Wednesday, April 12, 2023

ভগত সিং ও নতুন ভারত গড়ার লক্ষ্য


( ১ )
"কেন আমি নাস্তিক" প্রবন্ধে ভগৎ সিং লিখেছেন, "যে মানুষ প্রগতির পক্ষে তাকে পুরোনো বিশ্বাসের প্রত্যেকটি বিষয়কেই চ্যালেঞ্জ করতে হবে। যথেষ্ট যুক্তিতর্ক ও বিচার-বিবেচনার পর যদি কেউ কোনো তত্ত্ব বা দর্শনে বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে তার বিশ্বাসকে স্বাগত জানাতে হয়। তার চিন্তাভাবনা ভুল বা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। কিন্তু তা শোধরানোর সুযোগ আছে, কারণ সে পরিচালিত হয় বিচারবুদ্ধির দ্বারা, অন্ধবিশ্বাসের দ্বারা নয়। বিশ্বাস ও অন্ধবিশ্বাস বিপজ্জনক, তা মস্তিষ্ককে অকোজো করে দেয়, মানুষকে প্রতিক্রিয়াশীল বানিয়ে তোলে।" উক্ত বইতে লেখা আছে- "যে দেশের যুবসমাজ দেব-দেবী, ধর্মের পিছনে দৌড়াতে থাকে, তাদের জন্য আমি কাপুরুষ শব্দ ব্যবহার করা উচিৎ বলে মনে করি। এই রকম যুবসমাজের হাতে দেশের ভার গেলে সেখানে কিছুই ভালো হওয়া সম্ভব নয়।"

ভগৎ সিং যে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন সেখানে ছিল না কোন শোষণ। এক শ্রেণীহীন সমাজ। সেটা শুধুমাত্র ব্রিটিশদের অধীনতা থেকে মুক্তি নয়। ভগৎ সিং এর উক্তি - "আমি একজন বাস্তববাদী, শাণিত যুক্তি-বিজ্ঞানই আমার হাতিয়ার, তাই দিয়েই আমি আমার ভিতরের প্রবৃত্তিকে জয় করতে চাই। এই ব্যাপারে যে আমি সবসময়ই সফল হয়েছি তা নয়, কিন্তু আমাদের উচিত বারে বারে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, কেননা সাফল্য নির্ভর করে ঘটনাচক্র আর বাস্তব পরিস্থিতির উপরে।"

( ২ )

ইনকিলাব জিন্দাবাদ একটি অসম্পূর্ণ স্লোগান। ভগৎ সিং সম্পূর্ণভাবে যে স্লোগান ধরেছিলেন, বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক, সাম্রাজ্যবাদের পতন হোক। সাম্রাজ্যবাদ মানে সেই এলাকা দখল করে অন্যের পরিশ্রম ও সম্পদ দখল করে নিজের সাম্রাজ্য বানানো। পূর্বে এই কাজ করত এক দেশ অন্য দেশের উপর। আজ অভ্যন্তরীণ সাম্রাজ্যবাদ অবিরাম অব্যাহত রয়েছে। তাঁর বুলডজারিয় উচ্ছেদ অভিযান আগ্রাসন চালাচ্ছে জোর কদমে। আদানির কালো ব্যবসা নিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বেশ চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেছে। মরিশাস-ভিত্তিক শেল কোম্পানি ইলোরা ক্যাপিটাল আদানি প্রতিরক্ষা সংস্থার সহ-মালিক। ইলোরা একই কোম্পানি যার নাম হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ রিপোর্টে বিশিষ্টভাবে স্থান পায়। ইলোরা আদানি প্রতিরক্ষা সংস্থা আলফা ডিজাইন টেকনোলজি প্রাইভেট লিমিটেড (ADTPL) এর সহ-মালিক এবং ৯000 কোটির বিনিয়োগ রয়েছে৷

 হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ প্রকাশ করেছে যে ইলোরা নামে একটি কোম্পানি আদানি গ্রুপে 24,766 কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে যা তার মোট মূলধনের 99%। এটা স্পষ্ট যে এটি একটি জাল কোম্পানি যার মাধ্যমে আদানি গ্রুপে কালো টাকা লেনদেন করা হয়।  আদানি ডিফেন্স ISRO এবং DRDO-এর সাথে কাজ করে।  মানে ভারতের নিরাপত্তা খাত কালো টাকা মাফিয়ার হাতে চলে গেছে। গ্রামগুলো শহরের সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে; শহর কিছুই বাড়ায় না কিন্তু সবচেয়ে বেশি খায়। জল, বিদ্যুৎ, কয়লা, সোনা, রূপা, লোহা, টিন, কয়লা, শস্য, দুধ, মাছ,মাংস, ফলমূল, শাকসবজি, ডিম গ্রামে রয়েছে। সে শহরে নিজের জন্য কাগজের নোট ছাপিয়েছে, এটাই তার সম্পদ। ক্রয় করছে মানুষ থেকে শুরু করে জমি।

কিন্তু প্রকৃত সম্পদ তো রয়েছে গ্রামেই। যখন গ্রাম শহর থেকে জাল সম্পদের জন্য আসল সম্পদ বিনিময় করতে অস্বীকার করে ঠিক তখনই শহর তার বুলডজার কে গ্রামে পাঠায়। গ্রাম গুড়িয়ে, জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, গ্রামবাসীদের মারধর করা হয়, জেলে ঢোকানো হয়। পুলিশ পোস্ট বসানো হয়, শহরের শর্তে তাদের মালামাল শহুরে প্রাণীদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়। আজ দুর্বল অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন করা হচ্ছে এবং তাদের পাঠানো হয় জনগণের সম্পদ ও শ্রম দখলের জন্য। এটা অভ্যন্তরীণ সাম্রাজ্যবাদ যেখানে ভগৎ সিং বলেছিলেন, এটা একটা যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধ ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার পরেও থামবে না। এই যুদ্ধে আমাদের নারীরা ধর্ষিত হচ্ছে, শিশুদের হাত কেটে দেয়া হয়, জীবন্ত পুড়িয়ে দেয়, পুরুষরা জোরপূর্বক ঘর থেকে টেনে হেঁচড়ে গুলিবিদ্ধ হয়। আমার মত একজন স্বার্থপর ব্যক্তি জীবিত ভগত সিং এর সমর্থক হতে পারি না, শুধুমাত্র মৃত ভগৎ সিংকে পূজা করার ভান করতে পারি। আর যেটুকু ভগৎ সিংয়ের প্রশংসা করি না কেন কিন্তু এর মধ্যে যদি আদানি মার্কা গন্ধ থাকে তবে নেহাৎ ভন্ডামী ছাড়া আর কি বলা যায়!

( ৩ )

যদি প্রার্থনা, উপবাস, আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মকর্ম থেকে কোনো উপকার পাওয়া যেতো তবে পুঁজিপতিরা তাও দখল করে নিত। এবং সাধারণ জনগণকে তা করার কোন পারমিশন ও দিতো না। কিন্তু বড়ই করুন সত্য যে উপরওয়ালার প্রার্থনা কোন সাহায্যে আসে না। সেজন্য পুঁজিপতিরা গরীব মানুষের জন্য এটা ছেড়ে দিয়েছে এবং তাঁরা এটাও জানে যে নিম্নবিত্ত এতে আটকে থাকবে। অথচ দেখুন একটা মজার বিষয় হলো পুঁজিপতিরা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করে নিচ্ছে, ব্যাংকে রাখা টাকা লুট করছে, আমরা বেরোজগার হচ্ছি। আমাদের ব্যবসা দখল করে সম্পত্তি হাতিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারে ক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখতে পুঁজিপতিরা শাসকশ্রেণীর সঙ্গে মিলে আমাদের পরস্পরের লড়াইয়ে লিপ্ত করছে। ধর্মের ভিত্তিতে একে অপরকে ঘৃণা করার ফাঁদে ফেলছে।অন্য ধর্মের বা অন্য বর্ণের ছেলেমেয়েরা একে অপরকে জীবন সঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়াতে তাদের হত্যা করা হচ্ছে। আমাদের কি চিন্তা করার সময় আছে, আমাদের অজ্ঞতা আমাদের সন্তানদের জন্য কি ধরনের জগৎ তৈরি করেছে!

