Saturday, February 24, 2024

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্দিকে জবরদস্তি দৃষ্টির রঙবদল চলছে। কালের পরিবর্তনে সমান্তরাল যুক্তি ও তত্ত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা আদর্শের পক্ষে অমিতাচারী স্বপ্নকথনকে প্রশ্রয় দেওয়া এখন সম্ভব। সময়, স্বদেশ, মনুষত্ব– কবি, কবিতা, কবিতার পাঠক — 'কে মুখোশ, কে মুখ এখন স্পষ্ট কিছু দেখা যায় না, কঠিন অসুখ সেরে গেলে যেরকম হয়'। তরুণ বয়স মানব জীবনের বিস্ময়কর সময়। তরুণরা আমাদের সব নির্ভরতার স্থল। তরুণরা পুরো পৃথিবীর মেরুদণ্ড। রবিঠাকুর বলেছিলেন, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।’ কিন্তু এই সন্ধিক্ষণে তরুণসমাজের ভাগ্যলিখন — বণিকতান্ত্রিক, সামন্ততান্ত্রিক, সাম্রাজ্যলােভীদের নিয়ন্ত্রণে। সম্প্রতি যুবসমাজের প্রতি তাকালে যথারীতি অবাক হতে হয়। দেশ ও জাতির কর্ণধার তরুণ সমাজ নৈতিক অবক্ষয়ের সাগরে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। তাদের নৈতিক কিংবা সামাজিক মূল্যবোধ নেই — ‘রাজা আমাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন,' এখনো ধনপ্রাণের যেটুকু বাকি সেটুকু রক্ষা করবার জন্যে আইন এবং চৌকিদারের ব্যবস্থাভার রইল আমার হাতে।' এদিকে আমাদের অন্নবস্ত্র, বিদ্যাবুদ্ধি বন্ধক রেখে কন্টাগত প্রাণে আমরা চৌকিদারের উর্দির খরচ জোগাচ্ছি। অন্ন নেই, বিদ্যা নেই, বৈদ্য নেই, পানের জল পাওয়া যায় পাঁক ছেঁকে, কিন্তু চৌকিদারের অভাব নই—।' (রবীন্দ্রনাথ - রাশিয়ার চিঠি, উপসংহার,২)

ধর্মীয় উন্মাদনা, ‘sacred madness’, সোজা ভাষায় প্রকাশ করতে গেলে — 'ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে, অন্ধ সে-জন মারে আর শুধু মরে' (রবীন্দ্রনাথ - ধর্মমোহ)।ধর্মসংস্কার লিওনার্দো বা গ্যালিলিওর মতাে বিজ্ঞানসাধকদের তপস্যা থেকে বিরত করাতে পারলাে না। সত্য নিষ্ঠায় অবিচ্ছিন্ন থেকে বিজ্ঞান মানুষকে সভ্যতার মুক্ত প্রবাহে, সংস্কারমুক্ত আলােকপ্রান্তরে এগিয়ে নিয়ে গেলাে। ধর্মের অন্ধত্ব মহাজাগতিক সারসত্যকে আবদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়ে বারবার বিজ্ঞানসাধকদের সাময়িক অত্যাচার, এমনকি প্রাণহানিতেও বিজ্ঞানের সারস্বত জয়ধারাকে রুদ্ধ করতে পারলাে না। ধর্ম যতদিন দুঃখী মানুষদের আশ্রয়দাতা, জীবনপথের পাশাপাশি চলা বন্ধ ততদিন ধর্ম সংক্রান্ত সংঘাত বা সংস্কার সভ্যতাকে আচ্ছন্ন করে না। কিন্তু বেঁচে থাকার সাহস যােগানাের বদলে ধর্ম যখন বেঁচে থাকার পথ রুদ্ধ করে মানুষকে অচলায়তনে আবদ্ধ করে তখনই সর্বনাশ সূচিত হয়। ধর্মতাত্ত্বিকদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় বারবার যেহেতু তারা ভুলে যায় রাস্তা কারাে একার নয়।

