Friday, September 29, 2023

নীতি আয়োগের দারিদ্র‍্য সূচকে বরাকের স্থান কোথায়!


'যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সে-ই কেড়েছে ভয়, আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়।'

আমরা সাধারণত দেশ বলতে বুঝি এমন একটা জায়গা যেখানে শান্তিতে নিশ্বাস নেওয়া যায়। যেখানে একে অপরের প্ৰতি সহানুভূতিশীল ও সহমৰ্মী এবং একে অন্যের ভালমন্দের ভাগীদার। দেশ মানে এমন একখণ্ড মৃত্তিকা যা মানুষকে লালন করে, পালন করে পরম মমতায়। আর যখন সেই ভৌগলিক পরিসীমার প্ৰতি মানুষের মনে মাতৃভাবের উন্বেষ ঘটে, তখন সেটা দেশ থেকে রূপান্তরিত হয় স্বদেশে।ভাষিক সংহতি ছাড়া জাতি বা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অত্যন্ত ভঙ্গুর। রাষ্ট্রের শক্ত ভিত্তির প্রধান উপাদান ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধ। তবে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার বিকাশ ও সংস্কৃতির রূপরেখা একটি জাতির ইতিহাসে দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সমৃদ্ধি লাভ করে। রাজনীতি ও সংস্কৃতির নানা চড়াই উতরাই, ইতিহাসের বহুপথ কেটে একটি জাতির রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথ অন্বেষণ করতে হয়। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সক্ষমতা একটি জাতির টিকে থাকার প্রধান যোগ্যতা। 

মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে লক্ষণীয়, চতুর্দশ শতক থেকে বিশ শতক পর্যন্ত পৃথিবীতে নানা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসন ঘটেছে। এই সব আগ্রাসনে পৃথিবীর যে সব জাতি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক যোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে কেবল তাদের মাতৃভাষাই টিকে আছে। বিজিতের ভাষাগুলো বিজয়ীর ভাষার আগ্রাসনে বিলুপ্ত হয়েছে কিংবা বিলুপ্তির পথে রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ অস্ট্রিয়া, হ্যাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, চেকস্লোভাকিয়া সহ ইতালির উত্তর টাইরোল ও স্ক্যান্ডেনেভিয় দেশ সমূহের স্থানীয় ভাষা এবং আফ্রিকার আদিম জনগোষ্ঠির বহু ভাষা আজ বিলুপ্ত।

আমরাও শান্তির বাসভূমি আসামকে এখানের মাটি ও মানুষের ভালোবাসায় লালিত পালিত হয়ে এই রাজ্যকে মনে প্রাণে ভালোবেসেছি স্বদেশ বা মাতৃভূমি রূপে। সুদীৰ্ঘ জীবন পরিক্ৰমায় এখানে আমরা অনেক কিছুই দেখেছি। দেখেছি জাতি দাঙ্গা, গোষ্ঠী সংঘৰ্ষ, রক্তক্ষয়ী আসাম আন্দোলন, ১৯৬১-র ভাষা আন্দোলন.... আরো কত কিছু। তবু পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়িয়েছি বারবার। এতো উত্থান পতনের মধ্যদিয়ে এগিয়ে গিয়েও এই দেশটার প্ৰতি একাত্ম বোধের শিকড় যখন প্ৰথিত হয়েছে গভীর থেকে গভীরে, ঠিক এমন একটা সময়ে আবারও আমাদের জীবনে যেন নেমে আসে এক ভয়ঙ্কর অমানিশা। আজ উত্তর-পূর্বে প্রায় দেড় কোটি বাঙালির অস্তিত্বের সঙ্কট। সঠিক ভাবে বলতে গেলে এটা নিশ্চয়ই বলতে হবে আজও আমরা ভাষাগত পরিচয়কে পুঁজি করে একটা ঐক্যের বলয় তৈরি করতে পারি নি। 'ঘুসপেটিয়া’ পরিচয়ে, ডি-র তকমায়, ডিলিমিটেশনে আমাদের শিকড় নড়বড়ে।