রাজনীতি সাধারণত দুই ধরনের হতে পারে,প্রথম বাস্তব রাজনীতি মানে এমন রাজনীতি যা জনগণের সমস্যার সমাধান করে। যেমন কর্মসংস্থান, শিক্ষা, শোষণ থেকে শ্রমিকের মুক্তি, কৃষকের উন্নতি, নারীর সমতা, জাতপাত, সাম্প্রদায়িকতা থেকে সমাজকে মুক্ত করার রাজনীতি ইত্যাদি। আরেকটা রাজনীতি হচ্ছে বোকা বানানোর রাজনীতি, সেই রাজনীতিতে এক ধর্মের সম্মানের নামে রাজনীতি।কিছু বর্ণের আধিপত্যকে ভিত্তি করে, ভুয়া জাতীয়তাবাদের স্লোগান তোলা হয়, কাল্পনিক শত্রু উদ্ভাবন করা হয়, অহেতুক বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, সেনাবাহিনীর নামে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়, কিছু সম্প্রদায়কে শত্রু ঘোষণা করা হয়। প্রথম রাজনীতি সমাজের উন্নতির দিকে নিয়ে যায়, জীবন সুখী হয়, কিন্তু দ্বিতীয় ধরনের রাজনীতির ফলে সমাজে ভয়, বিদ্বেষ ও সহিংসতা বাড়তে থাকে। দ্বিতীয় প্রকারের রাজনীতিতে জনগণের জীবনসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ হয় না, শুধু শব্দগুচ্ছ থাকে। দ্বিতীয় প্রকারের রাজনীতির একটি লক্ষণ হলো, ধীরে ধীরে মৌলবাদ বাড়তে থাকে, নতুন গুন্ডারা পুরনো গুন্ডাদের উদারপন্থী বলে নিজেদের হাতে ক্ষমতা দখল করে এবং ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ নির্বোধ ও নিষ্ঠুর নেতা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড়,এর পর এই রাজনীতির সুনিশ্চিত অবসান।কারণ হিংসা ধ্বংসাত্মক, এই আগুন সবাইকে পুড়িয়ে দেয়,ধরুন, ভারতে যদি সংঘের স্বেচ্ছাচারিতা চলতে দেওয়া হয়, তাহলে তারা সর্বোচ্চ কী করবে? তারা কি একসাথে মুসলমান, খ্রিস্টান, কমিউনিস্ট, ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবে? সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় তারা ভারতে আট থেকে দশ কোটি মানুষকে হত্যা করবে,কিন্তু তাতে না মুসলিম, না খ্রিস্টান, না কমিউনিস্ট মতাদর্শ পৃথিবী থেকে শেষ হবে না, নতুন বুদ্ধিজীবীদের জন্মও বন্ধ হবে না। কিন্তু এর পর হিন্দুত্বের রাজনীতি নিশ্চিতভাবেই চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। তারপরে ভারত অবশ্যই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সঠিকভাবে তার কাজ চালিয়ে যাবে।

আসলে হিটলারও সেটাই করেছিলেন,তিনি নিজেকে পুরাতন ও তাঁর জাতিকে বিশ্বের সেরা জাতি হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। ইহুদিদেরকে তাঁর দেশের সমস্যা বলে ঘোষণা করেন। এক কোটি বিশ লক্ষ নারী, শিশু, যুবক ও বৃদ্ধকে তাদের বাড়িঘর থেকে বের করে বিষাক্ত গ্যাস ছেড়ে মেরেছিলেন। তিনি শুধু ইহুদিদের হত্যা করেননি, কমিউনিস্ট, বুদ্ধিজীবী, উদারপন্থী, ভিন্নমতাবলম্বী, সমকামী, মুক্তিকামী মানুষের হত্যা করেছিলেন। কিন্তু হিটলার শেষ পর্যন্ত নিজেকে গুলি করেছিলেন।জার্মানি দুই খন্ডে বিভক্ত হয়। আজও দেশের মানুষ হিটলারের নাম নিতে দ্বিধা করে।এবং যদি নাম নেওয়া হয়, তারা লজ্জা এবং ঘৃণার সাথে নিয়ে থাকে। ভারতেও যদি এভাবে সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদের ভুয়ো রাজনীতি গড়ে ওঠে, তবে এটা তার শেষের দিকে যাচ্ছে এটা নিশ্চিত, এই ধরনের রাজনীতি কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। চিতায় জ্বলে উঠবে নতুন ভারত। এটা নিশ্চিত যে রাজনৈতিকভাবে একটা জাতি থেকে যাবে নাকি টুকরো টুকরো হয়ে যাবে, এটা বলা খুব কঠিন।