নাগরিকত্বের শর্তাবলী থেকে শুরু করে প্রজাতন্ত্রের ধরন পাল্টে গেছে। একতরফা শাসন প্রণালী, অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে তুলকালাম, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে বেলাগাম নির্লজ্জতার প্রতিমূর্তি। ক্রোনি পুঁজিবাদ, দুর্নীতি, আর্থিক বিপর্যয়ের দরুণ বিকাশের গালভরা বুলির আড়ালে ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে তার ভিটে মাটি থেকে উৎখাত ও স্থানান্তরিত । গভীরতর কৃষিসংকট, মাত্রাছাড়া কর্মহীনতা এবং ক্রমবর্ধমান বৈষম্য আর্থিক বৃদ্ধি মন্থর হয়েছে আর নিদারুণভাবে তার প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে। সংখ্যালঘু, দলিত ও সমস্ত ধরনের বিরোধী কণ্ঠস্বরের বিরুদ্ধে হামলা — অস্বস্তিকর প্রশ্নের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে জাতীয়তাবাদ বিরোধী তকমা এঁটে, তাকে দাঁড় করানো হচ্ছে দেশের সীমান্তে প্রহরারত সৈনিকদের আত্মত্যাগের বিরুদ্ধে। ধর্মীয় ও রাজনীতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতে সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সংঘাত ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মৌলিক সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়।

সাম্প্রতিক সময়গুলোতে প্রায় সর্বত্রই মূল্যবোধের চরম পতন ঘটছে। মানুষ স্বার্থের মোহে এমন কোনো মানবিক বিপর্যয় নেই যে ঘটাচ্ছে না। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের মাঝে অবিশ্বাস দানা বেধেছে। সামান্য কারণে একে ওপরকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। সর্বত্রই চলছে অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা। গুম, খুন, নির্যাতন, ধর্ষণ নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ তার পরিবারের কাছেও নিরাপদ থাকতে পারছে না। শুধু স্বার্থ আর সম্পদের প্রেমে পড়ে নয় - যে রাষ্ট্র তার জনগণকে নিরাপত্তা দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সেই রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় রাষ্ট্রীয় বাহিনী দ্বারাই শুধু রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে গুম, খুন ও অত্যাচারের মহড়া দেয়া হচ্ছে । আমাদের সমাজ,রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে সর্বগ্রাসী অবক্ষয় ও অনৈতিক পৈশাচিকতার বিস্তার যে ক্রমে অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ছে। এ থেকে উত্তরণের পথ পন্থা খুঁজে বের করার মূল দায়-দায়িত্ব সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর হলেও সমাজের কোনো সচেতন ও দায়িত্ববান মানুষই এ দায় এড়াতে পারেন না। দুর্নীতি ও সামাজিক-রাজনৈতিক অবক্ষয় মাত্রাহীন বিস্তৃতি লাভের পেছনে গত এক দশকের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা কতটা প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। সে বিতর্কে গিয়ে এই নিবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি না করাই শ্রেয় বলে মনে করি। শুধু এটুকুই বলতে পারি আইনস্টাইনের ভাষায় - 'বর্তমান যুগ বিশ্লেষণের যুগ। আগামী পৃথিবীকে তারাই চালাবে, যারা ভাবা প্র্যাকটিস করবে'।

