Tuesday, November 7, 2023

মলয় রায়চৌধুরী : বাংলা সাহিত্যের 'হাংরি' লেখক


'হাংরি' বলতে 'ক্ষুধার্ত' বোঝায় না। হাংরি শব্দটা IN THE SOWRE HUNGRY TYME থেকে নেয়া; অর্থাৎ পচনরত কালখণ্ডকে হাংরি বলা হয়। - মলয় রায়চৌধুরী

হাংরিয়ালিস্ট মলয় রায় চৌধুরী আর নেই। ২৬ অক্টোবর ২০২৩-এ প্রয়াত হলেন হাংরি আন্দোলনের আর এক প্রবক্তা ও পুরোধা কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক মলয় রায়চৌধুরী। মলয় রায় চৌধুরী ফেসবুকেও ছিলেন, বয়স হয়েছিল বেশ কিন্তু ছিলেন সক্রিয়। তাঁর জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৯ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের ছাতনায়। তবে আশৈশব তাঁর বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা সবই বিহারের পাটনা শহরে। ১৯৬১ সালে তাঁর দাদা কবি সমীর রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও দেবী রায়ের সঙ্গে তিনি হাংরি আন্দোলনের ম্যানিফেস্টো তৈরি করেন এবং ওই আন্দোলনের সূচনা করেন। কিছুদিনের মধ্যেই এই আন্দোলনে যোগ দেন বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, ফাল্গুনী রায়, সুবিমল বসাক, বাসুদেব দাশগুপ্ত প্রমুখ কবি-লেখকরা। বছর চারেক পরে এই আন্দোলন ভেঙে যায়। তার আগেই অবশ্য বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, দেবী রায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু এই আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছিলেন।

১৯৬৪ সালে হাংরি বুলেটিনে মলয় রায়চৌধুরীর 'প্রচণ্ড বৈদুতিক ছুতার' কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার পরই অশ্লীলতার অভিযোগে তিনি গ্রেফতার হন। প্রায় তিন বছর ধরে চলেছিল সেই মামলা। নিম্ন আদালতে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা ঘোষণা করা হলেও, ১৯৬৭ সালে উচ্চ আদালতে তিনি অভিযোগ থেকে মুক্তি পান। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তরুণ সান্যাল, জ্যোতির্ময় দত্ত প্রমুখ তাঁর পক্ষে সাক্ষী দিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, মলয় রায়চৌধুরীর পক্ষে সাক্ষী দিলেও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হাংরি আন্দোলনকে সমর্থন করেননি। 'মলয় রায়চৌধুরীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'শয়তানের মুখ' প্রকাশিত হয়েছিল কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে ১৯৬৩ সালে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকেই মলয় তাঁর নিজস্ব বাচনভঙ্গি তৈরি করে নিয়েছিলেন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে বাংলা কবিতার প্রথাগত ধারা থেকে তিনি বেরোতে চেয়েছিলেন। তাঁর লেখায় তিনি যৌনতার সঙ্গে মিশিয়েছিলেন ব্যঙ্গ, আত্মপরিহাস ও মানুষের অসহায়তাকে'।

প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার কারণে তিনি ষাটের দশক থেকেই বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। তবে বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি। পরবর্তী সময়ে সাহিত্যে উত্তর-আধুনিকতাবাদ -এর চর্চাও করেন। অধুনান্তিক সাহিত্যচর্চা নিয়ে তাঁর দাদা সমীর রায়চৌধুরীও লেখালেখি করেছেন। মলয় রায়চৌধুরীর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে 'শয়তানের মুখ', 'জখম', 'আমার অমীমাংসিত শুভা', 'মেধার বাতানুকূল ঘুঙুর', 'চিৎকারসমগ্র', 'মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো' ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। নব্বইয়ের দশকে প্রকাশিত হয় তাঁর উপন্যাস 'ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস' এবং এবছরই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সাম্প্রতিক উপন্যাস 'গহ্বরযান'। তিনি অনুবাদ করেছেন উইলিয়াম ব্লেক, জাঁ ককতো, অ্যালেন গিন্সবার্গ, পাবলো নেরুদা, লোরকা প্রমুখের রচনা।

একটা সলজ্জ স্বীকারোক্তি দিই। গ্রেজুয়েশন করার সময়ে  কে যেন পড়তে দিয়েছিল 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'। প্রথমে ক্যাজুয়ালি এমনিই পড়েছি- যে বৈদ্যুতিক ঝটকা লেগেছে। আবার পড়েছি, আবার পড়েছি। পরে তো হাংরিদের সম্পর্কে পড়েছি, বই কিনেছি, পড়েছি। কিন্তু প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার- আহ, সত্যিই এইরকম একটা কবিতা যদি লিখে যেতে পারতাম, মরে গেলেও বলতে পারতাম একটা কিছু লিখে মরেছি। কবিতাটার জন্যে মলয় রায় চৌধুরীর সাজা হয়েছিল কোলকাতার একটা আদালতে। হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত হয়েছিল কবিতাটি, বুলেটিনের সাথে জড়িত অনেকেরই সাজা হয়েছিল। কি ওদের অপরাধ? ওদের অপরাধ নাকি ছিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, অশ্লীলতা, তরুণ সমাজকে বিপথগামী করা ইত্যাদি। এইটা ছিল কবিতা লেখার জন্যে মলয় রায় চৌধুরীর প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় পুরস্কার। 

