Tuesday, September 24, 2019

একজন দৃশ্যমান ইউম‍্যানিষ্ট ‘ঈশ্বর'

           (১)
“হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি এই পৃথিবীর পথে” – আরও হাজার বছর হয়তো লাগবে সেই পথ পেরিয়ে এক নতুন ভোরে পৌঁছাতে! এ এমন এক দেশ; যেখানে অবিজ্ঞান, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় উন্মাদনা, দাঙ্গার সহবাস; সেই কোন যুগ-যুগান্ত ধরে গেঁড়ে বসে আছে। তিমিরবরণ অজ্ঞতার কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে আছে সভ্যতার আলোময় সকালগুলো, রাত – সেতো নিকষ কালো। দীর্ঘদিন ধরেই এই দেশে জাতপাতের প্রভাব রয়েছে। একবিংশ শতকে এসেও যা শেষ হয়নি। আমরা এমন একটা দেশ চাইনা, যেখানে মানুষের ঘৃণাই প্রাধান্য পায়, একজন মানুষকে অন‍্য কেউ বা কোন গোষ্ঠী আক্রমণ করছে অনিঃসীম এক অজগরের ক্ষিদের মতো। ভবিষ্যতকে অন্ধকারে ছেয়ে ফেলতে উদ‍্যত অরাজক পরিস্থিতি এখন সারা দেশ জুড়ে।
ভালো নেই, আমাদের দেশ ভালো নেই, আমাদের পরিবেশ ভালো নেই, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ একেবারেই ভালো নেই। কথাগুলো কমবেশি সবাই অনুধাবন করছেন বলেই মনে হয়, যে যার নিজের মতো করে এই প্রাণান্তকর অবস্থা থেকে মুক্তির জন্যও নানান রাস্তা হাতড়ে চলেছেন, কিন্তু সামনে অনিশ্চয়তার নিকষ অন্ধকার আমাদের সত্তাকে গিলতে চাইছে বলেই প্রতিভাত হচ্ছে। সমাজ থেকে যুক্তি, বুদ্ধি, বৈজ্ঞানিক ভাবনা, সুচেতনার বিকাশ প্রভৃতি বিষয়গুলো হারিয়ে যেতে বসেছে, বা বলা ভালো, হারিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের এক নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত। অতীতে মানুষের সমস্ত দুঃখ-দুর্দশার জন্য বৃটিশ শাসনকে দায়ী করা হতো, যে দায়িত্ব বৃটিশরা অবশ্যই এড়িয়ে যেতে পারেনা; কিন্তু তথাকথিত ক্ষমতা হস্তান্তরের ৭২ বছর পরেও কেন দেশের মানুষের জীবনের এমন বেহাল দশায়? এর উত্তর কী আমরা খুঁজেছি?
শিক্ষায় এখন জ্ঞানের বিষয় আর নেই, তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন দলের দলীয় আদর্শের শিক্ষা। পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা জীবনকে তুচ্ছ করে আত্মবলিদান করেছিলেন শুধুমাত্র প্রতিটি নাগরিকের প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলি যাতে পূরণ হয় সেই লক্ষ্যে, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্য ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা যাতে পূরণ হয় সেই লক্ষ্যে। তাঁরা চেয়েছিলেন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সেসব চাহিদা আর আত্মবলিদান যে সার্বিকভাবে সাফল্যলাভ করেনি তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। হিটলার-র সুযোগ্য উত্তরসূরী কট্টর ফ্যাসিবাদীদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির মুখোশগুলো একে একে খুলতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের উপর নানা বিপর্যয় চাপিয়ে দেওয়ার পর উন্নয়নের কথা ফলাও করে প্রচার করছে। দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা, সম্প্রীতিকে বিপন্ন করে সংখ্যালঘু ও দলিত সমাজকে আতঙ্কের গহ্বরে তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সংখ্যালঘুদের মধ্যে উপযুক্ত মেধা থাকা সত্বেও, তারা তা বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্রমশঃ অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে। অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অপশিক্ষিত শাসককূল ক্ষমতার শীর্ষে বসার সুযোগের চূড়ান্ত অপব্যবহার করে সাধারণ নাগরিকদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। এই অজাচারী শাসকদের কিছু অপোগন্ড মাথামোটা ভক্ত তাতে ইন্ধন যুগিয়ে নিজেদেরই যে সর্বনাশকে ডেকে আনছে, তা এই মূর্খের দল বুঝতেও পারছে না। মৌলবাদী শক্তির সবচেয়ে বড় শত্রু শিক্ষিত, মেধাবী, বুদ্ধিমান, যুক্তিবাদী, প্রতিবাদী মানুষের ব্রেন বা মগজ; যারা এই গণশত্রু সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ জানায়, রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে প্রশ্নবাণ ছুঁড়ে মারে, তাদেরই নির্মমভাবে হত্যা করে চলে এরা।
              (২)
আজ রাষ্ট্রীয় শাসন কী সমাজ জীবন স্বাভাবিক বা স্বস্তিতে নেই। নিরাপদে শ্বাস নেওয়া কঠিন, বেঁচে থাকা দুঃসাধ্য। হয়তো এই পরিস্থিতি গোটা পৃথিবী জুড়েই। সনাতনী ধ্যান-ধারণা, ধর্মীয় কুসংস্কার ও গোঁড়ামি, মানববিমুখ রীতিপ্রথার ঘন অন্ধকার মেঘ ভেঙে দীপ্তিমান সূর্যের মতোই একজন ঈশ্বরের ভূমিকা নিয়ে যে মানুষটির আবির্ভাব ঊনিশ শতকের বঙ্গদেশকে পুণ্যভূমিতে পরিণত করেছিল, তিনি হচ্ছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগর। উনিশ শতকে বাংলায় যে কয়েকজন সমাজ সংস্কার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন তাদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র অন‍্যতম। নবজাগরণের ভাবাদর্শের মূর্ত প্রতীক ঈশ্বরচন্দ্রের মধ্যে পাশ্চাত্য চিন্তাধারার এক অপূর্ব সমন্বয় পাওয়া যায়। ছিলেন পিতামহের অত‍্যন্ত আদরের। তাইতো নাম দিয়েছিলেন 'ঈশ্বর'।
মধুসূদন তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “The man to whom I have applied has the genius and wisdom of an ancient sage, the energy of an Englishman and the heart of a Bengali mother.” তাঁর কথা কতটা যুক্তিযুক্ত তা বোঝাতে নিঃশ্চয় অসুবিধে হওয়ার নয়। ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর চারপাশের সকল সমস্যা অত্যন্ত সুক্ষ্ম দূরদৃষ্টি দিয়ে প্রত্যক্ষ করে তার স্বরূপ অনুধাবনের প্রয়াস পেয়েছেন এবং তা সমাধানের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। ঈশ্বরচন্দ্রের এহেন মানবমুখিতা প্রত্যক্ষ করে বিনয় ঘোষ বলেন, “আমাদের এই মানুষের সমাজে দেবতার চেয়ে অনেক বেশী দুর্লভ মানুষ। তপস্যা করে জীবনে দেবতার দর্শন পাওয়া যায়, কিন্তু সহজে এমন একজন মানুষের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না, যিনি মানুষের মতন মানুষ। মানুষের পক্ষে এ সমাজে দেবতায় রূপান্তরিত হওয়া যত সহজ, মানুষ হওয়া তত সহজ নয়। আজও আমাদের সমাজে, বৈজ্ঞানিক যুগের দ্বিপ্রহরকালে, অতিমানুষ ও মানবদেবতাদের মধ্যে দেবত্বের বিকাশ যত স্বল্পায়াসে হয়, সামাজিক মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্বের