আমাদের প্রাথমিক দায় হচ্ছে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই অঞ্চলের বিপন্নতার প্রকৃতি নির্ণয় করা। 'বহিরঙ্গ দিয়ে বিচার করলে সে নিরূপণের কাজটা তেমন জটিলতায় আবৃত নয়। মোদ্দা কথাটা এভাবে বলা যায় যে বরাক উপত্যকার মানুষ নিত্যদিন যে বিপদ সম্ভাবনায় আতঙ্কিত, মূলত পরিচয়ে তা ভাষিক এবং সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিপীড়নগুলো সেই মৌলিক উৎস থেকেই উৎসারিত। আমাদের দেশের বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামোতে এমনতরো সঙ্কট থেকে যদি উত্তীর্ণ হতে হয়, তবে সে প্রয়াসও একটা স্তরে রাজনৈতিক।' আসামের দক্ষিণাঞ্চল বরাক উপত্যকায় যথাক্রমে তিনটি জেলা কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি। আয়তনের দিক থেকে প্রায় ৬৯২২ বর্গ কিলোমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বরাক উপত্যকার জনসংখ্যা ছিল ৩৬,২৫,৩৯৯, তা বর্তমানে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষের অধিক। বরাক, কুশিয়ারা, ধলেশ্বরীর মিলনায়তন এই উপত্যকা বহু আগে থেকেই পিছিয়ে পড়া। জনসংখ্যার দিক থেকে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষের বেশি হলেও সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থতৈনিক দিক দিয়ে জীবনধারণের মানদন্ডে ভারতের বিশেষ করে আসামের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক দূরে। নির্বাচনী ইশতেহার অনেক ঘোষণা থাকলেও রাজনৈতিক নেতা দুই একজন ব্যাতিক্রমী ছাড়া কন্ঠস্বর খুবই ক্ষীণ। দেখতে গেলে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কাগজ কল পাঁচগ্রাম কাগজ কল এখন বন্ধ, অপমৃত্যু ঘটে আনিপুর চিনি কল, বন্যার প্রকোপ, দুর্বল কর্মসংস্থান, অবিকশিত কৃষি ক্ষেত্র। তাছাড়া কি আর বলার আমাদের ছেলেমেয়েরা পেটের তাগিদে বর্হিরাজ্যে গিয়ে কর্মসংস্থানে জুড়ছে। এককথায় তিমির অবগুণ্ঠনে বরাকের জনজীবন।

সম্প্রতি নীতি আয়োগের একটি রিপোর্ট সামনে এসেছে।
নীতি আয়োগের বহুমাত্রিক দারিদ্র সূচক (Multidimensional Poverty Index) তিনটির নিরিখে বিচার করা হয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার মান দিয়ে।গত পাঁচ বছরে দেশে কমেছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। এমনটাই দাবি নীতি আয়োগের। সেই অনুসারে, ২০১৯-২১ সালে ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ দরিদ্র, যা ২০১৫-১৬ সালে ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। সাড়ে তেরো কোটি মানুষের দারিদ্রমুক্তি ঘটেছে, এমন সুখবরে নিশ্চয়ই আহ্লাদিত হওয়ারই কথা। কিন্তু সমস্যা হল উন্নয়নের বিচিত্র পরিসংখ্যান অনবরত ছুটে এসে তৈরি হয় বিভ্রান্তি। যে বারোটি মাপকাঠিতে দারিদ্রের যে থার্মোমিটারে বিচার করছে নীতি আয়োগের ‘বহুমাত্রিক দারিদ্র সূচক', তার প্রথমেই রয়েছে অপুষ্টি। শিশু-অপুষ্টি কমেছে, এমনটাই দাবি নীতি আয়োগের। কিন্তু যে সমীক্ষার ভিত্তিতে এই সূচক, 'সেই পঞ্চম জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (২০১৯-২১) দেখিয়েছিল, ভারতে শিশু-অপুষ্টির চিত্র যথেষ্ট উদ্বেগজনক। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে পঁয়ত্রিশ শতাংশেরই অপুষ্টির কারণে উচ্চতায় ঘাটতি রয়েছে। হতে পারে তা পূর্বের থেকে (২০১৫-১৬) সামান্য কম (তিন শতাংশ), কিন্তু তাতে কি আশ্বস্ত হওয়া চলে? আন্তর্জাতিক ক্ষুধা সূচকও (২০২২) দাবি করেছিল যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে অপুষ্টির নিরিখে ভারতের পিছনে রয়েছে কেবল আফগানিস্তান। যদিও এই তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছিলেন যে, সেই তথ্যের সঙ্গে সরকারি তথ্যের খুব বেশি গরমিল নেই। আরও মনে রাখতে হবে, পঞ্চম জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার বেশ কিছু তথ্য সংগৃহীত হয়েছিল কোভিড অতিমারির আগে। ভারতের নিম্নবিত্তের উপরে অতিমারির ভয়াবহ প্রভাব দেখে আশা করা কঠিন যে, ২০২২ সালে ক্ষুধা ও অপুষ্টির চিত্রে উন্নতি হয়েছে।'

নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান সুমন বেরির প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৫-১৬ এবং ২০১৯-২১ সালের মধ্যে আসামে ৪৬ লক্ষ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। নানা তথ্যের উপর ভিত্তি করে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতে ২০৩০ সময়সীমার অনেক আগেই দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা ১.২ অর্জন করবে। নীতি আয়োগের তরফে বলা হয়েছে পুষ্টি, রান্নার গ্যাস, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, পানীয় জল ও বিদ্যুতের অ্যাক্সেসের দিকে সরকার মনোযোগী হওয়ায় উপরে উল্লিখিত রাজ্যগুলোতে প্রভূত উন্নতি হয়েছে। সরকারি এই রিপোর্ট, 'Multidimensional Poverty Index -এর ১২ টি প্যারামিটারে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। এছাড়াও স্যানিটেশন এবং রান্নার গ্যাসের উন্নতি দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে'। সম্প্রতি নীতি আয়োগের প্রকাশিত একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা ও রাজস্থানে গত পাঁচ বছরের মধ্যে দরিদ্র ব্যক্তির সংখ্যা কমেছে। সেইসাথে আসামেও ৫ বছরে ৪৬.৮৭ লক্ষ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছে। অর্থাৎ আসামের বহুমাত্রিক দারিদ্র্য ২১.৪১% (Rate of Poverty) যেখানে ভারতের ১৪.৯৬%।

মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (Gross Domestic Product) এবং মানব উন্নয়ন সূচকের (Human Development Index) দিক থেকে বরাক উপত্যকা আসামের সবচেয়ে দরিদ্রতম অংশ। এই অঞ্চলের অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা চরম দারিদ্রতার মধ্যে বাস করছে। একটি জরিপ অনুসারে, হাইলাকান্দি জেলার জনসংখ্যার ৫১%, কাছাড় জেলার জনসংখ্যার ৪২.৪% এবং করিমগঞ্জ জেলার জনসংখ্যার ৪৬% বহুমাত্রিকভাবে দারিদ্র এবং নিরাপদ পানীয় জল, খাবারের উপযুক্ত মজুত তথা বিদ্যুৎ, বাসস্থান, কর্মসংস্থান আশ্রয় ইত্যাদির অভাব এখনে পরিলক্ষিত হয়। বহুমাত্রিক দারিদ্র সূচকে (Multidimensional Poverty Index) আসামের বিভিন্ন জেলার দারিদ্রতা হ্রাস শতাংশের হিসেবে তথ্য প্রকাশ হয় যেখানে — বরাক উপত্যকার কাছাড় (৩০.৫৮%), করিমগঞ্জ (৩২.৯৩%), ও হাইলাকান্দি (৩৬.২২%) ছাড়া আসামের বাকি জেলার বহুমাত্রিক দারিদ্রতার সূচক অনেকটা উন্নত। ( NATIONAL MULTIDIMENSIONAL POVERTY INDEX - NITI Aayog https://niti.gov.in/sites/default/files/2023-08/India-National-Multidimentional-Poverty-Index-2023.pdf )

সংবাদমাধ্যম তথা বিভিন্ন প্রিন্ট তথা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দেখা যায় খাদ্য-সহ নানা অত্যাবশ্যক সামগ্রীতে ব্যয়ের হার কমেছে, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন ব্যয়ক্ষমতার পতনে দারিদ্র বাড়ার একমাত্র লক্ষণ, এমনটাই মনে করছেন। একই সময়ে জাতীয় নমুনা সমীক্ষার নিয়োগ ও বেকারত্ব সংক্রান্ত সমীক্ষাটি দেখিয়েছিল গ্রামাঞ্চলে কর্মহীনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু উন্নয়নের নজির বলে মানব উন্নয়নের যে সব পরিসংখ্যান পেশ করা হয়, সেই সংখ্যাগুলির পিছনের চিত্রটিও দেখা প্রয়োজন। বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার বরাক উপত্যকা তা অস্বীকার করা যায় না। তবুও বিবিধ আগ্রাসনে বিধ্বস্ত হলেও  অপশক্তির সঙ্গে কখনও হাত মেলানো সুবিধাবাদী ছাড়া আর কেউই করতে পারে না। বরাক উপত্যকার উন্নয়নের পেছনে এতো ধীর গতি কেন, তা ভাববার বিষয়!