আজকের দিনে মৌলবাদ ও চরমপন্থার যে দ্রুত উত্থান ঘটে চলেছে, পৃথিবীর এমন পরিবর্তন একদিনে ঘটেনি। বিশ্বাসের ভাইরাস ঘুণপোকার মতো ক্ষয় ধরিয়ে চলেছে আমাদের শুভবুদ্ধির ভিত্তিতে। তাইতো রাষ্ট্র তাঁর জনমানুষের সাথে কল্যানকামী গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ধর্মান্ধতাকে জাগ্রত করে দেশের মানুষদের ক্ষতি করছে। জ্ঞানের বিকাশ বা পরিবর্তনকে অস্বীকার করে মৌলবাদ।উদাহরণস্বরূপ-টলেমির সৌরধারণা (সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে) পরিবর্তন হয়ে এল গ্যালিলিও, কোপার্নিকাসের সৌরধারণা। এটাই জ্ঞানের অগ্রগতির ধারা বা গতিশীলতা। এই গতিশীলতাকে অস্বীকার ক’রে মৌলবাদীরা গ্যালিলিও, কোপার্নিকাসের ওপর আক্রমণ সংঘটিত করে। মৌলবাদ জ্ঞান-বিজ্ঞান, ঐতিহাসিক সত্যতাকেই অস্বীকার করে। 'ভাইরাসের থেকে মুক্তির পথ কিন্তু জমজমের পানি, খৃষ্টধর্মে দীক্ষার পবিত্র জল কিম্বা গঙ্গাজলে ধোওয়া নয়। যুক্তি ও শ্রেয়বোধের ইঁটে গাঁথা সে পথ ক্ষুরধার ও বন্ধুর। তাই সভ্যতা তার ব্যাপক প্রকৌশল ও পরিকাঠামোগত উন্নয়ন সত্ত্বেও বারবার চরমপন্থার ফাঁদে পড়ে। আজকের পৃথিবীতে একরূপে যেমন পাকিস্তান, সৌদি আরব, সিরিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় এর বিস্তার ঘটছে তেমনি আরেক রূপের চরমপন্থা উগান্ডা, ব্রাজিল, ভারত, রুশ ও মার্কিন দেশে গড়ে উঠছে। অন্ধ ধর্মীয় বা বর্ণ জাতীয়তাবাদ যেন ধর্মে বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের অধিকার থেকে শুরু করে জেন্ডার, প্রজনন বা সমকামিতার অধিকারের মত শত শত বছরের কষ্টার্জিত মানবাধিকারগুলোকে যেন নস্যাৎ করে দিতে চাইছে।'মৌলবাদী শক্তি একদিকে পুরাণ কাহিনী ও অন্যদিকে শরিয়তি বিধানকে অমোঘ ও চূড়ান্ত বলে মনে করে। যে ধর্মান্ধতার খেসারত মায়ানমার, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ দিচ্ছে আমরাও (ভারতবাসী) বিস্ময়করভাবে সেদিকেই যাচ্ছি। ধর্মান্ধতার পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছি। এর বড় উদহরণই বাবরি মসজিদ।

বেভেরিজ তুর্কি ভাষা থেকে ইংরেজিতে ‘বাবরনামা’র তর্জমা করেছেন ১৯২১ সালে। তাঁর তর্জমায়
মসজিদের বাইরের দেওয়ালে উৎকীর্ণ একটি লেখার উল্লেখ করা হয়েছে তা থেকে জানা যায়, মুঘল সম্রাট বাবরের আদেশে সেনাপতি মীর বাকী ১৫২৮–২৯ (৯৩৫ হিজরি বর্ষে) এ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এর সাড়ে তিনশ বছর পর ১৮৮৫ সালে মহন্ত রঘুবীর দাস যান ফৈজবাদ আদালতে। তিনিই প্রথম দাবি করেন, যে স্থানে বাবরি মসজিদ তৈরি করা হয়েছে, সেটি আদতে রাম জন্মভূমি। তবে আদালত সে মামলা খারিজ করে দেয়। এর কিছু বছর পর সে স্থানে রামের একটি মূর্তিও প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই জমি নিয়ে নানা পক্ষ একাধিকবার গিয়েছেন আদালতে। তবে, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদের কাঠামো ভেঙে ফেলে কয়েক হাজার মানুষ। আর তা ভাঙার জন্য উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল বিজেপির লালকৃষ্ণ আদভানি ও মুরলি মনোহর যোশীদের বিরুদ্ধে। আবারো আদাতল রায় দেয় যে, ওই স্থানে কোন মন্দির থাকার প্রমাণ না মিললেও প্রাচীন স্থাপনা ছিল৷ অন্যত্র মসজিদ নির্মাণের ব্যবস্থা করার নির্দেশনা দেয়া হয়৷ শুরু হয় রাম মন্দির নির্মাণযজ্ঞ৷ রাম মন্দির ভারতের সবচেয়ে দামী মন্দিরগুলির তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে নিয়েছে। এই মন্দির নির্মাণের জন্য মোট বরাদ্দ করা হয়েছে ১৮০০ কোটি টাকা। উদ্বোধনী ব্যয় শত কোটি টাকা৷ দান হিসেবেও এসেছে কয়েকশ কোটি টাকা৷ এর কাছাকাছি রয়েছে কেবলমাত্র গুজরাটের বিষ্ণু উমিয় ধামের মন্দির। যা তৈরিতে খরচ হয়েছে ১ হাজার কোটি টাকা। রাম ভক্তরা দাবী করছেন, প্রায় ৫০০ বছর পর রামলালা ঘরে ফিরলেন।

