Sunday, December 25, 2022

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২, কাতার


'কে লইবে মোর কার্য, কহে সন্ধ্যারবি। শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।
মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল, স্বামী, আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।'

চোখে ঘুম হারিয়ে মোবাইল,টিভির পর্দায় কিবা লুসাইলের দর্শক আসনে বসে ইতিহাসে স্বাক্ষী রইল ভারত তথা পুরো বিশ্বের ফুটবল প্রেমীরা। আর্জেন্টিনা ৩-ফ্রান্স ৩। একটা গোল যদি এমবাপে বা মেসির পা স্পর্শে বক্সে ঢুকে যায় আর লিখা হবে ইতিহাসে পাতা। রুদ্ধশ্বাস খেলা। টানটান উত্তেজনার অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত ছিল রেকর্ড জয়ের স্নায়ুবিক চাপ। গোলরক্ষক এমিলিও মার্তিনের দক্ষতায় ৩৬ বছর পর আবারও শিরোপা আসলো মেসির আর্জেন্টিনায়। লিওনেল মেসিদের বিশ্বকাপ জয়ে উচ্ছ্বাসের ঢেউ দোহা থেকে বুয়েন্স এইরেস হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা ফুটবলবিশ্বে। এবারের আগে আর্জেন্টিনা সবশেষ বিশ্বকাপ জিতেছিল মারাদোনার জাদুতেই। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে তার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স তাকে শুধু আর্জেন্টিনায় নয়, গোটা বিশ্বে করে তুলেছিল রূপকথার মহানায়ক। আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার দে পল খুশিতে, খুঁজে পাচ্ছেন না অনুভূতি ব্যাখ্যা করার ভাষা।'২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে তারা শিরোপা ঘরে তুলতে পেরে ম্যাচ শেষে তিনি বললেন, যোগ্য দল হিসেবেই জিতেছে আর্জেন্টিনা।'

কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের মাসকটের নাম ছিল লা-ইব। আরবি এ শব্দের অর্থ 'অত্যন্ত দক্ষ খেলোয়াড়'। যদিও লা-ইব দেখতে অনেকটা ক্যাসপার- দ্য ফ্রেন্ডলি-র ভুতের মতো। এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেয় ৩২টি দেশ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ধারা বর্ণনায় ছিলেন হলিউডের খ্যাতিমান অভিনেতা মরগ্যান ফ্রিম্যান। তার সাথে ছিলেন ২০ বছর বয়সী ঘানেম আল মুফতাহ। এক বিরল রোগের কারণে জন্ম থেকেই তার পা নেই। তাদের দুজনেই বক্তব্যে বিশ্ব ঐক্য ও সাম্যের কথা ফুটে। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চ কাঁপিয়েছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ব্যান্ড বিটিএসের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য জং কুক। এবারের বিশ্বকাপের থিম সং 'ড্রিমার্স' গানেই পারফর্ম করেন তিনি। তবে বিশ্বকাপ মানে মনেপড়ে শাকিরার 'ওয়াকা ওয়াকা' বা কান - এর 'ওয়েব ইন ফ্লেগ'-র কথা। দর্শকরা সত্যিকার অর্থে এইধরণের কিছু থেকে খুব মিস করছিলেন। কাতার বিশ্বকাপ উদ্বোধনীতে ছিল চোখ ধাঁধানো আলোর খেলা, ড্রামস পারফর্মেন্স, বর্ণিল আতশবাজির খেলা। তবে কাতারের মত ছোট একটি দেশ, যেখানে পেশাদারী ফুটবলের তেমন কোন ঐতিহ্য নেই, তারা কীভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার পেল, তা নিয়ে বিতর্কও তো কম হয়নি! একাধিক বিষয় নিয়ে বিতর্ক চলে কাতার বিশ্বকাপ ঘিরে।

২০১৪ ও ২০১৮ সালে ব্রাজিল ও রাশিয়া বিশ্বকাপ আয়োজনে ১৫ বিলিয়ন ডলারের কম খরচ হয়েছিল৷ ২০১০ সালে কাতারকে যখন ২০২২ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হয়, তখন সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়েছিল ৬৫ বিলিয়ন ডলার৷ কিন্তু দেখা গেল বিশ্বকাপ আয়োজন করার জন্য কাতার প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করা হয়! টাকার অঙ্কে কত হতে পারে? প্রায় ১৬ লক্ষ ৩৩ হাজার কোটি টাকার মতো । বিশ্বকাপের আয়োজনকে কেন্দ্র করে বারবার বিতর্কে জড়িয়েছে কাতার। কখনও LGBTQ নাগরিকদের স্বীকৃতি না দেওয়া আবার স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজে যুক্ত পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের ঘটনা, খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে কাতার প্রশাসন।মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত ১৫,০২১। এসব শ্রমিক ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার নাগরিক। মৃত্যুর এই সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে কাতারে এসব দেশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।তবে কি মৃত্যু উপত্যকায় চলছে আনন্দযজ্ঞ? কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে এমনই প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মিডিয়া। সাতটি স্টেডিয়াম-সহ নানা নির্মাণ কাজে ২০১০-২০ সময়কালে নাকি অন্তত সাড়ে ছ’হাজার অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে কাতারে। এর মধ্যে রয়েছেন ভারতের ২৭১১ জন, নেপালের ১৬৪১ জন, বাংলাদেশের ১০১৮ জন, শ্রীলঙ্কার ৫৫৭ জন।

নতুন বিতর্কের মধ্যে ছিল টিকিটের দাম। আগের সব রেকর্ডকে ছাপিয়ে গিয়েছে কাতার বিশ্বকাপের টিকিটের দাম। রাশিয়া বিশ্বকাপের থেকে গড়ে ৪০ শতাংশ বেশি এ বারের। ফাইনালের টিকিট কিনতে ফুটবলপ্রেমীদের ঘটি-বাটি বিক্রি করার উপক্রম। ফাইনালের টিকিটের দাম গড়ে ৬৮৪ পাউন্ড বা ৬৬ হাজার টাকার বেশি। ২০১৮ সালের ফাইনালের টিকিটের গড় দামের থেকে যা ৫৯ শতাংশ বেশি। রাশিয়া বিশ্বকাপে টিকিটের গড় দাম ছিল ২১৪ পাউন্ড বা প্রায় ২১ হাজার টাকা। এ বার তা বেড়ে হয়েছে ২৮৬ পাউন্ড বা প্রায় ২৮ হাজার টাকা। গত ২০ বছরে কোনও বিশ্বকাপের টিকিটের গড় দাম এত বেশি ছিল না।প্রকৃতপক্ষে বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক দেশ হিসেবে তেলসমৃদ্ধ ছোট দেশ কাতারকে বেছে নেওয়াটা একটি বড় রাজনৈতিক ঘটনা। যাইহোক অন্যদিকে না গিয়ে চলে আসা যাক মূল ট্রেকে।

কাতার বিশ্বকাপ প্রতিবাদের মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছেন একের পর এক ফুটবলার। বিতর্কও কম হচ্ছে না এই বিশ্বকাপকে ঘিরে। জার্মান সিনিয়র ফুটবল দল অভিনব পদ্ধতিতে কার্যত বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার (FIFA) বিরুদ্ধে 'বিদ্রোহ' ঘোষণা করলেন অ্যান্টনি রুডিগাররা। নাকে হাত দিয়ে নাক চেপে ফিফার বিরুদ্ধে অভিনব প্রতিবাদ দেখালেন তাঁরা। কাতারে সমকামীতা নিষিদ্ধ। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হয়েছে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, সুইডেন, নরওয়ে, এবং ওয়েলস। প্রতিবাদের অঙ্গ হিসেবে তারা একটি বিশেষ আর্মব্যান্ড তৈরি করে। যার নাম দেওয়া হয় ‘ওয়ান লাভ’ আর্মব্যান্ড। এই রামধনু রঙা এই ব্যান্ড পরেই মাঠে খেলতে নামার কথা ছিল এই দেশগুলোর ফুটবলারদের। কিন্তু বাঁধা দেয় ফিফা। তাই নাকে হাত দিয়ে নাক চেপে এক অভিনব প্রতিবাদ করে জার্মানরা।

খলিফা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘ই’-র ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল জাপান ও চার বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল জাপান। প্রতিটা খেলায় সাধারণ গ্যালারিতে সমর্থকরা খাবার খান, পানীয় পান করে থাকেন। সমর্থিত দলের খেলা দেখে গ্যালারি ছেড়ে চলে যান সমর্থকরা। আর গ্যালারিতে যত্রতত্র পড়ে থাকে জলের বোতল, খাবারের প্যাকেট। এদিন ম্যাচের শেষে জলের বোতল, খাবারের প্যাকেট পরিষ্কার করতে দেখা গেল জাপানের সমর্থকদের। যা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিমেষের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। বড় বড় নীল রঙের ডিসপোসাল ব্যাগ নিয়ে গ্যালারিতে যত্রতত্র পড়ে থাকে জলের বোতল, খাবারের প্যাকেট পরিষ্কার করেন। জাপানের সমর্থকদের পাশাপাশি ফুটবলাররাও ম্যাচের শেষে সুন্দর করে সাজঘর সাজিয়ে দেন। তবে জাপানি সমর্থকদের অভিনব সাফাই অভিযান মন জয় করে নেয় নেটিজেনদের।

নারীদের বেলা সব সময়েই দাবিয়ে রাখা পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা। তবে বিশ্বকাপ হলেই কি ? কাতার কি আর পিছিয়ে থাকতে পারে ? পোশাক পরিধান নিয়ে কাতার বিশ্বকাপে ছিল বেশ কড়াকড়ি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ মতে, কাতারে পা রাখা ভিনদেশি নারী সমর্থকদের বলা হচ্ছে, তারা যাতে খোলামেলা পোশাক না পরেন। মূলত কাঁধ ও হাঁটু ঢেকে রাখতে হবে। দর্শকদের কোনো বিশেষ পোশাক পরতে বলা হচ্ছে না। তারা নিজেদের পছন্দের পোশাকই পরতে পারেন। তবে খোলামেলা পোশাক পরা যাবে না। শুধু স্টেডিয়াম নয়, মিউজিয়াম ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরে গেলেও শরীর ঢাকা পোশাক পরতে হবে। তবে ব্যতিক্রম দেখা যায় ক্রোয়েশিয়ার এক মডেল কে দেখে। নিজের দলকে সমর্থন জানাতে কাতার বিশ্বকাপে দর্শক হয়ে এসেছেন ক্রোয়াট মডেল ইভানা নোল। তবে সেসব সমালোচনাকে মোটেই পাত্তা দেননি ইভানা। উল্টো দোহার সৈকতে বিকিনি পরে ঘুরাফেরায় দেখা যায় তাকে।

যদিও ৬-২ ব্যবধানে হেরেছে ইরান। তবে হেরে গিয়েও জিতে গেল তাঁরা। প্রতিবাদের ভাষা তো বিভিন্ন রকম হয়। চিৎকার করলেই সব সময় প্রতিবাদ হয় এমন নয়। নীরব থেকেও জানানো যায় প্রতিবাদের আগুন। সেটাই আজ প্রমাণ করল ইরান ফুটবল দল। মাঠের লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের কাছে বড় ব্যবধানে হেরে গেলেও মানবতার লড়াইয়ে বড় অঙ্গীকার রেখে গেল আমির নাসের,হোসেনি, তারেমিরা। দু’মাস আগে প্রতিবাদী মাহশা আমিনির মৃত্যুর পর থেকে ফুঁসছে ইরান। দেশে প্রতিবাদ থেমে যায়নি। প্রচুর মানুষের প্রাণ গেছে পুলিশের কাছে। তবুও ভয় পাইনি সাধারণ মানুষ। ইরানের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার সরদার আজমুন পর্যন্ত কিছুদিন আগে বিরাট প্রতিবাদ করেছিলেন সরকারের বিপক্ষে। এমনকি গুলি খেতেও রাজি ছিলেন। তাকে শেষ মুহূর্তের দলে রেখেছিল ইরান ফুটবল ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু অত্যন্ত নিন্দনীয় যা করেছে আমির নাসের কে মৃত্যদণ্ডের আদেশ দিয়ে। বিশ্বকাপে জাতীয় সংগীত গাইল না ইরান! ফুটবলে হেরেও জিতে গেল মানবতার যুদ্ধে। তবে এক্ষেত্রে মরক্কোও পিছিয়ে নেই।দীর্ঘ ৩৬ বছর পর, ২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশ মরক্কো। ১৯৮৬ -র মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল তারা। যদিও সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হারে। নিজেদের ধরে রেখেছে চতুর্থ স্থানে। কাতার বিশ্বকাপে স্পেনকে হারিয়ে প্যালেস্টাইনের পতাকা (Palestine Flag) নিয়ে ‌সেলিব্রেশন করে হাকিমি–জিয়েচরা। এর অর্থ হল বিশ্বের সামনে ইজরায়েলের আগ্রাসন থেকে প্যালেস্টাইনের মুক্তির দাবি।

প্রগতিশীল শিক্ষা আমাদেরকে খোলামেলা চিন্তা করতে শেখায়, ব্যক্তিস্বাধীনতা সম্পর্কে শেখায় এবং মানুষের পাশাপাশি সমস্ত প্রাণীকে ভালবাসতে শেখায়। সমাজের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে ভালোবাসতে শেখায়। আশ্চর্যের বিষয় এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ। বিবাহ বহির্ভুত কাপোল নাকি বিশ্বকাপ সময়ে কাতারে যেতে পারবে না। গেলে জরিমানা বা জেল। পাশ্চাত্যে বিবাহ প্রথা কম। বিবাহ ছাড়াই দু'জন হয়তো সারা জীবন ঘর সংসার করে, সন্তান সন্ততি নিয়ে সুখে থাকে। সেসব পশ্চিমা কাপোল তাহলে কাতার যেতে পারবে না! দুজন পুরুষ বা দু'জন নারী একসাথে গিয়ে খেলা উপভোগ করলে, এক কক্ষে থাকলে সন্দেহ করা হবে তারা সমকামি কি না। সমকামি হলে শাস্তি। ২১ বছরের নীচে হোটেল বারে মদ খেলে ৩০০০ দিনার জরিমানা বা ৬ মাসের জেল। সি-বীচে বিকিনি পড়া নিষেধ। পুরুষরাও খালি গায়ে রাস্তায় বের হতে পারবে না। কাতারে ছিল LGBTQ র উপর, নারীদের পোশাকের উপর নিষেধাজ্ঞা যেমন নিয়ম কানুনের জতুগৃহে আটকে পড়েছিল এবারের বিশ্বকাপ। অনেক সময় মনে হতো বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের কি প্রয়োজন ছিল ধর্মীয় জলসার আয়োজন করলেই পারতো ! 

কাতার বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক ও বিজ্ঞাপনী চুক্তিগুলো থেকে রেকর্ড সাড়ে সাতশো কোটি ডলার আয় করেছে ফিফা। ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও ট্র্যাজিক হিরোই হয়ে রইলেন কিলিয়ান এমবাপে। চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা রানার্স আপ ফ্রান্স, তৃতীয় স্হান ক্রোয়েশিয়া,গোল্ডেন বল মেসি( আর্জেন্টিনা), গোল্ডেন বুট এমবাপে (ফ্রান্স) ,গোল্ডেন গ্লাভস মার্টিনেজ (আর্জেন্টিনা),তরুন সেরা ফুটবলার ফার্নান্দেজ (আর্জেন্টিনা)। ২০২৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসতে যাচ্ছএ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে । ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দিয়েগো ম্যারাডোনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে, দোহায় ছাদখোলা বাসে ট্রফি নিয়ে উদযাপন মেসিদের। ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে লুসাইলকে স্মরণীয় করে রাখলো আলবিসেলেস্তেরা।১৯৩০ সালে শুরু হওয়া ফিফা বিশ্বকাপের ২২তম আসরের আয়োজক দেশ কাতার। কাতারের আয়োজক হওয়া নিয়ে আলোচনা যেমন ছিল, ছিল নানামুখী সমালোচনাও।অনেকটা ইসলামী বিধিনিষেধের উর্ধ্বে গিয়ে কাজ করেছে কাতার। এটাও কম বড় কথা নয়। তবে সব কিছু ছাপিয়ে ইতিহাসের অন্যতম সফল এক বিশ্বকাপ শেষ করে মরুর এই দেশটি। সবার মনে থাকবে কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ (Qatar World Cup 2022)।

Friday, December 16, 2022

গৃহবধূ আত্মহত্যা : বিবাহ সংক্রান্ত সমস্যা


আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘সেইডেয়ার’ থেকে ।সুইসাইড বা আত্মহত্যা আজ আর কারো কাছে অপরিচিত নয়। হয়তো এমন কোনো দিন খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হবে যেদিন দেশের কোথাও না কোথাও আত্মহত্যা ঘটেনি। পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট, ফেসবুক, টিভি অন করলেই কোনো না কোনো আত্মহত্যার খবর সামনে ভেসেই আসে। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো আত্মহত্যার নৈতিকতার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করেছেন। তিনি মনে করেছেন, যখন কেউ রাষ্ট্রীয় আইনে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত হন অথবা দুর্ভাগ্যবশত জীবন ধারণে অপারগ হন অথবা অপ্রত্যাশিত অপমানে জর্জরিত হন তখন তার আত্মহত্যা করা অনৈতিক নয়। অনৈতিক হয় না। একটি সূত্রমতে, গোটা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৮ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে থাকেন। তার মানে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ১ জন করে আত্মহননের পথ বেছে নেন। এই সংখ্যার মধ্যে ভারতেই ২০২১-এ আত্মহত্যার কারণে মৃত্যু হয়েছে ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৩৩ জনের। এমনই তথ্য উঠে এসেছে ‘ন্যাশনাল ক্রাইম স্টেশন ব্যুরো’-র সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে। এনসিবি-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে প্রতি ১০ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে ১২০ জনের মৃত্যুর কারণই হল আত্মহত্যা।

আমাদের সমাজে আত্মহত্যা যেকোনো ঘাতক ব্যাধি থেকে অধিক দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং ইহা সমাজ তথা দেশকেও রাখছে সর্বক্ষণ ভীতির মুখে। বর্তমানে যেকোনো বয়সের মানুষই আত্মহত্যা নামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বিয়ে নামক দাসপ্রথায় আবদ্ধ হয়ে সম্প্রতি বাড়ছে গৃহবধূ আত্মহত্যা। বিবাহিত মেয়েদের আত্মহত্যার ক্ষেত্রে পরিবার কিংবা স্বামীর ইন্ধন দেখা যায়। নারীর ক্ষেত্রে অধিকাংশই ইভ টিজিং, যৌতুকের চাপ, অভাব, হতাশা, পারিবারিক কিংবা সামাজিক নির্যাতনের মতো ঘটনায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। একজন নারী বিয়ের পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দৈনন্দিন জীবন সংসারে প্রাত্যহিকতার বেড়াজালে আটকে পড়েন। মন খুলে কথা বলার বা কথা শোনার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার যেহেতু অভাব রয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি নারীকে যে নানা ধরণের মানসিক নিগ্রহের শিকার হতে হয়, তার একটি বড় অংশ হয় নেতিবাচক নানা শব্দের মাধ্যমে। কোন ঝগড়া বিবাদে নারী বিভিন্ন ধরনের মৌখিক সহিংসতার শিকার হয়।  খেয়াল করেছি হয়তো, আমাদের আশপাশে প্রচলিত বেশিরভাগ গালিগালাজ এর সাথে স্ত্রী লিঙ্গের সম্পর্ক রয়েছে। অনেক তিরস্কারমূলক শব্দের মধ্যে পুরুষবাচক তো কোন শব্দই নেই।

নারীরা আসলে খুব সহনশীল, কিন্তু সহ্যেরও একটা সীমা রয়েছে। বেশিরভাগ মেয়েরই ১৮ বছর হবার সাথে সাথেই বিয়ে হয়ে যায়, যেটা বিয়ের আইনগত বয়স বা এর থেকে কমবয়সী মেয়েদেরকে পরিয়ে দেয়া হয় বিয়ের শিকলে। সে স্ত্রী এবং পুত্রবধূ হয়ে শ্বশুর ঘরে যায় আর তার গোটা সময়টা কাটায় ঘরের চার দেয়ালের মাঝে - রান্না, ধোয়ামোছা আর ঘর গৃহস্থালির নানা কাজে। বিয়ে প্রথায় লোভী পুরুষ মানসিকভাবে নির্যাতন করে স্ত্রী কে, তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ পর যাতে সামাজিকভাবে আবার দ্বিতীয়, তৃতীয় বা তার অধিক নারীর কাছ থেকে পেতে পারে সে চরম সুখ। তার ওপর আবার চাপিয়ে দেয়া হয় নানা ধরনের বিধিনিষেধ। ব্যক্তি স্বাধীনতা বলতে তার কিছুই প্রায় থাকে না। থাকে না আর্থিক স্বাধীনতাও - নিজস্ব অর্থ বলতে তার হাত থাকে প্রায় শূন্য। তার শিক্ষা বা ভবিষ্যতের স্বপ্ন সব কিছু তাকে বিসর্জন দিতে হয়। তার আশা আকাঙ্ক্ষার ধীরে ধীরে অপমৃত্যু শুরু হয়। ফলে হতাশা আর ব্যর্থতার গ্লানি তাকে গ্রাস করতে শুরু করে। তখন তার কাছে শুধু জীবনধারণ একটা যন্ত্রণার মত মনে হয়।

আমাদের সমাজে আত্মহত্যাকে ধর্মীয় দৃষ্টিতে পাপ হিসেবে দেখা হয়। ফলে কেউ নির্যাতন, নিপীড়ন ও অবহেলার শিকার হয়ে যদিও বা বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ, ধর্মীয় কারণে তার অন্তুষ্টিক্রিয়ায় ও দেয়া হয় নানা ধরনের ফতুয়া। আত্মহত্যার কারণ যতই সংবেদনশীল হোক না কেন এক্ষেত্রে। আত্মহত্যার পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। সহজে একজন মানুষ তার নিজ জীবনের পরিসমাপ্তি চায় না। যে কোনোভাবে বেঁচে থাকার আকাঙ্খাই প্রবল এবং বড় সত্য মানবজীবনে।

ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ভারতে গত বছর ২২ হাজার ৩৭২ জন গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ ভারতীয় গৃহবধূদের মধ্যে আত্মহত্যার হার প্রতিদিন গড়ে ৬১ আর মিনিটের হিসাাবে প্রতি ২৫ মিনিটে একজন। ২০২০ সালে মোট এক লক্ষ ৫৩ হাজার ৫২ টি আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে - তার মধ্যে ১৪.৬% ক্ষেত্রেই আত্মহত্যা করেছেন গৃহবধূরা। আর মোট আত্মহত্যার ৫০ শতাংশেরও বেশি ঘটনায় গৃহবধূরাই আত্মহননের পথে গেছেন।১৯৯৭ সালে আত্মহত্যার পরিসংখ্যান সংকলন করতে শুরু করে এবং সেটা তারা করে পেশার ভিত্তিতে। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে ভারতে প্রতিবছর বিশ হাজারের বেশি গৃহবধূ আত্মহত্যা করছেন। ২০০৯ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছিল ২৫ হাজার ৯২। বিগত ৫ বছরে ১৩৫৩০ জনের আত্মহত্যায় উত্তরপূর্বে শীর্ষে আসাম,দেশে শীর্ষে মহারাষ্ট্র (৯৬৬৫০)
-কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ দপ্তর। রিপোর্টে এধরনের আত্মহত্যার জন্য সবসময়ই দায়ী করা হয়েছে "পারিবারিক সমস্যা" অথবা "বিবাহ সংক্রান্ত সমস্যাকে"। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ ব্যাপক মাত্রার পারিবারিক সহিংসতা। সরকার পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে অংশ নেয়া নারীদের ৩০% বলেছেন, তারা স্বামীদের হাতে নিগ্রহ ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। সেইসাথে প্রতিদিন জীবনের ঘানি টানা আর সংসারের প্রাত্যহিক শ্রম তাদের দাম্পত্য জীবনকে কঠিন করে তুলছে, সংসারে তাদের জন্য দমবন্ধ করা অবস্থা তৈরি হচ্ছে।

চলমান পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে জীবন কাটানোর পরেও অনেক নারী যে তাদের মাথা ঠিক রেখে জীবন চালাতে পারছেন, তার একটা বড় কারণ হল তাদের পেছনে ব্যক্তিগত সাহায্য সমর্থনের অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ।আত্মহত্যার এই সামাজিক ব্যাধি শতভাগ নির্মূল করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। মানুষ হিসেবে নিজেকে জানতে হবে। সামাজিক দায়িত্ববোধ, পারিবারিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক অনুশাসনগুলো যথার্থভাবে মেনে চললেই অনেকাংশে এটা রোধ করা সম্ভব। মানুষ হিসেবে কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, যদি উপলব্ধি করেন সমাজ প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য, তবে তার পক্ষে আত্মহত্যা সম্ভব নয়। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা সাধারণত দুইধরনের।ইমপালসিভ (হঠাৎ আত্মহত্যা) এবং ডিসিসিভ (সিদ্ধান্ত নিয়ে বা পূর্বপরিকল্পিত)। তবে ডিসিসিভ আত্মহত্যাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য। আত্মহত্যা হুট করে হয় না। অনেক পরিকল্পনা করে এগোতে হয়। এ সময় আশপাশের মানুষ যদি একটু খেয়াল করেন তাহলে তারা সমস্যাগুলো বুঝতে পারেন। এ অবস্থায় যদি তারা উদ্যোগী হয় তাহলে বিষয়টি তখন পারিবারিকভাবে সমাধানে এগিয়ে মীমাংসা করা সম্ভব হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, গৃহবধূদের বাবা-মায়েরা তখন এই বিষয়ে বেখেয়ালে থাকেন, আবার কখনো কখনো নিজেরাই মেয়ের মনকে বিষিয়ে তোলেন। এভাবে তারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে শেষে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা নিতে ছুটে যান।

আত্মহত্যার বিষয়টি নিয়ে সমাজে খোলাখুলিভাবে কথা বলা হয় না। বিষয়টি এখনও গোপন রাখার প্রবণতা দেখা যায়, কারণ আত্মহত্যাকে পরিবারের জন্য লজ্জার বিষয় হিসাবে অনেকে দেখেন। গ্রাম এলাকায় ময়না তদন্তের প্রয়োজন থাকে না এবং অপেক্ষাকৃত ধনী পরিবারগুলো বিভিন্ন পন্থা অবলম্বনে আত্মহত্যাকে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হিসাবে নথিভুক্ত করায়। অনেক সময় প্রশাসনের নথিও যাচাই করা হয় না।এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের অনেক ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। যৌতুক, গৃহনির্যাতন, বহুবিবাহ সম্পর্কিত খবর ও এগুলোর কুফলের পাশাপাশি আত্মহত্যার পথে না গিয়ে বিকল্প পথে জীবন গঠনের উপায় নিয়ে বেশি বেশি সংবাদ প্রকাশিত হওয়া দরকার। তাহলে তা এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারবে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আত্মহত্যার প্রবণতা কমিয়ে আনতে শিশুকাল থেকেই মা-বাবার আন্তরিক আচরণ বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। আত্মহত্যার পেছনে যেসব কারণ দায়ী এসব চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে এর প্রবণতা বাড়তেই থাকবে।বিগত দিনে গৃহবধূ আত্মহত্যার কারণগুলো দর্শীয়ে, প্রত্যেক প্লেটফোর্মে, সামাজিক মাধ্যম, গণমাধ্যমের সাহায্যে মনোবিজ্ঞানী বিশেষজ্ঞ দ্বারা সচেতনতামূলক কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কলেজ, ইউনিভার্সিটি লেভেলে কোর্স কারিকুলামে এই ধরণের বিষয় ইনক্লুড করা। যাতে পরবর্তীতে একজন নারী সহজেই সংযত রাখতে পারে, মানসিক ভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে,বিয়ে নামক দাসপ্রথার বিরুদ্ধে লড়তে পারে। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবাইকে সজাগ, সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে, সকলকে সচেতন করতে হবে।

Thursday, December 15, 2022

ইরান ফুটবলারের মৃত্যুদণ্ড প্রসঙ্গে


ইরান পুঁজিবাদ অনুসারী দেশ।নারী–পুরুষ–ছাত্র–যুব নির্বিশেষে সমাজের সমস্ত অংশের ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণে এই গণআন্দোলনের শক্তি এতটাই বেড়েছে যে তা ক্ষমতাসীন মৌলবাদী–ফ্যাসিবাদী শাসকের চোখে চোখ রেখে অত্যাচারী জমানা বদলের আওয়াজ তুলছে৷ রাষ্ট্রের দমনপীড়নে ইতিমধ্যেই চারশোর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে৷আজ ইরানে যা চলছে তা হলো প্রগতিশীলতার বধ্যভূমি প্রস্তুত করা। এটা কি কোন সভ্য দেশের কাজ ? ধুর। একজন কে মৃত্যু দণ্ড দিলেই কি আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে ? একসময় শাহ র আমলে হিজাব বা বোরখা পুরো নিষিদ্ধ ছিল ১৯৮৯ ধর্মীয় অন্ধকার কে পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয়।

একটা পুঁজিবাদী দেশে ধর্মীয় বিধিনিষেধ দিয়ে অন্ধকারে ঠেলে দেয়া কতটা আক্রমণাত্মক তা ইরানকে দেখলেই বুঝা যায়। কারণ ভীতি প্রদর্শন করে মালাই খাওয়া দস্তুর। আসলে এটা শুধু ইরানে না, ধর্মীয় অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে প্রগতিশীলতা পিছনে ফেলে দেয়া হয়। কাতার বিশ্বকাপে মরক্কো কে তো দেখেছিই। আশরাফ হাকিমিরা ধর্মীয় গেড়াকল থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে নতুন আঙ্গিকে সাজিয়ে তুলেছে বিশ্বদরবারে। আসলে ইরান আমেরিকাকে ফলো করেই ধর্মীয় অন্ধকার আবার ফিরিয়ে এনেছে। ধর্মের নামে রাজনীতি এটা তো আবহমান কালের প্রচলিত ধারা।

রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর 'রামরাজ্য ও মার্ক্সবাদ' বইয়ে লিখছেন 'বিবর্তন বাদ ধর্মের মূলে এমন আঘাত করে যে তার ভিত্তিই নড়ে ওঠে। নিজের নিন্দনীয় পুঁজিবাদী সমাজ বহাল রাখার জন্য ধর্ম ও ঈশ্বরের সবথেকে বড় পৃষ্ঠপোষক আমেরিকা এজন্যই তাদের বেশ কিছু --বিশ্ব বিদ্যালয় গুলোতে বিবর্তনবাদ বিষয়ক পঠন-পাঠন ও আলোচনা বন্ধ করে দিয়েছে ।' (পৃঃ ৫৭)

জার্মান সংবাদপত্র ‘আনজেরে জাইট’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘তুদে পার্টি’র আন্তর্জাতিক মুখপাত্র মহম্মদ ওমিদভার জানাচ্ছেন, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইরানে ৪০ শতাংশের বেশি জনগণ দারিদ্র সীমার নিচে৷ বেকারত্ব ভয়াবহ, কোনও কোনও প্রদেশে তা ৭০ শতাংশের বেশি৷ এর সঙ্গে জুড়ে আছে শাসকদের সীমাহীন দুর্নীতি৷ আর চলছে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের নির্মম দলন৷ সৌদি আরবের শাসকরা এবং আফগানিস্তানের তালিবানরা মহিলাদের উপর যে ধরনের ফতোয়া জারি করেছে, ইরানেও তাই৷ মানুষ হিসাবে যে বুনিয়াদি অধিকার থাকা উচিত, তার কিছুই ইরানের মহিলাদের নেই৷ এমনকী তার নিজের শরীরের উপর নিজের অধিরকারটুকুও নেই৷

ইরান ধর্মীয় মৌলবাদীদের দ্বারা শাসিত একটি পুঁজিবাদী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র৷ এ যে কী দুঃশাসন ইরানের জনগণ বিশেষ করে মহিলারা তা উপলব্ধি করছেন জীবন দিয়ে৷ মৌলবাদী শাসকরা মেয়েদের বিয়ের বয়স ধার্য করেছিল ৯ বছর৷ জনগণের প্রবল প্রতিবাদের সামনে পড়ে ২০০২ সালে পার্লামেন্ট মেয়েদের বিয়ের বয়স বাড়িয়ে করে ১৩ বছর৷ অধিকারের প্রশ্নে নারী–পুরুষের বৈষম্য ব্যাপক৷ পুরুষেরা মুখে তালাক বললেই বিবাহ–বিচ্ছেদ হয়ে যায়৷ কিন্তু নারী বিবাহ বিচ্ছেদ চাইলে তাকে যেতে হবে কোর্টে৷ একজন বিবাহিত মহিলা বিদেশে যাওয়ার পাসপোর্ট পাবে না, যদি না স্বামী লিখিত অনুমতি দেয়৷ সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক বৈষম্য৷ স্বামী মারা গেলে তার সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার নগণ্য, মাত্র সাড়ে ১২ শতাংশ৷ কিন্তু স্ত্রী মারা গেলে, তার সম্পত্তি পুরোটাই পাবে স্বামী৷ পৈত্রিক সম্পত্তিতে মেয়ের ভাগ ছেলেদের অর্ধেক৷ বিচারবিভাগে মেয়েদের চাকরির কোনও অধিকার নেই৷ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও মেয়েদের দাঁড়ানো নিষিদ্ধ৷ কোনও কোনও ধর্মীয় নেতা এমনও বাণী দিচ্ছে যে মহিলাদের মস্তিষ্কের শক্তি পুরুষের অর্ধেক৷ সব মৌলবাদের বহিরঙ্গে পার্থক্য যাই থাক, মর্মবস্তুতে এরা এক৷ এদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রগতির পথে প্রতিবন্ধক৷

ইরান আদালতের মতে, ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে শত্রুতা’। সম্পূর্ণ নির্বোধতা আর কাপুরুষতা। মূল কথা হলো আমির নাসের আজদানির মৃত্যুদণ্ড,নিন্দনীয় এবং কুপমূন্ডকতা ছাড়া কিছু নয়। সবশেষে পুঁজিবাদ ও ধর্মীয় অন্ধকার নিপাত যাক।

Tuesday, December 13, 2022

বিতর্কিত দেওয়াল লিখন জেএনইউ-তে


আবারও বিতর্ক ঘিরে দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় জেএনইউ ( Jawahar Lal Nehru University) । এবারের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে কোন অজ্ঞাত পক্ষের দ্বারা দেয়াল লিখন হয় --- ক্যাম্পাসের ভেতরে স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের দেওয়ালে কারা যেন লাল কালিতে লিখে রাখল ফতোয়ার ঢং-এ একাধিক বিতর্কিত বার্তা। কোথাও লেখা হয়েছে ‘ব্রাহ্মণরা ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাও’, কোথাও লেখা ‘বানিয়ারা (বৈশ্য) দূর হটো’, কোথাও বা ‘শাখায় (সংঘ) ফিরে যাও’, ‘আমরা বদলা নিতে আসছি’ ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে একটি বিবৃতি জারি করা হয়েছে৷ 

অজ্ঞাতনামাদের কুকীর্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের দেওয়াল ব্রাহ্মণ তথা বৈশ্যবাদের বিরুদ্ধে স্লোগানে ভরে উঠল। রীতিমতো শাসানি দিয়ে বলা হল ‘ব্রাহ্মণরা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাও’, ‘ব্রাহ্মণ ভারত ছাড়ো’ আবার কোনওটিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখা রয়েছে, ‘এখানে রক্ত ঝরবে’, ‘ব্রাহ্মণ-বৈশ্য, আমরা তোমাদের জন্য আসছি। আমরা সংখ্যায় বেশি রয়েছি।’ ইতিমধ্যে এই ঘটনা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিনীত জিন্দাল দিল্লি পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন। এই মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনত দণ্ডবিধির ধারা ১৫৩এ/বি, ৫০৫, ৫০৬, ৩৪ এর অধীনে মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে বলে দিল্লি পুলিশের দাবি।

এমনিতেই দেশের প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জেএনইউ বা জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ডান ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের মধ্যে কথায় কথায় হরদম সংঘাত সেখানে রোজকার বিষয়। গেরুয়া শিবিরের তরফে জেএনইউ-র বামমনস্ক ছাত্র সংগঠনের পড়ুয়াদের কখনো ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’, কখনও ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে। কেন্দ্রীয় শাসক দলীয় শিবিরের কাছে আজও জেএনইউ পঠনপাঠনের পীঠস্থান নয়, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদের আঁতুরঘর’ বলে চিহ্নিত করা হয়। জেএনইউ দেয়াল লিখন কোন নতুন বিষয় নয়। সময়ে সময়ে অনেক রাজনৈতিক বিতর্কে বেশ চর্চায় রয়েছে। কিন্তু এবারের বিতর্কের ঝড় বেশ তাৎপর্য বহন করছে। বিশেষ করে দুটো সম্প্রদায়কে কোন অজ্ঞাত পক্ষ আক্রমণ করার জন্য বেছে নিয়েছে। তবে এবারের বিষয় ব্রাহ্মণ ও বানিয়া সমাজে আক্রমণ করায় এর তীব্র প্রতিক্রিয়া সংবাদ শিরোনাম দখল করেছে।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে চলা বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচন তথা আগামী লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ধরণের স্পর্শকাতর বিষয় উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে করা হয়েছে বলে বুদ্ধিজীবী মহলে সরগোল চলছে। যদিও এই ধরণের ইস্যুর বাস্তব ভিত্তি নেই, তদুপরি একটা জাতিয়তাবাদী বিষয় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এনে একে অপরের সাথে সংঘাত বাঁধানো কি কোন সংকীর্ণতার কাজ নয় ? মানে, দেয়াল লিখন দিয়ে কি বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে ?

আচ্ছা, বিশ্লেষণের সুবিধার্থে ব্রাহ্মণ-বানিয়া (বৈশ্য) বিরোধী শ্লোগান লিখা পক্ষকে যদি বামপন্থা বা দলিত সংগঠনের বিচারধারার মানুষ ধরে নেয়া হয়, তবে এই ধরণের শ্লোগান লেখার পেছনে লুকিয়ে আছে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমির সাথে বর্তমান উচ্চবর্ণের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মানসিকতা এবং বিশেষ করে সংবিধানের ১০৩ নং সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চবর্ণের আর্থিকভাবে দুর্বলদের দেয়া ১০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চিন্তা বা নির্বাচনে দলিত বামপন্থী এবং অন্য শ্রেণীর ব্যাক্তিকে বিজেপির বিরুদ্ধে একজোট করার চিন্তা। যেখানে তাদের বিচারধারা দরশায় জাত-পাত, উচ্চ - নীচের বিভাজনে ব্রাহ্মণ্যবাদের নামে ব্রাহ্মণ বানিয়া শ্রেণী শৈক্ষিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বা আরও বিভিন্ন দিকে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরও দলিত ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণী থেকে বহুগুণ অগ্রসর হয়ে আছে তা বিভিন্ন প্রতিবেদনে লক্ষিত। তবু বামপন্থী বা দলিত বিচারধারার কারোর দ্বারা যদি এইধরণের দেয়াল লিখন হয় তবে এটা জাতিগত আক্রমণ। এইধরণের সংকীর্ণ মানসিকতা এবং কাজ নিন্দনীয়।

অপরদিকে, এই দেয়াল লিখনের কাজ যদি এবিভিপি বা বিজেপি সমর্থিত কারো কাজ হয়ে থাকে, ধরে নেয়া হয়, তবে একটা অযৌক্তিক বিষয় নির্বাচনে ইস্যু বানিয়ে উচ্চবর্ণের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা বা জেএনইউ-র বামপন্থী বা দলিত গতিবিধি সাম্প্রদায়িকতা ছড়াচ্ছে দেখিয়ে দেশের জনগণকে বামপন্থী বা বিজেপি বিরোধী সমর্থন থেকে নিজেদের দিকে টেনে আনার অভিপ্রায়। অথবা দেশে জাতিবাদ বা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। যদি এবিভিপি বা এই ধরনের কারো দ্বারা এই দেয়াল লিখন হয় তবে এটাও নিন্দনীয়।

এখন কথা হলো এই দেয়াল লিখন কি কোন বামপন্থী- দলিত বা এবিভিপি ছাড়া কোন তৃতীয় পক্ষের ষড়যন্ত্র। এইধরণের বিভেদমূলক মন্তব্য কারা করেছে, নিশ্চয় রাতের অন্ধকারে লিখা দেয়াল লিখন দিনের আলোয় উদ্ভাসিত হবে। কিন্তু নীরব দর্শক গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা থেকে এই আশা করতে পারে কি একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সঠিক তথ্য সিনাক্তকরণ হবে ?

আসলে এইধরণের ঘটনা কোন রাজনৈতিক মুনাফা না দেশহীতের কাজে ঠিক কোনটা তা স্পষ্ট ফুটে উঠছে না। এইধরণের বিভেদকামী বিষয় নিয়ে ভারতবর্ষে শান্তি সম্প্রীতি বিনষ্ট করে কোনভাবেই 'জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন' নেয়া সম্ভব নয়। যেকোন উন্নয়নশীল দেশ বিকাশ ও উন্নয়নে তাদের ফোকাস সেখানে ধর্মীয় মেরুকরণ, জাতীবাদ, নারী নির্যাতন, সাম্প্রদায়িকতা বাদ দিয়ে মননশীল প্রগতির পথে। তাই বিকাশ ও উন্নয়ন হোক প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। দল - পন্থা নির্বিশেষে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংগঠন এক গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল কাজে দেশের উন্নয়নে দূরদর্শী এবং দায়িত্বশীল হওয়ার সময় এখনই।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...