Tuesday, September 19, 2023

ইন্ডিয়া’- নাম কি তাহলে বদলে যাবে ‘ভারত’-এ?


'রোমিও জুলিয়েট' নাটকের একটা বিখ্যাত লাইন যেখানে শেক্সপীয়ার বলেছিলেন, নামে কিবা আসে যায়?(What's in a name!) তাহলে বিতর্ক থেকেই যায়। 'ইন্ডিয়া' না  'ভারত' কোন নামটি দেশের হওয়া উচিত। সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদে যেখানে লেখা আছে "India, that is Bharat, shall be a Union of States”। দেশের নাম বদলে যাবে! এই গত কয়েকদিন ধরে এমনই জল্পনা শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। কেন্দ্রের তরফ থেকে বিশেষ যে অধিবেশন রাখা হয়েছে সেই অধিবেশনেই নাকি এমন নাম বদলের বিল পেশ করা হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। অনুমান করার পাশাপাশি এই নিয়ে বিস্ফোরক সব দাবি তুলতেও দেখা যাচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা নেত্রীদের। এমন জল্পনা শুরু হয় মূলত G20 সম্মেলন ঘিরে রাষ্ট্রপতি যে আমন্ত্রণপত্র পাঠান তা থেকেই।

আমাদের দেশের ভূখণ্ডকে সেই প্রাচীনকাল থেকে নানা নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জম্মুদ্বীপ, ভারতখণ্ড, হিমবর্ষ, অজনাভবর্ষ, আর্যাবর্ত, হিন্দ, হিন্দুস্তান আর ইন্ডিয়া নামগুলি। সম্রাট অশোকের শিলালিপিতে জম্মুদ্বীপের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ভাষাবিদ অজিত ওয়াডনের্করের মতে, “হিন্দ, হিন্দুস্তান বা ইন্ডিয়া – এই নামগুলির সঙ্গে সিন্ধু নদের যোগ আছে। কিন্তু সিন্ধু শুধু একটি নদ নয়, এর অর্থ যেমন নদ বা নদী হয়, তেমনই সাগরও এর আরেকটি অর্থ। সেদিক থেকে বিচার করলে দেশের উত্তর-পশ্চিম অংশটি কোনও এক সময়ে সপ্তসিন্ধু বা পাঞ্জাব বলা হত। ওই অঞ্চলটি খুবই উর্বর ছিল তাই সেখান দিয়ে বহমান সাত অথবা পাঁচটি নদীই ছিল এলাকার পরিচয়।“ তিনি আরও বলেন, “প্রাচীন ফার্সি ভাষায় সপ্তসিন্ধুকে ‘হফ্তহিন্দু’ বলা হত।“ আবার ইন্ডিয়া এবং ইন্ডাস নাম পাওয়া যায় গ্রীক ইতিহাসবিদ মেগাস্থিনিসের বর্ণনায়। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সংস্কৃতের দিকপাল অধ্যাপক মনিয়র উইলিয়ামস, যিনি সংস্কৃত-ইংরেজি অভিধান লিখেছিলেন, তার মতে বেদে ভরত বা ভরথ শব্দটির অর্থ অগ্নি, লোকপাল বা বিশ্ব-রক্ষক, এক অর্থে রাজা। ওয়াডনের্কর বলছেন, “বৈদিক যুগের এক প্রসিদ্ধ জনগোষ্ঠী ভরতের উল্লেখ অনেক প্রাচীন পুঁথিতে রয়েছে। এই গোষ্ঠী সরস্বতী নদী তট, যেটি বর্তমানের ঘগ্গর, ওই অঞ্চলে বসবাস করত। এদের নাম অনুসারেই ওই ভূখণ্ডের নাম হয় ভারতবর্ষ।“

আসল-নকলের উত্তর খোঁজা সহজ নয়। ‘ইন্ডিয়া’- নামটিও মিলছে যথেষ্ট প্রাচীন ব্যবহারেও— ‘Indos’ শব্দটি পাওয়া যাচ্ছে গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস-এর বিবরণে। প্রাচীন ভারতে বিদেশাগত পর্যটক মেগাস্থিনিস (‘ইন্ডিকা’), আল বেরুনি প্রমুখের (‘কিতাব উল হিন্দ’) বইয়ের নামের মধ্যেই ‘ইন্ডিয়া’ শব্দটি লুকিয়ে আছে। তাহলে কেন ‘ভারত’ এভাবে উঠে এল সরকারি নথিতে? ভাষাবিদ পবিত্র সরকার বলছেন, শকুন্তলা ও দুষ্মন্তের পুত্র ভরতের নাম থেকেই তার রাজ্যের নাম হয় ভারত, এটাই প্রচলিত ধারণা। ‘ভারত’ শব্দের উৎসে লুকিয়ে আছে এক হিন্দু পুরাণকাহিনী। মহাভারতে যে কুরু-পাণ্ডবের গল্প আমরা পড়ি, ভরত ছিলেন তাঁদেরই পূর্বজ, চন্দ্রবংশের একজন নৃপতি। ‘ভরতের রাজ্য’ অর্থেই ‘ভারত’ ভূখন্ডটি তাৎপর্যময়, এবং সেই উদ্দেশ্যেই ‘ভারত’ নামটিকে গুরুত্ব দেওয়া— কিছু বিরোধী সমালোচনা অনুযায়ী উঠে এসেছে এমনই মতামত। বিজ্ঞজনেরা ধরে নিচ্ছেন আগামী দিনে রাষ্ট্রে’র নির্মাণপ্রকল্পে পুরাণকাহিনিকে ইতিহাসে রূপান্তরিত করার একটা প্রয়াস হিসেবেই এটাকে দেখছেন তাঁরা।

মুঘল আমলের দিকে তাকানো যায় তবে দেখা যায় তাদের শাসনাধীন অঞ্চলকে হিন্দুস্তান বলা হত। তবে ঐতিহাসিক ইয়ান জে ব্যারো লিখেছেন, অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে ব্রিটিশ মানচিত্রগুলিতে ইন্ডিয়া নামটির প্রচলন হতে থাকে। তার আগে, মুঘল আমলে তাদের শাসনাধীন এলাকাটিকে হিন্দুস্তান বলে চিহ্নিত করা হত। ব্যারো 'জার্নাল অফ সাউথ এশিয়ান স্টাডিসে' প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ ‘ফ্রম হিন্দুস্তান টু ইন্ডিয়া’-তে লিখেছেন “ইন্ডিয়া শব্দটির প্রতি আকর্ষণের কারণ সম্ভবত ছিল তাদের গ্রীক-রোমানদের সঙ্গে নৈকট্য, ইউরোপে এটির দীর্ঘ ব্যবহার এবং সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার মতো বৈজ্ঞানিক ও সরকারি সংস্থাগুলির কাছে এই নামটির গ্রহণযোগ্যতা।“