বিকাশ আদৌ সেভাবে হয় না। আজ থেকে শতাধিক বছর আগে, আমাদেরই এই সমাজে তাই যখন দেখতে পাই বিদ্যাসাগরের মতন একজন মানুষ পর্বতের মতন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিলেন, কোন অলৌকিক শক্তির জোরে নয়, সম্পূর্ণ নিজের মানসিক শক্তির জোরে, তখন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যেতে হয়।” [বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ, ১ম খ- (প্রথম সংস্করণ): বিনয় ঘোষ, পৃ. ১]
বিদ্যাসাগর ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারকও। বিধবা বিবাহ ও স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন, বহুবিবাহ ও বাল্য বিবাহের মতো সামাজিক অভিশাপ দূরীকরণে তাঁর অক্লান্ত সংগ্রাম, বাংলার নবজাগরণের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘দয়ার সাগর’ নামে। দরিদ্র, আর্ত ও পীড়িত কখনই তাঁর দ্বার থেকে শূন্য হাতে ফিরে যেত না। এমনকি নিজের চরম অর্থসংকটের সময়ও তিনি ঋণ নিয়ে পরোপকার করেছেন। বিধবা আইন প্রসঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র লিখেছেন," বিধবা বিবাহ আমার জীবনের সর্বপ্রধান সৎ কর্ম"।বিদ্যাসাগর সমস্ত ভারতীয় দর্শন মন্থন করে ' পরাশর সংহিতা ' থেকে একটি মোক্ষম শ্লোক উদ্ধার করেছিলেন, 'নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চা পতিতে পতৌ / পঞ্চস্বাপৎসু নারীনাং পতিরণ্যে' - বিধবা বিবাহ বিহিত ও কর্তব্য কর্ম। বিধবা বিবাহের যৌক্তিকতা শাস্ত্রীয় ও সামাজিক এই মর্মে ব্যাখ্যা করে ইংরেজিতে অনুবাদ করলেন ১৮৫৬ সালে 'Marriage of Hindu Widows' । ২৬ শে জুলাই ১৮৫৬-তে বিধবা বিবাহ বিল পাশ হয়। পুত্র নারায়ণের সাথে ভবসুন্দরী নামে অষ্টাদশী বিধবার বিয়ে দেন। অবশ‍্য সমাজ সংস্কারক বিদ‍্যাসাগরকে বিধবা বিবাহ প্রচোলন করতে গিয়ে হতে হয় অনেক লাঞ্ছনার স্বীকার। একসময় তাঁকে হত‍্যা করার ষড়যন্ত্র ও হয়েছিল। এরপরও তিনি একপা পিছনে দেননি। বাল‍্যবিবাহ বন্ধেও সচেষ্ট ছিলেন বিদ‍্যাসাগর। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ থেকে এরকম কুসংস্কার দূর করতে না গেলে সামাজিক উন্নয়ন অসম্ভব। এ মর্মে তিনি 'সর্বশুভঙ্করী' পত্রিকার প্রথম সংখ‍্যায় 'বাল‍্যবিবাহের দোষ' নামে একটি প্রবন্ধ লিখেন।
ঈশ্বরচন্দ্র কতটা দৃঢ় ব‍্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন তা যদি আমরা তাকে নিয়ে বিশ্লেষণ না করি তবে জানা অসম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে তার দৃঢ়তা প্রকট হয়। এমনকি একমাত্র পুত্র নারায়ণের প্রতিও দেখা তার কাঠিন‍্যতা। ছেলের প্রতি অনমনীয়তা দেখিয়ে উইলে লিখেছিলেন," আমার পুত্র বলিয়া বিবেচিত শ্রীযুক্ত নারায়ণ বন্দোপাধ্যায় যারপরনাই যতেচ্ছাচারী ও কুপথগামী। এজন্য, ও অন‍্য অন‍্য গুরতর কারণ বশতঃ আমি তাহার সংশ্রব ও সম্পর্ক পরিত্যাগ করিয়াছি। এই হেতু বশতঃ বৃত্তিনির্বন্ধস্থলে তাঁহার নাম পরিত্যক্ত হইয়াছে এবং এই হেতুবশতঃ তিনি চতুর্বিংশধারা নির্দিষ্ট ঋণ পরিশোধকালে বিদ‍্যমান থাকিলেও আমার উত্ত‍রাধিকারী বলিয়া পরিগণিত অথবা এই বিনিয়োগ পত্রের কার্যদর্শী নিযুক্ত হইতে পারিবেন না'।