ভগত সিং তার ফাঁসির আগে পাঞ্জাবের গভর্নরকে একটি চিঠি লিখেছিলেন যুদ্ধ চলছে এবং এই যুদ্ধ চলবে। এই যুদ্ধ ভারতের জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের সম্পদ ও পরিশ্রম কেড়ে নেওয়ার জন্য। ব্রিটিশ চলে গেলেও এই যুদ্ধ চলবে ,দরিদ্র ও মেহনতি জনগণ এতে নির্ধারক বিজয় না পাওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলবে। তাহলে এটা নিঃসন্দেহে বলতে পারি ভগৎ সিং-এর এই বক্তব্যটাও সত্য প্রমাণিত হচ্ছে !!

১২-০৪-২৩

Sunday, April 2, 2023

ডার্ক মুভিজ : মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিক এখন কোন পথে !


বিগত কিছুদিন থেকে মানুষের রুচিবোধের বিরাট পরিবর্তন ঘটছে। যে কোন ওটিটি প্লাটফর্মের ট্রেন্ডিং এ থাকা কোন ওয়েব সিরিজ দেখলেই তা অনুমান করা অতি সহজেই যায়। বর্তমান সময়ে সিনেমা সিরিয়ালের পাশাপাশি গ্ল্যামার ইন্ডাস্ট্রিতে এক নতুন সংযোজন হয়েছে ওয়েব সিরিজের। আসলে প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে চলতে গিয়ে এখন প্রত্যেকেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়েব সিরিজ দেখতে পছন্দ করেন। বাংলা, হিন্দি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার বেশ কিছু ওয়েব সিরিজ টেক্কা দেয় বড় বাজেটের সিনেমাকেও। আসলে করোনা পরবর্তী সময় থেকে ডিজিটাল মিডিয়া কদর বুঝে গিয়েছে সাধারণ মানুষ। আর সেই সাথে পাল্লা দিয়ে চলার জন্য জন্ম নিয়েছে একাধিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মের। এই ওয়েব সিরিজ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে - হয়ত রয়েছে রগরগে যৌনতা, নতুবা রয়েছে ডার্ক অ্যাকশন সিকুয়েন্স।

কথা হল এখন যেকোনো ওটিটি প্লেটফরমে অপরাধমূলক কাহিনীতে আধারিত সিনেমা বা ডার্ক মুভিজ এর বিরাট কদর। সেই সঙ্গে সমান তালে আছে ওয়েব সিরিজও। এটা খুবই দুশ্চিন্তার বিষয় যে ওয়েব সিরিজ সমূহে যৌনতা, জঘন্য হত্যা, ধর্ষণ, হিংসাত্মক কাহিনীর মূলে সিনেমা প্রদর্শিত হয়। এই জঘন্যতম অপরাধ প্রচলিত সমাজে বর্তমান তা থেকে দর্শকরা কি শিক্ষা পাবে, এটাই এখন প্রশ্ন ? এই ধরনের বহু সিরিজ বা সিনেমা আমরা অনলাইনের মাধ্যমে দেখতে পাই যেখানে আসলেই শিল্পের নামে বিক্রি হচ্ছে সম্ভাব্য অপরাধী বা অপরাধপ্রবণ মানুষের অপরাধ সংঘটিত করার টিপস্। আজ আমাদের চারপাশে সংঘটিত হয় এমন জঘন্য থেকে জঘন্যতম অপরাধসমূহের তথা সভ্য মানব সমাজের গৌরব ভূলুণ্ঠিত করা অপরাধজনিত ঘটনাসমূহের কাহিনী বানিয়ে হুবহু উপস্থাপন করে এবং তাকেই সিনেমা, ওয়েব সিরিজের নামে বিক্ৰী করে ইতিমধ্যেই একাংশ চলচ্চিত্র নির্মাতাই বেশ ধন অর্জনে সফলতা পেয়েছেন। এক কথায় আজকের অপরাধীরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত করার জন্য সেইসব ছবি বা ওয়েব সিরিজকেই হাতিয়ার বানিয়ে ফিরছে।

