Saturday, December 29, 2018

সুপ্ত কথা

এটা ‘চার্লি চ্যাপলিন’ অভিনীত বিখ্যাত সিনেমা ‘দ্যা গ্রেট ডিক্টেটর’-এর একদম শেষের দৃশ্যের একটা ভাষণ। চার্লি চ্যাপলিন ছিলেন মূলত সাইলেন্ট মুভির অভিনেতা। তাঁর বাক-হীন অভিনয় দেখে সবাই উচ্চস্বরে কণ্ঠ ছেড়ে হাসতো। কিন্তু সেই অভিনেতা যখন হানাহানি আর রক্তপাতের বিরুদ্ধে উচ্চস্বরে তাঁর কণ্ঠ ছেড়েছিলেন, পুরো দুনিয়া বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো। এটা সেই ঐতিহাসিক ভাষণের বাংলা অনুবাদ, যেটা তিনি দিয়েছিলেন সিনেমাটার একদম শেষে, পুরো মানব জাতির উদ্দেশ্যে…
««««««««««»»»»»»»»»»
আমি দুঃখিত! আমি কোনো সম্রাট হতে চাই না। ওটা আমার কাজ নয়। আমি শাসন করতে কিংবা দখল করে নিতেও চাই না কাউকে। যদি সম্ভব হয়, আমি চাই সবাইকে সহযোগিতা করতে, হোক সে ইহুদি কিংবা অন্য কেউ, কালো কিংবা সাদা। আমরা সবাই চাই আসলে একে অপরকে সহযোগিতা করতে, মানবজাতি ওভাবেই তৈরি। আমরা বাঁচতে চাই একে অপরকে আনন্দে রেখে, অন্যকে কষ্টে রেখে নয়। আমরা চাই না একে অপরকে ঘৃণা ও অপমান করতে।

এই পৃথিবীতে সকলের জন্যেই পর্যাপ্ত স্থান আছে। এই ধরণী বিপুল ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ আর সবারই দেখভাল করতে সক্ষম। বেঁচে থাকাটা হতে পারে স্বাধীন এবং সুন্দর। কিন্তু আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। লোভ মানুষের আত্মাকে বিষাক্ত করে তুলেছে, পৃথিবীকে ঢেকে ফেলেছে ঘৃণার চাদরে, আমাদেরকে টেনে নিয়ে গেছে দীনতা ও রক্তপাতের দিকে।

আমরা গতি অর্জন করেছি, কিন্তু বেঁধে ফেলেছি আমাদের মনকে। যন্ত্ররা আমাদের প্রাচুর্যে ভরিয়ে দিয়েও ফেলে রেখেছে অভাবের ভেতরে।
আমাদের জ্ঞান করে তুলেছে আমাদের হতাশাবাদী। চতুরতা করে তুলেছে কঠিন এবং রূঢ়। আমরা খুব বেশী ভাবি অথচ অনুভব করি খুব কম। যন্ত্রের থেকেও বেশী প্রয়োজন আমাদের মানবতা। চতুরতার থেকেও বেশী দরকার আমাদের মমতা এবং ভদ্রতা। এই গুণগুলো ছাড়া জীবন হয়ে উঠবে হিংস্র আর হারিয়ে যাবে সবকিছু।

বিমান এবং রেডিও আমাদের সবাইকে খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। এই আবিষ্কারগুলো চিৎকার করে বলছে মানুষের ভালোবাসার কথা, তাদের ভ্রাতৃত্ব-বোধের কথা, তাদের একতার কথা। এমনকি এই মুহূর্তেও আমার কণ্ঠ গিয়ে পৌঁছাচ্ছে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে। লক্ষ লক্ষ হতাশাগ্রস্ত নারী, পুরুষ আর শিশুদের কাছে, যারা এমন এক ব্যবস্থার শিকার যেখানে মানুষ আরেক নির্দোষ মানুষকে নির্যাতন ও বন্দী করে। যারা আমার কথা শুনতে পাচ্ছো, তাদের বলছি, “নিরাশ হয়ো না”।

যে দুর্ভোগ আমাদের আজ পোহাতে হচ্ছে, সেটা লোভের পরিণতি ছাড়া আর কিছুই নয়। যারা মানবজাতির উন্নতিতে ভয় পায় তাদের তিক্ত মনের কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষের মনের ঘৃণা এক সময় মিলিয়ে যাবে, সেই স্বৈরশাসক মারা যাবে, আর মানুষের থেকে যে ক্ষমতা সে কেড়ে নিয়েছিলো- সেটা ফিরে যাবে সাধারণ মানুষের হাতে। ফলে যতদিন মানুষের মৃত্যু ঘটবে, ততদিন স্বাধীনতার কখনো বিনাশ ঘটবে না।

সৈনিকেরা, পশুদের হাতে তোমাদের তুলে দিও না। সেই সব মানুষদের হাতে যারা তোমাকে তাচ্ছিল্য করে, ক্রীতদাস করে, নিয়ন্ত্রণ করে তোমার জীবন; তোমাকে বলে চলে- কী করতে হবে, কী ভাবতে হবে, কী অনুভব করতে হবে; যারা তোমাকে চরিয়ে বেড়ায়, বাছ-বিচার করে খাওয়ায়, গবাদিপশুর মতো তোমাকে গণ্য করে, খরচের খাতায় থাকা জিনিসের মতো ব্যবহার করে। তোমাদের তুলে দিও না সেই সব অপ্রকৃতস্থ মানুষের হাতে। যন্ত্র মানবদের হাতে, যাদের মগজ যান্ত্রিক আর হৃদয়ও যান্ত্রিক। তোমরা যন্ত্র নও। তোমরা গবাদিপশুও নও। তোমরা মানুষ। তোমাদের হৃদয়েও আছে মানুষের প্রতি ভালোবাসা। তোমরা তো কাউকে ঘৃণা করো না। শুধু ভালোবাসা বঞ্চিতরাই ঘৃণা করে। ভালোবাসা বঞ্চিত ও অপ্রকৃতিস্থরা।