ধর্ম সম্পর্কে ছিল তাঁর নিস্পৃহতা। হিন্দুশাস্ত্রবিদ হয়েও ধর্মকে শিক্ষাক্ষেত্র থেকে নির্বাসিত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি বিদ্যাসাগর। সংস্কৃত কলেজের দ্বার শূদ্রদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া, অষ্টমী ও প্রতিপদের পরিবর্তে রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির প্রবর্তন ছাড়াও বেদান্ত ও সাংখ্যকে ভ্রান্তদর্শন বলে ব্যাখ্যা করে তার পরিবর্তে দেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের পক্ষে তাঁর সুউচ্চ চিন্তা, এক উদার ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাদর্শের সূচনা ঘটায়। এদেশের নবজাগরণের আন্দোলন পূর্ণতা পেয়েছিল বিদ্যাসাগরের মধ্য দিয়ে৷ তিনি ছিলেন আমাদের দেশে পার্থিব মানবতাবাদী ধারার শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি, যিনি দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘‘কতকগুলি বিশেষ কারণে সংস্কৃত কলেজে বেদান্ত ও সাংখ্য আমাদের পড়াতেই হচ্ছে৷ কিন্তু সাংখ্য ও বেদান্ত যে ভ্রান্ত দর্শন, তা নিয়ে আজ আর কোনও বিরোধ নেই৷’’  তবে কি এই মানবতাবাদী ঈশ্বর নিরীশ্বরবাদী ছিলেন?
এই প্রশ্নটি বার বার মনে ফিরে আসে। এই কারণে ফিরে আসে যে, আশৈশব আমরা শিখেছি ঈশ্বরচন্দ্র নামক ইস্পাত কঠিন পুরুষটি আসলে দয়া ও বিদ্যার সাগর। কিন্তু পরে যখন এই মানুষটি নিয়ে বহু ঘাটাঘাটির পরে প্রায় না জানা বিষয় পাওয়া গেছে তা হল ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন ঘোর যুক্তিবাদী ,নাস্তিক এবং তাঁর ছিল বিজ্ঞানমনস্কতার অকাট্য প্রমাণ। তাইতো অত্যন্ত সখেদে বিদ্যাসাগর কালজয়ী কয়েকটি মন্তব্য করেছিলেন, তা নিচে বিধৃত হল:
'দেশের লোক কোনও শাস্ত্র মানিয়া চলে না, লোকাচার ইহাদের ধর্মও' - আজীবন এই ছিল বিদ্যাসাগরের ধারণা, তাই তিনি লোকাচার স্বরূপ কুসংস্কার থেকে ধর্মকে মুক্ত করতে গিয়ে সংশয়বাদী হয়ে ওঠেন।
' দুঃখের বিষয় আমি এ বিষয়ে ব্যালেনটাইনের সঙ্গে একমত নই।-----শাস্ত্রে যার বীজ আছে এমন কোনও বৈজ্ঞানিক সত্যের কথা শুনলে সেই সত্য সম্পর্কে শ্রদ্ধা ও অনুসন্ধিৎসা জাগা দূরে থাক, তার ফল হয় বিপরীত। ----শাস্ত্রীয় কুসংস্কার আরও বাড়তে থাকে, তারা মনে করেন যেন শেষ পর্যন্ত শাস্ত্রেরই জয় হয়েছে। বিজ্ঞানের জয় হয় নি।'
'চোখের সামনে মানুষ অনাহারে মরবে; ব‍্যাধি, জরা, মহামারীতে উজাড় হয়ে যাবে; আর দেশের মানুষ ভগবান ভগবান করবে- এমন ভগবৎ প্রেম আমার নেই; আমার ভগবান আছে মাটির পৃথিবীতে'।
উত্তরকালের Raionalist বা যুক্তিবাদীদের জন্য তিনি এক মহামন্ত্র দিয়ে গিয়েছিলেন যা যুগে যুগে যুক্তির আকাশে ধ্রুবতারর মতো জ্বলজ্বল করবে। উক্তিটি ছিল, 'ধর্ম যে কি তাহা মানুষের জ্ঞানের অতীত এবং বর্তমান অবস্থায় ইহা জানিবার কোনও প্রয়োজন নাই।' তাঁর মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, "আশ্চর্যের বিষয়, কি করে ভগবান ৪ কৌটি বাঙালির মধ্যে একটি মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন। “One wonders how God, in the process of producing forty million Bengalis, produced a man!”
    (৩)
