- বিশেষ করে ওদের সাথে ফেবুতে বেশ কথা হয়। এমনকি আমার "মননভূমি"র ৩য় সংখ্যায় বাসব দার একটা লেখাও ছাপিয়েছি। কিন্তু কখনও একসাথে দেখা হয়নি। এই লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলন অসম,ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গকে ত্রিবেনী সঙ্গমে পরিণত করেছে।
এই মহা মিলনায়তনে বরাক-ত্রিপুরা মিলে আমরা যোগ দেই ১৩জন। আমার করিমগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন থেকে ওদের সাথে দেখা হয়। অজিত স্যার, গোবিন্দ ধর(স্রোত), গোপাল চন্দ্র দাস(মনুতট),সঞ্জীব দে(বিজয়া) রাজিব(রূপান্তর), অভিক(সমভূমি),পদ্মশ্রী মজুমদার(বইবাড়ি), গৈরিকা(দোলনা), শুভ্রশংকর(Shadowkraft) অনুপ(মহুরি)আর আমি একসঙ্গে বদরপুর পর্যন্ত যাই। তারপর সেখানে দেখা হয় আদিমা মজুমদার(কথা) ও মৃদুলা ভট্টাচার্য(সৃজনী) এর সঙ্গে। রাত্রি ০৯.৩০ মিনিটে শিলচর-গুয়াহাটি ট্রেনে যাত্রা শুরু করলাম সম্মেলন অভিমুখে। এই যাত্রায় গোবিন্দ দা'র সাথে আমার প্রথম সফর। এই শব্দ চাষীর কথা যতই বলা হবে তবুও কম। স্রোত সাহিত্য পত্র ১৯৯৫ সাল থেকে নাথেমে চলছে। এখন পর্যন্ত ৬৮-৬৯তম সংখ্যা বেরিয়ে শতকের ঘর পেরোনোর লক্ষ্যে। স্রোত প্রকাশনাও পিছিয়ে নয়। প্রায় ৫০০টির উপর উত্তর পূর্বাঞ্চলের বইসহ সারা বাংলা সাহিত্যের বই করে স্রোত আজ সারা বাংলা সাহিত্যের পরিচিত নাম। বাংলা সাহিত্য চর্চায় এই শব্দ শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমকে সাধুবাদ জানাই।
এই সম্মেলনের অনেক প্রাপ্তি। টেবিলে টেবিলে মিলন গানে বেঁধে নিয়েছে একসূতে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক নিরুপমা বাইদেউর হাতে উদ্বোধন ও লিটল ম্যাগাজিনের প্রাণপুরুষ সন্দীপ দত্তের দ্বারা "হেমন্ত কুমারী চৌধুরী" লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনী উদ্বোধন হয়। এই দৃশ্য রেখাপাত করে আমার হৃদয়ের তথ্যচিত্রে। আরও নজড় কাড়ে মঞ্চ উৎসর্গ করার মাধ্যমে-- দীপালি বরঠাকুর ও শুক্রাচার্য রাভা স্মরণে। ছোট পত্রিকা ও সম্পাদকের সাথে পরিচয়ে যে উষ্মস্পর্শ পেয়েছি তা আর হয়তো নাও হতে পারে। বিশেষ করে-- উজান, নাইনথ কলাম, জলসিঁড়ি, লেখা কর্মী, আরশিনগর, প্রজন্ম চত্বর, দোলনা আরও অনেক।
অতিথি আপ্যায়নে বিশেষ করে আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যাপারে আয়োজক গোষ্ঠি চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। হোটেলের প্রবেশদ্বারে গৌতম দা'র উষ্ণ অভিনন্দন চিরদিন মনে রাখার মতো। শিখেছি আতিথেয়তা কিভাবে করতে হয়। যাবার বেলায় যখন না খেয়ে বেরিয়ে পড়ি ট্রেনের জন্য তখন প্রসূন দা যে অমায়িক ও সহোদরতা দেখিয়েছেন তা অমূল্য। মনে পড়লেই চোখে জল এসে যায়। এই সম্মেলন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। বিশেষ করে লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে অনেক কিছু জানতে পারি যা এ যাবৎ আমার কাছে অজানা ছিলো। অনেক প্রশ্ন যেগুলো আমাকে যন্ত্রণা দিতো ম্যাগাজিন তৈরিতে--- অমলেন্দু স্যার, সুশান্ত স্যার, জ্যোতির্ময় দা, গোবিন্দ দা, এর সমাধান দিয়েছেন নির্দ্বিধায়। দ্বিতীয় দিন বিকেলে লিটল ম্যাগাজিনের প্রাণপুরুষ সন্দীপ দত্ত, উনিও বসেছিলেন আমার ষ্টলে। আলোচনা করেন লি'ম্যাগ এর প্রতিবন্ধকতা নিয়ে।