সৈনিকেরা, দাসত্বের কারণে লড়াই কোরো না। লড়াই করো স্বাধীনতার জন্যে। সেইন্ট লুকের সপ্তদশ অধ্যায়ে বলা আছে, “ঈশ্বরের সাম্রাজ্য রয়েছে মানুষেরই ভেতরে”। শুধু একটা মানুষের ভেতরে নয়, শুধু একদল মানুষের ভেতরে নয়, বরং তোমাদের সবার ভেতরে; তোমার ভেতরেও। তোমাদের মানুষদেরই আছে ক্ষমতা, যন্ত্র তৈরির ক্ষমতা, সুখ তৈরির ক্ষমতা। তোমাদেরই আছে এই জীবনটাকে মুক্ত ও সুন্দর করার ক্ষমতা, জীবনটাকে এক অসাধারণ অভিযান বানানোর ক্ষমতা। তাহলে চলো গণতন্ত্রের খাতিরেই আমরা সেই ক্ষমতাটাকে ব্যবহার করি। চলো আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই!

এসো আমরা এক নতুন পৃথিবী গড়তে লড়াই করি, এক সুন্দর পৃথিবী যা মানুষকে দেবে কর্মের সুযোগ, শিশুদের দেবে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আর বয়স্কদের দেবে নিরাপত্তা। এসব দেবার ওয়াদা করেই পশুরা উঠেছিলো ক্ষমতার শিখরে। কিন্তু তারা মিথ্যা বলেছিলো। তারা কখনোই সেই ওয়াদা পূর্ণ করেনি, কখনো করবেও না। স্বৈরাচারেরা মুক্ত করেছে শুধু নিজেদেরকেই, আর ক্রীতদাস বানিয়েছে জনগণকে। এখন এসো আমরা একত্রে লড়াই করি সেই ওয়াদা পূরণে।এসো একসাথে লড়াই করি পৃথিবীটাকে মুক্ত করতে; সমস্ত জাতীয় সীমানার, সমস্ত লোভের, সমস্ত ঘৃণার এবং অসহনশীলতার ইতি টানতে। এসো একসাথে লড়াই করি একই লক্ষ্যের পৃথিবী গড়তে, এমন এক পৃথিবী যেখানে বিজ্ঞান ও উন্নয়ন মানুষকে নিয়ে যাবে সুখী জীবনের দিকে।
সৈনিকেরা! গণতন্ত্রের নামে এসো: আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হই!
**************************
এরপরেই চার্লি চ্যাপলিনের বিরুদ্ধে হিটলারের ফতোয়া নামে ।
(সুজিত দণ্ডপাটের দেওয়াল থেকে)

লিটল ম্যাগাজিন : অন্তহীন যাত্রা

" সভ‍্যতা তো সইতে শেখায়।
বইতে শেখায় নদীর তীরে।
মনকে আবার পারলে ফেরাও
জীবন বিমুখ এই শরীরে।---- শ্রীজাত