বিদ্যাসাগর, সমকালে যেমন গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় ছিলেন, আজকের সময়েও তাঁর গুরুত্ব বর্তমান। তেমনিভাবে  নিন্দুকদের উৎপীড়ন আর প্রতিরোধ সেকাল একালও সমান্তরাল।বিদ্যাসাগরের গুরুত্ব নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য থেকে সেটি অনুধাবন করা যায়, ‘তিনি বিজ্ঞ, শাস্ত্রজ্ঞ, দেশহিতৈষী এবং সুলেখক, ইহা আমরা বিস্মৃত হই নাই। বঙ্গদেশ তাঁহার নিকট অনেক ঋণে বদ্ধ। এ কথা যদি আমরা বিস্মৃত হই, তবে আমরা কৃতঘ্ন।’ কিন্তু দু শতক আগে, অনগ্রসর ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুগে একজন বিদ্যাসাগর যে মানবিক-সামাজিক-নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করলেন, স্বচেষ্টায় দেশকালকে ছাপিয়ে হয়ে উঠলেন অতুলনীয় ও কীর্তিমান—পুরো ব্যাপারটি ভাবলে বিস্ময় জাগে! আমাদের প্রযুক্তির ঝলমল সময়ে, এখন বিদ্যাসাগরীয় দূরে থাকুক, তাঁর ছায়াতুল্য ব্যক্তিত্বের গড়ে ওঠাটুকুও দুর্লভ হয়ে পড়েছে। এই সমাজ ও সময়ে যথেষ্ট মননশীল, চিন্তাশীল, মুক্তমনের মানবিক, তাত্ত্বিক মানুষ কেন তৈরি হচ্ছে না!
উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী বিদ্যাসাগর অকৃতজ্ঞ মনুষ্যসমাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন ‘স্বেচ্ছা নির্বাসন’-এ। কিন্তু কিছু রক্ষণশীল ও তথাকথিত শিক্ষিত মানুষই বিদ্যাসাগরের প্রতি চরম অকৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করেছিল। আজও কী আমরা এর থেকে পিছিয়ে। মধ‍্যযুগীয় বর্বরতার সুরাপানে আসক্ত হয়ে  'একজন দৃশ্যমান হিউম‍্যানিষ্ট ঈশ্বর'র মূর্তি ভেঙেছি। কেন ভেঙেছি? এর উত্তর হলো প্রগতিশীল চিন্তার মূল‍্যবোধে আঘাত করা। তবে কি,এতে তো সফলও হয়েছি!
আজকের ভারতবর্ষে যেখানে ঐতিহ্যের নামে ক্ষমতাসীন শাসকরা দেশকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে, মানুষের ধর্মীয় আবেগকে ধর্মীয় উন্মাদনার স্তরে নামিয়ে দিয়ে সংকীর্ণ স্বার্থে সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ ও হানাহানিতে মানুষকে ফাঁসিয়ে দেশকে রক্তাক্ত করছে৷ বিদ্যাসাগরের হাত ধরে গড়ে ওঠা এদেশের আধুনিক শিক্ষার ভিত্তিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে শিক্ষায় গৈরিকীকরণ ঘটানোর সার্বিক আয়োজন চলছে– সেখানে বিদ্যাসাগরের চিন্তা ও শিক্ষার চর্চা আজ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়৷ আজ শিক্ষা ও সমাজজীবনে আমরা যে অবক্ষয়ের সম্মুখীন, সেকুলারিজমের ধারণাকে আজ যেভাবে বিকৃত করা হচ্ছে, তার প্রতিকার খুঁজে পেতে আমাদের গভীরভাবে জানতে হবে বিদ্যাসাগরের চিন্তা ও শিক্ষা৷ বিশেষ করে বাঙালীর হৃদয়ে বিদ্যাসাগর নামটি আজও অনন্য ও বিস্ময়কর ! ভেবে অবাক হই, প্রায় দেড় শতাধিক বছর আগে আজকের তুলনায় আরও আঁধার যুগে ভাববাদী দর্শনের কুৎসীত বিষবৃক্ষের শিকড়ে ঈশ্বরচন্দ বিদ্যাসাগর যেভাবে আঘাত করার হিম্মত দেখিয়েছিলেন, আমরা একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে তাঁকে কিংবা তাঁর কৃতকর্মকে সামান্যতমও মনে রাখার চেষ্টা করেছি কি?
(তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, অনুশীলন, দেশ, আনন্দবাজার পত্রিকা, ইন্টারনেট)