ইতিমধ্যে এই ধরনের বহু সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ ভালো ব্যবসা করছে যেখানে দেখানো হয়েছে নৃশংস হত্যায় কিভাবে একজন অপরাধী তার কার্যসম্পাদন করতে পারে। এই ধরনের অপরাধ বা অপরাধীকে মহিমান্বিত করার জন্য ব্যবসার স্বার্থে একজন অভিনেতা এই কাজটিও খুব সুনিপুণভাবে করছেন। আজ থেকেও প্রায় একটা দশক আগে মানুষের বিনোদনের উপাদান খুব সরল ছিল। ত্রিকোন প্রেম, শোষণকারী জমিদার বনাম নিপীড়িত মানুষের মাঝখান থেকে উঠে আসা অ্যাংরি ইয়াং ম্যান অথবা ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ, মধ্যবিত্তীয় পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের ঘর-সংসারের কাহিনী। এর মধ্যেই বিচরণ ছিল বলিউড সিনেমা। তারপর হঠাৎ একদিন শুরু হল এই ডাটা যুগের। হাতে হাতে ফোরজি নেটওয়ার্ক সমৃদ্ধ মোবাইল ফোন। সম্ভবতঃ ২০১৬ সনে আমরা বিশেষ করে আসামে ফোরজি সেবা চালু হয়। সেটা যে নেটওয়ার্কই হোক, ফোরজি সেবা বিস্তার হওয়ার সাথেসাথেই আমাদের সমাজ রুচিশীল সংস্কৃতি থেকে অনেকটা সরে যেতে থাকে। মানুষের সমস্ত ধ্যান ধারণা চোখের সম্মুখে মোবাইলের স্ক্রিনের উপর আবদ্ধ হয়ে আটকে থাকে। 

২০২১-২২ সালে প্রকাশিত Nielsen Report অনুসারে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক গড় হিসাবে স্ক্রিন টাইম অর্থাৎ মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করার সময় হলো প্রায় ১৫ ঘন্টা। ২০১৯ এ এর সময় ছিল ১০ ঘন্টা। নিশ্চয়ই আমাদের ক্ষেত্রে বিচার করা হয় তবে এই সময় আরও অধিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যেখানে প্রতিদিন ফেসবুকের মত যে কোন একটা অর্থহীন বিষয়ে 'ভাইরাল' হয়ে থাকে অথবা ঘরের শৌচাগারের ভিডিও আপলোড করে ইউটিউবে মিলিয়নের হিসাবে ভিউয়ার্স থাকে সেখানে তো নিশ্চয়ই অন্যান্য রাজ্য দেশ স্থানের তুলনায় স্ক্রিন টাইমিং বেশি হবে। যাইহোক ফোরজি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ডাটা যুগেই আমাদের প্রত্যাবর্তন তা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পাওয়াটা স্বাভাবিক। মানুষের হাতে হাতে প্রত্যহ দেড় জিবি ডাটা কোথায় খরচ হবে ঠিক সেই সময় ইউটিউবাররা বেশ পরিকল্পিতভাবে এর মুনাফা লাভ করছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, যদিও রুচিবোধের অবক্ষয় হচ্ছে তারপরও কিছু সংখ্যক পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থাকে পুঁজি করে  মেহনতি মানুষের টাকা ডাটায় কনভার্ট করে শোষণ করছে।