সাহিত্য-সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগাজিন দীর্ঘদিন থেকে এক অসাধারণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শিল্প-সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিষয়ে চলমান ধারাকে আপত্তি জানিয়ে মুক্ত চিন্তা ও মতামত ব‍্যক্ত করার বাহক হলো লিটল ম্যাগাজিন। সৃজনশীল ও সৃষ্টিশীল তথা কমার্শিয়াল দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে সাহিত্যের বিবর্তন ও বিনির্মাণে দলিল হয়ে উঠেছে। যে বোধের তাড়িত হয়ে প্রতিটা লিটল ম্যাগাজিন, তার নেপথ্যের মূলে জীবনের গল্প। নব আশার কিশলয় কবে রূপ নেবে মহীরুহে তা জানা নেই। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি বোধের এই চিন্তন ভূমিতে কালে কালে হরেক বৈচিত্রের জন্ম হবে আবহমানতার ভেতরেই ফলবতী থাকে বীজ মাহাত্ম। তাই র‍্যশানাল জীবনের শরীরী উদভাস প্রবল হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। আর যারা কিছু নতুন নির্মাণের কারিগর তাদের পায়ের নীচে থাকা চাই সহযোগের শক্ত পাটাতন। আর অবশ্য এই পাটাতনের নাম 'লিটল ম‍্যাগ'।উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগাজিনগুলো মাতৃতুল‍্য। আমাদের অঞ্চলে যেসব লেখক- প্রায়ই উঠে এসেছেন লিটল ম‍্যাগ থেকে। তাই নবীন প্রবীণ সাহিত্যিকদের মধ্যে যে মেল বন্ধন ধরে তার একমাত্র বাহক লিটল ম্যাগাজিন।
            আজকের এই বিশ্বায়নের গগনচুম্বী আপ-টু-ডেট ভার্শনে, সাহিত্য-সংস্কৃতি-সভ‍্যতায় পুঁজিবাদী গন্ধ, আর ঠিক সেই সময়ে গুয়াহাটির মতো 'ডিজিটালাইজেশনের' পথে ধাবিত হওয়া শহরে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজ আয়োজিত "৭ম উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলন'। এই অভাবনীয় অনুষ্ঠান আমাদের ভাবনায় এক উৎসাহের প্রজ্জ্বলিত শিখার জন্ম দেয়। এক আলাদা সত্তা হিসেবে কাজ করে যখন সময় সংকটে। ২০১৮ সনের ২২,২৩ ও ২৪ ডিসেম্বর গুয়াহাটির সাউথ পয়েন্ট স্কুল প্রাঙ্গণে ৭ম উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লি'ম‍্যাগ সম্মেলনে বিশিষ্ট গুণীজনের সান্নিধ্য ও নতুন কিছু অভিজ্ঞতার কাছে পরিচয় সে এক অভাবনীয় বিষয়। যা আমার সৌভাগ্য। উত্তর পূর্বাঞ্চলের ছোট কাগজ মিলন মেলায় মেলবন্ধন ও মতবিনিময় সুযোগ করে দিয়েছে এই মঞ্চ। লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলন যে বিষয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠে-- ১। কবি- সাহিত্যিক মিলনায়তন,২। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,৩। আলোচনা সভা,৪। মতবিনিময়,৫। প্রদর্শনী।
                   ৭ম লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনটি ছিল এক চমকপ্রদ। আর আমার জন্য অনেক শিক্ষনীয় দিকের উন্মেষ হওয়া। অসংখ্য পত্র পত্রিকা, ছোট কাগজ তথা যে কবি, সাহিত্যিক, কথাকারদের লেখা পড়েছিলাম এবং যাদের সাথে ফেবুতে পরিচয় ছিল, সশরীরে অনেক কে দেখে ধন্যবাদ জানাই এই বৌদ্ধিক চিন্তার সঙ্গমস্থলকে। বাসব দা, সুশান্ত কর স‍্যার, গৌতম দা, প্রসূন দা-- বিশেষ করে ওদের সাথে ফেবুতে বেশ কথা হয়। এমনকি আমার "মননভূমি"র ৩য় সংখ‍্যায় বাসব দার একটা লেখাও ছাপিয়েছি। কিন্তু কখনও একসাথে দেখা হয়নি। এই লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলন অসম,ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গকে ত্রিবেনী সঙ্গমে পরিণত করেছে।
                এই মহা মিলনায়তনে বরাক-ত্রিপুরা মিলে আমরা যোগ দেই ১৩জন। আমার করিমগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন থেকে ওদের সাথে দেখা হয়। অজিত স‍্যার, গোবিন্দ ধর(স্রোত), গোপাল চন্দ্র দাস(মনুতট),সঞ্জীব দে(বিজয়া) রাজিব(রূপান্তর), অভিক(সমভূমি),পদ্মশ্রী মজুমদার(বইবাড়ি), গৈরিকা(দোলনা), শুভ্রশংকর(Shadowkraft) অনুপ(মহুরি)আর আমি একসঙ্গে বদরপুর পর্যন্ত যাই। তারপর সেখানে দেখা হয় আদিমা মজুমদার(কথা) ও মৃদুলা ভট্টাচার্য(সৃজনী) এর সঙ্গে। রাত্রি ০৯.৩০ মিনিটে শিলচর-গুয়াহাটি ট্রেনে যাত্রা শুরু করলাম সম্মেলন অভিমুখে। এই যাত্রায় গোবিন্দ দা'র সাথে আমার প্রথম সফর। এই শব্দ চাষীর কথা যতই বলা হবে তবুও কম। স্রোত সাহিত্য পত্র ১৯৯৫ সাল থেকে নাথেমে চলছে। এখন পর্যন্ত ৬৮-৬৯তম সংখ্যা বেরিয়ে শতকের ঘর পেরোনোর লক্ষ্যে। স্রোত প্রকাশনাও পিছিয়ে নয়। প্রায় ৫০০টির উপর উত্তর পূর্বাঞ্চলের বইসহ সারা বাংলা সাহিত্যের বই করে স্রোত আজ সারা বাংলা সাহিত্যের পরিচিত নাম। বাংলা সাহিত্য চর্চায় এই শব্দ শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমকে সাধুবাদ জানাই।
                এই সম্মেলনের অনেক প্রাপ্তি। টেবিলে টেবিলে মিলন গানে বেঁধে নিয়েছে একসূতে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক নিরুপমা বাইদেউর হাতে উদ্বোধন ও লিটল ম্যাগাজিনের প্রাণপুরুষ সন্দীপ দত্তের দ্বারা "হেমন্ত কুমারী চৌধুরী" লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনী উদ্বোধন হয়। এই দৃশ্য রেখাপাত করে আমার হৃদয়ের তথ‍্যচিত্রে। আরও নজড় কাড়ে মঞ্চ উৎসর্গ করার মাধ্যমে-- দীপালি বরঠাকুর ও শুক্রাচার্য রাভা স্মরণে। ছোট পত্রিকা ও সম্পাদকের সাথে পরিচয়ে যে উষ্মস্পর্শ পেয়েছি তা আর হয়তো নাও হতে পারে। বিশেষ করে-- উজান, নাইনথ কলাম, জলসিঁড়ি, লেখা কর্মী, আরশিনগর, প্রজন্ম চত্বর, দোলনা আরও অনেক।