Tuesday, September 10, 2019

নৈতিকতার নিরিখে শিক্ষক দিবস


"শিক্ষকের দায়িত্বপূর্ণ কর্তব‍্যভার গ্রহণ করিতে পারে, এমন একদল লোক সৃষ্টি করিতে হইবে; তাহা হইলেই আমাদের উদ্দেশ্য সফল হইবে। মাতৃভাষায় সম্পূর্ণ দখল, প্রয়োজনীয় বহুবিধ তথ্যে যথেষ্ট জ্ঞান, দেশের কুসংস্কারের কবল হইতে মুক্তি -- শিক্ষকদের এই গুণগুলি থাকা চাই। এই ধরণের দরকারী লোক গড়িয়া তোলাই আমার সংকল্প।" ---- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগর

শিক্ষা হল একটি জাতির মূল চালিকাশক্তি। 'শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড'। শিক্ষার আলো মানুষের মনকে আলোকিত ও বিকশিত করে। তাই শিক্ষাই ভালো মানুষ তৈরি করে। আর এর কারিগর হলেন শিক্ষক। আমি মনে করি একটা কথা আমাদের মনে রাখা খুবই জরুরি, একজন আদর্শ শিক্ষকই মানুষকে সুষ্ঠ ও সমৃদ্ধ সামাজিক জীব হিসেবে তৈরি করতে পারেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন," বিশ্ব সত‍্যের সাথে ব‍্যক্তিসত্বার সামঞ্জস্য বিধানের অর্থই হল শিক্ষা"। প্রত‍্যেকটা জাতি তার প্রগতিশীল চিন্তা ও মননের অনুশীলনে কল‍্যানকামী সমাজে পৌঁছে। প্রগতিশীল এই পৃথিবীতে একজন শিক্ষক কে শুধু উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করলে চলবে না। তারজন্য প্রয়োজন গুণ ও নীতিগত আদর্শের, যুক্তিবাদী ও কুসংস্কার মুক্ত চারিত্রিক দৃঢ়তা, এবং বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার প্রতিফলন। আমাদের জীবনে শিক্ষা পর্যায়ক্রমে চলে। জন্ম থেকে আমৃত্যু পর্যন্ত। প্রথমে মা, তারপর পরিবার, প্রতিবেশী, পরিবেশ- এভাবেই চলতে থাকে শিখন প্রণালী।

আর এযাবৎ পৃথিবীতে যিনি শিক্ষাদান করে থাকেন 'শিক্ষক'। উনার গুণগত কর্মের প্রতিফলনে গোটা বিশ্ব আলোকিত। কারণ আদর্শের স্বরূপ হিসেবে একজন শিক্ষক তার জীবনের ব্রতী হয়ে যায় সমাজ সংস্কার। তাই এটা নৈতিকতা যে আমাদের প্রয়োজন এই সমাজ সংস্কারক ব‍্যক্তিত্বের অন্ধকার থেকে আলো দেখানো পথে চলা এবং এই বিশেষ ব‍্যক্তিদের নিয়ে অনুসন্ধানমূলক কাজ করা। যাতে পরবর্তী প্রজন্ম সুরাহার সূত্র সন্ধান পায়। আজ বিশ্ব ক‍্যালেণ্ডারের বিভিন্ন তারিখে শিক্ষক দিবস পালন করা হয়। ইউনেস্কো ১৯৯৪ সাল থেকে ৫ অক্টোবর কে 'বিশ্ব শিক্ষক দিবস' ঘোষণা করে। আমাদের দেশ ভারতবর্ষে ও ৫ সেপ্টেম্বর প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিনে শিক্ষক দিবস পালন করে। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরই ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। ছাত্র ও গুণমুগ্ধ বন্ধুরা যখন তাঁর জন্মদিন পালন করতে চাইলে তিনি বলেন 'জন্মদিনের পরিবর্তে ৫ সেপ্টেম্বর যদি শিক্ষক দিবস উদযাপন হয় তবে আমি বিশেষরূপে অনুগ্রহ লাভ করবো।

এই রাষ্ট্রনেতার জন্মদিনে আমরা শিক্ষক দিবস অনেক উৎসাহ এবং উদ্দীপনার সাথে উদযাপন করে থাকি। এইদিন শিক্ষক দিবস পালনের মধ্যে কতটা সুবিধা অসুবিধা সেটা নিয়ে লেজটানা অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু প্রগতিশীল চিন্তনে যা বারবার প্রশ্ন জন্মায় ---- এই রাষ্ট্রনেতারই জন্মদিনে শিক্ষক দিবস কতটা যুক্তিপূর্ণ, নৈতিকতার নিরিখে যদি বিচার করা যায় তবে প্রশ্ন এটাই আসে আদর্শের ভিত্তিতে তিনি কোন মতাদর্শে বিশ্বাসী? এই লেখনীতে ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের বিরূপ বা বিরোধিতা করার কোন উদ্দেশ্য নয়। শুধু নিদৃষ্ট এই দিন কে আমরা কেন শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করবো এই নিয়ে আলোচনা।

ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ দর্শনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার বিষয় ছিল, " বেদান্ত দর্শনের বিমূর্ত পূর্বকল্পনা " ( The Ethics of the Vedanta and it's Metaphysical Presuppositions)। একজন আদর্শ শিক্ষক তাঁর চিন্তা ও আচরণে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে থাকেন। ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক কর্তব‍্যে ধারা ৫১ (ক)র ৮ নং কর্তব‍্যে বলা হয়েছে বিজ্ঞানমনস্কতা,মানবতাবাদ, অনুসন্ধান ও সংস্কারের বিকাশ"। আধ‍্যাত্মতত্ত্ববাদ দিয়ে কিভাবে আদর্শ শিক্ষক হওয়া যায় তা জানা নেই। তবে এটা স্পষ্ট যে, আধ‍্যাত্ববাদের শেকড়ে ধরে কুসংস্কার, গোঁড়ামিমুক্ত তথা বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার কখনই বিকশিত হতে পারে না।

ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণ মনে করতেন, নারীশিক্ষা এমন হ‌ওয়া উচিত, যাতে একজন নারী আদর্শ মা এবং গৃহকর্মে নিপুণা হয়ে ওঠেন [১]  Dr Sitaram Jaiswal, Bharatiya Shiksha ka Itihaas, 1981, Prakashan Kendra, Sitapur Road, Lucknow, Page 259।তিনি বর্ণ(কাস্ট)-প্রথায় বিশ্বাস রাখতেন। তিনি মনে করতেন জ্ঞান আহরণ করা শুধুমাত্র ব্রাহ্মণের কর্তব্য। অন্যান্য বর্ণের মানুষরা 'মনু সংহিতা' মেনে কর্ম করবে [২] Sarvepalli Radhakrishnan, Bharatiya Darshan (Hindi translation of Indian Philosophy), Volume 1, 2004, Rajpal & Sons, Delhi, Page 422।রাধাকৃষ্ণাণ তাঁর ব‌ই 'দ্য হিন্দু ভিউ অফ লাইফ'-এ দাবি করেছেন 'হিন্দু' সংস্কৃতি ৪০০০ বছরের পুরনো। বলা বাহুল্য, যা সঠিক নয়। তিনি তাঁর 'ইন্ডিয়ান ফিলোজফি' ব‌ইতে বলেন, হিন্দুবাদ একটি যাপন ধারা এবং হিন্দুধর্ম সবচেয়ে সহনশীল ধর্ম। গৌতম বুদ্ধ অজ্ঞেয়বাদী ছিলন, কিন্তু রাধাকৃষ্ণাণ দাবি করেছেন যে বুদ্ধ 'প্রার্থণা মার্গী' ছিলেন এবং  সর্বোচ্চ শক্তিতে বিশ্বাস করতেন। বুদ্ধ সম্পর্কে বিশ্বের দার্শনিকদের মধ্যে তিনিই একমাত্র এই মত পোষণ করতেন। তিনি মনে করতেন গীতা বুদ্ধের আগেকার সময়ে লেখা। আম্বেদকর প্রমাণ করেন এই ধারণা সঠিক নয় [৩] Dr Babasaheb Ambedkar Writing and Speeches, Volume 3, 1987, Chapter 13।  রাধাকৃষ্ণাণ বিশ্বাস করতেন, ভারতবর্ষে ভগবান মানুষ সৃষ্টি করেছেন। এই বিশ্বাসের পথ ধরেই আসে 'ব্রহ্মার মুখ থেকে ব্রাহ্মণের সৃষ্টিকথা'। যা শুধু বৈজ্ঞানিক বিবর্তনবাদ কে অস্বীকার করে না, উপরন্তু সামাজিক শোষণের প্রতিষ্ঠান বর্ণাশ্রমকে স্বীকার করে। এইসব বহুবিধ কারনে রাহুল সংকীর্তায়ন রাধাকৃষ্ণাণকে যথার্থই 'একজন সংকীর্ণ ধর্ম প্রচারক' হিসেবে অভিহিত করেছেন [৪], Rahul Sankrityayan, Darshan Digdarshan, 1944, Preface, Page 5 বলেছেন 'feeder to exploitation in India." দার্শনিক দিক ছাড়াও ব্যক্তি রাধাকৃষ্ণাণের বিরুদ্ধে কুম্ভীলকবৃত্তি (রচনা চুরি)-র অভিযোগ ওঠে। ১৯২৯ সালে যদুনাথ সিনহা অভিযোগ করেন, তাঁর থিসিস থেকে রাধাকৃষ্ণাণ বেশ কিছুটা অংশ 'ইন্ডিয়ান ফিলোজফি, খন্ড ২'-তে ব্যবহার করেন কোনরকম ঋণস্বীকার ছাড়াই।