ফেসবুকে উনার ফ্রেন্ড লিস্টে থাকার সুবাদে কথোপকথন হতো। আমাদের 'মননভূমি' লিটলম্যাগ-এ কবিতাও দিয়েছেন। কথোপকথনে হঠাৎ একদিন ইমেলে পাঠিয়ে দিলেন 'অ্যালেন গিন্সবার্গ-এর কবিতা ‘বাস্তব সিংহ’: অনুবাদ মলয় রায়চৌধুরী'। এছাড়াও আরও পাঠিয়ে ছিলেন আমাকে পড়ার জন্য - জন্ম ও যোনীর ইতিহাস, গহ্বরযান, প্যারিস স্প্লিন: শার্ল বদল্যার অনুবাদ মলয় রায়চৌধুরী সহ অন্যান্য। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত ‘Modern And Postmodern Poetry Of The Millenium’ সংকলনে দক্ষিণ এশিয়া থেকে অন্তর্ভুক্ত এইটিই একমাত্র কবিতা বলে ভূমিকায় জানিয়েছেন সম্পাদক জেরোম রোদেনবার্গ। হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে The Hungryalists নামে ২০১৮ সালে একটি বই লিখেছেন মৈত্রেয়ী ভট্টাচার্য চৌধুরী । মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটিকে অধ্যাপক শীতল চৌধুরী বলেছেন এটি বাংলা সাহিত্যে একটি সার্থক ও গুরুত্বপূর্ণ কবিতা।

কবিতার সমস্ত রেখাচিত্র ভেঙে দিয়ে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন তিনি। এই  ক্ষুধার্ত প্রজন্মের কবিতা বাংলা কবিতার দিকচিহ্ন শুধু নয় এক  উজ্জ্বল স্তম্ভ। 'মা, তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ?/তাহলে আমি দুকোটি আলোকবর্ষ ঈশ্বরের পোঁদে চুমু খেতুম'—প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার আওয়াজ তুলে  মলয় রায়চৌধুরীই প্রথম বাংলা সংস্কৃতিতে বিকল্প এক রাস্তার সন্ধান দিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠান বিরোধী  বিশ্বাস হল এটাই  যা  সমাজের প্রচলিত সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নীতির বিরোধিতা করে এবং সামষ্টিক  মানুষের শুভবোধের কথা বলে । এই  আওয়াজ  বহু পরে অন্যান্য দেশে প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন চোখে পড়ে । যেমন প্যারিসের ছাত্র আন্দোলন । কী হয় কবিতা লিখে ? এই প্রশ্ন মাঝেমাঝে  আমাদের বিভ্রান্ত করে। কিন্তু এ কথা সত্য যে কবিতার চেয়ে ধারালো অস্ত্র পৃথিবীতে আর কিছু নেই। হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে তা যেমন প্রমাণিত হয়েছে।  সারা পৃথিবীর বিভিন্ন শাসকবিরোধী অবস্থানে কবিদের নেমে আসা আক্রমণ এই সত্যকেই প্রমাণ করে। শুধু কবিতার জন্য যদি এত অত্যাচার নেমে আসে তাহলে বোঝা যায় কবিতার শক্তিমত্ততা।

 'পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মারামারি, হানাহানি ও আধিপত্যবাদের কালোছায়ার পাশাপাশি জঙ্গিবাদের ভয়াল থাবার আতঙ্কে আতঙ্কিত বিশ্ববাসী। পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষ চায় স্বাধীনতা ও মুক্তবিশ্ব। স্বভাবতই পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষী কবিদের হাতে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের কবিতা হয়ে উঠছে আরও শানিত। কবিতা প্রেমের, কবিতা দ্রোহের, কবিতা ভালোবাসার। কবিতা প্রতিবাদের। আমরা নিশ্চিত যে কবিতার সবর্গ্রাহ্য কোনো সংজ্ঞা নেই, অথবা কবিতাকে কোনো সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়।' বাংলা কবিতার  চির বিতর্কিত কিংবদন্তি আপনি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অনস্বীকার্য নাম হিসেবেই উচ্চারিত হবেন মলয় রায়চৌধুরী। তবু, ‘ওঃ মলয়’, আপনার মৃত্যু - ‘কল্কাতাকে আর্দ্র ও পিচ্ছিল বরাঙ্গের মিছিল মনে হচ্ছে আজ...’। মনে হচ্ছে- বাংলা সাহিত্যের একটা কালপর্বের শেষ হলো- এন্ড অব দ্যা ইরা।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...