                  অতিথি আপ‍্যায়নে বিশেষ করে আমাদের থাকা খাওয়ার ব‍্যাপারে আয়োজক গোষ্ঠি চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। হোটেলের প্রবেশদ্বারে গৌতম দা'র উষ্ণ অভিনন্দন চিরদিন মনে রাখার মতো। শিখেছি আতিথেয়তা কিভাবে করতে হয়। যাবার বেলায় যখন না খেয়ে বেরিয়ে পড়ি ট্রেনের জন্য তখন প্রসূন দা যে অমায়িক ও সহোদরতা দেখিয়েছেন তা অমূল্য। মনে পড়লেই চোখে জল এসে যায়। এই সম্মেলন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। বিশেষ করে লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে অনেক কিছু জানতে পারি যা এ যাবৎ আমার কাছে অজানা ছিলো। অনেক প্রশ্ন যেগুলো আমাকে যন্ত্রণা দিতো ম‍্যাগাজিন তৈরিতে--- অমলেন্দু স‍্যার, সুশান্ত স‍্যার, জ‍্যোতির্ময় দা, গোবিন্দ দা, এর সমাধান দিয়েছেন নির্দ্বিধায়।  দ্বিতীয় দিন বিকেলে লিটল ম্যাগাজিনের প্রাণপুরুষ সন্দীপ দত্ত, উনিও বসেছিলেন আমার ষ্টলে। আলোচনা করেন লি'ম‍্যাগ এর প্রতিবন্ধকতা নিয়ে।
               ৭ম উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলন সম্পাদিত হয় বিভিন্ন ধরনের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। বিশেষ করে কবিতা পাঠ, গল্প পাঠ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রতিনিধি সভা, সাউথ পয়েন্ট স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের অনুষ্ঠান, সম্পাদকদের বৈঠক ইত্যাদি। সম্মেলনের তৃতীয় দিনে প্রতিনিধি সভায় "লিটল ম্যাগাজিন" বিষয়ক বিভিন্ন দিকের আলোচনা হয়। এই আলোচনা সভায় উপস্থিত থাকেন-- "সৃজনী- মৃদুলা ভট্টাচার্য, উত্তীয়- স্নিগ্ধা চট্টোপাধ্যায়, বরাক নন্দিনী- দেবযানী ভট্টাচার্য, স্রোত- গোবিন্দ ধর, প্রজন্ম চত্বর- জ‍্যোতির্ময় রায়, উত্তরণ, মননভূমি- আ. জাহিদ রুদ্র, কর্মশালা- ধনঞ্জয় চক্রবর্তী, আকাশের ছাদ- সুমিতা বসু ঠাকুর, সাগ্নিক- প্রদ‍্যোৎ গোস্বামী প্রমুখ। এই অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কুমার অজিত দত্ত মহাশয়।  জ‍্যোতির্ময় রায়ের অসাধারণ শব্দ চয়ন বক্তব্য আর গোবিন্দ ধর লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশে নিজের কিছু ব‍্যক্তিগত গল্পও তুলে ধরেন এই আলোচনায়। "সাগ্নিক" এর সম্পাদক প্রদ‍্যোৎ গোস্বামী বড়ল‍্যাণ্ড থেকে কতটা ত‍্যাগ স্বীকার করে ম‍্যাগাজিন চালিয়ে যাচ্ছেন তাও শুনে অবাক হলাম। আসলে লিটল ম্যাগাজিন যে অপ্রাতিষ্ঠানিক এবং অবানিজ‍্যিক তা পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুধাবিত হয় এই মঞ্চে।
            আমার আলোচনা আর দীর্ঘায়িত করছি না। তবে একটি কথা না বললে অসম্পূর্ণ থাকবে বলে মনে করি আমার লেখনী। সম্মেলন শেষে ট্রেনে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই, গুয়াহাটি-শিলচর ফার্ষ্ট পেসেঞ্জারে। সঙ্গে আদিমা মজুমদার। পরদিন সকালে ফ্রেশ হয়ে ট্রেনে বসে বসে গল্প করছিলাম আন্টির সাথে। তো হঠাৎ এক হিজড়া এসে হাজির আমাদের কামরায়। হাতে তালি দিয়েই টাকার আবদার। এই সুযোগে আদিমা মাসি ওর হাত ধরে বসিয়ে দিলেন তাঁর কাছে। আদর-সোহাগে কথোপকথন করতে থাকেন তার সাথে। তার ব‍্যক্তিগত জীবনের অনেক দিক নিয়ে কথা চলে।অশ্রুমথিত চোখে অনর্গল বলতে থাকে জীবনের গল্পটা। আন্টি প্রশ্ন করছেন আর সেও উত্তর দিচ্ছে একটার পর একটা।সেই ফাঁকে আমিও ভিডিও করে নিলাম এই সাক্ষাৎ কারের। যেখানে বিশ্বায়নের নামে রঙিন ফানুস উড়িয়ে মানুষ আনন্দ বিহারে মগ্ন। নিজেকে সভ‍্য করার জাল সার্টিফিকেট দেখিয়ে লুটিয়ে খাচ্ছে সমাজ। এই সমাজে হিজড়াদের প্রতি মানবিক বড়ই বিচক্ষণ মানসিকতার কাজ। এই নির্মম সমাজ মৃত বাবার মুখও দেখতে দেয় নাই অভাগিনিটাকে। বড়ই করুণ লাগে। আন্টির মুখে মমতার আঁচলে ঘেরা স্বান্তনা তাকে নিশ্চয়ই বেঁচে থাকার, নিজেকে সংযত করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাত শেখাবে। অবশেষে আমরা কিছু টাকা তুলে তার হাতে দেই। তারপর বিদায় নিয়ে চলে যায়।
                দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা একটু ব‍্যাতিক্রম। অমলেন্দু স‍্যার আর আমরা দু'জন গল্প করছিলাম। তো হঠাৎ এক বাদামওয়ালার সাথে সাক্ষাৎ। সে স‍্যার কে দেখে প্রণাম করে, দু'জনের মধ্যে বার্তালাপ চলতে থাকে। স‍্যার পরিচয় করিয়ে দিলেন পঙ্কজের সাথে। গুরুচরণ কলেজ থেকে বাংলায় ৫৯% পেয়ে ডিগ্রী পাশ করে। বর্তমানে "আইডল" থেকে মাষ্টার্স করছে। স‍্যার তাকে বিশেষ কিছু টিপস দিলেন। আর আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখতে বললেন পঙ্কজ কে। এই কমল হৃদয়ের ছেলেটার পড়ার প্রতি আগ্রহ আর টান অনেক কিছু মনে করিয়ে দিল আমাকে। ফেরার পথে এই ঘটনাদ্বয়ে সম্মেলনের ক্লাইম্যাক্স আরও অভিজ্ঞতার জানান দেয় আমাকে।
           কথায় কথায় অন্য কথা এসে গেল। তবে এটা অপ্রাসঙ্গিক নয়। সবশেষে একটা কথা বলি। লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলন কে 'সাহিত্য উৎসব' বললেও ভুল হবে না। সম্মেলনের প্রতিটা অনুষ্ঠান দারুণ উপভোগ্য ও নজরকাড়া ছিলো। যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে সম্মেলনটি সুন্দর ও সর্বাঙ্গীন সফলতা পেয়েছে সেই "বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজ"কে জানাই হৃদয়ের অন্তর্স্থল থেকে কুর্নিশ এবং আন্তরিক শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন।