২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রের নিরঞ্জন ভটওয়াল, 'ভারত' নামটিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে জনস্বার্থ মামলা করেছিল। ‘ইন্ডিয়া’ নাম বাতিল করে শুধু ‘ভারত’ করা যাবে না, সেবছরই দেশের শীর্ষ আদালতে হলফনামা দিয়েছিল কেন্দ্র সরকার। যাইহোক নাম পাল্টে দেশ ও দশের কিছু লাভ হবে কি? তর্কের খাতিরে মেনেই নিলাম এই নাম পরিবর্তন করেই ভারতবর্ষ করা হলো তাহলে যে সব সরকারি প্রতিষ্ঠান গুলো আছে তাদের নামের আগে বা পরে ইন্ডিয়া শব্দটি ব্যবহার হয় উদাহরন স্বরূপ I.I.T (Indian Institute of Technology), I.I.M.s (Indian institute of management), I.S.R.O ( Indian space Research Organisation), R.B.I (Reserve Bank of India), S.B.I (State Bank of India), AIIMS (All India Institute of Medical Sciences) ইত্যাদি, এমনকি পাসপোর্টেও লিখা থাকে রিপাবলিক ওফ ইন্ডিয়া, পেন কার্ড, আধার কার্ড এবং প্রত্যেক টাকা তে উল্লেখ থাকে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া(RBI), এই সব সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান গুলির নাম,  কাগজ, টাকা ও দস্তাবেজ পরিবর্তন করতে কোন অযথা খরচা হবে না তো? উপরে মাত্র কয়েকটা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে ইন্ডিয়া নামে এমন হাজারো সরকারি, আধা সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ধরুণ এটা যদি তুঘলকি সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে আমাদের দেশ কতটা দুর্দশায় আক্রান্ত — মানুষ  মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নাগরিকত্ব,  দুর্নীতি, গৃহ ও জাতি দাঙ্গা, ক্ষুদা সূচকে অবনতি, নির্দিষ্ট কর্পোরেট দের হাতে রাষ্ট্রের সম্পত্তি জলের দামে বিক্রি, ঋণ চুরি, নির্দিষ্ট শিল্পপতিদের ঋণ মাফ, সীমা বিবাদ, মহিলা, দলিত, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু অত্যাচার, বনভূমি ও খনি সমূহ কে কিছু নির্দিষ্ট কর্পোরেট দের হাতে তুলে দেওয়া প্রভৃতি সরকারের একের পর এক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন না করতে পারে সেইজন্য জনসাধারণ নাম বিতর্কের পিছনে অযথা তর্কে বহুদূর সরিয়ে দেয়ার কোন মনোবাঞ্ছনা নয় তো!

আসন্ন ২০২৪ লোকসভা ভোটে পায়ের নীচে জমি শক্ত করছে বিরোধী শিবিরে। বিজেপির প্রতিপক্ষ হিসেবে জোট শিবিরে রয়েছেন মমতা, কেজরিওয়াল, নীতিশ কুমার, উদ্ধব ঠাকরে, ফারুখ আবদুল্লাহ, এম. কে. স্তালিন প্রমুখ বিরোধী ঐক্যের নেতা-নেত্রীরা। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারতের ছাব্বিশটি রাজনৈতিক দলের এক ‘বিগ টেন্ট’ হিসেবে ১৮ জুলাই ২০২৩ তারিখে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে INDIA ওরফে Indian National Developmental Inclusive Alliance । বিশেষজ্ঞদের মতে স্পষ্টতই ‘ইন্ডিয়া’- নামটিকে বিজেপি বিরোধী অস্ত্র হিসেবে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে চাইছিল বিরোধী শিবির। কিন্তু, ‘ভারত’ নামটি ব্যবহার করে যেন সেই পরিকল্পনারই পাল্টা দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী — এমনটাই তাঁদের ধারণা। আবার, অনেকে এ-ও ভাবছেন— এতে অযথা রাজনীতি খোঁজা অর্থহীন। ‘ভারত’- নামেই বা সমস্যা কোথায়? ‘ইন্ডিয়া’ বিদেশী ইংরেজদের দেওয়া নাম, তাই দেশের ‘ভারত’ নামই দেখতে চান বলে গুঞ্জন বিশেষজ্ঞ মহলে।

কিন্তু, সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা— ‘ইন্ডিয়া’- সরকারি নামটিই কি তাহলে বদলে যাবে ‘ভারত’-এ? তাঁদের অনেকেই মনে করছেন এবার আবারও কি ফিরবে নোটবন্দি’র স্মৃতি। ব্যাঙ্ক নোট থেকে আরম্ভ করে আধার, ভোটারের মত সরকারি নথিতে ‘ইন্ডিয়া’ বদলে ‘ভারত’ করানোর লাইনে দাঁড়ানোর পালা আসতে চলেছে ফের। সব মিলিয়ে নাম-বিতর্ক এখন তুঙ্গে। অবশেষে একটিই কথা বলতে চাই নামে কোন আপত্তি নেই। এটা ভারতবর্ষ হোক আর ইন্ডিয়া বা হিন্দুস্থান। কথা হলো এবার বিচার করার পালা পরিবর্তনের নামে যাতে নোংরা রাজনীতি না হয় দেশে। জনগণের টাকাকে দেশের ও দশের উন্নয়নে যেনো লাগানো হয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও তুঘলকি স্বার্থের বিপরীতে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ চরিত্র আমরা দেখতে চাই।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...