আসলে এটা একটা মাইন্ড গেম। বেশ ভালো করে বুঝতে পেরেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতারা যে কিভাবে কম পুঁজিতে মোটা অংকের টাকা নিজের কাছে চলে আসে সেই জন্য হাতিয়ার হিসেবে ওয়েব সিরিজ যে ডার্ক মুভিজ এর বিপুলতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অবশ্য তথাকথিত ডাটা যুগের পূর্বেও অপরাধ জগত, রাজনীতির রুক্ষ বাস্তব যতদূর সম্ভব মৌলিক রূপে উপস্থাপনের চেষ্টা কিছু সিনেমায় দেখা গিয়েছিল। যেগুলো দেশের বিশেষ করে হিন্দি প্রধান সমাজে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করা হয়।  এক্ষেত্র অগ্রগণ্য ছিল  'গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর' শীর্ষক চলচ্চিত্র সিরিজটি। যেখানে অপরাধ ও রাজনীতির নেক্সাসটা বেশ সাহসিকতার সাথে প্রদর্শিত করা হয়। অপরাধজনিত সিনেমা হিসেবে ভারতীয় দর্শক এক নতুন স্বাদে তা গ্রহণ করে, সমাদৃত যেভাবে হয়েছিল সমালোচিত হয়েছিল বেশ। তবে হ্যাঁ এই সিনেমার মাধ্যমে নওয়াজ উদ্দিন সিদ্দিকী, পঙ্কজ ত্রিপাঠী, রাজকুমার রাও এর মত প্রতিভাবান অভিনেতাদের মাধ্যমে বলিউডের নেপটিজমগ্রস্থ ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন ঘটে। ভারতীয় সিনেমা জগতে এক নতুনত্ব প্রদান করার যোগ্য দাবিদার হিসেবে কৃতিত্ব মেনে নিলেও সমালোচকরা বলেন যে এই সিনেমার পূর্বে ভারতীয় চলচ্চিত্রে অপরাধ জনিত দৃশ্য এত খোলাখুলি ভাবে প্রকাশিত হয়নি আর যদিও একটু আধটু হয়েও থাকে তবে দর্শকদের এত আকৃষ্ট করতে পারে নাই। তবে যাই হোক এটা ছিল ডাটা যুগের পূর্ব ধারণা। কিন্তু এর পরবর্তী দু-তিন বছরের মধ্যেই ফোরজি নেটওয়ার্কে মাধ্যমে চলে আসে আমুল পরিবর্তন। সঙ্গে সঙ্গে উন্মুক্ত হয় বলিউড, হলিউড, ওয়েব সিরিজ, আর ডার্ক মুভিজের মুক্ত মঞ্চ। এই যুগে অপরাধের নির্মোহ অথচ কলাত্মক দিক উপস্থাপন না করে, সমাজ-রাজনৈতিক দিকে প্রভাবিত না করে এই ওয়েব সিরিজ সমূহে কেবল নৃশংস-বীভৎস্য-হত্যা-হিংসা উপস্থাপন করে ক্ষান্ত হয়নি সেখানে দেখানো হয় কীভাবে একটা মৃতদেহকে কতটা ক্ষতবিক্ষত করলে ঘাতকের তৃপ্তি আসে, দেখানো হচ্ছে আইনের চোখে কিভাবে ফাঁকি দিয়ে অবাধে বিভৎস অপরাধমূলক ঘটনা সংঘটিত করা যায়। মূল কথা ডার্ক মুভিজগুলো অপরাধের কৌশল শিখাবার পাশাপাশি একথা শেখাবার বারংবার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যে অপরাধ কোন বড় কথা নয়, জাস্টিফিকেশন দিতে পারলেই অপরাধ ন্যায্য!

সংবেদনশীল মানুষ মাত্রই এটা অনুভব করতে পারবেন যে আমাদের চারপাশ কতটা বিষাক্ত হচ্ছে ধীরে ধীরে। কিভাবে মানুষের জন্য ভালো খবরের অভাব ঘটছে। পৃথিবী জটিল থেকে জটিলতার হয়ে পড়ছে। এই সময় মানুষের সুস্থ চিন্তা করতে সৃষ্টিশীল কাজের খুব প্রয়োজন। একজন শিল্পী আমাদের অনুভব করাতে পারেন চার পাশের সত্যাসত্য ঘটনার সাথে, আগ্রাসিত বিশ্বায়নের সাথে, বলতে পারেন রুটি কাপড় ও ঘরের সমস্যা কথা, তরুণ তরুণীর জীবন সংগ্রামের কথা — এগুলিই তো একজন শিল্পী ও শিল্পের অমূল্য সম্ভার। অন্যথায় সমাজ হয়ে পড়বে অসুস্থ। নিয়ন্ত্রণহীন সমাজ জীবন - ভিডিও বা মোবাইল গেমস, শর্টস, রিলস্, এমনকি এই ধরনের ওটিটি প্লেটফর্ম র ডার্ক মুভিজ ইত্যাদি মানুষকে করে তোলে অপরাধী। এই গেমস ভিডিও বা ওয়েব সিরিজ মনস্তাত্ত্বিক দিকের কূপ প্রভাব ফেলে। সেই জন্য অপরাধ এবং বিনোদন দুটিকে দুই জায়গায় রেখে সরকার তথা সেন্সর বোর্ডকে যাচাই করতে হবে সমাজের কোনটি ফলপ্রসূ।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...