৭ম উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলন সম্পাদিত হয় বিভিন্ন ধরনের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। বিশেষ করে কবিতা পাঠ, গল্প পাঠ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রতিনিধি সভা, সাউথ পয়েন্ট স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের অনুষ্ঠান, সম্পাদকদের বৈঠক ইত্যাদি। সম্মেলনের তৃতীয় দিনে প্রতিনিধি সভায় "লিটল ম্যাগাজিন" বিষয়ক বিভিন্ন দিকের আলোচনা হয়। এই আলোচনা সভায় উপস্থিত থাকেন-- "সৃজনী- মৃদুলা ভট্টাচার্য, উত্তীয়- স্নিগ্ধা চট্টোপাধ্যায়, বরাক নন্দিনী- দেবযানী ভট্টাচার্য, স্রোত- গোবিন্দ ধর, প্রজন্ম চত্বর- জ্যোতির্ময় রায়, উত্তরণ, মননভূমি- আ. জাহিদ রুদ্র, কর্মশালা- ধনঞ্জয় চক্রবর্তী, আকাশের ছাদ- সুমিতা বসু ঠাকুর, সাগ্নিক- প্রদ্যোৎ গোস্বামী প্রমুখ। এই অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কুমার অজিত দত্ত মহাশয়। জ্যোতির্ময় রায়ের অসাধারণ শব্দ চয়ন বক্তব্য আর গোবিন্দ ধর লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশে নিজের কিছু ব্যক্তিগত গল্পও তুলে ধরেন এই আলোচনায়। "সাগ্নিক" এর সম্পাদক প্রদ্যোৎ গোস্বামী বড়ল্যাণ্ড থেকে কতটা ত্যাগ স্বীকার করে ম্যাগাজিন চালিয়ে যাচ্ছেন তাও শুনে অবাক হলাম। আসলে লিটল ম্যাগাজিন যে অপ্রাতিষ্ঠানিক এবং অবানিজ্যিক তা পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুধাবিত হয় এই মঞ্চে।
আমার আলোচনা আর দীর্ঘায়িত করছি না। তবে একটি কথা না বললে অসম্পূর্ণ থাকবে বলে মনে করি আমার লেখনী। সম্মেলন শেষে ট্রেনে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই, গুয়াহাটি-শিলচর ফার্ষ্ট পেসেঞ্জারে। সঙ্গে আদিমা মজুমদার। পরদিন সকালে ফ্রেশ হয়ে ট্রেনে বসে বসে গল্প করছিলাম আন্টির সাথে। তো হঠাৎ এক হিজড়া এসে হাজির আমাদের কামরায়। হাতে তালি দিয়েই টাকার আবদার। এই সুযোগে আদিমা মাসি ওর হাত ধরে বসিয়ে দিলেন তাঁর কাছে। আদর-সোহাগে কথোপকথন করতে থাকেন তার সাথে। তার ব্যক্তিগত জীবনের অনেক দিক নিয়ে কথা চলে।অশ্রুমথিত চোখে অনর্গল বলতে থাকে জীবনের গল্পটা। আন্টি প্রশ্ন করছেন আর সেও উত্তর দিচ্ছে একটার পর একটা।সেই ফাঁকে আমিও ভিডিও করে নিলাম এই সাক্ষাৎ কারের। যেখানে বিশ্বায়নের নামে রঙিন ফানুস উড়িয়ে মানুষ আনন্দ বিহারে মগ্ন। নিজেকে সভ্য করার জাল সার্টিফিকেট দেখিয়ে লুটিয়ে খাচ্ছে সমাজ। এই সমাজে হিজড়াদের প্রতি মানবিক বড়ই বিচক্ষণ মানসিকতার কাজ। এই নির্মম সমাজ মৃত বাবার মুখও দেখতে দেয় নাই অভাগিনিটাকে। বড়ই করুণ লাগে। আন্টির মুখে মমতার আঁচলে ঘেরা স্বান্তনা তাকে নিশ্চয়ই বেঁচে থাকার, নিজেকে সংযত করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাত শেখাবে। অবশেষে আমরা কিছু টাকা তুলে তার হাতে দেই। তারপর বিদায় নিয়ে চলে যায়।
দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা একটু ব্যাতিক্রম। অমলেন্দু স্যার আর আমরা দু'জন গল্প করছিলাম। তো হঠাৎ এক বাদামওয়ালার সাথে সাক্ষাৎ। সে স্যার কে দেখে প্রণাম করে, দু'জনের মধ্যে বার্তালাপ চলতে থাকে। স্যার পরিচয় করিয়ে দিলেন পঙ্কজের সাথে। গুরুচরণ কলেজ থেকে বাংলায় ৫৯% পেয়ে ডিগ্রী পাশ করে। বর্তমানে "আইডল" থেকে মাষ্টার্স করছে। স্যার তাকে বিশেষ কিছু টিপস দিলেন। আর আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখতে বললেন পঙ্কজ কে। এই কমল হৃদয়ের ছেলেটার পড়ার প্রতি আগ্রহ আর টান অনেক কিছু মনে করিয়ে দিল আমাকে। ফেরার পথে এই ঘটনাদ্বয়ে সম্মেলনের ক্লাইম্যাক্স আরও অভিজ্ঞতার জানান দেয় আমাকে।
কথায় কথায় অন্য কথা এসে গেল। তবে এটা অপ্রাসঙ্গিক নয়। সবশেষে একটা কথা বলি। লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলন কে 'সাহিত্য উৎসব' বললেও ভুল হবে না। সম্মেলনের প্রতিটা অনুষ্ঠান দারুণ উপভোগ্য ও নজরকাড়া ছিলো। যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে সম্মেলনটি সুন্দর ও সর্বাঙ্গীন সফলতা পেয়েছে সেই "বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজ"কে জানাই হৃদয়ের অন্তর্স্থল থেকে কুর্নিশ এবং আন্তরিক শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন।