Thursday, August 24, 2023

অন্ধকারে জাগ্রত বিবেক : নরেন্দ্র দাভোলকর


“নরেন্দ্র দাভোলকারের কাজ কখনও মুছে ফেলা যাবে না। তাঁর পায়ের ছাপ রয়ে যাবে” — নাসিরুদ্দিন শাহ

শুধু কেউ বিজ্ঞান জানলে কিংবা বিজ্ঞানী হলে সমাজ বিকশিত হবে না, যদি না তিনি বিজ্ঞানমনস্ক হন। কারণ মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণীদের প্রধান তফাত হল, মানুষের কৌতূহল আছে, সে প্রশ্ন করে, অন্য প্রাণীরা করে না। প্রকৃতি সম্বন্ধে কৌতূহল থেকেই মানুষ জন্ম দিয়েছে বিজ্ঞানের। পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তর্ক, অনুমান, অভিজ্ঞতার  মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে বিজ্ঞান। মূলত ‘বিজ্ঞানমনস্কতা’ হল, বিজ্ঞানস্বীকৃত সত্যকেই বিশ্বাস করার মানসিকতা। ২০ অগাস্ট ২০১৩ সাল। আততায়ীদের হাতে গুপ্তহত্যার শিকার হন নরেন্দ্র দাভোলকর। কাজের দিক থেকে তিনি বিজ্ঞান আন্দোলন কর্মী, ডাক্তার, সমাজকর্মী ও প্রভাবশালী যুক্তিবাদী লেখক ছিলেন। মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতির সভাপতি ছিলেন। তাঁরা দীর্ঘ লড়াইয়ের পর কুসংস্কার ও কালাযাদু বিরোধী একটি আইন আনার চেষ্টা করছিলেন মহারাষ্ট্রে। যা অনেক ক্ষমতাশালীদের ভীমরুলের স্বার্থে আঘাত করেছিল। তাই আলো হাতে নিয়ে যারা আঁধারের যাত্রী তাদের লুকিয়ে লুকিয়ে গুপ্তহত্যা। শুধু দাভোলকর নন, গোবিন্দ পানসারে, এমএম কালবুর্গি, গৌরী লঙ্কেশ সহ অগুন্তি যুক্তিবাদী প্রগতিশীলরা আমাদের গর্ব। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যখন এঁদের মতো প্রগতিশীলরা আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন।

নরেন্দ্র দাভোলকর নিজে ছিলেন একান্ত নিরীশ্বরবাদী, কিন্তু কোনও মানুষের ধর্মাচরণে কখনও বাধা দেননি। ধর্মাসক্ত অসহায় মানুষকে তিনি বরং ভরসা দিতেন, বলতেন সাফল্যের জন্য সতত পরিশ্রম করার কথা। তাঁর মৃত্যুর পর 'ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান র‌্যাশনালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন'-এর সভাপতি নরেন্দ্র নায়ক বলেন, “প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি যদি মনে করে থাকে আমাদের এক জনকে গুলি চালিয়ে খুন করে আন্দোলনকে স্তব্ধ করবে, তবে তারা ভুল করছে।” বিজ্ঞানে স্বীকৃত সত্যই একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য। অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই কখনওই থামে না, বরং হাতবদল হয় শুধু।

সমাজকে আলোর পথে হাঁটানোর ভাবনা দাভোলকরের মধ্যে যুবক বয়স থেকেই ছিল প্রায় সক্রিয়। ডাক্তারি পড়তে পড়তেই তিনি যোগ দিয়েছিলেন ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান ড্রিঙ্কিং ওয়াটার’ আন্দোলনে। পানীয় জলের অপব্যবহার নিয়ে তিনি তৎকালীন ধর্মগুরু আসারাম বাপুর সরাসরি বিরোধিতা করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। দাভোলকর ১৯৮৩ সালে নিজে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি’ বা ‘এমএএনএস’। শুধু মহারাষ্ট্রেই এর ২৩০টি শাখা। আজ সমগ্র ভারতে এই সমিতির শাখা ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে যেমন সরব হলেন, তেমনি মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন দাভোলকর। ২০০২ সালে একটি চ্যালেঞ্জে বলেন, কোনও অলৌকিক বাবা যদি ‘এমএএনএস’-এর ঠিক করে দেওয়া ১২টি কাজের মধ্যে কোনও একটি করে দেখাতে পারেন তবে ১১ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। এই কাজগুলির মধ্যে ছিল শূন্যে ভেসে থাকা, গভীর জলের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া, আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা, শূন্য থেকে একটা সোনার হার তৈরি করা ইত্যাদি। কাউকে ব্যক্তিগত আঘাত করার উদ্দেশ্যে এই চ্যালেঞ্জ নয়, উদ্দেশ্য ছিল তথাকথিত বাবাজি-মাতাজির হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা, একটা সুস্থ সমাজ গঠন করা। ‘মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি’র লক্ষ্য ছিল— কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের চর্চা বন্ধ করা, যুক্তিবাদ, নৈতিক মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ব চর্চা, বিজ্ঞান-অনুসন্ধিৎসা ও অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষকে সঠিক পথ দেখানো।

যুক্তিবাদী নিগ্রহ ও নিধনের এই পর্বটি হয়তো এখনও শেষ হয়নি। হয়তো যুক্তিবাদী সৈনিকদের আরও মূল্য চোকাতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, যুক্তিবাদ, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সমর্থনে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই স্বনামধন্য ব্যক্তি ছিলেন। প্রত্যেকটি মৃত্যুর জোরালো প্রতিবাদ হয়েছে ভারতের কোণায় কোণায়। দেশের বাইরেও আলোড়ন কম হয়নি। এঁদের প্রাণ কেড়ে যুক্তিবাদী কর্মীদের মনোবল গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে মৌলবাদীরা। কিন্তু অন্য দিক থেকে দেখলে, মৌলবাদকে রুখতে যুক্তিবাদের এক দুর্দান্ত ভূমিকায় এভাবে উঠে আসতে হবে। উঠে আসে যুক্তিবাদী আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলার এখন সময়ের দাবি। আধুনিকতার অভিঘাতে বিপন্ন ধর্মের মরণকামড় হয়তো বা আরও কিছুকাল সমাজের উপর পড়বে, কিন্তু তা কখনই চিরস্থায়ী হতে পারে না। মানবসভ্যতার অগ্রগতির রৈখিক পথরেখায় এ এক সাময়িক ‘ফ্ল্যাকচ্যুয়েশন’ বা বিচলন মাত্র, আধুনিকতার চাকাকে কখনও পেছনে ফেরানো যায় না। তবে ঊর্ধ্বমুখী লেখচিত্রের এই উঁচুনিচু বাঁকগুলোকে আমরাই পারি দ্রুত সরলরেখায় এনে ফেলতে। সুবিচারের দাবিতে বিচারব্যবস্থাকে অবশ্যই প্রভাবিত করতে হবে। একই সঙ্গে, আমাদের ইতিকর্তব্য থেকেও আমরা যেন বিচ্যুত না হই।

ব্যক্তিজীবন বা সামাজিক জীবন সার্বিকভাবে সুস্থ ও সুন্দর করে গড়ে তোলার প্রয়াস জারি রাখতে প্রকৃতি ও সমাজের প্রতিটি ঘটনার পেছনে কার্যকারণ সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা খুব জরুরী। আর এইজন্য চাই প্রশ্ন করার আর প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার বৈজ্ঞানিক মেজাজ। ততটুকুই গ্রহণীয় যতটুকুর সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে, এই বৈজ্ঞানিক মেজাজ তৈরী করার কাজটা সুচারুভাবে করেছিলেন তিনি। মানুষের সাথে বন্ধুর মত মিশে, মানুষের জীবনসংগ্রামের সাথী হয়ে, মানুষকে বিজ্ঞান সচেতন করে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে সামিল করার প্রয়াস প্রতিটি বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের কাজ। আর এই কাজে ঔদ্ধত্য নয়, সাহসী এবং বিনয়ী হতে হবে। সর্বোপরি তৈরী করেছিলেন কুসংস্কার ও জাদুবিদ্যা বিরোধী আইনের সেই ঐতিহাসিক খসড়া যা সারা ভারতে যুক্তিবাদী মানুষের সংগ্রামের পাথেয়। যুগে যুগে কোনো যুক্তিশীল চিন্তাধারার মানুষদের কাজ কখনও সহজ হয়নি। ওনার কাছেও এই কাজ সহজ ছিল না। বহু বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বক্তৃতা বন্ধের চক্রান্ত, ম্যাগাজিন বিক্রি না করার ফতোয়া এমনকি প্রাণনাশের হুমকি নিয়েই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

সাম্প্রতিক কালে গোবিন্দ পানসার, নরেন্দ্র দাভোলকর, এম এম কালবুর্গি,  গৌরী লঙ্কেশের মত ব্যাক্তিত্বদের খুন করার উদ্দেশ্য এক। সবটাই হয়েছে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদীদের নিখুঁত পরিকল্পনায়। ওরা যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাধারাকে ভয় পায়। সেই একই কারণে অরুণ ফেরেইরা, সূধা ভরদ্বাজ, ভারভারা রাও, গৌতম নাভালখা ও ভেরনন গনজাল্ভেজরা আটক হন। পাশের রাষ্ট্রে, ঠিক একই উদ্দেশ্যে ধর্ম সন্ত্রাসীরা অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, আরেফিন দীপন, অনন্তবিজয় দাস, হুমায়ুন আজাদ, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়কে খুন করে। ধর্মান্ধে কিছু ধান্দাবাজ গডম্যানরা নিজ স্বার্থে তাদের ধর্ম বিপদে এমন গল্প বারংবার শুনিয়ে ভক্তদের মগজধোলাই করে উগ্র, হিংস্র বানায়। এরা কারোর যুক্তির ধার ধারেন না। এরা যা জানে সেটাই অভ্রান্ত, এমনটাই মনে করেন। এদের হাতে কখনো খুন হয়, অপদস্থ হয় এমনকি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় ব্লগার, ফেমিনিস্ট, এলজিবিটি এক্টিভিস্ট, মুক্তচিন্তকরা।


আমরা কখনই এরকম দেশ চাই না যেখানে অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, বিজ্ঞানমনস্ক পরিপন্থী মৌলবাদী কট্টরপন্থীদের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই ওরা গলা টিপে ধরবে।  যেরকম পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে মৌলবাদীরা মুক্তচিন্তকদের জড় সমেত উপড়ে ফেলার সংকল্প নিয়েছে। ভারতও কি সেই পথে হাঁটছে! মৌলবাদের উৎসগুলিকে ধ্বংস করতেই হবে। বিজ্ঞানমনস্কতা প্রচারের জন্য দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মৌলবাদী শক্তির হাতে খুন হওয়ার প্রতিবাদ হোক.... সেই সাথে মাঠে ঘাটে ছড়িয়ে থাকা বিজ্ঞান কর্মীদের যারা প্রতিনিয়ত  যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতাকে ছড়িয়ে দিতে গিয়ে প্রাণ দিচ্ছেন। [Scientific thinking is purely logical: the adjective ‘rational’ cannot be applied to it. Scientific temperament is a process of thinking, method of action, search of truth, way of life, spirit of a freeman. — Dr Narendra Dabholkar, The Case for Reason, Volume One] ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কলম ধরলেই পাশবিক হয়ে উঠেন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি । বেছে নেয় খুন করার পথ। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমালোচনা করা নাগরিকদের বৈধ অধিকার। মত প্রকাশের অধিকার যদি কোন ক্ষমতার দ্বারা বিপন্ন হয় তবে নিশ্চয় ভাববার বিষয়।

Thursday, August 10, 2023

নিষ্কর্ষ বার্তাবাহক '১৯-এর কবিতা ও গান'


ভাষাগত ও জাতিগত দিক দিয়ে যত রকমের ল্যাব ও ডিএনএ টেস্ট রয়েছে পৃথিবীর আর কোন জাতিকে হয়তো এতোটা প্রমাণপত্র দিতে লাগে না। যতটা বাংলা ভাষা ও বাঙালিকে বিশেষ করে উত্তর পূর্বাঞ্চল ও বরাক উপত্যকার বাঙালিকে দিতে হয়। আর এটার প্রচলন যে আজ শুরু হয়েছে এমন নয়। এর প্রমাণ স্বরূপ রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে অর্থাৎ ১৯৬১ সালের ১৯শে মে ১১ টি তরতাজা প্রাণ শহীদ হন শিলচরে, ১৯৭২ এর ১৭ই আগস্ট করিমগঞ্জে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু চক্রবর্তী),১৯৮৬র ২১ জুলাই করিমগঞ্জে শহীদ হন জগন্ময় ও যীশু, ১৯৯৬ এ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার রক্ষায় করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে শহীদ হন সুদেষ্ণা সিংহ ও সলিল সিংহ। সেই তখন থেকেই এখন অব্দি চলছে। হ্যাঁ হয়তো এখন শহীদ হচ্ছেন না ঠিক কিন্তু আগ্রাসনবাদী শক্তির করমর্দনে দেয়ালে পিঠ ঘষা খেতে খেতে কতটা ঘা হয়েছে এ বলার ইয়ত্তা রাখেনা।

ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় জীবনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আর এই আন্দোলনই অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনার ভিত্তি সুদৃঢ় করে। যার ফলস্বরূপ বাঙালি নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা ও স্বতন্ত্র অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে। বাঙালি জনগণ উপলব্ধি করতে পারে সংগ্রামের মাধ্যমেই তাদেরকে দাবি-দাওয়া আদায় করতে হবে এবং ভালোভাবে বাঁচার পথ খুঁজতে হবে। মায়ের ভাষা রক্ষার জন্য মেয়েরাই তো পেরেছিল রক্ষণশীলতার ব্যারিকেড ভেঙ্গে রাস্তায় নামতে। ভাষা আন্দোলনই তো পেরেছিল সাহিত্য-সংস্কৃতি-সমাজ গঠনে এক মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে। এটি একটি জাতির রাজনৈতিক ও সামাজিক ল্যান্ডস্কেপ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও, ১৯৯৯ সালের ২৬ শে নভেম্বর ইউনেস্কোর অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। বিশ্ববাসীর দরবারে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির যেভাবে আত্মমর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি ভাবমূর্তিও হয়েছে উজ্জ্বল।

'তবু উনিশে মে-র কাছে ফিরে যেতে হয়। নিষ্কর্ষ খুঁজতে হয় পুনর্নির্মাণের। ভাষা আন্দোলন চলমান এক প্রক্রিয়ার নাম: কোনো একটা বিশেষ তারিখ অন্য দিনগুলির তুলনায় উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে, এইমাত্র। ভাষা-সংগ্রামের বহুমুখী মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়ন করে বুঝি, বৃহত্তর গণসংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গ হল ভাষা আন্দোলন।' আজ উনিশে মে ভাষা আন্দোলন শুধু বরাক উপত্যকার মধ্যে সীমাবদ্ধ এমনটা কিন্তু নয়। এর পরিধি পুরো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই চিরসত্য আপ্তবাক্য সারা বিশ্বের বাঙালির স্পর্শ করেছে শ্রদ্ধেয় কবি দিলীপকান্তি লস্কর সম্পাদিত '১৯ এর কবিতা ও গান' (দ্বিতীয় সংস্করণ,বিশ্ব-সংকলন) স্বমহিমায়। সিকুয়েন্স এর প্রথম বইটি হলো '১৯-এর ভাষা শহিদেরা'। প্রকাশকাল ২০০২ সালের ১৯ মে। আর আবার দীর্ঘ একুশ বছর পর ২০২৩-র ১৯ মে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় সুবিশাল কলেবরে। সম্পাদক কবি দিলীপকান্তি লস্কর তাঁর এই বইয়ের প্রথম সংস্করণে ভূমিকায় লিখেছিলেন, যে কোন সংগ্রামের পেছনে থাকে এক একটি সাহিত্য-সংস্কৃতিক ভূমিকা। কখনো তা সংগ্রামকে পেছন থেকে ইন্ধন যোগায়, কখনো তা সংগ্রামীকে দেয় প্রেরণা। আবার কখনও কখনও সংগ্রামের সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রভাবে জন্ম দেয় কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-গীতিকারদের মনোজগতে এক অনন্য সৃজন কর্মশালা। তদুপরি সংগ্রামটি যেখানে ১৯শে মে, আপামার জনসাধারণের মধ্যে পরিব্যাপ্ত এক মহান গণজাগরণ, মাতৃস্তন্যস্বরূপ মাতৃভাষার অধিকার অর্জনের সংগ্রাম, মাতৃভাষার কারিগর কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-গীতিকারদের চেতনায়-অবচেতনায় ফেলবেই তার স্বাভাবিক অনুরণন। ফেলছেও। ১৯-কে নিয়ে সাহিত্য 'সৃষ্টি হয়নি' কথাটি প্রায়শই উচ্চারিত হতে শুনেছি, লালনমঞ্চ তা মিথ্যে প্রমাণ করেছে। সে গোটা বাংলা ভূবনের সাহিত্যকৃতি ঘেঁটে দেখতে চেয়েছে। কোথায় কোথায় উনিশ। প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি বলে বঙ্গ ও বাংলাদেশের কবির সংখ্যা তুলনায় কম, তবে অদ্যাবধি যে মাধুকরিটুকু হলো, তাও কি খুব কম !' দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা সম্পাদক কবি প্রথমেই সৌহার্দ্য সিরাজের কবিতা দিয়ে শুরু করেছেন যেখানে একটি লাইন লিখা — 'বৃষ্টির মেঘ/বরাকের অশ্রুত চিহ্নগুলো নিয়ে যাও দেখুক পৃথিবী'। কবি দিলীপকান্তি লস্কর ভূমিকায় লিখেছেন,'ভাষা শব্দটি মাতৃভাষার আবেগ ও মমতায় কখনও যেন উনিশের ভাবধারার কাছাকাছি এসে যায়। আবার ‘ভাষা’ থেকে মাতৃভাষা, ‘মাতৃভাষা’ থেকে ‘মাতৃভাষাসংগ্রাম'—এই আনুভূতিক পারম্পর্য আমাদের কাব্য-ভাবনায় সৃষ্টি করে একটি সরল রৈখিক যোগাযোগ। এক থেকে আরেককে পৃথক করা দুষ্কর। আর এই ভাবধারা একুশ-উনিশ ভেদে প্রায়ই এক বা অনন্য। ফলে আমাদের প্রাপ্তির ঘরও বহু সদৃশ কবিতার ফুলের মতো, নানা বর্ণের লাবণ্যে পূর্ণ হয়ে ওঠে। নদীর মতো বিভিন্ন অববাহিকা, উঁচুনিচু পাহাড়-টিলা তথা আঁকাবাঁকা বহু রৈখিক পথে ভালো-মন্দ বহু বিচিত্র বিষয়বস্তু নিয়ে এগোতে থাকে তার পথযাত্রা, কিন্তু গতি তার সুনির্দিষ্ট সাগরের দিকে। এক্ষেত্রে উনিশ, উনিশ-একুশ এক বা উভয়ের ভাষা-কাব্য-গান, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ভাব-বিশ্ব-সায়রে এক অনন্য সৃষ্টিময়তার সংযোজন। তাই অধিকাংশ কবি সজ্ঞানে উনিশের ধৃতি নিয়ে কবিতা লিখে থাকলেও তাঁরা কিন্তু শেষ অব্দি এই সাগর-সঙ্গমে এসে যুক্ত হয়ে যান বহু থেকে এক এবং এক থেকে বছর বিন্যাসে। এখন তাই বাংলাভাষার কবিদের কাছে নেই কোনো আগল, যা রাজনৈতিক প্রভুরা কাঁটাতার বা নদীর সীমানা দিয়ে বিভাগ করে দিয়েছেন কারো রান্না ঘরের কারো উঠোনের বা খেলার মাঠের ভিতর দিয়ে বা উনুনের মাঝ বরাবর। বর্তমান সংকলনে আমরা উনিশের বহু কবিতা বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন কবির কাছে পেয়েছি। বিভিন্ন ভাবনা-চিন্তার কবিতা, উনিশকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে তার স্বরূপ তথা মূল্যায়নের কবিতা, মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধার মূল্যবোধ থেকে উনিশের কবিতা এবং আরো অনেক বিষয়-বৈচিত্র্যে ভরপুর। ভাষা-সংগ্রামের ফলে কিছু শব্দ পেয়েছে তার নিজস্ব পৃথক এক তাৎপর্য ও অর্থময়তা। আত্মত্যাগের রক্ত কৃষ্ণচূড়াতেই যেন পেয়েছে তার প্রকৃতির প্রতিরূপ। এমন আরো কত কী।'

আমার মনে হয় বর্ধিত কলেবরে সংকলনটি সাজানোর একমাত্র কারণ সবাইকে এক সুতোয় বাঁধা। সংকলনটি মূলত  কয়েকটি পর্যায়ের বিন্যাস। উনিশে মে'র কবিতা (স্বদেশে), উনিশে মে'র কবিতা (বাংলাদেশে), উনিশে মে’র কবিতা (দূর-বিদেশে), উনিশে মে'র কবিতা (বাংলা ভাষায় / ভাষান্তরে)। শেষের পর্যায়ে রয়েছে উনিশে মে'র গান বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যাগ্রহী 'জজ্ সাহেবা', শ্যামাপদ ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে আলাউদ্দিন খাঁ, গণেশ দে, মঞ্জুশ্রী দাস,কালিকা প্রসাদ, খালেক চৌধুরী সহ এই সময়ের অনেক কবির রচনা সংকলিত হয়েছে। আর উল্লেখযোগ্য হলো এই সংস্করণে  বেশ কয়েকজন কবির লেখা গান ভিডিও লিংক সহ দেয়া রয়েছে। রয়েছে বেশ কয়েকটি গানের স্বরলিপিও। এরমধ্যে আমার খুব প্রিয় যা উল্লেখ না করে আর পারলাম না শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর ‘বঙ্গভূমি মা’ গানটি। এর ভিডিও লিংক — http:// youtube.be/DRFs17ecj71।

সম্পাদক কবি দিলীপকান্তি লস্কর তার অসাধারণ বুনন শৈলীতে নির্মাণ করেছেন '১৯-এর কবিতা ও গান'র সূচিপত্র। ১৯ মে-র কবিতায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ থেকে শুরু করে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, ব্রজেন্দ্র কুমার সিংহ, মলয় রায়চৌধুরী, কামালউদ্দিন আহমেদ, তপোধীর ভট্টাচার্য, সুবোধ সরকার, জয় গোস্বামী, বিশ্বজিৎ চৌধুরী প্রমুখের কবিতা রয়েছে। বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, হুমায়ূন আজাদ, রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন, জিললুর রহমান, বেলাল চৌধুরি, হেনরি স্বপন প্রমুখ ছাড়াও বহু কবির কবিতা রয়েছে।  দূর বিদেশের (কানাডা,জার্মানি, নিউইয়র্ক, ফ্রান্স সহ আরও) কবিদের মধ্যে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, অরুণিমা নাসরিন, দীপঙ্কর দাশগুপ্ত প্রমুখ। তৎসঙ্গে যে সমস্ত ভিন্নভাষী কবির কবিতা বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে শুরুতেই রয়েছেন অসমের খ্যাতনানা কবি জ্যোতিপ্ৰসাদ আগরওয়ালর কবিতা। বড়ো কবি অঞ্জলি বসুমাতারি, উর্খাও গৌড়া ব্রহ্মের কবিতা। এরপর রয়েছে বাগানি ভাষার অভিজিৎ চক্রবর্তী, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষী কবিতা লিখেছেন ধনঞ্জয় রাজকুমার সহ প্রমুখ কবির কবিতা।