সমস্ত ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যকে অস্বীকার ক’রে
রাম চরিত্রের ঐতিহাসিক নিদর্শন বা ভিত্তি নিয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ থাকলেও, রামায়ণ একটি মহাকাব্য যা ধীরে ধীরে পল্লবিত হয়েছে অর্থাৎ যুগে যুগে অবয়বে বিস্তৃত হয়েছে৷ বিশেষজ্ঞদের মতে রামায়ণেও রয়েছে ভিন্নতা৷ তাই যুগে যুগে রামের দেবত্বগুণ নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন ৷ তবুও মানুষের অধিকার রয়েছে রামের পূজা-আরাধনা করার৷ ঐতিহাসিক তথ্যাদি আর প্রচলিত ধারণার মধ্যে মতোবিরোধ থাকাটা স্বাভাবিক। তাই সর্বপল্লী গোপাল, রোমিলা থাপার, বিপান চন্দ্র, হরবন্স মুখিয়া, সব্যসাচী ভট্টাচার্য প্রমুখ ঐতিহাসিকদের অভিমত,অযোধ্যা কি রামের জন্মভূমি? এই প্রশ্নের পাশাপাশি আর একটি প্রশ্ন-আজকের অযোধ্যা কি রামায়ণের অযোধ্যা? রামের কথা ও কাহিনির আদিগ্রন্থ ‘রামকথা’। যা আর এখন পাওয়া যায় না। বাল্মীকি এই রামকথাকেই দীর্ঘ মহাকাব্যিক কবিতার ছাঁচে পুনর্লিখিত করেন রামায়ণে। যেহেতু এটি একটি কবিতা এবং বর্ণিত ঘটনাগুলি হয়তো বা কবির কল্পনা, তাই যতক্ষণ না কোনও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রমাণাদি মেলে, ততক্ষণ কোনও ঐতিহাসিকের পক্ষে রামায়ণের চরিত্রগুলিকে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব রূপে বা ঘটনাস্থলগুলিকে ঐতিহাসিক স্থান রূপে গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। তাহলে কি সেখানে রাম মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ করারও কোন প্রমাণ নেই — কেবল হিন্দুত্ববাদ কায়েমের জন্য এক বয়ানের নাম রাম-মন্দির ইস্যু ?