Monday, October 29, 2018

মানুষের পৃথিবীটা

মানুষের পৃথিবীটা আস্ত একটা যৌনখানা
ন্যাংটো হয়ে যেই বিছানাটা নাচতে শুরু করলো
ফরমান এলো
মানচিত্রের কাঁধের কাছ থেকে আড়াই কেজি মাংস কেটে নেয়া হবে
অবাক হবেন না।

শুকনো জিহ্বা কত টানবে উপচে পড়া ব্লাউজের রস
রয়েল-বেঙ্গল টা ন‍্যাশনেল পার্কে
স্বপ্ন বিহারে বিভোর
আর্য-শ্লোকের বর্জ‍্য চিৎকারে
থালায় প্রসাদ, চেষ্টায় ঘুম ভাঙানো।

নাস্তিকতা এবং বিশ্ব প্রেক্ষাপট

নাস্তিকদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে পুরো বিশ্ব, সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশের তালিকায় বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক এক গবেষণা বলছে, বিশ্বের ৮৫টি দেশে ধর্মে অবিশ্বাসী বা নাস্তিকরা প্রচণ্ড বৈষম্য-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
এর মধ্যে, গত এক বছরে অন্তত সাতটি দেশে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে চরম নির্যাতন হয়েছে। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং মালয়েশিয়া।
ধর্ম বা সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসীদের জন্য ৩০টি সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিস্ট এ্যান্ড এথিক্যাল ইউনিয়ন (আইএইচইইউ) নামে একটি সংস্থার উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদনটি দু সপ্তাহ আগে ইউরোপীয় সংসদে পেশ করা হয়েছে।

কোন কোন দেশ সবচেয়ে বিপজ্জনক?

গত এক বছরে নাস্তিকদের ওপর হামলা নির্যাতনের প্রসঙ্গে পাকিস্তান, ভারত, সৌদি আরব, সুদান এবং মালয়েশিয়ার নাম একাধিকবার এসেছে।
এপ্রিল মাসে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে অন্য ছাত্ররা পিটিয়ে হত্যা করেছে।
তার কয়েক সপ্তাহ আগে, মালদ্বীপে এক ব্লগার, যিনি ধর্ম নিরপেক্ষতার স্বপক্ষে নিয়ে লেখালেখি করতেন এবং মাঝে মধ্যে ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করতেন, তিনি নিজের ঘরে ছুরিকাঘাতে নিহত হন।
সুদানে মোহামেদ আল দোসোগি নামে একজন মানবাধিকার কর্মী তার জাতীয় পরিচয় পত্রে মুসলিম পরিচয় বদলে নাস্তিক হিসাবে পরিচিত হতে চাইলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

পাকিস্তান অন্যতম বিপজ্জনক দেশ।

ধর্মে অবিশ্বাসীদের জন্য পাকিস্তান চরম বিপজ্জনক দেশ। এরকম কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরে আইএইচইইউ বলছে - যে সব মানুষ ধর্ম, সৃষ্টিকর্তা এসব মানেনা, এসব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তাদের ওপর পৃথিবীর দেশে দেশে অত্যাচার, নির্যাতন, বৈষম্য বাড়ছে।
তাদের গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে বিশ্বের ৮৫টি দেশে এই ধরণের নির্যাতন "চরমে পৌঁছেছে।

তার মধ্যে সাতটি দেশে - ভারত, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মৌরতানিয়া, পাকিস্তান, সুদান, সৌদি আরব - ধর্ম অবিশ্বাসীদের ধরে ধরে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে।
৩০টি সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম রয়েছে।
এই তালিকায় আরো রয়েছে মিশর, কাতার, আফগানিস্তান, ইরান ও ইরাক। এর মধ্যে ১২টি দেশে ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছ।
এই ৩০টি দেশেও গত এক বছরে নাস্তিক তকমা দিয়ে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তথাকথিত ধর্ম অবমানকারীদের গুম করার ঘটনাও ঘটেছে।

পশ্চিমা দেশও ঝুঁকিমুক্ত নয়

যে সব দেশে নাস্তিকরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই মুসলিম প্রধান দেশ।
কিন্তু কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রেও ধর্মে অবিশ্বাসী লোকজনের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
"বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা বা বৈষম্য সাধারণ ঘটনা," বলছেন ব্রিটেনের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ম বিষয়ক গবেষক ডঃ লোয়া লি।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের তথাকথিত বাইবেল-বেল্টে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতা দিন দিন বাড়ছে।
গত এক বছরে ৮৫টি দেশে ধর্মে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে নানা নির্যাতন বৈষম্যের ঘটনা ঘটেছে

কেন এই প্রবণতা?

অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এসব হত্যা নির্যাতনের খবর বেশি শোনা যাচ্ছে তার কারণ বিশ্বজুড়ে ধর্ম বিশ্বাস যত তীব্র হচ্ছে, তেমনি বহু মানুষ নতুন করে নিজেদের অবিশ্বাসী হিসাবে পরিচিত করছে। ফলে দ্বন্দ্ব বাড়ছে।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের হিসাবে, ২০৬০ সালে সারা বিশ্বে নাস্তিক এবং ধর্মে অবিশ্বাসীদের সংখ্যা বেড়ে ১২০ কোটিতে দাঁড়াবে। তবে আশংকাজনকভাবে  ধর্মে বিশ্বাসীদের সংখ্যা তার চেয়ে বেশি হারে বাড়বে!!

তবে এই হিসাবের সঙ্গে আমি একমত নই। আমার ধারনা এই হিসাবে মারাত্মক ভুল আছে! প্রযুক্তি এবং তথ্য যেভাবে আগাচ্ছে তাতে আমার ব্যক্তিগত ধারনা আগামী ৫০ বছরের মধ্যে পৃথিবী থেকে ধর্মের বিলুপ্তি ঘটবে! এ ক্ষেত্রে আপনার কি মত ?

সূত্রঃ বিবিসি নিউজ এবং অন্যান্য ওয়েবসাইটের কনটেন্ট অবলম্বনে লিখিত।

Wednesday, October 24, 2018

মৌলবাদ সৃষ্টি পুঁজিবাদ থেকে

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কায়েম করতে মৌলবাদ সৃষ্টি করা হয়ে থাকে! সাম্রাজ্যবাদী এই বিশ্বায়নের যুগে নব্য পুঁজিবাদী উপনিবেশবাদ এবং রমরমা হাতিয়ার বানিজ্য কায়েম করতে ধর্মীয় শাসন ব্যবস্থা জন্য ধর্মীয় মৌলবাদ খুবই রমরমা গোটা বিশ্ব জুড়ে! বিশেষ করে ষাটের দশক থেকে তা শুরু হয়েছে! সমাজতন্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পুঁজিবাদী আমেরিকা ঠান্ডা যুদ্ধের ফর স্বরূপ পৃথিবীর বুকে এই ধর্মীয় মৌলবাদ মারণাস্ত্র হয়ে আছে! সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সাম্রাজ্য বিস্তার এবং ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে তা বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকশো গুন! ------
মধ্য প্রাচ্যের, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার সংকট পরিকল্পনা মাফিক তৈরী! আফগান যুদ্ধ থেকে শুরু ইরাক পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থা কবল থেকে মুক্তি পেতে ধর্মীয় শাসন ব্যবস্থা জন্য ধর্ম নামক আফিম দিয়ে কত রক্ত বয়ে যাচ্ছে তার হিসেব নেই!

 
ধর্মীয় মৌলবাদ আজকাল পৃথিবীর বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পৌঁছে গেছে! নিউরো সাইন্সটিস আফিয়া সিদ্দিকী থেকে শুরু ক্যালিফোর্নিয়ার মেধাবী আরিফ পর্যন্ত! আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে ঠিক সেইরকম! উচ্চ শিক্ষাতে পাঠরত অনেক ছেলেমেয়ে মগজ ধোলাই এর ফলে বিপদে চলে যাচ্ছে! সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার থেকে আই টি এবং মেডিক্যালের ছাত্রছাত্রী! ভারতের কাশ্মীরের আফজল গুরু থেকে শুরু বুরহান বানী অনেকেই মেধাবী ছাত্র ছিল! কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতের নামী টপ টেন আলিগড় ইউনিভার্সিটির ছাত্র পিএইচডি স্কলার  মান্নান বানী উগ্রবাদের দিকে চলে গেল এবং বন্দুক যুদ্ধে মারা গেল! ভারতের সিমি একটি একটি নিষিদ্ধ সংগঠন যারা সদস্য সবাই উচ্চ শিক্ষা পাঠরত ছাত্রছাত্রী !


প্রশ্ন হচ্ছে এই মেধাবী ছাত্রছাত্রী কেন বিপদে যাচ্ছে, কেন তাদের মগজ ধোলাই হচ্ছে এবং কারা করছে? যারা মগজ ধোলাই এর শিকার হচ্ছে মনোবিজ্ঞানের দিক থেকে বিচার করলে এরা অসুস্থ বিজ্ঞানের ভাষায় তাদের বলা এনোমমিলাযান এন্টোবিযান সাইকোলি! এদের যথাযথ কাউন্সিলং হলে এরা সুস্থ হয়ে উঠবে! এদের উল্টো মগজ ধোলাই করতে হবে এবং যে বা যে সংগঠন তাদের মগজ ধোলাই করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে! রোগীকে মেরে লাভ নেই রোগ প্রতিরোধ করতে হবে ঐ রোগের ভাইরাস মারতে হবে!

 
আই এস হচ্ছে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে নৃশংস ভয়ংকর উগ্রবাদী কিন্তু তাদের যোদ্ধা অধিকাংশ উচ্চ শিক্ষত! ঠিক সেই রকম পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে হাজার হাজার উগ্র মৌলবাদী উগ্রবাদী সংগঠন! তাদের হাতিয়ার থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক মদতদাতা সৌদি আরব, ইজরায়েল এবং আমেরিকার! মধ্য প্রাচ্যের তেল আর আফ্রিকার খনিজ সম্পদ লুট করতে আর বিশ্ব জুড়ে আধুনিক হাতিয়ার বানিজ্য জিরিয়ে রাখতে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা, সংস্কৃতি, আঞ্চলিকতা ইত্যাদি বিভিন্ন ধারালো হাতিয়ার ব‍্যবহার করছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ! রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং ধর্ম হচ্ছে সবচেয়ে বেশি ধারালো হাতিয়ার!