'১৯-এর কবিতা ও গান ' তাঁর সম্ভাব্য সকল দোষত্রুটি পেছনে ফেলে সুস্থ জনমত গঠনে আরও একধাপ এগিয়ে চলছে। সংস্করণের শুরুর দিক থেকে যদি দেখা হয়, সংকলনটির সূচনা হয় মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'বঙ্গভাষা' কবিতাটি দিয়ে। এরপর ধাপে ধাপে দেখা যায় শুধু নিদৃষ্ঠ 'উনিশ মে' নিয়ে কবিতার পাশাপাশি বিভিন্ন কবির কবিতায় তাঁর অনুভূতিতে প্রকাশ পায় ভাষা আন্দোলন, বাঙালি আগ্রাসন তথা কোণঠাসার গল্প। যেখানে মাইকেল তাঁর বঙ্গভাষা কবিতায় লিখেছেন — হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন; —তা সবে, (অবোধ আমি) অবহেলা করি।‌ জয় গোস্বামী লিখেছেন — 'আমি আসছি, ভাত বেড়ে রাখো'—/মাকে বলে ছুটে গিয়েছিল/সপ্তদশী কমলা।ফেরেনি।/গুলি সোজা লেগেছিল চোখে। শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর  'উদ্বাস্তুর ডায়েরি'তে লিখেছেন — যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সে-ই কেড়েছে ভয়,/ আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়।
কামাল উদ্দিন আহমেদ লিখেছেন — বাড়ন্ত সে সবুজের মেলায়/ আমার যৌবন দোল খায়/ কমলা শচীন সুকমল বীরেন্দ্র/কানাই হিতেশ সুনীল কুমুদ চন্ডী/তরণী সত্যেন এগারোটি তাজাপ্রাণ মরণজয়ী গান গায়।

গুণের বিচারে কবিতার মান নিয়ে কথা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। উনিশ কিবা একুশ - ভাষা আন্দোলন আমাদের আবেগকে নাড়া দেয়। তাই প্রতিটি কবিতার মানও গুণগত সম্পন্ন। এতোবড় কলেবরে বিশ্ব-সংকলন ঈষৎ ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। কিন্তু এদিকে না গিয়ে সম্পাদকের অসাধারণ কাজ তথা '১৯-এর কবিতা ও গান' দ্বিতীয় সংস্করণে সম্পাদকের প্রচ্ছদ রুচিও অতুলনীয়। যেখানে কেন্দ্রে স্বপন পালের ভাষা-শহিদ স্মারক ও নকশা বিন্যাসে রয়েছেন মাসুদ করিম। এককথায় প্রসারিত দুহাত বাড়িয়ে একত্রিত করেছে এই বিশ্ব-সংকলন। নিশ্চয়ই এই সংকলন বিশ্বকবিতার উইকিপিডিয়ায় স্থানলাভ করবে। চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বে উনিশের বার্তাবাহক হিসেবে।

'১৯-এর কবিতা ও গান' — সম্পাদক দিলীপকান্তি লস্কর
প্রগতি সরণি, বনমালী রোড, করিমগঞ্জ, আসাম। মূল্য - ৪৫০/-

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...