আজ ভারতকে দেখে মনে হচ্ছে নিজের নাক কেটে মুসলিমদের যাত্রা ভঙ্গ করছে৷ ধর্মে আচ্ছন্ন থেকে ভারতের জাগরণ সম্ভব নয় — 'হেথায় আর্য, হেথা অনার্য,হেথায় দ্রাবিড়,চীন,শক-হুন-দল পাঠান মোগল এক দেহে হল লীন'।
নিজ দেশের ভিতরে ভারত ঘৃণার যে আবাদ করেছে তা আর নিজ দেশে সীমাবদ্ধ নেই৷ ভারতের ধর্মাচ্ছন্নতার ঢেউ আছড়ে পড়ছে প্রতিবেশি দেশেও৷ ধর্মান্ধতার মারাত্মক চাষী রাজনীতিবিদরাই৷ বোকা জনগণকে ধর্মের আফিম খাইয়ে দস্তুরমত চলছে উন্নয়ন বঞ্চনা ৷ ধর্ম নিয়ে মানুষের মধ্যে এক উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। আমার রিলিজিয়ন বেস্ট রিলিজিয়ন ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড। কিছু কিছু তো মারতে কাটতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। মুদ্দা কথা হলো ইগো কে একটু সাইডে রেখে যদি রাম নামের চরিত্রের গুণগুলো, যেসব তিনি প্রমোট করতেন। যদি ফলো করি আমাদের জীবন ট্রান্সফোর্ম অর্থাৎ পরিবর্তন হবে ঠিকই। গান্ধীজিও খুব বেশি রামভক্ত ছিলেন। কিন্তু আজকের দিনে রামের নাম 'খাতরে মে হ্যায়' — মুহ মে রাম...বগল মে নাতুরাম। এই কথা যেন সত্যিকারের হয়ে উঠছে। আমরা যদি রিপোর্টস দেখি তবে সমাজের কিছু চাপাবাজ লোক 'জয় শ্রীরাম' উচ্চারণ নিয়ে জোরজবরদস্তির খবর পাই — মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, কানপুর, উন্নআও, গাজিয়াবাদ, আসাম, দিল্লি সহ এইধরণের খবর দেশের কোনায় কোনায় পাওয়া যায়। এটা সত্য ভারতে হিন্দুত্ববাদ জাগরণে মুসলিম জঙ্গিবাদের ভূমিকা বিপুল৷ বিশ্বজুড়ে মুসলিম জঙ্গিদের তাণ্ডব হিন্দুত্ববাদকে শক্তি যুগিয়েছে৷ এমনকি আজ ইউরোপে উত্থিত ডানপন্থী চেতনার নেপথ্যেও মুসলিম জঙ্গিবাদের ভূমিকা পাওয়া যাবে৷ কিন্তু এটা কোনভাবেই মানা যায় না মৌলবাদ ও চরমপন্থা কল্যানকামী রাষ্ট্রের উদাহরণ হতে পারে। এর বিপরীতেই সূচনা করতে হবে নবজাগরণের৷

যুদ্ধ পরিস্থিতি : আন্তর্জাতিক সমীকরণ ও প্রজন্মের দায়ভার


বিশ্বে প্রতিদিন এমন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে যাদের জন্ম যুদ্ধের ময়দানে। সেই পাথরযুগের সূচনাকাল থেকেই মানুষকে পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। শুধু বেঁচে থাকা নয় যোগ্যতম হয়ে বাঁচার জন্য আদিমকাল থেকেই মানুষকে যুদ্ধ করতে হয়েছে। টিকে থাকার লড়াইয়ে গুহা থেকে শুরু করে সভ্যতার যুগে এসে যুদ্ধের ইতিহাস  মানব ইতিহাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় রয়েছে যুদ্ধের অনেক বিবরণ। এমনকি যুগে যুগে বিশ্বাসী মানুষের পথ প্ৰদৰ্শক হয়ে আসা; যারা মনে করেন পথ হারিয়েছে তাদের অন্ধকার পথে আলোকিত করা একটি মোমবাতি ; এই ধর্মগ্রন্থগুলোর কাহিনীর অন্যতম প্রধান উপজীব্য হলো যুদ্ধ ৷ সব মিলিয়ে আদিমকাল থেকে মানুষ যুদ্ধ করে আসছে।  কখনও কখনও এই যুদ্ধের কারণ হল বিজিত ভূমিতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, আবার কখনও তা ঘটে সাম্রাজ্য বিস্তারের কারণে। আজকের চেনাশোনা পৃথিবীটি অনেক অর্থেই ওই যুদ্ধের নির্মাণ। সেই সময় থেকে এই যুদ্ধ না ঘটলে ইতিহাসের ধারা অনেকটাই ভিন্ন খাতে বইত। বার্ট্রান্ড রাসেল ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, অস্ত্রের বদলে অস্ত্র দিয়ে সমস্যা সমাধান না করে মানুষ সমস্যা সৃষ্টিতেই পারদর্শী হয়ে উঠবে। সেই একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, জাতীয়তাবাদ নামক বন্দিত আদর্শটির মধ্যেই যে গভীর অসুখ, সেটাকে উপড়ে না ফেললে দুনিয়া অ-বাসযোগ্য হয়ে যাবে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বা এরিক মারিয়া রেমার্ক-এর মতো মার্কিন বা জার্মান ঔপন্যাসিক, বা তরুণ ব্রিটিশ কবি আইজ্যাক রোজেনবার্গ (যিনি যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা যান) সাহিত্যে দিয়ে গেলেন যুদ্ধদুনিয়ার ভয়ানক সব ছবি। তাঁরা নিশ্চয় জানতেন, ‘আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ কিংবা ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’-এর মতো বাক্যবন্ধ পরের শতাব্দীর সবচেয়ে সেরা প্রহসন হয়ে উঠবে?

সাম্রাজ্য বিস্তারের তাড়নাই কখনও মানুষকে এইভাবে অন্ধ করে তোলে যে ভুলে যায় সকল মানবীয় অনুভূতি। সাম্ৰাজ্য বিস্তারের মতো এমন শেষ না হওয়া  বাসনা যে কেবল অগণিত মানুষের মৃত্যু এবং দুঃখ-যন্ত্ৰণার কারণ হয়ে পড়ে তেমন নয়, ইহা কখনও বা এক আগ্রাসী সাম্রাজ্যের পতনের মুখ্য কারণও হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, মোগল সাম্ৰাজ্যের কথাই ধরুন ৷ ঔরংগজেবের আগ্রাসনী নীতিমালা মোগল সাম্ৰাজ্যকে এইভাবে আয়তনে বিশালকায় করে তুলেছিল যে তাঁর পরবৰ্তী কালের বাদশাহদের জন্য ইহা মাথার ব্যথাস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। ঔরংগজেবকে বেশিরভাগ সময় ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল দাক্ষিণাত্যের অধিকৃত ভূমির সুরক্ষা সুনিশ্চিতকরণে। মোগল সাম্ৰাজ্যের পতনের যুগ ঔরংগজেবের এই আগ্রাসনী মনোভাবই ধেয়ে এনেছিল বলে বহু ইতিহাসবিদ মত পোষণ করেন ।সংক্ষেপে, হিন্দু বিদ্বেষ এবং ঔরংগজেবের আক্রমণাত্মক ও যুদ্ধবাজ নীতি মুঘল সাম্রাজ্যকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়।

যদি ইতিহাসে যুদ্ধবাজ মানুষের একটা তালিকা প্রস্তুত করা হয় তবে অবশ্যই শীৰ্ষ পাঁচে নাম থাকবে এডলফ হিটলারের। নাৎসিদের গুণগত এবং শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী হিটলার নিজ জাতিকে যতটা ভালো পেয়েছিলেন তার ঠিক বিপরীতে সমানভাবে ঘৃণা ছিল অন্যদের প্রতি। এমনকি ইহুদি বিদ্বেষ ও সমাজতন্ত্র বিরোধিতায় নাৎসিরা নিজ জাতির বিরোধী পক্ষকেও নিস্তার দেয় নাই। প্রায় ষাট লাখ ইহুদিদের হিটলার হত্যা করলো হাসোয়া বা হলোকষ্টের নামে। এ হত্যাকান্ডও করা হয়েছে কেবল ধর্মের নামে। তৃতীয় রাইখের সময় বিনা অপরাধে লাখ লাখ জিউসকে বন্দীশিবিরে কৃতদাস বানায় হিটলার বাহিনি। একপর্যায়ে মালবাহি ট্রেনের বগিতে তুলে বধ্যভূমিতে নেয়া হতো জিউসদের। নেয়ার পথেই কষ্টে মারা যেতো অর্ধেক, বাকি অর্ধেককে হত্যা করা হতো সেখানে নিয়ে। একইভাবে ইতিহাসের পাতায় পাতায় হিটলার, মুসোলিনি, ঔরংগজেবের মতো অনেক মানুষ পাওয়া যায়। এর মধ্যে অবশ্য হারিয়ে যাননি সম্রাট অশোকও, পরাক্রমশালী অশোক, যিনি ২৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কলিঙ্গ যুদ্ধে বিজয়ের পর মৃতদেহের স্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আত্ম-উপলব্ধির নতুন আলোর পথ খুঁজে পান। অশোককে যুদ্ধের জন্য ক্ষুধার্ত একজন সাধারণ সম্রাট থেকে মানব ইতিহাসের অন্যতম সেরা সম্রাটে পরিণত করেছিল কিন্তু অশোক ছাড়া আর কতজন সম্রাট বা আজকের যুদ্ধ-উন্মাদ শাসক আত্ম-উপলব্ধির আলোর সাথে পরিচিত হয়েছেন তা নিয়ে অবশ্যই সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।

মানব ইতিহাসে যুদ্ধ নিয়ে লিখতে গেলে ইসরাইল-প্যালেস্টাইন তুমুল যুদ্ধের উল্লেখ করতেই হয়। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামাসের নির্বিচারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ১৫ জন নিরীহ ইসরায়েলি নাগরিক নিহত হওয়ার পর ইসরায়েল গাজা ষ্ট্ৰিপস্থিত হামাসের ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এরই মধ্যে হাজার হাজার প্যালেস্টাইনি সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছে। বর্তমান গাজা ষ্ট্ৰিপে গভীর মানবিক সংকট চলছে।  মানব ইতিহাসের আগের যেকোনো যুদ্ধের মতোই নিষ্পাপ শিশু ও নারীরা সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে এবং বর্তমানে করছে। গাজার হাসপাতালে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ৫০০ জন রোগী, আত্মীয়স্বজন ও চিকিৎসা কর্মী নিহত হয়েছেন। এই প্রসঙ্গে ইতিহাস কে মিথ্যা বলা যাবে না কিছু কথা যোগ করা খুবই জরুরি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের প্রয়োজনে দুর্লভ বোমা তৈরির কৃত্রিম ফসফরাস তৈরি করতে সক্ষম হন জিউস বিজ্ঞানী ড. হেইস বাইজম্যান। ফলশ্রতিতে আনন্দিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন - কি ধরনের পুরস্কার চান তিনি! জিউসপ্রেমিক বিজ্ঞানীর উত্তর ছিল - "অর্থ নয় - নারী নয় - বাড়ি নয়! আমার স্বজাতির হারানো ভূমি ফিরে পেতে চাই আমি"! বৃটেন প্রতিশ্রুতি দেয়, যিহোভা প্রদত্ত জিউস জাতির হারানো ভূমি ফিরিয়ে দেবেন তাদেরকে একদিন! ঐ প্রতিশ্রুতির ধরাবাহিকতায় ১৯৪৮ সনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৮১ নম্বর প্রস্তাব অনুসারে, ইসরাইল রাষ্ট্র গঠিত হয়। জাতিসংঘ তখন ৪৫% ভূমি ফিলিস্তিনিদের এবং ৫৫% ভূমি জিউসদের দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ পর্যন্ত পৃথিবীর ১৬১-টি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও, ৩১-টি মুসলিম রাষ্ট্র এখনো ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বে মেনে নেয়নি। ১৯৪৮ সনে তৌরাত বর্ণিত ‘যিহোবা’ প্রতিশ্রুত ইসরাইল নামক ইহুদী রাষ্ট্র পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলে, আরবদের সম্মিলিত মুসলিম বাহিনির সাথে জিউসদের যথাক্রমে ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সনে যুদ্ধ বাধে। তারা যুদ্ধ করে জিউস জাতি তথা ইসরাইল দেশকে পৃথিবী থেকে বিলোপ করে দিতে চাইছে।