Monday, October 22, 2018

কবি নজরুলের ধর্মমত।।

নজরুল ইসলামকে কেউ খুবই ভালোবেসেছেন,কেউ বা অসম্ভব ঘৃণা করেছেন। কিন্তু কেউই তাকে অবহেলা করতে পারেননি। তিনি যখন জনপ্রিয়তার একেবারে তুঙ্গে, তখনোকেবল প্ৰশংসার জোয়ারে ভাসেননি, বরং তীব্র নিন্দা আকর্ষণ করেছেন অনেকের তরফ থেকে। যেমন, মৌলবীরা (নজরুলের ভাষায় মৌ-লোভীরা) ফতোয়া দিয়েছিলেন যে, তিনি কাজী হলেও কাফের। আর হিন্দুরা তাকে উপাধি দিয়েছিলেন ‘পাত-নেড়ে’। তাঁর ভাষায়, পুরুষেরা তাঁকে নারীঘেষা বলে গাল দিয়েছেন, মেয়েরা তাকে অভিশাপ দিয়েছেন নারীবিদ্বেষী বলে।

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে তিনি একাত্ম হতে পারেননি। তার মানবতার সংজ্ঞার সঙ্গে কারো ষোলো আনা মিল হয়নি।নজরুল হয়তো ঠিকই বলেছেন–তিনি বর্তমানের কবি, ভবিষ্যতের নবী নন। হয়তো তাঁর সাহিত্য চিরকালীন সাহিত্য নয়। কিন্তু তিনি যে-মানবতার কথা বলেছিলেন, তা চিরকালের। তাঁর আগে অথবা পরে কোনো বাঙালি সাহিত্যিক, কোনো দার্শনিক, কোনো ধর্মীয় নেতা, এমন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মানবতার জয় গান করতে পারেননি–মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” সত্য বটে, তাঁর অন্তত দু শতাব্দী আগে চণ্ডীদাস বলেছিলেন, ‘সবার উপরে মানুষসত্য তাহার উপরে নাই।” কিন্তু চণ্ডীদাসের মানুষ এবং নজরুলের মানুষ এক নন। চণ্ডীদাস মনের মানুষের কথা বলেছিলেন। নজরুল বলেছিলেন রক্তমাংসের মানুষের কথা।
মানুষের প্রতি এই অকৃত্রিম ভালোবাসার জন্যেই নজরুল বলতে পেরেছিলেন। যে, জগতের সব পবিত্র গ্রন্থ এবং ভজনালয়ের চেয়ে একটি মানুষের ক্ষুদ্ৰ দেহ অনেক বেশি পবিত্র। মানুষকে ঘূণা করে যারা ধর্মগ্রন্থ পড়েন, তিনি তাঁদের কাছ থেকে ধর্মগ্রন্থ কেড়ে নেওয়ার আহবান জানিয়েছিলেন। মন্দির-মসজিদ ভেঙে ফেলার জন্যে কালাপাহাড় এবং গজনি মামুদকে আহবান জানিয়েছিলেন। সকল সাম্প্রদায়িকতার উর্ধে তাঁর এই যে-মানবগ্ৰীতি, তা-ই তাকে হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, খাটি বাঙালিতে পরিণত করেছিলো।অথচ নজরুল রীতিমতো মুসলমান হতে পারতেন। তিনি যে,-অশিক্ষিত পরিবারে জন্মেছিলেন, সে পরিবারে আনুষ্ঠানিক ইসলাম ধর্মই পালিত হতো। আর, ছেলেবেলা সেই ধর্মের শাস্ত্র পড়েই মাত্র দশ বছর বয়সে মসজিদে নামাজ পড়ানোর চাকরি পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি যেসব ইসলামী গান লিখেছিলেন, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোরান-হাদিস তিনি ভালোই জানতেন। কিন্তু ছেলেবেলার এই শিক্ষা সত্ত্বেও তিনি মোল্লাহ হলেন না, বরং কয়েক বছরের মধ্যে ‘কাফের কাজী” উপাধি লাভ করেন। পরিণত নজরুল যে কেবল ইসলাম ধর্মের কতোগুলো বিধানের বিরোধিতা করলেন, তাই নয়; আনুষ্ঠানিক ধর্মেরই তিনি বিরোধিতা করলেন। খোদার আসন আরশ ছেদ করে উঠলেন, ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিলেন। কিকরে এটা সম্ভব হয়েছিলো, বলা শক্ত। ছাত্রজীবনে এবং সেনাবাহিনীতে থাকার সময়ে তিনি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের ঘনিষ্ঠতায় এসেছিলেন–এই একটি তথ্য দিয়েই এর ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না।ধর্ম যে মানুষের তৈরি এবং অর্থহীন, তারও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। “হত-আহতদের ক্ৰন্দনে মসজিদ টলিল না, মন্দিরের পাষাণ দেবতা সাড়া দিল না। শুধু নির্বোধ মানুষের রক্তে তাহাদের বেদী চিরকলঙ্কিত হইয়া রহিল।’ কিন্তু হতাশা দিয়েই তাঁর বক্তব্য তিনি শেষ করেননি। আশা করেছেন “সেই রুদ্র আসিতেছেন, যিনি ধর্ম-মাতালদের আডডা ঐ মন্দির মসজিদ-গীর্জা ভাঙিয়া সকল মানুষকে এক আকাশের গম্বুজতলে লইয়া আসিবেন।” “হিন্দু-মুসলমান’ প্ৰবন্ধে লিখেছেন, এই দুই সম্প্রদায়ের বিরোধের প্রধান কারণ মোল্লা-পুরুতের দেওয়া শাস্ত্রের অপব্যাখ্যা। হিন্দুত্ব মুসলমানত্ব দুই সওয়া যায়, কিন্তু তাদের টিকিন্তু দাড়িত্ব অসহ্য, কেননা ঐ দুটোই মারামারি বাধায়। টিকিন্তু হিন্দুত্ব নয়, ওটা হয়ত পণ্ডিতত্ত্ব! তেমনি দাড়িও ইসলামতত্ত্ব নয়, ওটা মোল্লাতৃত্ব!’

সাহিত্যের মান বিচার করলে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের কোনো তুলনা চলে না, কিন্তু ঐহিত্য সমন্বয়ের প্রশ্ন উঠলে স্বীকার করতেইহবে যে, নজরুল যেমন করে হিন্দু-মুসলিম ঐহিত্যের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তা আদৌ করতে পারেননি। করার চেষ্টাও করেননি। বস্তুত, বাড়ির কাছের পড়শিদের প্রাঙ্গণের ধারে গেলেও তিনি তাদের বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করেননি। অপর পক্ষে, নজরুল তা কেবল করেননি, সার্থকভাবে করেছিলেন। তিনি যেভাবে তৎসম-তদ্ভব শব্দের সঙ্গে আরবি-ফারসি শব্দের মিলন ঘটিয়েছিলেন, তাও একমাত্র তারই রচনায়দেখা যায়। এবং তিনি এটা করেছিলেন, আধুনিক বাংলা ভাষার জন্মদাতা এবং পালক রবীন্দ্রনাথ যখন “খুন’ শব্দের ব্যবহারে বিরক্ত হয়েছেন, সেই প্রতিকূল সময়ে।

সন্তানদের নামকরণ এবং শিক্ষায়ও এই অসাম্প্রদায়িকতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। নজরুল। তাঁর প্রথম সন্তানের নাম তিনি দিয়েছিলেন কৃষ্ণ মহাম্মদ। মুসলমানদের মধ্যে এখন বাংলায় নাম রাখেন অনেকেই। কিন্তু কৃষ্ণ এবং মহাম্মদের মিলন ঘটিয়ে নয়।দ্বিতীয় পুত্রের নাম দিয়েছিলেন অরিন্দম খালেদ। তৃতীয় এবং চতুর্থ পুত্রের নাম দিয়েছিলেন যথাক্রমে সব্যসাচী আর অনিরুদ্ধ। অরিন্দম, সব্যসাচী এবং অনিরুদ্ধ–তিনটি নামেরই ধর্মনিরপেক্ষ অর্থ থাকলেও, তাদের ধর্মীয় অনুষঙ্গই প্রধান। মুসলমানরা এতে তাঁর প্রতি প্ৰসন্ন হতে পারেননি। কিন্তু নজরুল সে সমালোচনা অগ্রাহ্য করতে পেরেছিলেন। কারণ, আনুষ্ঠানিক ধর্মের চেয়েও মানবিক এবং ভাষিক পরিচয় তার কাছে বড়ো ছিলো। সন্তানদের তিনি কোনো ধর্মীয় শিক্ষাও দেননি। নিজেও ব্যক্তিগত জীবনে কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন না।

নজরুল একদিনে মরেননি। তিনি নির্বাক হয়ে বেঁচেছিলেন পয়তিরিশ বছর। তারপর কেটে গেছে আরও তিরিশ বছর। এই প্ৰায় পয়ষট্টি বছরের মধ্যে তিনি কয়েকবার মারা যান। তাঁর গানের চরম অনাদর থেকে মনে হয়, তিনি প্রথম বার মারা যান পশ্চিম বাংলায়, দেশবিভাগের ঠিক পরে। মনে হয়, তার পেছনেও ছিলো। সাম্প্রদায়িকতা। দ্বিতীয় বার তিনি মারা যান পূর্ব পাকিস্তানে, তাকে খণ্ড খণ্ড করে হাজির করায়। তৃতীয়বার মারা যান বাংলাদেশে, শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করায়। চতুর্থবারও মারা যান বাং–মৌলবাদীদের হাতে। এবারে কেবল ব্যক্তি নজরুল নন, তাঁর আদর্শও ভূত অর্থাৎ অতীত হয়ে যায়। নজরুল মরেও মুসলিম জাতীয়তাবাদের হাত থেকে রেহাই পাননি। পরিজনের মতামত ছাড়াই তাকে যে ঢাকায় সমাধিস্থ করা হয়, সেও ইসলামের প্রতীক হিশেবে তাঁর নাম ব্যবহার করার জাতীয়তাবাদী উদ্দেশ্য থেকেই।অথচ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রভাবে উভয় বাংলাতেই বাঙালিত্ব যখন বিপন্ন, এমন কি, বিপন্ন যখন মনুষ্যত্ব, তখন নজরুলের বেঁচে থাকাটাই খুবই দরকার ছিলো। বস্তুত, একজন নজরুল নয়, খুবই দরকার ছিলো ঘরে ঘরে নজরুলের।

'হে মোর চিত্ত,পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে'

পরিস্থিতি যত উদ্ভট, সমাজের পরিবেশ যত প্রতিকূল, মূলত সময় এখন প্রশ্রয় দেয় অজ্ঞতায়। অন্তরস্থ ভাঙন তত তরান্বিত। সাধারণ ভাবে চতুর্...