যেখানে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগর শাস্ত্রীয় শিক্ষাকে সম্বলিত করে নিজেকে তৈরি করেন এক মানবতাপ্রেমী ও যুক্তিবাদী সমাজ সংস্কারক। ঈশ্বরচন্দ্র বলেন," কতগুলো কারণে সংস্কৃত কলেজে বেদান্ত ও সাংখ্য আমাদের পড়াতেই হয়। কিন্তু সাংখ্য ও বেদান্ত যে ভ্রান্ত সে সম্পর্কে এখন আর বিশেষ মতভেদ নেই।' আমরা বাবা সাহেব আম্বেদকর কে কীভাবে ভুলতে পারি! সারা বিশ্ব যেখানে 'Symbol of Knowledge' বলে তাঁকে জানে। যে আমাদের সংবিধান প্রণয়ন করেন। তিনি শিক্ষা সম্পর্কে বলেন, যদি দুই টাকা উপার্জন কর তবে এক টাকা দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ কর। আর এক টাকা দিয়ে বই কিনে সন্তানদের শিক্ষিত কর।

আর এখানেই কী শেষ! সাবিত্রী বাই ফুলে, জ‍্যাতিবা ফুলের কথা আমরা কিভাবে ভুলতে পারি। যে সাবিত্রী বাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। যে যুগে নারী শিক্ষা শব্দটাই অজানা। সেই যুগে আধুনিক নারী শিক্ষার গোড়াপত্তন করেছিলেন। এইসবের জন‍্য তৎকালীন সমাজ তাদের ছেড়ে কথা বলে নি। তাদের সহ‍্য করতে হয় অকথ্য নির্যাতন। তো প্রশ্ন হলো, আমরা যারা বিজ্ঞানমনস্ক, প্রগতিশীল-আধুনিকতায় বিশ্বাসী, আমরা তাহলে কি সংবিধান মানছি!? না, আমরাও প্রথাগত আধ‍্যাত্ববাদ দর্শনকে ফলোআপ করছি। শিক্ষার লক্ষ্য যদি পরমাত্মা বা বিশ্ব আত্মার উপলব্ধি বোঝায় তবে এই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য কী -- তা নিয়ে অবশ্যই মনে প্রশ্ন জাগে?

আজও ভারতবর্ষে শিক্ষার খাতে অনেকটা উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। পড়াশোনা খরচ বাড়ার সাথেই মাঝ পথে ছেড়ে দিচ্ছে পড়ুয়ারা। তাই বাড়ছে বিদ‍্যালয় ছুট ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা। আর অন‍্যদিকে বিজ্ঞানের অস্বিকৃতের পাশাপাশি চলছে বিকৃত ইতিহাসের উপর মননচর্চা। অনেক ক্ষেত্রে নামধারী শিক্ষক যে রচনা করছেন জাতির অধঃপতনে বিকৃত ইতিহাস। অবৈজ্ঞানিক ধ‍্যানধারণার পাশাপাশি চলছে বৈদিক সিলেবাসের সুপারিশ। তাই তলিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের অগ্রগামীর সাথে নিজের প্রগতিশীলতা। সেইজন্য বোধহয় শিক্ষার উদ্দেশ্য কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি বা বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ হারিয়ে অন্তরের মধ্যে বুদ্ধি অগম‍্য যে সত্তা বর্তমান, তার উপলব্ধিতে আমরা মরিয়া। আর সংবিধানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিজ্ঞানমনস্কতার বিপরীত চিন্তা।

একজন শিক্ষক যেখানে ' Friend, Philosopher & Guide ' সেখানে আমরা শিক্ষক হিসেবে প্রয়োজন ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে প্রগতিশীল চিন্তার বিকাশ ঘটানো। নচেৎ শুধু নিদৃষ্ট একজনের গলায় মালা পরিয়ে শিক্ষার ব‍্যাপকতাকে সংকীর্ণ করা। শিক্ষার ক্ষেত্রে যারা বিশ্বের মানসিকতার সাথে তাল মিলিয়ে সংস্কারের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। তাঁদের মতাদর্শকে সামনে রেখেই শিক্ষার প্রসার ঘটানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। যিনি ঊষর মরুতে বৃষ্টি নামান, তিনিই যদি হয়ে থাকেন শিক্ষক। তবে অনৈতিক কাজে না জড়িয়ে শৈক্ষিক অবক্ষয়ে হাত বাড়াই। এটাই হোক মূল লক্ষ্য।


'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...