ইতিমধ্যে আন্তরাষ্ট্ৰীয় মঞ্চে পেলেষ্টাইনের পক্ষে এবং ইজরাইলের পক্ষে কারা কথা বলছে তা এখন প্রায় স্পষ্ট। যুদ্ধের পেছনে পেছনে চলছে কূটনৈতিক ছায়াযুদ্ধও। বলাবাহুল্য, যেকোন একটা যুদ্ধের  সঙ্গে আরও বহু কথা জড়িত হয়ে থাকে। অস্ত্ৰ বেপারীদের স্বাৰ্থ, দেশের ঘরোয়া রাজনীতির স্বাৰ্থ ইত্যাদি ইত্যাদি। কখনও বা শাসক তার জনপ্রিয়তা উদ্ধারের আকাংক্ষায় এবং তার জন্য যুদ্ধসৃষ্ট তাৎক্ষণিক দেশপ্ৰেমের ইন্ধনকে সম্বল হিসেবে নেয়ার খবরও বিশেষভাবে চৰ্চিত হয়ে পড়ে। সেইজন্য বহু সময়ে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মাধ্যমে প্রচুর অৰ্থ, অস্ত্ৰ এবং মানব সম্পদের ব্যবহার হওয়া অনুশীলন যা আমাদের স্বচোক্ষে দেখানো হয় তা চূড়ান্ত সত্য না ও হতে পারে। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইসরায়েলের ওপর সাম্প্রতিক বিধ্বংসী হামাসের হামলা এবং ইসরায়েলের পাল্টা আক্রমণ এধরণের এমন অনেক সম্ভাবনাময় ঘটনা উদাহরণ স্বরূপ রয়েছে।  কিন্তু এই ধরনের আলোচনা ও সমীকরণের শেষে একটা সত্য আছে- এই সবের জন্য সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে নিষ্পাপ শিশু ও নারীরা।  হত্যাকারী জানে না কার ঘর ধ্বংস হয়েছে এবং কার জীবন কেড়ে নিয়েছে, মিসাইল কোনদিকে ছোড়ছে, বিনা কারণে যে প্রাণ হারাচ্ছে সে জানে না তার হত্যাকারী কে। আমরা যখন যুদ্ধ এবং মানুষের কথা বলি, তখন এটাই আমাদের হৃদয়ে আঘাত করে  অবশ্য, যদিও যুদ্ধ সংবেদনশীল মানুষের হৃদয়কে অশ্রুপাত করে, তবুও বিশ্ব যুদ্ধের কবল থেকে মুক্ত হবে এমন কোনো আশা নেই।  যুদ্ধ প্রতিরোধে আধুনিক মানুষের সমস্ত প্রচেষ্টা ইতিমধ্যেই বৃথা প্রমাণিত ।

লিগ অফ নেশ্যনস এর ব্যর্থতা যুদ্ধের ভারে ভারাক্রান্ত বিশ্বের বৃহৎ শক্তিদের দ্বারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের জন্ম হয়।  কিন্তু জাতিসংঘ কি যুদ্ধ বন্ধে সফল হয়েছে? জাতিসংঘ কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিধর দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদী চাওয়া-পাওয়া মোকাবেলা করতে পেরেছে? পারে নাই। অস্ত্রশিল্পের বিশ্বায়ন খুলে দিল সামরিক প্রযুক্তির বিপ্লবের রাস্তা। পক্ষ-বিপক্ষ নির্বিশেষে মহামানবতীরের সর্বত্র যুদ্ধকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অনায়াসে। ইজরায়েল থেকে ইউক্রেন, আল্পস থেকে সাহারা, লিবিয়া থেকে ফিজি,
নিশ্চিন্ত প্রাত্যহিকতার মধ্যেই বিছিয়ে দেয়া হচ্ছে যুদ্ধের মারণ। মানুষের নিষ্ঠুরতা কত আন্তর্জাতিক, বিশ্বায়নের নতুন প্রজন্ম জিভ টেনে ধরবে না তো....!

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...